উত্তাল দরিয়া। খোলামকুচির মতো দুলছে নৌকা। তারস্বরে চিৎকার করছে মাঝিমাল্লার দল। সমস্বরে কাতর স্বরে তারা ডাকছে ‘বদর’, ‘বদর’।

নৌকা চালানো, মাছ ধরা কিংবা অন্য কোনো কারণে নদী ও সমুদ্রে যাদের যাতায়াত তাদের কাছে এ ধরনের চিত্র পরিচিত। সাগরে ঝড় ওঠে। সে ঝড়ে বিপর্যস্ত মাঝিরা বদরের কাছে তাদের প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য অনুরোধ করে। ঝড় থেমে গেলে তারা বদরের প্রতি প্রণতি জানায়। কিন্তু কে এই বদর!

সাধারণভাবে তিনি ‘পীর বদর’ নামে পরিচিত। অনেকে আবার তাকে ‘বদর শাহ’ বা ‘বদর আউলিয়া’ নামে সম্বোধন করে। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে বদর পীরের মাজার ও আস্তানা আছে। আসাম, বিহার, এমনকি মিয়ানমারেও আছে বদর পীরের দরগা। তবে চট্টগ্রামের সঙ্গে বদর পীরের নাম সবচেয়ে বেশি জড়িত। কিংবদন্তি অনুসারে, বদর পীরের দয়ায়ই চট্টগ্রাম শহর জিন-পরীর কবল থেকে মুক্ত হয়েছিল। তিনি চাটি (মাটির প্রদীপ) জ্বালিয়ে জিন-পরীদের তাড়িয়েছিলেন। সেখান থেকেই এলাকাটির নাম হয় ‘চাটিগ্রাম’। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যা চট্টগ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বদর পীরের নানা অলৌকিক ক্ষমতা থাকলেও তিনি ‘দরিয়ার পীর’, ‘মাঝিমাল্লাদের রক্ষাকর্তা’, ‘মাঝিমাল্লাদের পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের মাঝিরা বহু শতাব্দী ধরে নদী ও সাগরে তাদের যাত্রা করার আগে পীর বদরের নামে বিভিন্ন ধরনের মানত করে আসছে। তারা পীর বদরের নামে চাটি জ্বালিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দেয়। তারা বিশ্বাস করে যে পীর বদরের প্রতি উৎসর্গীকৃত এ চাটি দরিয়ার পানিকে শান্ত রাখবে। পানি থেকে নিরাপদে ডাঙায় ফিরে আসার পর তারা পীর বদরের নামে করা মানত পূরণ করে। 

পীর বদর কীভাবে মাঝিমাল্লাদের মসিহ হয়ে উঠলেন? ‘দরিয়ারপীর’ হিসেবেই বা তার পরিচিতি কীভাবে গড়ে উঠল? এসব প্রশ্নের সঠিক কোনো বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। তবে অনুমান করা যেতে পারে। কিংবদন্তি অনুসারে, বদর পীর পাথরে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। সে কারণে তাকে দরিয়ার পীর ও মাঝিমাল্লাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবার প্রথা প্রচলিত হতে পারে। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। সাগর পাড়ি দিয়ে আরো অনেক পীর বাংলায় এসেছেন। হতে পারে যে অন্যদের তুলনায় পীর বদর তার অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন। আবার তিনি যেহেতু বৃহত্তর চট্টগ্রামেই বেশি পরিচিত এবং এ অঞ্চলেই মাঝিমাল্লার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, তাই তাকেই রক্ষক হিসেবে মেনে নিয়েছেন তারা।

তবে কেবল পীর বদরই নন। তার সঙ্গে আরো চারজনের কাছেও প্রার্থনা করে মাঝিমাল্লার দল। মোট পাঁচজন। এ পাঁচজন একত্রে ‘পাঁচ পীর’ নামে পরিচিত। তাদের ‘কুতুব’ তথা প্রধান হলেন ‘পীর বদর’। চতুর্ভুজের কেন্দ্রে তার অবস্থান। চারপাশে তাকে ঘিরে আছেন চারজন পীর। এ পাঁচ পীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে মাঝিমাল্লারা পানিতে পাঁচটি পয়সা ছুড়ে মারেন। পয়সা দেয়ার সময় তারা একত্রে বলেন,

‘দরিয়ায় পাঁচ পয়সার কুরবানি,

আরে বদর বদর’।

এ কথা থেকে স্পষ্ট যে পাঁচ পীরের প্রতি মাঝিমাল্লারা সম্মান জানালেও তাদের প্রধান পীর বদরের নাম আলাদাভাবে উচ্চারণ করার মাধ্যমে তারা তার দৃষ্টি আকর্ষণের বিশেষ প্রয়াস চালিয়ে থাকেন। অনেক সময় পীর বদরের পাশাপাশি গাজি পীরের নামও তারা নিয়ে থাকেন।

এ পাঁচ পীর কেবল দরিয়ার পীর হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। কালক্রমে কেবল মাঝিমাল্লারাই নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ নানা কারণে তাদের নামে মানত করা শুরু করে। তারই একটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাঁচ পীরের অন্যতম ধরা হয় শাহ পীরকে। লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদে তার মাজার অবস্থিত। সেখানে নানা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ভিড় করে বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তবে বিশেষভাবে সেখানে যান বন্ধ্যা নারীরা। বিয়ের বহু বছর পার হয়ে গেলেও যাদের কোনো সন্তান হচ্ছে না। এ নিয়ে একটি কিংবদন্তি আছে। শাহ পীরের মাজারের সামনের পুকুরে এক ধরনের মাছ আছে। সন্তানপ্রত্যাশী নারীরা পুকুরের ঘাটে নেমে মাছগুলোকে খাবার দেন। স্থানীয়দের মাঝে প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, যদি শাহ পীরের দরবারে কোনো নারীর প্রার্থনা কবুল হয়ে থাকে, তাহলে তার কোলে একটি মাছ উঠে আসে। তারপর সে নারীর হাত থেকে খাবার খেয়ে আবার পুকুরে নেমে যায়। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তখন সে নারী তার সন্তান হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হন। 

পাঁচ পীরের আরেকজন মানিক পীর। তার নামেও বহু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বলা হয়ে থাকে, একবার জনৈক কালু ঘোষের বাড়িতে আগমন ঘটে মানিক পীরের। কালু ঘোষের মা তাকে পাঁচ পয়সা হাদিয়া দিতে চান। কিন্তু মানিক পীর তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তে তিনি দুধ ও দধি দিতে বলেন। কালু ঘোষের মা কূটকৌশলে তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তার সব গবাদিপশু, এমনকি গোয়ালাও মারা যায়। কালু ঘোষের মা তার ভুল বুঝতে পারেন। তিনি মানিক পীরের কাছে ক্ষমা চান। পীরের দয়া হলে তিনি মাটিতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। সবকিছু আবার জীবিত হয়ে যায়।

বাংলায় পাঁচ পীরের একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিচিতি আছে। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই তাদের প্রার্থনা করে। তাদের উদ্দেশে তারা শিরনি মানত করে। তাছাড়া গরু, ছাগল, মুরগিও কুরবানি দেয়। বাংলা ও বিহারের মুসলিমদের কাছে পাঁচ পীরের সমাধিগুলো দরগা বা আস্তানা নামে পরিচিত। আর হিন্দু ভক্তরা এগুলোকে ঢিবি, আসন বা বেদি নামে ডাকে। অনেক জায়গায় পাঁচ পীরের ভক্তরা ঘরের একটি কক্ষ পীরদের জন্য বরাদ্দ রাখে। সেখানে তাদের কাছে প্রার্থনা করা হয়। পাঁচ পীরের সম্মানে সে কক্ষের উত্তর-পশ্চিম কোণে মাটির স্তম্ভের ওপর ছোট বেদি নির্মাণ করা হয়। সেখানে একটি লোহার তৈরি পাঞ্জা স্থাপন করা হয়। এর কবজিতে একটি হলুদ কাপড় বাঁধা থাকে। পাঞ্জার পাঁচটি আঙুলও আলাদাভাবে কাপড়ে পেঁচানো থাকে। এ পাঁচ আঙুল হলো পাঁচ পীরের প্রতীক। প্রতি বুধবার বেদিটি ধোয়া হয়, আগরবাতি জ্বালানো হয় এবং পুষ্পার্ঘ্য দেয়া হয়। বিশেষ দিনে ছাগল বা মুরগি পাঁচ পীরের নামে উৎসর্গ করা হয়। এক্ষেত্রে পাঁচ পীরের ভক্ত হিন্দুরা বিশেষ কিছু রীতি মেনে চলে। তারা মুসলমান কসাইদের মাধ্যমে জবাইকৃত ছাগলের মাংস খায়। তারা দেবদেবীর সামনে উৎসর্গীকৃত কোনো প্রাণীর মাংস ছোঁয় না। তবে তারা দেবদেবীর পূজা করাকে অস্বীকার করে না। পাঁচ পীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের দয়া কামনা করে শিরনি নিবেদন করা হয়। যথাযথ আচার-অনুষ্ঠান শেষ করে অংশগ্রহণকারী সবার মাঝে শিরনি বিতরণ করা হয়। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলা কিছুটা ব্যতিক্রম। সেখানে কেবল শিশু-কিশোরদের মাঝে শিরনি বিতরণ করা হয়। চাল, দুধ, চিনি, নারকেল ইত্যাদি দিয়ে এ শিরনি তৈরি করা হয়। শিরনি তৈরিতে ভক্তরা তাদের সাধ্য অনুযায়ী অর্থসহায়তা করে। তারা বিশ্বাস করে যে পরিপূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে যথাযথ রীতি অনুসরণপূর্বক পাঁচ পীরের প্রতি শিরনি নিবেদন করা হলে ইহজাগতিক ও পারলৌকিক সুখ-সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। রোগমুক্তি, মহামারী, মামলায় জয়ী হওয়া, পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করা, চাকরি পাওয়া, ব্যবসায় উন্নতি হওয়া ইত্যাদি কারণে পাঁচ পীরের প্রতি শিরনি নিবেদন করা হয়।

পাঁচ পীরের প্রত্যেকের নাম কী? এ নিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন তালিকা প্রচলিত আছে। বাংলা ও বিহারেও পাঁচ পীরের কয়েকটি তালিকা পাওয়া যায়। একটি তালিকা অনুসারে এ পাঁচজন হলেন পীর বদর, গাজি মিঞা, জিন্দা গাজি, শেখ ফরিদ ও খাজা খিজির। আরেকটি তালিকায় শেখ সাদ্দু নামে এক পীরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গে প্রচলিত পাঁচ পীরের এক তালিকায় ইসমাইল গাজির নাম আছে। কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি উত্তরবঙ্গ ও কামরূপের হিন্দু রাজাদের পরাজিত করে সেসব অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কাঁটাদুয়ার নামক স্থানে ইসমাইল গাজির মাজার অবস্থিত। 

বাংলাদেশে দুটি পাঁচ পীরের দরগা বিখ্যাত। একটি সোনারগাঁয়। অন্যটি বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া ইউনিয়নে। সেখানে আগে বার্ষিক উৎসবের আয়োজন করত মাদারি সম্প্রদায়। বর্তমানে তা বার্ষিক উরসে রূপ নিয়েছে। সেখানকার ভক্তদের বিশ্বাস অনুসারে, পাঁচ পীরের প্রধান হলেন শাহ মাদার। অন্যদিকে সোনারগাঁর পাঁচ পীরের তালিকায় আছেন শাহ সিকান্দার, শামসউদ্দিন, গিয়াসউদ্দিন, গাজি মিঞা ও গাজি কালুর নাম। এ পাঁচজনের প্রথম তিনজনই ছিলেন বাংলার স্বাধীন সুলতান। তারা হলেন শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪৩-৫৭ খ্রিস্টাব্দ), সিকান্দার শাহ (১৩৫৭-৯৩ খ্রিস্টাব্দ) ও গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ (১৩৯৩-১৪১০ খ্রিস্টাব্দ। পাঁচ পীরের এসব তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে নানাভাবে সুফি, শাসক, যোদ্ধাদের সন্নিবেশ ঘটেছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তি চরিত্রও এসব তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক। তাই অন্য কারণ ছাড়াও পাঁচ পীর বিশেষ করে মাঝিমাল্লাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। চট্টগ্রামের স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুসারে, এ পাঁচ পীর হলেন শাহ বদর, শাহ সুলতান, শাহ জালাল, শাহ মুহসিন ও শেখ ফরিদ। কিছু অঞ্চলে শাহ মুহসিনের পরিবর্তে শাহ পীরের নাম প্রচলিত আছে। অনেক ভক্ত আবার পীর বদরকে খাজা খিজির বলে বিশ্বাস করে। এভাবে ভক্তদের মনোজগতের নানামাত্রিক উপস্থাপনের নমুনা হিসেবে তৈরি হয়েছে পাঁচ পীরের বিভিন্ন কিংবদন্তি। 

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক