ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের জীবনযাত্রায় নিত্যনতুন বিভিন্ন উপাদান যুক্ত হতে থাকে। কোনো কোনোটা সরাসরি ব্রিটিশদের জীবন থেকে স্থানীয়দের জীবনধারায় জায়গা করে নিয়েছিল আবার পরিমাণে অল্প হলেও উল্টোটাও যে হয়নি, সেটা বলা যাবে না। ভারতীয় অনেক খাবার মনে ধরেছিল নাক উঁচু ব্রিটদের। অন্যদিকে উনিশ শতকে ভারতবর্ষ ব্রিটদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ধন-সম্পদ কামানো আর অনেক ক্ষেত্রে বিলাসী জীবনযাত্রার জন্য। মেমসাহেবরাও একটু একটু করে স্থানীয়দের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছেন। সবাই না হলে সামান্য কয়েকজন ভারতীয় জীবনযাত্রা নিয়ে অনুসন্ধানও করছেন। এমন সময়েই, অনেক ব্রিট ভারতীয় খাবারের রেসিপি বুক লিখতে শুরু করলেন। কুকবুকগুলো ছিল বৈচিত্র্যময়— খাবারের রেসিপি থেকে শুরু করে ভারতীয় রান্নাঘরের নানা দরকারি তথ্য, আদব-কায়দা, চাকরবাকরদের বৈশিষ্ট্য, তাদের সামলানোর পরামর্শসহ বিবিধ বিষয় এসব বইয়ে ঠাঁই পেয়েছিল। ভারতে যেসব মেমসাহেব বাস করছেন বা ব্রিটেন থেকে যারা ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য এসব গ্রন্থ গাইডবুক হিসেবে কাজ করত। আবার যারা কিছুদিন ভারতে থেকে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে গেছেন, তারা যখন ভারতীয় খাবারের জন্য আফসোস করছিলেন, তখন এসব রেসিপি বই তাদের দারুণ কাজে এসেছিল। বইয়ের লেখকরা তাদের গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কত বছর ভারতে কাজ করেছেন, ভারতের মানুষদের সঙ্গে মিশেছেন, সেসবের উল্লেখ করেছেন। বাড়তি পাওনা হিসেবে এসব বইয়ে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিত্র পাওয়া যায়।

১৮৮৭ সালে ড্যানিয়েল সান্তিয়াগোর কারি কুক’স অ্যাসিস্ট্যান্ট অর কারিজ অ্যান্ড হাউ টু মেক দেম ইন ইংল্যান্ড ইন দেয়ার অরিজিনাল স্টাইল লন্ডনে প্রকাশিত হয়। ড্যানিয়েল ছিলেন একজন বাবুর্চি, যিনি মাদ্রাজ ও শ্রীলংকায় ব্রিটিশদের জন্য রান্না করতেন। তার বাবা শ্রীলংকায় খানসামার কাজ করতেন। তাই বাবুর্চি তথা রেসিপি বইয়ের রচয়িতা হিসেবে ড্যানিয়েলের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার মনিব ছিলেন জন লাউডান শাদ। শ্রীলংকায় জনের প্লান্টেশন ছিল, তিনিই তার বাবুর্চি ড্যানিয়েলের বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। ভূমিকায় জন কারির উপকারিতার কথা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ভারতীয়দের আয়ু বেশি হওয়ার একটি কারণ বোধহয় এই কারি।

‘ভারতীয়রা এত বেশি বছর বাঁচে কেন?’ প্রশ্নটি হরহামেশাই করা হয়।&dquote;&dquote;

অর্থনীতির ছাত্ররা জবাবে বলবেন, কারণ অনেক ভারতীয় বুড়ো বয়সে পেনশন পায়। কিন্তু স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ছাত্ররা বলবেন, কারণ তারা কারি খায়।

আরো একটি বিষয় তিনি জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কারিখাদক জাতিগুলো শক্ত নেশাপানীয় পান করে না। তিনি পাঠকদের উদ্দেশে লেখেন, সান্তিয়াগোর ইংরেজি হয়তো সুস্বাদু নয়, কিন্তু কারি বিষয়ে তার জ্ঞান যথেষ্ট।

১৮৮৮ সালে দ্বিতীয় সংস্করণের জন্য লেখকের ভূমিকায় সান্তিয়াগো জানিয়েছেন, বইটির প্রথম সংস্করণে ৫০০ কপি ছাপা হয়েছিল, যার ৪০০ কপি বিক্রি হয়ে যায় এবং বাকি ১০০ কপি তিনি ইংল্যান্ড ও শ্রীলংকায় তার বন্ধুদের উপহার দেন। এই প্রথম সংস্করণে প্রতি কপি বইয়ের মূল্য ধরা হয়েছিল ৬ পেন্স। সান্তিয়াগো বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের উদ্দেশ্য হিসেবে লিখেছেন, ‘আমার প্রথম বইয়ে আমি খুব অল্প কিছু রেসিপি ও তথ্য দিতে পেরেছি। কিন্তু আমি মনে করি, বইটি আরো বিস্তৃত করার সুযোগ ছিল। তাই এবার পরিমার্জিত সংস্করণটি প্রকাশিত হচ্ছে এবং সেই আগের দামেই। কারি তৈরির জন্য আমার উচিত অনেক রেসিপির বর্ণনা দেয়া। সব মাংস ও সবজির নাম ইংরেজি ও তামিল ভাষায় দেয়া হলো। কারির প্রত্যেকটি রেসিপির সঙ্গে দুই ধরনের উপাদানের নাম দেয়া হয়েছে, যেগুলোর একটি অংশ ইংল্যান্ডে ও অন্য অংশটি শ্রীলংকায় সহজলভ্য।’ এখানে উল্লেখ্য, বাঙালিদের কারি সান্তিয়াগোর তেমন পছন্দ হয়নি। বিষয়টি তিনি এ ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, ‘স্টিমারে ও নদীর পাড়ে বসে আমি বাঙালিদের তৈরি কারি খেয়েছি। কারির সব উপাদানই তারা ঠিকঠাক ব্যবহার করে, কিন্তু তারা অনেক বেশি স্বাদ যুক্ত করতে গিয়ে অনেক ঘি ও খাসির চর্বি ব্যবহার করে, আর এটা করতে গিয়ে তারা কারির স্বাদ নষ্ট করে ফেলে। বোম্বাইয়ের কারিরও একই দশা, শুধু মাদ্রাজই একমাত্র জায়গা, যেখানে আপনি প্রকৃত কারির স্বাদ পাবেন। এছাড়া শ্রীলংকায়ও পাবেন, কারণ মাদ্রাজ থেকে অনেক শেফ এখানে এসেছেন এবং কারি শিল্প শ্রীলংকায় ছড়িয়ে দিয়েছেন।’ এবং ভূমিকার শেষ অংশে আবারো তিনি বাংলা ও বোম্বাইয়ের কারির ওপর মাদ্রাজের কারির শ্রেষ্ঠত্বকে বর্ণনা করেছেন, ‘মাদ্রাজের নারীরা কারি রান্নায় ভারতের অন্য যেকোনো প্রান্তের নারীদের হারিয়ে দিতে পারবেন।... আমার মতে, মাদ্রাজের কারি সবসময়ই শ্রেষ্ঠ এবং বাংলা ও বোম্বাইয়ের কারি থেকে বেশ ভিন্ন।’&dquote;&dquote;

সান্তিয়াগো তার বইয়ে ৬০ প্রকারের রেসিপি দিয়েছেন। সঙ্গে কারি পাউডার তৈরির উপাদানগুলোরও তালিকা দিয়েছেন। এসব উপাদানের জন্য তিনি দুটি আলাদা তালিকা দিয়েছেন। কারণ শ্রীলংকায় সহজলভ্য উপাদান লন্ডনে পাওয়া যেত না আবার উল্টোটাও ছিল। সে সময় নাগাদ অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষভাগে বাণিজ্যিকভাবে কারি পাউডার বিক্রি শুরু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রসিক রাঁধুনিরা মূল উপদানগুলো ব্যবহার করে নিজেরাই পাউডার তৈরি করে নিতেন। যা হোক, সান্তিয়াগোর বইয়ে উল্লেখ্য কয়েকটি রেসিপির নাম উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না নিশ্চয়—

১. ঘরে তৈরি কারি পাউডার, ২. বিফ কারি (সাধারণ), ৩. বিফ কারি (সিংহলি), ৪. বিফ কারি (মাদ্রাজি), ৫. বিফ কারি (শকুনা), ৬. বিফ কারি (বল), ৭. কবুতর কারি, ৮. মুরগি কারি, ৯. ডিম কারি, ১০. শূকর কারি, ১১. পেঁয়াজ কারি, ১২. মাছের কারি, ১৩. আলুর কারি প্রভৃতি। বইয়ের শেষ দিকে কারি খাওয়ার জন্য কীভাবে ভাত রান্না করতে হবে, সে উপায়ও বলেছেন লেখক। বইয়ের একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় অংশ রয়েছে সবার শেষে। এ অংশে বইয়ে বর্ণিত বিভিন্ন খাদ্যোপাদানের ইংরেজি নামগুলোর পাশাপাশি সেগুলোর তামিল নামটি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৮৮৬ সালে হেনরি ইয়ুল ও এসি বার্নেল প্রকাশ করেন তাদের বিখ্যাত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অভিধান। এ ডিকশনারিতে তারা কারিকে “savoury dish made up of ‘meat, fish, fruit or vegetables cooked with a quantity of bruised spices and turmeric’ served to flavour the two staple foods of the east – bread and rice, both of which are bland dishes” সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়।

আশির দশকেই প্রকাশিত হয়েছিল কর্নেল কেনি-হার্বার্টের বই ফিফটি ব্রেকফাস্টস, সুইট ডিশেস ও কিউলিনারি জটিংস ফর মাদ্রাজ। শেষোক্ত বইটি প্রকাশিত হয়েছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার লেখা রচনার সংকলন হিসেবে। এই কর্নেল লন্ডনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কমন-সেন্স কুকারি অ্যাসোসিয়েশন, উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমাদের ‘উচ্চমানের রান্না’ শেখানো। কেনি-হার্বার্ট পত্রিকায় তার অনেক লেখায় তরুণীদের ওপর বেশ ক্ষোভ ঝেড়েছেন। কারণ ছিল, তরুণীরা একদিকে পত্রিকায় কলাম লিখতে চাইতেন, অন্যদিকে তার কাছে এসে কারি তৈরির ব্যাপারে টিপস চাইতেন। এই তরুণীরা নিশ্চিত ও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, কয়েকটি ক্লাসই তাদের কারি তৈরিতে দক্ষ করে তুলবে। অথচ কর্নেল সাহেব জানতেন, এ বিদ্যা আয়ত্ত করতে কয়েক মাস এমনকি এক বছরও লাগে। কিউলিনারি জটিংস ফর মাদ্রাজ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৮ সালে। বইটি বেশ বিক্রি হয়েছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় যখন আমরা দেখি, ১৮৮৫ সালে বইটির পঞ্চম সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। বইয়ে রান্না ও খাবারের আদবকেতা নিয়ে অনেক ছোট ছোট নিবন্ধ রয়েছে। এসব রচনার মধ্যে আছে— পাচক ও তাদের ব্যবস্থাপনা, স্টোর রুম ব্যবস্থাপনা, রান্নাঘরের বিভিন্ন প্রয়োজন, সালাদ, সবজি ইত্যাদি।

জর্জ ফ্রাংকলিন অ্যাটকিনসনের কারি অ্যান্ড রাইস প্রকাশিত হয় ১৮৫৮ সালে। বইয়ের অসাধারণ লিথোগ্রাফগুলোয় ভারতের ছোট ছোট শহর ও হিল স্টেশনগুলোয় সাহেব ও স্থানীয় জীবনযাত্রার মধ্যে আদান-প্রদানের চিত্র পাওয়া যায়।&dquote;&dquote;

আয়া ও লস্করদের সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক ভারতের আরেকদল পেশাজীবী আন্তর্জাতিক পরিসরে ভ্রমণ করছিলেন, তারা হলেন রাঁধুনি বা বাবুর্চি। অবশ্য এ পেশাজীবীদের ভ্রমণ কখনো দালিলিক হয়নি, কোনো ইতিহাসেও তাদের কথা সেভাবে লেখা হয়নি। সান্তিয়াগো তার বইটি লেখার অন্তত দুই দশক আগে হাজি আলী তার কাবাবের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৫১ সালে লেখক উইলিয়াম ময় টমাস তার একটি গল্প দি এলিক্সির অব লাইফে হাজি আলীর কথা উল্লেখ করেছিলেন, যে একটি বাঙালি হোটেলে কাজ করার জন্য ইংল্যান্ডে হাজির হয়েছিল। গল্পে টমাস এক বক্তার মুখ দিয়ে বলাচ্ছিলেন, আলী তার ভারতীয় দোপিঁয়াজা, কোরমা, জর্দা, পোলাও, ভারতীয় কোপ্তা, খিচুড়ি ও ভারতীয় কাবাব’-এর জন্য বিখ্যাত।

বাস্তবের হাজি আলী লন্ডনে গিয়ে এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করেছিলেন, সেটা ১৮৪৬ সাল মানে সিপাহী বিদ্রোহ হতে তখনো ১১ বছর বাকি। ১৮৩০-এর দশকেই হাজি আলী রেসিপ্টস ফর কুকিং দ্য মোস্ট ফেভারিট ডিশেস ইন জেনারেল ইউজ ইন ইন্ডিয়া প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তী বইগুলোয় এ বইয়ের কিছু অংশেরই পুনর্মুদ্রণ লক্ষ করা যায়।

এসব গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি কিছু ভারতীয় রেসিপি বই ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছিল। ১৮৩১ সালে একজন ভাষাতাত্ত্বিক ও কলকাতাভিত্তিক কাজ করা প্রাচ্যবিদ লন্ডন ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটের জন্য একটি ফার্সি রেসিপি বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ইন্ডিয়ান কুকারি, অ্যাজ প্র্যাকটিসড অ্যান্ড ডেসক্রাইবড বাই দ্য নেটিভস অব দি ইস্ট। এটিই সম্ভবত ইংরেজি ভাষায় প্রথম কোনো ভারতীয় রান্নার বই।

রান্নার রেসিপি-সংক্রান্ত বইপত্র ছাড়া আরেক ধরনের রান্নাসংক্রান্ত বই দেখা দিয়েছিল। এ বইগুলো ছিল পরামর্শসংক্রান্ত। শুরুর দিকে এসব বই পুরুষরা লিখলেও পরবর্তীতে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নারীরা এগিয়ে আসেন। এ নারীরা অবশ্য অনেকে নাম উল্লেখ না করে লিখেছেন। এসব বই রচিত হয়েছিল যেসব নারী ইংল্যান্ড থেকে স্ত্রী হিসেবে ভারতে যাচ্ছেন সংসার পাততে তাদের উদ্দেশে। কীভাবে ঘর গোছাতে হবে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পোশাক কী হবে, প্রতিদিনের নিত্যজীবনের বিভিন্ন রীতি, গার্হস্থ্য জীবনের আরো নানা বিষয় নিয়ে থাকত এ বইয়ের সিলেবাস।

পুরুষ লেখকদের পর মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল নারী লেখকদের। হেনরিয়েটা হার্ভি লিখলেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কুকারি অ্যাট হোম। তিনি উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেসিপি সংগ্রহ করে সেগুলোকে অ্যাংলো চেহারা দিয়েছিলেন। তিনি ব্রিটেনে ফিরে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে ডেকচি ও রান্নার অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়েছিলেন। কারি পাউডার তৈরির জন্য যে হামানদিস্তা ভারতে ব্যবহার করা হতো, সেটাও তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বইটি বহু বছর ধরে ক্ল্যাসিক হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৫ সালে। বইয়ের নামপত্রে উল্লেখ ছিল, লেখিকা ভারতে কর্মরত একজন কর্মকর্তার স্ত্রী। অর্থাৎ বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে লেখিকা যে ভারতীয় জীবনধারার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচিত, সেটা শুরুতেই উল্লেখ করে দেয়া হয়। হেনরিয়েটা হার্ভি ভূমিকায় লিখলেন, ভারতীয় রান্নার রেসিপি নিয়ে এরই মধ্যে অনেক বই প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি নতুন করে আরেকটি বই লিখছেন কারণ এটি হয়তো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারগুলোর কাজে আসবে। তিনি লিখেছেন, ‘এই বইয়ে আমি ভারতে আমার বিবাহিত জীবনের ২৩ বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চেয়েছি। আমার মনে হয় যারা ভারত থেকে ইংল্যান্ডে চলে গেছেন এবং পুরনো স্মৃতি যাদের আর্দ্র করে, এ বই তাদের কাজে লাগবে। আমি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকেছি, তাই আমার রেসিপিগুলো যে যেখানেই থেকেছেন না কেন— পেশোয়ার থেকে কেপ কোমোরিন, করাচি থেকে কলকাতা— তাদের সবারই কাজে লাগবে। বইয়ের শুরুতে লেখিকা বিভিন্ন ধরনের স্যুপ তৈরির পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যেমন— মুক টার্টল স্যুপ, মুলিগাতাবানি স্যুপ, পি-ফোল মুলিগাতাবানি স্যুপ, ঢোল অর ইসপ্লিট পি স্যুপ, ডাল অর রেড পালস পেপার ওয়াটার স্যুপ। আছে মাছ রান্নার বিবরণ। এরপর আছে কারি নামক আকর্ষণীয় এক অধ্যায়— চিকেন কারি, ফ্রেশ মাটন কারি, কোল্ড মিট কারি, বল কারি, মালয় কারি, কুর্মা কারি, ফিশ কারি, চিংড়ি কারি, কাঁকড়া কারি, ডিম কারি, টমেটো কারি। এ রকম আরো অনেক কারি।&dquote;&dquote;

১৮৯৩ সালে প্রকাশ হয়েছিল মিসেস গ্রেস জনসনের অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল কুকারি। এ বইয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ইংলিশ, ফরাসি ও ইতালীয় রন্ধন পদ্ধতি দ্বারা রূপান্তরিত রান্না।’

পরামর্শধর্মী একটি উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে দ্য ওয়াইফ’স হেল্প টু ইন্ডিয়ান কুকারি: বিয়িং আ প্রাকটিক্যাল ম্যানুয়াল ফর হাউজকিপারস। লেখকের নাম ডব্লিউ এইচ ডওয়ে, লন্ডন থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮৮ সালে। তিনি ছিলেন এলাহাবাদে ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা। এই বইয়ে লেখক এমন সব বিষয় আলোচনা করেছেন, যা থেকে কোনো ইংরেজ মেমসাহেব ভারতে বসবাস করার জন্য দরকারি নির্দেশনা পেতেন। বইয়ের ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, ‘এ বইয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে একটি গাইডবই হিসেবে। বইটিতে এমনভাবে তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যেন যে কেউ ভারতীয় রন্ধন ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভালোভাবে বুঝতে পারেন। পুরুষের সুখের মূলে রয়েছেন নারীরা, তাই এ বই সব নারীর হাতে থাকা উচিত। যেকোনো শিক্ষিত মানুষ এ বইয়ের পাতায় পাতায় অনেক দরকারি বিষয় খুঁজে পাবেন।’ ডব্লিউ এইচ ডওয়ে ছিলেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। এ কারণে তিনি ভারতীয় জীবনযাত্রা সম্পর্কে যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বইটি লিখেছেন, সেটি উল্লেখ করতে ভোলেননি। ‘গ্রন্থকার একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, তাই তিনি স্থানীয় জীবনের সঙ্গে মেশার ভালো সুযোগ পেয়েছেন। লেখক কয়েকটি অ্যাংলো পরিবারের কাছে ঋণী কারণ তাদের মাধ্যমেই তিনি বেশকিছু দুর্লভ রান্নার রেসিপি পেয়েছেন, যেগুলো এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।... এই বইয়ে যেসব তথ্য যুক্ত করা হয়েছে, সেগুলোর কারণে এটা একটা রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহূত হতে পারবে আর কাউকে উপহার দেয়ার জন্যও এটি মহামূল্যবান।’ বইটি শুধু যে ভারতে বসবাসরত ব্রিটিশদের রান্নাঘরের কথা বিবেচনা করেই লিখেছেন তা নয়, বরং ভারত থেকে ইংল্যান্ডে ফিরে যদি কোনো ইংরেজ ভারতীয় খাবারের অভাব বোধ করতে থাকেন, সেক্ষেত্রে তারও কাজে আসবে এ বই। বইটি আক্ষরিক অর্থেই একটি রেফারেন্স বই ছিল। রান্নার রেসিপিতে যাওয়ার আগে বইয়ে যুক্ত কিছু দরকারি তথ্যের তালিকাটা একবার দেখা যেতে পারে। বইয়ের শুরুতেই লেখক ইংলিশ পাউন্ডের সঙ্গে ভারতীয় রুপির বিনিময় হারের তালিকা দিয়েছেন। বইয়ের শুরুর দিকের একটি অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়— ‘কীভাবে পানি বিশুদ্ধ করতে হবে’। লেখক সেই পদ্ধতির বর্ণনা করেছেন। পদ্ধতিটি হচ্ছে কয়লা ও বালুর মধ্যে দিয়ে পানি প্রবাহিত করে পানিকে বিশুদ্ধ করা। তৃতীয় অধ্যায়টি ভারতের চাকরদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে। লেখক শুরু করেছেন এভাবে— ‘ভারতে ইংরেজদের অভিযোগের অন্যতম বিষয় হচ্ছে ভারতীয় চাকরদের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি। ভারতে নতুন আসা কিংবা বহুদিন ধরে বাস করা উভয় সম্প্রদায়ই এ সমস্যা দিয়ে আক্রান্ত। ভারতীয় চাকরদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সর্বজনীন— অলসতা, অসততা, এ রকম আরো অনেক দোষ মনে হয়ে তাদের জন্মগত।’ তবে লেখক চাকরদের পাশাপাশি ইংরেজ সাহেব-মেমদের দোষের কথাও বলেছেন। মাসের শুরুতেই চাকরদের বেতন দিয়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আরো বলেছেন সন্তানদের এই চাকরদের সঙ্গে খুব বেশি না মিশতে দিতে। শেষোক্ত পরামর্শটি অবশ্য নানা পেশার ইংরেজদের লেখনীতেই পাওয়া যায়। ভারতীয় খাবারের রেসিপির সঙ্গে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত অনেক পরামর্শ আছে বইতে। ভারতীয় ওজন পদ্ধতির সঙ্গে ইংলিশ পদ্ধতির তুলনামূলক একটি তালিকা রয়েছে, যা নিশ্চয়ই পাঠকদের জন্য খুব কাজের ছিল। আরো আছে বিভিন্ন ধরনের চাকরদের বেতন তালিকা। এ তালিকায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন বাবুর্চিরা— ৮ থেকে ১০ রুপি। আর তালিকার সবচেয়ে নিচে আছেন মেথর, ধোপা ও পাখা টানা কুলিরা— বেতন কাজের পরিমাণ অনুযায়ী ৩ থেকে ৭ রুপি। বইটির রেসিপি অংশটি বিস্ময় জাগায়। বিভিন্ন ধরনের রান্নার রেসিপি, খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের দরকারি পরামর্শ মিলে রেসিপি অংশে ভুক্তি আছে ৯০৮টি।&dquote;&dquote;

এসব বই অনুসারে ভারতীয় চাকররা শিশুর মতো কিন্তু তারাই আবার ধূর্ত, ধড়িবাজ হয়ে উঠতে পারে। এ চাকররা ঔপনিবেশিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তা সত্ত্বেও তাদের সতর্কতার সঙ্গে নজরদারি করতে হবে এবং সে কাজে এ বইগুলো মেমসাহেবদের কাজে আসবে। যেহেতু রান্নাঘর স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত, তাই বাবুর্চিদের ওপর কঠোর নজরদারি করতে হবে। এ বিষয়ে প্রথম বইটি লিখেছিলেন আর ফ্লাওয়ার রিডেল। তিনি ছিলেন ১৮৪০-এর দশকে হায়দরাবাদে নিজামের দরবারে কাজ করা একজন সার্জন জেনারেল। তার বই ইন্ডিয়ান ডমেস্টিক ইকোনমি অ্যান্ড রেসিপ্ট বুক প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪৯ সালে। আর এ বইয়ের প্রথম অধ্যায়টিই চাকরদের বিষয়ে। রিডেল ভারতীয় চাকরদের ব্যাপারে শক্ত ছিলেন। তিনি তাদের অসৎ প্রকৃতির ব্যাপারে পাঠককে সতর্ক করেছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন, যেন চাকর নিযুক্ত করার আগে তাদের থানায় নিয়ে পরিচয় লিপিবদ্ধ করিয়ে নেয়া হয়। তিনি ঔপনিবেশিক ভারতে গৃহস্থ কাজে জড়িত বিভিন্ন শ্রেণীর বিবরণ ও তাদের বেতনের পরিমাণ উল্লেখ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ: বাংলায় ছিল সরকার বা হিসাবরক্ষক, খানসামা বা পরিচারক, খিদমতগার বা টেবিল চাকর, বাবুর্চি, ধোপা, হরকরা, মেথর, দর্জি, দারোয়ান, গাড়োয়ান, আয়াসহ আরো অনেক ধরনের চাকরবাকর। ‘ভিন্ন ভিন্ন প্রেসিডেন্সিতে চাকরদের জাত ভিন্ন— বোম্বাইতে দেখা যায় পর্তুগিজ, পার্সি, মুসলিম, হিন্দু; মাদ্রাজে পার্সিদের জায়গা নিয়ে নিয়েছে স্থানীয় খ্রিস্টানরা আর কলকাতায় ভারতের সব জাতের মিশ্রণ দেখা যাবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ ইংরেজি বলতে পারে, কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে সবাই কমবেশি একই রকম।’

মুরগি ও ঘোড়ার বিস্তারিত যত্ন-আত্তির বিষয়ও আছে এ বইয়ে। এরপর আছে বিভিন্ন খাবার তৈরির রেসিপি, যেমন— স্যুপ, সস, মাছ, পুডিং ও অতি অবশ্যই কারি। বইয়ের ৪০২-৩ পাতায় আছে চার ধরনের কারি পাউডার তৈরির বিবরণ। চা-কফি তৈরির বিবরণ আছে, আরো আছে বরফ দিয়ে কিংবা বরফ ছাড়া কীভাবে খাবার ঠাণ্ডায় সংরক্ষণ করা যায়, সে পদ্ধতির বর্ণনা।

লেখকরা তাদের বইয়ের টাইটেল পাতাতেই তারা কত বছর ভারতে থেকেছেন, সে কথা উল্লেখ করতেন, যা ছিল তাদের বইয়ের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির একটি কৌশল। এতে লেখক হিসেবেও বিষয়সংশ্লিষ্টতায় তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। যেমন দি ইন্ডিয়ান কুকারি বুক: আ প্র্যাকটিক্যাল হ্যান্ডবুক টু দ্য কিচেন ইন ইন্ডিয়া (১৮৬৯) বইয়ে উল্লেখ করা ছিল যে, লেখক ৩৫ বছর ভারতে কাটিয়েছেন। বইটিতে অনেক ভারতীয় খাবারের রেসিপির বিবরণ পাওয়া যায়। বইটিতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ভারতীয় আচার তৈরির পদ্ধতি। এছাড়া জ্যাম, জেলি, পুডিং, চাটনি তৈরির বিবরণও আছে। এই বইয়ের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অধ্যায়টি হচ্ছে ‘মেডিসিনাল অ্যান্ড আদার রেসিপিজ’। এ অধ্যায়ে লেখক বিভিন্ন ধরনের রোগ ও শারীরিক সমস্যায় বিভিন্ন খাবার ও ভেষজ চিকিৎসার বিবরণ দিয়েছেন। যেমন— মৌমাছি কামড়ালে কী করতে হবে, জ্বর বা ঠাণ্ডা লাগলে কী খেতে হবে ইত্যাদি।&dquote;&dquote;

 আবার ১৯০২ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ের শিরোনামই ছিল এমন— হাউজহোল্ড কুকারি: টেস্টেড রেসিপিস কালেক্টেড ডিউরিং ২৩ ইয়ারস’ রেসিডেন্স ইন ইন্ডিয়া। লেখকদের অনেকে বহু বছর ভারতে কাটিয়ে ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে এসব বই লিখেছিলেন।

 ১৯০৩ সালে জোসেফ এডমন্ড লিখলেন, কারিজ: অ্যান্ড হাউ টু প্রিপেয়ার দেম। তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে কারি পাউডার তৈরি করে বিক্রি করতেন। আবার তার রেসিপিগুলোকে রান্নার শিক্ষক ও বিশিষ্ট রন্ধনশিল্পীদের দিয়ে স্বীকৃত করে নিয়েছিলেন।

১৭৭০-এর দশকে ব্রিটেনের কিছু কিছু কফি হাউজে কারি পাওয়া যেতে শুরু করে। ১৮১০ সালে চালু হয় শেখ দ্বীন মোহাম্মদের হিন্দুস্তানি কফি হাউজ (অবশ্য এক বছরের মাথায় এটি বন্ধ হয়ে যায়)। ১৮ শতকের শেষ দিকেই ইংল্যান্ডে কারি পাউডার ও চাটনি, সস, আচার বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অভিজ্ঞ রাঁধুনিরা নিজেরাই নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো কারি পাউডার তৈরি শুরু করলেন।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রধান শেফ (১৮৮০ থেকে ১৯১০-এর দশক) গ্যাব্রিয়েল শুমি তার এক বইয়ে লিখেছেন, প্রাসাদের বাবুর্চিরা কারি পাউডারকে তাচ্ছিল্য করতেন।

অন্যদিকে ব্রিটেনে তখন কারি পাউডারের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত উপকারিতা নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করতেন, কারি হচ্ছে সুস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। হার্ভি ডে তার কারিজ অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে মানবশরীরের জন্য কারির উপকারী ভূমিকার বিবরণ দিলেন, ‘প্রায় সব মসলারই অ্যান্টিসেপটিক গুণাগুণ আছে। অনেকগুলো পেট ফাঁপার সমস্যা দূর করে। মরিচ গোত্রটি ভিটামিন সি দ্বারা পূর্ণ, এ ভিটামিন ত্বকের জন্য উপকারী। সম্ভবত এ কারণেই অনেক ভারতীয় নারীর ত্বক অতি ফর্সা, সুন্দর।’ আদার ঔষধি গুণ প্রাচীন ভারত ও চীনে পরিচিত ছিল। পাশাপাশি রাজা অষ্টম হেনরিও (১৪৯১-১৫৪৭) আদার গুণমুগ্ধ ছিলেন।

 

তথ্যসূত্র :

কারি কুক’স অ্যাসিস্ট্যান্ট অর কারিজ অ্যান্ড হাউ টু মেক দেম ইন ইংল্যান্ড ইন দেয়ার অরিজিনাল স্টাইল

দ ইন্ডিয়ান কুকারি বুক: আ প্র্যাকটিক্যাল হ্যান্ডবুক টু দ্য কিচেন ইন ইন্ডিয়া

কিউলিনারি জটিংস ফর মাদ্রাজ

কারি অ্যান্ড রাইস

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কুকারি অ্যাট হোম

হাউজহোল্ড কুকারি: টেস্টেড রেসিপিস কালেক্টেড ডিউরিং ২৩ ইয়ারস’ রেসিডেন্স ইন ইন্ডিয়া

দি ইন্ডিয়ান কুকারি বুক: আ প্র্যাকটিক্যাল হ্যান্ডবুক টু দ্য কিচেন ইন ইন্ডিয়া

দ্য ওয়াইফ’স হেল্প টু ইন্ডিয়ান কুকারি : বিয়িং আ প্র্যাকটিকাল ম্যানুয়াল ফর হাউজকিপারস

ইন্ডিয়ান ডমেস্টিক ইকোনমি অ্যান্ড রেসিপ্ট বুক