আজকাল ইফতিয়াক সাহেবের অবসর বিকেল কাটে মানুষ দেখে দেখে। চেনা, অচেনা মানুষগুলোর চলন-বলন, ভাব প্রকাশ, আবেগ, উচ্ছ্বাস তাকে চুম্বকের মতো টানে। প্রায় বছরখানেক হতে চলল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সারা দিন কোনো নেই কাজ, তো খই ভাজ! বর্তমানে এটি তার প্রতিদিনের সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি। শুধু কাজ বললে বোধহয় ভুল হবে, এসব এখন প্রায় অভ্যাসের পর্যায়ে চলে গেছে। বাড়ির দোতলায় তার শোয়ার ঘরের সাথে যে লম্বা ঝুল বারান্দা আছে, ওখানেই এক মগ কফি হাতে রোজ বিকেলে বসে পড়েন তিনি। রাস্তার মানুষ দেখেন। তার বারান্দাটি কিন্তু রাস্তার মুখোমুখি নয়। মুখোমুখি এ বারান্দার একটি বড়সড় বাগান। তার স্ত্রীর হাতে গড়া। আর উত্তরের দিকে রাস্তা। প্রতিদিনই বসেন এখানে। রাস্তার কত শত দৃশ্য এখন তার মুখস্থ। প্রায় নিত্যদিনই কিছু কিছু দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ইফতিয়াক সাহেব এক ধরনের একঘেয়ে আশ্চর্যবোধ নিয়ে রোজ এসব দেখেন। এখানে বসার পর থেকে একটি মজার ব্যাপার তিনি প্রায়ই লক্ষ করছেন। তিনি যখনই এখানে এসে বসেন, একটি কালো দাঁড়কাক কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জাফরি ঘেঁষা জামরুল গাছটায় বসে। ধ্যানী মুনির মতো একদম চুপচাপ বসে থাকে সেই কাক। মুখোমুখি নয়, ইফতিয়াক সাহেবের পাশাপাশি বসে থাকে। মনে হবে এ পাখিটিও যেন ইফতিয়াক সাহেবের সাথে মানুষ দেখতে ব্যস্ত। মানুষের এত আনাগোনা, এত চলাচল, কত আবেগের উচ্ছ্বাস— সব যেন একেও টানে ইফতিয়াক সাহেবের মতন। কাক আর ইফতিয়াক সাহেব যেন প্রৌঢ় বয়সের পরম বন্ধু দুজনার। তাদের চিন্তাধারা, মানসিকতা সবটাই মনে হয় একই ধারায় প্রবাহিত। তাদের এই মৌন বৈঠক যেন পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালোবাসা আর ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ। তারপর ধীরে ধীরে আনত রাঙা সন্ধ্যা অন্ধকার হয়ে গেলে কোথায় যে কাকটি হারিয়ে যায়! হারিয়ে যায় না হয়তো। ঘরেই ফিরে শেষমেশ। যেখানে কাকটির শিকড়ের সবটুকু গেঁথে আছে। ইফতিয়াক সাহেবেরও আজকাল এমন একটা ঘরে ফিরতে খুব ইচ্ছে করে। যে ঘরটায় নিজের সবটুকু থাকবে। কোথাও কোনো ফাঁক নেই, কোনো একলা কোণ নেই।

ইফতিয়াক সাহেব কফিতে চুমুক দেন। এমন সময় রাস্তায় দুজন তরুণ-তরুণীকে দেখা যায়। তারা প্রায় রোজ বিকেলেই একসঙ্গে হাঁটে। হাত ধরে কিংবা ধাক্কাধাক্কি করে নয়। হাতখানেক জায়গা রেখে গভীর উচ্ছ্বাস ও আনন্দ মুখে মেখে ছোট্ট নদীর মতো টলটল করে বয়ে চলে তাদের হাঁটাপথ। ছেলেমেয়ে দুটোকে চিনতে ভুল হয় না তার। ওদের এই স্নিগ্ধ আবেগী ভ্রমণবীথি তার ভেতরের কোথায় যেন আন্দোলনের জোয়ার এনে দেয়। দেখতে দেখতে নিজের পুরনো কত কথা মনে পড়ে যায়।

পোড়া মাটির রঙে রাঙানো সুন্দর দুটো চোখ নিয়েও সম্পর্কটা আর রাখতে পারেননি ইফতিয়াক সাহেব। একঝাঁক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চলে গেল শমিরীতা। মানুষটার স্মৃতি বলতে এখন শুধু এ বাগান। বন্ধুত্ব, প্রেম, বিয়ে সবকিছু পেছনে ফেলে তাকে একলা করে চলে গেল শমিরীতা। হেসে ফেলেন ইফতিয়াক সাহেব। শমিরীতাকে তো তিনি নিজেই একলা করে ফেলেছিলেন তারও অনেক দিন আগে। নইলে কতটা অভিমান জমলে একটা মানুষ এত দিনের পুরনো সম্পর্ক, এত প্রেম দুই হাতে গুটিয়ে নিয়ে চলে যেতে পারে!

দাঁড়কাকটা পাখা ঝাপটায়। আজকাল গরম পড়েছে খুব। কাকটাও বোধহয় এর ভুক্তভোগী। এমনই এক বিকেলের কথা মনে পড়ে ইফতিয়াক সাহেবের। বাগানে শমিরীতার সঙ্গে বসেছিলেন তিনি। কথার জাদু জানত বটে মেয়েটা। এত সুন্দর করে কথা বলত!

আধা ঝরা গোলাপগুলোর দিকে করুণ দৃষ্টি দিয়ে শমিরীতা একদিন আক্ষেপ করছিলেন, বসন্ত এখন ভীষণ আটপৌরে হয়ে গেছে।

আর বসন্ত! কেতাদুরস্ত গ্রীষ্মের দাবদাহ চলছে।

স্ত্রীর সঙ্গে কথার তাল মেলাতে গিয়ে খানিকটা খাবি খেতে হয় ইফতিয়াক সাহেবকে। খানিকটা সময় নিয়ে উত্তর দেন। বাইরে কিন্তু সেটা ভুলেও প্রকাশ করেন না।

শমিরীতা সায় দিয়ে বলেন, সে আর বলতে!

সেটাই তো।

আকাশে গুমোট মেঘ জমতে শুরু করেছিল। অথচ বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। তাই দেখে শমিরীতা বিরক্ত হন, প্রচণ্ড গরম! মেঘ অভিমানে জমে আছে সব। ঝরার ইচ্ছেটিচ্ছে নেই মনে হয়।

ইফতিয়াক সাহেব আড় চোখে স্ত্রীকে দেখেন। কথার কাব্যে মুগ্ধ হন। কিন্তু বাইরে মজা করে বলেন, মেঘের কি ঠ্যাকা পড়েছে যে অন্যের জান জুড়োতে আসবে!

ঠ্যাকা তো কারোই নেই। শুধু শুধু হা-হুতাশ। কি রকম আগুনের মতো স্তব্ধ চারদিক। মেঘের যদি দয়া হয়, তো ভাঙল নাহয় খানিক অভিমান। খুব কি ক্ষতি তাতে?

হা-হুতাশ করার কী দরকার। অপেক্ষায় থাকাটা সবসময়ই পীড়াদায়ক। ঝরলে ঝরুক না হলে নাই। এত অপেক্ষার কি প্রয়োজন?

অপেক্ষা ছাড়া তো কিছুই সম্বল নেই। পীড়াটা তবু গায়ে পড়ে বেছে নেয়া, যদি একটু পাওয়া যায়।

কী?

ভেজা ঘাস। সবুজ নিঃশ্বাস। সামান্যই।

শমিরীতার গলাটা ক্লান্ত শোনায়।

ফলাফল জানা সত্ত্বেও অপেক্ষায় থাকাটা নিরর্থক বোকামি। অতএব বাদ দেয়াই উত্তম।

হিসাবের ফলাফলটাই কি সব? অকৃত্রিম অনুভব আর বিশ্বাসেরও তো একটা দাম আছে।

শমিরীতার কণ্ঠের আকুলতায় চমকে উঠেছিলেন ইফতিয়াক সাহেব। স্ত্রীর হাতে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেন, তোর কী হয়েছে শমু?

শমিরীতা মৃদু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টা, ‘ধুর! কিছু না।’

খানিক বাদে ঝট করে হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ওই আমি এখন তোর বউ না! খবরদার আর তুই তোকারি করবি না।’

ইফতিয়াক সাহেব চোখ নাচিয়ে বলেন, ‘বউ বুঝি আমাকে বড় আপনি আপনি করে ডাকেন!’

দুজনেই খুব হেসেছিল সেদিন।

সেসব কত বছর আগের কথা! বিয়ের বছরখানেকও বুঝি পেরোয়নি তখন। অথচ মনে হয় ঘাড় ফেরালেই যেন চোখের সামনে দেখতে পারবেন।

ইফতিয়াক সাহেব অবাক হয়ে ভাবেন, ৪৭ বছরের শমিরীতা এখনো মেয়েই আছে তাহলে আমার কাছে!

রাস্তায় চোখ পড়তেই চমকে ওঠেন তিনি। এক বাবা তার মেয়েকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া বাচ্চা একটি মেয়ে। মেয়েটির হাতে আইসক্রিম। খুব আগ্রহ নিয়ে সে খাচ্ছে আর বাবা একটু পর পর মেয়ের মুখ মুছে দিচ্ছেন। সঙ্গে উদ্বিগ্ন মুখে কি যেন বুঝিয়ে বলছেন মেয়েকে। মেয়েটা ঝুঁটি দুলিয়ে দুলিয়ে কোনো রকমে বাবার কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আর তাদের দেখা যায় না। দেয়ালের ওপাশের অজানায় মিলিয়ে যায় তারা।

দৃশ্যটিতে চমকে ওঠার মতো আসলে কিছু নেই। বস্তুত তিনি চমকে উঠেছেন অন্য একটি কথা মনে পড়ায়। আজ তার ছেলের জন্মদিন। সকালেই ছেলের জন্য বড় সাইজের এক বাক্স আইসক্রিম এনে রেখেছিলেন। আইসক্রিম সাঈমের খুব প্রিয়। অথচ ছেলেকে আইসক্রিম দেয়া তো দূরের কথা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতেই ভুলে গেছেন।

কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে পড়লেন তাড়াতাড়ি।

সাঈম তখন আপন মনে বাগানে পায়চারী করায় রত। ওর হাতেও মগভর্তি কফি। বাবাকে দেখে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার পথ দর্শন শেষ হলো?’

‘হ্যাঁ। কী করিস তুই?’

‘এই তো হাঁটি। বাগানে এতসব সবুজের মাঝে হেঁটে হেঁটে কফি খাওয়ার মজাটাই অন্য রকম। তোমাকেও দিই এক কাপ? কফি খাবে আর আমার সঙ্গে হাঁটবে। দেখবে কত সতেজ লাগে।’

এইমাত্র শেষ করলাম এক কাপ। আপাতত আর কফির দরকার নেই। তবে তোর সঙ্গে হাঁটাহাঁটি করা থেকে বঞ্চিত হতে চাচ্ছি না। আমি বরং খালি হাতেই তোর সঙ্গে পা চালাই।

‘আচ্ছা। এসো।’

ছেলেকে পূর্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন ইফতিয়াক সাহেব। দুই বছর হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কেমন করে এত বড় হয়ে গেল ছেলেটা ? হদিসই পেলেন না তিনি।

সাঈম কাছে ঘেঁষে জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু বলবে বাবা?’

ছেলের কাঁধে হাত রেখে শুভেচ্ছা জানান তিনি, ‘শুভ জন্মদিন সোনা!’

‘তুমি ভুলে গিয়েছিলে।’

আমি তোর জন্য আইসক্রিম এনে রেখেছি।

‘কখন? দেখলাম না তো।’

সেই সকালে।

‘এখন সময় হলো দেয়ার?’

বুড়ো হয়ে গেছি তো। কিছু আর মনে থাকে না আজকাল।

সাঈম বাবার কথায় হাসে, ‘তুমি মোটেও বুড়ো হওনি বাবা। মধ্যবয়সে কেউ বুড়ো হয় না।’

ইফতিয়াক সাহেব বলেন, আচ্ছা। সে না হয় মানলাম কিন্তু তুই তো একটা জোয়ান ছেলে। আজকে তোর জন্মদিন। তুই বাসায় বসে বসে কী করছিস? বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ঘুরবি, মজা করবি।

‘বাসায় বসে বসেও মজা করা যায়।’

ধুর! কিসব বুড়ো মানুষের মতো কথা বলছিস। বাইরে থেকে বেরিয়ে আয়। ভালো লাগবে। এমনি দিন তো টো টো করে বেড়াস।

বাবার দিকে কোমল দৃষ্টি দিয়ে সাঈম বলে, ‘সবসময় একা একা বেরোতে ভালো লাগে না।’

ইফতিয়াক সাহেব ছেলের জন্য বেদনা বোধ করেন। মুখে অবাক হওয়ার ভান করে বলেন, কি বলিস! এই বয়সেও একা? তোর মতো বয়সে আমি চুটিয়ে প্রেম করে বেড়িয়েছি জানিস। সে প্রায় ২৫ বছর আগের কথা।

বাবার উচ্ছলতা দেখতে ভালো লাগে সাঈমের। বাবাকে এত ভালো মেজাজে খুব কমই পাওয়া যায়। সন্ধ্যাটা বৃথা যেতে দিতে ইচ্ছে করে না ওর।

‘ঘুরতে যাবে বাবা? অনেক দিন বের হও না তুমি।’

আমি? ধুর! এই বুড়োকে নিয়ে ঘুরে মজা পাবি না তুই।

‘চলো না বাবা। এত সুন্দর একটা সন্ধ্যা। বৃথা যেতে দেয়া কি উচিত?’

ছেলের আবদার ফেলতে পারেন না ইফতিয়াক সাহেব। সামান্য ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগতে ভুগতে শমিরীতা যেদিন মারা যান, সেদিন থেকে ছেলেটা তার কাছে। নিজের বলতে একটি বোন আর এই ছেলেটাই এখন অবশেষ তার।

রিকশার ফুরফুরে হাওয়ায় বেশ চনমনে লাগে ইফতিয়াক সাহেবের।

সন্ধ্যার সৌন্দর্য প্রেয়সীর আঁচলে বুঝলি। রিকশায় যেতে যেতে বাতাসে তার আঁচল উড়ে এসে লাগবে মুখে। সঙ্গে নাকে আসবে প্রেয়সীর গায়ের হালকা মদির সৌরভ। এর চেয়ে সুন্দর সন্ধ্যা আর কি হতে পারে!

সাঈম চোখ নাচিয়ে বলে, ‘কারো প্রেমেটেমে পড়েছ নাকি? ফুপিকে তো তাহলে বলতে হয়।’

ইফতিয়াক সাহেব লজ্জা পেয়ে যান, ধুচ্ছাই! কি যে বলিস না। তোদের জেনারেশনটা না গেছে।

লজ্জা পেলেও ইলার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না ইফতিয়াক সাহেব। ইলা জাহান, তার ছোট বোন। যার কাছে তার ঋণের বোঝার কোনো মানদণ্ড নেই। সেই ছোট থেকে সাঈম তার কাছেই মানুষ, যেদিন রোগের চেয়ে অনেক বেশি অভিমানে ধুঁকে ধুঁকে শমিরীতা চিরদিনের মতো চলে গেল; ইলাই বা আর তখন কতটুকু। কেবল কলেজে পড়ে। ভাবীকে বড় ভালোবাসত মেয়েটা। এখনো তেমনি বাসে। মেনে নিতে পারেনি তার প্রিয় মানুষটার এমন নির্মম প্রস্থান। অথচ সেদিন একটুও কাঁদেনি ইলা। অভুতপূর্ব প্রচণ্ড ধাক্কায় তার বটগাছের শিকড়ের মতো দৃঢ় বিশ্বাস টালমাটাল হয়ে তাল হারায়। কি অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে সেদিন সে তাকিয়ে ছিল ইফতিয়াক সাহেবের দিকে। বোনের সেই নিষ্পলক, কবরের মতো ফাঁকা ও বেদনার্ত চাহনির কথা কোনো দিন ভুলতে পারবে না সে। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়েছিল তার। বুকের ভেতর জন্ম নেয়া এক হিম শীতল কৃষ্ণগহ্বরকে সঙ্গী করে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সে। দ্বিমেরুর মতো সেই বরফ শীতলতা এখনো জমিয়ে রেখেছে তার সব অনুভব। সেই কৃষ্ণগহ্বর এখনো তার রোজ রাতের আলোয়ান। তার এসব বরফাচ্ছন্নতার মাঝে এন্টার্ক্টিকার মাউন্ট ইরেবাসের মতো যেন জ্বলে উঠেছিল ইলা। একটি আগ্নেয়গিরির সত্যিই খুব প্রয়োজন ছিল সেই সময়। অন্তত সাঈমকে বাঁচানোর জন্য। আর সেটি ছিল ইলা। ইলাকে কোনো দিন সাঈমের ফুপু মনে হয়নি। মনে হয়েছে মা। জননীর মতো স্নেহ ও ভালোবাসায় সাঈমকে একটু একটু করে নিজের হাতে গড়ে তুলেছে ইলা। আপাদমস্তকে একজন ভালো মানুষে রূপ দিয়েছে। ইফতিয়াক সাহেব নিজে হলেও হয়তো ছেলের জন্য এতটা পারতেন না। হলে হয়তো কি, তিনি পারতেনই না। শমিরীতার মৃত্যুর পর তার একান্ত ভাঙাচোরা সত্তা কোনোদিনই একজন সন্তান মানুষ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তার পিতা, মাতা ও স্ত্রীহীন সংসার, সন্তান সব এক হাতে সামলানোর কৃতিত্ব কেবলই তার বোনের। তিনি নিজেও কোনো দিন তার মা-বাবাহারা বোনটাকে এভাবে সামলাতে পেরেছেন কিনা, তার সন্দেহ। ইলার সবচেয়ে ক্রান্তিকালীন সময় তার বয়ঃসন্ধিকালে, ভাগ্যিস শমিরীতা এসেছিল। মায়ের মতো তাকে আগলে রেখেছিল শমিরীতা। দুই বোন বৈ আর কিছুই মনে হতো না ওদের। কারো মৃত্যু কখনো তার প্রতি ভালোবাসার অবসান ঘটাতে পারে না। সেই ভালোবাসা দেখে সে সাঈমের প্রতি ইলার মমতায়, শাসনে ও বাহুডোরে। সাঈমের জন্য একটু বয়স করেই বিয়ে করেছিল ইলা। তাই কি করতে চায়? সাঈম বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিলে তারপর বহু কষ্টে তাকে বিয়ে দিতে পেরেছিল ইফতিয়াক সাহেব। সেও কত শর্তসাপেক্ষে যে ছিল, তার হদিস নেই। কিসব দিন গেছে তাদের। হু হু করে সময় চলে গেল সাইমুমের মতো। কত বেদনা, হাসি, কান্নার ধুলো উড়িয়ে চলে গেল বয়স। ভাবলে বড্ড আশ্চর্য হতে হয়। কষতে গেলে হিসাবের ঘর শূন্য নয়, সংখ্যাহীন পড়ে রয়।

বাবার মতটা ঠিক হজম হয় না সাঈমের। প্রত্যুত্তর দিয়ে বলে, একটু আগেই না নিজের প্রেম কাহিনী বলছিলে। এখন জেনারেশন চলে এল? এটা কিন্তু বেইমানি।

সাঈমের স্বরে বর্তমানে পা ফেলে তার পাখনা মেলা ভাবনারা। মুখে গর্বের রেশ এনে বলেন, তোর মায়ের মতো একজন কিংবদন্তির সঙ্গে প্রেম করেছি। বলব না! বিশ্ববিদ্যালয়ের নক্ষত্র ছিল তোর মা। ওর গল্প শুধু আমাদের ব্যাচমেট না, তখনকার সিনিয়র-জুনিয়র সবার মুখে মুখে ঘোরে। এখনো।

সাঈম পারতপক্ষে বাবার সামনে মায়ের কথা এড়িয়ে চলে। বাবার খারাপ লাগাটা খুব সহজেই বুঝতে পারে সে। বাবার দুর্বোধ্য অনুতাপটাও টের পায়।

ইফতিয়াক সাহেব বলে চলেন, আমার প্রেমে না পড়ে তোর মার কি আর উপায় ছিল বল। আমার মতো এমন একটা হ্যান্ডসাম ছেলে সারা ভার্সিটিতে আর কেউ ছিল যে পটবে!

সাইম হেসে ফেলে।

‘সে তুমি এখনো আছো বাবা। একবার শুধু বলে দেখো তোমার জন্য এখনো মেয়ের লাইন লেগে যাবে।’

ইফতিয়াক সাহেব কপট অভিমান নিয়ে বলেন, তোর মাটাই শুধু বুঝল নারে। জীবনে একটাবারও আমাকে হ্যান্ডসাম বলল না।

‘মা তোমাকে খুব ভালোবাসত। আমি দেখেছি।’

ইফতিয়াক সাহেব গভীর থেকে গভীরতর আস্বাদ নেন কথাগুলোর। ঝুল বারান্দার প্রতিটা বিকেলের কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে প্রায়ই হেঁটে যাওয়া তরুণ-তরুণীর কথা। তারা যেন একটানে অতীতে নিয়ে যায় তাকে।

ছেলের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসেন। রিকশার টুং টাং শব্দের সে অতীত থেকে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না ইফতিয়াক সাহেবের।