পেরুর নোবেলজয়ী সাহিত্যিক নাগরিক স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার। ‘দ্য কল অব দ্য ট্রাইভ’ (ল্য ইলামাদা দ্য ল্য ট্রাইবু, প্রকাশক: আরফাগুরা) নামে নতুন একটি বইয়ে তিনি সাত প্রভাবশালী চিন্তকের চিন্তার আলোকে উদারবাদী চিন্তার পক্ষে কলম ধরেছেন। সম্প্রতি এল পায়েসের সঙ্গে তার কথা হয় উদারতাবাদ, বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব ও গণতন্ত্রের বর্তমান হুমকি নিয়ে। এল পায়েস সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে ২ মার্চ ২০১৮

অনুবাদ: সাবিদিন ইব্রাহিম

 

মারিও বার্গাস ইয়োসা বেশ সুস্থ-সবল আছেন। পেরুর এ নোবেলজয়ী সাহিত্যিক তার স্বাধীনতা ভাবনা, ব্যক্তি ও নতুন বই ‘দ্য কল অব দ্য ট্রাইভ’ (ল্য ইলামাদা দ্য ল্য ট্রাইবু) নিয়ে কথা বলার সময় সহজেই হেসেছেন। তার বইটিতে সাত প্রভাবশালী চিন্তকের আলোকে উদারবাদী চিন্তার কথা উঠে এসেছে। তার নির্বাচিত সাত চিন্তক হচ্ছেন— এডাম স্মিথ, হোসে ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট, ফ্রিদরিক ফন হায়েক, কার্ল পপার, রেমন্ড অ্যারন, ইসাইয়াহ বার্লিন ও জ্যঁ ফ্রাসোঁ রেভেল।

এ চিন্তকরা এমন একটি স্কুলের অংশ, যারা বিশ্বাস করেন প্রতিটি ব্যক্তি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সত্তা এবং স্বাধীনতা হচ্ছে সর্বোত্কৃষ্ট সম্পদ। তারা গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বলেন এবং সমাজের পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করার ক্ষেত্রে ক্ষমতার বিভাজনকে সহজলভ্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা মনে করেন। তারা এমন একটি চিন্তা সামনে নিয়ে এসেছেন, যা ‘গোষ্ঠীতান্ত্রিক মানস’ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের পেছনে এ গোষ্ঠীতান্ত্রিক মানসই ঐতিহাসিকভাবে দায়ী বলে মনে করছেন তারা।

ইয়োসার এ ‘দ্য কল অব দ্য ট্রাইভ’কে তার ইন্টেলেকচুয়াল আত্মজীবনীও বলা যায়, যা পাঠকের সামনে ইয়োসার মার্কসীয় ও অস্তিত্ববাদী দর্শন দিয়ে যাত্রা থেকে শুরু করে উদার নীতি/লিবারালিজমের পক্ষে সমর্থন পর্যন্ত তার ভ্রমণকে তুলে ধরে।

প্রশ্ন: উদার চিন্তার ওপর এত আক্রমণ হচ্ছে কেন?

ইয়োসা: স্বাধীনতার শত্রু এমন সব আদর্শের সবচেয়ে কঠোর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদারতাবাদ। আমার বইয়ে আমি এটাই ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি। এর বিভিন্ন ক্যারিকেচার করে ও রক্ষণশীলতার সঙ্গে একে যুক্ত করে শুরু থেকেই উদারতাবাদকে কঠোর আক্রমণ করে আসছে ফ্যাসিবাদ ও কমিউনিজম। প্রাথমিক পর্যায়ে উদারতাবাদ ছিল মূলত ডানপন্থীদেরই দখলে। গির্জায় দাঁড়িয়ে ধর্ম ও নৈতিক মূল্যবোধের শত্রুদের বিরুদ্ধে বয়ানের মাধ্যমেই এর সূত্রপাত। আমি বিশ্বাস করি, আমার চিন্তকরা গণতন্ত্র ও উদারতাবাদের মধ্যকার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ব্যাখ্যা করেছেন। এসব উদারপন্থী চিন্তকের কল্যাণেই মূলত গণতন্ত্র এগিয়েছে এবং মানবাধিকারের ধারণা স্বীকৃত হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার বইয়ে যে লেখকদের কথা তুলেছেন, তারা সবাই স্রোতের বিপরীতে হেঁটেছেন—

ইয়োসা: হায়েক ও ওর্তেগার তো দুটি বই-ই নিষিদ্ধ হয়েছিল। লিবারালরা কি একলা হাঁটারই দণ্ড পেয়েছে? লিবারালরা শুধু ভিন্নতাকে আলিঙ্গনই করে না, এটা আসলে ভিন্নতাকে উদ্দীপ্ত করাও। তারা স্বীকার করে যে, বিভিন্ন ধরনের মানুষ নিয়ে সমাজ গঠিত এবং এটা সে রকম রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। এটা কোনো আইডিওলজি নয়। কোনো আদর্শ আসলে একটি সেক্যুলার ধর্ম। লিবারালিজম কিছু মৌলিক চিন্তার কথা বলে: স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, গোষ্ঠীতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। অন্যভাবে বলতে গেলে, বিশেষ করে যেসব আদর্শ বা ডকট্রিন সমাজে স্বাধীনতা নষ্ট করে বা সীমিত করে সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে লিবারালিজম।

প্রশ্ন: জাতীয়তাবাদের কথা বলতে গিয়ে (স্বায়ত্তশাসিত) বাস্ক কান্ট্রি ও কাতালোনিয়ায় এর বিপদের দিক নিয়ে অনেক কথা বলেছেন ওর্তেগা ওয়াই গ্যাসেট। উদারতাবাদীরা কেন জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন?

ইয়োসা: কারণ এটা স্বাধীনতার সঙ্গে খাপ খায় না। আপনি যদি বিশ্বাস করেন কোনো দেশ, জাতি, বর্ণ বা ধর্মের অংশ হওয়া একটি বিশেষ সুবিধা বা এটা নিজেই কোনো তাত্পর্য বহন করে, তাহলে আপনি বিশ্বাস করেন আপনি অন্যের চেয়ে শ্রেয়। এ রকম বিশ্বাসই আসলে বর্ণবাদ। এর থেকেই সহিংসতা ও স্বাধীনতার ওপর দমন-নিপীড়নের ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করে। এ কারণেই লিবারালিজমের শুরুতে জাতীয়তাবাদের মধ্যে এ রকম গোষ্ঠীতন্ত্রের বিষয়টি যে বিশ্বাসেরই অংশ হিসেবে রিজনকে প্রত্যাখ্যান করে, তা অনুধাবন করেছিলেন এডাম স্মিথ।

প্রশ্ন: এই যে লোকরঞ্জনবাদ, জাতীয়তাবাদের পুনরাগমন, ব্রেক্সিট... এগুলো গোষ্ঠীতন্ত্র বা ট্রাইবালিজমের পুনর্জন্ম দিয়েছে কি? মূলত উদারতাবাদী চিন্তকদের কারণেই গণতন্ত্র অগ্রসর হয়েছে এবং মানবাধিকারের ধারণা স্বীকৃত হয়েছে, তাই না? &dquote;&dquote;

ইয়োসা: এ ধারার বিপরীত ধারাও ইউরোপে সৃষ্টি হয়েছে, যাকে আমি আমাদের সময়ের সবচেয়ে প্রগতিবাদী উন্নয়ন মনে করি। এখন ইউরোপে সীমানা, ভাষা, বিশ্বাস ও প্রথার দেয়াল ভেঙে বড় বড় সংস্থা বা সত্তা তৈরি হচ্ছে। ফলে কিছুটা অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং পুরনো গোষ্ঠীতান্ত্রিকতার দিকে ফিরে যাওয়ার বেশ এক ধরনের মোহও তৈরি হচ্ছে। আমরা এমন একটি সমাজে ফেরত যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি, যা কখনো ছিলই না; যেখানে সবাই একই রকমের হবে, সবাই একই বিশ্বাস লালন করবে, সবাই একই ভাষায় কথা বলবে। এ মিথটি বড় আকারের নিরাপত্তা বোধের জন্ম দেয়, এর প্রবণতা দিয়েই ব্রেক্সিট ও কাতালান জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ ধরনের জাতীয়তাবাদী চিন্তা পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও হল্যান্ডের মতো দেশগুলোর গণতন্ত্রকেও কুরে কুরে খাচ্ছে। তবে কাতালোনিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে আমার অভিমত হচ্ছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এ অভিমুখটা ঠেকাবে। আমি এ ব্যাপারে খুবই আশাবাদী।

প্রশ্ন: আপনার মার্কসবাদ থেকে উদারতাবাদে যাওয়ার বিষয়টি আসলে অস্বাভাবিক নয়। এই একই পথ নিয়েছেন পপার, আরন ও রেভেল, যাদের আপনি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন।

ইয়োসা: লাতিন আমেরিকায় আমার প্রজন্ম এমন একটি বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছে, যারা দেখেছে কীভাবে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও বিশাল বৈষম্য কায়েম হয়েছিল। তরুণ ও কিছুটা অস্থির লাতিন আমেরিকান হিসেবে গণতন্ত্রের ক্যারিকেচারকে অস্বীকার না করা খুব কঠিন ছিল। আমি একজন কমিউনিস্ট হতে চেয়েছি। আমি মনে করতাম সামরিক স্বৈরতন্ত্র, দুর্নীতি এবং সর্বোপরি সব অসাম্যের সমাধান হচ্ছে কমিউনিজম। আমি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সান মার্কোসে ভর্তি হই, যাতে সেখানে কমিউনিস্টদের সঙ্গে মিশতে পারি। এবং তা-ই হয়েছে। কিন্তু লাতিন আমেরিকার কমিউনিজম পুরোদস্তুর স্টালিনিজমের নামান্তর। দলগুলো মস্কোর কমিন্টার্নের কাছে আনুগত্য সঁপে দিয়ে রাখত। এক বছরের জন্য চরমপন্থী কমিউনিস্ট হয়ে গিয়েছিলাম আমি। তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা হালকা ধাঁচের সোসালিস্ট হলাম। এর পেছনে কিউবা বিপ্লবের অবদান রয়েছে। মূলত এর মাধ্যমেই আমরা খানিকটা কম ডগমাটিক ধাঁচের সমাজতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলাম। ১৯৭০-এর দশকে আমি পাঁচবার কিউবায় গেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে মোহমুক্তি ঘটতে থাকে, বিশেষ করে ‘উৎপাদনে সহায়তায় সামরিক ইউনিট’ বা ইউম্যাপ (ইউএমএপি) গঠনের পর থেকে এ মোহভঙ্গের শুরু।

তরুণদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দমন-নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু হয়েছিল। বিষয়টি খুবই কষ্টকর ছিল। মনে আছে, আমার অসন্তোষের বিষয়টি নিয়ে ফিদেলকে একটি চিঠি লিখেছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিউবায় যেখানে অনেকটা সহনীয় ও খোলা স্টাইলের সমাজতন্ত্র ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল, সেখানে কীভাবে দেশটির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সাধারণ অপরাধীদের সঙ্গে সমকামীদেরও রাখা হচ্ছে? 

ফিদেল আমিসহ ডজনখানেক চিন্তককে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমরা পুরো ১২ ঘণ্টা কথা বললাম। রাত ৮টায় শুরু হয়ে পরের দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত আলোচনা চলেছিল। মূলত তিনিই বেশির ভাগ কথা চালিয়েছিলেন। খুবই চটকদার কথা ছিল কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার পর থেকে আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া শুরু করি। তারপর চূড়ান্ত ফাটলটা ধরে পাদিইয়ার ঘটনাটার সময়। ১৯৭১ সালে কবি হেবার্তো পাদিইয়াকে শাস্তি দেয়া হয় এবং জনসমক্ষে অপদস্থ করা হয়। এর পর থেকে কিউবার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ইন্টেলেকচুয়ালদের মনোরম সম্পর্কের ইতি ঘটে। গণতন্ত্র ও উদারতাবাদকে গ্রহণ করতে আমাকে একটি সুদীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমি আসলে সৌভাগ্যবান ছিলাম। কারণ মার্গারেট থ্যাচারের সময়ে ব্রিটেনে বসবাস করছিলাম।

প্রশ্ন: একজন সাহসী, সংস্কৃতিবান ও বেশ উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন নারী হিসেবে আপনি মার্গারেট থ্যাচারকে যেভাবে দেখেন, আমরা কিন্তু তার একেবারে ভিন্ন ছবি পাই—&dquote;&dquote;

ইয়োসা: তার আসলে অন্যায্য ক্যারিকেচার করা হয়েছে। আমি যখন ইংল্যান্ডে এসেছিলাম, তখন দেশটি একটি ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে স্বাধীনতা ছিল কিন্তু লেবার পার্টির অর্থনৈতিক জাতীয়তার কারণে তার তেজস্বিতা ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছিল। মার্গারেট থ্যাচারের বিপ্লব ব্রিটেনকে জাগিয়ে তুলেছিল। সময়টা ছিল খুব কঠিন; ট্রেড ইউনিয়নের ঝামেলা পোহানো থেকে শুরু করে দক্ষ মুক্ত বাজার সোসাইটি তৈরি করা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে গণতন্ত্রকে সুরক্ষা করার কাজ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনের মতো নিষ্ঠুরতম স্বৈরতন্ত্রকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। সে বছরগুলো ছিল আমার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়ার বছর। আমি তখন হায়েক ও পপার পড়া শুরু করেছিলাম, যে লেখকদের প্রায়ই উদ্ধৃত করতেন থ্যাচার। তিনি বলতেন, ‘দি ওপেন সোসাইটি অ্যান্ড ইটস এনিমিজ’ বিশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতি ঘটানো এবং স্বাধীনতার সংস্কৃতি বিকাশে থ্যাচার ও রোনাল্ড রিগ্যানের অবদান একটি বাস্তবতা; যা গণমাধ্যমে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের পেছনে বামরা দায়ী, যাদের অর্জন খুবই কম।

প্রশ্ন: এখন পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

ইয়োসা: এর প্রধান শত্রু হচ্ছে লোকরঞ্জনবাদ (পপুলিজম)। সুস্থ মগজে এখন কেউই তাদের রাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়া, কিউবা ও ভেনিজুয়েলার মতো করতে চায় না। মার্ক্সবাদ এখন তার রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে চলে এলেও একই পরিস্থিতি নেই লোকরঞ্জনবাদের, যা ভেতর থেকেই গণতন্ত্রকে কুরে কুরে খায়। আইডিওলজির চেয়েও কিছুটা কম সরাসরি এটা এমন একটি প্রবণতা, যাতে দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলো দুর্ভাগ্যক্রমে নাজুক অবস্থায় পড়েছে।

প্রশ্ন: ২০০৮ সালে সৃষ্ট ব্যাংক সংকট বৈষম্যকে আরো ত্বরান্বিত করেছে। উদারতাবাদী চিন্তার সমালোচনা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে নতুন একটি নামে, যাকে প্রায়ই নিউলিবারালিজম বা নব্য উদারতাবাদ বলা হচ্ছে।

ইয়োসা: এ নব্য উদারতাবাদ জিনিসটা কী, সেটা আসলে বুঝি না। এটা আসলে উদারতাবাদকে মশকরা করে (ক্যারিকেচার) এবং পুঁজিবাদের নিষ্ঠুর ধারা হিসেবে উপস্থাপন করে। উদারতাবাদ ডগম্যাটিক নয় এবং তাতে সব প্রশ্নের উত্তরও নেই। এডাম স্মিথের জমানা থেকে এটি রূপান্তর হয়ে হয়ে এখনকার সমাজে এসেছে, যা ক্রমে জটিল আকার ধারণ করেছে। আজকে এমন কিছু অবিচার নিয়ে কথা হচ্ছে, যা অতীতে ধরা যায়নি। যেমন— নারীর প্রতি বৈষম্য।

প্রশ্ন: রাষ্ট্রের ভূমিকা কী, সেখানে আসলে নির্ভর করে বিভিন্ন মাত্রার উদারতাবাদের মধ্যে মূল পার্থক্য কতটুকু? এটা কি ব্রেক্সিট ও কাতালান জাতীয়তাবাদের মতো বিদ্রোহকে ব্যাখ্যা করে?

ইয়োসা: হ্যাঁ, উদারতাবাদীরা একটি কার্যকর রাষ্ট্র চায়, আক্রমণাত্মক-হানাদার রাষ্ট্র নয়। এমন রাষ্ট্র, যা বিশেষ করে শিক্ষা ও বিচারের মুখে স্বাধীনতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। এমন কিছু মৌলিক ঐকমত্যের বাইরে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ইসাইয়াহ বার্লিন বলেন, অবাধ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দেয়া যাবে না। কারণ এর ফলেই উনিশ শতকে শিশুরা বিভিন্ন খনিতে আটকে ছিল। অন্যদিকে বাজারের ওপর হায়েকের এমন অস্বাভাবিক আস্থা রয়েছে যে, তিনি মনে করেন এটি সব সমস্যার সমাধান করতে পারে, যদি তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয়। বার্লিন এক্ষেত্রে অনেক বাস্তববাদী। তিনি মনে করেন, বাজার সেটাই, যা অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে আসে কিন্তু উন্নতির অর্থ যদি হয় বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি, তাহলে গণতন্ত্রের মূলকথাই হুমকিতে পড়ে।

এদিকে উদারতাবাদের জনক হিসেবে পরিচিত এডাম স্মিথ এ বিষয়টায় বেশ নমনীয়। অবশ্যই উদারতাবাদের কিছু বিকৃতি রয়েছে। যেমন কিছু অর্থনীতিবিদ আছেন, যারা খুবই সংকীর্ণমনা; যারা মনে করেন, শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমেই নিশ্চিত স্বাধীনতা লাভ সম্ভব।

আমি এর সঙ্গে একমত নই। আমি মনে করি, অর্থনৈতিক সংস্কারের চেয়েও আইডিয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভাষার বিকৃতির দিকে যদি খেয়াল করি এবং ‘প্রগতিবাদী’ আখ্যানটির দিকে যদি নজর দিই তাহলে দেখব, স্পেনে তারাই এ খেতাব পেয়েছেন, যারা কিউবা ও ভেনিজুয়েলার একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন করেছেন।

আমি মনে করি, ভাষার এ বিকৃতির পেছনে ইন্টেলেকচুয়ালদের অবদান রয়েছে। তারা মার্ক্সবাদ ও কমিউনিজমের সঙ্গে এমন মর্যাদা যোগ করেছেন, যা এর আগে নািসবাদ ও ফ্যাসিবাদে ছিল। ইন্টেলেকচুয়ালরা অনেকটা অন্ধভাবেই মনে করতেন, বড় বড় আইডিওলজির মতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেই সৌন্দর্য, নিপুণতা ও সঙ্গতি নেই। অনেক বড় চিন্তকও এ অন্ধত্ব দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ের শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার কীভাবে একজন নািস হতে পারেন? এমনটা ঘটেছে কমিউনিজমের বেলায়ও। এটা অনেক বড় লেখক-কবিকে আকর্ষণ করেছে, যারা গুলাগের প্রশংসা করেছেন। বিশ শতকের সবচেয়ে জ্ঞানী ফরাসি দার্শনিক সার্ত্রে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব সমর্থন করেছিলেন।

প্রশ্ন: সার্ত্রে গণহত্যার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং নািসদের মতো বিভিন্ন স্বৈরশাসকগোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছেন। যেখানে আলবেয়ার কামুর মতো চিন্তকরা প্রতিরোধে দাঁড়িয়েছিলেন, সেখানে সার্ত্রে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। আপনি কিন্তু তাকে ডিফেন্ড করেছেন, তার পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেছেন—

ইয়োসা: সত্যি কথা বলতে কি, তিনি ছিলেন আমার কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রশ্ন: আপনি তাকে অনেক বড় ইন্টেলেকচুয়াল বলছেন কিন্তু তিনি এমন ব্যক্তি, যার রাজনীতি সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ—

ইয়োসা: তিনি আসলে প্রতিরোধ যুদ্ধের সত্যিকার সভ্য ছিলেন না। এমনকি ইহুদি বলে বাতিল হওয়া এক শিক্ষকের স্থলে অন্য একজনকে বসিয়েছিলেন। তিনি এমন একটি প্রতিরোধ বলয়ের অংশ ছিলেন, যা সে সময়ে সচল ছিল না। তিনি সারা জীবন এ হীনম্মন্যতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছেন। কখনো ‘প্রগতিবাদী’, কখনো ‘বিপ্লবী’ অভিধা লাভের জন্য তিনি যা করেছেন, সেগুলো বেশির ভাগ সময়ই খুব উদ্ভট ছিল।

এটা তার সময়কালের খুবই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, তখনকার ইন্টেলেকচুয়ালদের প্রগতিবাদের পরীক্ষায় পাস করতে হতো। ১৯৭০ দশকের লাতিন আমেরিকায় আপনি যদি বাম ঘরানার ইন্টেলেকচুয়াল না হতেন তাহলে আপনাকে কোনো ইন্টেলেকচুয়ালই বলা হতো না। আপনার জন্য দরজা বন্ধ করে দেয়া হতো। সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করছিল বামরা, যারা ছিল গোষ্ঠীপ্রেমী ও ডগম্যাটিক; যা সাংস্কৃতিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। আমি মনে করি, বর্তমানে এগুলো অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

প্রশ্ন: এটা তো ইউরোপেও ঘটেছে। ইউরোপে এখনো বৈষম্য নিয়ে কথা হচ্ছে। এই যে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য, এ বিষয় নিয়ে অতীতে কিন্তু এত হইচই হয়নি—

ইয়োসা: অবশ্যই। ইংল্যান্ডে বসবাস করার সময় আমি এমন কিছু ইন্টেলেকচুয়ালের মুখোমুখি হয়েছি, তাদের কোনো ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ বা হীনম্মন্যতা ছিল না। তারা এগিয়ে আসতেন, আমার জন্য লড়তেন এবং আমার নিজের সঙ্গে সৎ থাকার ব্যাপারে সহায়তা করতেন।

প্রশ্ন: এটা তো আসলে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার (ইন্টেলেকচুয়াল অনেস্টি) বিষয়।

ইয়োসা: শাসকগোষ্ঠীর সাফাই গাওয়া অভিজাতরা কখনই বার্ট্রান্ড রাসেলকে সহ্য করবে না। রাসেল অনেক মহৎ বিষয়াদির পক্ষে লড়েছেন এবং তিনি বিভিন্নভাবে প্রশংসনীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তবে তিনি একই সঙ্গে বিভিন্ন অপ্রীতিকর বিষয় সমর্থন করেছেন এবং বামদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। অথচ বামপন্থীরা তাকে তেমন সম্মান করতেন না, এমনকি তার লেখাও পড়তেন না। এ বৈপরীত্য কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? দুর্ভাগ্যক্রমে বুদ্ধিমত্তা-পাণ্ডিত্য কখনো বুদ্ধিবৃত্তিক সততার গ্যারান্টি নয়।

প্রশ্ন: বেয়াড়া লোকদের কাজকে কি আমরা সম্মান করব?

ইয়োসা: তাদের কাজ শুধু সম্মানই নয়, প্রকাশও করতে হবে। আপনি যদি নীতিবাগিশতা ও নীতিশাস্ত্র দিয়ে সাহিত্যের মূল্যায়ন করতে যান, তাহলে এটি শুধু নড়বড়েই হয়ে যাবে না, হারিয়েও যাবে। এটি তার মূল্য উদ্দেশ্যই (রেজন দ’তরে) হারিয়ে ফেলবে। সাহিত্য তারই প্রকাশ ঘটায়, বিভিন্ন কারণে রিয়ালিটি যা গোপন করতে চায়। ভালো সাহিত্যের মতো সমাজের ক্রিটিক্যাল স্পিরিটজাগানিয়া আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু সাহিত্য ও নীতিবাগিশতা একসঙ্গে যেতে পারে না। তারা পরস্পরের শত্রু। আপনি যদি স্বাধীনতাকে সম্মান করেন, তাহলে সাহিত্যকে সম্মান করতে হবে।

প্রশ্ন: রাজনৈতিক বিশুদ্ধতা (পলিটিক্যাল কারেক্টনেস) কি স্বাধীনতার হুমকি?

ইয়োসা: রাজনৈতিক বিশুদ্ধতা স্বাধীনতার শত্রু, কারণ এটি সততা ও অকৃত্রিমতাকে খারিজ করে। সত্যের বিকৃতি হিসেবে এটাকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি ‘ফেইক নিউজ’ বা ভুয়া খবরের মতো বিষয় আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, যা মনে হচ্ছে একেবারেই নতুন একটি বিষয়—

ইয়োসা: আসলে পুরনো বাস্তবতার নতুন নামকরণ। ভুল তথ্য ও ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করার ক্ষেত্রে, ভালো মানুষকে হীনভাবে উপস্থাপন করতে এবং মিথ্যাকে ঢেকে রাখতে বা মিথ্যা সত্য দিয়ে বাস্তবতার প্রতিস্থাপন করতে কমিউনিজম অবিশ্বাস্য চতুরতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রশ্ন: সোভিয়েত ইউনিয়ন তো শেষ কিন্তু এখন মস্কো থেকে নতুন ধরনের সাইবার হস্তক্ষেপ চলছে, যা মার্কিন নির্বাচন, কাতালান নির্বাচন এবং মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার নির্বাচনী প্রচারণা প্রভাবিত করেছে—

ইয়োসা: আমরা যে প্রযুক্তিগত বিপ্লব পেলাম, তা গণতন্ত্রের পথ মজবুত করার চেয়ে বিকৃত করছে। এ প্রযুক্তি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব কিন্তু গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রুরা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এ বাস্তবতার সঙ্গেই আমাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কিন্তু তার জন্য প্রস্তুতি খুব কম। আমরা প্রযুক্তির এ নগ্ন হামলার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যা আমাদের মিথ্যা সরবরাহ করে, সত্যের অপলাপ করে। আমরা যদি এর রাশ টেনে ধরতে না পারি, তাহলে এটি ধ্বংসাত্মক ভূমিকা চালিয়ে যাবে, সভ্যতাকে দূষিত করবে এবং আমাদের অগ্রসরতা ও গণতান্ত্রিক বিকাশকে থামিয়ে দেবে।