দধিকর্ণকথা
উত্তরদেশে অর্বুদশিখর নামে এক পর্বত আছে। সেখানে মহাবিক্রম নামে এক সিংহ ছিল। সে যখন গুহায় ঘুমিয়ে থাকত, তখন একটা মূষিক (ইঁদুর) তার কেশরের ডগা কেটে নিত। তা দেখে সিংহ একদিন ভীষণ ক্ষেপে গেল। কিন্তু গর্তে ঢুকে থাকা মূষিককে ধরতে না পেরে সে চিন্তা করল: যে শত্রু ক্ষুদ্র এবং বিক্রমের দ্বারা যাকে ধরা যায় না, তাকে ধরতে হলে তার সমান যোদ্ধা নিয়োগ করতে হবে।
এরূপ চিন্তা করে মহাবিক্রম দধিকর্ণ নামে এক বিড়ালকে মাংস খাইয়ে বশীভূত করল এবং তার গুহায় তাকে থাকতে দিল। দধিকর্ণের উপস্থিতি টের পেয়ে মূষিক আর গর্ত থেকে বের হয় না। ফলে মহাবিক্রমও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে লাগল। যখনই মূষিকের আওয়াজ পেত, তখনই দধিকর্ণকে ভালোমতো মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করত।
অতঃপর একদিন মূষিক ক্ষুধার কষ্টে বাইরে এসে দধিকর্ণের হাতে ধরা পড়ল এবং মারা গেল। সেদিন থেকে মহাবিক্রম আর মূষিকের শব্দ না পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে লাগল এবং দধিকর্ণের আর প্রয়োজন নেই মনে করে তার আপ্যায়নও বন্ধ করে দিল। ফলে দধিকর্ণ না খেয়ে খেয়ে দুর্বল ও অবসন্ন হয়ে পড়ল। তাই বলছিলাম, রাজাকে কখনো একেবারে নিশ্চিন্ত করতে নেই। তাতে মন্ত্রীদেরই লোকসান। তাদের গুরুত্ব কমে যায়।
দধিকর্ণের কাহিনী শুনে করটক বলল: তুমি যথার্থই বলেছ। তা এখন আমাদের কর্তব্য কী?
দমনক। চলো আমরা সঞ্জীবকের কাছে যাই।
তারপর দমনক ও করটক সঞ্জীবকের কাছে গেল। সেখানে গিয়ে করটক এক গাছের নিচে সদর্পে বসল। আর দমনক সঞ্জীবকের কাছে গিয়ে ধমকের সুরে বলল: এই ব্যাটা ঘাসখেকো! ইচ্ছেমতো খাচ্ছিস দাচ্ছিস আর গর্জন করছিস! জানিস এটা কার রাজ্য? এটা পশুরাজ পিঙ্গলকের রাজ্য। তার সেনাপতি করটক এই অরণ্য রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত। তিনি ওই ওখানে বসে আছেন। আমাকে আদেশ করেছেন তোকে নিয়ে যেতে। শিগগিরই চল। নইলে এ বন থেকে পালা। এর অন্যথা হলে কঠিন ফল ভোগ করতে হবে। সেনাপতি ক্রুদ্ধ হলে কি জানি কি কঠিন শাস্তির বিধান করেন।
দমনকের কথা শুনে সঞ্জীবক ভয় পেয়ে গেল। একে তো নতুন জায়গা, তার ওপর রাজার লোক বলে কথা। দমনকের চেয়ে তার দৈহিক শক্তি বেশি হলেও শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শরীরের চেয়ে বুদ্ধিই শ্রেষ্ঠ। তাই তো বিশাল দেহের হাতি সামান্য মাহুতের কথা মেনে চলে। এরূপ চিন্তা করে সঞ্জীবক দমনকের সঙ্গে করটকের কাছে গিয়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল এবং সভয়ে বলল: সেনাপতিমশাই! আমার কী করণীয় বলুন।
করটক গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলল: যদি এই বনে থাকতে চাস, তাহলে এক্ষুনি আমাদের প্রভুর পায়ে গিয়ে প্রণাম কর।
সঞ্জীবক কাতরভাবে বলল, তাহলে আমায় অভয় দিন। আমি যাচ্ছি।
করটক। ওরে ষণ্ড, তোর এত ভয় কেন? শোন, আমাদের প্রভু তোর মতো নগণ্য প্রাণীকে মারবে না। দেখ, পশুরাজ সিংহ মেঘের গর্জনের অনুকরণ করে, শৃগালের রব নয়। প্রবল বায়ু সামান্য তৃণের কোনো ক্ষতি করে না, সে সমুন্নত বৃক্ষকেই সমূলে উৎপাটন করে। প্রবল প্রবলের প্রতিই বিক্রম প্রকাশ করে, দুর্বলের প্রতি নয়।
এভাবে সঞ্জীবককে অভয় দিয়ে করটক ও দমনক তাকে নিয়ে পিঙ্গলকের উদ্দেশে যাত্রা করল। তারপর তারা সঞ্জীবককে কিছু দূরে বসিয়ে রেখে পিঙ্গলকের কাছে গেল। পিঙ্গলক সাগ্রহে তাদের দিকে তাকালে তারা তাকে প্রণাম করে বসল। পিঙ্গলক বলল: তোমরা তাকে দেখতে পেলে?
দমনক বলল: হ্যাঁ মহারাজ, দেখেছি। আপনি যা জেনেছেন, সে তা-ই বটে। খুবই ভয়ঙ্কর! বিশাল তার দেহ। শক্তিও তেমন। সে আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থী। তাই আপনি আত্মরক্ষার্থে প্রস্তুত হয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন। তবে শুধু ওর গর্জন শুনেই ভয় পাবেন না। পণ্ডিতেরা বলেন: শব্দের কারণ না জেনে শুধু শব্দ শুনে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাই তো শব্দের কারণ জেনে সামান্য কুট্টনী (গণিকা) সম্মানিত হয়েছিল।
পিঙ্গলক কৌতূহলের সঙ্গে জানতে চাইল: সে কী রকম?
দমনক বলল: শুনুন তাহলে, বলছি...
কুট্টনী-কাহিনী
শ্রীপর্বতে ব্রহ্মপুর নামে এক নগর ছিল। সেখানকার লোকেরা বলাবলি করত, ওই পর্বতের শিখরদেশে ঘণ্টাকর্ণ নামে এক রাক্ষস বাস করে। আসল ঘটনা হলো, একদিন ওই পর্বতের জঙ্গলে বাঘে একজন মানুষ হত্যা করে খায়। তার হাতে ছিল একটা ঘণ্টা। জঙ্গলের বানররা সেটি কুড়িয়ে পায় এবং মাঝে মাঝেই বাজায়। এদিকে বাঘে খাওয়া মানুষটার দেহাবশেষ এলাকার লোকজন দেখতে পায়। এর পর থেকেই তারা ভাবে, ওই রাক্ষসটা ঘণ্টা বাজায় আর মানুষ ধরে খায়। এ ভয়ে ওই নগরের সব লোক পালিয়ে যায়।
তারপর একদিন করালা নামে এক কুট্টনী ওই পর্বতের কাছে গেল। সে দেখল, ঘণ্টা বাজার নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যখন তখন ঘণ্টা বাজছে। কোনো রাক্ষস ঘণ্টা বাজিয়ে মানুষ খেলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। তাই সে ঘণ্টার শব্দের কারণ অনুসন্ধান করতে লাগল। সে দূর থেকে দেখতে পেল, বানররা এ ঘণ্টা বাজাচ্ছে। তারপর সে নগরে ফিরে গিয়ে রাজাকে বলল: মহারাজ, আপনি যদি কিছু অর্থ ব্যয় করেন। তাহলে আমি এ আপদ দূর করার ব্যবস্থা করতে পারি।
রাজা সম্মত হয়ে কুট্টনীকে প্রয়োজনীয় অর্থ দিলেন। কুট্টনী জঙ্গলের কাছে মণ্ডল এঁকে গণেশাদি দেবতার ঘটা করে পূজা করল। এ উপলক্ষে বানরদের প্রিয় ফলমূল প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে দিল। বানররা ঘণ্টা ফেলে ফল খেতে লাগল। এ সুযোগে কুট্টনী গিয়ে ঘণ্টাটি নিয়ে এল। সেই থেকে আর কেউ ঘণ্টার শব্দ শোনেনি। সবাই আবার যার যার বাড়িতে ফিরে এসে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে লাগল। রাজা কুট্টনীকে অনেক মণি-রত্নাদি দিয়ে সম্মানিত করল। তাই বলছিলুম, শুধু শব্দ শুনেই ভয় পাওয়া উচিত নয়।
দমনকের কথা শুনে পিঙ্গলক সাহসে ভর করে বলল: আচ্ছা ঠিক আছে। এবার তুমি তাহলে তাকে এখানে নিয়ে এসো। পিঙ্গলকের আদেশ পেয়ে দমনক সঞ্জীবককে নিয়ে এল। উভয়ের মধ্যে আলাপ-পরিচয় হলো এবং সেদিন থেকে উভয়ে পরমানন্দে বসবাস করতে লাগল।
তারপর একদিন স্তব্ধকর্ণ নামে পিঙ্গলকের এক ভাই সেখানে এল। পিঙ্গলক তাকে আদর-আপ্যায়ন করে শিকারে যাবে। এমন সময় সঞ্জীবক সেখানে এসে বলল: মহারাজ, আজই তো কয়েকটা পশু মারলেন। সে মাংস গেল কই?
পিঙ্গলক। তা দমনক ও করটক জানে।
সঞ্জীবক। মহারাজ, আগে জানুন, সে মাংসের কী হলো।
পিঙ্গলক জেনে এসে বলল: তা নেই।
সঞ্জীবক বিস্ময়ের সঙ্গে বলল: নেই মানে? এতগুলো মাংস গেল কই?
পিঙ্গলক। হয়তো ওরা কিছু খেয়েছে। কিছু অন্যদের দিয়েছে। কিছু নষ্ট করেছে। প্রতিদিন তো এমনই হয়।
সঞ্জীবক বিজ্ঞের ন্যায় বলল: মহারাজ, আপনার অগোচরে এসব হওয়া উচিত নয়। তাহলে রাজ্যে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। রাজনীতিশাস্ত্রে বলা হয়েছে, একমাত্র বিপদের প্রতিকার ছাড়া আর কোনো কাজ রাজকর্মচারীরা রাজার অগোচরে করবে না। এভাবে চললে একদিন আপনার রাজকোষও যে শূন্য হয়ে যাবে। তখন আপনার রাজ্য চালানোই মুশকিল হয়ে পড়বে। অতিব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অধর্মপথে অর্থোপার্জন, চুরি ও দূরে অবস্থান— এগুলো রাজকোষের পক্ষে ক্ষতিকর। নিজের আয়ের পরিমাণ চিন্তা না করে যে ইচ্ছেমতো ব্যয় করে, সে কুবেরের মতো ধনী হলেও অতিশিগগিরই দরিদ্র হয়ে পড়ে। আর ধনহীন পুরুষকে নিজের স্ত্রীও পরিত্যাগ করে।
সঞ্জীবকের কথা শুনে স্তব্ধকর্ণ পিঙ্গলককে বলল: শোনো ভাই, এই দমনক ও করটক তোমার বহুদিনের সেবক। এ ধরনের সেবকরা কোনো অপরাধ করেও নির্ভয় থাকে। এরা প্রভুকে অবজ্ঞা করে নিঃশঙ্কচিত্তে অন্যায় করে যায়। আর যারা একবার প্রভুর উপকার করে, তারা সে উপকারের সুযোগে প্রভুর সর্বস্ব লুটে নেয়। যে বাল্যকাল থেকেই রাজার খেলার সাথি, তাকে মন্ত্রী করলে সে নিজেই রাজার ন্যায় আচরণ করে। দীর্ঘদিনের পরিচয় থাকার সুবাদে সে রাজার চরিত্র বিশেষভাবে জেনে যায়। এ কারণে সে রাজাকে অবজ্ঞা করার সাহস পায়। অন্তরে দুরভিসন্ধি কিন্তু বাইরে বন্ধুভাবাপন্ন, এমন লোক সব অনর্থের কারণ। এরা খুব ভয়ঙ্কর হয়। অন্যায় পথে অর্জিত অর্থের উদ্ধার, নিয়ত কাজের গুণাগুণ পরীক্ষা, যোগ্যতা অনুসারে সম্মান ও উচ্চপদ প্রদান এবং কর্মস্থলের পরিবর্তন— রাজার এসব দিকে নজর দেয়া উচিত। কর্মচারীরা অনেক সময় দুষ্ট ফোঁড়ার মতো হয়। ফোঁড়ায় চাপ দিলে যেমন ভেতরের পুঁজ বের হয়, তেমনি দুষ্ট কর্মচারীদের শাস্তি দিলে তাদের ভেতর থেকে কথা বের হয়। অসৎ পথে অর্থ সংগ্রহকারী কর্মচারীদের বারবার পীড়ন করতে হয়। তাহলে সে সেই অর্থ বের করে দেয়। দেখো, ভেজা গামছাকে একবার নিংড়ালে সমস্ত জল বের হয় না।
পিঙ্গলক বলল: ভাই, তুমি ঠিকই বলেছ। এই দমনক ও করটক একটুও আমার কথা শোনে না।
স্তব্ধকর্ণ। এ তো খুবই অন্যায় কথা। রাজাজ্ঞা অমান্য করা গুরুতর অপরাধ। এদের কোনো প্রকার ক্ষমা করা উচিত নয়। রাজা আদেশ অমান্যকারী পুত্রকেও ক্ষমা করে না। তাহলে রাজা ও তার ছবিতে পার্থক্য কী? দেখো, অর্থলোভী ধার্মিক, বিষয়াসক্ত বিদ্বান ও দুষ্ট মন্ত্রী, এর কেউই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই আমি বলি, তুমি এই তৃণভোজী সঞ্জীবককে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করো। তাহলে আর তোমার এ সমস্যা থাকবে না।
পিঙ্গলক উৎসাহের সঙ্গে বলল, ভাই, আমিও এমনই ভাবছিলাম। ওর কোনো লোভ নেই। খায় ঘাস। মনের মধ্যে হিংসাও নেই। তাই আজই আমি ওকে মন্ত্রিপদে বহাল করলাম।
এই বলে পিঙ্গলক দমনক ও করটককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিল এবং সঞ্জীবককে নিয়ে সুখে দিন কাটাতে লাগল।
এদিকে দমনক ও করটক চাকরিহারা হয়ে হতাশ হয়ে পড়ল। তারা পরস্পর চিন্তা করতে লাগল, এখন কী হবে? দমনক করটককে বলল, এখন কী করা যায়? এ তো আমাদের নিজেদের দোষ। আর দোষ যদি নিজের হয়, তাহলে অনুশোচনা করাও অনুচিত। তার ফলভোগ নিজেদেরই করতে হয়। যেমন করতে হয়েছিল স্বর্ণরেখাকে স্পর্শ করে কন্দর্পকেতুকে, নিজেকে বেঁধে রেখে দূতীকে ও মণি অপহরণ করতে গিয়ে বণিককে।
করটক কৌতূহলের সঙ্গে বলল, কী সে ঘটনা? খুলে বলো।
দমনক। বলছি, শোনো...
কন্দর্পকেতু, দূতী ও বণিকের কাহিনী
কাঞ্চনপুর নামে এক নগর ছিল। তার রাজা ছিলেন বীরবিক্রম। রাজার বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক কর্মচারী নাপিতকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হঠাৎ এক সন্ন্যাসী সেখানে উপস্থিত হয়ে বলল, একে মারবেন না।
রাজপুরুষরা অবাক হয়ে জানতে চাইল, কেন?
সন্ন্যাসী বলল, স্বর্ণরেখাকে স্পর্শ করে আমাকে, নিজেকে বেঁধে রেখে দূতীকে ও মণি হরণ করতে গিয়ে বণিককে দুঃখ পেতে হয়েছিল।
রাজপুরুষরা বলল, এর মানে কী?
সন্ন্যাসী বলতে লাগল, আমি সিংহলদ্বীপের রাজপুত্র কন্দর্পকেতু। আমি একদিন প্রমোদবনে ভ্রমণ করছিলাম। তখন এক সমুদ্রবণিক বলল, চতুর্দশী তিথিতে সমুদ্রের মধ্যে এক কল্পতরুর আবির্ভাব ঘটে। তার নিচে মণিমানিক্যে শোভিত পালঙ্কে অপরূপ সুন্দরী বীণাবাদনরতা এক কন্যাকে দেখা যায়। এ কথা শুনে আমি সেই বণিককে নিয়ে জাহাজে চড়ে সেখানে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, সত্যি, পালঙ্কে অর্ধশয়নে সেই কন্যা শুয়ে আছে। তার লাবণ্যে আকৃষ্ট হয়ে আমিও তাকে পাওয়ার জন্য সমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম। তারপর এক সোনার নগরীতে পৌঁছে সেই কন্যাকে দেখতে পেলাম। বিদ্যাধরীরা তার সেবা করছে। সেও দূর থেকে আমাকে দেখে সখীকে পাঠিয়ে আমায় সাদর সম্ভাষণ জানাল। সখী বলল, ‘এ হলো বিদ্যাধরশ্রেষ্ঠ কন্দর্পকেলির কন্যা রত্নমঞ্জরী। এ প্রতিজ্ঞা করেছে, যে এখানে এসে এই সোনার নগরী দেখবে, সে আমাকে বিয়ে করবে। তাই আপনি একে বিয়ে করুন।’ অতঃপর আমি তাকে গান্ধর্বমতে (ছেলেমেয়ের পছন্দমতে) বিয়ে করে তার সঙ্গে পরমানন্দে বাস করতে লাগলাম। তারপর সে আমাকে একদিন বলল, ‘তুমি ইচ্ছেমতো এখানে সবকিছু ভোগ করো। কিন্তু ভুলেও ছবিতে আঁকা স্বর্ণরেখা নামে ওই বিদ্যাধরীকে স্পর্শ করবে না।’ কিন্তু কৌতূহলবশত আমি একদিন স্বর্ণরেখাকে স্পর্শ করলাম। অমনি ছবি হলেও তার পদাঘাতে আমি নিজের রাজ্যে এসে পড়লাম। তারপর দুঃখার্ত হয়ে আমি সন্ন্যাসীর জীবন গ্রহণ করলাম এবং নানা দেশ ঘুরতে ঘুরতে এ নগরীতে এসে পৌঁছলাম।
তারপর কোনো একদিন বিকালবেলা এক গোপের ঘরে আমি শুয়ে ছিলাম। সন্ধ্যাবেলা দেখি গোপ বাইরে থেকে মদপান করে ঢুলতে ঢুলতে ঘরে ফিরেছে। তখন এক রাজকর্মচারী নাপিতের স্ত্রী দূতী আর গোপী ঘরের ভেতরে বসে কী যেন পরামর্শ করছিল। গোপীর এক গোপন প্রেমিক ছিল। সম্ভবত তার কাছে যাওয়ার জন্যই পরিকল্পনা করছিল। গোপ ঘরে ঢুকেই তাদের দেখে ক্ষেপে গেল এবং গোপীকে আচ্ছা রকম প্রহার করে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। দূতী তার বাড়ি চলে গেল। কিন্তু মাঝরাতে ফিরে এসে গোপীকে বলল, তোমার নাগর তোমার অপেক্ষায় আছে। তার খুব করুণ অবস্থা।
গোপী বলল, কিন্তু আমি যাব কী করে? মিনসে যে আমায় বেঁধে রেখেছে।
দূতী। এক কাজ করো। আমি তোমার বাঁধন খুলে দিচ্ছি। তুমি আমাকে বেঁধে রেখে চলে যাও এবং নাগরের সঙ্গসুখ অনুভব করে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
গোপী তা-ই করে অভিসারে চলে গেল। এদিকে গোপের নেশা একটু কমে এলে ঘুমটা হালকা হলো। তখন দূতীর কাছে এসে তাকে নিজের স্ত্রী মনে করে বলল, কি আর কখনো যাবি তোর নাগরের কাছে?
কিন্তু কণ্ঠস্বরে ধরা পড়ার ভয়ে দূতী কোনো উত্তর দিল না। এতে গোপ নিজেকে অপমানিত মনে করে ভীষণ রেগে গেল। তাই কাছে গিয়ে দা দিয়ে দূতীর নাক কেটে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। এদিকে গোপী ফিরে এসে দূতীর ওই অবস্থা দেখে দুঃখ প্রকাশ করল এবং তার বাঁধন খুলে দিয়ে নিজেকে আবার আগের মতো বেঁধে রাখল। দূতী তার কাটা নাক নিয়ে বাড়ি চলে গেল। ভোরবেলা গোপ ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার স্ত্রীর নাক অক্ষত। তার যেন বিস্ময়ের শেষ নেই। তখন তার স্ত্রী জোর গলায় বলল, ওরে মিনসে, এ পৃথিবীতে কারো এমন ক্ষমতা নেই যে, সতী নারীর কোনো ক্ষতি করে। তাই তো আমার কাটা নাক আবার জোড়া লেগে গেছে।
গোপ নিজেকে অপরাধী মনে করে দ্রুত স্ত্রীর বাঁধন খুলে দিল এবং তার পায়ে পড়ল। আদরে আদরে স্ত্রীর মন ভরিয়ে দিল।
এদিকে ভোরবেলা দূতীর স্বামী নাপিত রাজবাড়ি থেকে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে বলল তার ক্ষুরের বাক্স দিতে। দূতী আড়াল থেকে একটা ক্ষুর উঠোনে ছুড়ে মারল। এতে ক্ষেপে গিয়ে নাপিত ক্ষুরটি আবার তার স্ত্রীর দিকে ছুড়ে মারল। অমনি দূতী চিত্কার দিয়ে বলতে লাগল, ওগো, তোমরা কে কোথায় আছ! দেখে যাও এই মিনসে বিনা দোষে আমার নাক কেটে দিয়েছে!
দূতীর চিত্কার শুনে পাড়া-প্রতিবেশীরা এগিয়ে এল। তারা দেখল সত্যিই দূতীর নাক কাটা। সঙ্গে সঙ্গে রাজার কাছে নালিশ চলে গেল। রাজা বললেন, আমার রাজ্যে নারী নির্যাতন! এর কঠিন শাস্তি হবে। পাপিষ্ঠকে ধরে নিয়ে এসো।
সঙ্গে সঙ্গে রাজার পেয়াদা এসে নাপিতকে ধরে নিয়ে গেল। তার বিচার হলো। ঘটনাপরম্পরার কারণে নাপিত তার অপরাধ অস্বীকার করতে পারল না। তাই বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড হলো। কিন্তু সে নির্দোষ। তাই আমি তাকে মারতে বারণ করেছি।
এবার অর্থলোভী বণিকের কথা বলছি। বণিক একবার বাড়ি ছেড়ে ১২ বছর মলয় পর্বতে ছিল। সেখান থেকে অনেক ধন-সম্পদ নিয়ে সে বাড়ি আসছিল। পথে এক গণিকার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। গণিকার ঘরের দরজায় কাঠের তৈরি এক বেতাল (প্রেতাত্মা) ছিল। তার মাথায় ছিল একটি উত্কৃষ্ট রত্ন। বণিক আর লোভ সামলাতে পারল না। সে রাতের বেলা চুপি চুপি সেই রত্নটি আনতে গেল। অমনি যন্ত্রচালিত বেতালের বাহুতে সে আটকা পড়ল। নিজেকে মুক্ত করার জন্য সে চিত্কার শুরু করে দিল। তখন গণিকা এসে তাকে বলল, তোমার সঙ্গে ধন-সম্পদ যা আছে সব দিয়ে দাও। তা না হলে তোমার মুক্তি নেই। অগত্যা বণিক তার সমস্ত ধন-সম্পদ গণিকাকে দিয়ে নিজে নিঃস্ব হয়ে গেল।
কন্দর্পকেতুর মুখে এসব কথা শুনে রাজপুরুষরা নাপিতকে ছেড়ে দিল এবং তার স্ত্রী দূতীকে ধরে তার মস্তক মুণ্ডিত করে রাজ্য থেকে বের করে দিল। স্ত্রীলোক বলে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়নি। দুশ্চরিত্রা গোপীকেও রাজ্য থেকে বের করে দেয়া হলো। বণিককে তার ধন-সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া হলো।
দমনক করটককে বলল, এজন্যই আমি বলছিলাম, নিজের দোষে দুঃখ পেলে তা নিয়ে অনুশোচনা করা উচিত নয়। তবে তুমি দেখো, আমি যেমন সহজে পিঙ্গলক আর সঞ্জীবকের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করেছিলাম, তেমনি সহজেই আবার তা নষ্ট করব। মনে রেখো, বিপদের সময় যার বুদ্ধি নষ্ট না হয়, সে ঠিকই বিপদ থেকে উদ্ধার পায়, যেমন পেয়েছিল সেই বুদ্ধিমতী গোপী।
করটক আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইল, কী সে ঘটনা?
দমনক বলল: শোনো, বলছি...





