মেট্রোপলিটন শিল্প জাদুঘরে ‘সুলতানস অব ডেকান ইন্ডিয়া ১৫০০-১৭০০’ শীর্ষক কিছু পাণ্ডুলিপির এক প্রদর্শনী হয়, জুলাই মাসে ২০১৫ সালে। প্রদর্শনীতে ছিল তাবত্কালের অত্যন্ত জনপ্রিয় আর রঙিন গল্পে ভরা ফার্সি ভাষায় লিখিত সিনবাদ আর সাত ঋষির গল্প। এ সিনবাদ আরব্য রজনীর সেই নাবিক সিনবাদ নয়, এ অন্য সিনবাদ। নাবিক সিনবাদের উত্পত্তি পশ্চিম ও পূর্ব— সবখানেই পাওয়া যাবে। আলোচ্য এ সিনবাদের জন্মের সঙ্গে ইরানের এক রকমের যোগসূত্র আছে বলে মনে করা হয়, এর সঙ্গে প্রাচীন গ্রেকো-ওরিয়েন্টাল কিছু ব্যাপারও রয়েছে।

তবে এ কাজ তুলনামূলকভাবে নতুন। কোনো এক অজ্ঞাত রাজার নির্দেশ ও অনুরোধে ফার্সি ভাষায় রচিত পুরনো সিনবাদের কবিতাকে ধারণ করে হিজরতের পরবর্তী ৭৭৬ সাল (১৩৭৪/৭৫)-এর দিকে তৈরি করা হয়েছিল এ নতুন লেখনী। সেই সময়ের ইরানি পাণ্ডুলিপিগুলোয় নানা রকম ধাঁচ ও স্টাইল ব্যবহার করা হতো। সিনবাদের এ লেখনী সেগুলোর চেয়ে ভিন্ন নয়। পুরো বইয়ে নানা রকম রঙ আর অদ্ভুত ও অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে চিত্রায়ণ করা হয়েছে মোট ৭২টি ক্ষুদ্র চরিত্র। বইয়ের পাতার শুরুতেই আছে ফেসিং পেজ। তাতে দুই পাশে রয়েছে রাজা সলোমন এবং রানী সেবার বিশাল দুটি চিত্র।

একটি গল্পের একটি কাঠামোর মধ্যে থেকেই ভারতীয় এ সিনবাদে বর্ণনা করা হয়েছে অনেকগুলো গল্প। তরুণ রাজপুত্র সিনবাদকে তার শিক্ষক আজ্ঞা দেন সাতদিন মুখ বন্ধ করে চুপচাপ থাকার। সিনবাদ গুরুর কথা মেনে নেয়। আর এই সময়েই তার উপরে অভিযোগ আসে রাজার উপপত্নীদের মধ্যে একজনকে প্রলোভন দেখানোর। ফলে সিনবাদের শাস্তি ঠিক করা হয় মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু রাজার সাত উজির তাকে এ কাজে বাধা দেন। কীভাবে? গল্প বলে। তারা রাজাকে ধোঁকা প্রদানকারী নারীর গল্প শোনান। কাজ থেমে থাকে। রাজপুত্রের আর শাস্তি দেয়া হয় না। প্রতিদিন গল্পে রাজাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে দোষী সিনবাদ না, দোষী রাজার উপপত্নী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা সফল হয় না। রাজার ধূর্ত উপপত্নী একটা না একটা গল্প বানিয়ে রাজার মাথা থেকে সিনবাদ যে নির্দোষ হতে পারে, সেই ভাবনাই দূর করে দেয়। তবে এভাবে সাতদিন পার হয়ে যায় আর সিনবাদ কথা বলতে শুরু করে। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে সে মুক্তি পায়। গল্পের অনেকটাই ছাড়া ছাড়াভাবে থাকায় জানা সম্ভব হয়নি যে ওই উপপত্নীর কী হয়েছিল। তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল, নাকি শাস্তি পেয়েছিল!

পাণ্ডুলিপির মধ্যেও কম রহস্য লুকিয়ে নেই! ১৫৭৫ থেকে ১৫৮৫ সালের ভেতরেই ভারতের গোলকান্দায় পাওয়া যায় ঠিক একই রকম সিনবাদের লেখনী। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই লেখনীতে কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা কোনো উেসর নাম ছিল না। কোনো বাড়তি পরিচয় না থাকলেও অবশ্য বইয়ের প্রথম ভাগে কুতুবশাহীর সিলের দাগ খুঁজে পাওয়া যায়। লরা উইনস্টেইন এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা চালান। তার মাধ্যমেই জানা সম্ভব হয়, মূলত এ ফার্সি কবিতাকে ভারতীয় রূপে বদলে দেয়ার নির্দেশ এসেছিল কুতুব শাহীর কাছ থেকেই। যদিও সেটা কেবলই অনুমাননির্ভর। মোহাম্মদ ইবনে আলী আল-জাহিরি আল-সামারকান্দির রচিত পার্সিয়ান সিনদাবাদকে সবাই ‘সিন্দাবাদনামা’ হিসেবে আপন করে নেয়। ১৬২২ সালে হায়দরাবাদে এ ঘটনা ঘটে কেবল সুলতান মোহাম্মদ কুতুব শাহের জন্য। অলঙ্করণের ২৩ নং বালামে খুঁজে পাওয়া যায় কান্নাডা ভাষার লেখনী। ধারণা করা হয় যে, এটি করা হয়েছিল সেই সময়ে যখন একটু একটু করে পুরো বইটিকে ছোট করে আনার চেষ্টা করা হয়। বেশকিছু অলঙ্করণ, গল্পের কিছু অংশ হারিয়ে গেছে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে পাণ্ডুলিপিটি কী করে এসেছিল, তা জানা যায়নি। তবে ১৮৪১ সালে পারস্য বংশোদ্ভূত এক স্কটিশ ফোর্বস ফকনার মোট তিন কিস্তিতে বইটির একটি ভাবানুবাদ এশিয়াটিক জার্নালে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এটি ইস্ট ইন্ডিয়া হাউজের একটি সংরক্ষণ।’ সেই সময় বই নিয়ে বাসায় গিয়ে পড়ার চল ছিল। বই ধার দেয়া হতো। ফকনার এমনভাবেই বইটি ধার দিয়ে ফেরত দিতে ভুলে যান বলে মনে করা হয় এবং সেটি ১৮৫৭ সালে বিক্রি করা হয়। বইটি কিনে নেন এডউইন গ্রিনউড। বইয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিল মারা ছিল। সেটিকে উঠিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয় একটা সময়। এভাবে হাতবদলের মাধ্যমে বইটি আবার সবার কাছে পৌঁছে যায়। অনেক অনেক আগের সেই সিনবাদের গল্প!