অর্থ ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে (এবং সাহিত্যকেও) কেউ যে কার্ল মার্ক্সের চেয়ে বেশি নাড়া দিতে পারেননি, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়াকালীন নিজের ভেতরের নাড়া থেকেই তা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আরো কিছুকাল পরে রাহুল সংকৃত্যায়নের ‘সিংহ সেনাপতি’ মার্ক্সকে অন্তরে রীতিমতো খোদাই করে দেয়। বয়স যখন কুড়ি-একুশ, আবু সয়ীদ আইয়ুবের ‘পথের শেষ কোথায়’ সেই খোদাই করা নামের ওপর এক দফা পলেস্তারা বসিয়ে দেয়। কিন্তু মার্ক্স রয়েই যান। একসময় পড়ি বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘হোয়াই আই এম, নট অ্যা কমিউনিস্ট’। তার পরও রয়ে যান।
তখন মার্ক্স না-পছন্দ, পুঁজি-পছন্দ কোনো ইংরেজিভাষী মনীষীর আরো একটি কথা কানে আসে: বয়স যখন তিরিশের নিচে তখন যদি মার্ক্স নাড়া না দেয়, তাহলে বুঝতে হবে হূদয় বলে কিছু নেই; বয়স তিরিশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও যদি নাড়া দেয়, তাহলে ধরে নিতে হবে মাথায় কিছু নেই।
অন্তত আমার বেলায় তিরিশের আগে হূদয় যে ছিল, তাতে সন্দেহ এতটুকুও নেই। কিন্তু মাথায় কিছু না থাকার অপবাদ নিতে রাজি হইনি বলে বেশ খানিকাংশ মার্ক্স-দখলকৃত অংশ অবমুক্ত করি। সে সময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বেহাল ও দুনিয়ার মজদুরকে এক করার বদলে দুনিয়ার মালিকদের হাত শক্ত করার ‘সমাজতান্ত্রিক’ উদ্যোগে কিছুটা বিচলিত হই।
১৯১৭-তে যা ঘটল তাকে বলা হলো বিপ্লব এবং ১৯১৭-এর অর্জন যখন ১৯৮৯-তে প্রতিযোগিতা বিসর্জন করে দেয়া হলো, তাকেও বলা হলো বিপ্লব।
নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকটায় আমি কথিত উচ্চশিক্ষার্থে কার্যত পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণার্থে বিলেতে অবস্থান করছিলাম। সমাজতান্ত্রিক দেশ ভাঙছে। গলায় ভারী শিকল দিয়ে টেনে নামানো হচ্ছে লেনিনের বিশাল মূর্তি, তখন মার্ক্স ও সমাজতন্ত্র পাঠের অন্যতম পীঠস্থান লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের মূল দরজার উল্টো দিকে রাস্তার পাশের কফিশপে নির্বিকার আলোচনা শুনেছি— এটাই তো হওয়ার কথা। এতদিন টিকল কেমন করে!
‘মার্ক্স না মনস্টার’— এ ধরনের শিরোনামে তো আঁতকে ওঠার কথাই— কমবেশি পাতা উল্টাতে শুরু করলাম।
আমরা রাষ্ট্রীয় খাতের বিনাশ ও ব্যক্তিখাতের বিকাশ চাই, গণতন্ত্র চাই, নাগরিকের স্বাধীনতা চাই, রাজনৈতিক বহুত্ব চাই, রাজনৈতিক স্বাধীনতা চাই, মানবাধিকার চাই, অবাধ ও মুক্ত নির্বাচন চাই। আমরা ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ চাই, তাতে যুক্তরাষ্ট্রই হবে পৃথিবীর একমাত্র সুপারপাওয়ার। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব রফতানির মতো সমাজতন্ত্র ভাঙার বিপ্লবও রফতানি করা চাই।
এ রকম একটি অবস্থায় আমি কার্ল মার্ক্সের কবর দর্শন ও সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। ১৯৯৩-এর ডিসেম্বরে লন্ডনের নর্দান আন্ডারগ্রাউন্ড লাইনের আর্চওয়ে স্টেশনে নেমে পায়ে হেঁটে হাইগেট সিমেট্রি। ওয়াটারলো (এটি সেই ওয়াটার লু নয়) পার্কের পর হাইগেট। সেখানেই সোয়াইনস লেন। দুপাশেই সিমেট্রি— একদিকে হাইগেট ইস্ট সিমেট্রি, অন্যদিকে হাইগেট ওয়েস্ট সিমেট্রি।
দেয়াল ভাঙার আগের ইস্ট জার্মানি আর ওয়েস্ট জার্মানির মতো— সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক কোনো ফারাক নেই।
আমি যখন কার্ল মার্ক্সের সমাধিতে তখন তিরিশ উত্তীর্ণ। তখন খানিকটা হূদয় আছে, খানিকটা মস্তিষ্কও। তখন আমার প্রিয় মার্ক্স বচন: ‘ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে একবার ট্র্যাজেডি হিসেবে, দ্বিতীয়বার প্রহসন হিসেবে।’
সোভিয়েত ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়া ভাঙনের ঢেউ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয় লাগে এবং শেষ পর্যন্ত পুঁজির দাপুটে প্রত্যাবর্তন— এ কি ট্র্যাজেডি না প্রহসন? নাকি অন্য কিছু?
এ ইংল্যান্ডে বসেই কার্ল মার্ক্স Das Capital লিখেছেন। নতুন অর্থনীতির দিশা দেখিয়েছেন।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্ত হবে। উৎপাদনের সব উপাদানের একচ্ছত্র মালিকানা থাকবে সরকারের; উৎপাদন, ভোগ, বণ্টন সবকিছুর পরিকল্পনা করবে রাষ্ট্র, নিয়ন্ত্রণ করবে রাষ্ট্র; মুনাফা অর্জন নয়, সামাজিক কল্যাণ হবে উৎপাদনের মূল লক্ষ্য; রাষ্ট্র সুষম বণ্টন নিশ্চিত করবে, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ আর কাজ অনুযায়ী মজুরি পাবে; ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত হওয়ায় শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে; উদ্বৃত্ত শ্রম শোষণ করে পুঁজি সৃষ্টি করা যাবে না, পুঁজি পরিণত হবে না শোষণের হাতিয়ারে; মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে রাষ্ট্র— আর এতে একচেটিয়া ব্যবসার বিলুপ্তি ঘটবে, শোষণ বন্ধ হওয়ায় শ্রমিক অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবে, সুষম বণ্টনে জীবনের মান উন্নত হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।
পুরোপুরি মার্ক্সীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। কিন্তু তার মানে এই নয়, মার্ক্স সঠিক বলেননি। পুুঁজির বিকাশের স্তরে স্তরে, পুঁজির দাসত্বের প্রতিটি সংকটে ভুক্তভোগীরা সমাধান খুঁজবেন মার্ক্সের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রেসক্রিপশনে।
ওকামোতোর মার্ক্স সমাধি জিয়ারত
আমার মার্ক্স সমাধি দর্শনের ৩৩ বছর আগে ১৯৬০-এর শরতে কেবল মার্ক্সের জন্য দূর জাপান থেকে লন্ডনের হাইগেট সিমেট্রিতে এসেছিলেন এক জাপানি— ওকামোতো সেলিচি। তাকুজু ফুকেদার লেখা ‘রিকনস্ট্রাকটিং দ্য স্টার্টিং পয়েন্ট অব দ্য ম্যাটেরিয়ালিস্টিক কনসেপশন অব হিস্টরি’ (১৯২৯-এ প্রকাশিত)-তে প্রকাশিত মার্ক্সের কবরের একটি সাদামাটা ছবির শান্ত ও সরল প্রতিচ্ছবি মনে গেঁথে তিনি হাইগেট সিমেট্রিতে আসেন। কিন্তু এসে ভড়কে যান। মার্ক্সের আশপাশে যারা শুয়ে আছে, তাদের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছে তারা নীরবে সমাহিত, তারা অনন্ত ঘুমে; কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মার্ক্সের কবরে স্থাপিত বিশাল মার্ক্স ভাস্কর্য কবরের নিঃস্তব্ধতা ভেঙেছে, মার্ক্স সেখানে পাথরের মূর্তির ভেতর থেকে চিৎকার করছেন, গালাগাল দিচ্ছেন, তার রাজকীয় অবস্থানের জানান দিচ্ছেন।
একজন গোড়া মার্ক্সবাদী ব্রিটিশ ঐতিহাসিক বিস্মিত হয়ে বলেছেন: That Marx statue in High gate is really an ugly piece of work! সমাধি ক্ষেত্রের শান্ত-সমাহিত পরিবেশের সঙ্গে বেমানান একটি কুিসত শিল্পকর্ম: চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে না দিলেও যেকোনো সাধারণ দর্শকের মনেও খটকা লাগবে— এত বড় কেন?
ওকামোতো যেদিন হাইগেট সিমেট্রিতে, বিশেষ করে কার্ল মার্ক্সকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা লোকজন সম্ভবত তার চোখে পড়েনি। পরদিন তিনি এলেন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র দ্য ডেইলি ওয়ার্কার অফিসে। সেখানে কর্মরত যে পাঁচ-ছয়জন তরুণের সঙ্গে তার কথা হয়েছে, তারাই তাকে নিশ্চিত করেছেন, মার্ক্সকে শ্রদ্ধা জানাতে কেউই হাইগেট সিমেট্রি যাননি।
অবশ্য ১৮৮৩ সালের মার্চে কার্ল মার্ক্সের শেষকৃত্যে অল্প কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী হাজির ছিলেন, তারা লন্ডনবাসী জার্মান ও ফ্রেঞ্চ নাগরিক, হয়তো কোনো ইংরেজ ছিলেনই না। অথচ মার্ক্স ১৮৪৯ থেকে টানা ৩৪ বছর লন্ডনেই কাটিয়েছেন এবং যথেষ্ট অর্থকষ্টে, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস তার জন্য মাসে ৫ পাউন্ডের একটি মাসোহারার আয়োজন করেছিলেন।
ওকামোতো জানলেন মার্ক্সের যে সমাধি তিনি দেখে এসেছেন, তা মূল সমাধির স্থানে নয় এবং অনেকেরই অপছন্দের এ ভাস্কর্যসহ কবরটির ব্যয়ভার মিটিয়েছে সোভিয়েত দূতাবাস।
ওকামোতো তখন স্বগতোক্তি করেন, তাই তো বলি!
আমি যেদিন হাইগেটে মার্ক্সের সমাধিতে, একজন যথেষ্ট বয়স্ক বৃদ্ধ ভিজিটরকে দেখেছি। তিনি চোখ তুলে সন্দিহান চোখে আমার দিকে তাকিয়েছেন, বলশেভিকরা যে চোখে মেনশেভিকদের দেখতেন, হয়তো তারটা সে রকমই। আমি নতুন শেখা ইউরোপীয় কেতায় হাই বলেছি। তিনি এক ধরনের অনুনাসিক শব্দ করে আমাকে অতিকায় কার্ল মার্ক্সের সামনে একা ফেলে দ্রুত চলে যান।
বিপ্লবগুরু কার্ল মার্ক্স লন্ডনে আসার অনেক আগেই ১৬৪০ থেকে ১৬৪৯ পর্যন্ত ব্রিটেনে পিউরিটান বিপ্লব ও ১৬৮৯ সালে গ্লোরিয়াস রেভল্যুশন সাধিত হয়। বিপ্লবের বড় ক্ষুধা ব্রিটেনের ছিল না। সে সময় ব্রিটেনে মার্ক্স অনাদৃত রয়ে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে ছিল:
ক. মার্ক্সের লেখা তখনো ইংরেজি অনুবাদে ব্রিটেনে প্রকাশিত হয়নি, দু-একটি কেবল আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
খ. স্বভাবত উন্নাসিক ইংরেজরা জার্মান মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে হেয় চোখে দেখতেন, মার্ক্স সেই স্বাভাবিক উন্নাসিকতার শিকড়।
গ. প্রলেতারিয়েত একনায়কত্বের কথা এমনকি তখনকার প্রগতিশীলরাও সন্দেহ নিয়ে শুনতেন, তারাও রাজনৈতিক দলে গাঠনিক পরিবর্তন চাননি।
লেনিনের মার্ক্স
কেবল গত শতকের নয়, বিগত সহস্রাব্দের মানুষ ও রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা ১৯১৭ সালের বলশেভিক রেভল্যুশন, সহজভাবে যা আমাদের কাছে রুশ বিপ্লব। লেনিন স্পষ্ট করেই বলেছেন: বলশেভিকবাদ উদিত হয় মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সবচেয়ে পাকা বুনিয়াদের ওপর। তার কথা: একমাত্র এ বিপ্লবী তত্ত্বের সঠিকতা প্রমাণিত হয়েছে শুধু গোটা উনিশ শতকের অভিজ্ঞতাতেই নয়, বিশেষ করে রাশিয়ার বিপ্লবী চিন্তার বিভ্রান্তি ও টলটলায়মানতা, ভুল ও মোহভঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকেও। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মোটামুটি গত শতকের (অষ্টাদশ শতক) চল্লিশের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত অদৃষ্টপূর্ব রকমের বর্বর ও প্রতিক্রিয়াশীল জারতন্ত্রের পীড়নতলে রাশিয়ায় অগ্রণী ভাবনা সঠিক বিপ্লবী তত্ত্বের জন্য সতৃষ্ণ সন্ধান চালিয়েছে... একমাত্র সঠিক বিপ্লবী তত্ত্ব হিসেবে রাশিয়া মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করেছে অভূতপূর্ব কষ্ট ও আত্মোৎসর্গ, অদৃষ্টপূর্ব বিপ্লবী বীরত্ব, ইউরোপীয় অভিজ্ঞতার সন্ধান, অধ্যয়ন, ব্যবহারিক প্রয়োগ, যাচাই ও তুলনার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য উদ্যম ও নিঃস্বার্থপরতায় অর্ধশতকব্যাপী ইতিহাসের সত্যিকার যন্ত্রণায় উত্তীর্ণ হয়ে (লেনিন নির্বাচিত রচনাবলি, ১০ম খণ্ড)।
মার্ক্সীয় তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে লেনিনের দিকনির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৮৯-তে এসে যে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, এ ভবিষ্যদ্বাণী কুড়ি বছর আগেও জোর দিয়ে কেউ করেননি।
কার্ল মার্ক্সের নিজ দেশ জার্মানির বামপন্থীদের নিয়ে সন্দিগ্ধ লেনিন লিখেছেন যে, বামপন্থীরা ‘নিজেদের নিংসন্দেহেই মার্ক্সবাদী বলে ভাবে এবং মার্ক্সবাদী হতে চায় এমন লোকেরা মার্ক্সবাদের মূল সত্যগুলো ভুলে গেছে দেখে কষ্ট হয়।’
একসময় জার্মান কমিউনিস্টদের মধ্যে ভাঙন বাস্তব ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। যে ইংল্যান্ডে কার্ল মার্ক্স সমাহিত, রুশ বিপ্লবের সাফল্যের পরও ১৯২০-এর এপ্রিলে লেনিন লিখছেন: ‘ইংল্যান্ডে এখনো কমিউনিস্ট পার্টি নেই, কিন্তু শ্রমিকদের মধ্যে একটা তাজা তাজা, ব্যাপক, শক্তিশালী, দ্রুত বর্ধমান, যথেষ্ট আশা জাগানো কমিউনিস্ট আন্দোলন বর্তমান।’
মার্ক্সীয় সামাজিক, রাজনীতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সারাৎসার নিয়ে যে রুশ প্রলেতারিয়েত বিপ্লব এবং ‘আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিপ্লবের যে বিজয় বুর্জোয়া ও কূপমণ্ডূকদের অপ্রত্যাশিত ছিল, তারপর সারা দুনিয়াই এখন অন্য রকম হয়ে উঠেছে, বুর্জোয়ারাও অন্য রকম হয়ে উঠেছে সর্বত্রই। বলশেভিকবাদের ভয়ে তারা সন্ত্রস্ত, বলশেভিকবাদের প্রতি বিদ্বেষে তারা প্রায় ক্ষিপ্ত এবং সেজন্যই তারা একদিকে ঘটনার বিকাশ ত্বরান্বিত করছে, আর অন্যদিকে বলপ্রয়োগে বলশেভিকবাদ দমনের জন্য মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছে এবং তাতে করে একাধিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থা ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে।’
কিন্তু দুর্ভাগ্য কার্ল মার্ক্সের অভিপ্রায় অনুযায়ী সাম্যবাদের বিকাশ ঘটেনি এবং পুঁজির দাপট আরো বেড়েছে। এবং ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের প্রায়োগিক বলশেভিকবাদের বিরুদ্ধে অবস্থানকারীরা তাদের নিজেদের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আগেই বলশেভিকদের গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্যই মানতে হবে, এটাই ইতিহাসের উপসংহার নয়; মার্ক্সবাদের পুনরুত্থান হয়তো আবারো ঘটতে যাচ্ছে, এর পেছনেও পর্যাপ্ত যৌক্তিকতা তুলে ধরা হচ্ছে। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন দেখিয়েছেন, উনিশ শতকের জার্মান দর্শন, ইংলিশ অর্থবিজ্ঞান ও ফ্রেঞ্চ সমাজতন্ত্রের সারাৎসার নিয়ে ন্যায্য উত্তরাধিকারী হিসেবে মার্ক্সবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মার্ক্স-এঙ্গেলস-মার্ক্সবাদ গ্রন্থে সংকলিত লেনিনের রচনা ‘মার্ক্সবাদের তিনটি উৎস ও উপাদান’-এ মার্ক্সবাদ বিরোধিতা নিয়ে লেনিন লিখেছেন:
সভ্য দুনিয়ায় সর্বত্র বুর্জোয়াবিজ্ঞানের (সরকারি ও উদারনীতিক উভয় প্রকার) পক্ষ থেকে মার্ক্সের মতবাদের প্রতি চূড়ান্ত শত্রুতা ও আক্রোশ দেখা যায়। মার্ক্সবাদকে তা দেখে এক ধরনের বিষাক্ত গোষ্ঠী হিসেবে। অবশ্যই অন্য মনোভাব আশা করা বৃথা, কেননা শ্রেণীসংগ্রামের ওপর গড়ে ওঠা সমাজে নিরপেক্ষ সমাজের অস্তিত্ব অসম্ভব। সব রকমের সরকারি ও উদারনৈতিক বিজ্ঞানই কোনো না কোনোভাবে মজুরি-দাসত্বের সমর্থন করে থাকে, আর সেই মজুরি দাসত্বের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন সংগ্রাম ঘোষণা করেছে মার্ক্সবাদ। পুঁজির মুনাফা কমিয়ে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো উচিত নয় কি— এ প্রশ্নে মালিকদের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা আর মজুরি দাসত্বের সমাজবিজ্ঞানের কাছ থেকে নিরপেক্ষতা আশা করা সমান বাতুলতা মাত্র।
উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্বই মার্ক্সের অর্থনীতির মোদ্দাকথা। শ্রমদিনের সামান্য অংশের মজুরিতে পরিবারের ভরণ-পোষণ হয় (কিংবা এই সামান্য অংশের পারিশ্রমিকই মোট শ্রমের মজুরি), বাকি অংশ কার্যত খাটে বিনা মজুরিতে এবং তা দিয়েই মালিকের জন্য সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত মূল্য— আর এটাই মালিকের মুনাফা, ক্রমবর্ধমান পুঁজি ও সম্পদের উৎস।
লেনিন বলছেন: ‘শ্রমিকের মেহনতে গড়া এ পুঁজি শ্রমিকদের পিষ্ট করে, খুদে মালিকদের ধ্বংস করে এবং সৃষ্টি করে বেকার বাহিনীর। শিল্পের ক্ষেত্রে বৃহদাকার উৎপাদনের জয়যাত্রা অবিলম্বেই চোখে পড়ে, কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার দেখা যাবে: বৃহদাকার পুঁজিবাদী কৃষির প্রাধান্য বাড়ছে, যন্ত্রপাতির নিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কৃষকের অর্থনীতি এসে মুদ্রাপুঁজির ফাঁকে আটকে যাচ্ছে, নিজের পশ্চাত্পদ টেকনিকের বোমা নিয়ে ভেঙে পড়ছে ও ধ্বংস হচ্ছে। ... বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ বিজয় লাভ করেছে, কিন্তু এ বিজয় হলো শুধু পুঁজির ওপর শ্রমের বিজয়েরই ভূমিকাস্বরূপ।’
কমিউনিস্ট ইশতেহারে মার্ক্স ও এঙ্গেলস বলেছেন:
‘সাম্যবাদী বিপ্লব হলো চিরাচরিত সম্পত্তি সম্পর্কের সঙ্গে একেবারে আমূল বিচ্ছেদ; এ বিপ্লবের বিকাশে যে চিরাচরিত ধারণার সঙ্গেও একেবারে আমূল একটা বিচ্ছেদ নিহিত, তাতে আর আশ্চর্য কী।’
বিবিধ
১৯৮০-র দশকের শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে খণ্ডকালের একটি সৌজন্য বৈঠকের সুযোগ পাই। মার্ক্সবাদী এ কমিউনিস্ট নেতা বাস্তবে কতটা সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন বা করতে চেয়েছেন, এ বিতর্কটি পুরনো। যেদিন তার সাক্ষাত্প্রার্থী হয়ে তার কার্যালয়ে যাই, পথে বেশ বড় মিছিলের মোকাবেলা করি। মিছিলে একটি স্লোগান বেশ মনে ধরে: জ্যোতি বাবু জবাব দাও, তোমার নাতি বিলেত কেনো?
উন্নততর শিল্পগ্রহণ ও ভোগের জীবনলাভের জন্য নাতিকে বিলেত পাঠিয়ে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে এ নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই।
সাক্ষাতের সময় সবিনয়ে মিছিলের স্লোগানটির কথা তাকে বলি। তিনি মুচকি হেসে বলেন, মিছিলে থাকলে আমিও তাই বলতাম। আমি সে ব্যবস্থাটাই চাইছি, যাতে সবার নাতিই বিলেত যাওয়ার সুযোগ পায়।
জর্জ অরওয়েলের সমাজতন্ত্রবিরোধী প্রতীকী উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ কি একই কথা বলছে না: সব জন্তুই সমান, কিন্তু কোনো কোনো জন্তু অন্যদের চেয়ে বেশি সমান— more equal than others. জ্যোতি বসুর উত্তরসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যা বলেছেন তার সারাংশ: শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অলীক কল্পনাবিলাস।
দেশ ৬ জুন, ২০০৬ সংখ্যা লিখছে, অতি সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী (বুদ্ধদের ভট্টাচার্য) আরো একটু অগ্রসর হয়ে আরো একটু খোলামেলাভাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পুরনো সমাজতান্ত্রিক ‘মডেলের’ সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে তার সংশয় আছে। এবং এ কথাও বলেছেন যে, রাজনীতির ক্ষেত্রে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। লেনিন এমন কথা শুনলে নিশ্চয়ই চমকে উঠতেন।
একটু কটাক্ষ করেই বলা: কমিউনিস্ট শাসনে সামাজিক মালিকানার বদলে ব্যক্তিপুঁজির বিকাশ ঘটবে-পুঁজির প্রয়োজনে ধরে আনতে হচ্ছে রতন টাটা, মুকেশ আম্বানি বা সালিম গোষ্ঠীকে।
লন্ডনে
কার্ল মার্ক্স ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের যৌথ লিখন ‘দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো’ ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হলো। জার্মানির সামন্তবাদী রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্র উচ্ছেদের লক্ষ্যে মার্ক্স ‘জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির দাবি শীর্ষক হ্যান্ডবিল বিলি করতে শুরু করলেন। মৃত পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া কিছু অর্থ বিনিয়োগ করে সে বছর ১ জুন তিনি একটি দৈনিক পত্রিকা বের করলেন (Neue Rheinische Zeitung)। তিনিই পত্রিকার প্রধান লেখক। কমিউনিস্ট লিগের আরো কিছু লেখক এ পত্রিকায় লিখলেও এঙ্গেলস লিখেছেন—
এখানে মার্ক্সের একনায়কত্বই চলেছে।
ট্যাক্স বয়কটের মাধ্যমে ক্রমে সশস্ত্র বিদ্রোহে উসকানি দেয়ার অপরাধে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হন।
রাজা চতুর্থ ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম কার্ল মার্ক্সের পত্রিকা বন্ধ করে দিলেন এবং ১৮৪৯-এর ১৬ মে তাকে দেশ ত্যাগ করার নির্দেশ দিলেন।
মার্ক্স প্যারিসে এলেন। দেখলেন সেখানে কলেরার প্রাদুর্ভাব, ওদিকে প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিবিপ্লবীদের হাতে চলে গেছে প্যারিস, তাকেও শহর থেকে বহিষ্কার করা হলো।
চতুর্থ সন্তানসম্ভবা স্ত্রী জেনিকে নিয়ে বেলজিয়াম কিংবা জার্মান যেতে সমর্থ না হওয়ায় লন্ডনে চলে এলেন। মৃত্যু— এ শহরেই।
শুরুতে বাস করতেন সোহো এলাকায়, ১৮৭৫ সালে এলেন উত্তর লন্ডনের মেইটল্যান্ড পার্ক রোডের একটি বাড়িতে, আমৃত্যু এখানেই।
হাইগেট সিমেট্রিতে কার্ল মার্ক্স
কার্ল মার্ক্সের জন্ম ৫ মে ১৮১৮ জার্মানিতে, তখন কিংডম অব প্রুশিয়ার লোয়ার রাইন প্রদেশে। পূর্বপুরুষ ইহুদি। ইহুদিবিরোধী প্রচারণা এবং বাস্তব ঝুঁকি থাকায় (দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সেই ঝুঁকির নির্মম প্রমাণ) তার বাবা হেনরিখ মার্ক্স লুথারিয়ান খ্রিস্ট্র ধর্ম গ্রহণ করেন। এটি প্রটেস্ট্যানিজম খ্রিস্টিয়ানিটির মূলধারা। তার সন্তান হিসেবে কার্ল মার্ক্সও খ্রিস্টান। তিনি ধর্মকে যত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করুন না কেন, খ্রিস্ট ধর্ম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে তার শেষকৃত্যে এবং সেভাবেই খ্রিস্টীয় সমাধিতে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।
ব্রঙ্কাইটিস ও প্লেত্তরিসিতে ভুগে মার্ক্স ১৪ মার্চ ১৮৮৩ মৃত্যুবরণ করেন। এঙ্গেলস তার শেষকৃত্যে এ বন্ধু সম্পর্কে প্রশংসাবচন উচ্চারণ করেন।
দেড় বছর আগে মার্ক্সের স্ত্রী জেনির মৃত্যু হয় (জেনিমুগ্ধ মার্ক্স সম্পর্কের সূচনায় তাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি কবিতাও লিখেছেন)। জেনি সমাহিত হন কাছাকাছি হাইগেট সিমেট্রিতে। ১৭ মার্চ ১৮৮৩ স্ত্রীর কবরটিতেই কার্ল মার্ক্সকে সমাহিত করা হয়। মার্ক্সের কন্যা এইলিন, অন্যান্য সদস্য ও তাদের প্রিয় গৃহকর্মী হেলেন ডেমুর্থও হাইগেটে সমাহিত।
মার্ক্স মেমোরিয়াল কমিটি এগিয়ে আসে। ১৯৫৪ সালে মার্ক্সের প্রপৌত্র ফ্রেডরিখ ও রবার্ট লঙ্গুয়েট গৃহকর্মী হেলেনসহ কার্ল মার্ক্স ও পরিবারের অন্য সবার দেহাবশেষ একত্র করে পুনরায় দাফনের জন্য হোম অফিসের অনুমতি চাইলে তা প্রদান করা হয়। মার্ক্সের মূল কবর থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ২৭ নভেম্বর ১৯৫৪ সবাইকে পুনরায় সমাহিত করা হয়।
ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির অর্থে (মতান্তরে সোভিয়েত দূতাবাসের) ভাস্কর লরেস ব্র্যাডশ মার্ক্সের ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। ১৯৭৫ থেকে ফ্রেন্ডস অব হাইগেট সিমেট্রি ট্রাস্ট এ কবরস্থানের পুরোটার মালিকানা লাভ করে। কবরস্থান রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দর্শনার্থীদের নির্ধারিত অর্থমূল্যের টিকিটের বিনিময়ে হাইগেট সিমেট্রিতে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। যদ্দূর মনে পড়ে, আমি ১ পাউন্ডে টিকিট কিনেছিলাম। এখন টিকিটের দাম ৪ পাউন্ড। মার্ক্সের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। তার কবরের দর্শনার্থীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা সে সাক্ষ্য দেয়।
সমাধিতে লেখা ‘ওয়ার্কার্স অব অল ল্যান্ড, ইউনাইট’— দুনিয়ার মজদুর এক হও।
কার্ল মার্ক্সের সমাধি ব্রিটেনের লিস্টেড বিল্ডিংগুলোর মধ্যে এ ক্যাটাগরির। হাইগেট সিমেট্রিতে সমাজতন্ত্রীদের কেউ কেউ সমাহিত। রাস্তার পশ্চিম দিকে হাইগেট ওয়েস্ট সিমেট্রিতে শায়িত আছেন স্ত্রী সারাহর সঙ্গে বিখ্যাত বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে, নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক জন গলসওয়ার্দি, চিত্রশিল্পী দান্তে গ্যাব্রিয়ল রসেটি, একালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী লুসিয়ান ফ্রয়েড, কবি ক্রিস্টিনা রসেটি, ঔপন্যাসিক জর্জ এলিয়ট, চিন্তাবিদ হার্বার্ড স্পেনসার, চার্লস ডিকেন্সের স্ত্রী ক্যাথরিন ডিকেন্স (ডিকেন্স স্থান পেয়েছেন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের পোয়েটস কর্নারে) এবং বিখ্যাত আরো অনেকে।
হাইগেট সিমেট্রি ইস্টে সবচেয়ে খ্যাতিমান কার্ল মার্ক্সস। মার্ক্সের সমাধি ১৯৭০ দশকে দুবার বোমাবর্ষণের শিকার হয়।
একটি পাদটীকা
যে কার্ল মার্ক্স ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলুপ্তি চেয়েছিলেন, সেই কার্ল মার্ক্স নিজের মরণোত্তর বসতির জন্য একটি কবর কিনে রেখেছিলেন; যিনি ধনতন্ত্রের বিলয় দেখেছিলেন, তার সমাধি দেখিয়ে এখন আদায় করা হচ্ছে জনপ্রতি ৪ পাউন্ড বা ৬ ডলার। বটে!





