(উৎসর্গ: নুসরাত অপরাজিতা)

 

এখন হয় যা তার নাম অবসাদ আর বয়স। মাঝরাতে কাশতে কাশতে বুক ও ঘুম একসঙ্গে ভাঙে। মনে হয়, কেন আমি এবং কোথায়। তার চেয়ে বড় কথা, কিসের জন্য। ঘুম ভেঙে গেলে এক গ্লাস জল খাওয়া হয়। সিগারেটের কাছে যেন আযাপন ক্রীতদাসত্ব, এ সেই শেকল ছিঁড়তে হবেই, অথচ মার্ক্স কথিত সর্বহারা, হারানোর কিছুই নেই। তবে ভোরবেলা মাইল তিন উজিয়ে কর্ণফুলীর পাড়ে বসে একখানা শক্ত লাঠি বিস্কুটের সঙ্গে দুধচার পর আদ্দেকটা লাগে। নিজের সকল আকাঙ্ক্ষা যেভাবে ভেঙে আধখানা করে নিয়েছে সেইভাবে সিগারেট। গুনে সাত টান আর অতি ধীরে যেন একটা বহুদিনের সঙ্গের জন্য কৃতজ্ঞতা। কর্ণফুলী ছেলেবেলায় আরো জলমগ্ন ছিল। দু-চারটে শুশুক কি দেখা যায়নি! ক্লাস সেভেনে স্কলাস্টিকার উর্মিলা একদিন প্লাসিডের কবরস্থানের পেছনে জড়িয়ে ধরে যে হিম করে দিয়েছিল আত্মাসহ, ২০ বছর পর নিউমার্কেটের অচল লিফট থেকে নামতে থাকা ঢাউস ঈদ সংখ্যার মতো ভদ্রমহিলাকে দেখে কে বলবে! কপালে নিখুঁত সিঁদুর। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার হেরিটেজ পাতায় কার যেন সিরিজ ইন্ডিয়ান গডেসদের নিয়ে, চোখ না তুললে তো মাতৃমূর্তি দেখাই যেত না। সঙ্গে গোল দুটি মেয়ে। পাশ দিয়ে দিব্যি চলে গেল। সে চেনা দেয়নি। ভরদুপুরে ২০ বছর আগের সেই উষ্ণতাটুকু অনুভব করে রীতিমতো ঘেমে উঠেছিল।

এখন নদীর পাড়ের ভোর মনোরম। ড্রয়িং খাতার পাতলা কাগজ সরালেই যেমন ভেসে উঠত শর্মিষ্ঠার আঁকা আকাশ, সেভাবে সূর্যটা ভেসে উঠল, নদীর পাড়ের সূর্যদের অধিক মায়াবি লাগে! সাধু মিষ্টি ভাণ্ডারের দুটো টসটসে গরম রসগোল্লা একসঙ্গে মেরে দিয়ে গোপালবাবুকে ৮ টাকা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় গাল টিপে দেন তিনি প্রায়। শর্মিষ্ঠার মা সেসব দুপুরে টিউশনে যান। আর ক্লাস এইটের মেয়েটা লাইব্রেরিতে বসে থাকে। খাস্তগীরে পড়ে। একদিন সাহস করে নিজ থেকেই এগিয়ে গিয়ে অবন ঠাকুরের রচনাবলির ‘আলোর ফুলকি’ মেলে দেয়া গেল। মেয়েটি তখন পড়ছিল বেদেনী, অচিন্ত্যকুমারের। অবাক হয়ে খানিক পরে বলে, রাখো পরে পড়ব। স্পষ্ট কথা। তারপর বন্ধুতা। রিকশা, ট্যাক্সি, নৌকা, নদীর ওপার। এন্তার চিঠি। না প্রেম নয়, একসঙ্গে থাকতে ভালো লাগত। তখনো ভালো সিনেমা কি জানে না নিরু, তাই শুধু বই ছিল।

একদিন হারিয়ে গেল। কতদিন লাইব্রেরিতে চুপচাপ বসে থেকেছে! তখন সেলফোন ছিল না। কোনোদিন বাসায় নেয়নি। এই হাতচিঠিরা সম্বল। ওর হরিশ্চন্দ্র মুন্সেফ লেনের এঁদো গলির বাসায় বার দুয়েক এসেছিল। প্রথমবার হাতে করে এনেছিল শিলালিপি, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রথম সংস্করণ, সেটাও ফিরিয়ে দেয়া হলো না আর।

৩২ বছর ধরে একটা কথা বলার মানুষ খুঁজছে নিরু। কথা বলবে খালি। এত কথা একদিন কী করে ঘুমের ভেতর মরে থাকবে সে!

 

এভাবে ভালো সব মুহূর্ত হারিয়ে যায় যেভাবে জেনারেল পোস্ট অফিসের সামনের মালঞ্চের ডিমবার্গার সাইজে ছোট হয়, লিবার্টির ফালুদা বিস্বাদ! পার্টি অফিসের সাইনবোর্ডে আরেকটু জং। ছেলেবেলার নদীতে চর। আস্তে উঠে পড়ে নিরু। বাসা বদলে সেই ৪ নম্বর বাসে ৫ টাকা ভাড়া। ব্রিজঘাট অনেক ভোরে জাগে। আলকরণের এক বুড়োর সঙ্গে প্রায় দিন দেখা হয়, নিদাঁত হাসে, ভাবে একদিন কথা বলবে।

 

একটা গল্প লিখবে নাকি সে?

 

প্রিয় সাবেকুন নাহার,

আল্লাহ তোমার ভালো করছেন, করেছেন ও করবেন, আমি জানি। তুমি জানো আমার অন্তরাত্মা আজো মেঘের মধ্যেও সেই সুমঙ্গল দেখে যাতে তুমি। আমরা জানি, আমাদের চুমুদের অনুবাদ হয় না। অনুবাদ অযোগ্য হাত ধরাগুলো, পেটে মাথা রেখে মহাজাগতিক সম্ভাবনাগুলো ভেবে দেখাগুলো। রাব্বুল আলামিন জানেন, তোমার মনস্তত্ত্ব বুঝতে আমি পবিত্র আল কোরআন পড়েছি, বুঝেছি এ ধূসর মরুর বুকে সুগন্ধিমাখা ফুল, যা মানবসভ্যতার নানা পাহাড় সমতল নদী উপত্যকা বাহিত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি জানি, মানুষ কাঁদলে কোরআনের হরফ ভিজে ওঠে, দুনিয়ার মালিক কেঁপে ওঠেন। যদিও আমার এ পাঠে তোমার কিছুই এসে যায়নি, কেননা তুমি আন্তরিকভাবে মানো, এই একটি বইয়ের বাইরে কিছুই নয়। তুমি আমাকে বুঝতে চেয়ে পড়েছ উপনিষদ, বেদ, মহাভারত আর পুরাণগুলো। অজস্র রাত আমি তোমায় কাঁদতে দেখেছি। পুরাণের নারীদের বিপন্নতা যেন তোমার ভেতর দিয়ে বাহিত হয়ে যাচ্ছিল। কোনো কোনো সকালে তুমি বেদের ঋষিদের মতো স্থির ছিলে। আমাদের ছোট ঘর মন্ত্রে স্নান করে উঠত। তুমি জানো, এ পাঠে আমার কিছুই এসে যায়নি। আমিও মনে করি, এসব গল্প উপন্যাসের, অক্ষর যখন হয়ে উঠছিল তখনকার বেস্টসেলার।

নাহার, অনেকদিন পর তোমায় দেখলাম। স্থির একটা নদীর পাড়ে তুমি দাঁড়িয়ে আর চারদিকে পুরো প্রাণিজগতের অশ্রুত অর্কেস্ট্রা আর তাতে মিশে যাচ্ছে আমাদের যুগলজীবনের অযুত সুরা ও স্তোত্র। আমি খুব শান্ত হতে থাকলাম। আস্তে আস্তে আমার খোলস থেকে আমি বেরিয়ে এসে অজস্র আমিতে মিশে যেতে থাকলাম। তুমি একবিন্দু নড়লে না। মিশে যাওয়াটুকু দেখে গেলে খালি।

 

(দিনপঞ্জির পাতা থেকে)

 

এই যে তুমি ঘুমাতে পারছ না, তাতে কারো কিছু ছেঁড়া যায় না। সামনেই আরেকটা ভোর ওয়েটিং মুডে। একটু আগে আজান হয়ে গেল। ভালো লাগল ভোরের আজান। আজান আমার ভালো লাগে ভোরে আর সন্ধ্যায়। আমাদের আগের পাড়ায় সন্ধ্যা ভরে যেত ধুপের গন্ধে। আমরা হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম। তার আগে দেখে নিতাম পাড়াতুতো দিদিদের খোলা চুলের ঝলমলানি ও দাদাদের দিকে না তাকিয়ে ইস্টিকুলু মিষ্টিকুলু প্রাণ চমকানো হাসি। সেই থেকে আমাকে গালে টোল চিবুকে টোল টানে, টানে শ্যামলা মেয়েরা। তাদের চোখ অজস্র কথা জানে। এ পাড়ায় সব বাড়িওয়ালা ও মধ্যবয়সী মাছ বিক্রেতা, সিগারেট বিক্রেতা ও বুড়িয়ে যাওয়া ক্যাডার। আর তরুণীরা অকালবৃদ্ধা। একটা ফর্সা বুড়ো প্রায়ই টুসটুসে খোকানাতি নিয়ে হাঁটত। কিছুদিন হলো মারা গেছে। আমি মিস করি খোকানাতির নিদন্ত হাসি। বইয়ের ভাঁজে এখনো মাঝেসাঝে চলে যাওয়া প্রেমিকার টিপ, চুলের টিপ, মুখ মোছা টিসু, যাতে লিপস্টিকের দাগ খুঁজে পাই। অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে ফেলে দিই জানালা দিয়ে। তবু ওরা অশেষ। তীব্র মন খারাপি বিকালে যখন হুইস্কি কালার রোদ ওরা হাতে উঠে আসবেই আমাকে নিথর করে দিতে। আমি কি মূলত মাছ? ঝুম দীঘিতে ডুবে আছি, ব্যক্তিগত কাদার গভীরে, কাঁদার গভীরে?

 

একদিন এক তরুণী বলেছিল, মেয়েদের আপনি এত রেসপেক্ট করেন, তবু আপনার প্রেমিকাছুট! আমি ভাষাহারা হয়ে খালি বলেছি পরিপ্রেক্ষিতবিনা, জ্যোতিষী কি নিজের হাত দেখতে পারে গো? আপনি কি নিশ্চিত ফুটপাতের জ্যোতিষীর টিয়াপাখি প্রতি রাতে ঘুমায়?

 

আর ডিবেট ভালো লাগে না নিরুর।

 

একটি নিপ টুক করে মেরে দিয়ে, টিআইসির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে, রক্তকরবীর রবীন্দ্রবরণের অনুষ্ঠানে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়তে পারে সে, একদম উপরে, কোনার সিটে, ঠিক এসির নিচে, অইখানে বসলে ঘণ্টা দুই মাথায় ঝুমুর বাজে অথবা না দেখা কন্যা কত্থক নাচে।

আজকেও ঘুমিয়েই পড়েছিল চুপচাপ। সারা শহরে এই একটিই ঘুমের জায়গা, কিছুদিন আগে শিল্পকলাতেও, বেগুনি শাড়ি পরা প্রমার মেয়েরা কি সুন্দর, সব মুখ একাকার হতে হতে সে ঘুমিয়ে পড়তে চেয়েও পারে না, ফ্যানের ঘটাং ঘটাং শব্দ বিব্রত করে।

মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভাঙে। তখন সে পুরীর স্বর্গদ্বার শ্মশানে নিবিষ্ট হয়ে মড়া পোড়ানো দেখছিল ঘুমের ভেতর, আচমকা ঘুম থেকে উঠে পাশে রুলিকে আবিষ্কার করে।

 

—কি নিরু দাদা, সেল্ফটট ক্রিটিক, এভাবে ঘুমিয়ে পড়লে চলবে?

রুলির ফিসফিসে স্বর। রুলির কোলে মুনিয়া। বয়স তিন। হয়তো তার। হয়তো নয়।

 

—এ মা, কাকু ঘুমাচ্ছ?

 

রবীন্দ্রগানে শীলাদি অজর অক্ষয়। কেমন কান্না পায়।

নিরু বেরিয়ে আসে। পেছনে রুলি ও মুনিয়া।

 

—তোমার খবর বলো।

—একটি ডার্বি ধরাতে গিয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে কোনো দুপুরবেলার হাহাকার মনে পড়া অপরাধ নয়। বৃষ্টি ছিল না। প্রতিরোধ ছিল না। খটখটে রোদ। তারপর দিন আটেকের মাথায় রুলির বিয়ে ও নিরুর নিরুদ্দেশ হওয়া। এখন তিন বছর পর কোনো তাপ অবশিষ্ট নেই। ডোমের বাড়িতে ফেটে যাওয়া খুলির মতো সব চুরমার। খালি মুনিয়ার বাম কানে তিল, নিরুর পাসপোর্টে আইডেন্টিফিকেশন মার্ক।

—কোনো খবর নেই, একই রকম।

মুনিয়া সারা পার্কিংময় দৌড়ে বেড়াচ্ছে।

—আমাকে মিস করো?

প্রশ্নটা করে ফেলতে হলো।

—না।

ওয়ান শটার। অব্যর্থ নিশানে। তবু হাসি পায়।

 

—আচ্ছা, আবার দেখা হবে।

—একটু ছুঁতে ইচ্ছে করে। না রুলিকে নয় মুনিয়াকে। হয়তো রক্ত হয়তো নয়।

 

পেছনে না তাকিয়ে সোজা হাঁটে নিরু।

 

আরেকটা নিপ লাগবে।