ভুমিকা, টীকা ও অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী
বিশ শতকের সর্বাধিক আলোচিত জননেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বেঁচে থাকলে ১৮ জুলাই ২০১৮ জন্মশতবর্ষ পুরো করতেন। ৯৫ বছর বয়সে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার ত্রাতা, তাদের প্রিয় মাদিবা ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ প্রয়াত হন। জীবনের মূল সময়টাই তার কেটেছে কারাগারে। ২৮ বছরের বন্দিজীবনের ১৮ বছর কেটেছে রোবেন আইল্যান্ড প্রিজনের ডাবল লকের ভেতর।
সাদা মানুষের কবল থেকে শুধু দেশকে স্বাধীন করা নয়, সারা পৃথিবীর কালো মানুষেকে সাদাদের পাশাপাশি ‘সেন্টার স্টেজে’ তিনি তুলে এনেছেন। সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স জাতীয় দলের দিকে তাকিয়ে কি মনে হয়নি দলটি কালোদেরই, সঙ্গে কয়েকজন সাদা খেলোয়াড়ও খেলেছে। ঠাট্টা করে এখন বলা সহজ হচ্ছে, ‘আফ্রিকান রিপাবলিক অব ফ্রান্স ইন ইউরোপ।’ অথচ প্রথম বিশ্বকাপের একমাত্র কালো খেলোয়াড় উরুগুয়ের আন্দ্রাদে যখন মাঠে নামলেন, সাদা মানুষজন গ্যালারি থেকে তার ওপর পাথর ছুড়ে মেরেছিল।
বিশ শতকের ভিলেন হিসেবে সবচেয়ে বেশি লেখা হয়েছে হিটলারকে নিয়ে, কিন্তু নায়ক হিসেবে? অবশ্যই নেলসন ম্যান্ডেলাকে নিয়ে।
নেলসন ম্যান্ডেলার কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল শিকল ছেঁড়া নয়। বরং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করা এবং অন্যের স্বাধীনতা ত্বরান্বিত করা। তিনি হত্যাযজ্ঞের আন্দোলন করেননি। বলেছেন, যদি শত্রুর সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে চাও, তাহলে আগে তার সঙ্গে কাজ করতে থাকো। শত্রু তখন তোমার অংশীদার হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হতে যাচ্ছে— সবাই নিশ্চিত, তিনি নিজেও। এজলাসে তিনি অবিস্মরণীয় এক বক্তৃতা দিলেন, ‘আই অ্যাম রেডি টু ডাই— আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত— এ কথা পৃথিবীজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। সাদা বিচারকরা থমকে গেলেন। রায় দিলেন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
জেলখানা থেকে স্বজনদের কাছে পাঠানো ম্যান্ডেলার কয়েকটি চিঠি ভাষান্তরিত হলো:
আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের সদস্য, বর্ণবাদবিরোধী নেতা ও আইনজীবী আর্চিবল্ড গুমেড (১৯১৪-৮৮), ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। ৮ জুলাই ১৯৮৫ কেপ টাউনের পুলসমুর কারাগার থেকে তাকে যে চিঠি লেখেন তার একাংশ:
উপসংহারে আমি জোহানেসবার্গের দৈনিকে প্রকাশিত একটি চিঠির প্রতি আপনার সৃষ্টি আকর্ষণ করিছ। রানী ভিক্টোরিয়া রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে যে নয়জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন, তাদের নিয়ে পৃথিবীর চারদিক থেকে যখন এ দণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠল, এ নয়জন মানুষকে নির্বাসন দেয়া হলো। অনেক বছর পর রানী ভিক্টোরিয়া জানতে পারলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয়জন হয়েছেন মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। তৃতীয়জন অস্ট্রেলিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল, চতুর্থজন তৃতীয়জনের উত্তরসূরি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে উন্নীত হন। পঞ্চমজন কানাডার কৃষিমন্ত্রী, ষষ্ঠজন মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সপ্তমজন মন্টানার গভর্নর জেনারেল, অষ্টমজন নিউইয়র্কের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও নবমজনকে নিউফাউন্ডল্যান্ডের গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হয়েছে।
১. ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬৮ নেলসন ম্যান্ডেলার মা নোসাকেনি ম্যান্ডেলা হঠাৎ হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৪ অক্টোবর ১৯৬৮ রোবেন আইল্যান্ড কারাগার থেকে কেডি মাতানজিমাকে চিটি লেখেন।
মাতানজিমা (১৯১৫-২০০৩) নেলসনের ভাইপো হলেও বয়সে তার তিন বছরের বড়। তিনি থেম্বু গোত্রপ্রধান ও রাজনীতিবিদ। বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ট্র্যান্সকির মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
গত বছর (১৯৬৭) সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে আমার মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা। মা আমার সঙ্গে (কারাগারে) কথা বলা শেষে করে যখন নৌকা ধরতে এগিয়ে যান, আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নৌকা তাকে এ দ্বীপ থেকে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাবে। মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়েছে, এভাবে আর কখানো তাকিয়ে থেকে মাকে আমার দেখা হবে না। মা যখনই আমাকে দেখতে আসত, আমার মন আনন্দ-উত্তেজনায় ভরে উঠত। তার মৃত্যু সংবাদ আমাকে তীব্র আঘাত করেছে। তখনই মনে হলো আমি নিঃসঙ্গ, শূন্য। কিন্তু এখানে যারা আমার বন্ধু, তাদের সহানুভূতি ও ভালোবাসা সবসময়ই আমার শক্তির উৎস, তারা আমার বেদনা হ্রাস করতে এবং মনোবল বাড়াতে সাহায্য করছেন। মায়ের শেষকৃত্যের প্রতিবেদন আমার সাহস আরো বাড়িয়েছে। যখন আমি জানতে পারলাম, বহুসংখ্যক আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব তাদের উপস্থিতি জানিয়ে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে, আমি খুবই আনন্দিত হয়েছি। শেষে শ্রদ্ধা জানাতে তুমিও যে তাদের মধ্যে ছিলে, আমি সেজন্য আরো খুশি হয়েছি।
২. ৪ মে ১৯৬৯ রোবেন আইল্যান্ড কারাগার থেকে নেলসন তার স্ত্রী উইনির সত্মা নাফিকেলা মাদিকিজেলাকে মায়ের মৃত্যু নিয়ে লেখেন:
আমার মাকে কখনো সামাহিত করতে পারব না, এমন স্বপ্ন আমি কখনো দেখিনি। বরং এ আশা আমি মনে লালন করতাম যে, বৃদ্ধ বয়সে আমি তার দেখাশোনা করব এবং শেষ সময়ে আমি তার পাশে থাকব। জামি (উইনি) ও আমি মাকে জোহানেসবার্গে আমাদের সঙ্গে বসবাস করতে রাজি করাতে আপ্রাণ চেষ্টা করি। বারাওয়ানাথ হাসপাতাল আমাদের বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় মায়ের নিয়মিত ও সঠিক চিকিৎসা সম্ভব হবে এবং রিফে আমাদের বাড়িতে চলে এলে জামির কার্যকরী ও সার্বক্ষণিক হেফাজতের মধ্যে থাকতে পারবে।
৬ মার্চ ১৯৬৬ ও ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ মা যখন আমাকে দেখতে আসে, আমি বিষয়টি আবার উত্থাপন করি। কিন্তু মা যে সারাটা জীবন গ্রামাঞ্চলে কাটিয়েছে; সেখানকার সমতল ও পাহাড়, সেখাকার সুন্দর মনের মানুষ ও সহজ জীবনযাপনের সঙ্গে মা একাত্ম হয়ে গেছে। মা যদিও জোহানেসবার্গে কয়েকটি বছর কাটিয়েছে, তার পরও গ্রামের বাড়ি ও পারিবারিক করবস্থান ছেড়ে এসে এতদূর থাকা তার জন্য খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। যদিও মায়ের এ দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতি আমি সমর্থন করি। আমার আশা ছিল, শেষ পর্যন্ত জোহানেসবার্গে এসে বসবাস করতে মাকে রাজি করাতে পারব।
‘উইনি ম্যান্ডেলাকে লেখা বিশেষ চিঠির অংশ
১৬ জুলাই ১৯৬৯ তার ছেলে থেম্বির মৃত্যুতে’
(বিশেষ চিঠি কয়েদিদের নির্ধারিত কোটার অতিরিক্ত চিঠি। স্বজনদের মৃত্যু কিংবা পড়াশোনাসংক্রান্ত বিষয়ে এ ধরনের চিঠির অনুমতি কারা কর্তৃপক্ষ দিয়ে থাকে।)
আজ বিকালে কারাগারের কমান্ডিং অফিসার অ্যাটর্নি মেন্ডেল লেভিনের কাছ থেকে এ টেলিগ্রাফিটি পান:
‘অনুগ্রহ করে নেলসন ম্যান্ডেলাকে জানাবেন যে, এ মাসের ১৩ তারিখে কেপটাউনে সড়ক দুর্ঘটনায় তার ছেলে থেম্বিকিলে নিহত হয়েছে।’
থেম্বির সঙ্গে আমার আর কখনো দেখা হবে না, এটা বিশ্বাস করা আমার জন্য খুব কষ্টকর। এ বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি সে চব্বিশে পড়েছিল। আমি ১৯৬২ জুলাইয়ের শেষ দিকে শেষবারের মতো তাকে দেখেছি, বিদেশ থেকে ফেরার কয়েক দিন পরই এ দেখা। তখন সে ১৭ বছরের স্বাস্থ্যবান তরুণ। এর সঙ্গে আমি কখনো মৃত্যুকে মেলাতে পারব না। সে আমার একটি পুরনো ট্রাউজার পরেছিল। এটা তার তুলনায় বেশ বড় ও লম্বা। তার এ কাপড় পরার ব্যাপারটি আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমাকে তা খুব ভাবিয়েছে। তুমি তো জানো, তার অনেক কাপড়, আর পোশাকের ব্যাপারে সে খুব খুঁতখুঁতে এবং সেদিন আমার কাপড় পরে থাকার কোনো কারণ ছিল না। তার এ আচরণের অন্তর্নিহিত আবেগময় বিষয়টি যে আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করবে, এটা তো স্পষ্ট। তারপর বেশ কয়েকটা দিন আমার অনুপস্থিতিতে সন্তানদের ওপর যে মনস্তাত্ত্বিক পীড়ন ও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা আমার মন ও অনুভূতিকে উত্তেজিত করে রেখেছে। একটা ঘটনা আমার মনে পড়ছে, ১৯৫৬-এর ডিসেম্বরে আমি জোহানেসবার্গ ফোর্ট কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় আছি। তখন কেগাথোর বয়স ছয় এবং তখন থাকত ওরলান্ডো ইস্টে। যদিও সে জানত, আমি কারাগারে, তবুও সে ওরলান্ডো ওয়েস্টে এসে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করে বলল, সে আমাকে চায়। সেই রাতে সে আমার বিছানায় ঘুমাল।
কিন্তু থেম্বির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কথাটা বলতে দাও। বোর্ডিং স্কুলে যাওয়ার পথে সে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। আমার কাছে পৌঁছে আমাকে খুব উষ্ণ অভিবাদন জানায়। শক্তভাবে কিছুক্ষণ আমার হাত ধরে রাখে। তারপর আমরা একসঙ্গে বসি এবং কথা বলি। কথা বলতে বলতে তার পড়াশোনোর বিষয়ের দিকে চলে যাই। সে সময় তার যে বয়স, সে তুলনায় শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজার সম্পর্কে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক মূল্যায়ন করে। আমি এটা খুব উপভোগ করি। সে যখন মাতাভিলে স্কুলে ভর্তি হয় এবং পরে যখন ওড হাউজে চলে যায়, তার সঙ্গে অমার নিয়মিত পত্র যোগাযোগ হতো।
১৯৬০-এর ডিসেম্বরে একটি গাড়িতে চড়ে অনেকটা পথ অতিক্রম করে তাকে দেখতে যাই। পুরোটা সময়ই আমি তাকে একটি শিশু হিসেবে বিবেচনা করেছি এবং সেভাবেই কথা বলেছি। কিন্তু ১৯৬২ সালে আমাদের কথাবার্তা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি এখন আর একটি শিশুর সঙ্গে কথা বলছি না, বরং এমন একজনের সঙ্গে কথা বলছি, যার মধ্যে জীবন সম্পর্কে একটি দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে নিজেকে পুত্র থেকে আমার বন্ধুতে উত্তীর্ণ করে ফেলল। যখন আমাদের বিদায় নিতে হলো, আমি সত্যিই ব্যথিত হলাম। আমি না পারলাম তার সঙ্গে বাস স্টপে যেতে, না পারলাম স্টেশনে গিয়ে তাকে বিদায় জানাতে। আমার মতো একজন ‘অপরাধী’কে অবশ্যই তখন জরুরি পৈতৃক ভূমিকা পরিত্যাগ করতে হবে। এ আমার সেই পুত্র, না আমার বন্ধ,ু নিজের প্রতিরক্ষার জন্য একাই পথে নামল— যেখানে আমি কেবল কখনো সঙ্গোপনে তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতে পারি। আমি জানি, তুমি তাকে কাপড় কিনে দিয়েছ, হাতে কিছু নগদ টাকা তুলে দিয়েছ। তার পরও আমার মতো একজন নিঃস্ব পলাতকের কাছে যে সামান্য তামা ও সিলভারের মুদ্রা থাকা সম্ভব, পকেট উজাড় করে তাকে দিয়েছি।
রিভোনিয়া মামলার সময় একদিন সে আদালতে আমার পেছনে বসল। আমি বারবার পেছন ফিরে তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিলাম এবং তাকে বড় হাসি উপহার দিচ্ছিলাম। তখন এটা মনে করা হতো যে, আমাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হবে, আর এটাই আমি দেখতে পাই, তার উদ্বিগ্ন মুখমণ্ডলে লেখা। আমি যতবার তার দিকে তাকিয়েছি, ততবার সে মাথা নেড়েছে, কিন্তু একবারও হেসে আমার হাসির জবাব দেয়নি।
আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, থেম্বির সঙ্গে আমার আর কখনো দেখা হবে না। সে তো পাঁচ বছর আগেকার কথা।
রোবেন আইল্যান্ড কারাগারের কমান্ডিং অফিসারকে লেখা চিঠির অংশ:
২২ জুলাই ১৯৬৯
আমার বড় ছেলে মাদিবা থেম্বিকিলে, বয়স ২৪ বছর, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জখম থেকে ১৩ জুলাই ১৯৫৯ কেপ টাউনে মৃত্যুবরণ করেছে।
যেকোনো মূল্যে আমি তার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তার স্মৃতির প্রতি আমার শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চাই। তাকে কোথায় সমাহিত করা হবে, এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। তবে অনুমান করি, তা কেপ টাউনে কিংবা জোহানেসবার্গ অথবা ওমতাতায় হতে পারে। আমাকে যদি অবিলম্বে শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য পুলিশ এসকর্টসহ কিংবা এসকর্ট ছাড়া অকুস্থলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন, আমি খুশি হব। এর মধ্যে আমার আবেদন আপনার কাছে পৌঁছা পর্যন্ত যদি তাকে সমাহিত করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি তার কবর পরিদর্শনের অনুমতি প্রার্থনা করব, যাতে সেখানে পাথর স্থাপন করে আসতে পারি— যারা শেষকৃত্য ধরতে পারে না, তাদের জন্য ঐতিহ্য অনুযায়ী এ আচারের আয়োজন করা হয়।
আমার একান্ত অনুরোধ, এ সময় অন্তত মানবিক দিক দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করবেন, কেবল ১০ মাস আগে ১৯৬৮-এর সেপ্টেম্বরে আমার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদানের জন্য একই ধরনের যে আবেদন আমি করেছিলাম, তখন আপনি যে ধরনের সাড়া দিয়েছিলেন, তার চেয়ে মানবিক বিবেচনা আমি প্রত্যাশা করি। আমার এ আবেদনের অনুমোদন অপনার দিক থেকে অত্যন্ত সদয় কর্ম বলে মনে করা হবে। এ মানবিক বিবেচনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মাহারা কারাবন্দির সম্পর্কের কঠোরতাকে নমনীয় করবে, তার কবরের পাশে আমাকে দাঁড়ানোর সুযোগ দেবে। আমি আরো যোগ করতে চাই, আমার এ প্রয়াত পুত্রের সঙ্গে পাঁচ বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে আমার শেষ দেখা। কাজেই আপনি বুঝতে পারবেন, শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমি কতটা আকুল।
সবশেষে আমি জানাতে চাই, এ ধরনের আবেদন সরকার সহূদয় বিবেচনা করেছে, এমন নজির রয়েছে।
৫. কন্যা জেনি ও জিন্দজি ম্যান্ডেলাকে লেখা চিঠি।
১ জুন ১৯৭০
শেষবার যখন তোমাদের দেখি, তারপর আট বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এদিকে তোমাদের মাকেও তোমাদের কাছ থেকে হঠাৎ সরিয়ে নিয়ে গেছে, তাও ১২ মাসের বেশি (উইনি ম্যান্ডেলাও কারাগারে)।
গত বছর আমি তোমাদের দুটি চিঠি লিখেছি— একটি ২৩ জুন ও অন্যটি ৩ আগস্ট। এখন আমি জানতে পেরেছি, এ চিঠি তোমরা কখনো পাওনি। তোমাদের দুজনের বয়সই যেহেতু ১৬ বছরের কম, ১৬তে না পৌঁছা পর্যন্ত জেলখানায় এসে আমাকে দেখার অনুমতি তোমাদের দেয়া হবে না। কাজেই তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার একমাত্র পথ চিঠি লিখে ও চিঠি পেয়ে তোমাদের স্বাস্থ্য, স্কুল ও পড়াশোনার খবর রাখা। যদিও মূল্যবান চিঠিগুলো তোমাদের কাছে পৌঁছে না, তবুও যখনই সম্ভব হবে, আমি চিঠি লিখে যাব। যে বিষয়টি আমাকে খুব উদ্বিগ্ন রাখছে তা হচ্ছে, স্কুল ছুটির সময় কে তোমাদের দেখভাল করছে। কে খাওয়াচ্ছে, কে কাপড় কিনে দিচ্ছে, কে স্কুলের বেতন দিচ্ছে, বোর্ডিং স্কুলে থাকা-খাওয়ার খরচ দিচ্ছে, স্কুলে তোমাদের অগ্রগতি কেমন, আমার কিছুই জানা নেই। আমি লিখে যাচ্ছি এ ভরসায় যে, ভাগ্য একদিন হয়তো আমাদের পক্ষে আসবে এবং তখন তোমরা চিঠিগুলো পাবে। এর মধ্যে আমার চিন্তা ও আমার অনুভূতির কথা লিখে আমি আনন্দ ও তৃপ্তি পাই। আমার উষ্ণ ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা তোমাদের কাছে পাঠানোর এ এক মাধ্যম; তোমাদের কথা যখন মনে হয়, যে যন্ত্রণা আমার ভেতর বিস্ফোরিত হয়, তা প্রশমিত করার এটাও এক মাধ্যম।
টীকা:
নেলসন ম্যান্ডেলা: জন্ম ১৮ জুলাই ১৯১৮ ট্র্যান্সকির একটি গ্রামে। গ্রামপ্রধানের ঘরে। তার মা গ্রামপ্রধানের তৃতীয় স্ত্রী। ১৯৫৫ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হন। ১৯৯০-এর ফেব্রুয়ারিতে কারামুক্ত হন। ১৯৯৩তে নোবেল পুরস্কার পান। এক টার্ম প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ২০০৯ সালের ১৮ জুলাইকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেলা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস: ১৯১২তে প্রতিষ্ঠিত। শার্পভাইল গণহত্যার পর দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৯০ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। ১৯৬১ সালে এ দলে সামরিক উইংয়ের কমান্ডার ছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৭১ সালে নেলসন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রধান নির্বাচিত হন।
উইনি ম্যান্ডেলা: (১৯৩৬-২০১৮) বর্ণবাদবিরোধী নারী নেত্রী; ১৯৫৮-৯৬ পর্যন্ত ম্যান্ডেলার স্ত্রী, জেনি ও জিন্দজি— এ দুই কন্যার মা। পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত এবং তালাকপ্রাপ্ত।
থেম্বি: ম্যান্ডেলার প্রথম স্ত্রী এভলিনের গর্ভজাত পুত্রসন্তান, জন্ম ১৯৪৫, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৬৯ সালে নিহত। কারাবন্দি নেতা পুত্রের শেষকৃত্যে যোগদানের অনুমতি পাননি।
কেগাথো: প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত দ্বিতীয় পুত্র। জন্ম ১৯৫০, আইনজীবী, ২০০৫ সালে এইডসে মৃত্যুবরণ করেন।
জেনি: নেলসন ম্যান্ডেলা ও উইনির প্রথম সন্তান জেনানি ম্যান্ডেলা, জন্ম ১৯৫০।
জিন্দজি: নেলসন ও উইনির দ্বিতীয় সন্তান, জন্ম ১৯৬৩।






