‘ছোটবেলা থেকে আমি ডিম খাচ্ছি, কিন্তু কখনো কেন মনে হয়নি, ডিমটাকে দাঁড় করানো যায় কিনা?’ ডিমকে আগে কখনো বিশেষ মনোযোগে, দাঁড় করানোর বিষয়ে একটি গভীর অর্থ বা সূত্র পাওয়ার জন্য, যাকে বলে গবেষণাধর্মী নিরীক্ষণ দেখেনি ৩১ বছর বয়সী, নারী-পুরুষ সহকর্মী ও বন্ধুদের বিচারে সুন্দরী, চামড়ার বর্ণ উজ্জ্বল শ্যামল, ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার অর্থনীতিতে লেখাপড়া করা শাহানা হাসান।
প্রশ্নটি মনে আসতেই সিগারেটটা না জ্বালিয়ে, যদিও শাহানা জানে, এ সময়ে সিগারেট খাওয়া ঠিক নয়। কেন ঠিক নয় পরে জানা যাবে। যদিও পরে সে ধরাবে, ডান হাতের তর্জনী ও মধ্যমার মধ্যে রেখে, মিনিট দুয়েক আগে টেবিলে রাখা ডিমটাকে তার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। শৈশব থেকে কতবার ডিম হাতে নিয়েছে বা ধরেছে, কিন্তু আজ সকালের মতো কখনো ইচ্ছে হয়নি। মনের মধ্যে ইচ্ছে নামের প্রবণতা যখন মানুষকে কোনো কিছু পাওয়া, করা বা দেখার জন্য প্ররোচিত করে, তখন ইচ্ছাপূরণ না হওয়া পর্যন্ত ত্বরা প্রিয় মানুষ থাকে অস্থির। অ্যাশট্রের ওপর সিগারেটটা রেখে বাম হাতের লম্বাটে আঙুলগুলো ডিমটার দিকে নিয়ে যেতে যেতে প্রথমে ‘ওভাল’ শব্দটি শাহানার চিন্তার মধ্যে ঘুরপাক খায় এবং সে বাংলা শব্দটি মনে করতে চেষ্টা করে। ‘ডিম্বাকৃতি’ মনে পড়তেই নিজেকে বলে, ‘থ্যাঙ্কিউ।’
‘কোনো ডিম কি কখনো পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল হয়? কোনো একটি পাখি বা অন্য প্রাণীর ডিম গোল হতে পারে, যা আমি দেখিনি। গুগলে সার্চ দিলেই পাওয়ার কথা। গুগলে অনেক কিছু আছে, তবে মানুষের একাকীত্বের যন্ত্রণার, দেশ হারানোর স্থায়ী দুঃখ, প্রেম পাওয়া বা না পাওয়ার এবং কেন বিশেষ সময়ে কান্না আসে সে কথা নেই, কারণ বলা নেই। প্রতিটি মানুষ বা প্রাণী এক রকম ডিম মাত্র। হাত-পা-চোখ-বুদ্ধি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে, কথা বলে। কথা বলা আর বুদ্ধি প্রয়োগের ব্যাপারটা না থাকলে মানুষ কী যে করত, একটি পিঁপড়ে বা বাদুরের সঙ্গেও মারামারি করে বেঁচে থাকতে পারত না।’
ডিমটাকে না ছুঁয়ে সরাসরি বাম হাতের করতলের মাঝখানে তুলে নেয় শাহানা। অনুভূতিকে আনন্দ দেয় এ রকম এক ধরনের ঠাণ্ডা। কিছুক্ষণ আগে ফ্রিজের এগ-চেম্বার থেকে বাদামি রঙের ডিমটাকে বের করেছিল। করতলের শিরা-উপশিরায় মৃদু ঢেউ দেয়। ভালো লাগে। ডিমটাকে মুঠোবন্দি করে। ‘মুঠ আরো শক্ত করলে ডিমটা ফেটে যাবে, হলুদ কুসুমটা এক পিচ্ছিল সাদাটে পদার্থের সঙ্গে মিশে যা হবে, তাকে কী বলা যাবে? হলুদ বমি, কদিন আগে আমিও বমি করেছি, রঙ ছিল ফ্যাকাসে?’ শাহানা ভেবেছিল, কিন্তু মুঠ শক্ত করেনি। ডিমের বাদামি খোসার ওপর শায়িত আঙুলের নীল রঙের পালিশের নখগুলো লম্বাকৃতি টিপের মতো দেখায়। ডিমটাকে টেবিলের ওপর রেখে নিঃশব্দে হাসে। হাসির কারণ হতে পারে, ওর মনে হয়েছিল, ‘আমিও তো একটা ডিম।’
‘ডিমকে দাঁড় করানো যায় কিনা?’ প্রশ্নটি শাহানার মাথা থেকে সরেনি। সিগারেট ধরাল। মুখভর্তি ধোঁয়া নিয়ে ঠোঁট সরু করে ধোঁয়া ছাড়ল ডিমের ওপর। ডিমটার সরু দিকে টোকা দিল। হালকা, উড়ন্ত কুয়াশার মধ্যে ডিম ঘুরছে লাটিমের মতো। দৃষ্টি অন্যদিকে না ফেলে ঘূর্ণন-দৃশ্য শাহানা উপভোগ করে। থেমে যাওয়ার পর আবার টোকা দিল। ডিম ঘুরছে। আবার ধোঁয়া ছাড়ল ডিমের ওপর। ঘুরতে ঘুরতে একটু একটু করে সরে ডিমটা টেবিলের কিনারার দিকে যাচ্ছে। ‘টেবিল থেকে পড়ে গেলে একটা ডিমই তো ভাঙবে, নষ্ট হবে। ওপর থেকে পড়ে ডিম ভেঙে যাওয়ার শব্দ আমি কখনো শুনিনি।’ ডিমটা ঘুরতে ঘুরতে টেবিলের কিনার প্রান্তে যাওয়ার আগেই শাহানা ধরে এবং বলে: ‘ডিমকে হত্যা করা ভালো নয়। কী ধৈর্যে একটি মুরগি বাচ্চার মুখ দেখার আশায় ২১ দিন ডিমে তা দেয়। তাপ শব্দটি মুরগির জন্য শুধুই “তা” কেন? শ্রেণিবৈষম্যের প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। আর একজন নারী, যদি সে মা হতে চায়, ১০ মাস ১০ দিন ভ্রূণে খাদ্য, তাপ, যত্ন ইত্যাদি দিতে থাকে। সন্তানের মুখ দেখবে। মুরগির জন্য অন্তঃসত্ত্বা শব্দটি কি সঠিক? মুরগি বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞেস করতে হবে। আমার পেটের মধ্যে অন্ধকারে রাশেদের শুক্রাণু আর আমার ডিম্বাণু ঘুরে ঘুরে, ওরা জানে কোন চক্রে কে ঘুরেছে, যেন এক আনন্দকর চিরন্তন কানামাছি খেলা, ধরে ফেলেছে একে অন্যকে। মিলিত হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত ভ্রূণ যদি বেঁচে যায়, যদি আমি হত্যা না করি, একদিন মানুষ হয়ে জন্ম নেবে, একটি কথা বলা ডিম হবে। বেঁচে থাকা প্রমাণ করার একটি শর্ত কথা বলা। মৃত্যুমুখী মানুষকে তার পাশে থাকা মানুষ আর্তস্বরে বলে, “কথা বলো, কথা বলো”।’
বাম হাতের তর্জনী, মধ্যমা আর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বড় ডিমটার মাঝখানে যত্নে ধরে ডিমের মোটা দিকটাকে শাহানা টেবিলের ওপর দাঁড় করায়। খুব ধীরে তিনটি আঙুল আলগা করে। ডিম দাঁড়ায় না। তিন-চারবার চেষ্টা করল। দাঁড়াল না। আঙুলগুলো আলগা করলেই যেকোনো দিকে ডিম গড়িয়ে পড়ে। ‘বৃত্তের বুক বা পিঠ হয় না। ডিমের কোন দিককে বলা হবে মাথা আর কোন দিককে পাছা?’ এ চিন্তার শেষ শব্দটি মনে হতেই শাহানা হেসে দেয়। ‘ডিম্বাকৃতি একটি বস্তুকে কেউ কখনো দাঁড়া করাতে পারে না। ফুটবল যখন মাঠের ওপর থাকে, যদিও বল ডিম্বাকৃতি নয়, কেউ বলে না, ‘বলটি দাঁড়িয়ে আছে।’ তবে বলতে পারে, ‘অপেক্ষা করছে লাত্থি খাওয়ার জন্য।’
২.
এক বহুজাতিক কোম্পানির বড় চাকুরে শাহানা। বাম হাতি। শুধু খাওয়ার সময় ব্যবহার করে ডান হাত। অন্য সব কাজ বাম হাতে। ঢাকার এক উন্নত এলাকায় দুই রুমের ফ্ল্যাটে একা থাকে। তার খাবার টেবিলের নীলচে কাচের ওপর একটি বাদামি রঙের বড় ডিম। ফার্মের। ডিমটি ভাজার জন্য শাহানা কিছুক্ষণ আগে ফ্রিজ থেকে রেব করেছিল। আজ ছুটির দিন। দুপুরের আগে প্রেমিক রাশেদ আসবে। কোনো বড় হোটেলে ওদের লাঞ্চ করার কথা। ফিরে এসে শোবে এক বিছানায়। রাশেদ জানে, শাহানা কনসিভ করেছে। শাহানা জানে, এখন সিগারেট খাওয়া ঠিক নয়।
গল্পটি সত্য না মিথ্যা, শাহানা জানে না। কোথাও শুনেছিল। ক্রিস্টোফার কলম্বাস নাকি ডিমকে দাঁড় করিয়েছিলেন। স্পেনের রানী ইসাবেলা ইতালির মানুষ কলম্বাসকে খুব মূল্য দিতেন। রানীর কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো নতুন দেশ খোঁজার জন্য কলম্বাস জাহাজ ভাসাবেন। রানীর আমলারা কলম্বাসকে পছন্দ করেন না। আমলারা নিজেদেরই পছন্দ করে বেশি। এক রাতে পার্টি হচ্ছে। দু-তিনজন আমলা কলম্বাসের বুদ্ধিকে যাচাই করার জন্য তাকে বললেন, ‘তোমার বুদ্ধি ও সাহস অনেক, তুমি অজানার উদ্দেশে যাও, ভালো কথা, ডিমকে দাঁড় করাতে পারো?’ কলম্বাস মাথা নেড়ে বোঝালেন, কাজটি কঠিন না। ঘোষণা হলো, কলম্বাস ডিমকে দাঁড়া করাবেন। আমলারা দাঁড়ালেন টেবিলের চারদিকে। পৃথিবীর সব আমলা মনে করেন, তাদের বুদ্ধি বেশি। সবার চোখ দেখছে কলম্বাস ডিমকে কীভাবে দাঁড় করান। খুব সাবলীলভাবে কলম্বাস ডিমের মোটা অংশের দিক টেবিলের ওপর ঠুকে দিলেন। খোসা ভেতরের দিকে দেবে গেল। ডিমটাকে কলম্বাস ভাঙা দিকটার ওপর দাঁড় করিয়ে দিলেন। সহজ চোখে তাকালেন তাকে ঘিরে ধরা আমলাদের দিকে। সব আমলা প্রায় একসঙ্গে বললেন, ‘ডিম ভেঙে দাঁড় করাতে সবাই পারে।’ ‘সবাই পারে, কিন্তু এখানে কেউ পারেনি’, শান্ত স্বরে জবাব দিলেন কলম্বাস।
৩.
রাশেদের ফোন এল। ‘কেমন আছ?’ জিজ্ঞেস করেই শাহানার উত্তর না শুনেই ‘কিছু হলো?’
‘না হয়নি’, শাহানার স্বরে স্বাভাবিক উত্তর।
‘তুমি কি অ্যাবরশন করাবে? দরকার হলে সিঙ্গাপুর চলে যাব।’
‘তুমি তো আসছ, তখন কথা বলব। ডোন্ট ওরি। আচ্ছা একটা প্রশ্ন করছি, রাদার জানতে চাইছি, তুমি কি কখনো একটি ডিমকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছ?’
‘কী উদ্ভট প্রশ্ন।’ রাশেদ হেসে দেয়। ‘তোমার মাথায় ডিমকে দাঁড় করনোর চিন্তা কেন এল? রাতে ঘুম হয়েছে?’
‘তুমি আসার পর এ নিয়ে কথা বলব। এখন রাখি।’
রাশেদকে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, ‘ডিমকে কখনো দাঁড় করানো যায় না। মানুষও এক রকম ডিম। এ পৃথিবীর ওপর মানুষ এখনো ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। ক্রমাগত দৌড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে দাঁড়াতে পারবে কিনা, সন্দেহ আছে। পৃথিবীর ওপর শক্ত পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, স্থির হওয়ার জন্য মানুষ ক্রমাগত নিজের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, অন্য মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। যুদ্ধ শেষে মনে করছে, এবার স্থির হওয়া যাবে, দাঁড়ানো যাবে, এবার একটি শান্তির পরিবেশ, সুন্দরভাবে বাঁচার পরিবেশ তৈরি হবে, কিন্তু তা হয় না। মানুষ সবকিছুকে পদানত করতে চায় বলেই পৃথিবীকে ধ্বংস করছে, করছে নিজেদেরও। ডিম তো, দাঁড়াবে কীভাবে?’
৪.
ফ্রিজ থেকে আরো চারটি ডিম বের করে শাহানা। টেবিলের ওপর ডিমগুলো রেখে পাঁচ রঙের পাঁচটি, পার্মানেন্ট নয়, মার্কার কলম আনে। প্রতিটি ডিমের নাম দেয়। ধূসর রঙের কালিতে লেখে: সরফরাজ হাসান, বাবা। ৭০ বছর পার করা একজন মানুষের মুখ তো ধূসর হতেই পারে। হলুদ দিয়ে সায়মা হাসান, মা। চারদিকে মা শুধু অসুখ দেখে। সবুজ কালিতে শরিফুল হাসান, ছোট ভাই। সবসময় প্রাণবান। লাল রঙে রাশেদ চৌধুরী, প্রেমিক। সে মনে করে, বিপ্লব আসছে। প্রথমে বের করা, দুবার ঘোরানো, ধোঁয়ায় ঢেকে দেয়া ডিমটার ওপর নীল কালিতে নিজের নাম লেখে শাহানা। আকাশের শূন্যতা তাকে ছাড়ে না।
চারটি ডিমের মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গা করে রাখে নিজের নাম লেখা ডিমটা। শাহানার মনে হয়, প্রতিটা ডিম বা প্রতিটি মানুষ নিজেদের রঙ নিয়ে অপেক্ষা করছে কে কাকে ধরবে।
আবার সিগারেট ধারল। কী ভেবে লাল কালিতে লেখা রাশেদের নাম বাম হাতের তর্জনী দিয়ে মুছে দিল। লাল রঙ লেপ্টে গেল ডিমের ওপর। অন্যদিকে কালো কালিতে লিখল: ‘রাশেদ কি আমাকে ভালোবাসে?’ আরো লিখতে চেয়েছিল: ‘নাকি শুধু আমার শরীরটা ভালোবাসে?’
৫.
নামগুলো না মুছে ধূসর বাবা, হলুদ মা, সবুজ ভাইকে ফ্রিজের এগ-চেম্বারে রেখে শাহানা এসে খাবার টেবিলের চেয়ারে বসে। রাশেদ ও শাহানা নামের ডিম দুটি পাশাপাশি রেখে ঘোরায়। ঘূর্ণমান ডিম দুটি একটি অন্যটির সঙ্গে দু-তিনবার ধাক্কা খেল। একসময় থেমে যায়। শাহানা নামের ডিমটার মোটা দিকটার মুখোমুখি রাশেদ নামের ডিমটার সরু দিক। যেন রাশেদ পালানোর জন্য প্রস্তুত। শাহানার মনে হয়, রাশেদ বিছানায় শুয়ে বলবে, ‘বাচ্চাটা ফেলে দাও। একজন মানুষকে কষ্টের পৃথিবীতে আনার কী দরকার?’
ডিমটা থেকে রাশেদের নাম মুছে ফ্রিজে রেখে দিল শাহানা। রাশেদ কালো আর লাল কালির মিশ্রণে একটি ভীতু ডিম।






