মানুষ সাগর দানবের মতো সমুদ্রে চষে বেড়ায়, ঈগলের মতো বাতাসে ভেসে বেড়ায়; মানুষের কণ্ঠ এক মুহূর্তে পুরো দুনিয়া ঘুরে আসে, তার চোখ স্বর্গ ভেদ করে যায়, সে পর্বত নাড়িয়ে দেয়, ঊষর মরুভূমিতে ফুল ফোটায়; উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে তার নিশান ওড়ায়, তার পরও প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ সামান্য মশার কামড়ে মারা যায়— পল এফ. রাসেল, ১৯৩১
সংক্রামক রোগ বিভিন্ন যুগে মানুষের জীবন, জনমিতি, ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে। ইতিহাসবিদরা যখন সংক্রামক রোগের ইতিহাস আলোচনা করেছেন, তখন তারা ম্যালেরিয়ার কথা খুব একটা আলোচনা করেননি। বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বসন্ত, হাম, প্লেগ। এটা সত্য যে লাশের পাহাড় এই রোগগুলোই বেশি তৈরি করেছিল কিন্তু ম্যালেরিয়াও আমাদের লোকালয়কে খুব সূক্ষ্ম কিন্তু একই রকম দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসহকারে বদলে দিয়েছে। সাব সাহারান আফ্রিকার জাতিগত বিন্যাস যেমন বদলেছে এ ম্যালেরিয়ার কারণে, আমেরিকার জনবসতির ধরন বদলেছে, এমনকি গ্রেট ব্রিটেনের সৃষ্টিতেও ভূমিকা আছে।
আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ার আক্রমণ নিয়ে স্থানীয় ও ইউরোপীয় ধারণায় তাত্পর্যপূর্ণ ফারাক দেখা যায়। অ্যান্টি-কলোনিয়াল চেতনায় ম্যালেরিয়া আফ্রিকার এক দুষ্ট আত্মীয়। এবং শ্বেতাঙ্গ বিজ্ঞানীরা কোনোমতেই ত্রাণকর্তা নয়। উপনিবেশবাদবিরোধী আফ্রিকীয় চিন্তায় বরং ম্যালেরিয়াকে আফ্রিকার রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখা হয়। এ আলোচনায় প্রবেশ করার আগে স্মরণ করা যেতে পারে একটি বিখ্যাত আফ্রিকান প্রবাদ— ‘যতদিন না সিংহ তার নিজের ইতিহাস লিখবে, ততদিন শিকারের গল্পে শিকারিকেই মহিমান্বিত করা হবে।’ আরো স্মরণ করা যেতে পারে আমেরিকার স্থানীয় আদিবাসীদের নির্মূলে শ্বেতাঙ্গদের ছড়িয়ে দেয়া মহামারীর কথা। ২০০৫ সালে ক্যামেরুনের রাজধানী আনদেইতে ম্যালেরিয়া বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ সম্মেলনের মঞ্চে হঠাৎ এক স্থানীয় সাংবাদিকের আগমন ঘটে, তার নাম পিটার অশোক। নিজের ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হওয়ার গল্প দিয়ে তিনি কথা শুরু করেন। তারপর তিনি বলেন, ম্যালেরিয়া আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে। এ প্রসঙ্গ তিনি টেনে আনেন উনিশ শতকের মাদাগাস্কারের এক রাজার কথা। সেই রাজা গর্ব করে বলেছিলেন, কোনো আক্রমণকারী তার দেশ দখল করতে পারবে না, কারণ তার দেশে আছে হাজো (দুর্ভেদ্য বন) ও টাজো (ম্যালেরিয়া জ্বর)। তিনি আফ্রিকায় আক্রমণকারী রুখে দেয়ার জন্য ‘জেনারেল অ্যানোফিলিস’-এর প্রশংসা করেন। এরপর উপস্থিতদের দিকে তাকিয়ে হেসে পিটার বলে ওঠেন, ‘আর এখন তোমরা বিজ্ঞানীরা আবার আফ্রিকাকে নিতে চাও!’ কেউ পিটারের কথার জবাব দেননি, বিজ্ঞানীদের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণকারীদের সঙ্গে তুলনা করাটা সবাই ভালোভাবে নিতে পারেননি। কিন্তু তার কথা থেকে যে বার্তাটি সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল তা হলো, ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক অনুজীব প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের তলোয়ারের তলায় থাকা সবাই নিজেদের একেবারে দুর্ভাগা মনে করেন না। ম্যালেরিয়ার সঙ্গে বসবাস সহজ কাজ নয়, কিন্তু যিনি একবার শিশু বয়সে ফ্যালসিপেরাম দিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন, তিনি ম্যালেরিয়ার অন্য জীবাণুগুলো থেকে সুরক্ষা পেয়ে যান। প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম বাইরের মানুষের জন্য জীবনঘাতী হলেও স্থানীয়দের আর মারতে পারে না।
বান্টুভাষী কৃষকরা পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা মূলত আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের শরীরের প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম প্রতিরোধী ক্ষমতা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বীরা ম্যালেরিয়ায় ধ্বংস হয়ে গেলেও তারা টিকে ছিল এবং বিস্তার লাভ করে। ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে যে ৩০০ বা এর বেশি ভাষার বৈচিত্র্য দেখা যায়, সেটার উদ্ভব আজ থেকে তিন বা চার হাজার বছর আগে এবং এসব ভাষায় মূল উৎস বান্টু ভাষার প্রাথমিক রূপ।
একসময় আফ্রিকার ভাষা বৈচিত্র্য এখনকার চেয়ে বিস্তৃত ছিল। শিকারি-যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর অবশিষ্টরা অবান্টু ভাষায় কথা বলে। তারা আফ্রিকার সমাজে প্রান্তিক মানুষ। তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। কয়েক হাজার বছর ধরে বান্টুভাষী কৃষিজীবীরা আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং শিকারি-যাযাবরদের প্রান্তে ঠেলে দেয়। এ প্রভাব বান্টুভাষীরা কীভাবে গড়ে তুলেছিল? প্রশ্নটির জবাব খোঁজা জরুরি। কেউ বলেন বান্টুরা ভালো যোদ্ধা ছিল, তাদের খাদ্যের নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু এর কোনোটাই তাদের প্রবল এবং ধারাবাহিক আধিপত্য বৃদ্ধির ব্যাখ্যা নয়।
আজকের দিনে বিজ্ঞানীরা জানেন, ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধী ক্ষমতা শিকারিদের তুলনায় কৃষক বান্টুদের অনেক বেশি ছিল। এর কারণও ছিল, কৃষকরা কোনো জায়গায় স্থায়ীভাবে বাস করত; ফলে তারা নিয়মিতভাবে অ্যানোফিলিস গ্যাম্বি মশার দংশনে ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতো। এতে অনেক নবজাত, শিশু এবং প্রথমবারের মা মারা যেত। কিন্তু যে মায়েরা গর্ভাবস্থায় টিকে যেত এবং যেসব শিশু মারা যেত না, তাদেরকে পরবর্তীতে কোনো ধরনের ম্যালেরিয়া কাবু করতে পারত না। হয়তো অসুস্থ হত, কিন্তু তারা মারা যেত না।
শিকারিরা যাযাবর জীবনযাপন করত, তারা কোনো জায়গায় স্থায়ী হতো না। শুষ্ক মৌসুমে অ্যানোফিলিস গ্যাম্বি তেমন দেখা যেত না। ফলে যাযাবররা ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় তেমন একটা আক্রান্ত হতো না। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী বান্টু কৃষকরা যখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তখন তাদের শরীরের মাধ্যমে ফ্যালসিপেরাম জীবাণুও মশার মাধ্যমে ছড়াতে থাকে। যাযাবররা যখন বান্টুদের বসতির কাছে আসত, তখন মশার কামড়ে তারা ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতো এবং সহজেই মারা যেত। এভাবে অনেক আফ্রিকান সম্প্রদায় যেমন— খোইসান, পিগমি, কুশাইট এবং মান্দি ও আটলান্টিকভাষী সমাজ ক্ষয়ে যায়। এবং যারা টিকে ছিল, তারা ক্রমেই মহাদেশের প্রান্তে চলে যায়। এখনো এসব জাতির বাস আফ্রিকা মহাদেশের প্রান্তীয় অঞ্চলে। এ ম্যালেরিয়াবাহী মশাই ছিল বান্টুদের সেনাবাহিনী। বান্টুদের সঙ্গে অন্য কোনো জাতিই যুদ্ধ করে টিকতে পারত না, কারণ যুদ্ধের আগে মশার কয়েকটি কামড়ই তাদের জীবন নাশ করত।
বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ ম্যালেরিয়ায় ভুগছে পাঁচ লাখ বছর ধরে এবং এখনো আক্রান্ত হচ্ছে। ১০০ বছরের বেশি হলো মানুষ এ রোগের কারণ ও প্রতিরোধের উপায় আবিষ্কার করেছে। কিন্তু ম্যালেরিয়া নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স আফ্রিকা থেকে ১০ হাজার বছর আগে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। পাঁচ হাজার বছর পরে আবার দেখা দেয় মিসর, গ্রিস, ভারত ও চীনে। পাঁচ হাজার বছর পুরনো মিসরীয় ও নুবিয় মমিতে প্লাজমোডিয়াম অ্যান্টিজেনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। চার হাজার বছর আগের সুমেরীয় ও মিসরীয় লেখায় ম্যালেরিয়া জীবাণুর অস্তিত্বের কথা জানা যায়। প্রাচীন সভ্যতার মানুষ ম্যালেরিয়ার বর্ণনা এত নিখুঁতভাবে দিয়ে গেছে যে, এর পরিচয় নিশ্চিত হতে ইতিহাসবিদদের কোনো বেগ পেতে হয়নি। প্রাচীন গ্রিকরা ম্যালেরিয়াকে মৌসুমি দুর্যোগ বলে গণ্য করত, যা মূলত ফসল তোলার সময় হাজির হতো। চিকিৎসাবিদ হিপ্পোক্রেটস লিখেছেন, জলাশয়ের কাছে এ রোগ দেখা যায়। হোমারের লেখাতেও ম্যালেরিয়া জ্বরের ইঙ্গিত রয়েছে। প্রাচীন চীনারা ম্যালেরিয়াকে জ্বরের রাজা বলে অভিহিত করত। ভারতে সাড়ে তিন হাজার বছর আগেই ম্যালেরিয়া ‘রোগের রাজা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বৈদিক ঋষিরা ম্যালেরিয়ার জ্বরের বিবরণ দিয়ে গেছে।
যিশুর জীবনকালে প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স ইউরোপের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছিল। এরপর মধ্যযুগের প্রাথমিক কালেই উত্তর ইউরোপে প্রবেশ করে। ষোড়শ শতক নাগাদ প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স ইউরোপ ও এশিয়ায় শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে এবং আফ্রিকা চলে যায় প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের দখলে। এরপর আসে এজ অব ডিসকভারির যুগ। ইউরোপ থেকে দুনিয়া আবিষ্কারের নেশায় দলে দলে অভিযাত্রী, বণিকরা সাগর চষে বেড়ানো শুরু করেন। তাদের অনেকের রক্তে ম্যালেরিয়ার পরজীবী বাসা বেধেছিল। ফলে ম্যালেরিয়ার নিধন ক্ষমতা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে হানা দিতে শুরু করে অনায়াসেই।
আফ্রিকার মানুষের শরীর ফ্যালসিপেরাম সহ্য করতে পারত, কিন্তু ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের শরীর সেটা পারত না। তাই অফ্রিকা অভিযানে গিয়ে দলে দলে ইউরোপীয় অভিযাত্রী মরতে শুরু করে। ১৫৭০-এর দশকে ইউরোপীয় সেনাবাহিনী আফ্রিকার স্বর্ণখনিগুলো দখলে নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের আক্রমণে দলে দলে সেনা মৃত্যুমুখে পতিত হয় আর ঘোড়াগুলো ঘুমের ব্যারামে আক্রান্ত হয়। ইউরোপীয়দের পরাজয়ে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া আফ্রিকানদের লোহার অস্ত্রশস্ত্র। ১৫৬৯ সালে জাম্বেজি নদী পর্যন্ত পৌঁছানো পর্তুগিজ মিশনারি এবং সেনাদের একটি দল প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ১৮২৫ সালে গাম্বিয়ায় অভিযানে যাওয়া একটি ইউরোপীয় অভিযাত্রী দলের ১০৮ জনের ৮৮ জনই ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। ম্যালেরিয়া এবং আফ্রিকার অন্যান্য রোগশোক প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ইউরোপীয়দের শরীরে ছিল না। তাই কোনো ইউরোপীয় দল আফ্রিকায় পা রাখার এক বছরের মধ্যে তাদের জনবল অর্ধেক হয়ে যেত। ইতিহাসবিদ ফিলিপ কার্টিন তার এপিডেমিওলজি অ্যান্ড দ্য স্লেভ ট্রেড প্রবন্ধে লিখেছেন, রোগশোকে মৃত্যুর কারণে ইউরোপীয়রা তখন আফ্রিকায় বিপুল দখলদারিত্ব কায়েম করতে পারেনি। ব্রিটিশরা এমনকি তাদের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদেরও আফ্রিকায় নির্বাসনে পাঠাত না। আমেরিকান কলোনিগুলো হাতছাড়া হওয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিতর্ক হয়েছিল সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের গাম্বিয়ায় নির্বাসনে পাঠানোর ব্যাপারে। কিন্তু সেই নির্বাসনের অর্থ হতো মৃত্যুদণ্ড, তাই পার্লামেন্ট এ নির্বাসনের ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব দেখায়। তখন অপরাধীদের আফ্রিকা নয় বরং অস্ট্রেলিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো শুরু হয়।
বেশির ভাগ বিজ্ঞানী মনে করেন ইউরোপীয়রা হাজির হওয়ার আগে হাজার বছর ধরে আমেরিকার আদিনিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা ম্যালেরিয়ামুক্ত ছিল। ১৬০০ শতকের শুরুতে ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপনকারীরা যখন আমেরিকার মাটিতে পা রাখতে শুরু করে, তখন তাদের অনেকের রক্তেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছিল। অন্যদিকে আমেরিকা ভূখণ্ডে ছিল প্রচুর জলাশয়, জলা, বিল আর ছিল মশা। এসব মশার মধ্যে অ্যানোফিলিস প্রজাতিটিও ছিল, যা মূলত ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে। ইউরোপীয়রা পৌঁছানোর পর আমেরিকাতে শুরুর দিকে রেড ইন্ডিয়ানরা ম্যালেরিয়া নয়, বরং হাম ও বসন্ত দিয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে হাম ও বসন্তের জীবাণু খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না এবং আক্রমণের পর শিগগিরই কোনো এলাকা থেকে হারিয়ে যায়। ১৬ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় সেটলাররা রেড ইন্ডিয়ানদের হটিয়ে দিয়ে শুষ্কভূমি দখল করে। কিন্তু সেটা ছিল নৌযাত্রার কাল। তাই মশা অধ্যুষিত জলপথ থেকে দূরে থাকাটা সম্ভব ছিল না। এই শতকের শেষভাগে এসে ভাইভ্যাক্স ম্যালেরিয়ার আমেরিকার স্থানীয় সংক্রামক রোগে পরিণত হয়। ১৬৮৭ সালে ভার্জিনিয়ার এক সেটলারের লেখায় পাওয়া যায় ম্যালেরিয়া তখন সেখানে নিত্যদিনের উপদ্রবে পরিণত হয়েছে।
আমেরিকা দখল করার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয়রা সেখানে চিনি, তামাকের প্লানটেশন গড়ে তোলে। এসব প্লানটেশনে কাজের জন্য তারা আফ্রিকা থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের দাস হিসেবে ধরে আনত। দাস ব্যবসার সেই নির্মম ইতিহাস আমরা সবাই কমবেশি জানি। আগেই আলোচনা করা হয়েছে, ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় আফ্রিকার মানুষ টিকে যেতে পারত, কিন্তু ইউরোপীয়দের সেই সহ্যশক্তি ছিল না। এ ঘটনা আফ্রিকা থেকে দাস নিয়ে আসার প্রেক্ষিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ক্যারোলাইনার ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোয় বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এসব এলাকার আবহাওয়া ও মশা উভয়ই ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়াতে অনুকূল ছিল। আফ্রিকানদের রক্ত থেকে ম্যালেরিয়ার জীবাণু স্থানীয় মশার মধ্যে প্রবেশ করে। তারপর সেগুলো যখন ইউরোপীয়দের কামড়াত, তখন তারা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে শুরু করে এবং এই আক্রমণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইউরোপীয়দের ভবলীলা সাঙ্গ হতো। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে ১৬৫০-এর দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যে সংখ্যায় শিশু গির্জায় ব্যাপ্টাইজ হতো, তার চেয়ে ৩ গুণ প্রাপ্তবয়স্ক মারা যেত ম্যালেরিয়ায়।
১৬৮৫ সালে একদল আইরিশ সেটলার কাঠের ব্যবসা করতে ক্যারোলাইনায় হাজির হয়। কিন্তু এসেই তারা জ্বরের কবলে পড়ে। ২৯ জন মারা যায়। কিছুদিন পরে সেখানে ১৫০ জনের একটি স্কটিশ দল এসে পৌঁছায়, কিন্তু তারাও পরিস্থিতি দেখে সেখানে বসবাসের আশা ত্যাগ করে।
১৬৮৭ সালে ক্যারোলাইনা থেকে দুজন তরুণ বোস্টনে হাজির হন। তারা জানান, ক্যারোলাইনার মতো অস্বাস্থ্যকর জায়গা তারা আর দেখেননি। ম্যালেরিয়াই ছিল ক্যারোলাইনার সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি। একটি প্রবাদও তৈরি হয়েছিল, ‘কেউ যদি আগেভাগে মরতে চায়, তাহলে তার ক্যারোলাইনায় যাওয়া উচিত।’ আর এক জার্মান যোগ করেছিলেন, ক্যারোলাইনা বসন্তকালে স্বর্গ, গ্রীষ্মে নরক আর শরত্কালে হাসপাতালে পরিণত হয়।
প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামে আক্রান্ত এলাকাগুলোয় ইউরোপীয় শিশুদের মৃত্যুহার ছিল অনেক বেশি। দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় জন্ম নেয়া ইউরোপীয় আমেরিকান শিশুদের ৮৬ শতাংশ তাদের বয়স বিশে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঘটত আগস্ট থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে, কারণ এ সময়ই ম্যালেরিয়ার মশা কামড়াত।
বাস্তুতন্ত্র ম্যালেরিয়ার বিকাশে ভূমিকা রাখে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ম্যালেরিয়া জীবাণুর বাহক মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ফলে মানুষের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। প্রাচীনকালের ইতিহাস ঘাঁটলেও এ পরিস্থিতির দেখা পাওয়া যায়। রোমান সাম্রাজ্যকে উদাহরণ হিসেবে নেয়া যায়। টাইবার নদীর তীরে রোম নগরীর পত্তন হয়েছিল ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এ নগরী মানুষের পাশাপাশি ইউরোপীয় ম্যালেরিয়ার অন্যতম বাহক অ্যানোফিলিস আট্রোপার্ভাসের বসতি হয়ে ওঠে। টাইবার নদী দুই কূল ভাসিয়ে নিয়ে যেত। পানি নেমে গেলে অনেক নিচু জায়গায় পানি জমে থাকত। এসব জলমগ্ন জায়গায় মশার বিস্তার হতো। অন্যদিকে রোমানদের সংস্কৃতিতে সবজির বাগান, ঝরনার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। এগুলো সবসময়ই মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে ভূমিকা রাখত। একদিকে ছিল প্রজননের জায়গা, অন্যদিকে কামড়ানোর জন্য প্রচুর নগরবাসী, ফলে রোম নগরী অ্যানোফিলিস আট্রোপার্ভাসের পছন্দের জায়গায় পরিণত হয়। ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ রোম নগরীতে অ্যানোফিলিস আট্রোপার্ভাস মশার জন্য স্থায়ী বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে। মশা নিয়মিতভাবে রোমানদের শরীরে প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স প্রবেশ করাত। ধীরে ধীরে রোমানদের শরীরও ভাইভ্যাক্স সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছিল। বান্টুরা যেমন এ সহ্যক্ষমতার কারণে আধিপত্য বিস্তার করেছিল এবং ইউরোপীয়রা আফ্রিকা জয় করতে গিয়ে বাধা পেয়েছিল, তেমনি সুবিধা পেয়েছিল রোমানরাও। রোমে প্রবেশ করতে হলে ম্যালেরিয়ামুক্ত উত্তর ইউরোপের সেনাদের ম্যালেরিয়া বহনকারী মশার আবাস জলাশয়গুলো পার হতে হতো। এতে তারা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রোমে পৌঁছানোর আগেই মারা যেত। কবি গডফ্রে অব ভিটারবো লিখেছেন, ‘তলোয়ার দিয়ে না পারলে রোম জ্বর দিয়ে নিজেকে রক্ষা করত।’
কিন্তু ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক নানা পরিবর্তনে রোমে অ্যানোফিলিসের নতুন প্রজাতি আবাস তৈরি করে। এবং পঞ্চম শতকে রোমে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের ব্যাপক আক্রমণ শুরু হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক আছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শত্রুদের উন্নত প্রযুক্তি, মহামারী— কোনটা ছিল কারণ? নিশ্চয়ই অনেক কারণের সমন্বয় ছিল। কিন্তু ম্যালেরিয়ারও যে একটা ভূমিকা ছিল, সেটাও নিশ্চিত। যে ম্যালেরিয়া একসময় রোমকে রক্ষা করেছে, সেটাই তার পতনের সময় মহামারী হয়ে রোমানদের মৃত্যু নিশ্চিত করছিল।
এবার আধুনিক কালের একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। আমেরিকার বিখ্যাত গৃহযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ম্যালেরিয়ার মহামারী দেখা দিয়েছিল। গৃহযুদ্ধে ইউনিয়ন আর্মির ১৩ লাখ সদস্য ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল, যার মধ্যে মারা যায় ১০ হাজার। যুদ্ধের প্রয়োজনে পরিখা খনন, বাঁধ ধ্বংস করা, রাস্তা নির্মাণ বাস্তুতন্ত্রে গুরুতর পরিবর্তন এনেছিল। নতুন পরিস্থিতি ম্যালেরিয়ার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। যেমন— পরিখায় পানি জমে যাওয়া, ছোট গর্তও ডোবায় পরিণত হওয়া প্রভৃতি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ম্যালেরিয়ার আগ্রাসন অব্যাহত থাকে। কারণ জীবাণুবাহী সেনারা বাড়ি ফিরলে তাদের মাধ্যমে স্থানীয় এলাকায় ম্যালেরিয়া ছড়ায়।
এ সহস্রাব্দের শুরুতে ভারতের মুম্বাই শহরে বিল্ডিং বুম সৃষ্টি হয়েছিল। এ সময় অসংখ্য নতুন বহুতল ভবন গড়ে ওঠে। এসব ভবন নির্মাণে দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিকরা এসেছিল। আর ভবন নির্মাণস্থলে ছোট ছোট গর্তে পানি জমে থাকত। ফলে মশার প্রজনন গতি পায় এবং বিভিন্ন এলাকার শ্রমিকদের দেহে থাকা ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়াতে শুরু করে। বর্ষায় মুম্বাইতে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ২০০৬ সালে শহরটিতে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আগের সময়ের চেয়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ২০০৮ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মুম্বাইতে ১৪ হাজার ম্যালেরিয়ার আক্রান্তের হিসাব পাওয়া যায়। এ পরিস্থিতির জন্য ভারতীয় এপিডেমিওলজিস্ট কিশোর হারুগোলি মুম্বাইয়ের নির্মাণ খাতে বাড়বাড়ন্তকেই দায়ী করেন।
আমাদের ঢাকা শহরের দিকে চোখ বোলালে মশা ও মশাবাহিত জ্বরের বিস্তার এবং নগরায়ণের নানা ত্রুটি দেখতে পাই। ঢাকার পানি নিষ্কাশন সমস্যা প্রকট। মুম্বাইয়ের মতো এখানেও প্রচুর ভবন নির্মিত হচ্ছে। ফলে মশা বংশবিস্তারে অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত কয়েক বছরে ডেঙ্গু এবং চিকনগুনিয়ার আক্রমণ দেখা যায়। এ বছরও ডেঙ্গুতে ১০-১২ জনের মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান দুনিয়ায় ম্যালেরিয়ার নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে পেরুর কাছে সাগরে গরম স্রোত বা এল নিনোর আবির্ভাব ঘন ঘন হচ্ছে। এল নিনোর কারণে ব্রাজিল, আফ্রিকার দক্ষিণাংশ, দক্ষিণ এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়ায় খরা হয়। আর পেরু, কলাম্বিয়া, একুয়েডর ও বলিভিয়ায় হয় অতিবৃষ্টি। কেনিয়ার উচ্চভূমিতে ম্যালেরিয়ার অস্তিত্ব ছিল না। সাগর থেকে হাজার ফুট উপরে ম্যালেরিয়ার বাহক মশা জীবিত থাকতে পারে না। কিন্তু ১৯৯৮ সালে এল নিনোর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং মশার আক্রমণ শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ম্যালেরিয়া দেখা দেয়। স্থানীয়দের শরীরের ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের কোনো শক্তি ছিল না। তাই প্রচুর প্রাণক্ষয় হয়।
রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার সময় প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স জীবাণু ব্রিটেনে হাজির হয়। লন্ডনের জলাশয়গুলো এ জীবাণুর আবাস হয়ে ওঠে। রবিনসন ক্রুশোর লেখক ড্যানিয়েল ডিফো বলেছিলেন তিনি কেন্ট ও এসেক্সে এমন অনেক পুরুষের দেখা পেয়েছিলেন, যাদের এক ডজনের বেশি স্ত্রী ম্যালেরিয়ায় মারা গেছে। উনিশ শতক নাগাদ ব্রিটিশরা ম্যালেরিয়ার প্রতিরোধ করার উপায় বুঝে গিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল এ রোগ জমে থাকা পানির সঙ্গে জড়িত, তাই শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাদের অবস্থানে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কোথাও ডোবা ভরাট করা হয় আবার কোথাও বদ্ধ পানিতে পেট্রল ছিটানো হয়। কিন্তু তাদের আচরণ ঠিক উল্টো ছিল তাদের উপনিবেশ ভারতবর্ষে। ম্যালেরিয়ার বিস্তারের বিষয়টি জানা থাকলেও তারা বাঁধ নির্মাণ করে সেচ ব্যবস্থা তৈরি করে। ব্রিটিশদের রফতানি পণ্য হিসেবে নীল, আফিম, ভুট্টা, আখ, তুলা উৎপাদনে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ভারতে স্থানীয় কৃষকদের নিজস্ব সেচ এবং পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, যা ম্যালেরিয়ার মশাকে প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিরোধ করত। কিন্তু এই নতুন সেচ ব্যবস্থা সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়, উল্টো মশার বিস্তারে সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা টি. ই. ডেম্পস্টার তার প্রতিবেদনে বলে, নতুন সেচ ব্যবস্থা প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, এমন গ্রামগুলোয় ম্যালেরিয়ার আক্রমণ শুরু হয়। ১৮৯৪ সাল নাগাদ জ্বরে ৫০ লক্ষ ভারতীয় মারা যায়, যার মধ্যে ২৫ শতাংশই ছিল ম্যালেরিয়া। ১৯০৮ সালে পাঞ্জাবে ম্যালেরিয়া মহামারী আকারে দেখা দেয় এবং কয়েক মাসের মধ্যে তিন লাখ মানুষের প্রাণ হরণ করে। সে আমলে তিন লাখ মানুষ মানে মোট জনসংখ্যার হিসেবে বিপুলসংখ্যক মানুষ।
১৯২৯ সালে লিগ অব নেশনস কমিশন ভারতে ম্যালেরিয়া দমনে ব্রিটিশদের ব্যর্থতার সমালোচনা করা হয়। এর অনেক আগে ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেল সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতীয়দের প্রতি যত্নবান নই।’
নগর সভ্যতায় দুনিয়ার মানুষ আজো ম্যালেরিয়ার মহামারীর ঝুঁকিতে আছে। তার ওপর যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এতক্ষণ আমরা দেখেছি ম্যালেরিয়া ও মশার প্রভাবে মানব সভ্যতার ইতিহাসের নানা বাঁক বদল। মধ্যযুগের পর থেকে মানুষের কর্মকাণ্ডই ম্যালেরিয়ার বিস্তারে মূল ভূমিকা রেখেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ইউরোপে বা অন্য যেসব স্থানে এখন ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব নেই, সেসব জায়গাতেও সামান্য কারণেই অ্যানোফিলিস মশা ও ম্যালেরিয়ার জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। কে জানে এই জ্বর আর মশার পাঁচ লাখ বছরের শাসন কবে শেষ হবে!
সূত্র: দ্য ফিভার: হাউ ম্যালেরিয়া হ্যাজ রুলড হিউম্যানকাইন্ড ৫,০০,০০০ ইয়ারস, সোনিয়া শাহ






