আমাদের দেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা যেমন বারবার মত ও পথ পরিবর্তন করেন, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য চরম বাম থেকে ডানে যেতেও দ্বিধা করেন না, সেখানে আহমদ রফিক আজীবন একই নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী হলেও তিনি ভিন্নমতের প্রতি বরাবরই সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এসেছেন। তার জন্ম ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। সে হিসাবে নব্বইয়ের কোটায় পা রেখেছেন। এ বয়সেও মানবকল্যাণে অবিচল থাকা এবং লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া আমাদের দেশে বিরল ঘটনাই বটে।
আহমদ রফিক যখন স্কুলের ছাত্র, তখন ভারতবর্ষ ভাগ হয়। তিনি কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠনে যোগ না দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক স্টুডেন্ট ফেডারেশনের মধ্যেই নিজের ঠিকানা খুঁজে নেন। দেশ ভাগের পর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, চিকিৎসক হবেন সেটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তার কর্মপরিসর আরো বাড়িয়ে দেয়। তখন আহমদ রফিক শেষ বর্ষের ছাত্র। আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। তাকে বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়। তিনি ১৯৫৮ সালে এমবিবিএস পাস করেন।
ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন ধীমান প্রাবন্ধিক, প্রতিশ্রুতিশীল কবি এবং কুশলী সম্পাদক হিসেবে। চিকিৎসা তার পেশা হলেও নেশা ছিল সাহিত্য সাধনা। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। কিন্তু পার্টির অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হতে পেরে রাজনীতিতে আর সক্রিয় থাকেননি। লেখনীই হয়ে ওঠে দেশ ও মানবসেবার প্রধান হাতিয়ার। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার নিরলস গবেষণা দুই বাংলার বোদ্ধা মহলেই প্রশংসিত ও সমাদৃত।
কবিতা দিয়ে তার সাহিত্যচর্চা শুরু হলেও পরবর্তীকালে মনোনিবেশ করেন মননশীল রচনায়। তার উল্লেখযোগ্য বই— শিল্প সংস্কৃতি জীবন, আরেক কালান্তরে, বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাত্পর্য, রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প, জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা, রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর, একাত্তরে পাক বর্বরতার সংবাদভাষ্য, রবীন্দ্রনাথ এই বাংলায়, মৃত্যুহীন বিপ্লবী চে গুয়েভারা, দেশবিভাগ: ফিরে দেখা প্রভৃতি।
আহমদ রফিক শুধু লেখেননি; সংগঠন করেছেন, অনেক লেখকও তৈরি করেছেন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন নাগরিক নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা, যাতে বাম ও প্রতিবাদী চিন্তার ছাপ ছিল। এ পত্রিকায় তার সহযোগী হিসেবে ছিলেন আবদুল আলীম চৌধুরী (একাত্তরের শহীদ), শাহাবুদ্দীন আহমদ, আহমদ কবির, জিয়াউল হক, পরে এসে যুক্ত হন সৈয়দ আবুল মকসুদ।
‘নাগরিকের আসা যাওয়া’ শীর্ষক স্মৃতিচারণায় আহমদ রফিক লিখেছেন,
‘পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকের কথা। আমাদের রাজনীতি তখন আঞ্চলিক ও রাষ্ট্রীয় উভয় স্তরেই চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার পরিণতি বহন করে চলেছে। এবং এর প্রভাব সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও কম পড়েনি। ...লেখাজোখার পরিকল্পনা নিতে নিতে মনে হলো একটা কাগজ বের করলে কেমন হয়। সাহিত্যের কাগজ। মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক। মেডিকেল কলেজের প্রথম দিকে আহমদ কবির ও আলীম চৌধুরী পাক্ষিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে ভোলে না। মনে করিয়ে দেয় মাসিক বা ত্রৈমাসিক পত্রিকা করার কথা। ...শেষ পর্যন্ত ভয়ে ভয়েই পরিকল্পনা একটা ছকে ফেলা গেল। এমনকি সেই সঙ্গে জুতসই আধুনিক ধরনের নামও। সমাজ ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট মনে রেখে।’
পত্রিকার নাম কেন নাগরিক রাখা হলো, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আহমদ রফিক। তার ভাষায়, ‘শহর ঢাকার চেহারা তখন বড় একটা আধুনিক না হলেও তার চরিত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। এক-পা, দু-পা করে সেদিকেই তার যাত্রা শুরু। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা একটা জমজমাট হয়ে ওঠেনি। গাছগাছালি ও ঝোপঝাড়ের আড়ালে দিলকুশা নবাব বাড়িটা তখনো শেওলা ধরা আভিজাত্য নিয়ে টিকে আছে। সেই উঠতি ঢাকার বর্ধমান নাগরিক চরিত্রের কথা মনে করিয়ে পত্রিকার নাম দাঁড়াল নাগরিক।’
আহমদ রফিক এ পত্রিকার পরিচালক হলেও রাজনৈতিক কারণেই তার নামে ছাড়পত্র পাওয়া গেল না। সরকারের খাতায় লাল কালিতে তার নাম লেখা। অতএব কৌশল হিসেবে কস্মিনকালেও সাহিত্যের ত্রিসীমানায় দাঁড়াননি এমন একজন— বোরহানউদ্দীন ভূইয়ার নামে ডিক্লারেশনের জন্য আবেদন করে সদুত্তরও পাওয়া গেল। নানান অসুবিধা সত্ত্বেও নাগরিক তার সাহিত্য বৈশিষ্ট্য হাতে তুলেছিল প্রধানত প্রবন্ধ ও সমালোচনাটা বিভাগের মাধ্যমে। তখনকার মননশীল লেখক-পাঠক মহলেও এর কদর বেড়ে যায়। কেন? আহমদ রফিক আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, ‘আমরা লাইনচ্যুত হইনি। নিজেদের রচনার ওপর লেখা কঠোর সমালোচনাও আমরা পত্রস্থ করেছি।’ এ কারণেই নাগরিক হয়ে উঠেছিল ঢাকা তথা বাংলাদেশের নাগরিক সংস্কৃতির দর্পণ ও মুখপত্র। সমকালীন প্রায় সব লেখকই এ পত্রিকায় লিখেছেন।
আহমদ রফিক পত্রিকার স্বত্বাধিকারী হলেও তার নাম ছাপা হতো না। পরবর্তীকালে সহযোগী সম্পাদনা পরিষদে তার নামটি গুঁজে দেয়া হয়। নাগরিকের সঙ্গে সৈয়দ আবুল মকসুদের যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে আহমদ রফিক লিখেছেন, ‘মকসুদ নাগরিকের সান্নিধ্যে প্রথম আসে কুকুর হইতে সাবধানতা নিয়ে। ...প্রয়োজনীয় দরজাটি নাগরিকই তার জন্য খুলে দিয়েছিল। সাহিত্যের টানে সরকারি চাকরি ছেড়ে ভেসে পড়া, নাগরিক সম্পাদনার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া এবং চার বছর সেখানে লেগে থাকা ইত্যাদি আরো বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মকসুদের জীবনে পটপরিবর্তনের সূচনা। জীবনে প্রতিষ্ঠা ও সাহিত্যে সম্পৃক্ততার জন্য যে নিরন্তর লড়াই তাকে চালিয়ে যেতে হয়েছে, সে কাহিনী আর কেউ জানে না।’
সে সময়ের সাহসী লেখক আবদুল হকের বেশকিছু নিবন্ধ প্রকাশ করে নাগরিক। একটি প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘সাম্রাজ্যবাদের অন্তিম মুহূর্তে’। তিনি এমনভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন, যাতে তত্কালীন পাকিস্তানি শাসক ও তার অনুগ্রহপ্রার্থী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র উঠে আসে। তিনি লিখেছেন,
‘কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যত দিন তার পদানত দেশে ক্ষমতাসীন বলে তত দিন প্রবল প্রতিরোধের মুখেও তার মনে হয় সে সর্বেসর্বা, সেই পদানত জাতিকে শাসন করাই তার স্বাভাবিক অধিকার। প্রজ্ঞার উদয় না হওয়া পর্যন্ত এই রকম মনে হয় এবং প্রজ্ঞার উদয় কখনো হয়, কখনো হয় না। হলে সময় থাকতে কেটে পড়ে, না হলে শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত হয়।’
আবদুল হকের এ লেখায়ই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। সমকালীন লেখক-সংস্কৃতিসেবীদের কাপুরুষতা ও অদূরদর্শিতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লিখেছেন, ‘তথাপি শুধু বিদেশী শাসক নয়, কখনো কখনো কিছু সংখ্যক দেশী মানুষও ভরসা পায় না, তাদের দেশে একদিন স্বাধীনতার সূর্যের উদয় হবে। দাস মনোভাবাপন্ন কেউ কেউ স্থায়ীভাবে স্বদেশে চিরস্থায়ী বিদেশী শাসক কামনা করে। যেমন অবিভক্ত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা করত। ব্রিটিশরা তাদের স্বধর্ম এবং তাদের সময়ের রক্তের একাংশ ওই ব্রিটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয়দের অবদান, এ হিসাবে ব্রিটিশদের তারা মনে করত স্বজাতি। আর এ কারণে তারা অবিভক্ত ভারতে চিরস্থায়ী শাসন কামনা করত। স্বধর্ম রক্তের ঈষৎ সংমিশ্রণের জন্য স্বদেশে বিদেশী শাসন কামনা এই প্রথম নয়, শেষও নয়।’
এ নিবন্ধে আবদুল হক পাকিস্তানি শাসক ও তার অনুগত লেখক-বুদ্ধিজীবীদের নাম উল্লেখ না করলেও তার সতর্কবাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। তার এ লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। এর কয়েক বছরের মধ্যে পাকিস্তান ভেঙে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
আমরা পর্যালোচনা করলে দেখব, নাগরিকে প্রচলিত অর্থে বাম-ডান-মধ্য সব চিন্তার লেখকদের রচনা ঠাঁই পেত। সম্পাদক ও তার সহযোগীরা কখনো কখনো বিষয়বস্তুর চেয়ে লেখনশৈলীকে গুরুত্ব দিতেন। অন্তত শাহাবুদ্দীন আহমদের কৈফিয়ত পড়ে তা-ই মনে হয়। তিনি বিপরীত ও প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বা দলের লেখকদের সুন্দর ও সৌন্দর্যের উদ্বোধক রচনা ছাপার তাগিদ দিয়েছিলেন। নাগরিক রবীন্দ্র গবেষক আহমদ রফিক ও নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদকে একত্র করলেও পরবর্তীকালে তারা আর একসঙ্গে থাকেননি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তাদের পথ ভিন্ন হয়ে যায়।
গবেষক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ নাগরিকের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘স্বদেশের সংস্কৃতির গভীরে যাদের শিকড়, চিরায়ত মূল্যবোধে, বিশ্বাসে ও সত্যানুসন্ধানী চেতনায় যারা দীপ্যমান... এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর জীবনের জটিলতা, পঙ্কিলতা ও যন্ত্রণায় ভয় বিহ্বল না হয়ে গভীরতর বেদনায় যারা সৃষ্টিশীল, নাগরিক তাদেরই মুখপত্র।’
আর আহমদ রফিকের সাক্ষ্য, ‘নাগরিক নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর সীমিত জীবন যাপন করেনি। গোষ্ঠীবহির্ভূত স্বাধীন সম্বল জীবন যাপনই ছিল তার আকাঙ্ক্ষিত। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল সুস্থ এবং সুষ্ঠু সংস্কৃতির শিকড় ছোঁয়া রূপের নির্মাণে সহায়তা করা। অবশ্য আধুনিকতা ও প্রগতি চেতনার সমন্বিত সমযাত্রায়।’
পাকিস্তান আমলে তো নয়ই, বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিও আধুনিকতা ও প্রগতি চেতনায় সমন্বিত সমযাত্রায় প্রবাহিত হতে পেরেছে বলে মনে হয় না।






