ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে গতানুগতিক খাবারের পাশাপাশি মুখরোচক হিসেবে একসময় জায়গা করে নিয়েছিল ‘বাকরখানি’। এটা সেই মোগল আমলের কথা। কালের আবর্তনে এটি পরিণত হয়েছে পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যে। এর তুলনায় বেকারি শব্দটি শুনলে নতুন ধাঁচের কিছু খাদ্যপণ্যের কথা আমাদের মনে আসে। তবে সেটা কতটা নতুন? সে হিসাব নিয়ে বসলে আমরা কিন্তু দেখতে পাই, কিছু বেকারিও ঢাকাই ঐতিহ্য তৈরির পথ ধরে দিব্যি হেঁটে গেছে!

আজকের গল্পটা ঢাকার পুরনো সব বেকারির বিস্কুট নিয়ে। এ পর্যায়ে একটি তথ্য উল্লেখ করা যায়। বলা হয় ঢাকার প্রথম আমদানি পণ্যের দোকান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৭ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের বছর। এটি ছিল জিএন সিনকোর অ্যান্ড সন্সের দোকান। এখানে বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে বিস্কুটও বিক্রি হতো। এ থেকে ধারণা করা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ঢাকার মানুষের খাদ্য তালিকায় বিস্কুট যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

গল্পের শুরুটা করা যায় সুখস্মৃতি দিয়ে। ধরা যাক, সময়টা নব্বইয়ের দশক। ঢাকার যেকোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকারি আইটেম কেনার অভ্যাসের ব্যাপারে খোঁজ করতে গেলে দেখা যাবে সেই চিত্র আজকের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। আজকের ঢাকায় বেকারি আইটেমগুলো স্বাদ, গন্ধ আর বিচিত্রতায় অনবদ্য। পেশাদার হাতে এসব আজ কেবল খাদ্যপণ্যই নয়, কিছু ক্ষেত্রে যেন শিল্প! রূপে, গন্ধে, বর্ণময়তায় তারা অনন্য, এদের প্রস্তুত প্রণালিতে লেগেছে বিশ্বায়নের ছোঁয়া; হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আর এখানকার বেকারি পণ্যগুলোর সমন্বয় আজকাল ঘটেছে ঢাকার আধুনিক কফিশপগুলোয়। এক কাপ কফির সঙ্গে কিছু ব্রাউনি, চিজকেক বা ক্রোয়াস্যান্ট নিয়ে নিজের মতো করে সময় পার করতে পছন্দ করে তরুণ-তরুণীরা।

ঘরোয়া আয়োজন থেকে শুরু করে প্রতিদিনের খোরাক মেটানোর ক্ষেত্রেও বেকারি পণ্য আজ আর তেমন দুর্লভ নয়। জন্মদিনসহ নিত্যনতুন সব আয়োজনে কেকজাতীয় বেকারি পণ্যের জন্য ঢাকায় আছে অনেক আধুনিক কাস্টমাইজড বেকারি বা অনলাইনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বেকারি আইটেমের অনেক দোকান। কতই না বাহার এসব দোকানের পণ্যে!

তবে ঢাকায় যখন বেকারি আইটেম প্রচলিত হয়, তখন এ অঞ্চলের মানুষের সে ধরনের খাবারের অভ্যাস স্বভাবতই ছিল কম। ঢাকায় বেকারি পণ্যের যাত্রাটা নেহায়েত কম বর্ণময় নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ঢাকায় আমদানীকৃত পণ্যের দোকান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে দোকানে বিক্রি হতো বিস্কুট। তবে ভারতবর্ষে যে এর আগেও বিস্কুট খাওয়ার প্রচলন ছিল, তার প্রমাণ বিভিন্ন ঐতিহাসিকের লেখায় মেলে। মূলত মোগল ও ইউরোপীয়দের হাত ধরে যে বেকারি পণ্য এ অঞ্চলে এসে স্থান দখল করেছিল, কালের পরিক্রমায় আজ তার বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে—এ ঢাকা শহরেও।

১৬৬০ সালে বিখ্যাত ফরাসি ডাক্তার ও পরিব্রাজক ফ্রাঁসোয়া বার্ণিয়ের জানিয়েছেন, তিনি বাংলায় দেখেছেন ইউরোপীয় নাবিকদের সস্তা বিস্কুট সরবরাহ করা হয়। এটা তখন বাংলার বেশ সাধারণ চিত্র ছিল। অর্থাৎ, সপ্তদশ শতাব্দীতেই বাংলায় বিস্কুটের উৎপাদন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ওলন্দাজরা আনে তাদের জাহাজি বিস্কুট এবং শেষমেশ আধুনিক বিস্কুট হাজির হয় ব্রিটিশদের হাতে। কলকাতায় বিস্কুট জনপ্রিয় হয়েছিল ফরাসিদের মাধ্যমে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ইউরোপীয়, মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বেকারি স্থাপন ও বিস্কুট তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছিল। ১৮৪১ সালে কলকাতার ওল্ড কোর্ট স্ট্রিটে ডেভিড উইলন হোটেল কাম বেকারি স্থাপন করেন এবং নাম দেন অকল্যান্ড হোটেল। এর কয়েক বছর পরই ১৮৫০ সালে গ্রেট ব্রিটেনের ওয়েলসের একজন ব্যক্তি ঢাকায় এসে প্রতিষ্ঠা করেন প্রিন্স অব ওয়েলস বেকারি। এটি ঢাকার সবচেয়ে পুরনো বেকারি হিসেবে পরিচিত।

কালের পরিক্রমায় সমৃদ্ধ হয়েছে ঢাকার বেকারি, আর তৈরি হচ্ছে কত রকমের বিস্কুট! গত শতকের আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে বেকারি আইটেম বলতে ছিল কিছু ‘গতানুগতিক’ কেক, বিস্কুট বা পরিবারের সন্তানদের টিফিন। কিছু আবার কেবলই মেহমানদারিতে পানীয়ের পাশাপাশি পরিবেশনের জন্য বরাদ্দ থাকত।


কিন্তু সে সময়ের আয়নায় দেখলে অনন্যতায় তারা কি কোনো অংশে পিছিয়ে ছিল? তেমন কিন্তু একেবারেই নয়!

আশি কিংবা নব্বইয়ের দশকে হয়তো ঢাকাই পরিবারগুলো বেকারি পণ্য কিনতে তাদের পছন্দের স্থানীয় কিছু দোকানের শরণাপন্ন হতো। ‘মিলেনিয়াল’ প্রজন্ম বলতে যাদের বোঝানো হয়, তাদের শৈশবের সঙ্গে মিলেমিশে আছে ঢাকার কিছু কনফেকশনারির নাম। যেমন ধরা যাক, ইউসুফ কনফেকশনারি, সুইস বেকারি অথবা ডিসেন্ট পেস্ট্রি শপ। কারো কাছে আবার আনন্দ অথবা প্রিন্স বেকারিও সুপরিচিত। নেহায়েত কনফেকশনারি হলেও অনেকের কাছে এ বেকারিগুলো আবার আবেগের নামও বটে!

শৈশবের স্মৃতি থেকে বলতে পারি, কোনো জন্মদিনের আয়োজনে রঙ-বেরঙের ফুল বসানো খুবই সাধারণভাবে তৈরি আনন্দ কনফেকশনারির একটা চৌকোনা কেক বছরের পর বছর আক্ষরিক অর্থেই আনন্দে মাতিয়ে তুলেছে আগত অতিথিদের। এ মিলেনিয়ালদের রুচি আজ বদলে গেলেও ওই অতি সাধারণ আনন্দের স্মৃতিগুলো আজও যেন অমলিন!

প্রিন্স অব ওয়েলস

পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লক্ষ্মীবাজার। ব্যস্ত চলাচল ও কলরবে পরিপূর্ণ এলাকাটিকে স্কুলের এলাকা বললেও ভুল বলা হয় না। জনসন রোডের ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক পেছনে ফেলে লক্ষ্মীবাজারের পথ ধরে হেঁটে গেলে পেছনে ফেলে আসতে হয় বেশকিছু শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রয়েছে শতবর্ষ পুরনো হলি ক্রস চার্চ। এসব ফেলে আসলেই আর দশটা সাধারণ বেকারির দোকানের মতো দাঁড়িয়ে আছে ‘প্রিন্স অব ওয়েলস’। প্রথম দর্শনে বোঝার উপায় নেই, এটিকেই বলা হয় ঢাকার সবচেয়ে পুরনো বেকারি!

সূত্র অনুযায়ী, ১৮৫০ সালে গ্রেট ব্রিটেনের ওয়েলসের একজন ব্যক্তি ঢাকায় এসে বেকারিটি প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার প্রথম বিয়ের কেক ও বড়দিনের কেক তৈরি হতো এ বেকারিতেই। এমনকি, আজকের এ দিনেও স্থানীয় খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী বহু মানুষ বড়দিনের কেক বলতে এ প্রিন্সের কেকই বোঝেন। পরবর্তী সময়ে এর মালিক ঢাকা ত্যাগ করার সময় বেকারিটিকে কিনে নেন শেখ বুদ্ধু মিয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি। বুদ্ধু মিয়া এক সময় এ প্রিন্সেরই কর্মচারী ছিলেন। তাই বেকারি আইটেম তৈরির ক্ষেত্রে তিনি সেই প্রাচীন পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। এখন তার বংশধররাই এটিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

প্রিন্স অব ওয়েলস, স্থানীয়রা যাকে সংক্ষেপে প্রিন্স বেকারি বলেও ডাকেন, সেটির নানা বেকারি পণ্যে বহুদিন সনাতনী স্বাদ ও গন্ধই ধরে রাখা হয়। বেকারিটির আশপাশেই শতবর্ষ পুরনো ঐতিহ্যবাহী সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস হাই স্কুল, ঢাকা গভ. মুসলিম হাই স্কুল, মহানগর কলেজ ও ছোট ছোট বেশকিছু কিন্ডারগার্টেনের অবস্থান। ফলে লক্ষ্মীবাজারের স্কুলগুলোয় পড়াশোনা করা কয়েক প্রজন্মের কাছে এটি কেবল ঢাকার একটি প্রাচীন বেকারিই নয়, নস্টালজিয়ার নামও বটে!

আনন্দ

ঢাকার পুরনো বেকারির কথা বলতে থাকলে এর পরই উল্লেখ করতে হয় পুরান ঢাকার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী কনফেকশনারির কথা। সেটি হলো আনন্দ কনফেকশনারি। বর্তমানে কনফেকশনারিটির বয়স ১১০ বছরের বেশি। ফলে বলাই বাহুল্য, যুগ পরিবর্তনের নানা গল্পে সমৃদ্ধ হয়েছে এ বেকারির ইতিহাসও।

চান মিয়ার হাতে কনফেকশনারিটির যাত্রা। তার আগে এক ইংরেজের বেকারির দোকানে বহু বছর কাজ করেছিলেন চান মিয়া। হাতে বানানো বেকারি পণ্য নিয়ে আনন্দ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ঢাকার সাধারণ মানুষের বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাসও তেমন একটা গড়ে ওঠেনি। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার হাটগুলোয় রুটি ও বিস্কুট বিক্রি করার মাধ্যমেই তাই এ কনফেকশনারির যাত্রা। আজ এতগুলো বছর পার করে ফেলা বেকারিটি কিন্তু তাদের গতানুগতিক স্বাদ থেকে খুব একটা সরে আসেনি। এই রঙবাহারি কেক, পেস্ট্রি ও বেকারি আইটেমের যুগে এত বছর ধরে তারা নিজস্ব ঐতিহ্য ধারণ করে কী করে টিকে আছে ভাবলে অবাক হতে হয়! এখানে হয়তো জড়িয়ে আছে অনেকের আবেগতাড়িত স্মৃতি।

ইউসুফ

ঢাকার কনফেকশনারিগুলোর প্রসঙ্গ এলে ইউসুফ কনফেকশনারির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। এটির পত্তন হয়েছিল গোয়ালঘাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফের হাত ধরে। প্রতিষ্ঠাতার নানা আবদুল ব্যাপারী ছিল ছোট আকারে কেক-বিস্কুটের ব্যবসা। সেই সূত্রে ১৯৩৯ সালে ৩৬ নম্বর জনসন রোডে তিনি এ বেকারির প্রথম দোকানটি দিয়েছিলেন। শুরুতে ‘ইউসুফ বেকারি’ নাম হলেও পরে নতুন নতুন খাবার যোগ হওয়ায় নাম পাল্টে এটি ‘ইউসুফ কনফেকশনারি’ করা হয়। আজ এর শাখা ছড়িয়ে আছে শহরজুড়ে। ছয় দশক পার করে আজ এটি জড়িয়ে আছে অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে।

এছাড়া পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের সবারই রয়েছে স্থানীয় কিছু পছন্দের বেকারির দোকান, যেগুলো বছরের পর বছর ব্যবসা করে যাচ্ছে। সুইস থেকে ডিসেন্ট অথবা অলিম্পিয়া থেকে কালেকশন—সবই সময়ের পরিক্রমায় কম পথ পাড়ি দেয়নি। সবচেয়ে বিচিত্র পথ পাড়ি দিয়েছে ঢাকার মানুষের স্বাদগ্রন্থি! তবে সব যাত্রাই তো আর ক্লান্তির হয় না, কিছু কিছু তৃপ্তিরও হয়!

 

দেবযানী মোদক: লেখক