উপমহাদেশের প্রাচীন
বিস্কুট ‘চাটগাঁর
বেলা’ এক
ঐতিহ্যের নাম।
যুগ যুগ
ধরে চট্টগ্রাম
অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর
মধ্যে বহন
করা এ
ঐতিহ্য প্রসার
লাভ করেছে
দেশের অন্যান্য
স্থানেও। এ
অঞ্চলে বিস্কুট
তৈরির পদ্ধতি
রপ্ত করা
হয়েছে চট্টগ্রামের
ফিরিঙ্গি বাজারে
পর্তুগিজদের নিয়মিত
আগমনের সুবাদে।
প্রচলিত রয়েছে
পর্তুগিজদের কাছ
থেকে অনুপ্রাণিত
হয়েই আবদুল
গণি সওদাগর
প্রথম বেলা
বিস্কুটের প্রচলন
ঘটিয়েছিলেন।
নানা রকমের
ঐতিহ্যবাহী খাবারের
ব্যাপারে এমনিতে
চট্টগ্রামের আলাদা
খ্যাতি। এর
মধ্যে চট্টগ্রামের
বেলা বিস্কুট
যেন ছাড়িয়েছে
অন্য যেকোনো
কিছুকে। সাধারণ
বিস্কুটের তুলনায়
শক্ত হওয়ার
কারণে শুরু
থেকেই চায়ে
ডুবিয়ে এ
বিস্কুট খাবার
প্রচলন ঘটে।
সারা দেশে
এমনকি প্রবাসেও
বেলা বিস্কুট
নিয়ে এ
খ্যাতি ছড়িয়েছে
গণি বেকারির
হাত ধরে।
বেলা বিস্কুট
টিনের পাতে
করে ওভেনে
সেকার বদলে
মাটির পাতে
তন্দুরিতে সেকার
সিদ্ধান্তটি আবদুল
গণি সওদাগরেরই
নেয়া। স্বাদটা
অনেক বেশি
হচ্ছে নিশ্চিত
হওয়ার পর
এ পদ্ধতিটাই
পরে স্থায়ী
করলেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
চলাকালে ব্রিটিশ
সৈন্যদের জন্য
রুটি সরবরাহ
করা হতো
আবদুল গণির
‘গণি
বেকারি’ থেকে।
তখন ব্রিটিশরাই
ময়দা সরবরাহ
করত।
নামকরণ প্রসঙ্গে
প্রয়াত লেখক
ও অধ্যাপক
আবুল ফজল
১৯৬৬ সালে
তার আত্মজীবনী রেখাচিত্র গ্রন্থে
লিখেছেন, ‘চন্দনপুরার
বেলায়েত আলী
বিস্কুটওয়ালার নাম
অনুসারে বেলা
বিস্কুটের নামকরণ
হয়েছে।’ এছাড়া
বিভিন্ন গবেষকদের
লেখায় ২০০
বছর আগে
চট্টগ্রামের বেকারিতে
সর্বপ্রথম বেলা
বিস্কুট তৈরি
হওয়ার তথ্য
পাওয়া যায়।
আবদুল গণির
আগে চট্টগ্রাম
অঞ্চলে বেকারি
পণ্য তৈরির
সূচনা হয়
তার পূর্বপুরুষ
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান
জেলার বাসিন্দা
লাল খাঁ
সুবেদার এবং
তার ছেলে
কানু খাঁ
মিস্ত্রির হাত
ধরে। এ
হিসাবে দেখা
যায় চট্টগ্রামে
বেলা বিস্কুটের
ইতিহাস প্রায়
২০০ বছরের।
আবদুল গণি
বেকারি শিল্পে
যুক্ত হন
১৮৭৮ সালে।
১৯৭৩ সালে
১০৫ বছর
বয়সে মারা
যান আবদুল
গণি। তবে
তার আগে
১৯৪৫ সালের
৮ অক্টোবর
ওয়াকফ করে
যান তিনি।
সে অনুযায়ী
এ বেকারির
হাল ধরেন
আবদুল গণির
ভাইয়ের ছেলে
দানু মিঞা
সওদাগর। তিনি
মারা যাওয়ার
পর ১৯৮৭
সালে তার
ছেলে জামাল
উদ্দিন হাল
ধরেন। জামাল
উদ্দিনের ইন্তেকালের
পর বর্তমানে
ঐতিহ্যবাহী এ
বেকারির ব্যবসা
পরিচালনা করছেন
তার ছেলে
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ
এহতেশাম। ওয়াকফ
দলিল অনুযায়ী,
বর্তমানে তিনিই
এ বেকারির
কর্ণধার। দানু
মিঞা সওদাগর
মারা যাওয়ার
পর বেলা
বিস্কুটের খ্যাতি
নিয়ে আসা
সেই গণি
বেকারি অনেকটা
গতি হারিয়ে
ফেললেও ঐতিহ্য
নিয়ে টিকে
আছে।
চট্টগ্রামের চন্দনপুরায়
কলেজ রোডে
সরেজমিনে গণি
বেকারিতে গিয়ে
দেখা মিলল
আবদুল গণি
সওদাগরের বংশধর
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ
এহতেশামের। তিনি
জানান, ‘দেশ
ভাগের আগে
ভারতের কয়েকটি
প্রদেশেও এ
বেকারির বিক্রয়
কেন্দ্র্র ছিল।
তবে ১৯১০
সালে আমার
পূর্বপুরুষ গণি
সওদাগর যখন
বেকারির হাল
ধরেন, তখন
নামকরণসহ পুরনো
বেকারি ভেঙে
আধা পাকা
ভবন গড়ে
তোলেন। এখনো
প্রাচীন পদ্ধতিতেই
বেলা বিস্কুট
তৈরি করে
যাচ্ছি। চট্টগ্রাম
অঞ্চল ছাড়াও
গণি বেকারি
থেকে এখনো
বেলা বিস্কুট
কিনে নিয়ে
যান চট্টগ্রামের
বাইরের জেলার
ক্রেতারা। আবার
প্রবাসে আছেন
এমন অনেকেই
দেশ থেকে
ফিরে যাওয়ার
সময় সঙ্গে
নিয়ে যান
বেলা বিস্কুট।
আধুনিক প্রযুক্তির
সব মেশিনারিজ
বাজারে এলেও
আসল স্বাদ
ও গুণগত
মান ধরে
রাখতে এ
বেকারির বেলা
বিস্কুট এখনো
তৈরি করা
হয় মাটির
তন্দুরে।’
চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী অনেক কাজ করেছেন আহমদ মমতাজ। এ গবেষক উল্লেখ করেছেন, মোগল ও পর্তুগিজদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ বেকারি পণ্য। ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক পর্তুগিজ এখানে বসতি গড়েছিল। পর্তুগিজদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেকারি শিল্পের যাত্রা। তবে এটির প্রসার ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। সে সময়ে গণি বেকারি থেকে ব্রিটিশ সৈনিকদের জন্য তৈরি হতো বেকারির পণ্য। সে হিসাবে বেলা বিস্কুট তৈরির ইতিহাস ২০০ বছর হবে বলেই ধারণা মেলে।
ব্রিটিশ কিংবা
পরবর্তী সময়ে
পাকিস্তান আমলে
বেলা বিস্কুটের
জনপ্রিয়তা কেমন
ছিল তার
ধারণা পাওয়া
যায় বাংলাদেশের
প্রখ্যাত সাহিত্যিক
আবুল ফজল
কিংবা ইতিহাসবিদ
আবদুল করিমের
স্মৃতিকথায়। ১৯৬৬
সালে রচিত
আবুল ফজলের
আত্মজীবনী রেখাচিত্র
গ্রন্থে লেখক
শৈশব কৈশোরকালের
একটি লাইন
এ রকম
‘ঘুম
থেকে উঠে
পান্তাভাতের বদলে
খাচ্ছি গরম-গরম
চা বেলা
কি কুকিজ
নামক বিস্কুট
দিয়ে। কুকিজ
ইংরেজি নাম,
বেলা কিন্তু
খাস চাটগেঁয়ে।’
প্রবীণ ব্যক্তিরা
বলেন, গ্রামাঞ্চলে
বেলা বিস্কুট
নিয়ে মুখে
মুখে প্রচলিত
ছিল ‘বেলা
বিস্কুট ঠেলা
গাড়ি- এক্ক
(এক) ঠেলায়
দোহাজারি।’ অর্থাৎ
দৈনিক ভিত্তিতে
যাদের কাজে
নিয়োগ দেয়া
হতো তারা
ঠেলাগাড়ি করে
কোনো মালপত্র
আনা-নেয়ার
আগে বেলা
বিস্কুট দিয়ে
চা পান
করত আর
পথে খাওয়ার
জন্য বোচকায়
করে নিয়ে
যেত বেলা
বিস্কুট। আর
এক ঠেলায়
দোহাজারি যাওয়ার
মানে হচ্ছে,
যাতে দ্রুত
কাজ করা
যায়।
গনি বেকারির
কারিগরদের সঙ্গে
কথা বলে
জানা যায়,
প্রযুক্তি অনেক
দূর গেলেও
ঐতিহ্য ধরে
রাখতে এ
বেকারিতে বেলা
বিস্কুট তৈরিতে
কয়েক দিন
সময় লাগে।
প্রথমে ময়দা,
চিনি, লবণ,
ভোজ্যতেল, ডালডা,
গুঁড়ো দুধ
পানিতে মিশিয়ে
খামি তৈরি
করা হয়।
এ খামিতে
ক্ষতিকর ইস্টের
পরিবর্তে বিশেষ
ধরনের মাওয়া
দেয়া হয়।
তবে এ
মাওয়া আবার
প্রস্তুত করা
হয় বিশেষ
কিছু উপাদান
ব্যবহার করে।
খামিতে মাওয়া
মিশিয়ে একদিন
রাখার পর
তন্দুরে কয়েক
দফা সেকে
গোলাকার এবং
আকারে বড়
বেলা বিস্কুট
তৈরি করা
হয়।
গনি বেকারিতে
বেলা বিস্কুট
কিনতে আসা
এক ক্রেতার
সঙ্গে কথা
হলে তিনি
জানান, ‘বেলা
বিস্কুটের সঙ্গে
আমাদের আবেগ-অনুভূতি
জড়িত। সকালে
ঘুম থেকে
উঠে চায়ের
সঙ্গে বেলা
বিস্কুটের বিকল্প
নেই চট্টগ্রামবাসীর।
সকাল বেলাটা
দৈনিক পত্রিকা
হাতে নিয়ে
আর সঙ্গে
চায়ের মধ্যে
বেলা বিস্কুট
চুবিয়ে খাওয়ার
মধ্য দিয়ে
শুরু হয়।’
কবি ও
সাংবাদিক ওমর
কায়সার একটি
জাতীয় দৈনিকে
বেলা বিস্কুট
নিয়ে চট্টগ্রামের
ভাষায় নিজের
অনুভূতি এভাবে
তুলে এনেছেন:
ভোগ লাইগ্গিদে
ফরান যার
ফেডর ভিতর
তুয়ান বা’র
বেয়ানবেলা কী
খাইয়ুম
মজার খানা
কী ফাইয়ুম
আঁর ফরানে
কী খোঁজের
কেউ তো
আর ন
বোঝের।
বেলা বিস্কুট
গরম চা
মজা গরি
ডুবাই খা
ঘরত গরবা
আইস্যি
বেলা দেহি
হাইস্যি।
রাশেদ এইচ চৌধুরী: সাংবাদিক





