বিস্কুট পছন্দ করে কিন্তু ‘পারলে-জি’র নাম জানে না, উপমহাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। হান্টলে অ্যান্ড পামার্সের মতো কিংবদন্তি না হলেও ভারতের এ বিস্কুট বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রীত কনফেকশনারি আইটেমের স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে পারলে-জি ৫ হাজার ১০ কোটি রুপি খুচরা মূল্যের গ্লুকোজ বিস্কুট বিক্রি করেছে। ভেঙে বললে, প্রতি মাসে বিভিন্ন আকৃতির ১০০ কোটি প্যাকেট আর বছরে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি পিস বিস্কুট বিক্রি হয়েছে। ভারতের সে সময়কার মোট জনসংখ্যার হিসাবে বছরে মাথাপিছু বিক্রি হয়েছে ১২১টি বিস্কুট। ২০২১ সালের হিসাব অনুসারে ২০২০ সালে পারলে-জি এবং পারলে কোম্পানির অন্যান্য বিস্কুটসহ মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৬৮২ কোটি রুপি। ব্যবসার দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতে ইউনিলিভারের হুইল এবং বহুল বিক্রীত ঘড়ি ডিটারজেন্ট থেকে বহু এগিয়ে আছে ‘পারলে-জি’। রীতিমতো ব্র্যান্ড হয়ে ওঠা এ বিস্কুটের যাত্রা ৮০ বছরেরও বেশি আগে।
পারলের ইতিহাসের সূচনা ১৯২৯ সালে। মোহনলাল দয়াল চৌহান নামে এক রেশম ব্যবসায়ী মুম্বাইয়ের ভিলে পারলেতে কনফেকশনারি ব্যবসা শুরু করেন। চৌহান স্বদেশী আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ব্রিটিশ ভারতে সব ক্ষেত্রে ইংরেজদের দৌরাত্ম্য তার পছন্দ ছিল না। তিনি জার্মানিতে গিয়ে কনফেকশনারি তৈরির নানা প্রক্রিয়া ও ব্যবসা শিখে আসেন। ১৯২৯ সালে ইরলা ও পারলা গ্রামের মধ্যবর্তী অংশে তিনি একটি পরিত্যক্ত কারখানা কিনে সেখানে কনফেকশনারি ব্যবসা শুরু করেন। পরিবারের সদস্যসহ মোট ১২ জন কর্মী নিয়ে শুরু হওয়া এ কনফেকশনারি অরেঞ্জ ক্যান্ডি দিয়ে সর্বপ্রথম তাদের ব্যবসা শুরু করে। এক দশক পর অর্থাৎ ১৯৩৯ সালে ‘পারলে গ্লুকো’ নামে এদের প্রথম বিস্কুট বাজারে আসে।
ভারত ভাগের আগে ভারতের বাজারে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট জনপ্রিয় ছিল। পারলে-জি প্রথমেই নিজেকে একটি দেশীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পূর্ণ চেষ্টা করে। প্রথমত পারলে গ্লুকোকে সাধারণ মানুষের বিস্কুট হিসেবে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনে দেশীয় সংস্কৃতি বা দেশীয় ছাপ রাখা হয়েছিল। ’৪৭ পূর্ববর্তী একটি বিজ্ঞাপনে একজন নারীকে তার গরু চরাতে দেখা যায়। ভারত স্বাধীনতার পর পারলে প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের গ্লুকোজ বিস্কুটকে পশ্চিমা কোম্পানির গ্লুকোজ বিস্কুটের বিপরীতে দাঁড় করায়। পণ্যটিকে পুরোপুরি একটি ভারতীয় অবতার দেয়া হয়। পরিচিতির পাশাপাশি অন্যান্য দামি বিস্কুটের বিপরীতে পারলে গ্লুকো স্বল্প দামে বিক্রি করা হতো। কিন্তু এর মাঝেও বেশকিছু সমস্যা সামনে আসে।
আশির দশকের শুরুতে ‘পারলে গ্লুকো’ নাম বদলে ‘পারলে জি’ হয়ে যায়। এর পেছনে বেশকিছু কারণ ছিল। এ সময়ে বাজারে থাকা ব্রিটানিয়া তাদের গ্লুকোজ বিস্কুট নিয়ে আসে। ‘গ্লুকোজ ডি’ নামে এ বিস্কুটের প্রচারণা করেন শোলেখ্যাত গব্বার সিং। বিস্কুটের নাম কাছাকাছি হওয়ার কারণে ক্রেতারা দোকানে গিয়ে কেবল ‘গ্লুকোজ বিস্কুট’ চাইতেন। এ সমস্যা সমাধানের জন্য পারলের পক্ষ থেকে নতুন প্যাকেজিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। হলুদ ওয়াক্স পেপারের এ প্যাকেটে বসানো ছোট্ট মেয়েটির ছবি আজও জনপ্রিয়। বলা চলে, ছবিটি দিয়েই ‘পারলে-জি’ চেনা যায়। কিন্তু প্যাকেজিং বদল করার পরও ক্রেতারা অন্যান্য গ্লুকোজ বিস্কুটের থেকে ‘পারলে গ্লুকো’কে আলাদা করতে পারল না। তাই ১৯৮২ সালে বিস্কুটের নাম বদল করে ‘পারলে-জি’ করা হয়।
পারলে-জি’র সুস্বাদ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। পাশাপাশি দামে কম হওয়ায় এর বিক্রি বেশি, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মধ্যে পারলে-জি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, এ কথাও ঠিক। তবে পারলে-জি’র তুমুল জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর বিজ্ঞাপন। প্রচারের ক্ষেত্রে খুব কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানই পারলে-জি’র মতো সময়ানুগ, পরিস্থিতি বিচার করে এগিয়ে যেতে পেরেছে। স্বাধীনতার আগে বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে তারা ভারতীয়করণ করেছিল। এরপর প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে প্রিন্ট মিডিয়া। শুরু থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল শিশুরা। ষাটের দশকে ভারতের কোনো ঘরে গিয়ে বিস্কুট সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে গৃহিণীদের উত্তর হতো, ‘বিস্কুট
আমরা আমাদের বাচ্চাদের জন্য কিনি।’ পারলের বিস্কুট তাই শিশুদের বিস্কুট হয়ে উঠতে চাইল।
সেই ষাটের দশকেই এভারেস্ট ব্র্যান্ড সলিউশন নামের বিজ্ঞাপনী সংস্থা পারলের সঙ্গে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানের সে সময়কার ক্রিয়েটিভ হেড মগনলাল ধাইয়ার কথা ছিল, ‘এমন
কিছু করতে হবে যেন বিস্কুটটা শিশুদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়।’ তারা কয়েকজন শিল্পীকে কাজে লাগিয়ে দেন। কেউ কেউ বলেন ছবিটি নীরজা দেশপান্ডের এবং নাগপুরে কোনো শিল্পী তাকে দেখে ছবিটা এঁকেছিলেন। অন্যরা বলেন ছবিটি কোনো এক অজানা শিশুশিল্পীর। তবে পারলে প্রডাক্টসের সিনিয়র ক্যাটাগরি হেড মায়াঙ্ক শাহ এসব ধারণা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘ছবিটি
মগনলাল ধাইয়ার নিয়োগ করা শিল্পীদের কোনো একজনের কল্পনা থেকে আঁকা।’ শিল্পীর কল্পনা এতটা জনপ্রিয় হয়েছিল যে পারলে-জি এবং ওই কন্যাশিশুটি সমার্থক বনে গেছে।
আশির দশকে পারলে গ্লুকো নাম পরিবর্তন করে পারলে-জি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের দিকে মন দেয়। একটি বিখ্যাত বিজ্ঞাপনে দাদা ও তার নাতি-নাতনিকে দেখা যায়। তারা পারলে-জি খেতে খেতে এর ট্যাগলাইন ‘স্বাদ ভরা, শক্তি ভরা’ আওড়াচ্ছিল। গ্লুকোজ বিস্কুট হিসেবে পারলে-জি শিশুদের পাশাপাশি প্রবীণদেরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। দূরদর্শন জনপ্রিয় হলে অন্যরা যখন সাধারণ বিজ্ঞাপন দিয়েই নিশ্চিন্ত থাকত, পারলে-জি সে সময়ে জনপ্রিয় সুপারহিরো সিরিয়াল ‘শক্তিমান’ স্পন্সর করা শুরু করে। শুধু এটুকুই নয়, তারা শক্তিমান সিরিজের অভিনেতা মুকেশ খান্নাকে ‘পারলে-জি’র শুভেচ্ছাদূত করে নেয়।
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পারলে-জি ভারতকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। এ শতকের শুরুর দশকে ‘মেরা সাপনা সাচ হোগা’ স্লোগান এনেছিল তারা। স্বপ্ন সফল হওয়ার নানা প্রতিকূলতাকে উপস্থাপন করে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা নিয়ে জিঙ্গেল করা হয়েছিল ‘রোকো মাত, টোকো মাত’। ‘থামিয়ে দিয়ো না, ধাক্কা দিয়ো না’ অর্থের এ জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়েছিলেন বিশাল দাদলানি ও পিয়ুশ মিশরা। ‘পারলে-জি’র এ সময়োপযোগী বিজ্ঞাপনের পরিকল্পনাই তাদের জায়গা ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। তারা বুঝেছিল ভারতের মানুষ ঠিক কী চায়। তাই ‘জি মানে জিনিয়াস’ থেকে ‘হিন্দুস্তান কি তাকাত’ ট্যাগলাইন ব্যবহার করেছে। সাধারণত সেলিব্রিটিদের দিয়ে বিজ্ঞাপন না করালেও আমির খানকে যুক্ত করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়ে ডিজিটাল যুগে পারলে-জি বলেছে ‘কাল কে জিনিয়াস’, ‘জিনিয়াস
বদল গ্যায়া’র মতো ট্যাগলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সবসময়ই ‘জি’-এর সঙ্গে মিলিয়ে করা হচ্ছে সেটা। পারলে-জি তার পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। চাওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা ভারতের সবচেয়ে পরিচিত তিনটি লোগো/মাসকটের মধ্যে পারলে-জি একটি।
আলী আমজাদ: লেখক





