১৯৭৭ সালের মধ্য এপ্রিলের উত্তপ্ত দুপুর। আমি গ্রামের বাড়িতে। এ সময় গ্রামে তাঁতের খটাখট শব্দ ছাড়া সবকিছু স্থির। আমি দুপুরের খাওয়া শেষ করে কী করব কী করব ভাবছি, হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।

আমার নাম ধরে বিশুদ্ধ উচ্চারণে ডাকাডাকি। স্পষ্টত ড্যাড রফিক কায়সারের কণ্ঠ। রফিক কায়সার মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পড়ান। ওখান থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি না হওয়ায় রফিক প্রায় প্রতি উইকেন্ডে এখানে চলে আসেন। গেল সপ্তাহে এসে আমাকে জানিয়েছিলেন, সামনের উইকেন্ডে ইলিয়াস ভাই (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) আসবেন, কয়েক দিনের জন্য, আমি যেন তার থাকার একটি নিরিবিলি ব্যবস্থা করে দিই। হঠাৎ করে আমার মনে হলো, তিনিই নয়তো? দ্রুত কপাট খুলে দিলাম এবং ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। আমার গডফাদার কবি ও কমলকুমার বক্ষে ধারণকারী রফিক কায়সার, সঙ্গে কিংবদন্তি লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তাদের আসার সংবাদ পূর্বনির্ধারিত, কিন্তু আমি চমকে উঠলাম এজন্য যে, তাদের সারা শরীর এমনভাবে ধূলিধূসরিত, চেনার উপায় ছিল না।

সত্তরের দশকে রাস্তাঘাট পাকা ছিল না, বাস থেকে নেমে পাঁচ মাইল রাস্তা হেঁটে বাড়ি আসতে হতো। পাড়ি দিতে হতো ধুলোবালিময় সড়ক, জমির আইল, মাঝে পড়ত একটি বিল, তার পাড় ভেঙে ভেঙে বাড়ি পৌঁছতে হতো। রফিক ফি হপ্তায় আসত এ কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে। কী জন্য? জানি না। এখনো রাতে ঘুমানোর আগে ফোনে জেনে নেয় সব ঠিকঠাক আছে কিনা, ছোট মেয়েটার বিয়ে কিংবা চাকরির খবর। রফিক তো জীবনভর পিতা না হয়েও আমার প্রতিপালকই রয়ে গেল। এ পিতৃঋণ আর শোধ হলো না।
আজ এ ক্লান্তিকর ও কষ্টকর বিপন্ন পথ পাড়ি দিয়ে চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অমরতার পথযাত্রী আমি সংবিত ফিরে পেলাম। দ্রুত পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। তিনি মাথায় হাত রাখলেন।

“জিতে র’ বেটা।”

ঘরে না ঢুকেই রফিক হাঁক মারল, আগে ইলিয়াস ভাইয়ের গোসল, তারপর খাওয়া। কিরে, মেনুটেনু ঠিক আছে তো?&dquote;&dquote;

রফিক ও ইলিয়াস ভাই ঘরে ঢুকলেন। লুঙ্গি-গামছা ও টকটকে লাল লাইফবয় সাবান দেয়া হলো। ‘কি রান্নাবান্না?’ ‘মাগুর মাছ, ডাল’— আমি বললাম। ‘ইলিয়াস ভাই, চলবে?’ ‘রফিক, বহুদিন খাইনি। জম্পেশ। গোসলখানাটা কইরে?’ ইলিয়াস ভাই আমাকে বললেন।

কলতলায় নিয়ে গেলাম। বালতি ভর্তি করে পানি তুলে দিলাম। খালি গায় ইলিয়াস ভাই ও রফিক। এভাবে গোসলে রফিক অভ্যস্ত হয়েছে, এখানে যাতায়াত করতে করতে। মনে হলো, ইলিয়াস ভাই অস্বস্তি বোধ করছেন।

‘ইলিয়াস ভাই, চালিয়ে যান, এ গোসল সুনিলের খুব প্রিয় ছিল।’ রফিক চেঁচিয়ে উঠল।

ইলিয়াস ভাই অ্যালুমিনিয়ামের মগ দিয়ে মাথায় পানি দিলেন। খেয়াল করলাম, তিনি বেশ মোটা হয়েছেন আগের চেয়ে। মানানসই ফর্সা, উপন্যাসের নির্যাস মাথা থেকে শরীর চুইয়ে চুইয়ে ঝরছে যেনবা।
এরই মধ্যে বাচ্চা পোলাপান ভিড় করছে। তারা কৌতূহলী দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। ইলিয়াস ভাই সহসা ওদের দিকে পানি ছিটিয়ে দিলেন। ওরা খিলখিল করে হেসে উঠল। ইলিয়াস ভাই খুব মজা পেলেন। হয়তো তার ভেতরের সুপ্ত শিশু পরিবেশ পেয়ে জেগে উঠেছে। কী আনন্দ কী আনন্দ, আহা!

সবার স্নান শেষ হলে খাবার দেয়া হলো। মাগুর মাছ, মুরগি ও ডাল। ‘শোনো রফিক, আগে অসুস্থ লোকজনকে মাগুর ও শিং মাছের ঝোল দেয়া হতো, কেন? ধারণা করা হতো, এতে রক্ত বাড়ে। আসলে এটা সুস্বাদু, বেরামটেরাম হলে রুচি কমে। তাই এ মাছ খেয়ে মজা পায়।’ ইলিয়াস ভাই বোঝালেন। আমরা বুঝলাম। ‘অনেক দিন পর এ সুস্বাদু মাছ খেলাম’— আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন। মনে হলো, তিনি তৃপ্তিসহকারে খাচ্ছেন। খাওয়া শেষ হলো।

বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলাম। তারা দুজনেই শুয়ে পড়লেন। ইলিয়াস ভাই উত্তম দাশের কবিতা চোখের সামনে ধরলেন। ইত্যবসরে রফিক আমাকে তাদের কর্মপরিকল্পনা বুঝিয়ে দিলেন। বিশ্রামের পর বিকালে গ্রাম, খাল-বিল, ও দলিত শ্রেণীর জীবনযাপন দেখবেন। কুমোরপাড়া ঘুরবেন পরদিন। তন্তুবায়ীদের প্রতি তার আগ্রহ অনেক। সমরেশ বসুর টানাপোড়েন যথেষ্ট নয়। এ কথা তিনি অনেক আগেই আমাকে বলেছিলেন। দীর্ঘায়ু হলে অনেকদিন তিনি এখানে থাকবেন। অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হলে বড়সড় একটি বই লিখবেন তন্তুবায়ীদের নিয়ে। এ ব্যাপারে আমার আগ্রহের সীমা ছিল না। শনিবার হাট দেখবেন। মূল কথা হলো দু-একদিন থাকবেন, মানুষ দেখবেন, তাদের জীবনযাপনের গভীরে ঢুকবেন, এ অল্প সময়ে তার মনের চাহিদা মিটাবার চেষ্টা করবেন। রফিক আমাকে বলেছিলেন, মহ? ব্যক্তিরা দ্রুত চিন্তা করে নিতে পারে। ইলিয়াস ভাই প্রায় মহ? হয়ে গেছেন।
বিকালে বিশ্রাম শেষ হলে চা খেয়ে ইলিয়াস ভাই পাইপ ধরালেন। চল বেরিয়ে পড়ি। আগে ঐতিহাসিক জায়গা দেখা। রফিকের ওই এক ধরনের বাতিক। আসলে আমাদের গ্রামে ঐতিহাসিক স্থান বলতে কিছু নেই। একটি প্রাচীন মসজিদ, বাজার ও স্কুল ছাড়া আর কিছু নেই। ইলিয়াস ভাই বিস্কুট কালারের কডের প্যান্ট ও স্ট্রাইপের জামা গায় চাপালেন। ইন করায় বেশ মানানসই লাগল। আমরা বাজারে ঢুকলাম। রফিক বারবার যাতায়াত করায় অনেকের কাছে সুপরিচিত ছিল। তদুপরি ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে তার আলাদা একটি সম্মান ছিল। ইলিয়াস ভাই সম্পূর্ণ অপরিচিত। আমি বাজারের প্রাচীনত্ব ও ব্যবসার সুদীর্ঘকালের ঐতিহ্য ব্রিফ করছিলাম। এমন সময় ডান পাশের গদি থেকে একজন কর্মচারী আমাদের দোকানে নিয়ে গেল। দোকানের মালিক আফাজ উদ্দিন খুব বড় ব্যবসায়ী। সম্মানের সাথে তাদের বসতে দিলেন। আমি পরিচয় করিয়ে দিলাম। তিনি কর্মচারী পাঠালেন মিষ্টি আনতে। এরই মধ্যে আরো দু-চারজন লোক চলে এল। ইলিয়াস ভাইয়ের দৃষ্টি পড়ল গদির ওপর পড়ে থাকা সাপ্তাহিক আরাফাতের ওপর। এ পত্রিকাটি আহলে হাদিসপন্থী মুসলিমদের মুখপত্র। তিনি এটি হাতে নিলেন। উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর হাদিস ও কোরআনের আলোকে আহলে হাদিসের মর্মকথা, তাদের প্রচার, কার মাধ্যমে কীভাবে এ সম্প্রদায়ের বিস্তৃতি লাভ করে, এ নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনল। ধরে নিল দাড়িবিহীন একজন বড় মওলানা। মনে হলো রফিকও অবাক। পড়াশোনার এত গভীরতা! এরপর তিনি সনাতন ধর্মের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের তুলনামূলক আলোচনায় গেলেন। দু-একজন আলোচনায় অংশগ্রহণ করায় বেশ জমে উঠল। মনে হচ্ছে, অন্য সব প্রোগ্রামের বারোটা বাজল। এখন ঘরভর্তি লোক। আলোচনা এগোচ্ছে। ইলিয়াস ভাই, ধারণা করা যায়, খুব সহজ ভাষায় ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কখন যে রাত ৯টা বেজেছে, কেউ বুঝতে পারেনি। মা রাত জাগতে পারেন না। আমরা উঠলাম। ব্যবসায়ী আফাজ উদ্দীন বিনয়ের সাথে ডাল-ভাতের দাওয়াত দিলেন। আরো দু-একজন একই রকমভাবে দাওয়াত গ্রহণের অনুরোধ করলেন। সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এলাম। আজকের প্রোগ্রাম এখানেই শেষ করতে হলো, কেননা গ্রামে অতিদ্রুত রাত নেমে আসে। আমরা বাড়ি ফিরে এলাম।&dquote;&dquote;

রাতের খাওয়া শেষ হলো ১০টায়। একটি টেবিল ও চেয়ার পাতা ছিল জানালার পাশে, আকাশ দেখা যায় এমন করে। টেবিলল্যাম্প রাখা ছিল। ’৭৩ সাল থেকেই এ গ্রামে বিজলিবাতি জ্বলে। মোটামুটি ব্যবস্থা করা ছিল লেখালেখির জন্য। পাইপ ধরালেন ইলিয়াস ভাই। দেখাদেখি রফিকও পাইপ জ্বাললেন। রফিক স্টার থেকে সরাসরি পাইপে প্রমোশন নিয়েছে। সম্পূর্ণ ঘর এরিনমুরের গন্ধে ভরে গেল। তারা দুজন টেবিল সামনে রেখে মুখোমুখি চেয়ারে বসলেন। ইলিয়াস ভাই নোটবুক মেলে ধরলেন। হাতে পেন্সিল।

ধরো, এইটা একটা বিশাল বিল। অতি প্রাচীন। কত প্রাচীন? তিনি পেন্সিল দিয়ে বিলের স্কেচ টানলেন, রফিকও আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। প্রাগৈতিহাসিক। রফিক বললেন। হবে হয়তো, এ কথা বলে আবার শুরু করলেন। এ বিলের চার পাশের মানুষের খাদ্য জোগায় এ বিল। নিরন্তর সংগ্রামী মানুষ। জীবনের বোধ কী জানে না, জীবনের অধিষ্ঠান বোঝে না, আবহমান কাল ধরে চলছে তাদের লড়াই। কখনো কখনো দখলদার পত্তনদার বদলে যায়, কিন্তু বাঁচার লড়াই চলতেই থাকে। একেকটা যেন জীবনের পথ সৃষ্টির যোদ্ধা। মাটি খোঁড়ো। বেরিয়ে আসবে হাড়গোড়। এ শুধু বিল-হাওড় নয়, প্রতিটি শ্রেণী-পেশায় একই ভেদ। তার পরও কি ত্যাজ! মানুষের পরাজয় কোথায়? নিরন্ন হওয়ায়? না। আত্মসমর্পণে। আমি মানুষকে বিশেষত নিরন্ন মানুষকে হেরে যেতে দেব না। রফিক তার সঙ্গে মাথা নাড়ছে। মাঝে মাঝে কথা এগিয়ে দিচ্ছে। শোন রফিক, আমার চিলেকোঠার সেপাই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ নয়। মানুষের স্বপ্ন নিয়ে ওটায় কিছু বলা হয়নি। এ নতুন উপন্যাসে বলার চেষ্টা করা হবে। ইলিয়স ভাইয়ের চিলেকোঠার সেপাই তখন সাপ্তাহিক রোববারে ধারাবাহিক যাচ্ছিল এবং প্রচুর পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছিল।

তিনি রফিকের কাছে জানতে চাইলেন খোয়াবনামা নামটি কেমন। রফিক নামের সাথে চিন্তার যথাযথ সাজুয্য আছে বলে মন্তব্য করল। অনেক রাত। ইলিয়াস লিখতে বসলেন। রফিক ইশারায় জানতে চাইল সব ঠিকঠাক আছে কিনা। ঠিক আছে। তারপর আমার ঘরে চলে এলাম।&dquote;&dquote;

শনিবার। হাটের দিন। সারা দেশের তিনটি বড় কাপড়ের হাটের একটি। ভোর ৫টায় হাট শুরু হয়। ৯-১০টায় শেষ। ইলিয়াস ভাই হাট দেখবেন, পূর্বেরই প্রোগ্রাম। তাদের ডেকে ওঠানো হলো। বাড়ি থেকে হাট মাত্র কয়েক মিনিটের। আমরা ৭টায় পৌঁছলাম। ততক্ষণে জমজমাট কাপড় কেনাবেচা শুরু হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পাইকার এসেছে। শত শত তাঁতি, এ গ্রাম কিংবা অন্য গ্রাম থেকে তাঁতের তৈরি কাপড় নিয়ে এসেছে। বাহারি নাম, বাহারি ডিজাইন, রঙ ও সাজানোর কৌশলে এক বিচিত্রময় রূপ ধারণ করেছে হাটের এমাথা-ওমাথা। হাঁকডাক। কোলাহল। দামদস্তুর। কুলি-কামলা সব মিলিয়ে বাণিজ্যের আবহ তৈরি হয়েছে। ইলিয়াস ভাই বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি দু-একজন তাঁতি ও পাইকারের সঙ্গে কথা বললেন। কুলি-মজুরদের সঙ্গেও দেখলাম খাতির জমিয়েছেন। আমার আর প্রয়োজন হচ্ছে না। ইলিয়াস ভাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। কখনো কাপড় হাতে নিয়ে দাম জানতে চাইছেন। কখনো কাপড়ের ডিজাইন ও সুতার মান পরীক্ষা করছেন, পাক্কা ক্রেতার মতো। যদিও এখন পর্যন্ত তাকে কাপড় তৈরির তাঁত দেখানো হয়নি। তাঁতঘরে নেয়া হয়নি। তিনি একটি আধুনিক ডিজাইনের ভেলভেট সুতি কিনলেন ৯০ টাকা দিয়ে। ’৭৭ সালে ওটাই সর্বোচ্চ মূল্য।
এরপর সুতার দোকানে নিয়ে গেলাম। সুতার বেইল, বান্ডেল, কাউন্ট সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। দাম নোট করলেন। এরপর রঙের দোকানে গিয়ে রঙ ও বিভিন্ন কেমিক্যালের ব্যবহার পদ্ধতি জেনে নিলেন। মন্তব্য করলেন, সব মনে রাখা যাবে না, রফিক, তুমি কিছু ধারণ করো। আমার মনে হলো খোয়াবনামার পর পরবর্তী টার্গেট তন্তুবায়ী, যার মালমসলা তিনি সংগ্রহ করছেন। ১০টায় বাড়ি ফিরলাম। মা রান্না করে রেখে ছিলেন, খিচুড়ি ও গরুর মাংস। ইলিয়াস ভাই লিখতে বসলেন। চিলেকোঠার সেপাইর পরবর্তী কিস্তি মনে হয় এখান থেকেই শেষ করে যাবেন। রফিকের হাতে দ্বান্দিক বস্তুবাদ। আমি হুকুম তামিলকারী। দুপুরের পর আমরা কাপড়ের ফ্যাক্টরিতে ঢুকলাম। একজন তাঁতি কী সুনিপুণ নৈপুণ্যে মাকু টানছে, হাতে ডিজাইন তুলছে, পা, চোখ, হাত একই সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে, তিনি নিবিষ্টমনে দেখলেন, এমনভাবে, যেন কোনো মহ? শিল্পকর্মের রসাস্বাদন করছেন। কয়েকটি ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখানো হলো। তিনি তাঁতের কয়েকটি যন্ত্রপাতির নাম জেনে নিলেন, যেমন— মেরা, মাকু, শানা, ব, ডগি, পাদানি ইত্যাদি। কোনটির কী কাজ সংক্ষিপ্তাকারে জেনেও নিলেন। একজন শ্রমিক প্রতি পিস কাপড়ে কত মজুরি পান, শুনে আফসোস করলেন। সর্বত্রই শোষণ। এ ছিল তার মন্তব্য। এরপর কুমোর বাড়ি নিয়ে গিয়ে মাটির কারুকাজ দেখালাম। তাদের স্ত্রীদের সুঠাম ও শক্তিশালী দেহ, তাদের শ্রম তাকে নতুন এক নায়িকার সন্ধান দিল, এ কথা তিনি রাতে বলেছিলেন। আমাদের প্রাচীন শিল্পীগোষ্ঠী। কিন্তু তাদের বেহাল অবস্থা দেখো। তিনি বললেন। এ সম্প্রদায় স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছে না। কতদিন বাঁচব? বহু কাজ বাকি রয়ে যাচ্ছে, রফিক। তার কণ্ঠ আর্তনাদের মতো শোনা গেল।

ওখান থেকে চলে এলাম মাইরা পট্টিতে। বাজারের উত্তর-পশ্চিমের শেষ প্রান্তে আবস্থিত মহল্লায় এ প্রাচীন গোষ্ঠীর বসবাস। ওরা কত প্রাচীন কিংবা আদি নিবাস কোথায়, তা কেউ জানে না। বাংলা ও হিন্দি মিশেলে এক ধরনের ভাষা ব্যবহার করে। সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র কয়েক ঘর অবশিষ্ট আছে। মূল পেশা কুলিগিরি। কেউ কেউ ঘোড়ায় টানা টমটম চালায়। নোংরা জীবনযাপন। নিজেদের মধ্যে অশ্লীলতা ছাড়া আর কোনো ভাষা ব্যবহার করে না। পুরুষ-মহিলা-শিশু নির্বিশেষে মদ্যপান করে। নেশা জমে উঠলে হুলো...লো...ল এই অদ্ভুত গান সম্মিলিত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে। লেখাপড়ার বালাই নেই। কেউ তাদের উদ্বুদ্ধও করে না। ইলিয়াস ভাই কয়েকজন বৃদ্ধের সাথে কথা বলে আমাকে জানালেন, বিহার অরিজিন। মোগল আমল থেকেই তারা এখানে। নৃতত্ত্বটা পড়ে নে— আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। স্কুল দেখালাম। প্রাচীন মসজিদও বাদ গেল না।

সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরলাম।&dquote;&dquote;

আমার বড় ভাই খোরশেদ ভালো রান্না জানতেন। রাতে তিনি কবুতরের মাংস রান্না করে খাওয়ালেন। ইলিয়াস ভাই রান্নার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। রাতে হালকা বিশ্রামের সময় রফিক বলল, ওস্তাদ, ওর হাতটা দেখেন, কোনো বিড়ম্বনা আছে কিনা। বলার সঙ্গে সঙ্গে ইলিয়াস ভাই আমার হাত টেনে নিয়ে বললেন, রেখা দেখার সকাল বেলা উপযুক্ত সময়, রফিক বলেছে, দে তোর হস্তরেখা স্টাডি করি। আমি হতবাক, তিনি হাত দেখতে জানেন। একজন পেশাদার জ্যোতিষীর মতো আমার হাত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে লাগলেন। হাত চোখের কাছে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলেন এবং একসময় যেন চমকে উঠলেন অ্যা, এ কিরে? তোর বুধ ও রবিতে দুটি আইল্যান্ড, রফিক দেখ, জ্যোতিষশাস্ত্রে এরা সবচেয়ে ভাগ্যতাড়িত। তুই বেঁচে আছিস শুধু উইলফোর্সের কারণে। এর প্রতিরোধী কোনো রেখা নতুন করে না এলে তোর ভবিষ্য? অন্ধকারাচ্ছন্ন। এরই মধ্যে রফিকও ঝুঁকে পড়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, একটা কাজ করা যেতে পারে। আমার বাসায় আয়, ভালো পাথর কিনে শোধন করে দেব। বিশ্বাস করিস পাথরে? প্রয়োজন নেই। দ্রব্যগুণ বলে একটা কথা আছে। দে, একটু কাগজ। এ কথা বলেই আমার অপেক্ষায় না থেকে তার নোটবুক থেকে কাগজ ছিঁড়লেন, অতিদ্রুত বাসায় যাওয়ার ঠিকানা ও রাস্তার ড্রয়িং করে দিলেন। এই প্রথম জানলাম, তিনি একজন পাথর বিশেষজ্ঞ।

হঠা? করেই তিনি ঘোষণা দিলেন, আগামীকাল ভোরেই চলে যাবেন। আমাকে বললেন, চাচিকে বল এ যাত্রায় পিঠা খাওয়া হলো না। আবার কোনো এক শীতে। রফিক কায়সার অবাক তাকিয়ে রইল। আমি বিস্মিত। কারণ আরো অন্ততপক্ষে একদিন থাকার কথা। শোন রফিক কায়সার, ঢাকায় ফিরে দ্রুত ওর পাথরের ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর আমার দিকে ফিরে বললেন, তুই এক সপ্তাহের মধ্যে ঢাকায় চলে আয়। আমি কিছুই বললাম না। শুধু হাতের দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল দুটি আইল্যান্ড দেখলাম। কেন আমার সবকিছু অনিশ্চিত মনে হয়, কেন আমি স্থিরতা পাই না। তাহলে আইল্যান্ডই আমার নিয়তি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সেই নিয়তির প্রদর্শক? জানি না। কিন্তু আমার ভয়ভীতি কিছুই রইল না। আমি পাশের ঘরে চলে গেলাম। অনেক রাত পর্যন্ত রফিক কায়সার ও ইলিয়াস ভাই কথা বললেন। আমি নিরুদ্বিগ্নভাবে টানা ঘুম দিলাম। খুব ভোরে উঠে নাশতা করলেন।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরোলেন। আমি সঙ্গে গেলাম কিছু দূর এগিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা সবাই চুপচাপ। হঠা? আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, জীবনটা একভাবে কেটে গেলেই হলো। তোর বিশ্বাস তোকে শক্তিশালী করবে। তুই তাড়াতাড়ি একবার চলে আয়।

তারা চলে গেলেন। সাপ্তাহিক রোববারের পরের সংখায় চিলেকোঠার সেপাইর যে কিস্তি ছাপা হলো, সেই কিস্তিতে দেখা গেল বল্লার কথা উল্লেখ আছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বল্লা । আমি আর ঢাকায় যাইনি। রফিক কায়সার পাথর নিয়ে এসেছিল। আমি ব্যবহার করিনি। বাড়ি বদলের সময় পাথরটা হারিয়ে যায়। আমি কোনো মূল্যবান জিনিসই ধরে রাখতে পারি না।

তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। কলকাতা থেকে চিকি?সা শেষে ঢাকায় এলে আজিমপুরের বাসায় দেখতে গেলাম। হেসে বললেন, তোর হাতের আইল্যান্ড এখনো আছে? নেই, আমি বললাম। তিনি খুশি হলেন। তারপর বল্লেন, তন্তুবায়ীদের নিয়ে আমার কাজটা তুই করিস। আমার চোখের সামনে একজন কীর্তিমান কী অসহায়ভাবে পড়ে আছেন। আমি ভাগ্যবান, আমার মতো অতিক্ষুদ্র একজন মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন।

প্রায় ১ ঘণ্টা চুপচাপ বসে থেকে শেষ বিদায় নিয়ে চলে এলাম।

৪ জানুয়ারি, ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি অবিনশ্বরের দিকে যাত্রা করলেন। আমি এখনো রয়ে গেছি হাতের তালুতে দুটি আইল্যান্ড নিয়ে। রফিক কায়সার পাবনায়, আমার পালনকর্তা। এখনো রাতে একবার ফোন করে। বলে, এত রাত জাগিস কেন?