রাত দুটো, ঘন কুয়াশায় চারপাশ ঘোলাটে। ঘুম না এলে করিডোরের ঠিক এখানটায় বসে পাশের বিল্ডিংয়ে তিন তলায় করিডোরে রাখা খাঁচার ভেতরের বাজরি পাখি দেখি। ওরা বাইরেই থাকে, আমাকে দেখলেই ছটফট করে। ডানা ঝাপটানোতে হাওয়ার ব্যস্ততা, মনে হয় কিছু বলতে চায়।

সে ভাষা বুঝতে ওদের ছটফটানো ডানার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকি, যখন ধ্যান ভাঙে, তখন খেয়াল করি শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের শান্ত, পবিত্র চাহনিতে কিছু একটা থাকে— যা আবেদন বা প্রত্যাশা, যাতে মুহূর্তেই মনে হয়; আর কিছু না হোক আমি তো মুক্ত। পরক্ষণেই মনে হয় ‘মুক্তি’ এটা তো স্বভাবের তাপমাত্রা। যা কখনো বাড়ে কখনো কমে; স্বল্পস্থায়ী বিশ্বাস। অজান্তেই মুক্তির বৈশিষ্ট্য খুঁজতে খুঁজতে ভাবনায় বন্দি হই। বুঝতে পারি; যেখানে স্রষ্টা নিজেই তার সৃষ্টিতে বন্দি, সেখানে মুক্তি শুধু একটি ধারণার নাম। যে ধারণা বন্দি পরাবাস্তব ধারণার কাছে। বস্তুত মুক্তি বলে কিছু নেই, মুক্তির ধারণাও ভাবনার অন্য রকম এক বন্দিত্ব।

পাখির খাঁচার ভেতরে হলুদ রঙের ছোট দুটো বাল্ব, এগুলো হয়তো উষ্ণতার জন্য কাজ করে। এক পাশে মোটামুটি সাইজের ছিদ্রযুক্ত একটা হাঁড়ি আছে। খাঁচার চারপাশ স্বচ্ছ প্লাস্টিকে মোড়া। তাতে ছোট ছোট কয়েকটা ফুটো। যিনি এই কাজগুলো করেছেন; তার আর আমার মধ্যে অনুভূত বন্ধুত্ব। মানে যে বন্ধুত্ব শুধু অনুভবে থাকে। সামনাসামনি কোনো দিন কথা হয়নি, দেখা হয়নি, একসঙ্গে চা খেতে খেতে আড্ডা দেয়া হয়নি, তাও বন্ধু বলছি কারণ, মানসিকভাবে মেনে নিয়েছি তিনি আমার বন্ধু।

মাঝেমাঝেই এমন হয় একদম ঘুম আসে না, ঘরে থাকা যায় না। মনে হয় দেয়াল সব চেপে আসছে, সংকীর্ণতায় আটকে নিঃশ্বাস কেড়ে নিবে। বাইরে বেড়িয়ে আকাশের দিকে মাথা উঁচু করলে শূন্য লাগে, ক্ষুদ্র লাগে নিজেকে। তখন ভীষণ রকম উড়তে ইচ্ছে করে। ভাগ্যিস করিডোরে গ্রিল ছিল। নইলে এমন ব্যর্থ অপচেষ্টায় কবেই প্রাণ হারাতাম। এখানে বসলেই তিনি আসতেন; তিনটে টুনি বাল্বের একটা লাইট জ্বালিয়ে সামনে রেখে বসে থাকতেন যতক্ষণ আমি থাকতাম। অদ্ভুত হলেও সত্যি— এতটা দূরে থেকেও আমার শ্বাস তার শ্বাসের ওঠানামা টের পেত। কি এক ঘোর বিষণ্নতায় যেন তলিয়ে যেতাম। মনে হতো; একটা পিচ্ছিল রাস্তায় দুটো পথভোলা মানুষ হেঁটে চলেছি, কেউ কাউকে চিনি না অথচ দুজন দুজনের হাতে হাত রেখে ভারসাম্য রক্ষা করছি টিকে থাকছি বৈরিতায়। দুজনই সলজ্জ হাসি ঝুলিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি অথচ আমাদের মধ্যে বিপর্যস্ততায় পড়া নিয়ে কোনো চিত্কার নেই। যেন আমি নিশ্চিত জানি সে ভালো নেই; যেন সে নিশ্চিত জানে আমি ভালো নেই। সে প্রবল আঘাতে ভেঙে ফেলে আমার স্বকীয়তার সবগুলো দরজা-জানালা, তারপর উন্মুক্ত আমিতে নির্দ্বিধায় হেঁটে বেড়ায়, পরিচয় করিয়ে দেয় বুকে রাখা সব বিষাদের সঙ্গে। সেসব বিষাদ ছুঁয়ে দেখি আলতো হাতে। আমি তো এমন নই, তবে আমার কী হয় তাকে দেখলে। অনুভূতিগুলো বিচিত্রভাবে আচরণ করে।

ভোরের আগে আগে রাত জাগা ক্লান্তিতে যখন শরীর ভেঙে আসে, তখন করিডোর ছাড়ি। ঘরে এসে জানালা দিয়ে আবার উঁকিঝুঁকি আছে কি নেই। শেষ যেদিন দেখেছিলাম, সেদিন কালো পাড়ের সবুজ রঙের শাড়ি কপালে বড় কালো টিপ পরেছিল। কানে দুটো মুক্তার টব, হাতে ছিল খুব সেকেলে ডিজাইনের এক জোড়া সোনার বালা। সেই দিনই প্রথম; দিনের আলোয় দেখা। সুন্দরী নয়, তবে মায়াবতী। কচি দুপুরের ঝকঝকে আলোর মতো তার সজীবতা, ভোরের নম্র হাওয়ার মতো তার চলন, হেসেছিলেন সামান্য, সে হাসিতে সাগর সমান গভীরতা। এর আগে কোনো দিন কোনো মেয়েকে এমন করে দেখিনি। সে ছিল আমার নিঃসঙ্গতার, একাকিত্বের, মাঝরাতের একমাত্র রহস্য ঘেরা বন্ধু। সেই বন্ধুটি গত ১৩ দিন যাবৎ আর আসে না করিডোরে। বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত দিন কাটাই যখন ফিরি, তখন আর কারো বাসায় যাওয়ার মতো সময় থাকে না। কী হয়েছে তার? কেন আর করিডোরে আসে না? সুস্থ আছে তো?

ঘাড়ের ওপর একটা শীতল হাত পড়েছে। চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে গেলাম।

- আপনি এখানে! কখন এলেন! কীভাবে এলেন? কেমন আছেন?

- অনেকক্ষণ হয় এসেছি। তুমি তো আমাকেই ভাবছিলে তাই না?

- হ্যাঁ, কীভাবে জানেন?

- জানি।

- আপনি আজো সবুজ শাড়ি পরেছেন? দারুণ লাগছে আপনাকে।

- সেদিনের অই শাড়িটাই!

- আপনার কি আর কোনো শাড়ি নেই?

- কি হবে শাড়ি দিয়ে? যেখানে এখন থাকছি; ওখানে কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জার প্রয়োজন হয় না।

- বুঝলাম না!

- তোমার কি কাল একটু সময় হবে?

- কেন?

- আমাদের ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তা ধরে গিয়ে দেখবে দক্ষিণে বাঁশের ঝাড়। সেখানে একটা বড় পুকুর আছে। পুকুরটার ঘাটের ঠিক উল্টো দিকে একটা কড়ই গাছ। গাছ থেকে দু-হাত দূরে একটি গর্ত মাটি চেপে ঢাকা দেয়া আছে। সেই গর্তে আমার শরীর পচছে। তুমি কি পুলিশকে একটু খবর দেবে?

- কী বলছেন এসব!

- হ্যাঁ, আমাকে খুন করা হয়েছে। ছুরিটা ওই পুকুরেই আছে। তাতে যে হাতের ছাপ আছে, ওটা আমার স্বামীর।

 

পৃথার মাথার শিরাগুলোর নড়াচড়া বেড়ে গেছে। চোখে ঝাপসা দেখছে; টলে পড়তে গিয়ে সামলে নিল নিজেকে, তবু এ অবয়বকে অস্বীকার করে সে চেঁচিয়ে উঠতে পারছে না। এত শীতের মধ্যে কপালে থুতনিতে ঘাম মুছতে মুছতে বলল—

- আমার সব উল্টোপাল্টা লাগছে।

- কি! কী বলছেন আপনি?

- আমি রুপন্তি। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তুমি পৃথা। সাহিত্যের ছাত্রী ছিলে। জানো, লিখিয়েরা খুব বোকা আর ভালো মানুষ হয়। আমার দেখা খুব ভালো মানুষগুলোর মধ্যে তুমি একজন। আমি জানি যে কাজটি কেউ করত না, সে কাজটি তুমি করবে। আমি ন্যায় পাব এবং তোমার জন্যই পাব। যাচ্ছি; ভালো থেকো।

- না! আপনি যাবেন না। আমার সব এলোমেলো লাগছে। মাথা কাজ করছে না। রুপন্তি - রুপন্তি! রুপন্তি কোথায় আপনি?

রুপন্তি রুপন্তি রুপন্তি

 

এই পৃথা? পৃথা? পৃথার ঘুম ভাঙে মায়ের ডাকে।

- হ্যাঁ

- কিরে কাকে ডাকছিস?

- মা! রুপন্তি এসেছিল।

- রুপন্তি, কে রুপন্তি?

- ওই যে আমাদের মুখোমুখি ফ্ল্যাটের; এই যে ওই পাখিগুলো যার।

- এত রাতে সে এখানে কীভাবে আসবে? আর এসেই যদি থাকে তো গেল কোথায়?

দেখি তোর জ্বর কত এখন।

- মা সে খুন হয়েছে!

- কে?

- রুপন্তি।

- ১০৪ জ্বর! আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি। রাতটা তোর পাশেই শোব।

- না। তুমি আমার ঘরে শোবে না।

- কোনো কথা নয়। একা একা থেকে নিজের মাথাটা খারাপ করেছিস। কেন কারো সঙ্গে কথা বলিস না? চারপাশে যারা আছে, তারা কি তোর শত্রু? মিশবে না গল্প করবে না, কোনো দাওয়াতে যাবে না, বাসায় ফিরে সেই করিডোর আর অন্ধকার।

- মা আমি ভালো আছি; নিজের মতো ভালো আছি। সবার ভালো থাকার ধরন তো আর এক নয়।

- তোর মনে আছে খালেদ ভাইয়ের কথা?

- ওই যে চিটাগং থাকতে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকত।

- হ্যাঁ, উনার বড় ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মাসে ২ লাখ টাকা বেতন পায়।

- তুমি জানলে কী করে?

- তোর বাবার সঙ্গে মাঝেমাঝে কথা হয়। মেয়ে খুঁজছে ওরা। আমি আসতে বলেছি।

- আমাদের বাসায় আবার পাত্রী এল কোথা থেকে!

- তুই আছিস।

- প্লিজ মা। আমার এসব একদম ভালো লাগে না। পুরুষ সম্পর্কে আমার বোঝাপড়া মোটেও স্বাচ্ছন্দ্যের না, এসব মন ভারী হওয়া সব বিশ্বাস নিয়ে সংসার হয় না। বেশির ভাগ পুরুষ স্বামী হওয়াকে নিরাপদ মনে করে; সঙ্গী হওয়াকে না তারা মানুষ হওয়ার আগে পুরুষ হতে চায়। স্বভাবের আচরণে বোঝাতে চায় নারীর দায় আজন্মের, তাদের কোনো দায় নেই।

‘নারী’ যে শব্দটা মানুষ হওয়ার আগে বসিয়ে দিয়ে তাকে শোষণ করা হয়, পুরুষ শব্দের হাতিয়ারে। আমি কারো রূপ দেখার আয়না হতে চাই না।

- বলাটা একেবারে মিথ্যা না। তবু মানুষ অনেকের ভার বইতে পারলেও নিজের ভার নিজে বয়ে বেড়ানো কষ্টের! তুই ক্লান্ত হয়ে যাবি।

- মা; যাবে?

- কোথায়?

- পুকুরপাড়ে।

- জ্বরের ঘোরে কি না কি স্বপ্ন দেখেছিস।

 হাল ছাড়া ভাব নিয়ে পৃথা বলল, হুম। হতে পারে। তাহলে চলো সকালে ওই ফ্ল্যাটে যাই। অনেক দিন হয়েছে উনাকে দেখি না। ক্যামন আছেন তিনি অন্তত এটুকু জানা যাবে।

- আচ্ছা সে দেখা যাবে। এখন একটু ঘুমো।

চারদিকে স্তব্ধ, কোনোদিক থেকে কোনো রকম শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে একটা কুকুর থেমে থেমে ডেকে উঠছে করুণ সুরে। রক্ষীরা খানিক পর পর হাঁকডাকে সাবধান করে যাচ্ছে অসাধু মানুষদের। একেই বুঝি রাতের জীবন বলে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ঝাপসা সব। আমি হাঁটছি একা একা নির্জন কোনো রাস্তা ধরে। রাস্তা ছেড়ে ক্ষেত, ক্ষেত ছেড়ে মাঠ, বাঁশঝাড়। কোথায় যাচ্ছি আর কেনইবা যাচ্ছি!

বেশ শীত শীত করছে; রাস্তাটাও স্যাঁতসেঁতে, বোধহয় খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেল।

আহা; চারদিক কি নিস্তব্ধ, সতেজ হাওয়া। বৃষ্টি ভেজা ঘাসের মোহনীয় গন্ধে ভালো লাগায় শরীর শিউরে উঠছে। কে যেন দাঁড়িয়ে আছে গাছের আড়ালে। এত রাতে এই শীতে তার কোমরসমান চুল উড়ছে পিরপিরি হাওয়ায়, আকৃতিতে তো নারী মনে হচ্ছে।

একি! সবুজ শাড়ি!

রুপন্তি!

রুপন্তি আপনি আবার এসেছেন?

- আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না?

- পারছি। অবশ্যই পারছি।

- তুমি খেয়াল করেছ পাখিগুলো আর আগের মতো চঞ্চল নেই। ঝিমিয়ে পড়েছে, ডাকে না, কথা বলে না।

- (শূন্য দৃষ্টি নিয়ে পৃথা তাকিয়ে) হ্যাঁ করেছি।

- ওদের খাবার শেষ, না খেয়ে আছে, বাসায় কেউ নেই ওদের দেখাশোনার জন্য।

পৃথা, আমার পাখিগুলো তুমি নেবে? আমি ওদের খুব ভালোবাসি, বাবা কিনে দিয়েছিলেন। বাবা পাখিগুলোর নামও দিয়েছিলেন। শুনবে নামগুলো?

- হ্যাঁ

- তিতলি, মিথলি, মুনিয়া আর আদুরী; বাবা বলতেন এরা চারটে তোমার বোন। আমি বাবাকে বলতাম; তুমি সব মেয়ের নাম দিলে কেন? এখানে তো ছেলে পাখিও আছে। বাবা হাসতেন আর বলতেন; ছেলেমেয়েদের যত ভেদাভেদ তা শুধু মানুষে। এরা পাখি, এগুলোর একটাই পরিচয়। তাছাড়া পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর যা কিছু, তার মধ্যে মেয়ে অন্যতম। তাই এদের সবার নাম মেয়ের নামে রাখলাম। আমি রেগে যেতাম, তর্ক করতাম, যুক্তি দেখাতাম। বাবা শুধু হাসতেন; আসলে বাবা আমার বাচ্চামো দেখতে চাইতেন।

একদিন অনেক সময় নিয়ে তোমাকে আমার বাবার গল্প করব। আমার বাবা আকাশ কিনা, তাই স্বল্প শব্দে তার গল্প করা যাবে না। তুমিই বলো এভাবে কয়েক লাইনে কি আকাশের গল্প শেষ হয়?

- কি চমত্কার করে কথা বলেন আপনি!

- পৃথা; চারপাশে যারা আছে, এরা সবাই একেকটা মুখোশ। মুখোশ ছিঁড়ে মানুষ বের করা সহজ নয়। আমার স্বামী যার জন্য আমার নিঃসঙ্গ বাবাকে আরো নিঃসঙ্গ করে তার ঘরে পা রাখা, সেও মানুষ অবয়বের সামনে একটা মুখোশ। যদি বুঝতাম, চিনতে পারতাম, তবে আজ এমন দিন আমার জীবনে আসত না। ভাগ্যে বিশ্বাসী নই আমি। মানুষ যেমন কর্ম করবে, তেমনই ফল পাবে। তুমি জানো; নীলয় তোমাকে ভালোবাসে না। তুমি ওর জন্য একটা লাকি কুপন মাত্র, যার ব্যবহার ফুরালে মুচড়ে ফেলে দেবে নিমিষে। তুমি কি ভাবছ নীলয় ফিরবে?

জানি তুমি ওর অপেক্ষা করেই বিয়েতে মত দিচ্ছ না। সে এখন অন্য কাউকে নিয়ে ব্যস্ত। বিশ্বাস করো নীলয় যদি ফেরে, তবে তার লাভের উদ্দেশ্য হাসিল করতেই ফিরবে।

শুনে মন খারাপ হলো?

রুপন্তির কথাগুলো শুনে বুকের পুরনো কোনো কষ্ট দুমড়ে মুচড়ে গলায় উঠে এল। গম্ভীর সুরে বলল—

- না।

- যাই পৃথা। পাখিগুলোর যত্ন নিও। ওদের তোমার কাছে রেখো।

- না রুপন্তি; যাবেন না। অনেক দিন মন খুলে কথা বলিনি কারো সঙ্গে। কার সাথে কথা বলব, কেইবা আছে যে নীরবতার কোলাহল বোঝে। আপনার সঙ্গে কথা বলতে দারুণ লাগছে, যাবেন না। আজ সারা রাত গল্প করব। অনেক গল্প, যাবেন না রুপন্তি, খুব একা লাগে একটা চাঁদের মতো একা। একটা জ্বলন্ত সূর্যের মতো একা। খাঁ খাঁ মাঠে এক পায়ে ভর করে থাকা কোনো গাছের মতো একা। থাকুন রুপন্তি, দয়া করে তখনকার মতো ফাঁকি দেবেন না।

- পৃথা যাবে? এখন যেখানে আছি?

চমত্কার জায়গা। সারা রাত জ্যোস্নার হাট, সারা দুপুর দুরন্ত কিশোরির মতো ছুটে বেড়ায় এলোমেলো হাওয়া, সন্ধ্যাটা নেমে এলে মনে হবে কোনো বৃদ্ধ পিতা হারিয়ে যাওয়া ভরসা ফিরে পাওয়ার স্বস্তিতে যে শ্বাস ফেলছে, সে শান্তি চাদরে জড়িয়ে নিচ্ছে আমাদের সবাইকে। ওখানে পোশাক, সম্পদ, রূপের সদ্ব্যবহার কিছুই দরকার পড়ে না। ক্ষুধা মেটাতে কোনো সং সাজতে হয় না। তুমি সবার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে। ঘৃণা নেই; হিংসে নেই। সবুজ আর সবুজ; মেঘের বিস্তৃত প্রান্তরে যত দূর দৃষ্টি যাবে, ততদূর খুঁজে পাবে প্রকৃতির ১০ দুয়ারী রূপ।

পৃথা শুনতে শুনতে যেন সেখানেই খুইয়ে গেল। রুপন্তি আবার বলল, ‘কি যাবে তো?’

চমকে উঠে পৃথা উত্তর দিল—

- যাব। যে আনন্দ সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মের মধ্যে পড়ে না, সে আনন্দ কুড়ানোর সখ আমার আজন্মের; আমি যাব রুপন্তি। কত দিন হয়েছে মন খুলে কথা বলিনি। একটা বিকলাঙ্গ শিশুর মতো নিজেকে নিয়ে নিজের দ্বিধা নিয়ে একা চলছি, সব আত্ম অতৃপ্তি বুকে চেপে। নিরুত্তাপ ভেজা স্বরে বলে গেল পৃথা—

জানেন রুপন্তি; এখন আর এই পরিণত জীবনটা ভালো লাগে না। এই জীবনে যা করতে হয়, বলতে হয়, সব মেপে মেপে সাবধানে। এত মাপজোখ করে কথা বলা সত্যিই বড় দুরূহ কাজ। কথা হবে ঢেউয়ের গতিতে; যার ছুটে আসার সঙ্গে উপচে পড়বে মনের যত জমা কষ্টের ফেনা। কথা শেষ হবে ঢেউয়ের শেষ দৃশ্যের মতো; নেমে যেতে যেতে রেখে যাবে শান্তি, সঙ্গে দিয়ে যাবে তার প্রশস্ত বুকের উদারতায় বাড়ন্ত সম্পদ। বলতে পারেন রুপন্তি; জন্ম থেকে মানুষ আকাশের তলে বেড়ে উঠেও কেন মানুষ আকাশের মতো করে ভাবতে পারে না? আজ কারো কাছে হালকা হওয়ার লোভে নিরাপদ ভেবে নিজের গোটা দুঃখ জমা রাখবেন; হয়তো কাল সেই মানুষটিই প্রয়োজনে আপনার দুঃখগুলো খুচরো পয়সার মতো ভাঙিয়ে ঝনঝন করে বিলি করে বেড়াবে এর-ওর কাছে। রুপন্তি আপনাকে নীলয়ের গল্প বলব; শুনবেন?

বলে পৃথা রুপন্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতেই দেখা গেল রুপন্তি ধীরে ধীরে হেঁটে চলে যাচ্ছে। যে পথ ধরে এগোচ্ছে, তার খানিকটা সামনেই বড় গভীর খাদ। পৃথা বিপদ টের পেয়ে পেছন থেকে ডাকতে শুরু করেছে, রুপন্তি সামনে খাদ দাঁড়ান, আর আগাবেন না, দাঁড়িয়ে পড়ুন।

রুপন্তি কোনো কিছু না শুনে নিজের মতো আগাতে থাকল; এদিকে পৃথা উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটতে ছুটতে ডাকতে লাগল রুপন্তিকে। হঠাৎ রাতের নীরবতা ভেঙে ছুটে এল এক বিকট চিত্কার, যা আকাশ কাঁপিয়ে বাতাসের বেগে সারা মাঠ ঘুরে নিমেষে মিলিয়ে গেল খাদের গভীর তলানিতে। দিশেহারা পৃথা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—

 

- পৃথা; এই পৃথা? কি হয়েছে কাঁদছিস কেন?

চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে সারা ঘরে ডিম লাইটের হালকা হলুদ আলোতে ছায়া ছায়া অন্ধকার; পর্দাগুলো বাতাসে দুলছে ট্রেন দুলুনির মতো। রুপন্তি নেই। রুপন্তির গায়ের গন্ধ এখনো বাতাসে ভুরভুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

- মা কিছু টের পাচ্ছ?

- কী?

- হালকা মিষ্টি গন্ধ, কি পবিত্র অনুভূতি! রুপন্তির গা থেকে এমন গন্ধই পাচ্ছিলাম। মা রুপন্তি আবার এসেছিল।

- তোর জ্বর কি আবার বাড়ল! বোস, থার্মোমিটারটা নিয়ে আসি।

- মা; সকালে আমরা ওই পুকুরপাড়ে যাচ্ছি ক্যামন?

- তুই জানিস এখন তোর জ্বর কত?

- জানতে চাই না।

- ঘুমা। এ নিয়ে সকালে কথা হবে।

- মা; আমার গায়ে তোমার হাতটা রাখো। এরপর আবার যখন রুপন্তি আসবে, তোমাকে আলাপ করিয়ে দেব। কি সুন্দর ফুটন্ত সুন্দর মুখ! তুলির আঁচড়ে শিল্পীর যত্নে আঁকা জীবন্ত সুন্দর। বিস্মিত সুন্দর তার কথা, মা তুমি না দেখলে বিশ্বাস করবে না যে একটা মানুষ গায়ের বর্ণে উজ্জ্বল না হয়েও এতটা মায়াবী হতে পারে।

- আহ্?! পৃথা এবার তো থাম।

পৃথা চুপ করে পিঠ ঘুরিয়ে নিল। চুপচাপ থাকতে থাকতে চোখ লেগে এল তার।

 

    (২)

সামনে প্রেসের লোকজন। মাথার সামনে উপরে ঝকঝকে আলো। মুখের সামনে নামিদামি চ্যানেলের মাইক। সবাই অপেক্ষা করছে পৃথার মুখ থেকে কিছু শোনার। পৃথা পাখির খাঁচা কোলের ওপর রেখে তাদের নিয়ে খেলতে ব্যস্ত। সবাই একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না। পৃথার বাবা আর মা এক ঘরের কোণে বিব্রত মুখ নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। নীরবতা ভেঙে কেউ একজন নরম সুরে জানতে চাইল—

- আমরা জানতে পেরেছি রুপন্তি পাখিগুলোর নাম দিয়েছিল। কিন্তু আপনি পাখিগুলোকেই রুপন্তি ডাকছেন, এটা কি আপনার দেয়া নাম?

- (হালকা চোখ তুলে আবার মাথা নুইয়ে) হ্যাঁ এদের নাম রুপন্তি। এদের সবার নাম রুপন্তি। পাখির নাম রুপন্তি।

বলার পর পৃথার চোখে মুখে বলতে পারার উচ্ছল দীপ্তি ছড়িয়ে গেল।

এবার শুরু হলো একের পর এক প্রশ্ন।

- আচ্ছা পৃথা! আপনার মায়ের মাধ্যমে যতটুকু জেনেছি, তাতে বোঝা যায় আপনি জ্বরের ঘোরে রুপন্তিকে দেখেন এবং সেই অনুযায়ী পুলিশের সাহায্য নিয়ে মাটির তল থেকে রুপন্তির লাশ উদ্ধার করেন। এ ব্যাপারে আপনি কি আমাদের কিছু বলবেন?

পৃথা অত্যন্ত বিনয় ও ভদ্রোচিতভাবে জবাব দিল, তাহলে তো পুরোটাই জানেন, আর বিশেষ কি শোনার জন্য এমন আয়োজন, তা জানতে পারি?

- দেখুন পৃথা, রুপন্তির লাশ পাওয়া গেছে সত্যি কিন্তু তার কোনো আত্মীয়-স্বজন তার স্বামী কারো কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অবস্থাটা কি আপনার কাছে স্বাভাবিক কিছু মনে হচ্ছে? তাছাড়া আমরা কোয়ারি থেকে যতদূর জানি, রুপন্তির স্বামী বিয়ের পর কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যা নিয়ে তাদের দাম্পত্য জীবনে ছিল নানা অশান্তি। আমরা ধারণা করছি, সে সম্পর্ক টেকাতেই খুনের শিকার হয়েছেন রুপন্তি। এ নিয়ে আপনার মতামত কী? মানে রুপন্তি কি এ ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেছে?

- না বলেনি। তাছাড়া আপনারা আমার চেয়ে অনেক বেশি জানেন।

- আরেকজন বলল, এমনও তো হতে পারে, সম্পর্ক জড়ানো সেই মেয়েটা আপনি। আপনারা প্ল্যান করে এসব করে একটা নাটক তৈরি করেছেন এই প্ল্যানের শেষটুকুর পরিণাম দিতে।

কথাটা শুনে পৃথা যেন হোঁচট খেল। অনুভূতির কোনো এক প্রান্তে জোরে আঘাত পেয়ে মূহর্তেই উগ্র হয়ে উঠল।

- বাহ! আপনারা শুধু বেশি জানেনই না, ভালো গল্পও বানাতে জানেন। ক্যারি অন গাইজ।

পৃথার কথা শেষ হতেই আবার সবাই চুপচাপ চাপা কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিরক্তিভরা উত্কণ্ঠায় চেঁচিয়ে উঠল পৃথা, এখনো কেন দাঁড়িয়ে আছেন সবাই? এখানে কি ভিনগ্রহ থেকে ব্রোঞ্জের জীবন্ত হনুমান হাজির হয়েছে, যা লাইভ দেখাবেন! বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান সবাই।

পৃথার এমন উত্তেজিত রূপে মুহূর্তের মধ্যে ঘর খালি হয়ে গেল। দ্রুত পা চালিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল পৃথা। ঘরে গিয়ে কাঁথা মুড়ে শুয়ে আছে। বিছানার এক পাশে পাখির খাঁচা। নির্মোহ জিজ্ঞাসা চোখে তাকিয়ে রয়েছে আর চোখের কোনো গড়ে জল ভিজিয়ে দিচ্ছে বালিশ। জিজ্ঞাসা, দ্বিধা, জানার অদম্য কৌতূহল জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে উগ্র করে তুলেছে পৃথাকে। ধমনীতে দৌড়ে বেরাচ্ছে ভয়, গভীর আত্মজিজ্ঞাসায় নির্বাক চোখ যেন নির্মমভাবে হত্যা করছে নিজেকেই।

বেশ কিছু সময় মেয়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পৃথার মা হাজির হলেন মেয়ের ঘরে। দরজা খুলতেই চোখে পড়লো পৃথার ক্লান্ত মুখ, বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়ছে পৃথা। কাছে গিয়ে কপালে হাত ছোঁয়াতেই চমকে উঠল মা। জোরে জোরে পৃথার বাবাকে ডাকতে শুরু করলেন, পৃথার বাবা পাশের ঘর থেকে দৌড়ে ছুটে এলেন।

পৃথা অস্ফুট ঠোঁটে মাকে ছোট ছোট করে বলছে, মা আমি কোথাও যাব না। জ্বর না এলে রুপন্তি আসবে না। এখন রুপন্তি আসবে মা; তোমরা যাও, রুপন্তি আসবে মা। এলে জিজ্ঞেস করব নীলয় ওর কে হয়? ও কী করে আমাকে জানে, নীলয়কে জানে। আমার জানা দরকার মা; প্লিজ মা তোমরা যাও। যাও মা।

- রুপন্তি আসুন প্লিজ; আপনাকে অনেক কিছু বলার আছে, অনেক কিছু জানার আছে। আর পারছি না রুপন্তি; বুকের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। আর দেরি করবেন না, আসুন প্লিজ।

পৃথার মা শক্ত করে পৃথার হাত নিজের হাতের ভেতর ধরে আছে। নিরুপায় মুখে কোমলতা মেশানো আদরে পৃথাকে সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন।

হঠাৎ পৃথা একদম চুপ হয়ে শরীর এলিয়ে দিল। হাতের ভেতর রাখা হাতটার অনুভূতির পরিবর্তন পৃথার মায়ের গলায় চিত্কার আনল।

পাখিগুলো কিচিরমিচির করে চেঁচাতে শুরু করেছে; ছটফট করে খাঁচার পাতলা শিক দাঁত দিয়ে কামড়ে কোরকরে আওয়াজ তুলে চারদিকে অশান্ত করে তুলেছে। এদিকে পৃথার মা ক্লান্তিহীনভাবে ডেকে চলেছে পৃথাকে।

টুঁ শব্দটিও করল না পৃথা। পাখির কিচিরমিচির আর পৃথার মায়ের আর্তনাদ মিলেমিশে এক হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকারকে শোকের ঘন চাদরে মুড়িয়ে দিল।