উত্তর আফ্রিকার কল্পনাতীত বিশাল মরুভূমির পুব প্রান্তে নীল নদের দুই তীরে কয়েক মাইল বিস্তৃত এক চিলতে উর্বর সবুজ জমিনের জোগান দিয়েছে। মিসরীয় সভ্যতা বরাবরই গুটিগুটি পায়ে এগোতে থাকা অনেকটা যেন ভাসিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়ে চলা সাগরের মতো মরুভূমিতে ঘেরাও হয়ে আঁটসাঁট অবস্থায় ছিল। এমনকি মাথাচাড়া দেয়া আধুনিক কায়রোতেও লোভী মরুপ্রান্ত থেকে ধেয়ে আসা বালি ঝেটিয়ে বিদায় করতে কাকভোরে হাজির হয় ঝাড়ুদাররা।
দুই তীরের সুবজ জমিন শেষ হয়ে যেখানে মরুভূমি শুরু, ঠিক সেখানেই প্রাচীন মিসরের সমাধিক্ষেত্রের খোঁজ মিলেছে। খ্রিস্টের জন্মের আনুমানিক তিন হাজার বছর আগে থেকে এগুলোর শুরু, সিচুয়ানে লবণ তৈরির সবচেয়ে পুরনো যে দলিল মেলে সেই একই সময়ের, তবে মহান মিসরীয় রাজ্য এবং এমনকি মিসরীয় সভ্যতার বৈশিষ্ট্য হায়ারোগ্লাফিক্স আমলেরও আগের। এই প্রাচীন গোরস্থানের শবে এখনো মাংস ও ত্বকের অবশেষ রয়ে গেছে। মমি না হলেও পাঁচ হাজার বছর আগের মরদেহ হিসেবে বিস্ময়করভাবে বেশ ভালোভাবেই সংরক্ষিত। মরুভূমির শুকনো লোনা হাওয়া এগুলোকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি প্রাকৃতিক এই মরু-ঘটনা মাংস সংরক্ষণ সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা ধরে রেখেছে।
মিসরীয়দের কাছে মরদেহ পরলোকের সঙ্গে ইহকালের সংযোগের মাধ্যম ছিল। ব্যক্তির প্রতিমা এমনকি মৃতের নাম জপ করেই চিরন্তন জীবন টিকিয়ে রাখা যেত। তবে আদর্শ চিন্তা ছিল মৃতদেহ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার সব পর্যায়েই সমাধির দুটো অংশ ছিল: মৃতদেহ রাখার জন্য ভূগর্ভ এবং বিভিন্ন উত্সর্গের জিনিসপত্র রাখতে উপরে একটা এলাকা। অপেক্ষাকৃত সহজ ধরনের কবরস্থানে উপরের অংশটুকু স্রেফ খোলামেলা কোনো জায়গাও হতে পারত।
উপরের অংশটুকু খাবার তৈরি ও খাবারের প্রতি প্রাচীন মিসরীয়দের গুরুত্ব দেয়ার ব্যাপারটা স্পষ্ট করে তোলে। এ জায়গাগুলোয় জাঁকালো শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হতো, বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে রাখা হতো প্রসাদ হিসেবে। ভোজ এবং কখনো কখনো খাবার তৈরির ছবি আঁকা হতো দেয়ালে। প্রাচীন মিসরীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পর্যায়ই খাবার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জোগানো সমাধির জন্ম দিয়েছে। মৃতের সুবিধার কথা ভেবে এসব রাখা হলেও উত্তরপুরুষের জন্য বিস্তারিত ও উদ্ভাবনী প্রাচীন খাবার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা জুগিয়েছে।
হতদরিদ্রদের হয়তো ফোলানো রুটি, মদ আর পেঁয়াজ খাওয়ার তেমন একটা সাধ্য ছিল না। পেঁয়াজের পল্লাগুলো মহাবিশ্বের সমকেন্দ্রিক বৃত্তের অনুরূপ বিশ্বাস করে মিসরীয়রা পেঁয়াজ এবং রসুনকে অসাধারণ ঔষধি ক্ষমতার অধিকারী মনে করত। মৃতের মমিতে পরিণত লাশের ওপর পেঁয়াজ ছড়িয়ে দেয়া হতো, অনেক সময় চোখের জায়গায় বসানো হতো। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালে জন্মগ্রহণ করা আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার জনক হিসেবে বিবেচিত গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২৯০০ সালে নির্মিত গিজার পিরামিডের সমাধির বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এক দেয়ালের খোদাইলিপিতে ২০ বছরের নির্মাণকালে নির্মাতা শ্রমিকদের বর্তমান ডলারের হিসাবে প্রায় ২ মিলিয়ন সমান মূল্যের ১ হাজার ৬০০ ট্যালেন্ট রুপার সমান দামি ঢেঁড়শ, পেঁয়াজ এবং রসুন জোগান দিয়েছেন।
তবে বিত্তশালীদের বেশ বৈচিত্র্যময়, সম্ভবত তাদের আমলের সবচেয়ে উন্নত মানের খাবার ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ বছর আগের সমাধিতে পাওয়া খাবারের অবশেষের ভেতর কোয়েল, কবুতরের স্ট্যু, মাছ, গরুর সিনা, কিডনি, বার্লি পোরিজ, ময়দার রুটি, ডুমুরের স্ট্যু, জাম, পনির, মদ ও বিয়ার ছিল। সমাধিতে পাওয়া উত্সর্গের অন্যান্য জিনিসের ভেতর লোনা মাছ এবং পাতের লবণঅলা একটা কাঠের পাত্র ছিল।
মিসরীয়রা লোনা জল সিরকার সঙ্গে মিশিয়ে ওক্সালিন নামে পরিচিত সস হিসেবে ব্যবহার করত। পরবর্তীকালে রোমানরা এটা ব্যবহার করেছে। সিচুয়ানের চীনাদের মতো মিসরীয়রা লোনা জল বা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা সবজির সমঝদার ছিল। ‘লোনা সবজির চেয়ে দারুণ আর কিছু হয় না,’ প্রাচীন প্যাপিরাসের বুকে এই কথাগুলো লেখা ছিল। লোনা জলে সংরক্ষিত মাছ বা মাছের নাড়িভুঁড়ি দিয়ে এক ধরনের চাটনিও বানাত ওরা। সম্ভবত চীনা পূর্বসূরি সয়া সসের মতো কিছু হবে।
প্রাচীন মিসরীয়রাই হয়তো প্রথম লবণ দিয়ে মাংস-মাছ সংরক্ষণ করেছিল। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ২০০০ সালের দিকে লবণ দিয়ে মাছ সংরক্ষণের সবচেয়ে প্রাচীন তথ্য মেলে। মিসরীয় সমাধিতে অপেক্ষাকৃত আরো আগের লোনা মাছ ও পাখি পাওয়া গেছে। লবণে মাংস সংরক্ষণ করলে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর কারণ জলীয় উপাদান শুষে নেয়। এছাড়া, খোদ লবণ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। আরো ভয়াবহ ব্যাকটেরিয়া ঘাতক সল্টপিটারের মতো অন্যান্য লবণে প্রাচীন সোডিয়াম ক্লোরাইডের কিছু মিশেল পাওয়া গেছে। উত্তাপে প্রোটিন উন্মুক্ত হয় এবং লবণের বেলায়ও একই ব্যাপার ঘটে। সুতরাং, লবণ মেশানোর সঙ্গে রান্নার মতো এক ধরনের প্রভাব রয়েছে।
এই প্রক্রিয়া মিসরীয়রাই প্রথম আবিষ্কার করুক বা না করুক, নিশ্চিতভাবে বিপুল মাত্রায় খাবার সংরক্ষণকারী প্রথম সভ্যতা ছিল ওরাই। নীল নদের দুই তীরের ওই সংকীর্ণ উর্বর জমিনই খাবারের প্রধান উত্স ছিল। কোনো বছরে নীল নদে প্লাবন না হলে খরা মৌসুমে পরিণাম ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াতে পারত। তৈরি থাকার খাতিরেই মিসরীয়রা বিশাল বিশাল সাইলোতে শস্য মজুদের পাশাপাশি সম্ভাব্য সব উপায়ে খাবার ধরে রাখত।
খাবার সরবরাহ টিকিয়ে রাখার এই ঝোঁক সংরক্ষণ এবং গাজনের গুরুত্বপূর্ণ ধারণার জন্ম দিয়েছে। লবণ দিয়ে মাংস সংরক্ষণ করায় এবং শুয়োর পোষ মানানোর কৌশলও জানা থাকায় এই প্রাণীর প্রতি ঘৃণা না থাকলে মিসরীয়রাই হয়তো প্রথম হ্যাম আবিষ্কার করত। কিন্তু মিসরীয় ধর্মগুরুরা শুয়োরকে কুষ্ঠ রোগের বাহক এবং শুয়োর পালকদের অস্পৃশ্য ঘোষণা করেছেন, সমাধি প্রাচীরে কোনোদিনই এই পশুর ছবি তুলে ধরেননি। মাংসের চাহিদা মেটাতে গ্রামের সীমান্তে এঁটো খাবার আর মরা পশুর খোঁজে থাকা হায়েনা পোষ মানানোর চেষ্টা করেছেন তারা; কিন্তু বেশির ভাগ মিসরীয়ই এমন একটা পশুর মাংস খাওয়ার চিন্তাকেই বিতৃষ্ণ নয়নে দেখেছে। অন্যান্য পশু পোষ মানানোর মিসরীয়দের ব্যর্থ চেষ্টার ভেতর রয়েছে অ্যান্টিলোপ, গাজলা হরিণ, ওরিক্স ও আইবেক্স।
উত্তর সিনাই এবং বর্তমান উত্তর ইসরায়েলি নেগেভ মরুভূমিতে এমনি ব্যর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষার অবশেষে এসব পশুর খোঁয়াড়ের ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মিলেছে। তবে মিসরীয়রা বুনো পাখপাখালি— হাঁস, কোয়েল, কবুতর ও পেলিক্যান— পোষ মানাতে শিখেছিল। প্রাচীন দেয়ালে পাখির ছাল খসিয়ে লবণ মেখে বড় বড় মাটির পাত্রে রাখার দৃশ্য রয়েছে।
নীলের জলাভূমি মিসরীয় খাবারের একটা বিরাট উত্স ছিল, আগাছায় ভরা এসব জলাভূমিতে বুনো পাখির পাশাপাশি রুই, ঈল, মিলেট, পার্চ ও টাইগার ফিশ পাওয়া যেত। মিসরীয়রা এসব মাছের বেশির ভাগই লোনা করত। মিলেটের ডিম লবণে শুকিয়ে সংরক্ষণও করত, এভাবে ইতালীয় ভাষায় বোতারগা নামে পরিচিত আরেক মহান মধ্যপ্রাচ্যীয় খাবার সৃষ্টি করেছিল।
মিসরীয়রা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাবার উদ্ভাবনেরও দাবিদার: জলপাই গাছের ফল থেকে ভোজ্যতেল। প্রায় সব মধ্যপ্রাচ্যীয় সংস্কৃতিই এটা আবিষ্কারের কৃতিত্ব দাবি করে। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছর আগের মিসরীয়রা দেবতা ওসিরিসের স্ত্রী দেবী আইসিস তাদের জলপাই ফলানোর কায়দা শিখিয়েছেন বলে বিশ্বাস করত। গ্রিকদেরও একই ধরনের কিংবদন্তি রয়েছে। কিন্তু জলপাইয়ের হিব্রু প্রতিশব্দ জইত সম্ভবত গ্রিক শব্দ ইলেইয়ার চেয়েও প্রাচীন হয়ে থাকবে এবং নীল ডেল্টার সেইদের কথা বোঝায় বলে ভাবা হয়। সিরিয় বা ক্রিটানরা সম্ভবত প্রথম বেহাল শীর্ণ বুনো ওলিয়েস্টার গাছ থেকে ওলিয়া কারোপিয়ার জন্ম দিয়ে থাকবে। মিসরীয়রা জলপাই তেলের উৎপাদক হিসেবে তেমন সুবিধার ছিল না, মধ্যপ্রাচ্য থেকেই বেশির ভাগ জলপাই তেল আমদানি করত। জলপাই গাছের টাটকা ফল ভীষণ শক্ত, টক ও আকর্ষণহীন হওয়ায় একে খাওয়ার উপযুক্ত করতে লম্বা সময় গবেষণা চালানোর ব্যাপারটা অবাক করার মতো। তবে মিসরীয়রা বেশ আগেই পানিতে ভিজিয়ে এখন ওলিউরিইনা নামে পরিচিত এর তেতো গ্লুসাইডস দূর করা এবং লোনা জলে নরম করার কথা জানত। লবণ একে কেবল খাবার যোগ্যই নয়, বরং উপভোগ্য করে।

ভালো খাবার জলপাইয়ে তেলের পরিমাণ কম হওয়ায় জলপাই চাষ ও জলপাই তেল তৈরির ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর। হয়তো এটাই মিসরীয় জলপাইয়ের বৈশিষ্ট্যই ছিল। এই খাবার জলপাইই প্রাচীন মিসরীয় সমাধির খাদ্যভাণ্ডারে যোগ করা হয়েছিল।
মিসরীয়রা ফোলানো রুটির উদ্ভাবক ছিল। বার্লি কিংবা মিলেট নয়, ফোলানো রুটি বানাতে এক ধরনের আঠা তৈরিকারী শস্যের দরকার ছিল। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের দিকে মিসরীয়রা গম আবিষ্কার করে। এই গম গুঁড়ো করে ইস্ট থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড ধরে রাখার মতো তাল বানানো যেত। সূচনার ইস্ট প্রায়ই রয়ে যাওয়া তাল, টক হয়ে যাওয়া তাল ছিল, ল্যাকটিক অ্যাসিড গাজনের আরেকটা নজির ছিল এটা। মিসরীয় রুটি তৈরিকারীরা অনেক সময় মধু, দুধ বা ডিম মিশিয়ে বিভিন্ন আকারে নানা ধরনের রুটি উদ্ভাবন করেছিল; আধুনিক কালের রুটির মতো এসব তাল ময়দা, পানি এবং এক চিমটি লবণের মিশেল দিয়ে বানানো হতো।
খ্রিস্টপূর্ব ১২৫০ সালে পয়গম্বর মুসা সিনাই মালভূমির ওপর দিয়ে হিব্রু ক্রীতদাসদের মুক্ত করে নিয়ে গিয়েছিলেন। হিব্রুরা সঙ্গে করে কেবল হিব্রু বাগধারা লিচেন ওনি, অর্থাত্ ‘গরিবের রুটি’ বাক্যবন্ধ দিয়ে প্রকাশিত চ্যাপ্টা, না ফোলানো রুটি মাতযো নিয়ে গিয়েছিল। দরিদ্র মিসরীয়দের মিসরীয় ফোলানো রুটির বিপুল বৈচিত্র্য ছিল না, তবে মিসরের বাইরের অন্য জাতির মতো তা নামে পরিচিত রুটি খেত, অনেক সময় তাতে কর্কশ শস্য, এমনকি ভুসিও থাকত। ‘এক চিমটি লবণের’ বিলাসিতার অভাব ছিল তাতে।
ইহুদি কিংবদন্তি অনুযায়ী পলায়মান হিব্রুরা ফোলানোর সময়ের অভাবে চ্যাপ্টা রুটি নিয়ে গিয়েছিল। তবে হয়তো এই জিনিস বানাতেই অভ্যস্ত ছিল ওরা কিংবা সম্ভবত এটা হয়তো মিসরীয় সংস্কৃতি এবং দাস মালিকদের বিলাসিতার সচেতন প্রত্যাখ্যান ছিল। ফোলানো রুটি এবং লোনা সংরক্ষণ উচ্চবিত্ত মিসরীয়দের প্রতীক ছিল।
নীল ডেল্টার লোনা জল বাষ্পীভবন করে মিসরীয়রা লবণ তৈরি করত। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্যের সুবাদেও হয়তো কিছু পরিমাণ লবণ জোগাড় করে থাকবে। স্পষ্টতই আফ্রিকান বাণিজ্য, বিশেষ করে
লিবিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে লবণ আমদানি করত ওরা। কিন্তু তাদের নিজস্ব শুকিয়ে যাওয়া লবণ হ্রদ এবং লবণের ভাণ্ডারও ছিল। এটা বিদিত যে ‘উত্তরের লবণ’ নামের খাবার লবণ এবং সম্ভবত মেম্ফিসের কাছে একটা হ্রদ থেকে আসা ‘লাল লবণ’ নামে পরিচিত লবণসহ বেশ কয়েক ধরনের লবণ ছিল তাদের।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর রসায়নবিদরা বিভিন্ন লবণের উপাদান শনাক্ত ও নামকরণ করার বহু আগেই প্রাচীন আলকেমিস্ট, চিকিত্সক এবং রাঁধুনীরা ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ ও রাসায়নিক উপাদানের বিভিন্ন লবণের কথা জানত এবং সেগুলোকে বিভিন্ন কাজের উপযুক্ত করে নিয়েছিল। চীনারা সল্টপিটার, পটাশিয়াম নাইট্রেট বিচ্ছিন্ন করে গানপাউডার আবিষ্কার করেছিল। মিসরীয়রা সামান্য পরিমাণ সোডিয়াম ক্লোরাইডসহ সোডিয়াম হাইড্রোকার্বোনেট এবং সোডিয়াম কার্বোনেটের মিশ্রণে একটা লবণ আবিষ্কার করেছিল, যদিও একে এভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। কায়রো থেকে আনুমানিক ৪০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে একটা ওয়াদিতে— শুকনা নদীর বুকের আরবি শব্দ— প্রাকৃতিকভাবেই এই লবণ পেয়েছে ওরা। জায়গাটার নাম ছিল নাত্রোন এবং ওয়াদির নামেই লবণের নাম নেত্রি বা নাত্রোন রাখা হয়। ‘সাদা’ ও ‘লাল’ রঙের নাত্রোন পাওয়া যায়, যদিও সাদা নাত্রোন সাধারণত ধূসর এবং লালটা গোলাপি হয়ে থাকে। প্রাচীন মিসরীয়রা নাত্রোনকে ‘স্বর্গীয় লবণ’ বলে উল্লেখ করত।

মিসরীয় সুদীর্ঘ সত্কার অনুষ্ঠানের শেষ আচারটি ‘মুখ খোলা’ নামে পরিচিত ছিল। এখানে পার্থিব পুষ্টি লাভের ভূমিকা হিসেবে সদ্যোজাত শিশুর নাড়ি-কাটার মতোই প্রতীকী নাড়ি-কাটা মৃতদেহকে পরকালে ভোগের জন্য মুক্তি জোগাত। খ্রিস্টপূর্ব ১৩৫২ সালে ১৮ বছর বয়সে মারা যায় শিশু ফারাও তুতেনখামেন। ১৯২২ সালে আবিষ্কৃত তার সমাধিটি এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে চমত্কারভাবে রক্ষিত সমাধি। সমাধিটি মমি সংরক্ষণের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রজন ও নাত্রোনে ভরা কাপঅলা চারটি মন্দিরে ঘেরাও নাড়ি-কাটার প্রতীক একটা তামার ছুরিতে সাজানো ছিল।
মমি তৈরির কাজে সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার নিয়ে অনুসন্ধানীরা বিতর্কে মেতে ওঠেন। নাত্রোনে সামান্য পরিমাণ খাবার লবণ থাকায় সব মমিতেই কিছুটা চিহ্ন রেখে যাওয়ায় বোঝা কঠিন। কিছুটা কম সচ্ছল লোকজনের কবরে নাত্রোনের বদলে সোডিয়াম ক্লোরাইড ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হয়।
রেওয়াজ চালুর দুই হাজার বছরেরও পরে লিখলেও প্রাচীন মিসরীয় মমীকরণের ভীতিকর সবিস্তার বর্ণনা তুলে ধরেছেন হেরোডোটাস: জুনিপার তেলকে সিডার তেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার মতো সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে যা আধুনিক প্রত্নবিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রাসায়নিক বিশ্লেষণে টিকে গেছে। এসব পদ্ধতির সঙ্গে মিসরীয়দের পাখি ও মাছের নাড়িভুঁড়ি বের করে লবণ মাখিয়ে সংরক্ষণ পদ্ধতির লক্ষণীয় মিল রয়েছে।
সবচেয়ে নিখুঁত প্রক্রিয়াটি এ রকম: একটা লোহার শলা দিয়ে নাক দিয়ে যতটুকু সম্ভব মগজ বের করে আনা হয়, অবশিষ্ট যেটুকু বের করা সম্ভব নয়, সেটা ওষুধ দিয়ে ধোয়া হয়; এর পর পাথরের ছুরি দিয়ে পেট কেটে ভেতর থেকে সব কিছু বের করে গহ্বর প্রথমে পাম ওয়াইন, তারপর গুঁড়ো মসলার নির্যাস দিয়ে ধুয়েমুছে সম্পূর্ণ সাফ করে ফেলা হয়। এর পর সেটা কুন্দু বাদে খাঁটি গন্ধরস, ক্যাসিয়া এবং রাজ্যের সুবাসিত জিনিস ভরে সেলাই করে লাশটাকে নাত্রোনে পুরোপুরি ঢেকে ৭০ দিন রেখে দেয়া হয়। এর বেশি নয়। এই সময় শেষে মৃতদেহ ধুয়ে ফালি ফালি করে কাটা লিনেন কাপড়ে আপাদমস্তক ঢেকে নিচের অংশে সাধারণভাবে মিসরীয়দের শিরিষের আঠার বদলে ব্যবহার করা আঠা মেখে দেয়া হয়। এই অবস্থায় মৃতদেহ পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়; মানুষের অবয়বে তৈরি কাঠের বাক্স থাকে তাদের কাছে, তাতে রেখে দেয়া হয় সেটা। এর পর কম খরচ এবং সবশেষে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির কথা বলেছেন তিনি:
বুনো পাখি এবং মাছে লবণ মাখানো ভোজন বিদ্যা বিকাশের চেয়ে বরং অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ একটা ধাপ ছিল। প্রাচীন বিশ্বে আটা ও মসুরের ডালের মতো কাঁচা খাবারের প্রধান রফতানিকারী ছিল মিসরীয়রা। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লবণ মূল্যবান পণ্য হলেও বেশ ভারী ছিল। লবণ দিয়ে পণ্য তৈরির ফলে প্রতি পাউন্ডের বিপরীতে একটা বাড়তি দাম ধরা হতো। টাটকা মাছের বিপরীতে সযত্নে তৈরি লোনা মাছ নষ্ট হতো না। মিসরীয়রা বিপুল পরিমাণে লবন রফতানি করত না, তবে মধ্যপ্রাচ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোনা খাবার, বিশেষ করে মাছ রফতানি করত। লোনা মাছের বাণিজ্য পরবর্তী চার সহস্রাব্দের অর্থনীতিকে আকার দেবে।
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮০০ সালে মিসরীয়রা ফিনিশীয় সিডার, কাচ এবং একটি গোপন ফিনিশীয় ফর্মুলায় ঝিনুকের খোলস থেকে তৈরি পিঙ্গল রঙের বিনিময়ে লোনা মাছের বাণিজ্য শুরু করে। এসব পণ্যের সুবাদে ফিনিশীয়রা বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, তবে সময়মতো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মিসরীয় লোনা মাছ এবং উত্তর আফ্রিকান লবণের মতো অংশীদারদের পণ্যও বিনিময় করেছে।
মূলত কার্মেল পাহাড়ের উত্তরে লেবাননি উপকূলের এক চিলতে জমিনের আদিবাসী ফিনিশীয়রা স্রেফ আংশিক সেমেটিক নানা জাতের মিশেল ছিল। কখনই সমরূপ জাতিতে রূপান্তরিত হয়নি। সাংস্কৃতিক দিক থেকে অন্য জাতি, প্রথমে মিসরীয় এবং পরে গ্রিকরা তাদের জীবনযাত্রায় প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
যাদের সংস্পর্শে এসেছে, তাদের সঙ্গেই বাণিজ্য করেছে তারা। সোলায়মান পয়গম্বর জেরুসালেমে উপাসনালয় নির্মাণের সময় ফিনিশীয়রা কাঠ— তাদের বিখ্যাত ‘লেবাননি সিডার’— এবং কারুশিল্পীদের জোগান দিয়েছিল। পুরনো নিয়মে টায়ার থেকে জেরুসালেমের মাছের বাজারে জোগান আসার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এবং তাদের বিক্রীত মাছগুলো সম্ভবত লোনা ছিল, কেননা জেরুসালেমে পৌঁছার আগেই মাছ পচে যাওয়ার কথা। ফিনিশীয়দের ভালো ভালো খাবারের ধারণা জোগানো মধ্যপ্রাচ্যীয় স্বভাব ছিল। বলা হয়, তারাই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জলপাই গাছ ছড়িয়ে দিয়েছে। স্পেনীয়রা বলে, ফিনিশীয়রা পশ্চিম এশীয় খাবার মটরশুঁটি পশ্চিম মধ্যপ্রাচ্যে পরিচিত করে তুলেছিল, যদিও দক্ষিণ ফ্রান্সের কাতালান অংশে বুনো স্থানীয় মটরশুঁটি থাকার প্রমাণ মিলেছে। কোনো কোনো ফরাসি লেখক বলে থাকেন,
ফিনিশীয়রা বুজাবেস উদ্ভাবন করেছে, তবে কথাটা সম্ভবত ঠিক নয়; সিসিলিয়দের মতো ফিনিশীয়রা প্রথম উপকূলীয় এলাকা থেকে ব্লুফিন টুনা মাছ ধরে, এটা সত্যি হয়ে থাকতে পারে। ফিনিশীয়রা আবার সিসিলি দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে বর্তমান কালের ত্রাপানিতে শিকার করা মাছ লোনাকরণের উদ্দেশ্যে একটা লবণ কারখানাও বসিয়েছিল।
বেশকিছু মধ্যপ্রাচ্যীয় বন্দরের কাছাকাছি টুনা মাছের ছবিঅলা প্রাচীন ফিনিশীয় মুদ্রা পাওয়া গেছে। সেই সময়ে টুনা পরিবারের বৃহত্তম সদস্য ক্ষিপ্রগতির ইস্পাত-নীল ব্লুফিন টুনা ওজনের দিক থেকে সম্ভবত ১ হাজার ৫০০ পাউন্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তবে এটা মাছটি ওক গাছের ফল খেয়ে বেঁচে থাকার কথায় বিশ্বাসী প্রাচীন লেখকদের কথা। ডিম পাড়ার জন্য উষ্ণ পানির খোঁজে ব্লুফিন অতলান্তিক সাগর ছেড়ে জিব্রাল্টার প্রণালিতে ঢুকে উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম সিসিলি পাশ কাটিয়ে সাঁতরে গ্রিস পেরিয়ে বসফরাস হয়ে কৃষ্ণ সাগরে হাজির হতো। ভূমধ্যসাগরে ব্লুফিনের পথচলার প্রতিটি বিন্দুতে টুনা ফিশারিজ স্থাপন করেছিল ফিনিশীয়রা।
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে আজকের তিউনিসীয় উপকূলে প্রথমবারের মতো নৌকা ভাসানোর সময় ফিনিশীয়রা স্ফাক্স নামে একটা সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলে, আজো সেটা সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্ফাক্স লবণ ও লোনা মাছের উত্স হয়ে উঠেছিল এবং আজো তাই আছে। ফিনিশীয়রা দক্ষিণ স্পেনে কাদিজও স্থাপন করেছিল, এখান থেকে টিন রফতানি করত ওরা। পর্তুগিজ নাবিকরা পশ্চিম আফ্রিকায় অনুসন্ধান চালানোর প্রায় ২৫০০ বছর আগেই ফিনিশীয়রা কাদিজ থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছে যায়। প্রথম বর্ণমালা আবিষ্কারের কৃতিত্বও দেয়া হয় ফিনিশীয়দের। বস্তু বা ধারণা বোঝাতে চীনা ও মিসরীয় ভাষা পিক্টোগ্রাফ, ড্রইং ব্যবহার করত। মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক ভাষা হয়ে ওঠা ব্যাবিলনীয় ভাষারও হরফের লম্বা তালিকা ছিল, প্রতিটি একটি বা সম্মিলিত শব্দের প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু ফিনিশীয়রা প্রাচীন হিব্রু ভাষার সেমেটিক পূর্বসূরি ব্যবহার করেছে, খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সালে সিনাইতে এর সবচেয়ে পুরনো চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রতিটির একটি নির্দিষ্ট শব্দ তুলে ধরা মাত্র ২২টি হরফ ছিল তাতে। সরলতার পাশাপাশি এই বর্ণমালার বাণিজ্যিক ক্ষমতা প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যের পথ খুলে দেয়।
স্ফাক্স বন্দরের অভ্যন্তরের এলাকায় শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যাওয়া হ্রদের তলদেশ থেকে ছেঁচে লবণ তোলা যেত। এই পদ্ধতি আট হাজার বছর আগে চীনের লেক ইউনচেংয়ে ব্যবহূত পদ্ধতির মতো এবং ‘টেনে আনা এবং জমানো’ হিসাবে উল্লেখ করা নাত্রোন ওয়াদি থেকে লবণ সংগ্রহের আদি মিসরীয় কায়দা। এই ধরনের লবণ উৎপাদনকে আরবরা সেবখা বলত এবং উত্তর আফ্রিকার আধুনিক মানচিত্রে মিসরীয়-লিবীয় সীমান্ত থেকে শুরু করে আলজেরীয়-মরক্কো সীমান্ত পর্যন্ত সাবকাহত শুনাইন থেকে সেবখা দে তিনদৌফ পর্যন্ত সেবখা আজো স্পষ্ট লেবেল করা থাকে।
প্রাচীনকালে বর্তমান দক্ষিণ লিবিয়ার ফেজান অঞ্চলের সঙ্গে মিসর ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার যোগাযোগ ছিল। ফেজানের যুদ্ধ-বিগ্রহে ঘোড়া ও রথ ব্যবহারের কথা লিখেছেন হেরোডোটাস, সে সময়ের বিচারে এটা অস্বাভাবিক ছিল। আরো বেশি অস্বাভাবিক, ঘোড়া হয়তো লবণ টানার কাজে লাগানো হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক নাগাদ ফেজান লবণ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। ফেজানের উৎপাদকরা স্রেফ সেবখা ছাঁচা থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। মোটামুটি নিখাদ স্ফটিক আলাদা না হওয়া পর্যন্ত চাঙড় সিদ্ধ করে সেগুলো ৩ ফুট উঁচু কোনাচে সিলিন্ডারের ছাঁচে নেয়া হতো। বণিকরা এর পর এই বিচিত্র দণ্ডাকার জিনিসগুলো খাড়ের তক্তপোষে মুড়িয়ে সাবধানে কাফেলায় করে মরুভূমি পার করে নিয়ে যেত। আজো সাহারার বিভিন্ন অংশে একই পদ্ধতিতে লবণ তৈরি ও পরিবহন করা হয়।
মুনাফাজনক লবণের চালান বিপুল ও ওজনদার হওয়ায় সামর্থ্যের ভেতর থাকা পরিবহন বরাবরই লবণ বাণিজ্যের জরুরি অংশ ছিল। এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বেশির ভাগ অংশে নৌপথই ছিল সমাধান। সমুদ্র-বন্দর কিংবা সিচুয়ানের মতো বিস্তৃত নৌপথের মাধ্যমে লবণ বাণিজ্য সারা হয়েছে। কিন্তু আফ্রিকা মহাদেশে, যেখানে ওয়াদি এবং জলহীন সাহারার শুষ্ক হ্রদের তলদেশে লবণের ভাণ্ডার ছিল, ভিন্ন একটা সমাধান মিলেছিল— উট।
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালে সাহারার ওপর দিয়ে প্রথম জানা যাত্রাগুলো প্রথমে ষাঁড় এবং তার পর ঘোড়ায় টানা রথে হয়েছিল। প্রাচীনকালে ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্যের অস্তিত্ব থাকলেও খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের আগে ক্রসিংয়ের ঘটনা বিরল ছিল, এই সময় উট ঘোড়ার জায়গা দখল করে নেয়। উট উত্তর আমেরিকার স্থানীয় পশু হলেও দুই মিলিয়ন বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালে, পশু পোষ মানানোর ইতিহাসে কিছুটা পরের দিকেই মধ্যপ্রাচ্যে উট পোষ মানানো হয়। বুনো প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। উট পোষ মানানো এবং সাহারায় এর ব্যবহারের মাঝখানে বেশ কয়েক সহস্রাব্দ কেটে গেছে। কিন্তু গৃহপালিত উট সাহারায় পা রাখার পর দ্রুত এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগ নাগাদ ৪০ হাজার উটের কাফেলা তাওদেন্নি থেকে ৪৩৫ মাইল দূরে প্রায় এক মাস জুড়ে লবণ নিয়ে তিম্বাক্তুতে গেছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত উটের কাফেলা সাহারা পেরিয়ে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকায় বিপুল পরিমাণ পণ্য পৌঁছে দিয়েছে। বাণিজ্য বিকশিত হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাহাজানিও বেড়েছে, ফলে প্রতিরক্ষার খাতিরে কাফেলার আকার বড় হয়েছে। লবণ দক্ষিণে যাওয়ার সময় আজকের নাইজেরিয়া, হাউসাল্যান্ড থেকে সোনা, কোলা নাট, চামড়া এবং তুলা উত্তরে লেনদেন হয়েছে। পরে কাপড়ের আকার ঠিক করার জন্য দরকারি বাবলা গাছের আঠা এবং রেনেসাঁ ইউরোপীয় খাবারের হুজুগ পশ্চিম আফ্রিকার কমলা রঙের ফলের বীজ মেলাগিতা মরিচসহ ইউরোপের জন্যে বিভিন্ন পণ্যও উত্তরে আমদানি হয়েছে। ক্রীতদাসদেরও এই পথে নিয়ে যাওয়া হতো এবং লবণের বিনিময়ে বিক্রি করা হয়েছে।
স্থলপথে আফ্রিকা, ইউরোপ এশিয়া ভ্রমণকারী মধ্যযুগের মহান আরবিভাষী পর্যটক ইবন বতুতা ১৩৫২ সালে তাগজা শহর ভ্রমণের কথা লিখেছেন। একটা মসজিদসহ গোটা শহরটাই লবণে তৈরি বলে উল্লেখ করেন তিনি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা প্রথমবারের মতো এই শহর আবিষ্কারের সময় পশ্চিম সাহারার কিংবদন্তির লবণ-শহর পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তাগজাই লবণের তৈরি শহর হিসেবে প্রথম উল্লেখিত হয়নি। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের রোমান ফিনি অভ এল্ডার মিসরে খনি থেকে লবণের পাথর উত্তোলনের কথা লিখতে গিয়ে লবণের তৈরি বাড়িঘরের কথা উল্লেখ করেছেন। তাগজা ঝলমলে সাদা শহর হিসেবে কল্পিত, কিন্তু সাহারার বালি তোড়ে ভেসে গেছে। ক্ষতবিক্ষত লবণ মলিন ধূসর রঙ ধরেছে। লবণ দিয়ে নির্মাণের ব্যাপারটা পরবর্তীকালের পর্যটকদের বিস্মিত করলেও নির্মাণের ক্ষেত্রে লবণের চাঙরই প্রাপ্য একমাত্র উপকরণ ছিল এবং তাগজা সম্ভবত বেহাল কোনো শ্রম শিবির হয়ে থাকবে, কাজে বাধ্য হওয়া খাবার বয়ে আনা কাফেলার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ক্রীতদাসরাই মূলত এর বাসিন্দা ছিল।
প্রাচীন তাগাজায় জমিনের অল্প গভীরতা থেকে একেকটি ২০০ পাউন্ড ওজনের ব্লক আকারে লবণ উত্তোলন করা হতো। উটের পিঠে দুই পাশে একটি করে ব্লক বোঝাই করা হতো। শক্তিশালী পশুগুলো সেগুলো পশ্চিম আফ্রিকার বেশির ভাগ এলাকার সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টিকারী নাইজার নদীর সবচেয়ে উত্তরের বাঁকে অবস্থানের কারণে ৫০০ মাইল দূরের তিম্বাক্তু বাণিজ্য কেন্দ্রে নিয়ে যেত। তিম্বাক্তুতে উত্তর আফ্রিকা, সাহারা এবং পশ্চিম আফ্রিকার পণ্যের বিনিময় ঘটত। বাণিজ্যিক সম্পদ একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল। তিম্বাক্তু পরিণত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় নগরী, শিক্ষার পাদপীঠে। কিন্তু তাগাজার স্থানীয়দের কাছে লবণ নির্মাণ উপকরণ ছাড়া কিছু ছিল না। লবণ ছাড়া আর সবকিছুরই অভাব ছিল তাদের।
বলা হয়ে থাকে যে, তাগাজার দক্ষিণের বাজারগুলোয় সোনার ওজনে লবণ বিনিময় হতো, কথাটা অতিরঞ্জিত ছিল। হেরোডোটাস এবং পরে বহু অন্য ইউরোপীয়র উল্লেখ করা পশ্চিম আফ্রিকার নীরব কায়দার বিনিময় প্রথা থেকে এই ভুল ধারণা এসেছে। পশ্চিম আফ্রিকার সোনা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোয় সোনার একটা ঢিবি তৈরি করা হতো, তার পর লবণ ব্যবসায়ীও পাল্টা লবণের একটা স্তূপ তৈরি করত, দর নিয়ে একটা রফা না হওয়া পর্যন্ত দুই পক্ষই তাদের ঢিবির আকার বদলাত। এই প্রক্রিয়া চলার সময় কোনো কথাবার্তা হতো না, এতে হয়তো কয়েক দিন লেগে যেত। লবণ বণিকরা অনেক সময় রাতের অন্ধকারে লবণের ঢিবি সমন্বিত করে অলক্ষে বিদায় হয়ে যেত। ভাণ্ডারের অবস্থান ফাঁস হতে না দিতে খুবই গোপনীয়তা বজায় রাখত তারা।
এ থেকেই ইউরোপে আফ্রিকায় সোনার ওজনের সমান ওজনে লবণ বিনিময়ের রটনা হয়। তবে এমন হতে পারে যে শেষপর্যন্ত রফায় পৌঁছানো ঢিবি দুটো কখনই সমান ওজনের ছিল না। মিসরে গরিবদের লাশ সোডিয়াম ক্লোরাইড আর ধনীদের লাশ নাত্রোনে মমি করার বাস্তবতা থেকে মিসরীয়রা নাত্রোনকেই বেশি গুরুত্ব দিত বলে মনে হয়। কিন্তু প্রাচীন আফ্রিকার অন্যান্য অংশে মনে হয় উল্টোটাই সত্যি ছিল। সাধারণত অপেক্ষাকৃত ধনী আফ্রিকানরা বেশি মাত্রার সোডিয়াম ক্লোরাইডযুক্ত লবণ ব্যবহার করত এবং নাত্রোন ছিল গরিবদের লবন। পশ্চিম আফ্রিকায় সাদা নাত্রোনকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের পক্ষে উপকারী ভাবা হতো। সিমজাতীয় খাবারের বেলায় কার্বোনেট গ্যাসের বিপরীতে কাজ করে ভেবে লবণের চেয়ে নাত্রোনই বেশি পছন্দ ছিল। পেটের ওষুধ হিসেবেও এর ব্যবহার ছিল, আজো হয়— সোডার প্রাকৃতিক বাইকার্বোনেট।
নাত্রোন পুরুষ কামোদ্দীপক বলেও বিশ্বাস ছিল। কেবল লবণ নয় বরং তামাক বাণিজ্যেরও কেন্দ্র তিম্বাক্তুতে তামাক এবং নাত্রোনের একধরনের মিশেল চিবোনো হতো। রঙ পাকা করতে নীল গলানোর জন্য হাউসারা লবণও ব্যবহার করত। নাত্রোন থেকে সাবান এবং শিয়া বাটার গাছের শাঁস থেকে তেল তৈরি করা হতো।
আফ্রিকার লবণের বাজারকে বরাবরই লবণের ব্যাপক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে পার্থক্য করা হতো, এগুলোর বেশির ভাগই দূষিত ছিল। প্রধানত সোডিয়াম ক্লোরাইড লবণ কেবল খাবারের জন্য ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন দূষণ এবং স্থানের সোডিয়াম ক্লোরাইড, নাত্রোন এবং অন্যান্য লবণ যার যার নামেই বিপুলভাবে পরিচিত ছিল। আফ্রিকান বণিক, চিকিত্সক এবং বাবুর্চিরা লবণের এই বিন্যাস সম্পর্কে ভালো রকম ওয়াকিবহাল ছিল। চাদ হ্রদ থেকে সংগ্রহ করা খাবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুপরিচিত একটা নাত্রোনের নাম ছিল ত্রানা। আফ্রিকানরা ভিন্ন ভিন্ন খাবারের জন্য বিভিন্ন লবণের বিস্তৃত একটা বৈচিত্র্য বজায় রেখেছিল, তবে সবসময় যেকোনো লবণকেই অপচয় না করার মতো মূল্যবান বস্তু হিসেবে দেখেছে। একজন নাইজেরীয় শিক্ষক আর. ওমোনারলোলা উইলিয়ামস নাইজেরীয় স্বাধীনতার অল্প আগে ১৯৫৭ সালে নাইজেরীয় গৃহবধূদের জন্য একটা রান্নার বই বের করেছিলেন। লবণ সম্পর্কে তার পরামর্শের ভেতর ছিল:
দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার জন্য নাইজেরিয়ার কোনো কোনো অংশে লবণকে ছাঁচে ফেলা হয়। ব্যবহারের আগে একে বের করে গুঁড়ো করতে হবে। উইরোবাসরা ইয়ো ওবু নামে পরিচিত এক ধরনের লবণ ব্যবহার করে। এক টুকরো কাপড়ে বেঁধে সেটা পানিতে চিপে ধরে ওরা। পানিকে যথেষ্ট স্বাদ জোগানোর পর তুলে রেখে পরে আবার ব্যবহার করা হয়।
আফ্রিকানরা প্রতিটি মিশ্রণের জন্য নির্দিষ্ট কাজসহ দূষিত লবণে এত অভ্যস্ত ছিল যে, ঔপনিবেশিককালে ইউরোপীয়রা খাঁটি সোডিয়াম ক্লোরাইড নিয়ে এলে তারা একে নিজেদের পছন্দমতো অন্য লবনের সঙ্গে মিশিয়েছে।
সূত্র: সল্ট: আ ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি থেকে






