সকালবেলা গাড়ি পার্ক করে বের হয়ে দেখি প্রচণ্ড শীত। এখান থেকে অফিস অল্পই দূরে। তার পরেও কয়েক পা ফেলেই মনে হয়, না-জানি কত দুনিয়া পাড়ি দিচ্ছি। এইসব সময়ে নিজেকে উত্সাহ দেয়ার জন্য আমি বিভিন্ন কথা ভাবি। আজকে মনে পড়ল মহাত্মা গান্ধীর বিখ্যাত সল্ট মার্চের কথা। ছোটখাটো মানুষটা একটা খাটো ধুতি আর লাঠি হাতে নিয়ে ঠিকই ২৪০ মাইল রাস্তা পার হয়েছিলেন পায়ে হেঁটে, অথচ এই ১০ মিনিটের রাস্তা পার করতেই আমার দশা কাহিল।
লবণের মতন সস্তা একটা দ্রব্য, যা যেখানে সেখানেই পাওয়া যায়। হোটেল-রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে এর জন্য আলাদা কোনো দাম দিতে হয় না, তার জন্য এত বড় আন্দোলনের কারণ ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল ছোটবেলায় পড়া রূপকথার গল্প। যেখানে রাজকন্যা রাজাকে বলেছিল— লবণের মতো ভালোবাসি, আর রাজা রাগ করে তাকে বনবাসে পাঠালেন। শেষ পর্যন্ত যখন নিজে লবণ ছাড়া খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন, তখন টের পেলেন এর মর্ম। রূপকথার অনেক রাজাই কেমন বোকা ছিল, হাতে-কলমে না দেখিয়ে দিলে কিছুই বুঝতেন না। শুধু রূপকথা নয়, সত্যিকার পৃথিবীতেও শাসক যদি জনগণের দৈনন্দিনতা, প্রয়োজন অথবা অভাব টের পাওয়ার মতন কাছাকাছি আসতে ব্যর্থ হন, তাকেও হাতেনাতেই তার মূল্য দিতে হয় একটা পর্যায়ে।
১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধী তাঁর নির্বাচিত ৭৮ জন অনুসারীকে নিয়ে ২৪০ মাইল দূরে ডাণ্ডির সমুদ্রের দিকে রওনা হয়েছিলেন, সেখান থেকে লবণ তোলার মাধ্যমে সেই উনিশ শতক থেকে ইংরেজদের শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ভারতের ওপর চাপিয়ে দেয়া লবণ আইন অমান্য করার উদ্দেশ্যে। এ ইতিহাস বিখ্যাত। কিন্তু এখনকার সময়ে বসে অতীত ইতিহাস পড়ার সময় যত স্বচ্ছভাবে আমরা বিষয়টা দেখতে পাই, যে সময় ঘটনাটা ঘটেছিল, তখন তা এত স্পষ্ট ছিল না। ১৯২৯ সালে লাহোরে জাতীয় কংগ্রেস পার্টির একটা অধিবেশনে গান্ধী যখন প্রথম এ অসহযোগের প্রস্তাব দেন, তখন পার্টির সহকর্মীরা, এমনকি অনেক কাছের লোকও স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্রে লবণ সত্যাগ্রহকে রাখার বিষয়ে গান্ধীর সঙ্গে দ্বিমত করেছেন।
এ সমস্যার ওপর গান্ধী কেন এতটা গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা ঠিকঠাক বুঝতে হলে আমাদের আরো কয়েকশ বছর পিছিয়ে যেতে হবে। কারণ ভালোবাসার মতনই বিক্ষোভও হঠাত্ করে জন্মায় না, আস্তে আস্তে জমে, দানা বাঁধে, তারপর একসময় ফেটে পড়ে।
ইংরেজদের কাছে ভারতবর্ষ যে ছিল শুধুই বাণিজ্যিক একটা উদ্যোগ, তার প্রমাণ হলো, তারা এর দখল পাওয়ার পর পরই দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে। বেসরকারি এ বাণিজ্যিক সংস্থাকে ১৬০০ সালে রাজকীয় সনদের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রানী প্রথম এলিজাবেথ। ব্যবসায়িক সংস্থা হলেও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মতনই কাজ করত এ প্রতিষ্ঠান, এর নিজস্ব টাকশাল ছিল, কর্মচারীদের জন্য নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা ছিল, এমনকি তাদের নিজেদের সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও ছিল, শুধু খ্রিস্টান রাষ্ট্র বাদে আশপাশের যেকোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা অথবা আপসের অধিকার ছিল তাদের। ১৬৩৯ সালে এ কোম্পানি ভারতের সমুদ্রতীরে প্রথম ছোট্ট এক টুকরা জমি কেনে, আর শতাব্দী ঘুরতে না ঘুরতেই কলকাতা শহর নির্মাণ শুরু করে। এরপর উনিশ শতকে ফ্রান্স আর ব্রিটেনের মধ্যে বেশ কয়েকটা যুদ্ধ পার হয়ে ভারত পুরোপুরি ইংরেজদের অধীনে চলে আসে। আর ইংরেজ শাসকরা প্রায় সম্পূর্ণ ভার তুলে দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।
কোম্পানি বিরাট আমলাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে ভালো বেতনে চাকরি নিয়ে বহু ইংরেজ কর্মচারী যোগ দেন। ভারতীয়দের কখনো ভালো কোনো পদে নিয়োগ করা হতো না। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের অর্ধেকের বেশি জুড়ে ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব। আর বাকিটা শাসন করতেন স্থানীয় জমিদাররা, যারা আসলে ছিলেন কোম্পানির হাতের পুতুল। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরে ইংরেজ প্রশাসন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে শাসনতন্ত্রের অধিকাংশই নিজের হাতে তুলে নেয়।
ইংরেজরা বাণিজ্যের ওপর বাধা সৃষ্টি করার আগে ভারতে লবণ অনেক সহজলভ্য আর সস্তা ছিল। ভারতে সমুদ্র উপকূলে প্রচুর লবণক্ষেত্র আছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে পাথুরে লবণ আর লবণ হ্রদ। লবণ তৈরি করা ও বেচাকেনা ভারতীয়দের প্রাচীন পরম্পরার অংশ। পাঞ্জাবের পাথুরে লবণ যদিও খুব খাঁটি, তার পরও ধার্মিক হিন্দুরা এ লবণ অথবা সিদ্ধ করা লবণের চেয়ে সমুদ্রে সূর্যের আলোয় ঘনীভূত লবণটাই বেশি পছন্দ করত। আর এ লবণ পাওয়াও যেত সহজে।
পশ্চিম উপকূল, যা এখন পাকিস্তানের সীমানার কাছে, আর কলকাতার কাছের পূর্ব উপকূলে নদীর মোহনা ছড়িয়ে গিয়ে বেশকিছু জলাভূমি আর বিলের সৃষ্টি হয়েছে। এসব জায়গাতেই সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে গেলে লবণের খড়ি জমে থাকে।
গুজরাটে পশ্চিম উপকূলে পাঁচ হাজার বছর ধরে লবণ উৎপাদন হয়ে আসছে নয় হাজার বর্গমাইলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রান কুচ জলাভূমিতে। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষার সময়টায় এ এলাকা থাকে সমুদ্রের পানির নিচে আর ডিসেম্বরে উত্তরের ঠাণ্ডা শুষ্ক বাতাসে লবণাক্ত পানি বাষ্পীভূত হতে শুরু করে।
আবার পূর্ব উপকূলে ওড়িশায় আছে ৩২০ মাইল লম্বা ও ১০ থেকে ৬০ মাইল গভীর সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক লবণক্ষেত্র অথবা খালাড়ি। জোয়ারের সময় খালাড়িতে জমানো পানি প্রাকৃতিক উপায়ে বাষ্পীভূত হয়ে লবণ জমা হতো। এ লবণকে বলা হতো কর্তক। আরেক ধরনের লবণ ছিল পাঙ্গা, যা লবণাক্ত বালি সমুদ্রের পানির সঙ্গে মিশিয়ে তারপর সিদ্ধ করে তৈরি করা হতো। যে শ্রমিকরা পাঙ্গা তৈরি করতেন, তাদের বলা হতো মালাঙ্গী। লবণ চাষের জন্য আদর্শ এ জমিগুলোয় লবণ ছাড়া অন্য কিছু উৎপাদন অসম্ভব ছিল। ওড়িশার সবচেয়ে গরিব চাষীর পক্ষেও খালাড়িতে নিজেদের ব্যবহার ও বিক্রির জন্য লবণ চাষ করে জীবন চালানো সম্ভব ছিল।
মালাঙ্গীদের তৈরি করা পাঙ্গা লবণ ছিল খুব সাদা আর ভারতে সবচেয়ে ভালো লবণ হিসেবে এগুলোই পরিচিত ছিল, আবার দামেও ছিল সস্তা।
পাঙ্গা লবণের খুব ভালো বাজার ছিল আশপাশের প্রদেশগুলোয়। এ লবণ জাহাজে করে পাঠানো হতো মহানদী আর বিভিন্ন শাখা নদীতে। এছাড়া কেন্দ্রীয় ভারতের ব্যবসায়ীরা গরুর গাড়িতে করে ওড়িশায় যেতেন লবণ কিনতে অথবা তুলা, আফিম, গাঁজা কিংবা গমের সঙ্গে লবণ বিনিময়ের জন্য। এমনকি বাংলার বিলেতি সাহেবরাও ওড়িশার লবণের ব্যবসা করতেন। উনিশ শতকে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে তাদের গোলাবারুদ তৈরির জন্য প্রচুর পরিমাণে লবণ দরকার হতো, এর অধিকাংশই আসত ওড়িশা থেকে।
ভারতবর্ষে বহু আগে থেকেই লবণের ওপর পরিমিত কর নেয়া হতো। ইংরেজদের আগে ওড়িশার শাসক শ্রেণী ছিল মারাঠিরা, তারা ব্যবসায়িক কারণে পরিবাহিত লবণের ওপর সামান্য কর ধার্য করেছিল, ব্যবসা এত বিস্তৃত ছিল যে, এই সামান্য করেই তাদের বেশ ভালো লাভ থাকত। তাই ওড়িশার লবণের দাম বাড়িয়ে প্রতিযোগিতার ক্ষতি করার কোনো দরকার হয়নি। এ আয়ের পরিবর্তে তারা লবণ ব্যবসার প্রসার ও সুরক্ষার দিকে খেয়াল রাখত। ওড়িশার প্রতি মারাঠি শাসকের মনোভাব একটা চীনা প্রবাদের কথা মনে করায়— ‘একটা রাষ্ট্র পরিচালনা হচ্ছে ছোট মাছ রান্না করার মতন, কাজটা করতে হয় খুব কোমল স্পর্শের মাধ্যমে।’
ইংরেজরা তাদের শাসন বা রান্না কোনো ক্ষেত্রেই এ কোমলতার ধারেকাছে দিয়ে যেত না। উনিশ শতকের শেষভাগে চেশায়ারে তাদের লবণ উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং জোরেশোরে বিদেশী বাজার খুঁজতে শুরু করেছিল। তাদের সাম্রাজ্যকেই বাজার করে তোলার চেষ্টা করছিলেন ইংরেজ শাসকরা, যদিও লিভারপুলের লবণের দাম ছিল ওড়িশার লবণের চেয়ে অনেক বেশি।
১৭৯০ সালে যখন ইংরেজরা ওড়িশায় উত্পন্ন সব লবণ কিনে নিতে চেয়েছিল, ওড়িশায় সে সময়কার মারাঠি রাজ্যপাল রঘুজি ভোঁসলে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন— এরা ওড়িশার লবণ বাজার থেকে সরিয়ে নিতে চাইছে যেন কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে লিভারপুলের লবণ বিক্রি করা যায়। তবে প্রস্তাব নাকচ করেও তাদের থামানো যায়নি, যেহেতু ক্ষমতা ছিল তখন ইংরেজদের হাতে, তারা বাংলায় ওড়িশার লবণ নিষিদ্ধ করে দিল।
ওড়িশা আর বাংলার সীমানার মাঝখানের এলাকাটায় ছিল ঘন জঙ্গল, সেখানে পাহাড়া বসানো বেশ কঠিন ছিল, তাই এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ করে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি শুরু হলো। চোরাই পথে ওড়িশার সস্তা লবণ বাংলায় ঢুকতে থাকায় লিভারপুলের লবণ খুব একটা সুবিধা করতে পারল না। ১৮০৩ সালে চোরাচালান রোধ করার নামে ইংরেজ সেনাবাহিনী ওড়িশা দখল করে তাকে বাংলার একটা অঙ্গরাজ্যে পরিণত করল।
১৮০৪ সালের ১ নভেম্বর ইংরেজ সরকার ঘোষণা দিয়ে ওড়িশার লবণের ওপর একচেটিয়া দখল নিল। লবণের বেসরকারি বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে গেল। বেসরকারি ব্যবসায়ীদের সব লবণ সরকারের কাছে নির্দিষ্ট মূলে বিক্রি করে দিতে হলো। লবণ পরিবহন অবৈধ করে দেয়া হলো, এমনকি সমুদ্রযাত্রার জন্য কোনো জাহাজে নাবিকদের জন্য প্রয়োজনীয় লবণও নিতে হতো ইংরেজ বাহিনীর কঠোর তত্ত্বাবধানের মধ্যে।
১০ বছরের ভেতরেই ইংরেজ সরকার ছাড়া অন্য কারো লবণ উৎপাদন বেআইনি করে দেয়া হলো। আর চোরাগোপ্তা চাষ বন্ধ করার জন্য ভালো বেতনে নিয়োগ দেয়া হলো সরকারি সংবাদদাতাদের। ওড়িশায় সবচেয়ে প্রথম প্রতিরোধ এসেছিল উপকূলের সর্দার ও জমিদারদের কাছ থেকে। লবণ শিল্প ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সুবিধা ও কর্তৃত্বও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। ইংরেজ শাসনের আগে উত্তর ওড়িশার মালাঙ্গীরা ছিল জমিদারদের প্রজা। এরা ছিল জমিদারদের জমিতে বর্গাচাষী, নিজেদের জমি না থাকায় ভাড়া বাবদ লাভের বেশির ভাগ যেত জমিদারের হাতে। তার ওপর সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় লবণও জমিদাররা পেতেন এই মালাঙ্গী শ্রমিকের কাছ থেকেই।
এর পরও ১৮০৪ সালে লবণ ব্যবসা ইংরেজদের দখলে যাওয়ার আগে শ্রমিকরা অন্তত বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট উপার্জন করতেন। ইংরেজরা মালাঙ্গীদের ভবিষ্যতের উৎপাদনের জন্য আগাম টাকা দেয়ায় শ্রমিকরা ঋণের বোঝার নিচে ডুবতে থাকেন আর ঋণ শোধ করার জন্য লবণের খালাড়িতে কাজ করতে বাধ্য হন। এ সময় বিভিন্ন মহামারীতে, বিশেষ করে কলেরায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে।
শুরু থেকেই জমিদাররা ইংরেজদের লবণনীতিতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছে। আর তাদের অধীনের মালাঙ্গীদের উত্সাহিত করেছে এ বিষয়ে ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতা না করতে। জমিদারদের উত্সাহে শ্রমিকরা বেআইনিভাবে নিজেদের লবণ তৈরি শুরু করায় বহুলোক গ্রেফতার হয়েছে। ১৮১৭ সালে মালাঙ্গী শ্রমিকরা একবার বিদ্রোহ করে সরকারি লবণ ব্যবসার অফিস, লবণ কারখানায় আক্রমণ করে সরকারের প্রতিনিধিদের ধাওয়া করেছিলেন, তবে এ বিপ্লব বিফল হওয়ার পরে স্থানীয়রা খোলাখুলি প্রতিরোধ বন্ধ করলেও গোপনে লবণ উৎপাদন করত। বহু পরিবারের জীবিকা এ বেআইনি লবণ উৎপাদনের ওপরই নির্ভরশীল ছিল।
ইংল্যান্ডের মানুষের কাছেও অজানা ছিল না যে, ভারতীয়রা ইংরেজদের লবণনীতি নিয়ে বিক্ষুব্ধ। এমনকি ১৮২২ সালে মেরি ইটনের লেখা “দ্য কুক অ্যান্ড হাউজকিপার’স কমপ্লিট অ্যান্ড ইউনিভার্সাল ডিকশনারি” নামের রান্নার বইতেও এর উল্লেখ ছিল ‘একজন গরিব মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি শোকের কারণ হতে পারে লবণের অভাব। হিন্দুদের কাছ থেকে বহু বিদ্রোহ আর প্রতিবাদের মূলে রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কিছু অযোগ্য কর্মচারীর নিষ্ঠুর এবং অনায্যভাবে লবণ চাষের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য। এরা নিজেদের পকেট ভরার জন্য বিভিন্ন বন্দর আর বাজার থেকে সব লবণ কিনে নিয়ে কৃত্রিম অভাবের সৃষ্টি করেছে।’
যত দিন যাচ্ছিল বেসরকারি লবণ চাষ দমনে ইংরেজদের তত্পরতা বাড়ছিল। এমনকি ১৮৪০ সালে লবণ পাচার বন্ধ করার আগ্রহের আতিশয্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৪ ফুট উঁচু আর ১২ ফুট প্রস্থের কাঁটার দেয়াল তুলেছিল বাংলার পশ্চিম দিকে, যাতে সেই কাঁটা পার হয়ে কেউ যাওয়া-আসা করতে না পারে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পরে যখন ইংরেজ সরকার শাসনভার নিজেদের হাতে নিয়ে নিল, এ দেয়াল হিমালয় থেকে ওড়িশা পর্যন্ত আড়াই হাজার মাইল ধরে বাড়ানো হয়েছিল।
সবচেয়ে বেশি অত্যাচার সহ্য করেছেন মালাঙ্গী শ্রমিকরা। কয়েক পুরুষ ধরে হাজার হাজার মানুষ অনাহারে, মহামারীতে মারা গেছে।
১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর পরবন্দরে গান্ধীর জন্মের বহু আগে থেকেই ইংরেজদের লবণনীতি নিয়ে ভারতীয়দের মনে বিক্ষোভ জমছিল। তবে সে সবই ছিল প্রাদেশিক পর্যায়ে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজদের লবণনীতি ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন আইনসভায় সমালোচিত হয়েছে। ১৯২৩ সালে বাজেটে ভারসাম্য আনার জন্য সরকার লবণের ওপর দ্বিগুণ ট্যাক্স নির্ধারণ করল। ভারতীয় আইনসভা এ প্রস্তাবকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করলেও ইংরেজরা ভাইসর?য় লর্ড রিডিংয়ের ফরমান অনুসারে প্রস্তাব পাস করে ফেলল। ১৯২৭ সালে ভারতীয় বিধানসভা ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাব করেছিল— লবণের ওপর কর অর্ধেক করা হোক, কারো কারো দাবি ছিল লবণের কর সম্পূর্ণ বন্ধ করার, কিন্তু ইংরেজ সরকার সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ১৯২৯ সালে ওড়িশার সভাসদ পণ্ডিত নীলকণ্ঠ দাস দাবি জানিয়েছিলেন ওড়িশায় আবার লবণ চাষ শুরু করার জন্য। এবার সরকার তর্ক তুলল লবণের ওপর কর হলো রাষ্ট্রের প্রতি গরিবদের একমাত্র অবদান।
কাজেই দেখা যাচ্ছে, লবণকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভ ইংরেজ সরকার তেমন পাত্তা দিতে চায়নি, যদিও ইংল্যান্ডের অনেকেই সরকারের সঙ্গে একমত ছিলেন না।
গান্ধী যখন পরবন্দরে বড় হচ্ছিলেন, মালাঙ্গী শ্রমিকরা তার আশপাশের জীবনের অংশ ছিলেন না। তিনি ছিলেন জাতে বৈশ্য, জাতের দিক দিয়ে তিন নম্বরে— শাসক শ্রেণীর নিচে, তবে শ্রমিক শ্রেণীর উপরে। তিনি ছিলেন অদ্ভুত এক মজার মানুষ। একবার তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ‘পশ্চিমা সভ্যতার বিষয়ে তিনি কী মনে করেন?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা খুবই ভালো আইডিয়া।’ তার মানে অবশ্য এটাও না যে, তিনি পূর্বের সংস্কৃতিকে পশ্চিমের চেয়ে বেশি ভালো ভাবতেন। একবার বলেছিলেন, ‘ভারতীয় রকফেলার মার্কিন রকফেলারের চেয়ে ভালো হবে— এ রকম মনে করাটা মূর্খতা।’
তিনি লন্ডনে আইন পড়ে, সাউথ আফ্রিকায় থাকার সময় ভারতীয়দের অধিকার রক্ষার একটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারাবরণও করেছিলেন। এ সময় তিনি হেনরি ডেভিড থরেউর ‘সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স’ পড়েছেন, একদম মোক্ষম জায়গায়, জেলের ভেতরে। হেনরির বিবৃতি ‘আমার একমাত্র যে দায়িত্ব নেয়ার অধিকার আছে তা হলো, যেকোনো সময়ে আমার নিজের কাছে যা ঠিক মনে হয়, সেই কাজটা করা’— গান্ধীর মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছিল। তাঁর প্রতিপক্ষের লোকেরা প্রথমে তাঁকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাইত না, এ রকম আজব এক লোককে লাখ লাখ মানুষ অনুসরণ করবে— এ তাদের বিশ্বাস হয়নি। গান্ধীর পথ ছিল অহিংস এবং শুধু অহিংসাই যথেষ্ট না, তিনি এভাবে অগ্রসর হতে চাইতেন যাতে কেউ নিজেকে পরাজিত অথবা অবনমিত মনে না করে। রাজনীতিতে তাঁর নিজস্ব এ পথের নাম তিনি দিয়েছিলেন সত্যাগ্রহ।
১৯২৯ সালে গান্ধী যখন লবণ সত্যাগ্রহের প্রস্তাব করেছিলেন কংগ্রেসের অধিবেশনে, তার অনেক সহকর্মী লবণের সমস্যা নিয়ে ভালোভাবে জানতেনই না, যদিও আঞ্চলিক পর্যায়ে এ সমস্যা তত দিনে প্রায় দেড়শ বছর পুরনো ছিল। তার সহকর্মীদের আপত্তির উত্তরে গান্ধী বলেছিলেন, ‘ইংরেজ শাসকদের অবিচারের এটা এমন এক উদাহরণ, যা ভারতবর্ষের সব জাত ও ধর্মের মানুষের জীবন স্পর্শ করে। লবণ সবাই খায়।’ যদিও তিনি নিজে তত দিনে লবণ খাওয়া ছেড়েছেন।
১৯৩০ সালের ২ মার্চ গান্ধী ভারতবর্ষের ভাইসরয় লর্ড আরউইনের কাছে একটি চিঠি লেখেন— ‘আপনি যদি এই অশুভ অবস্থার থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে না পান আর আমার এই আবেদন যদি আপনার মনে কোনো আবেদনই না জাগায়, তাহলে এ মাসের ১২ তারিখে আমি এবং আমার আশ্রমের সহকর্মীরা লবণ আইনের বিধান ভাঙার জন্য যাত্রা শুরু করব, একজন দরিদ্র মানুষের কাছে লবণের ওপর নির্ধারিত এ কর আমার কাছে অত্যন্ত অন্যায় মনে হয়। স্বাধীনতা আন্দোলন যেহেতু মূলত এ দেশের দরিদ্রদের জন্য, এর শুরু হবে এই অশুভ আইন লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে। এই একচেটিয়া নিষ্ঠুরতা আমরা এত দিন ধরে মাথা নিচু করে সহ্য করে এসেছি, এটাই সবচেয়ে অবাক বিষয়।’
এ চিঠির জবাবে ভাইসরয় গান্ধীর আইন ভাঙার সিদ্ধান্তে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন।
গুজরাটে গান্ধীর সত্যাগ্রহীদের আশ্রম ছিল আহমেদাবাদ জেলের কাছে। গান্ধী তাঁর অনুসারীদের বলতেন, তাদের বেশির ভাগ সময় কাটবে কয়েদখানায়। তাঁর এ ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল। তিনি মজা করে বলতেন, জেলখানাতেই তার লেখাপড়া ভালো হয়।
মার্চের ১২ তারিখে গান্ধী যখন তাঁর ৭৮ জনের দল বাছাই করে রওনা দিয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন তাঁর দলে ভারতবর্ষের সব ধর্ম ও জাতের প্রতিনিধি থাকুক। তবে মেয়েদের তিনি নিতে চাননি। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা চাই কষ্ট ভোগ করতে, হয়তো অত্যাচারিতও হব। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে নিলে সরকার হয়তো যতটা নিষ্ঠুর হওয়ার কথা, তা হবে না।’ তারা অসহ্য গরমের ভেতর ধূলিমাখা পথ ধরে হাঁটতেন, প্রতিদিন ১২ মাইল। একটা বাঁশের লাঠি হাতে, দলের প্রথমেই ছিলেন ষাটোর্ধ্ব গান্ধী, তাঁর ধীর পদক্ষেপে আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তা। হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, কারো পা ফুলে গেছে, তারা গরুর গাড়িতে চলেছেন। গান্ধীর জন্যও একটা ঘোড়া ছিল, তবে তিনি কখনো তা ব্যবহার করেননি। প্রতিদিন সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে শুরু হতো হাঁটা, তারও অনেক আগে থেকেই গান্ধী জেগে থেকে চরকা কাটতেন, বক্তৃতার জন্য লেখা তৈরি করতেন। অনেকেই তাঁকে চাঁদের আলোয় চিঠি লিখতে দেখেছেন। গ্রামের লোকেরা যারা ভিড় করত মহাত্মাকে দেখার জন্য, তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের বলতেন ইংরেজদের একচেটিয়া বাজার দখল প্রতিরোধ করার জন্য তাঁর দলের সঙ্গে চলে আসতে। এছাড়া তিনি তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কথা বলতেন, কোনো রকম নেশা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিতেন, নিজের চরকায় বানানো খদ্দরের কাপড় পরতে বলতেন।
গান্ধী লিখেছিলেন, ‘আমি একা হই অথবা হাজার মানুষ আমার সঙ্গে থাকুক, আমার জন্য ফেরার পথ নেই।’ তবে তিনি একা ছিলেন না। পথে কত স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে হাসাহাসিও কম হয়নি। তবে বিদেশের পত্রিকাগুলো এই ছোটখাটো মানুষটার সারা ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে এ যাত্রায় মুগ্ধ হয়েছিল। তাঁর এই অভাবনীয় অবাধ্যতায় সারা পৃথিবীর মানুষ আনন্দিত হয়েছিল। যদিও ভাইসরয় লর্ড আরউইন ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেটকে লিখেছিলেন, ‘গান্ধীর শরীর অশক্ত, আর যদি তিনি প্রতিদিন এই ১২ মাইল হাঁটা বজায় রাখেন তাহলে জলদিই ভেঙে পড়বেন। আর সেটা বেশ ভালো সমাধান হবে।’
তবে লর্ড আরউইনের আশা অসার প্রমাণ করে এপ্রিলের ৫ তারিখে ২৫ দিনের পথ হেঁটে গান্ধী পৌঁছে ছিলেন ডাণ্ডি সমুদ্রের উপকণ্ঠে। তার সঙ্গে তখন ৭৮ জন সহযাত্রীর বদলে ছিল হাজার হাজার মানুষ, এদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, ধনী, গরিব, মুসলিম, অস্পৃশ্য, নারী সবাই ছিলেন। এমনকি শহরের বড় পরিবারের মেয়েরাও তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন।
সারা রাত ধরে গান্ধীর নেতৃত্বে তাঁর অনুসারীরা আরব সমুদ্রের উষ্ণ পানিতে উপাসনা করেছে। দিনের প্রথম আলোতে তিনি ও কয়েকজন সঙ্গী পানির ভেতরে ডুব দিয়ে বিশুদ্ধতার অনুষ্ঠান পালনের পর ঢেউ ভেঙে এগিয়ে গিয়ে লবণের একটা চাঙ্গর হাতে তুলে নিয়ে ইংরেজ সরকারের আইন লঙ্ঘন করেন।
ডাণ্ডির সমুদ্রতীরে গান্ধীর এই আনুষ্ঠানিকভাবে ইংরেজ আইন ভাঙার মুহূর্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এক সপ্তাহের ভেতরেই। আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে অনেকেই, অনেকের জেল হয়েছে। ছাত্র, শিক্ষক, চাষী... ভারতবর্ষের সবাই লবণ তৈরি করছিল। ইংরেজ সৈন্যরা ডাণ্ডি থেকে গান্ধীকেও গ্রেফতার করেছিল। তিনি যখন জেলে বসে চরকা চালাচ্ছিলেন, সারা ভারতে এক লাখেরও বেশি মানুষ তাঁকে অনুসরণ করে লবণনীতির প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এদের মধ্যে বড় বড় নেতারাও ছিলেন।
১৯৩১ সালের ৫ মার্চ গান্ধী-আরউইন প্যাক্টে সই করা হয়, যার ফলে লবণ প্রচারণা বন্ধ হয় আর কয়েদিদের মুক্তি দেয়া হয়। যদিও এটা ছিল একটা সমঝোতা আর ইংরেজরাই বেশি লাভবান হয়েছিল, তার পরও গান্ধী খুশি ছিলেন। কারণ প্রথমবারের মতন ভারত আর ইংল্যান্ডে সমানে সমানে কথা বলেছে, প্রভু-ভৃত্য সম্পর্ক বাদ দিয়ে।
আরউইন প্যাক্ট সই করার পরে যখন চা খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন, গান্ধী হেসে বলেছিলেন, ‘আমার চা আমি খাব, পানি, লেবু আর এক চিমটি লবণ দিয়ে।’






