সত্যজিৎ রায় তার ষাটের দশকে পরিকল্পিত বিজ্ঞান কল্পকাহিনী দি এলিয়েনের চিত্রনাট্যে এক নাটকীয় সূচনা যোগ করেছিলেন: ‘নিশুতি ভয়াল এক রাতে’ পশ্চিম বাংলার কোনো এক গ্রামের পদ্মপুকুরে স্পেস শিপ নামার সময় হেলে থাকা পদ্ম ডাঁটাগুলো খাড়া হয়ে পাপড়ি মেলে ধরছে। রায়ের ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি, তবে বর্ণনার অংশবিশেষ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় দুটি বিজ্ঞান কল্পগল্পের চলচ্চিত্রে সুবিদিতভাবেই জায়গা করে নিয়েছে: স্টিভেন স্পিলবার্গের ই.টি.— দ্য এক্সট্রা টিরেস্ট্রিয়াল ও ক্লোজ এনকাউন্টার অব দ্য থার্ড কাইন্ড।

রায়ের চলচ্চিত্রটির দিনের আলো না দেখার নেপথ্য কাহিনী সম্প্রতি ট্রাভেলস উইদ দি এলিয়েন: দ্য ফিল্ম দ্যাট ওয়াজ নেভার মেইড অ্যান্ড আদার অ্যাডভেঞ্চার্স উইদ সায়েন্স ফিকশন নামে এক বইতে নতুন করে বয়ান করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, ড্রইং, নিবন্ধ, ছোটগল্প ও সাক্ষাৎকারের সংকলন এ বইটিতে এলিয়েন-ই.টি. বিতর্কের চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে। প্রধানত এটি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান কল্পগল্পের প্রতি রায়ের সীমাহীন আবেগকেই তুলে ধরেছে।

স্পিলবার্গ এক সাইড শো। এরপর আর মনে-প্রাণে আশা করা প্রকল্প দি এলিয়েন শুরু করতে পারবেন না, তা জানা থাকায় রায়ের পক্ষে ই.টি. ছিল বিরক্তি ও হতাশার ব্যাপার। এ ব্যাপারে রায় ছিলেন দার্শনিকসুলভ, বরং চলচ্চিত্রের একটা ঘরানা হিসেবে বিজ্ঞান কল্পগল্পের সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে আলাপের পথই বেছে নিয়েছেন।  

বাবা সুকুমার রায়ের দ্য ডায়েরি অব প্রফ. হেশোরাম হুঁশিয়ার (ট্রাভেলস উইদ দ্য এলিয়েনের একটা তর্জমা রয়েছে) থেকেই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রতি রায়ের দুর্বলতার শুরু। দুনিয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় (যেমন বান্দাকুশ পর্বতমালার ১০ মাইল উত্তরের ‘কারাকোরাম’) দাবড়ে বেড়ানো বিস্ময়করভাবে অদ্ভুত ও হাস্যকর জন্তু-জানোয়ার নিয়ে আর্থার কোনান ডয়েলের দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ডের প্যারোডি ছিল এটি। 

১৯৬১ সালে প্রকাশিত সত্যজিৎ রায়ের প্রথম শিশুতোষ গল্প হেশোরামের আদলে লেখা। ব্যোম-যাত্রীর ডায়েরি বা মহাকাশচারীর দিনলিপি প্রফেসর শঙ্কুকে পরিচয় করিয়ে দেয়া মজাদার (এবং খুবই হাস্যরসাত্মক) কাহিনী। তবে এটা আবার বিজ্ঞানী অভিযাত্রীর শেষ অভিযানেরও বর্ণনা। কোনো কারণে গল্পটি এ বইতে জায়গা করে নিতে পারেনি। অবাক করা ভ্রান্তি। বিভিন্ন জার্নাল, বিজ্ঞান গ্রন্থ ও আইস্যাক অসিমভ, রে ব্র্যাডবারি, আর্থার সি. ক্লার্ক, জন উইন্ডেম এবং থিয়োডর স্টারজনের বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পড়তে গিয়ে রায় বিজ্ঞান কল্পগল্পের প্রেমে পড়েন। ফলে আরো অসংখ্য শঙ্কু কাহিনী রচিত হয়ে ভারতীয় পাঠকদের আনন্দ জুগিয়েছে।

তার ছোটগল্প, সাক্ষাৎকার, এমনকি দি এলিয়েনের চিত্রনাট্যের পরতে পরতে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনী সম্পর্কে রায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ধরনের মানবিকতার অস্তিত্ব রয়েছে। তার বিজ্ঞান কল্পকাহিনীগুলো সবসময়ই মানুষকে কেন্দ্র করে— যেসব চরিত্র আমরা চিনতে পারি— এবং চেনাজানা পটভূমিতে রচিত।

যেমন— ১৯৬২ সালের ছোটগল্প বঙ্কু বাবুর বন্ধু-তে ভূগোলপাগল এক গ্রাম্য নিরীহ স্কুলশিক্ষক পঞ্চু ঘোষের বাঁশবাগানে ভিনগ্রহের প্রাণীর দেখা পাওয়ার অল্প বাদেই পাড়াপড়শীদের সবকের মুখোমুখি হচ্ছেন— ভিনগ্রহীরা আদৌ পৃথিবীতে এলেও পশ্চিমা দেশে আসবে, নিশ্চিত করেই ওদের গ্রাম কঙ্কুরগাছিতে নয়।

রায়ের বিজ্ঞান কল্পগল্পের সবকিছুই রসবোধে ভরা পরিচিত দৃশ্য আর শব্দ নিয়ে। পঞ্চু ঘোষের বাঁশঝাড় থেকে উৎসারিত গোলাপি আভার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বঙ্কু বাবু ভাবছেন ঝিঁঝি পোকারা ডাকছে না, ব্যাপারটা কী? এমনকি তার ভিনগ্রহীরাও দেখতে মানুষের মতো।

এ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প অংক শিক্ষক, গোলাপি মশাই ও টিপুর মহাশূন্য থেকে আসা অতিথির (গোলাপি মশাই) দৈহিক গঠনের একমাত্র অস্বাভাবিক দিক হলো, তার জিভ দুটো কিন্তু দাঁত নেই। ১০ ফুট উঁচু গাছের ওপর দিয়ে লাফাতে পছন্দ করে সে। এছাড়া রায়ের অলঙ্করণে কিশোর সাংবাদিক টিনটিনের মতোই দেখায় তাকে।

বিজ্ঞানের প্রতি দুর্বলতা রায়কে কলকাতায় ১৯৬২ সালে ‘বিজ্ঞান কল্পগল্প ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্যে’ বিজ্ঞান কল্পগল্প সংঘ প্রতিষ্ঠা এবং প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বাংলা বিজ্ঞান কল্পগল্প সাময়িকী আশ্চর্যর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার পথে ঠেলে দেয়। তিনি সায়েন্স ডাইজেস্টের জন্য নিজ শহরে জায়গা করে দিয়েছেন, ক্লার্কের সঙ্গে তার সখ্য ছিল, ব্র্যাডবেরির সঙ্গে চিঠিপত্র চালাচালি করেছেন।

তার নিজের রচনার প্রসঙ্গ যখন ওঠে, রায়ের বিজ্ঞান কল্পকাহিনীগুলোর শিকড় নিজ দেশে, মামুলি জায়গায় ছিল— উপনিবেশে পরিণত মঙ্গল গ্রহে নিঃসঙ্গ মানুষের (ফোন বিকল হয়ে গেছে) মলিন ছবি তার জন্য নয়। আসলে বোধ করি শিশুদের জন্য লেখা ছোটগল্পে উৎস থাকার ফলেই রায়ের বিজ্ঞান কল্পগল্প (বড়দের জন্য লেখা ছোটগল্প সবুজ মানুষ বাদে) সহজ পাঠ্য, পশ্চিমের বেশির ভাগ বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যের কোনো ছায়া নেই। ২০০১: আ স্পেস অডিসি-তে স্ট্যানলি কুবরিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কম্পিউটার এইচএএল ক্ষমতা দখলের হুমকি দেয় কিন্তু মহাকাশ অভিযানে প্রফেসর শঙ্কুর রোবট বিধুশেখর প্রফুল্ল, উপকারী এবং বিভিন্ন  গ্রহ-নক্ষত্র দেখে বিহ্বলও।

তবু সহজ-সরল হয়েও দি এলিয়েনের চিত্রনাট্য বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, নৈতিকতা এবং ধর্ম সম্পর্কিত প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। রায়ের কল্পনায় বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরা কখনই খলনায়ক নন। তিনি বন্ধু হিসেবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বিপরীতে ই.টি.-তে প্রত্যেক বিজ্ঞানী (একজন বাদে) হূদয়হীন মানুষ, শিশুদের কাছ থেকে এক বন্ধুসুলভ ভিনগ্রহীকে ছিনিয়ে নিতে চান।

রায় বিজ্ঞানকে দানবীয় রূপ দেননি। অসিমভ বা ক্লার্কের মতো বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের কল্পনা আর গল্প বলার ঈর্ষণীয় শক্তিকে বশ করেছেন। ‘মানুষের কল্পনা সীমাহীন,’ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি, ‘আর বিজ্ঞান পিছিয়ে থাকলেও এতে সামান্যতম প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা থাকলেই ক্রমে তার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করে এবং একদিন সেটা বাস্তবে রূপ নেয়।’

রায়ের কল্পনাশক্তিতে দি এলিয়েন মহাশূন্য থেকে আসা এক অতিথির— রায় যার বর্ণনা দিয়েছেন ‘ভীষণ বুদ্ধিমান, অতিমানবীয় শক্তির অধিকারী কিন্তু স্বভাবসুলভ দুষ্টু ধরনের’— সৌজন্যে বিজ্ঞানের সীমাহীন সম্ভাবনা নিয়ে। ষাটের দশকে বড় পর্দায় আমাদের না দেখা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী হতে পারত এটা। কিন্তু তার পরই আমেরিকার ছোট শহরের বিজ্ঞান কল্পকাহিনী নিয়ে হাজির হয়েছে ই.টি.।

সেই থেকে বিজ্ঞান কল্পকাহিনী মোটামুটি বিষণ্ন কল্পনার রসকষহীন ভবিষ্যতে ফিরে গেছে। তবে বিজ্ঞান কল্প চলচ্চিত্রে রায়ের সহানুভূতিময় কল্পনার প্রত্যাবর্তন ঘটতে না পারার কোনো কারণ নেই। তার সংবেদনশীলতার প্রতি মনোযোগী কারো— মিরা নায়ারকে রায় শ্রদ্ধা করতেন, তিনি নন কেন— চিত্রনাট্যটির ধুলো ঝেড়ে উন্নত করে চলচ্চিত্রে রূপ দেয়া উচিত। ই.টি.র ঢ্যাঙা নিরাময়ী আঙুলের মতো আভা বিলিয়ে ঝিলিক মারবে, ক্ষুধা অবসানের দ্যুতিময় প্রতিশ্রুতি নিয়ে পচে যাওয়া গমক্ষেত সহসা ঝলমল করে উঠবে, বিজ্ঞানবিরোধী এ অন্ধকার সময়ে এটাই সবচেয়ে মানানসই।

সূত্র: লাইভমিন্ট