মানুষ যত আপনই ভাবুক না কেন, স্বর্গ জানে তার বিষয়াদি মানুষ তত ভালো করে জানে না। কিন্তু একজন সত্যিকার আগ্রহীর জন্য রকেটের শোঁ শোঁ হলো সেই শব্দ, যা তাকে মানুষের কল্পনার দূরতম দিগন্তে নিয়ে যায়। রকেট মানুষকে দূর জগতের শূন্যতায় পৌঁছে দেয়, নিয়ে যায় ছায়াপথ আর সৌরজগতের বাইরে; যা মানুষের অভিজ্ঞতায় নেই, যার কোনো নামও নেই।
কিংসলে আমিস তার করা সায়েন্স ফিকশন জরিপ ‘নিউ ম্যাপস অব হেল’-এ পর্যবেক্ষণ করেছেন, এ ধারার সাহিত্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ জন্মে কিশোর বয়সে আর নয়তো কখনই নয়। আমার মনে হয় উনি ঠিকই বলেছেন, কারণ আমি এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক সায়েন্স ফিকশন আসক্তকে পাইনি, যে কিনা বলেনি যে সে অনেক দিন থেকে সেগুলো পড়ছে।
আমার ক্ষেত্রে সায়েন্স ফিকশনের প্রতি আকর্ষণ জন্মেছিল ১০ বছর বয়সে, যখন আমার পিতামহের কনিষ্ঠ ভাই কুলদারঞ্জন রায় জুল ভার্নের ‘মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড’-এর অসাধারণ অনুবাদ করলেন, দুটি হলুদ খণ্ডে অনুবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পে জুল ভার্নের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণী আমাকে সেই বয়সে এবং এমনকি এখনো বিমোহিত করে। অবশ্যই জুল ভার্ন একজন অগ্রদূত। তবে তিনি সেই অগ্রদূত নন, যিনি সাময়িকভাবে একটি নতুন পথের সূচনা করে বাকি দায়িত্ব উত্তরসূরিদের কাঁধে দিয়ে গেছেন। দূরকল্পনার বিস্ময়কর ক্ষমতা নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন। আর প্রতিভা থাকার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী ও বিশদ লেখক। তিনি তার প্রথম ফ্যান্টাসি গ্রন্থ ‘ফাইভ উইকস ইন আ বেলুন’ লিখেছিলেন ৩৫ বছর বয়সে। এরপর থেকে প্রতি বছর তিনি এ রকম একটি বা দুটি উপন্যাস লিখেছেন প্রায় ৩০ বছর সময়কাল ধরে। এবং এ বছরগুলোয় থিমের দিক থেকে জুল ভার্ন তার উপন্যাসে কখনো পুনরাবৃত্তি করেননি।
জুল ভার্ন শুরুতেই এই নতুন সাহিত্য ধারার ফাঁদটি বুঝতে পেরেছিলেন। যেমন— আপনি কল্পকাহিনীতে রূপকথার মতো কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়াই মানুষের উড়ে যাওয়ার গল্প বলতে পারবেন না। এখানে বাস্তবতার একটা শর্ত আছে এবং লেখককে কষ্ট স্বীকার করতে হবে যেন তার গল্পে বাস্তবতা অনুমানের সাগরে হাবুডুবু না খায়। এক্ষেত্রে জুল ভার্ন একটি কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, তিনি তার চরিত্রকে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার অংশ করে নিয়েছিলেন; এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকে সতর্কতার সঙ্গে তিনি তার বইয়ে পুনর্নির্মাণ করতেন এবং সেটাকে কল্পকাহিনীর কাঠামোর মধ্যে বুনে দিতেন। এভাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় পাঁচ বন্দি মুক্তি পেতে চড়ে বসেন এক বেলুনে আর সেই বেলুন তাদের নিয়ে যায় রহস্যময় এক দ্বীপে। ভারতের মাটিতে তৈরি করা এক উপন্যাস ‘টাইগার্স অ্যান্ড ট্রেইটরস’-এর বিরাট অংশ জুড়ে আছে সিপাহি বিদ্রোহ এবং নানা সাহেব। ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ কোনো সায়েন্স ফ্যান্টাসি নয়, তবে একটা লম্বা গল্প, যেখানে পাঠক পুরো দুনিয়া ঘুরে আসবেন আর জুলভার্ন প্রতিটি দেশের গল্পগুলো নির্ভরযোগ্য স্থানীয় বিবরণসহ তৈরি করেছেন। ভারতীয় অংশটির বিবরণ বেশ সমৃদ্ধ, তখন সদ্য চালু হওয়া রেলের বর্ণনাও এসেছে এই উপন্যাসে।
জুল ভার্ন এইচজি ওয়েলস পড়েছিলেন এবং তার কল্পনার লাগামছাড়া দৌড়কে অপমানজনক ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন। এখন যদি কেউ এইচজি ওয়েলস পড়েন, তাহলে তিনি জুল ভার্নের আপত্তির জায়গাগুলো দেখতে পাবেন। সায়েন্স ফিকশনকে এইচজি ওয়েলস দেখতেন কাব্যিক ও রোমান্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে। মৌলিক বিষয়গুলোর চেয়ে তিনি রোমান্টিক কাব্যিক বিচ্যুতিকেই বেশি পছন্দ করতেন। ‘অদৃশ্য মানব’ কীভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়? এই রহস্য লুকিয়ে ছিল তিনটি চামড়ায় বাঁধাই করা নোটবুকে। কিন্তু যার হেফাজতে এই নোটবুকগুলো ছিল, তিনি এগুলোর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুই প্রকাশ করেননি। অদৃশ্য মানব গ্রিফিন প্রক্রিয়াটি তার ডাক্তার বন্ধুকে এভাবে বর্ণনা করেন—
কেম্প, আগে বা পরে তোমাকে আমি সব জটিল প্রক্রিয়াগুলো খুলে বলব। এখনই আমাদের সেসবের মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই... ইথারময় একটি কম্পনের দুটি বিকিরণ ছড়ানো কেন্দ্রের মধ্যে একটা স্বচ্ছ বস্তু রাখতে হবে, এটাই অবশ্য কর্তব্য, বাকিটা আমি বিশদভাবে পরে বলব... আমি দুটো ডায়নামো চেয়েছিলাম এবং এগুলো নিয়ে আমি সস্তা গ্যাস ইঞ্জিন দিয়ে কাজ করেছি। আমার প্রথম পরীক্ষাটা ছিল উলের কাপড় নিয়ে...
এইচজি ওয়েলসের উপন্যাসে দুটি বৈশিষ্ট্যকে উপস্থিত দেখা যায়— কিছু বৈজ্ঞানিক কচকচানি এবং একটি বৈজ্ঞানিক প্রণালির বিবরণ, যা খুবই সরল কিন্তু সেটাও আবার পুরোপুরি দেয়া হয় না। আর ‘টাইম মেশিন’ উপন্যাসে বৈজ্ঞানিক কচকচানিটাও বাদ পড়ে গেছে। আছে কেবল এক টাইম ট্রাভেলারের চতুর্মাত্রিক দুনিয়ায় ভ্রমণের তাত্ত্বিক সম্ভাবনার বিবরণ। টাইম মেশিনটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:
টাইম ট্রাভেলারের হাতে থাকবে জেল্লা ছড়ানো একটা ধাতব কাঠামো, এটা ছোট একটা ঘড়ির সমান বা বড়জোর সামান্য একটু বড় হতে পারে। যন্ত্রটা খুব সুন্দরভাবে তৈরি করা। এতে হাতির দাঁতের কাজ আছে আবার স্বচ্ছ ক্রিস্টাল বস্তুও আছে।
‘এই ছোট বস্তুটি’ কনুই টেবিলে রেখে এবং যন্ত্রটার ওপর দুই হাত রেখে চাপতে চাপতে টাইম ট্রাভেলার বলতে লাগলেন, ‘একটা মাত্র একটা মডেল। সময়ের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে পারে, সে রকম একটা যন্ত্র তৈরির পরিকল্পনার মডেল। তুমি দেখবে এটা দেখতে একটু তির্যক হবে, এই দণ্ডটা অদ্ভুতভাবে ঝিকমিক করে, মনে হবে যেন এটা অবাস্তব... এখানে একটা ছোট সাদা রঙের লিভার থাকবে এবং এখানে আরেকটা।’
একটা লিভার অতীতে যাওয়ার জন্য আরেকটা ভবিষ্যতে— এর চেয়ে সরল বিজ্ঞান আর কী হতে পারে? নিজে বিজ্ঞানী হলেও তিনি তার সায়েন্স ফিকশনে প্রযুক্তিকে পাশে রেখে কল্পনাতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তার গল্পের ধারণা বা সূচনার চেয়ে পরিণতিটাই বেশি উত্তেজনাকর। এটা ওয়েলসকে এক ধরনের স্বাধীনতা দিয়েছে যা জুল ভার্নের কখনো ছিল না। ‘ফ্রম দি আর্থ টু দ্য মুন’ বইয়ের ২৮টি অধ্যায়ের মধ্যে ২৬টিতেই জুল ভার্ন ব্যবহার করেছেন চাঁদে প্রথমবার অভিযানে যাওয়া নভোযান নির্মাণের পরিকল্পনা বিষয়ে। অবশ্য তার সেই আমলের বর্ণনা করা চাঁদে যাওয়ার অভিযানের পরিকল্পনার সঙ্গে এখনকার দিনের প্রযুক্তির কোনো মিল নেই। তবে এটা এখানে প্রমাণিত হয়ে যায় যে জুল ভার্ন প্রযুক্তি বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। সারা জীবনই তিনি প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং কাহিনীর মূল সূত্র তৈরি করেছেন প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে। তিনি এমন সব উদ্ভাবনের গল্প নিয়ে এসেছেন, যেগুলো মানুষকে নতুন অভিজ্ঞতা, রোমাঞ্চ আর অনুভবের মুখোমুখি করেছে। তার বিজ্ঞান এখন বাস্তবে পরিণত হলেও তার ভাবি দর্শন হয়নি। তিনি অনেক ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল সাবমেরিন, হেলিকপ্টার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং নভোযাত্রা।
বর্তমানে আমার সায়েন্স ফিকশন লেখকদের জগতে জুল ভার্ন ও ওয়েলস দুজনকেই সম্মানজনক আসন দিয়েছি। তারা সায়েন্স ফিকশনের দুটি মূল ধারার অগ্রদূত নন বরং জনক। এই ধারা দুটি এখনো টিকে আছে। তারা মোটামুটিভাবে বেরসিক আবার কবিসুলভ। জুলভার্ন প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যকে ব্যবহার করেছেন স্প্রিংবোর্ডের মতো, কিন্তু তিনি তার কল্পনাকে সম্ভাবনার সীমানা থেকে মুক্ত করতে পারেননি। আর ওয়েলস কল্পনার লাগামকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন, তিনি লব্ধ বাস্তবতা বা তথ্যকে উপেক্ষা করে কাব্যিক প্রেরণাকে ব্যবহার করেছেন। অবশ্যই অনেক গল্প আছে, যেখানে দুজনের বৈশিষ্ট্যগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের সেরা লেখকদের মধ্যে আছেন অনেক বিজ্ঞানী যেমন— আর্থার ক্লার্ক ও আইজাক আজিমভ। এরা বৈজ্ঞানিক মূলনীতিকে আমলে নিয়েই কল্পনাশক্তির বিকাশ দেখিয়েছেন।
প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের এই যুগে সায়েন্স ফিকশনও অবশ্যম্ভাবীভাবে নিত্য রূপান্তরিত হচ্ছে। আগের প্রধান রীতি নতুন কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। অ্যাপ্লাইড সায়েন্সের প্রতিটি শাখার নিত্য নতুন আবিষ্কার দিয়ে সায়েন্স ফিকশন প্রতিদিনই ঋদ্ধ হচ্ছে। লেজার রশ্মি, কম্পিউটার, স্পেস স্যাটেলাইট, অ্যান্ড্রয়েড (মানুষের আকৃতিতে রোবট) হচ্ছে আজকের দিনের সায়েন্স ফিকশনের সাধারণ উপাদান। চাঁদ নিয়ে এখন অনুমানের যুগ শেষ। অদৃশ্য হওয়া এবং টাইম ট্রাভেল করা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো সায়েন্স ফিকশনের মূল ধারা হিসেবে মর্যাদা হারিয়েছে। রোবটের এখন দিন যাচ্ছে, তবে এগুলোর হিংসাপরায়ণ দিকটিও এখন ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ ধারণা করা হয় শত্রুতা হচ্ছে এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা যন্ত্র অর্জন করতে পারে না। ইএসপি বা এক্সট্রা সেন্সরি পারসেপশন এখন সামনে আসছে। এজন্য নবতম আবিষ্কারগুলোকে ধন্যবাদ দিতে হয়।
কবিদের জন্য এখন সবচেয়ে উর্বর কাজের ক্ষেত্র হচ্ছে একস্ট্রাটেরিস্ট্রিয়াল, কারণ এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাই কবিরা কল্পনাকে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে দেন। আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্রহের নাম মঙ্গল, সেটিও কিন্তু মেঘাচ্ছন্ন; আক্ষরিক অর্থে এবং রূপকার্থে। আমাদের সৌরজগৎ নিয়ে সায়েন্স ফিকশন লেখকরা আগ্রহী না হয়ে পারেন না। প্রকৃত অর্থেই এ ক্ষেত্রটি আজ সীমাহীন।
দুনিয়ার চেনা পরিবেশে মানুষের যেকোনো অভিযানের গল্প লিখতে হলে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। রকেট মহাশূন্যে অনেক দূরে চলে যেতে পারে কিন্তু সেই রকেটটি যদি দুনিয়া থেকে উেক্ষপণ করা হয় এবং তাতে মানুষ থাকে, তাহলে সেখানে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং প্রণালি ব্যবহার করা ব্যতীত আর কোনো উপায় থাকে না।
কিন্তু এটা কোনো বাধাদান নয়। কারণ, মানুষের অনির্ণেয় আচরণ সবসময় যন্ত্রের নির্দিষ্ট করা ক্রিয়ার বিপরীত। অন্যদিকে বেশির ভাগ সাধারণ পাঠকের জন্য বাস্তব প্রযুক্তি নিজেই এক ধরনের কল্পবিজ্ঞান। মানুষ যতদিন নিজেকে ভারহীন হিসেবে অনুভব করতে পারবে, কিংবা রকেটের প্রচণ্ড গতিতে ঊর্ধ্বগমন বা দানব আকৃতির কম্পিউটারের অসীম জটিলতাকে মাপতে না পারবে, ততদিন এসব যন্ত্রের মূল ভাবনাটিই পাঠকের জন্য বিরাট বিস্ময় হয়ে থাকবে।
মানুষের বিস্ময়ের অনুভূতিতেই সায়েন্স ফিকশন বেঁচে থাকে। এবং যতদিন মানুষ ক্রমবর্ধনশীল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় নিজের ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে অনুভব করতে চাইবে, ততদিন সায়েন্স ফিকশন থাকবে। মহাকাশ, দুনিয়া, ভিনগ্রহ কিংবা নিজের মন ও শরীরে মানুষের অনুসন্ধানের যে সাফল্য এবং ব্যর্থতা, সেটা মানুষ সায়েন্স ফিকশনে দেখতে পায়— এই বিজয় এবং হার দুটোই তাকে অনুভব করতে দিন।
নাউ ম্যাগাজিন, ২১ অক্টোবর ১৯৬৬
ভাষান্তর: এসএম রশিদ






