পাঠকরা অবগত আছেন, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস রচিত নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসে ‘কলাশ্রমিক গণহত্যা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। নিজেদের বেতন-ভাতা ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশের দাবিতে একটি ধর্মঘটের পরিণতি হিসেবে যে নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, যেখানে নিরস্ত্র শ্রমিকদের একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্বিচার গুলি চালিয়ে সেনাবাহিনী অন্তত তিন হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে, তার একটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে।

১৯২৮ সালের ৫ ও ৬ ডিসেম্বর মার্কিন ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির শ্রমিকরা কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা শহরের কাছে সিয়েনাগা নগরে একটি গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন। সম্মানজনক কর্মপরিবেশের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে যেন কোম্পানিটি একটি চুক্তিতে উপনীত হয়, সেই দাবিতে ১৯২৮ সালের ১২ নভেম্বর ধর্মঘটটি শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও কোম্পানি সে রকম কোনো চুক্তি সম্পাদনে এগিয়ে আসে না, বরং সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধর্মঘটটি শেষ হয়। ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির প্রতিনিধিরা এবং কলম্বিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন কর্মকর্তারা মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে পাঠানো টেলিগ্রামে এ ধর্মঘটকে ‘কমিউনিস্টদের’ ইন্ধনজাত নাশকতামূলক একটি পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে। আর তার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই মর্মে কলম্বিয়াকে হুমকি দেয়, ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় দেশটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র ইউএস মেরিন কর্পসের সহায়তায় সেখানে হামলা চালাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনে কলম্বীয় কলার বিশাল বাজার ছিল। পাছে কোম্পানিটি কলম্বিয়ার সঙ্গে ব্যবসাটি বন্ধ করে দেয়— এ কথা বিবেচনা করে কলম্বিয়ায় মিগুয়েল আবাদিয়া মেন্দেজের রক্ষণশীল সরকার ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় কলম্বীয় সেনাবাহিনীকে এ ধর্মঘটের অবসান ঘটানোর জন্য তলব করে।

নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসে হোসে আর্কাদিও সেগান্দো সেই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী এবং সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া চরিত্রটি নিহত শ্রমিক বা নারী-পুরুষের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলে দাবি করলেও হত্যাকাণ্ডে আসলে কতজন নিহত হয়েছিল, তা কখনই জানা যায়নি।

উপন্যাসে আমরা দেখি, সরকার ও সেনাবাহিনীর লোকদের প্রচারণায়, ভয়ে, হুমকিতে হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর কথা মাকোন্দাতে কেউ বিশ্বাস করতে চায় না বা বিশ্বাস করলেও স্বীকার করে না যে ওখানে আদৌ কোনো মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম হত্যাকাণ্ড ও তার অস্বীকারের ঘটনা মোটেই বিরল নয়, এমনকি অতি সাম্প্রতিক সময়েও নয়।

আসুন, আমরা আরেকবার গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসে বর্ণিত সেই কলাশ্রমিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির শিল্পিত রূপটি পাঠ করি। ধন্যবাদ। জি এইচ হাবীব

কলার প্রথম ছড়াটা খাওয়ার আগ পর্যন্ত কেউই খেয়াল করেনি তাকে। জ্যাকব হোটেলে কোনো কামরা খালি না থাকায় ভাঙা ভাঙা হিস্পানিতে লোকটা যখন তর্কাতর্কি করছিল, তখন হঠাৎ করেই অরেলিয়ানো সেগান্দো হাজির হয়েছিল সেখানে, তারপর নতুন মানুষ দেখলে সচরাচর সে যা করে থাকে, তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। দড়িতে আটকানো বেলুনের ব্যবসা তার, সেই সূত্রেই অর্ধেক দুনিয়া ঘুরেছে সে, পয়সাও কামিয়েছে প্রচুর। কিন্তু মাকোন্দোতে কাউকে আকাশে ওড়াতে পারেনি, তার কারণ জিপসিদের উড়ন্ত গালিচা দেখে সেগুলো ব্যবহার করার পর এ আবিষ্কারটাকে নেহাতই সেকেলে ঠেকেছে তাদের কাছে। তাই পরের ট্রেনেই সে ফিরে যাচ্ছিল। ডোরাকাটা দাগঅলা যেসব কলার ছড়া ওরা সচরাচর খাওয়ার ঘরেই ঝুলিয়ে রাখে, তারই একটা যখন টেবিলে রাখা হয়, সে রকম কোনো আগ্রহ না দেখিয়েই সেখান থেকে প্রথম কলাটা ছিঁড়ে নেয় সে। কিন্তু কথা বলতে বলতে খেয়েই যেতে থাকে একটার পর একটা; যতটা না ভোজনরসিকের আনন্দ নিয়ে, তার চেয়ে বেশি এক অভিজ্ঞ লোকের বিহ্বলতা নিয়ে স্বাদ নিতে থাকে, চিবুতে থাকে, আর যখন প্রথম ছড়াটা শেষ হয়, তখন সে আরেকটা ছড়া আনতে বলে। তারপর তার সর্বক্ষণের সঙ্গী টুলবক্স থেকে বের করে অপটিক্যাল যন্ত্রপাতির ছোট্ট একটা বাক্স। হীরা ব্যবসায়ীর খুঁতখুঁতে মনোযোগ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কলাগুলোকে সে পরীক্ষা করে, বিশেষ একটা ছুরি দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করে, ফার্মাসিস্টের তুলাদণ্ডে ওজন নেয় একেকটা কলার, আর বন্দুক নির্মাতার ক্যালিপার্স দিয়ে সেগুলোর প্রস্থ মাপে। তারপর বাক্সটা থেকে একের পর এক কিছু যন্ত্রপাতি বের করে নিয়ে তাপমাত্রা, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ আর আলোর তীব্রতা মাপে। সেটা এমনই কৌতূহলভরা একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় যে, হার্বার্ট সাহেব একটা চূড়ান্ত আর চোখ খুলে দেয়া ফলাফল ঘোষণা করবে ভেবে কেউই আর শান্তিতে খেতে পারে না, কিন্তু তার মতলবটা যে কী, তা আন্দাজ করার মতো কিছুুই বলে না সে।

এর পরের কয়েকটা দিন দেখা যায়, শহরের প্রান্তসীমায় একটা জাল আর ছোট্ট একটা ঝুড়ি সঙ্গে নিয়ে প্রজাপতি ধরে বেড়াচ্ছে সে। বুধবার এসে হাজির হয় একদল ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, জলানুসন্ধানবিদ, ভূসংস্থানবিদ আর ভূজরিপকারী। তারপর হার্বার্ট সাহেব যেখানে প্রজাপতি ধরে বেড়িয়েছিল, সেখানে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালায় তারা। এরপর সেখানে এসে উপস্থিত হয় জ্যাক ব্রাউন সাহেব, হলুদ ট্রেনটার সঙ্গে জুড়ে দেয়া আর আগাপাশতলা রুপার প্রলেপ মাখানো একটা বাড়তি কোচে চড়ে, কোচটার আসনগুলো যাজকীয় মখমলের আর ছাতটা নীল কাচের। বিশেষ সেই গাড়িতে ব্রাউন সাহেবের চারপাশে ভনভন করতে করতে হাজির হয় কালো পোশাক পরা সেই গোমড়ামুখো উকিলরা, যারা মাঝে মাঝে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পেছনে ছায়ার মতো ঘুরত, আর তাতে করে লোকজনের এ রকম একটা ধারণা হয় যে, দড়িতে আটকানো বেলুন আর রঙিন প্রজাপতিঅলা হার্বার্ট সাহেবের মতো, চাকাঅলা সমাধি আর জার্মান শেফার্ড কুকুরঅলা ব্রাউন সাহেবের মতো, কৃষিবিদ, জলানুসন্ধানবিদ, ভূসংস্থানবিদ আর জরিপকারীদের সঙ্গেও যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক আছে। এ নিয়ে বেশি চিন্তাভাবনা করার সময় থাকে না, কারণ মাকোন্দোর সন্দেহগ্রস্ত অধিবাসীরা যখন সবে ভাবতে শুরু করেছে কি করেনি যে কী ঘোড়ার ডিমটাই না জানি ঘটতে যাচ্ছে, তারই মধ্যে শহরটা দস্তার ছাদঅলা কাঠের বাড়ির একটা বসতিতে বদলে যায়, যেখানে ট্রেনে করে আসা সব ভিনদেশীর বাস এবং তারা যে কেবল কোচগুলোর আসন আর পাদানিতে বসেই দুনিয়ার অর্ধেক জায়গা থেকে এসেছে তা-ই নয়, এসেছে ছাদে চড়েও। রেলপথের অন্য পাড়ে গ্রিংগোরা আলাদা একটা শহর গড়ে তোলে, তারপর মসলিনের কাপড়চোপড় পরা আর নেকাবঅলা বিরাট বিরাট টুপি মাথায় দেয়া তাদের নিস্তেজ বউগুলোকে নিয়ে আসে; সে শহরের রাস্তায় রাস্তায় সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে তাল গাছ, বাড়ির জানালায় ঝোলে পর্দা এবং সামনের উঁচু চত্বরে রাখা থাকে ছোট ছোট সাদা টেবিল, সিলিংয়ে লাগানো হয় পাখা, আর বিশাল বিশাল নীল লনে ঘুরে বেড়ায় ময়ূর ও তিতির পাখি। ধাতব একটা বেড়া দিয়ে এলাকাটা ঘেরা, আর সেই বেড়ার ওপর বিদ্যুতায়িত চিকন তারের জাল, সেই জালটা গ্রীষ্মের ঠাণ্ডা সকালগুলোয় ঝলসে যাওয়া চড়ুই পাখিতে কালো হয়ে থাকে। ওদের উদ্দেশ্যটা যে কী বা ওরা স্রেফ মানুষের উপকার করে বেড়ায় কিনা, এসবের কিছুই তখনো জানতে পারেনি কেউ। কিন্তু এরই মধ্যে ওরা মহাবিরক্তির কারণ ঘটিয়ে ফেলেছে, পুরনো সেই জিপসিরা যতটা করেছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি, যদিও ওদের কাজকর্ম যতটা পরিষ্কার আর বোধগম্য ছিল, এদেরটা ততটা নয়, বরং কম। যেসব ক্ষমতা একসময় ঐশ্বরিক শক্তির জন্য বরাদ্দ ছিল, সেগুলো পেয়ে গিয়ে ওরা বৃষ্টিপাতের ধাঁচটা বদলে ফেলে, ফসল ফলানোর চক্রটার গতি বাড়িয়ে দেয়, আর বরাবরই নদীটা যেখানে ছিল, সেখান থেকে সেটাকে সরিয়ে আনে সেটার সাদা পাথর আর বরফশীতল স্রোতসমেত, শহরের অন্যধারে, গোরস্তানের পেছনে। এ সময়টাতেই লোহার রড ব্যবহার করে পোক্ত করা কংক্রিট দিয়ে হোসে আর্কাদিওর বিবর্ণ সমাধিটার ওপর একটা দুর্গম তো তৈরি করে ওরা, যাতে বারুদের গন্ধ পানিকে দূষিত করতে না পারে। যেসব বিদেশী নিমরাজি হয়ে এসেছে, এখানে তাদের জন্য তারা ফ্রান্সের মোহনীয় রমণীদের গলিটাকে আরো বড়সড় একটা পল্লীতে রূপান্তর করে ফেলে, আর এক চমত্কার বুধবার ট্রেনভর্তি উদ্ভটসব বেশ্যাকে এনে হাজির করে, বেবিলনীয় ঢঙের সেই রমণীরা প্রাচীন সব পদ্ধতিতে পটু, আর তাদের কাছে রয়েছে সব ধরনের মলম ও কলাকৌশল; যা নির্জীবকেও উত্তেজিত করে তোলে, ডরপুককেও সাহস জোগায়, অতিলোভীর খাই মেটায়, লাজুক লোককেও উজ্জীবিত করে তোলে, যারা বারে বারে আসে তাদের একটা শিক্ষা দেয় আর নিঃসঙ্গ লোকজনের ভুলভাল শুধরে দেয়। তুর্কিদের সড়কটা এখন বিদেশী জিনিস-ঠাসা দোকানপাটে সয়লাব, আর সেগুলোর উজ্জ্বল রঙের দাপটে পুরনো সব হাটবাজার হঠে গেছে, শনিবার রাতে জায়গাটা উপচে পড়ে দুঃসাহসিক লোকজনের ভিড়ে, রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে যায় জুয়ার টেবিলে, শুটিং গ্যালারিতে, ভবিষ্যৎ আর স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার অলিগলিতে, ভাজাভুজি আর পানীয়র টেবিলে এবং রোববার সকালে এখানে-সেখানে পড়ে থাকে সুখী মাতালদের দেহ। তবে তাদেরকেই সেখানে বেশি দেখা যায়, যারা ঝগড়াঝাঁটির সময় চিৎপাত হয়ে গেছে গুলি, ঘুষি, ছোরা আর বোতলের ঘায়ে। এ এমনই এক শোরগোলভরা আর বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রাসন যে প্রথম প্রথম তো আসবাবপত্র আর তোরঙ্গের ভিড়ে, কারো অনুমতির ধার না ধেরে ফাঁকা জায়গা পাওয়ামাত্র বাড়ি বানাতে লেগে যাওয়া লোকজনের কাঠের কাজ চলার আওয়াজে, আর দুই আমন্ড গাছের মাঝখানে দোলখাটিয়া টাঙিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মশারির নিচে রমণ শুরু করে দেয়া কপোত-কপোতীদের জঘন্য কাজকর্মের কারণে রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। নিরিবিলি একমাত্র জায়গাটা তৈরি করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান শান্তিপ্রিয় নিগ্রোরা, সরু একটা রাস্তা আর তার পাশে খুঁটির ওপর কিছু কাঠের ঘর তৈরি করেছিল তারা, সেই বাড়ির দরজায় বসে তাদের অগোছালো উচ্চারণে বিষণ্ন ধর্মসংগীত গাইত তারা। এত কম সময়ে এত বেশি পরিবর্তন ঘটে যায় যে হার্বার্ট সাহেব আসার আট মাস পর নিজেদের শহরটাকে চিনতে রীতিমতো কষ্ট হয়ে দাঁড়ায় পুরনো বাসিন্দাদের।

কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া সে সময় একবার বলে, ‘নিজেদের কী এক ঝামেলায় জড়িয়েছি আমরা দেখো; কারণ কী? না, এক গ্রিংগোকে ডেকে এনে কয়েকটা কলা খেতে দিয়েছিলাম।’

...সশস্ত্র পুলিশের প্রহরাধীন একটা ট্রেনে করে ফারনান্দা মাকোন্দোয় ফেরে। পথের মধ্যেই যাত্রীদের চাপা উত্তেজনা, রেলপথের ধারে ধারে শহরে সামরিক প্রস্তুতি আর ভয়ঙ্কর কিছু ঘটার নিশ্চয়তা নিয়ে অন্য রকম হয়ে ওঠা একটা পরিবেশ লক্ষ করেছিল সে, কিন্তু মাকোন্দো পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কোনো কিছু জানতে পারেনি, পরে লোকজন তাকে বলে, হোসে আর্কাদিও সেগান্দো কলা কোম্পানির শ্রমিকদের ধর্মঘটে যাওয়ার জন্য উসকে দিচ্ছে। আপনমনে ফারনান্দা বলে, ‘এই তো চাই। পরিবারের মধ্যে এক নৈরাজ্যবাদী।’ ধর্মঘটটা হয় দুই সপ্তাহ পর কিন্তু যে রকম ভয় করা হয়েছিল, সে রকম নাটকীয় কিছু ঘটে না। শ্রমিকদের দাবি হলো, তাদের যেন রোববারও কলা কেটে গাড়িতে তুলতে বাধ্য করা না হয়। আর দাবিটা এতটাই ন্যায্য বলে বোধ হয় যে এমনকি ফাদার আন্তোনিও ইসাবেল পর্যন্ত সেটার পক্ষে ওকালতি শুরু করেন। কারণ তার ধারণা, দাবিটা ঈশ্বরের আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। দাবি আদায়ে সফলতা, আর তার পরের মাসগুলোয় হাতে নেয়া অন্যান্য কাজকর্ম সাদাসিধে হোসে আর্কাদিও সেগান্দোকে অপরিচয়ের আড়াল থেকে বের করে নিয়ে আসে। কারণ লোকজন আগে এ কথা বলতেই অভ্যস্ত ছিল, সে কেবল ফরাসি বেশ্যা দিয়ে শহর ভর্তি করে ফেলতেই ওস্তাদ। ঠিক যেভাবে ঝোঁকের মাথায় নেয়া সিদ্ধান্তের কারণে সে তার লড়িয়ে মোরগগুলো নিলামে বিক্রি করে দিয়ে হঠকারী এক নৌকা ব্যবসায় নেমে পড়েছিল, ঠিক সেভাবেই সে কলা কোম্পানির ফোরম্যানের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে শ্রমিকদের পাশে এসে দাঁড়ায়। শিগগিরই তাকে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার এক আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চর হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলা হয়। নানা আজেবাজে গুজবে কালো হয়ে ওঠা এক সপ্তাহের এক রাতে সে যখন একটা গোপন মিটিং থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন তাকে উদ্দেশ্য করে অজ্ঞাত কোনো দলের ছোড়া রিভলভারের চার চারটে গুলির হাত থেকে সে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। পরের কয়েকটা মাসের পরিবেশ পরিস্থিতি এমনই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, এমনকি উরসুলা পর্যন্ত অন্ধকার কোনায় বসে সেটা টের পেয়ে যায়। আর তার মনে হয়, সে বুঝি আরেকবার সেই বিপজ্জনক সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যখন তার ছেলে অরেলিয়ানো ধ্বংসের হোমিওপ্যাথিক বড়ি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। সেই ঘটনাটার কথা জানার জন্য সে হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু অরেলিয়ানো সেগান্দো তাকে বলে, যে রাতে তার জানের ওপর হামলা হয়েছিল, সেদিনের পর থেকে সে কোথায় আছে কেউ তা জানে না।

বিস্ময়মাখা গলায় উরসুলা বলে ওঠে, ‘ঠিক অরেলিয়ানোর মতো। দুনিয়ায় আগের ঘটনাগুলোই যেন ঘটছে আবার।’

চারপাশের উত্তেজনা ফারনান্দাকে ছুঁতে পারে না। তার স্বামীর অনুমতি না নিয়ে মেমের ভাগ্য সম্পর্কে সে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা নিয়ে অরেলিয়ানো সেগান্দোর সঙ্গে তুমুল ঝগড়ার পর থেকে দুনিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকে না তার। দরকার হলে পুলিশের সাহায্য নিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করতে বের হতে তৈরি ছিল অরেলিয়ানো সেগান্দো কিন্তু ফারনান্দা তাকে এমন কিছু কাগজপত্র দেখায়, যা দেখে বোঝা যায় মেমে তার নিজের ইচ্ছেতেই মঠে যোগ দিয়েছে। লোহার গরাদের ওপারে যাওয়ার পর মেমে আসলেই সেসব কাগজে সই করেছিল, তবে যে নির্লিপ্ততা নিয়ে সে নিজেকে পথ দেখাতে দিয়েছিল, সেই একই নির্লিপ্ততা নিয়েই কাজটা করেছিল সে। অরেলিয়ানো সেগান্দো অবশ্য সেই প্রমাণের বৈধতায় বিশ্বাস করেনি, ঠিক যেমন সে বিশ্বাস করেনি মরিসিও ব্যাবিলনিয়া মুরগির বাচ্চা চুরি করতে আঙ্গিনায় গিয়েছিল, কিন্তু দুটো যুক্তিই তার বিবেককে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। আর তাই কোনো রকম অনুতাপ ছাড়াই সে পেত্রা কোতেসের ছায়ায় ফিরে যায়, সেখানে ফের হইচইভরা আনন্দোৎসব আর লাগামছাড়া ভোজনবিলাস শুরু করে দেয়। শহরের অস্থিরতা গায়ে না মেখে, উরসুলার শান্ত ভবিষ্যদ্বাণী কানে না তুলে, ফারনান্দা তার পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনাটির চাল চালে। হোসে আর্কাদিওকে সে একটা লম্বা চিঠি পাঠায়, সে তখন তার প্রথম অর্ডার পেতে যাচ্ছে, আর সে চিঠিতে ফারনান্দা তাকে জানায়, তার বোন রেনাতা কালো বমি করে মারা গেছে। এরপর আমারান্তা উরসুলাকে সে সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের হাতে তুলে দেয়, তারপর অদৃশ্য চিকিৎসকদের সঙ্গে পত্র যোগাযোগের আয়োজন করার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে। মেমের ঘটনায় তাতে একটা বাধা পড়েছিল। প্রথমেই সে যে কাজটা করে তা হলো, মুলতবি রাখা টেলিপ্যাথিক অপারেশনটার জন্য একটা তারিখ নির্দিষ্ট করা। কিন্তু অদৃশ্য চিকিৎসকরা তাকে জানায়, মাকোন্দোতে সামাজিক উত্তেজনা থাকাকালীন সেটা উচিত হবে না। তার তখন এমনই তাড়া অথচ জানাশোনার পরিধি এত কম যে আরেক চিঠিতে সে তাদের জানায়, সে রকম কোনো উত্তেজনা আসলে বিরাজ করছে না, পুরো ব্যাপারটা তারই এক দেবরের পাগলামির ফল, যে ওই শ্রমিক সংঘের আজেবাজে ব্যাপার নিয়ে মেতে আছে, ঠিক যেমনটি সে একসময় মোরগ লড়াই আর নৌকা নিয়ে মেতে ছিল। এ ব্যাপারে দুই পক্ষ তখনো একমত হতে পারেনি, এমন সময় এক বুধবার বয়স্ক এক সন্ন্যাসিনী হাতে একটা ছোট্ট ঝুড়ি নিয়ে দরজায় ঘা দেয়। দরজা খোলার পর সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ ভাবে, ওটা বোধহয় কোনো উপহার, চমত্কার লেসের কাজ করা একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা ঝুড়িটা নেয়ার জন্য সে হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সন্ন্যাসিনী তাকে নিরস্ত করে। কারণ তার ওপর নির্দেশ আছে সেটা ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত গোপনে দোনা ফারনান্দা দেল কারপিও দে বুয়েন্দিয়ার হাতে তুলে দেয়ার। ঝুড়িটাতে করেই নিয়ে আসা হয়েছে মেমের ছেলেকে। ফারনান্দার সাবেক আধ্যাত্মিক চিকিৎসক তাকে একটা চিঠিতে খোলাসা করে লিখেছেন, শিশুটির জন্ম দুই মাস আগে। আর তারা তার নানার নামে তার নাম রেখেছে অরেলিয়ানো। কারণ ছেলের নাম সে কী রাখতে চায়, এ ব্যাপারে তার মা মুখই খোলেনি। নিয়তির সেই চাতুরির বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে রুখে দাঁড়ায় ফারনান্দা, তবে সন্ন্যাসিনীর সামনে সেটা প্রকাশ না করার মতো যথেষ্ট শক্তির পরিচয় দেয় সে।

মুচকি হেসে সে বলে, ‘আমরা সবাইকে বলব, ওকে আমরা একটা ঝুড়িতে ভাসমান অবস্থায় পেয়েছি।’

সন্ন্যাসিনী বলে, ‘কেউ সে কথা বিশ্বাস করবে না।’

ফারনান্দা জবাব দেয়, ‘লোকে যদি বাইবেলের কথা বিশ্বাস করতে পারে, তাহলে আমার কথা কেন করবে না?’

বাড়িতেই দুপুরের খাওয়া সেরে নেয় সন্ন্যাসিনী, ওদিকে ফারনান্দা তখন অপেক্ষা করে ট্রেনটা ফিরে আসার। আর সন্ন্যাসিনীর কাছে যে রকম বিবেচনাবোধ আশা করা গিয়েছিল, তারই পরিচয় দিয়ে দ্বিতীয়বার সে আর শিশুটির কথা উল্লেখ করে না। কিন্তু ফারনান্দা তাকে তার লজ্জার এক অবাঞ্ছিত সাক্ষী হিসেবেই গণ্য করে। আর ভগ্নদূতকে ফাঁসি দেয়ার মধ্যযুগীয় রীতি যে লোকে কেন বর্জন করল, এ আক্ষেপ করতে থাকে বারবার। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় বাচ্চাটিকে সিস্টার্নে চুবিয়ে মারার কিন্তু মনটা তার অতটা শক্ত নয়, ফলে যতদিন পর্যন্ত ঈশ্বরের অনন্ত কৃপা তাকে তার এ বিরক্তি থেকে মুক্তি না দিচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করাই স্থির করে সে।&dquote;&dquote;

নতুন অরেলিয়ানোর বয়স যখন এক বছর, সেই সময় কোনো রকম আগাম আভাস না দিয়েই লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হোসে আর্কাদিও সেগান্দো আর অন্যান্য যেসব ইউনিয়ন নেতা আত্মগোপন করেছিল, তারা হঠাৎ এক সপ্তাহান্তে উদয় হয় এবং গোটা কলা অঞ্চলের শহরগুলোর ভেতর দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন, মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করে। পুলিশ স্রেফ নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষা করে। কিন্তু সোমবার রাত্রিবেলা নেতাদের তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পায়ে দুই পাউন্ড করে লোহার বেড়ি পরিয়ে প্রাদেশিক রাজধানীর জেলে চালান করে দেয়া হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছে হোসে আর্কাদিও সেগান্দো আর লরেঞ্জো গাভিলান, মাকোন্দোতে নির্বাসিত মেক্সিকো বিপ্লবের এক কর্নেল, যে বলেছিল, সে নাকি তার বন্ধু আর্তেমিও ক্রুজের বীরত্ব নিজ চোখে দেখেছে। তিন মাস পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। তার কারণ সরকার আর কলা কোম্পানি নাকি এ সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে পারেনি যে জেলে এ দুজনকে কে খাওয়াবে। শ্রমিকদের এবারের আন্দোলনটা দানা বেঁধেছে তাদের বাসস্থানে স্যানিটারি সুবিধাদির অভাব, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা না থাকা, আর শোচনীয় কাজের পরিবেশ এসবকে কেন্দ্র করে। তাছাড়া তাদের আরো বক্তব্য হলো, তাদের আসলে টাকায় বেতন দেয়া হয় না, দেয়া হয় রসিদের মাধ্যমে, যা দিয়ে কেবল কোম্পানির কমিসারিতে ভার্জিনিয়ার হ্যাম কেনা যায়। হোসে আর্কাদিও সেগান্দোকে জেলে পোরা হয়েছিল। কারণ সে এ ব্যাপারটা ফাঁস করে দিয়েছিল যে রসিদ দিয়ে বেতন দেয়াটা আসলে কোম্পানির বের করা একটা ব্যবস্থা, যাতে করে ফলের জাহাজগুলোয় টাকা খাটানো যায়, নইলে কমিসারির পণ্য ছাড়া সেগুলোকে নিউ অরলিন্স থেকে কলার বন্দরে খালি ফেরত যেতে হয়। অন্য সব অভিযোগের কথা সবারই জানা। কোম্পানির ডাক্তাররা কোনো রোগীকে পরীক্ষা করে না, একজনের পেছনে আরেকজনকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নার্সরা কপার সালফেটের মতো দেখতে একটা করে বড়ি সবার জিভের ওপর ছেড়ে দেয়, তা তাদের ম্যালেরিয়াই থাকুক বা গনোরিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। চিকিৎসাটা এতই মামুলি ব্যাপার ছিল যে শিশুরা বহুবারই লাইনে গিয়ে দাঁড়াত এবং বড়িটা গিলে না ফেলে সেটাকে বিঙ্গো খেলার মার্কার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বাড়ি নিয়ে যেত। কোম্পানি শ্রমিকরা একসঙ্গে গাদাগাদি করে দুর্দশাগ্রস্ত সব ব্যারাকে থাকত। ইঞ্জিনিয়াররা টয়লেট না বসিয়ে বড়দিনের সময় প্রতি ৫০ জনের জন্য একটা বহনযোগ্য শৌচাগার ক্যাম্পে আনাত। তারপর কীভাবে ব্যবহার করলে সেগুলো অনেকদিন ভালো থাকবে, তার একটা গণপ্রদর্শনীর আয়োজন করত। যারা একসময় কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়াকে ঘিরে থাকত, অথচ এখন কলা কোম্পানির হাতের পুতুল, সেই কালো পোশাক পরা জরাগ্রস্ত উকিলরা ওসব দাবিদাওয়া এমন সব সিদ্ধান্তের সাহায্যে নাকচ করে দেয় যে ব্যাপারটাকে ভেলকিবাজি বলে মনে হয়। শ্রমিকরা সর্বসম্মত অনুরোধের একটা তালিকা দাঁড় করালে কোম্পানিকে সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে সেই উকিলদের মেলা সময় লেগে যায়। ঐক্যজোটটার ব্যাপারে জানতে পেরেই ব্রাউন সাহেব তার কাচ দিয়ে মোড়া বিলাসবহুল কোচটাকে ট্রেনটার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কোম্পানির আরো কিছু বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে মাকোন্দো থেকে উধাও হয়ে যায়। অবশ্য পরের শনিবার তাদের একজনকে কয়েকজন শ্রমিক একটা বেশ্যালয়ে পেয়ে যায়, লোকটাকে ফাঁদে ফেলতে যে নারী তাদের সাহায্য করেছিল তারই সঙ্গে ন্যাংটো অবস্থায়, তখন তারা তাকে দিয়ে সেই দাবিদাওয়ার কাগজগুলোর একটা অনুলিপিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। গম্ভীরদর্শন উকিলরা আদালতে বলে, লোকটার সঙ্গে কোম্পানির কোনো সম্পর্ক নেই। আর কেউ যাতে তাদের কথা অবিশ্বাস না করে সেজন্য তারা তাকে একটা প্রতারক হিসেবে জেলে পোরার ব্যবস্থা করে। পরে একটা তৃতীয় শ্রেণীর কোচে ছদ্মবেশে ভ্রমণরত ব্রাউন সাহেবকেও অবাক করে দেয় শ্রমিকরা, আর তাকে দিয়েও তারা দাবিদাওয়ার আরেকটা অনুলিপিতে সই করিয়ে নেয়। পরদিন সে বিচারকদের সামনে হাজির হয়, তখন তার চুলে কলপ, মুখে নিখুঁত হিস্পানি বুলি। উকিলরা প্রমাণ করে দেয়, সে আলবামার প্র্যাটভিলে জন্মগ্রহণকারী, কলা কোম্পানির সুপারিনটেনডেন্ট জ্যাক ব্রাউন সাহেব নয়, বরং এক নিরীহ ভেষজ গাছগাছড়া বিক্রেতা, জন্ম মাকোন্দোয়, নাম দাগোবের্তো ফনসেকা। খানিক পর, শ্রমিকদের আরেক দফা প্রচেষ্টার পর উকিলরা সবার সামনে ব্রাউন সাহেবের মৃত্যুর সনদপত্র হাজির করে, সেটা সত্যায়িত করেছে কয়েকজন কনসাল আর বিদেশমন্ত্রী। আর সেটার বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৯ জুন শিকাগোতে একটা দমকল বাহিনীর উঞ্জিনের নিচে চাপা পড়ে সে মারা গেছে। এসব ব্যাখ্যামূলক প্রলাপে ক্লান্ত হয়ে শ্রমিকরা মাকোন্দোর কর্তৃপক্ষের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে উচ্চতর আদালতে তাদের অভিযোগ দাখিল করে। আর সেখানেই ওস্তাদ উকিলরা ভোজবাজিতে প্রমাণ করে দেয়, ওসব দাবিদাওয়া স্রেফ এ সাধারণ কারণে অসার যে কলা কোম্পানির চাকরিতে কোনো শ্রমিক নেই, কোনোদিনই ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না, কারণ তাদের সবাইকেই অস্থায়ী ভিত্তিতে আর দরকারমতো ভাড়া করা হয়েছিল। কাজেই সেই ভার্জিনিয়া হ্যামের গল্প স্রেফ গাঁজাখুরি, অলৌকিক বড়ি আর ইয়ুলিটাইড পায়খানার গল্পগুলোও তা-ই এবং শ্রমিকদের যে কোনো অস্তিত্বই নেই— এ কথা আদালতের এক হুকুমবলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, বিধিসম্মত রায় হিসেবে লেখাও হয়ে যায়।

শুরু হয়ে যায় সেই মহাধর্মঘট। মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় আবাদ, ফলগুলো পচতে থাকে গাছে, আর ১২০ গাড়ির ট্রেনটা পড়ে থাকে সাইডিংয়ে। বেকার শ্রমিকে ভরে যায় শহরগুলো। তুর্কিদের সড়কে প্রতিধ্বনি ওঠে এক শনিবারে আর তা স্থায়ী হয় বেশ কিছুদিন, হোটেল জ্যাকবের বিলিয়ার্ড খেলার ঘরে ওদের ২৪ ঘণ্টার শিফট চালু করতে হয়। হোসে আর্কাদিও সেগান্দো যখন সেই হোটেলেই রয়েছে, সে সময়েই একদিন ঘোষণা দেয়া হয়, নাগরিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ভার সামরিক বাহিনীর হাতে দেয়া হয়েছে। যদিও ব্যাপারটা এমন নয়, শুভাশুভ সংকেতের সঙ্গে তার বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু তার পরও হোসে আর্কাদিও সেগান্দো খবরটা একটা মৃত্যুর ঘোষণা হিসেবেই দেখে, যে ঘোষণার জন্য সে সেদিন থেকে অপেক্ষা করছিল, যেদিন কর্নেল জেরিনালদো মার্কেস তাকে একটা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দৃশ্য দেখানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য অশুভ সংকেতটা তার গাম্ভীর্যে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। সে তার পরিকল্পনামতো কাজ করে ফেলে। আর তা ভালোভাবেই করে। ড্রামের শব্দ, বিউগলের তীক্ষ, তীব্র আওয়াজ আর লোকজনের চিত্কার ও দৌড়াদৌড়ির শব্দ তাকে বলে দেয়, কেবল যে বিলিয়ার্ড খেলাই শেষ হয়েছে তা-ই নয়, শেষ হয়েছে সেই নিঃশব্দ একা একা খেলাটিও, যা সে খেলে আসছিল, সেই ভোরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দিনটি থেকে। এর পরই সে বাইরে বেরিয়ে এসে ওদের দেখতে পায়। একটা গ্যালি ড্রামের তালে তালে কুচকাওয়াজ করে চলেছে তিনটে রেজিমেন্ট, সেই আওয়াজে ধরণী কাঁপছে। অগুনতি মাথাওয়ালা একটা ড্রাগনের নাসিকা গর্জন জঘন্য বাষ্প দিয়ে দুপুরের প্রখর দীপ্তিকে ভরিয়ে তুলছে। দেখতে ওরা ছোটখাটো, গাট্টাগোট্টা আর নির্দয়-নিষ্ঠুর চেহারার। ঘোড়ার মতো ঘামছে ওরা, গায়ে রোদে শুকানো চামড়ার মতো গন্ধ, পাহাড়ি লোকদের মতো মৌনী আর অভেদ্য তাদের অধ্যবসায়। যদিও ১ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে তাদের মার্চ করে চলে যেতে কিন্তু দেখে মনে হওয়া বিচিত্র ছিল না, কয়েকটা মাত্র স্কোয়াড গোল হয়ে মার্চ করছে। কারণ দেখতে তারা সব একই রকম, একই কুক্কুরীর পুত্রসন্তান, আর একই অবিচলতা নিয়ে তারা সবাই তাদের দল আর ক্যান্টিন, বেয়নেট লাগানো বন্দুকের লজ্জা, অন্ধ বশ্যতার ক্ষত আর একটা সম্মানবোধের ছাপ বয়ে চলেছে। উরসুলা ছায়ান্ধকারে রাখা তার বিছানা থেকেই ওদের চলে যাওয়ার শব্দ শোনে, তারপর আঙুল দিয়ে ক্রুশ আঁকে। এই মাত্র ইস্তিরি করা নকশা আঁকা টেবিল ঢাকনাটির ওপর ভর দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ, ভাবে তার ছেলে হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর কথা, ওদিকে সে তখন ভাবলেশহীন মুখে হোটেল জ্যাকবের দরজার পাশ দিয়ে শেষ সৈন্যটির চলে যাওয়া দেখছে।

সামরিক আইন এ বিরোধে সেনাবাহিনীকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ করে দেয় কিন্তু বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। মাকোন্দোয় পা রাখা মাত্র সৈন্যরা রাইফেল সরিয়ে রাখে, তারপর কলা কেটে ট্রেনবোঝাই করে সেটা চালু করে দেয়। এতক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিকরা অপেক্ষা করেই সন্তুষ্ট ছিল, এবার তারা তাদের কাজের হাতিয়ার সেই মেশেটি হাতেই বনে ঢুকে এ অন্তর্ঘাতের বিরুদ্ধেই অন্তর্ঘাতী কাজে নেমে পড়ে। কলার বাগান আর কমিসারিতে আগুন লাগিয়ে দেয় তারা; মেশিনগানের গুলি ছুড়ে পথ করে নেয়া শুরু করেছিল ট্রেনগুলো, ওরা তাতে বাধা দেয়ার জন্য রেলপথ উপড়ে ফেলে, কেটে দেয় টেলিগ্রাফ আর টেলিফোনের তার। সেচকাজের গর্তগুলোয় রক্তের ছোপ লাগে। বিদ্যুতায়িত চিকন তারের জাল-ঘেরা জায়গাটার মধ্যে থাকা ব্রাউন সাহেবকে তার দেশী ভাইদের পরিবারসহ মাকোন্দো থেকে সরিয়ে ফেলা হয়, তারপর তাদের সেনাবাহিনীর প্রহরাধীনে একটা নিরাপদ জায়গায় রাখা হয়। পরিস্থিতিটা যখন একটা রক্তাক্ত আর অসম গৃহযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে, এমন সময় কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের মাকোন্দোতে জড়ো হতে বলে। সেই আহ্বানে বলা হয়, প্রদেশের সামরিক ও বেসামরিক নেতারা এ বিরোধে মধ্যস্থতা করতে পরের শুক্রবার এসে পৌঁছবেন।

যেসব শ্রমিক শুক্রবার খুব সকাল থেকেই স্টেশনে এসে জড়ো হয়েছিল, তাদের ভিড়ের ভেতরেই ছিল হোসে আর্কাদিও সেগান্দো। ইউনিয়ন নেতাদের একটা মিটিংয়ে অংশ নিয়েছে সে, এখানে আসার আগে কর্নেল গাভিলানের সঙ্গে, তার ওপর দায়িত্ব পড়েছে ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়ার। খানিকটা অসুস্থ বোধ হতে থাকে তার, আর তার টাকরায় যখন নোনামতো একটা আঠালো বস্তু দলা পাকাতে শুরু করেছে, এমন সময় সে খেয়াল করে সেনাবাহিনী সেই ছোট্ট স্কোয়ারটার চারপাশে মেশিনগান দাঁড় করানোর মঞ্চ বসিয়েছে, কলা কোম্পানির তার দিয়ে ঘেরা শহরটা গোলন্দাজ বাহিনীর কামান দিয়ে সুরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। যে ট্রেনটা শেষ পর্যন্ত  আর আসবে না, সেটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে তিন হাজারেরও বেশি লোক— শ্রমিক, মহিলা আর শিশু— দুপুর ১২টার দিকে স্টেশনের সামনের খোলা জায়গাটা থেকে উপচে পড়ে সারি সারি মেশিনগান দিয়ে বেড় দিয়ে রাখা পাশের রাস্তাগুলোর দিকে চেপে আসতে শুরু করে। মনে হয়, এ যেন অপেক্ষারত মানুষজনের ভিড় নয়; বরং আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকা একটা মেলা। তুর্কিদের সড়ক থেকে লোকজন পিঠা আর পানীয়র স্ট্যান্ড নিয়ে এসেছে, অপেক্ষার একঘেয়েমি আর প্রখর রোদের মধ্যেও লোকজনের ভেতর ফূর্তির মেজাজ। তিনটা বাজার খানিক আগে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সরকারি ট্রেনটা পরের দিনের আগে আর আসছে না। হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাস ওঠে ভিড়ের ভেতর থেকে। ভিড়ের দিকে মুখ করে চারটে মেশিনগানের মঞ্চ বসানো হয়েছে স্টেশনের ছাদে, সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট সেখানে উঠে লোকজনকে চুপ করতে বলে। হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর পাশেই এক নারী দাঁড়িয়ে, খালি পা, ভীষণ মোটা, সঙ্গে দুটো শিশু, তাদের বয়স চার থেকে সাতের মধ্যে। ছোটজনকে সে কোলে নিয়ে আছে; হোসে আর্কাদিও সেগান্দোকে না চিনেই সে তাকে বলে, সে যেন বড়টিকে উপরে তুলে ধরে, যাতে কথাগুলো সে ভালো করে শুনতে পায়। হোসে আর্কাদিও সেগান্দো শিশুটিকে কাঁধের ওপর তুলে নেয়। যদিও তখন কেউই তার কথা বিশ্বাস করবে না কিন্তু বহু বছর পরেও সেই শিশুটিকে বলতে শোনা যাবে, সে লেফটেন্যান্টকে পুরনো একটা ফনোগ্রাফের শিঙ্গা দিয়ে সেই প্রদেশের সামরিক ও বেসামরিক নেতার ৪ নম্বর ডিক্রিটা পড়তে শুনেছে। জেনারেল কার্লোস কোর্তেস ভার্গাস আর তার সচিব মেজর এনরিকে গার্সিয়া ইসাযার সই করা ছিল সেটায়; তো যারা ধর্মঘটে যাচ্ছে তাদেরকে লেফটেন্যান্ট আশি শব্দের তিনটে ধারায় ‘এক দঙ্গল রাস্তার গুণ্ডা’ বলে ঘোষণা করে। আর তারপর হত্যার জন্য গুলি করার অনুমতি প্রদান করে সেনাবাহিনীকে।

ডিক্রিটা পড়া হয়ে যাওয়ার পর প্রতিবাদের কানে তালা লাগানো চিত্কারের ভেতর সেই লেফটেন্যান্টের জায়গায় এক ক্যাপ্টেন এসে দাঁড়ায় স্টেশনের ছাদে, শিঙ্গার সংকেত দিয়ে জানায়, সে কিছু কথা বলতে চায়। ফের শান্ত হয়ে আসে জমায়েতটা। নিচু, ধীর আর খানিকটা ক্লান্ত স্বরে ক্যাপ্টেন বলে, ‘ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়রা, ৫ মিনিট সময় দেয়া গেল আপনাদের এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য।’

মিনিট গুনতে শুরু করা বিউগলের আওয়াজ চাপা পড়ে যায় আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া বিদ্রূপভরা চেঁচামেচির শব্দে। কেউ নড়ে না।

সেই একই সুরে ক্যাপ্টেন বলে ওঠে, ‘৫ মিনিট পার হয়ে গেছে। আর ১ মিনিট, তার পরেই আমরা গুলি ছুড়তে শুরু করব।’

ঠাণ্ডা ঘাম বেরোতে থাকে হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর শরীর থেকে, শিশুটাকে নামিয়ে মহিলার কাছে ফিরিয়ে দেয় সে। বিড়বিড় করে মহিলা বলে, ‘ওই বেজন্মারা কিন্তু গুলি ছুড়তেও পারে।’ কথা বলার সময় নেই তখন হোসে আর্কাদিও সেগান্দোর, কারণ সেই মুহূর্তেই মহিলার কথাটারই প্রতিধ্বনি তুলে চিত্কার করে ওঠা কর্নেল গাভিলানের কর্কশ গলাটা চিনতে পারে সে। টানটান উত্তেজনার মাদকতদায়, সেই নৈঃশব্দের অলৌকিক গভীরতায়, আর মৃত্যুর সঙ্গে এক আকর্ষণে আটকে যাওয়া জনতাকে কোনো কিছুই এখান থেকে নড়াতে পারবে না—  এ ব্যাপারে আরো নিশ্চিত হয়ে হোসে আর্কাদিও সেগান্দো তার সামনের মাথাগুলোর ওপর নিজের মাথাটা তুলে ধরে। তারপর জীবনে এই প্রথমবারের মতো সে উঁচু গলায় কথা বলে ওঠে।

চিত্কার করে সে বলে ওঠে, ‘বেজন্মার দল! ওই বাড়তি মিনিটটা নিয়ে তোরা তোদের পোদের মধ্যে লাগিয়ে রাখ।’

তার সেই চিত্কারের পর এমন একটা ব্যাপার ঘটে, যাতে আতঙ্ক নয়, বরং এক ধরনের বিভ্রম ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন গুলি ছোড়ার আদেশ দেয়, ১৮টা মেশিনগান একসঙ্গে তার হুকুম তামিল করে। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাকেই একটা প্রহসন বলে মনে হয়। মেশিনগানগুলোকে যেন ঢাকনা পরিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে, কারণ সেগুলোর হাঁফ ধরানো ঘর্ঘর শব্দ শোনা যাচ্ছে, ভাস্বর অগ্নিবর্ষণ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু সামান্যতম প্রতিক্রিয়াও লক্ষ করা যাচ্ছে না, কোনো চিত্কার নয়, এমনকি যে নিবিড় জনতাকে মনে হয় যেন একটা তাত্ক্ষণিক অভেদ্যতায় জমে কঠিন হয়ে গেছে, সেটার ভেতর থেকে একটা কান্না বা কোনো দীর্ঘশ্বাসেরও শব্দ ওঠে না। হঠাৎ স্টেশনের একপাশ থেকে একটা মরণ চিত্কার সেই মন্ত্রমুগ্ধতা ছিড়ে ফালা ফালা করে দেয়: ‘ও, মাগো।’ ভূমিকম্পের মতো একটা কণ্ঠ, একটা আগ্নেয় নিঃশ্বাস, একটা মহাবিপর্যয়ের গর্জন বিপুল বিস্তারে ছড়িয়ে পড়ার শক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে সেই ভিড়ের কেন্দ্র থেকে। হোসে আর্কাদিও সেগান্দো কোনোমতে তুলে নেয় শিশুটাকে, আর ওদিকে মা-টি অন্য শিশুটিকে নিয়ে হারিয়ে যায় আতঙ্কে ঘুরপাক খাওয়া জনতার ভেতর।

হোসে আর্কাদিও সেগান্দো কীভাবে তাকে তার মাথার ওপর তুলে ধরে প্রায় শূন্যের ভেতর দিয়ে টেনে, যেন সেই জনতার আতঙ্কের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে, পাশের রাস্তাটার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সে কথা সেই শিশুটি বহু বছর পরেও বলবে, যদিও লোকে তখন তাকে এক পাগল বুড়ো মনে করবে। সেই সুবিধেজনক অবস্থানে থাকার সুবাদে শিশুটি সে সময় দেখতে পেয়েছিল যে, সেই উন্মত্ত জনতা যখন কোনাটার দিকে এগোতে শুরু করেছে, তখনই মেশিনগানের সেই সারি থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেছিল বেশ কয়েকটা গলা, ‘শুয়ে পড়ুন! শুয়ে পড়ুন!’

সামনের সারির লোকেরা অবশ্য গুলির লহরির আঘাতে এরই মধ্যে সে কাজ সেরে ফেলেছে। শুয়ে পড়ার বদলে জীবিতরা মাঝখানের সেই স্কোয়ারটায় যাওয়ার চেষ্টা করে, আর আতঙ্কটা একটা ড্রাগনের লেজ হয়ে যায়, একটা নিবিড় ঢেউ আরেকটা বিপরীতমুখী ঢেউয়ের ওপর আছড়ে পড়ে, সেটা আবার এগিয়ে যাচ্ছিল অন্য ড্রাগনের লেজটার দিকে রাস্তার অন্য পারে, আর সেখানেও বিরামহীন গুলি ছুড়ে যাচ্ছিল মেশিনগানগুলো। প্রবল একটা ঘূর্ণিঝড় হয়ে ঘুরপাক খেতে খেতে ঘেরাও হয়ে পড়ে ওরা, আর ঘূর্ণিঝড়টা ছোট হতে হতে শেষ পর্যন্ত সেটার নাভিতে এসে ঠেকে। কারণ সেটার প্রান্তসীমাটা চারপাশ থেকেই নিয়মবদ্ধভাবে ছেঁটে ফেলা হচ্ছিল, যেন কিছু মেশিনগানের অতৃপ্ত, নিয়মবদ্ধ কাঁচি একটা পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শিশুটি দেখতে পায়, এক মহিলা তার হাত দুটো বুকে ক্রুশের মতো জড়ো করে হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটা খোলা জায়গায়, আর কী রহস্য, কেউই তাকে মাড়িয়ে যাচ্ছে না। সেই ফাঁকা জায়গাটা, সেই হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মহিলা, সেই উঁচু, খরায় আক্রান্ত আকাশের আলো, আর উরসুলা ইগুয়ারান যে বেবুশ্যে দুনিয়ায় এত এত ছোট ছোট মিছরির জন্তু-জানোয়ার বিক্রি করেছে, সেটাকে পর্যন্ত সেই অতিকায় সৈন্যদলটা ঝেঁটিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে হোসে আর্কাদিও সেগান্দো শিশুটিকে ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আর তার পরেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় তার রক্তমাখা মুখটা নিয়ে।

যখন তার জ্ঞান ফিরে আসে, হোসে আর্কাদিও সেগান্দো তখন অন্ধকারে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। সে বুঝতে পারে এক অন্তহীন, নিঃশব্দ ট্রেনে সওয়ার হয়েছে সে, শুকনো রক্তে তার মাথাটা শক্ত হয়ে আছে, আর তার সারা শরীরে একটা ব্যথার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছে। এক অদম্য ইচ্ছে হয় তার ঘুমিয়ে পড়ার। সন্ত্রাস আর আতঙ্ক থেকে নিরাপদ অবস্থায়, বেশ কয়েক ঘণ্টার একটা ঘুম দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে যে-পাশটায় কম ব্যথা করছে সে-পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে সে, আর তখনই সে বুঝতে পারে যে সে আসলে মরা মানুষজনের গায়ে ঠেস দিয়ে আছে। মাঝখানের আলপথটা ছাড়া গাড়িটায় খালি বলতে কোনো জায়গাই নেই। সেই গণহত্যার পর নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ পার হয়ে গেছে, তার কারণ শরত্কালের পলেস্তারার মতো তাপমাত্রা লাশগুলোর, শক্ত হয়ে যাওয়া ফোমের মতোই কঠিন, আর লাশগুলো যারা গাড়িতে তুলেছে, তারা নিশ্চয়ই কলার ছড়া চালান দেয়ার মতো করেই গাড়িতে ফেলেছিল সেগুলোকে। দুঃস্বপ্নের হাত থেকে রেহাই পেতে ট্রেনটা যেদিকে ছুটে চলেছে, সেদিক বরাবর নিজেকে এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে টেনে নিয়ে যায় হোসে আর্কাদিও সেগান্দো এবং ঘুমন্ত শহরগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় কাঠের পাত ভেদ করে আলোর যে ঝলক এসে ভেতরে ঢুকছিল, সেই আলোয় সে দেখতে পায় পুরুষের লাশ, নারীর লাশ, শিশুর লাশ; এদের সবাইকে বাতিল কলার মতো ফেলে দেয়া হবে সমুদ্রে। স্কোয়ারে পানীয় বিক্রি করত যে মহিলা, তাকে আর কর্নেল গাভিলানকে চিনতে পারে সে কেবল, মরেলিয়া সিলভারের বাকলওয়ালা যে বেল্টটা দিয়ে কর্নেল গাভিলান সেই আতঙ্কের ভেতর দিয়ে পথ করে নিতে চেয়েছিল, সেই বেল্টটা তখনো তার হাতে পেঁচানো। প্রথম গাড়িটায় পৌঁছে সে অন্ধকারের ভেতর লাফিয়ে পড়ে, ট্রেনটা চলে যাওয়া পর্যন্ত রেলপথের পাশেই শুয়ে থাকে। প্রায় ২০০ মাল গাড়ি, দুই মাথায় দুটো আর মাঝখানে আরেকটা লোকোমোটিভসহ এ ট্রেনটা তার দেখা সবচেয়ে লম্বা ট্রেন। কোনো আলো নেই ট্রেনটায়, এমনকি লাল আর সবুজ রানিং লাইট দুটোও নেই। ফলে একটা নৈশ, সংগোপন গতিবেগে পার হয়ে যায় সেটা। গাড়িগুলোর মাথায় দেখা যায় তাক করা মেশিনগান নিয়ে বসে থাকা সৈন্যদের কালো কাঠামো।

বহু বছর আগে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যুদ্ধের আর্কষণ সম্পর্কে তার সঙ্গে আলাপ করেছিল। আর তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অগুনতি উদাহরণ টেনে এনে তাকে বোঝাতে চেয়েছিল সেই আকর্ষণের কথা। সে তার কথা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু যে রাতে গত কয়েক মাসের উত্কণ্ঠা, জেলের কষ্ট, স্টেশনের আতঙ্ক, আর মরা মানুষভর্তি ট্রেনটার কথা ভাবার সময় সৈন্যরা তার দিকে তাকায় কিন্তু তাকে দেখে না, সেদিনই হোসে আর্কাদিও সেগান্দো এ সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছে যে কর্নেল অরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া হয় একটা ঠক নয়তো নির্বোধ ছিল। সে এ কথা বুঝতে পারে না যে যুদ্ধের সময় তার অনুুভূতি কী ছিল, সে কথা বোঝাতে লোকটা এত কথা খরচা করেছিল কেন, কারণ সেজন্য তো একটা শব্দই যথেষ্ট ছিল: ভয়। অন্যদিকে মেলকিয়াদেসের কামরায় অতিপ্রাকৃত সেই আলো, বৃষ্টির শব্দ, অদৃশ্য হয়ে থাকার অনুভূতি এসবের নিরাপত্তার কারণে সে সেই প্রশান্তিটুকু পায়, যা সে তার আগের জীবনে এক মুহূর্তের জন্যও পায়নি, আর তখন তার কেবল যে ভয়টি থাকে সেটি হলো, ওরা না তাকে জ্যান্ত কবর দেয়। সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদ যখন তার প্রতিদিনের খাবার নিয়ে আসে, তখন সে তাকে তার আশঙ্কার কথা জানালে সে তাকে কথা দেয়, এমনকি তার প্রাকৃতিক শক্তির বাইরে গিয়ে হলেও সে এ ব্যাপারটা নিশ্চিত করার জন্য বেঁচে থাকবে যে ওরা তাকে যেন মৃত অবস্থাতেই কবর দেয়। সব ভয় থেকে মুক্ত হয়ে হোসে আর্কাদিও সেগান্দো তখন মেলকিয়াদেসের পাণ্ডুলিপি অসংখ্যবার খুঁটিয়ে দেখার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করে, আর সেগুলো যখন সে বুঝতে পারে না, তখনই সে অনেক বেশি আনন্দ পেতে থাকে। বৃষ্টির শব্দ, যা দুই মাস পর অন্য ধরনের নীরবতায় রূপ নিয়েছে, তাতে সে অভ্যস্ত হয়ে যায়। শুধু যে ব্যাপারটি তার নিঃসঙ্গতায় বাগড়া দেয় তা হলো, সান্তা সোফিয়া দে লা পিয়েদাদের আসা-যাওয়া। কাজেই সে তাকে বলে, সে যেন তার খাবার জানালার গোবরাটের ওপর রেখে যায় আর দরজাটায় তালা মেরে দেয়। পরিবারের বাকি সবাই ভুলে যায় তার কথা, এমনকি ফারনান্দাও; সৈন্যরা তাকে দেখেও চিনতে পারেনি দেখে তার ওখানে থাকা নিয়ে সে আর কোনো আপত্তি তোলেনি। ছয় মাস অবরুদ্ধ থাকার পর সৈন্যরা মাকোন্দো ছেড়ে চলে যাওয়ায় অরেলিয়ানো সেগান্দো তালা খুলে দেয়। কারণ বৃষ্টি যতক্ষণ না থামছে ততদিন কথা বলার জন্য একজন মানুষ খুঁজছিল সে। দরজাটা খুলতেই চেম্বারপটগুলোর জঘন্য আক্রমণের শিকার হয় সে, সেগুলো সব মেঝেতে রাখা, আর সবগুলোই বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে। হোসে আর্কাদিও সেগান্দো পড়েই চলেছে সেই অবোধ্য পার্চমেন্টগুলো, এদিকে টাক তার মাথা গ্রাস করে নিয়েছে। তাছাড়া বাতাসটা যে বমি উদ্রেককারী বাষ্পে কটু হয়ে উঠেছে, সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই তার। দেবদূতদের মতো একটা দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে আছে সে। দরজা খোলার শব্দে স্রেফ এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে তাকায় সে। আর ওইটুকু সময়ের মধ্যেই তার ভাই সেই দৃষ্টির ভেতর দেখে নেয় তাদের দাদার বাবার অমোচনীয় নিয়তির পুনরাবৃত্তি।

হোসে আর্কাদিও সেগান্দো শুধু বলে, ‘ওখানে তিন হাজারেরও বেশি লোক ছিল। আমি এখন নিশ্চিত, স্টেশনের সবাই ছিল ওখানে।’