৪০ বছর বয়সী একজন আমেরিকান গড়ে ১০ হাজার কলা খান! বাংলাদেশের একজন মানুষের ক্ষেত্রে কলা ভক্ষণের নিশ্চিত হিসাবটা আমাদের জানা নেই। তবে কলা আমরা কমবেশি সবাই খাই। শিশুরা সাধারণত প্রথম ফল হিসেবে কলা খেয়ে থাকে আবার শেষ বয়সে দাঁত পড়ে গেলে কলাই হয় একমাত্র ভরসা! কলা তো কলাই— হলুদ রঙ, প্রায় একই আকার ও বীজহীন।

আমরা যতই কলাগাছ! কলাগাছ! বলে ডাকি না কেন, কলা কিন্তু গাছ বা বৃক্ষ নয়, বরং দুনিয়ার সবচেয়ে বড় তৃণজাতীয় উদ্ভিদ।

দুনিয়ায় অন্তত এক হাজার প্রকারের কলা আছে। যদিও মানুষ খায় মাত্র কয়েক জাতের। এশিয়া থেকে যাত্রা করে আফ্রিকা হয়ে কলা কীভাবে দুনিয়ার মানুষের খাদ্যতালিকায় স্থায়ী আসন করে নিল, সে ইতিহাসটা আমাদের জানা আর অজানার মধ্যে একটা জট পাকিয়ে আছে।

কলার প্রজাতির বিবর্তন ঘটেছে কয়েক হাজার বছর ধরে। অল্প কিছু জংলি প্রজাতি থেকে আজকের খামারে উৎপাদিত কলার প্রজাতির যাত্রাটা অনেকটা সময় ধরে হয়েছে। খামারের কলা সাধারণত মানুষের সাহায্য ব্যতীত বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। মানুষ তার কৃষিকাজের ইতিহাসে প্রথম যেসব চাষাবাদ করেছে, তার মধ্যে কলা অন্যতম। প্রথম কলা চাষ হয়েছিল সাত হাজার বছর আগে। তারপর থেকে কলা দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল। আরো নির্দিষ্ট করে বললে মানুষ তার কৃষি খাতে পুরো দুনিয়ায় যা উৎপাদন করে, তাতে কলার স্থান চতুর্থ। গম, চাল ও ভুট্টার পরই উৎপাদনের পরিমাণের দিক থেকে কলার স্থান।

কলার প্রথম চাষাবাদ কোথায় হয়েছিল, সেটা নিশ্চিত নয়। কারণ ফল উৎপাদন দুনিয়ার কোনো একটি বিশেষ জায়গাতেই শুরু হয়েছিল তা নয়। একটা মত অনুসারে কলার প্রথম চাষ হয়েছিল এখনকার মালয়েশিয়ায়। ধারণা করা হয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকাতে কলা বন্য অবস্থায় জন্মাত। এখানে একটি মজার ব্যাপার লক্ষ করা যায়। শুরুর দিকের সেই বন্য কলার মধ্যে বীজ থাকত কিন্তু আজকের দিনে আমরা যেসব কলা খাই, তার প্রায় সবই বীজহীন। মিউটেশন বা বাতাসের মাধ্যমে বীজের আন্তঃপ্রজননে বীজহীন কলার আবির্ভাব ঘটে।

সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে পাপুয়া নিউগিনির কাক সোয়াম্পে আজ থেকে ৬ হাজার ৯০০ বা ৬ হাজার ৪০০ বছর আগে কলা চাষের প্রমাণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কলা প্রথমবারের মতো বন্য অবস্থা থেকে চাষের ক্ষেতে উপস্থিত হয়। এটাই কলা চাষের আদিতম নমুনা।

কলা চাষের প্রথম লিখিত বিবরণী পাওয়া যায় ভারতের ক্ষেত্রে। সেটা ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আজকের দিনে যেভাবে কলার চাষ হয়, সময়ও ভারতে এভাবেই কলার চাষ হতো। সে সময় ভারতের কলা ছিল বীজহীন। তাই মানুষ ইচ্ছামতো সেগুলো চাষ করত। মানুষ বড় গাছ থেকে কলার সাকার সংগ্রহ করে সেগুলো রোপণ করত। কলা সে যুগে মানুষকে নিশ্চিত ও সহজে বহনযোগ্য খাবারের নিশ্চয়তা দিত। কৌতূহলের বিষয় হলো, কীভাবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের জঙ্গল থেকে কলা ভারতে হাজির হয়েছিল। হিন্দু শাস্ত্রেও কলার নানা ধরনের উল্লেখ পাওয়া যায়। উদ্ভবস্থল থেকে কলার ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাসটি এখনো আমাদের অজানা। এ নিয়ে জিন গবেষকরা কাজ করছেন। আশা করা যায়, একদিন এ ইতিহাস উন্মোচন হবে।

৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারত থেকে ফেরার সময় আলেকজান্ডার সঙ্গে করে কলা নিয়ে এসেছিলেন। এভাবেই কলা পশ্চিম গোলার্ধে হাজির হয়েছিল। রোমান লেখক, প্রকৃতিবিদ প্লিনি দি এল্ডার ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে দুনিয়ায় প্রথম প্রাকৃতিক ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তার গ্রন্থে কলার উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি লেখেন, সম্ভবত আলেকজান্ডারের অভিযানের মাধ্যমেই কলা বা মুসা (কলার শ্রেণিবিন্যাসের গণনাম) তাদের দেশে পৌঁছে। তবে আরো অনেক বিবরণীতে কেউ কেউ পশ্চিমে কলার আগমনস্থল হিসেবে সিরিয়া, মিসর ও চীনের নাম উল্লেখ করেছেন।

৬৫০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সেনাদল ও বণিকরা কলা আফ্রিকায় নিয়ে যায়। এর নাম দেয়া হয় ‘বানান’। আঙুলের আরবি শব্দের অনুকরণে বানান নামটি চালু হয়েছিল। আফ্রিকার মহাদেশের পূর্ব প্রান্ত থেকে ধীরে ধীরে কলা পশ্চিম প্রান্তে গায়ানায় পৌঁছে। ভিক্টোরিয়া লেকসংলগ্ন এলাকায় কলা হয়ে ওঠে প্রধান খাদ্য। বর্তমানে এ অঞ্চলের মানুষের গ্রহণ করা ক্যালরির ৭০ শতাংশ আসে কলা থেকে।

১৪০২ সালে পর্তুগিজ সেনারা গায়ানা থেকে কলা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে আসে। বর্তমানে এ স্প্যানিশ দ্বীপপুঞ্জ দুনিয়ার অন্যতম কলা রফতানিকারক। ইউরোপে কলার চাহিদার একটি বড় অংশ মেটে এখানকার কলা থেকে। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশ মিশনারি ফাদার টমান ডি বারলাঙ্গা কলা ক্যারিবীয় দ্বীপে নিয়ে যান। সেখানে প্রথম কলা চাষাবাদ শুরু হয় সান্তো ডোমিঙ্গোয়, যা বর্তমান ডমিনিকান রিপাবলিক। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ স্প্যানিশ সেটলাররা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় কলা চাষ শুরু করে। তবে কিছু কারণে সেখানে কলা চাষ খুব একটা সফল হয়নি। ১৭৫০ সালে শ্রেণিবিন্যাসবিদ্যার জনক ক্যারোলাস লিনিয়াস কলাকে মুসা স্যাপেনটিয়াস বা ‘জ্ঞানী ফল’ বলে বৈজ্ঞানিকভাবে নামকরণ করেন। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন জেমস কুক হাওয়াইতে কলার অস্তিত্ব দেখতে পান। ১৮৩৬-এ ডিউক অব ডোভেনশায়ার মরিশাস থেকে কলা এনে চাটসওর্থে তার খামারবাড়িতে চাষ শুরু করেন। এ কলা ব্রিটিশ লিনিয়ান সোসাইটিতে আলোচিত হয়। সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে মিশনারি জন উইলিয়াম কলাকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল— টোঙ্গা, সামোয়া, তাহিতি, হাওয়াই দ্বীপে নিয়ে যান। ১৮৭০ সালে ক্যাপ্টেন লোরেনজো ডো বেকার জ্যামাইকা থেকে কলার চারা সংগ্রহ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। তিনি জার্সি শহরে একটি চারা ২ ডলার দামে বিক্রি করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এটাই কলা বাণিজ্যের প্রথম ঘটনা। বেকারের এ কলা বাণিজ্য বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তখন কলা বেশ দামি এবং বিশেষ সম্মানীয় এক খাদ্যে পরিণত হয়েছিল। সে সময় কলা টুকরো করে কেটে চিনি, মাখন, ওয়াইন বা কমলার জুসের সঙ্গে খাওয়া হতো। তাছাড়া কলার রোস্ট, ফ্রাইও তৈরি হতো। বেকারই যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কলা আমদানি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

কলার ইতিহাসের এহেন বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, কলা দুনিয়ার কিছু অংশের রাজনীতিকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। উনিশ শতকের শেষভাগে কয়েকজন নিষ্ঠুর উদ্যোক্তা যুক্তরাষ্ট্রে কলার বাজার তৈরি করেন। আর সেই কলা উৎপাদনে ব্যবহার করতেন লাতিন আমেরিকার জমি। শিগগিরই কলা বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বিস্ময় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২০ বছরের মধ্যে আপেলকে হটিয়ে কলা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেস্ট সেলার ফলের জায়গা নেয়। উল্লেখ্য, কলা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার ফল ও সহজেই পচনশীল। তাছাড়া কলাকে হাজার মাইল জাহাজে পরিবহন করে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া হতো। অথচ আপেল যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শহর থেকে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে উৎপাদন হতো। সেই প্রথম দিককার ব্যানানা ব্যারনরা জঙ্গল থেকে কলাকে ক্ষেতে ফলানোর ওপায় বের করেছিলেন। তাছাড়া কীভাবে কলাকে পরিবহনের সময়ে পেকে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়েও তাদের ভাবতে হয়েছে। কলা উৎপাদন করতে গিয়ে কোম্পানিগুলো রেইন ফরেস্ট কেটে জমি তৈরি করেছে, রেলপথ বসিয়েছে, একেবারে আস্ত নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করেছে। এসবের বাইরে রেডিও নেটওয়ার্ক ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, অনেক রেডিও নেটওয়ার্ক এখনো বর্তমান। এই রেডিও নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল কলার খামার ও বন্দরে কলা নিয়ে যাত্রা করা যানবাহনের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য। কলা পরিবহনকারী জাহাজগুলোই দুনিয়ার প্রথম জাহাজ, যেগুলোতে বিল্ট-ইন রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা ছিল। ফল (কলা) পাকা বিলম্বিত করতে রাসায়নিক দ্রব্য ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ব্যবহার ব্যানানা ব্যারনরাই প্রথমবারের মতো করেছিলেন। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এখন খুব সাধারণ হলেও সে সময়ের আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। দুনিয়ার শব্দকোষে ‘ফ্রুট ইন্ডাস্ট্রি’ নামেও কোনো শব্দযুগল ছিল না।&dquote;&dquote;

কলা যেখানেই হাজির হয়েছে, সেখানেই মানুষের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনেছে। অনেকে বলেন, বাইবেলে ইভ যে নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন, সেটা আপেল নয়, বরং কলা। আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়াকে ঘিরে যেসব মানুষ বাস করে, তাদের সোয়াহিলি ভাষায় খাবার মানে হচ্ছে কলা। মধ্য আমেরিকায় কলা সরকার উত্থান ও পতনে ভূমিকা রেখেছে। গুয়াতেমালায় কলা উৎপাদন একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১৯৫০-এর দশকে দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করা হয়েছিল এবং এর পরিণতিতে পরবর্তী কয়েক দশকে মায়া গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। কিউবা বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রো কলার খামার জাতীয়করণ করেছিলেন। কলা কোম্পানিগুলো তখন বে অব পিগসের সংকটে সিআইএকে সহায়তা করেছিল ফিদেলকে উত্খাত করতে। কলা বারবার বিজয় আর ধ্বংসের প্রভাবক হয়েছে আমেরিকা মহাদেশে। হন্ডুরাসের কলা খামারের শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থা নিয়ে মহাকাব্যিক উপন্যাস, কবিতা, গান লিখেছেন। চিকিতার চেয়ার্যান এলি ব্ল্যাক তার কোম্পানির রাজনৈতিক গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর ম্যানহাটনের উঁচু দালানের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ব্যানানা রিপাবলিক নামে রাজনৈতিক শব্দকোষে একটি শব্দযুগল আছে। বিশ শতকের রাজনীতিতে কলা ব্যবসায়ীদের আধিপত্যকে প্রকাশ করতেই এ শব্দযুগল তৈরি হয়েছিল।

কলার জন্ম কবে? বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা নেই, তবে ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে একটা তথ্য পাওয়া যায়। বাইবেলে অ্যাডাম আর ইভের গল্প সবারই জানা। ঈশ্বর স্বর্গের সব সুবিধা প্রথম নর-নারীর জন্য উন্মুক্ত রাখলেও তাদের একটি ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। সেই নিষিদ্ধ ফল খেয়ে দুজনকে স্বর্গ ছেড়ে এ দুনিয়ায় নেমে আসতে হয়। প্রচলিত বিবরণীতে এ ফলটি আপেল। পশ্চিমা দুনিয়ায় স্বর্গের ধারণার সঙ্গে আপেল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিন্তু গবেষক ড্যান কোয়েপেল আমাদের জানাচ্ছেন এক কৌতূহলোদ্দীপক গল্প। তিনি কলার ইতিহাস নিয়ে গবেষণার সময় দেখতে পান, হিব্রু ও গ্রিক ভাষায় লেখা বাইবেলসংক্রান্ত প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে ফলটিকে কোথাও আপেল হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়নি। চতুর্থ শতকে সন্ত জেরোম বাইবেল লাতিন ভাষায় অনুবাদ করেন। চৌদ্দ শতকে ছাপাযন্ত্র আবিষ্কারের পর পুরো বাইবেলের বহুসংখ্যক কপি ছাপা শুরু হয়। এ ছাপা বাইবেল গুটেনবার্গ বাইবেল নামে পরিচিত। এতে জেরোসের করা লাতিন অনুবাদকেই অনুসরণ করা হয়েছিল।

ইংরেজির মতো লাতিন ভাষায়ও সমুচ্চারিত কিন্তু ভিন্নার্থক শব্দ আছে। হিব্রু ভাষায় স্বর্গে ‘ভালো ও মন্দ’ সচেতনতার ফল অংশটি লাতিন অনুবাদ করতে গিয়ে জেরোম ফলের জন্য বেছে নেন লাতিন শব্দ ম্যালাম। লাতিন ম্যালামের দুটি অর্থ হয়— একটি হলো ব্যাধি, খারাপ আর অন্যটি হলো ‘আপেল’। ম্যালাম শব্দটি আবার এসেছে ফল বোঝাতে গ্রিক শব্দ মেলন থেকে। রেনেসাঁর শিল্পীরা গুটেনবার্গ বাইবেল অলঙ্করণ করতে গিয়ে ফল হিসেবে আপেলকে আঁকতে শুরু করেন।

রেনেসাঁর ইউরোপের বাইরে পণ্ডিতরা বহু শতক ধরে ফলটিকে কলা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। এ পণ্ডিতদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য নাম হচ্ছে শ্রেণিবিন্যাসকরণ বিদ্যার জনক সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস। আঠারো শতকের শুরুর দিকে নিজের যুগান্তকারী সিসটেমা ন্যাচারে গ্রন্থে লিনিয়াস চার হাজার প্রজাতির বেশি জীব ও সাত হাজার উদ্ভিদকে শ্রেণীকরণ করে তালিকাভুক্ত করেন। লিনিয়াস ছিলেন কঠোরভাবে ধার্মিক মানুষ। লিনিয়াস চেয়েছিলেন ঈশ্বরের সব সৃষ্টির তালিকা তৈরি করতে। তিনি স্বর্গের সেই বাগান ও ফলটি কলা বলে বিশ্বাস করতেন। কলার বৈজ্ঞানিক নামটি লিনিয়াসেরই দেয়া— মুসা স্যাপেনটিয়াম (Musa Sapentium)। সাধারণভাবে যে কলা চাষ করা হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম মুসা প্যারাডিসাইকা (Musa paradisiaca), অর্থাৎ স্বর্গের কলা। কলার শ্রেণিবিন্যাসে লিনিয়াস কলার ফ্যামিলি নাম দিয়েছিলেন মুসা, যা তিনি নিয়েছিলেন ফলের আরবি শব্দ মউজ থেকে।

এবার এক মুহূর্তের জন্য জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান বাইবেলের দিকে তাকানো যাক। পশ্চিমের বর্ণনামতে, নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর নিজেদের নগ্নতা নিয়ে সচেতন হয়ে অ্যাডাম ও ইভ ডুমুর পাতা দিয়ে নিজেদের লজ্জা ঢাকেন। তবে ডুমুর পাতা দিয়ে সেভাবে শরীর ঢাকা সম্ভব নয়, বরং দুনিয়ায় এখনো অনেক স্থানে মানুষ শরীর ঢাকতে কলা পাতা ব্যবহার করে। এছাড়া ছাতা হিসেবে, বিছানা হিসেবে, খাবার প্লেট হিসেবে কলা পাতা ব্যবহূত হয়।

দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বেশি কলা ভালোবাসে কারা? আমেরিকানদের কথা তো শুরুতেই বলা হয়েছে। এরপর আসে ভারতের কথা। অনেকে মনে করেন, ভারতেই সবচেয়ে বেশি কলাপ্রীতি দেখা যায়। বর্তমানে ভারতে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি কলা উৎপাদন হয়, দুনিয়ার মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ। ওজনের হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ টন এবং এ বিপুল পরিমাণ কলা ভারতেই ব্যবহূত হয়। ভারতে ৬৭০ প্রজাতির কলা পাওয়া যায়। কিছু চাষ করা হয় আর কিছু এখনো জঙ্গলে আছে। এসবের মধ্যে বনে থাকা ৩২টি প্রজাতি অতি দুর্লভ, এদের হয়তো একটি বা দুটি গাছ বনে টিকে আছে। ভারতে আবিষ্কৃত হয়নি, এমন কলার জাত থাকাটাও অসম্ভব নয়। তবে চাষের জন্য জনপ্রিয় কয়েকটি জাতের আধিপত্যে ভারতে কলা তার বৈচিত্র্য হারাচ্ছে। তমিলনাড়ুতে কলা থেকে তৈরি নানা ধরনের খাবারের সমাহার দেখা যায়।

আলেকজান্ডার ভারতে কলার দেখা পেয়েছিলেন। প্রচলিত আছে, প্রাচীন ভারতের ঋষিরা তাদের ধ্যানের সময় ছায়ার জন্য কলাগাছের সাহায্য নিতেন। ১৯৯৮ সালে কলা ও খাদ্যনিরাপত্তা-বিষয়ক এক সম্মেলনে ভারতের জাতীয় কলা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক পালানিয়ানদি সুন্দরারাজু বলেছেন, কলা হচ্ছে প্রকৃতির সেরা উপহার।

নোবেলজয়ী কলাম্বিয়ান লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের উপন্যাস নিঃসঙ্গতার ১০০ বছরে কলার খামারে কাজ করা শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ পাওয়া যায়। জাদুবাস্তবতার গল্পে মার্কেস তার শ্রোতাদের সত্য গল্পই শুনিয়েছিল। ১৯২৯ সালে কলাম্বিয়ায় সত্যি সত্যিই একটা ব্যানানা ম্যাসাকার সংঘটিত হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে লাতিন আমেরিকায় কলা চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। শ্রমিকরাও বুঝতে শুরু করেন, কী দারুণ লাভজনক পণ্য তারা মালিকদের জন্য উৎপাদন করে যাচ্ছেন। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লব দুনিয়ার শ্রমিকদের মধ্যে অধিকার ও সংগ্রাম প্রসঙ্গে নতুন এক প্রেরণা জাগিয়ে তোলে।&dquote;&dquote;

একদিকে লাতিন আমেরিকার কলা খামারের শ্রমিকরা কম মজুরি পেতেন, নির্যাতন তো ছিলই, অন্যদিকে তারা দেখছিলেন তাদের দেশের জমি সব কলা কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে। পানামা ব্লাইটের কারণে কিছুদিন পর কলার ক্ষেত পরিত্যক্ত করে নতুন জমিতে চাষাবাদ করা হতো। শ্রমিকদের সচেতনতা আর ক্ষোভ দমন ও জমির সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে পছন্দের সরকারের বিকল্প ছিল না কলা কোম্পানিগুলোর জন্য। কলাম্বিয়ার সেই হত্যাকাণ্ড ঘটনার শুরু হয়েছিল ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে এবং নববর্ষের পর পরই তা পরিণতি পায়। ১৮৯৯ সাল থেকেই ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি কলাম্বিয়ায় ছিল। বিশ শতকে কোম্পানিবান্ধব সরকার ক্ষমতায় বসে। ১৯২০ নাগাদ লিবারেল রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায় কলা খামারের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

১৯২৭ নাগাদ কলাম্বিয়ার রাজনৈতিক বাতাস কলা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বইতে শুরু করে। কোম্পানির ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল সরকার বেশ চাপে পড়ে গিয়েছিল। বিশেষত গ্রামাঞ্চলে লিবারেলরা শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। অধিকারহীন কলা শ্রমিকরা কিছুটা শক্তিশালী বোধ করতে থাকেন। এমন অবস্থায় ১৯২৮ সালে ৩২ হাজার কলা শ্রমিক বিভিন্ন দাবিতে ধর্মঘট ডাকেন। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সরকার সেনা প্রেরণ করে। কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে লিবারেল রাজনৈতিক কর্মীরা যুক্ত হন। ফলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এ সংঘাতের কথা যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হয়। ৫ ডিসেম্বর কলাম্বিয়ায় সামরিক শাসন জারি হয়। ৬ ডিসেম্বর চিনাগা শহরের স্কয়ারে শ্রমিকরা জমায়েত হন। ঠিক মার্কেসের মাকোন্দো গ্রামের মতো। কলাম্বিয়ার সেনাদের কথা, তারা মার্কিন সেনাদের আগমন ঠেকাতে এ বিদ্রোহ দমন করেছিল। স্কয়ারের চারমাথায় চারটি মেশিনগান স্থাপন করা হয়। সেনাদের গুলিতে সেদিন এক হাজারের বেশি শ্রমিক নিহত হন। নিহতের এই সংখ্যাটি খোদ ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির দেয়া। তাই সংখ্যাটা আরো বেশিই হবে হয়তো। ড্যান কোয়েপেল মনে করেন, মার্কেস কলাম্বিয়ার এই ব্যানানা ম্যাসাকারকেই তার উপন্যাসে অমর করে রেখেছেন।

চিলির কবি পাবলো নেরুদার অনেক কবিতাতেও তার মহাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শোষণ-নিপীড়ণের গল্প শোনা যায়। ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি শিরোনামে নেরুদার একটি কবিতাই আছে-

The United Fruit Co.

When the trumpet sounded, it was 
all prepared on the earth, 
the Jehovah parcelled out the earth 
to Coca Cola, Inc., Anaconda, 
Ford Motors, and other entities: 
The Fruit Company, Inc. 
reserved for itself the most succulent, 
the central coast of my own land, 
the delicate waist of America. 
It rechristened its territories 
as the ’Banana Republics’ 
and over the sleeping dead, 
over the restless heroes 
who brought about the greatness, the liberty and the flags...

ব্যানানা ম্যাসাকার কলাম্বিয়ার রাজনীতিকে বদলে দিয়েছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হয়। ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির অবস্থান দুর্বল হয়ে যায়। তারা পানামা ব্লাইটের অজুহাত দেখিয়ে তাদের কলার খামার কোস্টারিকায় স্থানান্তর শুরু করে। কলা চাষাবাদকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা লাতিন আমেরিকায় আগ্রাসন শুরু করেছিল। এই আগ্রাসনে নেতৃত্ব দিয়েছিল ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি। মার্কিন সেনা মোতেয়েন, সামরিক অভ্যুত্থান, গণহত্যা সবই লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ঘটানো হয়েছিল শুধু এই লাভজনক কলার বাণিজ্যকে নিরাপদ রাখতে। ১৯২৮ সালে কলাম্বিয়ার সেই গণহত্যার কয়েক বছর পর হন্ডুরাসের কলা শ্রমিকদের ওপর গুলি চালায় ইউনাইটেড ফ্রুট। ১৯৩০ এর দশকে লাতিন আমেরিকায় ব্যানান রিপাবলিক শব্দ যুগলটি বহুল ব্যবহূত হতে শুরু করে। এসকয়ার ম্যাগাজিনের একটি প্রবন্ধে শব্দ যুগলটি জায়গা করে নেয়। ব্যানানা রিপাবলিকের পাশাপাশি আরেকটি শব্দযুগল লাতিন আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল- এল পালপো। এই স্প্যানিশ শব্দটির অর্থ অক্টোপাস এবং এল পালপো বলতে ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানিকে বোঝানো হতো। ১৯৪৬ সাল নাগাদ ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি কিউবা, জ্যামাইকা, হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়া, কোস্টারিকা পানামা ও কলাম্বিয়ায় প্রায় ১০ লক্ষ একর জমির মালিক হয়ে যায়। তাদের কেন এল পালপো বা অক্টোপাস বলা হতো সেটা বুঝতে তাই বেগ পেতে হয় না।

লাতিন আমেরিকার কলার খামারগুলোতে শ্রমিকদের জীবনের চিত্র তুলে ধরে হন্ডুরাসের লেখক রামোন আমায়া আমাদো ১৯৫৭ সালে প্রকাশ করেন উপন্যাস গ্রীন প্রিজন। তিনি নিজেও তরুণ বয়সে কলার খামারে কাজ করতেন। সে অভিজ্ঞতা তার উপন্যাসকে পরিস্থিতির যথার্থ বিবরণীতে পরিণত করে।

 

ড্যান কোয়েপেল- এর ব্যানানা : দ্য ফেট অব দ্য ফ্রুট দ্যাট চেঞ্জড দি ওয়ার্ল্ড গ্রন্থ অবলম্বনে