ঠিক আগুনে নয়, আগুন থেকে উদ্ভূত ধোঁয়ায়।

অ্যানি নিজেই তার প্রিয় বইগুলোতে আগুন লাগিয়েছেন।

স্পষ্টত এটি আত্মহত্যা। ভার্জিনিয়া উল্ফ, অ্যানি সেক্সটন, সিলভিয়া প্লাথ নিজ নিজ উদ্ভাবিত পথে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন।

অ্যানিও তা-ই করলেন। ২০ জুলাই করাচির রাষ্ট্রীয় প্রহরাধীন এলাকা করাচি তার জিমখানা ও স্টেট গেস্ট হাউজের কাছাকাছি ‘কসর-ই-জয়নব’ ভবনে তার চারতলার অ্যাপার্টমেন্টে তিনি কাজটি করেন। পুলিশ যখন তার মরদেহ বের করে নিয়ে আসে, শরীরে কোনো আঘাত বা পোড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণ ধোঁয়া ও গ্যাস।

অ্যানি এ অ্যাপার্টমেন্টে একাই থাকতেন। তার স্বামী অনেক দিন ধরে বিদেশে। তার ঘর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে এক প্রতিবেশী পুলিশকে ফোন করেন।

অ্যানি আলির মধ্যে বিচিত্র মেধার সমন্বয় ঘটেছে। তিনি ছিলেন বেশ পরিচিত একজন পাকিস্তানি এবং একই রকম পরিচিত একজন লেখক ও সাংবাদিক। তিনি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করেছেন।

পাকিস্তানে সেরা সংবাদপত্র ও জার্নাল ডন, হেরাল্ড, স্টেট, দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, দি এশিয়া সোসাইটি ও দ্য ক্যারাভানে তিনি লিখতেন।

সৌন্দর্য ও মেধার এক দুর্লভ সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে।

অ্যানির পুরো নাম কুররাতুল আইন আলি খান। জন্ম লাহোরে ১৯৮৪ সালে। মডেল থেকে সরে এসে ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতা পেশায় এলেন তিনি। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়া কীভাবে এড়ানো যায়, সে সম্পর্কেও লিখলেন।

কিন্তু নিজেকেই যদি নিজের হত্যাকারী হতে হয়, তাহলে তা এড়াবেন কেমন করে?

আর্নেস্ট হেমিংওয়েও পারেননি।

অ্যানি আলি খানের রচনা থেকে:

রিকশা ডায়েরি

আমার সহকর্মী এক তরুণ নারী সাংবাদিক কাজ সেরে মধ্যরাত পেরিয়ে ১টায় যখন বাড়ি ফিরছিলেন, রিকশাওয়ালা হঠাৎ বড় রাস্তা থেকে দিক পরিবর্তন করলে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন।

রিকশাওয়ালা বলল, ‘যদি সেক্স-কাস্টমারের জন্য না হয়, তাহলে তুমি এত রাতে বেরোলে কেন?’

শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়িতে নামিয়ে দিলেও রিকশাওয়ালা ক্ষুব্ধই রয়ে গেল।

একবার আমি মধ্যরাতের পর রিকশায় বাড়ি ফিরতে চাইছিলাম। নৌবাহিনীর জাদুঘর পেরিয়ে শাহারি-ই-ফয়সলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আধঘণ্টা ধরে আমি দেখলাম পুরুষ মানুষভর্তি উদ্ভট সব গাড়ি আমার কাছাকাছি এসে গতি কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকক্ষণ আগে পুলের দোকান বন্ধ করে যে যুবকটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার বন্ধুর সাথে গল্প করছিল, আমার অবস্থা বুঝতে পেরে গন্তব্য কোথায় জানতে চাইল, তারপর তার এক বন্ধু রিকশাওয়ালাকে ডেকে এনে আমার বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করল। সে আমাকে ঠিকভাবেই নামিয়ে দিল।

করাচি সফরে আসা আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘রাত বেশি হলে সবচেয়ে নিরাপদ যানবাহন কোনটি? আমি বললাম, রিকশায় আমি যাই। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ। আমি যেকোনো সময় লাফিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়তে পারব। রিকশাকে অনেক সময় রাক-শা উচ্চারণ করা হয়। হিন্দি এ শব্দের মানে রক্ষা। আমি কথাটা নিজেকে বারবার শোনাই।

একদা শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় শপিং সেন্টারটি ছিল তারিক রোডে। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য হাঁক দিলাম। সরু গোঁফের এক তরুণ রিকশাওয়ালা এগিয়ে এল। তার বাম দিকের ওপরের মিররে চোখ ফেলে যুবক আমাকে দেখছিল। আমি পেছনে তাকাই। আপনি যখন রিকশায়, দেখবেন রিকশাওয়ালা কোনো না কোনো সময় তার মিরর ঘুরিয়ে ওঠানামা করিয়ে আপনার চোখাচোখি হবেই।

(করাচির রিকশাও তিন চাকার, কিন্তু রিকশাওয়ালা সামনে ছয়টি মিরর জুড়ে রাখে।)

আমি সবসময় ভাবি, আয়নায় এই দেখাদেখির সময় যদি আমি হাসি কিংবা ভেংচি কাটি, তার পরিণতি কী কী হতে পারে। একই অনুসন্ধিৎসা নিয়ে আমি আয়নায় তার দিকে তাকাই। দেখে মনে হয়, লোকটি বাঙালি হতে পারে।

আমি জানতে চাই, পাশের বাঙালি কলোনি থেকে সে এসেছে কিনা? রিকশাওয়ালা জানায়, সে পাঞ্জাবি, তার চোখ লাল হয়ে ওঠে। আমি বুঝতে পারি, আমার কথায় সে অপমানিত বোধ করেছে।

রিকশা তার নিজস্ব সড়ক আইন মেনে চলে। ড্রাইভাররা একজন অন্যজনকে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানায়। ট্রাফিক লাইট জ্বললে যেসব ট্রাক ড্রাইভার তাদের গাড়ি ডিঙিয়ে রিকশাকে এগিয়ে যেতে দেয়, রিকশাওয়ালা বড় গাড়ির সে ড্রাইভারকেও মাথা নেড়ে সালাম জানায়। চালকদের মধ্যে চমত্কার সৌভ্রাতৃত্ব। রং সাইড দিয়ে যাবে কি যাবে না— এ নিয়ে রিকশাওয়ালা দ্বিতীয়বার ভাবতে যায় না— চলে যায় কিংবা ভরা ট্রাফিকে মাঝপথে অকস্মাৎ রিকশার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অসম্ভব রকম সরু রাস্তা দিয়ে রিকশা টেনে নিয়ে যেতে পারে। একবার আমি পাকিস্তানের ভারত সীমান্তবর্তী শহরে একটি রিকশা নিলাম। লম্বা পথ, কেন যে রিকশা নিতে গেলাম, নিজেকে গাল দিচ্ছিলাম।

কিন্তু সেই শহরে পৌঁছতে অবিশ্বাস্য রকম অপ্রশস্ত গলি, পানি জমে থাকা গলি, গরু ও শিশুদের দাপাদাপি করা গলি সব পেরিয়ে যখন সেই ছোট্ট শহরে পৌঁছলাম, আমি বুঝতে পারলাম, রিকশা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনে এ পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব ছিল না।

অন্য এক রিকশাওয়ালা আমাকে করাচি থেকে বেশ দূরে একটি ঝামেলাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে এলে। সেখানে দেয়ালে দেয়ালে জাতীয়তাবাদী স্লোগান। আমি সাক্ষাত্কারের কাজ সেরে যখন বেরিয়ে আসি, দেখি দরজার সামনে সেই রিকশাওয়ালা দাঁড়িয়ে। বলল, ‘আমি এতক্ষণ ধরে আপনার বেরিয়ে আসার অপেক্ষাই করছিলাম। আমি ভাবলাম আমার থাকা উচিত। জায়গাটা তো দুই নম্বরি।

আমি রিকশাওয়ালাদের দেখেছি, রাস্তার খানাখন্দে জমে থাকা পানিতে সস্নেহে তাদের রিকশাকে গোসল করাচ্ছে।

যখন ট্রাফিক বাতি সব থামিয়ে দেয়, দেখি গাড়ির জানালা দিয়ে পুরুষ মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মোটরসাইকেলের আরোহী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছে বাতাসে ছুড়ে দিচ্ছে দেঁতো হাসি। বাহাদুরাবাদ পৌঁছার পর এক হিজড়া ঝুঁকে পড়ে টাকা চাইছে। বড় গলার জামা পরা একজন আমার কানের রিংয়ের প্রশংসা করে তা-ই চেয়ে বসে। আমি তাকে এক প্যাকেট বিস্কুট দিই। আমি ভেবেছিলাম গাল দেবে, কিন্তু সে হাসি উপহার দিল। গাড়িতে কখনো এমন ভালোবাসার ভ্রমণ হয় না। এক সকালে সাবর চাচার রিকশায় লায়ারিতে আসছি। যখন গোলচক্কর পার হচ্ছি। দেখি চক্করের চারপাশে কালো, লাল ও সবুজ পতাকা। পাশেই পার্টি হাউজ, সেখানে ভুট্টো পরিবারের বড় ছবি টাঙানো। মেয়ে তার বাবার হাত ধরে আছে (বেনজির ও ভুট্টো)। চাচা বললেন, শহর খালি হয়ে গেছে। কারণ আজ একজনকে ফাঁসি দেয়া হবে। নবীজিকে অপমান করার কারণে সে একজনকে খুন করেছিল। এখন জজ তাকে ঝুলিয়ে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।

চাচা বললেন, ‘রাস্তা দেখেই আমি শহরের অবস্থা বলে দিতে পারি।’

আটাওয়ালার গল্প

পেশোয়ারে আর্মি পাবলিক স্কুলে তেহরিক-ই-তালেবানের আক্রমণের খবর শুনে অ্যানি আলি খান নিউইয়র্ক থেকে পেশোয়ারের আটাওয়ালায় আলতাফ হোসেনকে ফোন করলেন।

‘আমি কেবল আমার বোন-পোকে কবর দিয়ে এসেছি। গতকাল যে আক্রমণ হয়েছিল, তাতে তার মৃত্যু ঘটেছে।

ফোনের লাইন খারাপ, আমাকে অনেকটা ঝুলে থাকতে হয়, আবার হোসেনকে ফোন করতে করতে যা শুনেছি, আমার স্বামীকে জানাই। সে বলল, ‘হয়েছেটা কী? তুমি যাকে ফোন করেছ, তারই কেউ না কেউ নিহত হয়েছে।’

আমার কোনো জবাব নেই।

হোসেনকে যখন আবার লাইনে পেলাম, বললেন, ‘গোটা পেশোয়ার নিঃশব্দ ও জনশূন্য হয়ে পড়েছে।’

তার নিজের ছয়টা সন্তান। গত বছর বউটা মারা গেছে। নিত্যদিন সকালের মতো ছেলেমেয়েরা স্কুলে গেছে। বড় তিনজন স্কুলে, ছোট তিনজন দাদির কাছে।

হোসেন যখন দোকান খুলতে যাচ্ছে, তার বোনের অবিরাম ফোন। বোনের ছেলে ওয়াসিম আর্মি পাবিলক স্কুলে পড়ে। কোনো খবরে তালেবান আক্রমণের কথা শুনেছে। কী ঘটেছে, হোসেনের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। সদর বাজারে সেদিন বিদ্যুৎ নেই, আশপাশেও বিদ্যুৎ না থাকায় কেউই টিভি খুলে সংবাদ জানতে পারেনি। হোসেন তার ছোট বাচ্চা আর মাকে বোনের কাছে রেখে বোন-পোর খোঁজে বের হয়। খবর বলছে, সরকারের প্যারামিলিটারি ফোর্স ফ্রন্টিয়ার কনস্টেবুলারির সবুজ ইউনিফর্ম পরে তেহরিক-ই-তালেবান সদস্যরা দেয়াল বেয়ে স্কুলের আঙিনায় ঢোকে। ‘যখন তাদের গুলি ফুরিয়ে যায়, তারা বাচ্চাদের জবাই করতে শুরু করে। প্রিন্সিপালকে স্কুলের সামনে পুড়িয়ে মেরেছে। অধিকাংশ বাচ্চাকে লেডি রেডিং হাসপাতালে নেয়া হয়।

হোসেন আহতদের মধ্যে ওয়াসিমকে খুঁজে পায়নি। হাসপাতালের কর্মচারীরা তাকে হলরুম দেখিয়ে দেয়। সেখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা আরো অনেক শিশু রয়েছে।

‘আমি হলে এসে ওয়াসিমকে খুঁজতে থাকি। সবাই তো সাদা কাপড়ে ঢাকা, আমি একের পর এক মুখের কাপড় সরাতে থাকি। দেখি এটাই আমার বোন-পো কিনা? আমি প্রতিটি বাচ্চার মুখ দেখি, কী সুন্দর একেকজন, ফুলের মতো বিছিয়ে পড়ে আছে।’

হোসেনের বোনের ছেলে সেখানেও নেই। তারপর তিনি যান কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে। সেখানেও তাকে প্রতিটি মৃত শিশুকে দেখতে হয়েছে। বহু শিশু প্রাণহীন পড়ে আছে। সেখানে আমি ওয়াসিমকে পেয়ে যাই।

গতকাল থেকে মনে হচ্ছে, প্রত্যেক বাড়িতেই যেন কাফন-দাফন হচ্ছে।

চারদিকে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা। সর্বত্রই অশ্রু ঝরছে।

ওয়াসিম সেদিন স্কুলে যেতে চায়নি, কিন্তু তার মা তাকে জোর করে পাঠিয়েছেন। বলেছেন, স্কুল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তোমাকে অবশ্যই যেতে হবে।

(সংক্ষেপিত)