প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে পশ্চিম ইউরোপীয়রা সাঁতারের বিষয়টি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিল পানির ভয়াবহতা থেকে কীভাবে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। ইউরোপীয়দের পুনরায় সাঁতার শেখা আলোকবর্তিতার মতো তাদের কাছে উদ্দীপনার জোয়ার বয়ে এনেছিল।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ সাঁতারে অভ্যস্ত ছিল। যদিও বিষয়টি নিয়ে পেলান্ত্রপোলজি ও এলেন মর্গানের (১৯২০-২০১৩) অনুসারীদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে। যারা ৭ থেকে ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন বছর আগেকার মনুষ্য বিবর্তনের তথ্য আবিষ্কারে সফল হয়েছেন। তার পরও আমাদের পূর্বপুরুষরা যে সাঁতার জানত, সে বিষয়ে তেমন যথার্থ প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিক যুগে প্রাচ্যের ভূমধ্যসাগরের পৌরাণিক কাহিনীগুলোয় সাঁতারবিষয়ক অনেক ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়।
মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপীয়রা পানির যথাযথ ব্যবহারে দক্ষ ছিল না। এমনকি তারা সাঁতারও ভুলে গিয়েছিল। তারা কেবল সাঁতার ভোলেনি, সাঁতারের ইচ্ছাও লোপ পেয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে। মনুষ্যজাতির একটি দক্ষতা দিন দিন লোপ পাওয়ার বিষয়টি সত্যি খুব দুঃখজনক! বিভিন্ন শারীরিক কসরত যেমন— দৌড়ানো, লাফ দেয়া, গাছে চড়া এ অভ্যাসগুলো কখনো পরিত্যাগ করা উচিত নয়। ঠিক তেমনি প্রয়োজনীয় ও উপকারী অভ্যাসগুলোও বাদ দেয়া সমীচীন নয়। কে চায় তীব্র গরমে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শের আরামদায়ক অনুভূতি থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে!
সাঁতারের প্রত্যাবর্তন শুরু হয়েছিল প্রাচীনকাল থেকেই। পঞ্চম শতাব্দীর রোমান লেখক ভিজেতিয়াসের লেখা থেকে ধারণা পাওয়া যায়, প্রজাতন্ত্রের যোদ্ধাদের পরিশ্রমের অন্যতম একটি বিষয় ছিল রিভার টিবারে স্নান করা। দিনব্যাপী প্রশিক্ষকরা সেখানে সাঁতার শেখাতেন। রোমানদের বাথটাবগুলো ছিল প্রশস্ত ও অগভীর। তারা শরীর ভিজিয়ে সেখানে বসে থাকার জন্য সেগুলো ব্যবহার করত। সাঁতার কাটার জন্য নয়। ফলে ধারণা করা হয়, পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই সাঁতার কাটা ভুলে গিয়েছিল। যদিও কেউ কেউ ধারণা করে থাকে, শহুরে শৌচাগার কাঠামো এবং এর উপযোগ দ্বীপাঞ্চলে বসবাসরত মানুষদের মধ্যেই প্রথম গড়ে উঠেছে। জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩৩ বছর আগে রোমে ১৭০টি শৌচাগার ছিল। চতুর্থ শতাব্দীর দিকে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৬।
সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষি ব্যবস্থাপনা উত্কর্ষ লাভের ফলে জলজ সম্পদের ব্যবহার দিন দিন হ্রাস পেতে থাকে। খুব কমসংখ্যক মানুষ সাঁতারের তালিম নিত। পঞ্চম শতাব্দীর দিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছেন জার্মানির যেসব যোদ্ধা সাঁতারু, তাদের কারণে পরে ইউরোপীয়দের মধ্যে দ্রুত সাঁতার শেখা প্রসার হতে থাকে।
হানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের দ্য লিটল মারমেইড (১৮৩৭) প্রকাশের পর মৎসকন্যার ধারণাটি সবার কাছে বেশ পরিচিত হয়। মৎসকন্যা হলো সংবেদনশীল কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত একটি চরিত্র, যার আংশিক ছিল মানুষ আর আংশিক প্রাণীর আদলে গঠিত। এন্ডারসেন তার লেখায় মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন, যা মৃন্ময়দের নৈতিক দিক দিয়ে অদ্ভুত প্রাণী হিসেবে চিত্রিত করে। যারা মাঝে মাঝে বিবাহিত পুরুষের প্রেমে পড়ে, নিজেদের মানুষের প্রজাতি বলে মনে করে। কখনো কখনো নাবিকদের প্রলোভন দেখিয়ে বিপদগ্রস্ত করে তোলে। মধ্যযুগে মত্স্যকন্যা ও জলের সঙ্গে একটি অস্পষ্ট সম্পর্ক ছিল বলে সে সময়ে অনেকেই মনে করত। বিশেষত নাবিক ও উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের কাছে মত্স্যকন্যা একটি প্রতীক, যার কাছ থেকে তারা সমুদ্রের রসদ আহরণ করত এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভালো-মন্দ নানা উপসর্গের নিয়ন্ত্রক মনে করত।
ফরাসি ইতিহাসবিদ জুলেস মিসলেট মধ্যযুগকে ‘স্নান ছাড়া এক হাজার বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বক্তব্যটি পুনর্বিন্যাস করে ‘সাঁতার ছাড়া ১৫০০ বছর’ বলা যায়। পশ্চিম ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে স্নান ও সাঁতারের সংস্কৃতির অনুপস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য অগ্রগতি থেকে তাদের ছিটকে ফেলেছিল। সপ্তদশ শতকে উন্নত দেশগুলোয় স্নানের অনুপস্থিতি ও অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এমনকি সানকিংস প্রাসাদেও ছিল না শৌচাগার ও প্রতিকর্মের যথাযথ ব্যবস্থা।
তবে পশ্চিম ইউরোপীয় অভিজাত সদস্যরা সে সময় দ্বীপ ভ্রমণে গেলে নিয়মিত জলের ভাপ নিতেন আর রোগমুক্তির জন্য জলের সংস্পর্শে যেতেন। চিকিৎসার প্রয়োজনেও স্নানের কিছুটা ব্যবহার গড়ে উঠেছিল। তবে এর প্রয়োগ ছিল খুব সীমিত। প্রাচীনকালে স্নানের বিষয়টি যে প্রচলিত ছিল, সে ব্যাপারে ইতিবাচক অনেক তথ্য পাওয়া যায়। যেমন— বাথ শহর থেকে মূল রোমান যুগের সময় সপ্তদশ শতকের স্নানবিষয়ক অনেক অবকাঠামো পুনরুদ্ধার হয়েছিল।
পশ্চিম ইউরোপের সাঁতারে ফিরে আসার ফলে ১৬তম শতাব্দীতে একটি উদ্দীপনাপূর্ণ সময়ের আবির্ভাব ঘটে। যদিও ইংল্যান্ডের পানিতে ডুবে মৃতের সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই, তবে তার সংখ্যা উনিশ শতকের শেষের দিকে বৃহত্তর যুক্তরাজ্যের মৃতের সংখার তুলনায় অনেক বেশি ছিল বলে ধারণা করা হয়। যখন বছরে প্রায় ২ হাজার ২৬৪ থেকে ৩ হাজার ৬৫৯ জন পানিতে ডুবে মারা যেত। তখন অনেকেই মত দিয়েছিল, ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে একমাত্র সমাধান সাঁতার শেখা। কিন্তু ১৫৩০-এর দশকে জার্মান স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সিদ্ধান্ত নেয়, এ থেকে উত্তরণের প্রতিকার হলো সাঁতার নিষিদ্ধ করা, যা ডানুবেতে অবস্থিত ইংগোলেস্টড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে পরিগণিত করা হয়। সাঁতারের ওপর ঠিক একই রকম শাস্তি ১৫৭১ সালে ক্যামব্রিজে আরোপ করা হয়। এ আইন লঙ্ঘনের কারণে প্রকাশ্যে দুজনকে বেত্রাঘাত করে শাস্তি দেয়া হয়।
এ প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও রাজকীয় উপদেষ্টা টমাস ইলিয়ট (১৪৯০-১৫৪৬), সেন্ট পল রিচার্ডের প্রধান শিক্ষকসহ আরো অনেকে সাঁতারকে একটি দরকারি অনুশীলন ও জীবনরক্ষাকারী উপায় হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এ বিষয়ে সবাইকে যিনি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তিনি হলেন সেন্ট জনস কলেজের ফেলো এভারার্ড ডিগবি (১৫৫০-১৬০৫)। যিনি ১৫৮৭ সালে দে আর্টে নাটানদি বা দি আর্ট অব সুইমিং পুস্তিকা প্রকাশ করেন। এ কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আধুনিক অনেক কসরতের মতো সাঁতারেরও অনেক কূটকৌশল রয়েছে। দে আর্টে অনুসারে সাঁতার দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম অনুচ্ছেদে সাঁতারবিষয়ক বিভিন্ন সংজ্ঞা ও বর্ণনা রয়েছে, ডিগবি যেগুলোকে শরীর সুস্থ রাখতে, দীর্ঘায়ু লাভকরণে ও পানি থেকে জীবনরক্ষার উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ডিগবি জুলিয়াস সিজারের উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, কীভাবে তিনি সাঁতার কেটে ওত পেতে থাকা ফিরোসে মিসরীয়দের কাছ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন, যা অনেক বীরত্বপূর্ণ সাঁতারুদের কৃতিত্বকেও হার মানিয়েছিল।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পানিতে নিরাপদ সাঁতার, ঘুরে বেড়ানো, ভেসে থাকা, পানিতে ডুব দেয়া, ডুবে সাঁতার কাটা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ ছিল। এসব লেখায় সাঁতার বিষয়ে তার যে উৎসাহ ও আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছিল, তাতে তার কিছু বন্ধু সাঁতারে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ডিগবি সামরিক বাহিনী ও মেডিকেলের বইয়ে সাঁতার বিষয়ে বিভিন্ন লেখা পড়েছিলেন। সেখানে বিস্তারিত কোনো নির্দেশনা ছিল না, যাতে সাধারণ যে কেউ এ বিষয়ে স্বতন্ত্রভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাঁতার শিখতে পারে। সে হিসেবে ইংরেজিতে অনূদিত দে আর্টে ছিল সাঁতারের পরিপূর্ণ নির্দেশনাসংবলিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বই।
ইংল্যান্ডে আপামর মানুষের কাছে সাঁতারের বিপ্লবটি ঘটে ১৬৬৭ সালে। যখন উত্তর ইয়র্কশায়ারের উপকূল শহরে ড. রবার্ট উইটি উল্লেখ করেন, সমুদ্রজলে স্নান রোগ নিরাময়ের অনন্যসহায়ক একটি ব্যাপার। জন লোকে (১৬৩২-১৭০২) ও জিন জ্যাকোস রুশোর (১৭১২-১৭৭৮) মতো খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে মনোযোগী হন এবং কীভাবে শিক্ষার অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে শারীরিক অনুশীলন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপায় হিসেবে সাঁতারকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করেন।
স্বল্পসময়ের মধ্যে ইংরেজি স্কুল পাবলিক হারো ও ইটন তাদের ছাত্রদের পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে সাঁতার শেখায় উৎসাহিত করতে শুরু করে। ১৭২৭ সালের দিকে ছাত্ররা যাতে স্নান করতে পারে, তার জন্য স্কুলের বিভিন্ন স্থানে স্নানাগার নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। তবু সব ছাত্র সাঁতার শিখতে সক্ষম হয়নি। অনেক ছাত্র পানিতে ডুবে মারা গেলে ১৮৩৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ১৭৮০ ও ১৭৯০-এর দশকে হারো স্কুলের প্রাকৃতিক পুকুরে ‘ডাক প্যাডেল’ পদ্ধতিতে ছাত্রদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে। ১৮১০ কিংবা ১৮১১ সালে আরো বৃহৎ পুকুরে ডাক প্যাডেলের মাধ্যমে সাঁতার চালু করা হয়, যা বিশ্বের কোনো স্কুলে সাঁতার শেখানোর জন্য নেয়া প্রথম পদক্ষেপ।
১৭৯৩ সালে জার্মানির ইয়োহান গাটস মুথস (১৭৫৯-১৮৩৯) ‘জিমন্যাস্টিক ফুয়ের মুন জুগেন্ড’ নামের একটি বই লেখেন। ১৮০০ সালে বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। যেখানে স্নান ও সাঁতারবিষয়ক একটি অধ্যায়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৯৮ সালে এ বইটিকে অনুসরণ করে ক্লেইন্স লেরবুচ লেখেন স্মল স্টাডি বুক অব দি আর্ট অব সুইমিং ফর সেলফ স্টাডি। তার মতে, শীতল স্নান শারীরিক অবস্থা ঠিক রাখার জন্য বেশ দরকারি একটি কাজ। বিশেষ করে পাবলিক স্কুলের জন্য স্নানাগার অপরিহার্য একটি উপাঙ্গ। তিনি স্নান ও সাঁতারের উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। ডিগবির মতো তিনিও বহমান নদীতে সাঁতারের পক্ষে সমর্থন জানান।
আমেরিকার খ্যাতমানা রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ ও সাঁতারু বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনের আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, শৈশবেই তিনি সাঁতার শিখেছিলেন। পরবর্তীতে ডিগবির দে আর্টে নাটানদি পড়ে তিনি সাঁতারের আরো কৌশল সম্পর্কে অবগত ও পারদর্শী হন। ১৭২৪ সালে ১৮ বছর বয়সে ফ্রাংকলিন টাইপসেটার হিসেবে কাজ করার জন্য লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি সফলভাবে তার দুই বন্ধুকে সাঁতার শেখান। ফ্রাংকলিন লন্ডনে সাঁতার শেখানোর একটি স্কুল স্থাপনেরও পরিকল্পনা করেন। মনে মনে ভাবেন, এর মাধ্যমে তিনি তার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবেন। ১৭২৬ সালে ফ্রাংকলিন ফিলাডেলফিয়া ফিরে আসেন। লন্ডন ত্যাগ করার আগে তিনি তার নিজ এলাকা চেলসিতে সাঁতারের একটি প্রদর্শনী আয়োজন করেন, যেখানে তার বন্ধুরা নৌকা চালিয়ে তার সাঁতার নৈপুণ্য প্রত্যক্ষভাবে উপভোগ করে। তিনি এতে ভীষণ অনুপ্রাণিত হন এবং নদীতে ইচ্ছেমতো ডুব দিয়ে, এলেমেলো সাঁতার কেটে, জলে ভেসে ভেসে চেলসি থেকে ব্ল্যাকফ্রায়ারস পর্যন্ত অতিক্রম করেন।
যখন ফ্রাংকলিন তার বন্ধুদের জন্য সৌজন্য সাঁতার প্রদর্শন করছিলেন, অন্য কোথাও তখন সাঁতার শেখানোর জন্য পারিশ্রমিক ও পুরস্কার ঘোষণা করা হচ্ছিল। ফলে ১৭৯১ সালে যোগ্যতা নিরূপণের নিমিত্তে একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কোনো এক মঙ্গলবারের বিকালে তিনজন এসে উপস্থিত হন সাঁতারে বাজি ধরার অভিপ্রায়ে ওয়েস্টমিনস্টার থেকে লন্ডন ব্রিজ পর্যন্ত। ভিক্টর নামে এক সাঁতারু উপস্থিত হয়ে অংশগ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু অতিমাত্রায় মদ্যপানের কারণে গন্তব্যে পৌঁছার আধঘণ্টা আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৮০৬ সালে এক তরুণী বাজি ধরে নরউইচ নদীতে প্রায় এক মাইল সাঁতার কাটেন। ইতিহাস মতে, কোনো তরুণী মেয়ের জনসমক্ষে এটাই প্রথম সাঁতার কাটার ঘটনা।
সেই সময়ের বিচক্ষণ শিক্ষক ও ডাক্তাররা সাঁতারকে পুনরুজ্জীবিতকরণের অগ্রদূত হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি ছিল শুধু সৈন্যদের জন্য, যারা সাঁতার শিক্ষার একটি সুসংহত আয়োজনে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রাচীন ফ্রান্সে একটি নৌ-দুর্ঘটনায় অনেক নৌ-সেনা মৃত্যুবরণ করেছিলেন, যারা সাঁতার জানতেন না। বার্থেলেমি টারকুইন প্যারিস ব্রিজের পাশে প্রথম ভাসমান পুল চালু করেন। তবে নেপোলিয়নের (১৭৬৯-১৮২১) ইউরোপ অভিযানের পর সাঁতারের বিষয়টি সবাইকে বেশ অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করে। পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে জলজ যুদ্ধে নিজেদের পারদর্শী করার জন্য পুরুষ ও ঘোড়া উভয়কে সাঁতারে প্রশিক্ষিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সাঁতারে রেনেসাঁ যুগের উদ্ভব হয়। স্কুল ও সামরিক ব্যারাকে সাঁতারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়। কিন্তু সার্বিকভাবে সাঁতারের বিষয়টি সবার কাছে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পায় উনিশ শতকের শেষ দিকে।
আজ সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ শরীর সুস্থ রাখার প্রয়োজনে ও সর্বসাধারণের জন্য সুইমিং পুলের ব্যবস্থা রাখে। গরমে কিংবা শীতে সেখানে অবকাশ যাপন করে।
যারা ভীষণ সাঁতার ভালোবাসেন, তাদের জন্য যেকোনো পানিই সাঁতারের জন্য উপযোগী। এছাড়া অবসর, প্রতিযোগিতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ আরো অনেক ব্যাপারে এর উপকারিতা অনেক। মানুষের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, সমুদ্র অভিযান, খনি অনুসন্ধান ও প্রকৌশলে সাঁতারের উপযোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পৃথিবীর ৭১ শতাংশ পৃষ্ঠতল পানি দ্বারা আবৃত। তাই মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে জলস্নানের ঘটনা কখনো মুছে যেতে পারে না। প্রতিকূল জলবায়ুু ও জলজ ভবিষ্যতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সবাইকে অবশ্যই সাঁতার শিখতে হবে।





