১
নূর নাহার এখনো হাঁপাচ্ছে। ভীষণ ভয় পেয়েছে সে। শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসেছে কখন, নিজেই ঠাহর করতে পারে না। ঘেমে একেবারে নেয়ে উঠেছে। পরনের ব্লাউজ আর থামি ভিজে আছে ঘামে।
এতক্ষণ ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন তাড়া করে ফিরছিল নূর নাহারকে, সেই ভয়াবহ অবস্থার কথা ভাবতেই তার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছে বারবার। হঠাৎ কেঁপে উঠছেও। কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না দুঃস্বপ্নের মুহূর্তগুলো। এ রকম ভয়ঙ্কর স্বপ্ন আগে কখনো দেখেনি নূর নাহার।
বড় একটা খোলা মাঠের মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে আছে সে। বিভিন্ন দিকে যাওয়ার রাস্তা দেখা যাচ্ছে আশপাশে। কোন রাস্তায় যাবে, ঠিক করতে পারছে না। অস্থিরতা চেপে বসেছে বুকের মধ্যে। কোনো এক পথে তাকে যেতে হবে এক্ষুনি। তা না হলে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে না।
সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। আকাশে অনেক মেঘ জমেছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। অন্ধকার জমে উঠছে চারদিকে। আশপাশে আর কেউ নেই। কারো কাছে জিজ্ঞেস করে নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথটা খুঁজে নেবে তারও সুযোগ নেই। পথঘাট হারিয়ে অচেনা, অজানা এক জনপদে এসে পড়েছে নূর নাহার।
বাড়ির সবার কথা মনে হতেই ভয়টা আরো চেপে ধরছে বেশি। স্বামী এবং দুই মেয়ের কথা মনে হতেই ভয়টা যেন আরো বাড়ছে বেশি।
স্বামী এবং দুই মেয়ের কথা মনে হতেই অস্থিরতা আরো বেড়ে যায় তার। অনেক কান্না পায়। চিত্কার করে তাদের ডাকতে ইচ্ছে করে। কিন্তু গলা দিয়ে চিত্কার বেরোয়না অনেক চেষ্টার পরও। কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে। কে যেন তার বাক্শক্তি কেড়ে নিয়েছে।
ক্রমেই অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে আসে। এখন বোধহয় অমাবস্যা চলছে। সন্ধ্যা নামতেই চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেছে। আশপাশে পথঘাটে কোনো মানুষজন নেই। নিস্তব্ধ সুনসান পরিবেশ চারপাশে। কী করবে এখন, ভেবে কুলকিনারা করতে পারে না নূর নাহার।
হঠাৎ ভয়ঙ্কর চেহারার একজন মানুষকে দেখা যায়। তার দিকে ব্যস্ত পায়ে ছুটে আসছে লোকটা। কাছাকাছি আসতেই স্পষ্ট দেখা যায় তাকে। লোকটাকে দেখে আরো অনেক ভয় পেয়ে যায় নূর নাহার। জীবনে কোনোদিন তাকে দেখেনি সে। চেনাজানা কেউ নয় লোকটা। হঠাৎ একটা ছুরি বের করে সে। লোকটার চেহারায় এক ধরনের হিংস্রভাব। ক্রমেই সে আরো হিংস্র হয়ে উঠছে। তার দিকে তাকাতেই শিউরে ওঠে নূর নাহার। খুব কাছাকাছি চলে এসেছে অচেনা হিংস্র মানুষটা। তার হিংস্র নির্মম চেহারার মধ্যে অদ্ভুত এক শীতলভাব ছড়িয়ে আছে। যেকোনো সময় যে কাউকে খুন করতে পারে সে, এমন একটা ভাব তার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বুকের ধুকপুকানি বন্ধ হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ভয়ে, আতঙ্কে। আর একটু হলেই লোকটা তাকে ধরে ফেলবে। তার নাগালের মধ্যে রয়েছে সে এখন, নূর নাহার অনুভব করে।
হিংস্র চেহারার লোকটিকে চেনে না নূর নাহার। আগে কোনো দিন দেখেওনি। কেন তাকে মারতে চাইছে লোকটি, তাও জানে না সে। তাকে ধরতে পারলে নির্ঘাত হাতের ছুরিটি দিয়ে খুন করবে সে। তাকে খুনের আগেও হয়তো আরো কয়েকটি খুন করেছে লোকটা। কারণ তার হাতে ধরা ছুরি থেকে এখনো ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছে। খুনের নেশায় মেতে উঠেছে লোকটা, চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।
নূর নাহার কোনো উপায় খুঁজে পায় না নিজেকে রক্ষার। তাই বেপরোয়া গতিতে প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে থাকে সামনের দিকে। যেদিকে চোখ যাচ্ছে সেদিকেই ছুটছে সে। এখানকার পথঘাট, পরিবেশ সবই তার অচেনা। আগে কখনো এ এলাকায় এসেছে বলে মনে পড়ে না। ছুটতে ছুটতে একসময় অচেনা আরো এক নতুন জনপদে এসে পড়ে নূর নাহার।
আবারো ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকায় সে। ভয়ঙ্কর চেহারার হত্যাকারী মানুষটা এখনো তাকে অনুসরণ করছে। ছোটার গতি আরো বাড়িয়ে দেয় সে। ঘন অন্ধকারে পথঘাট ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ কিছু একটার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায় নূর নাহার।
তখনই তার ঘুম ভেঙে যায়। দুঃস্বপ্নের কবল থেকে বেরিয়ে আসে সে।
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে নূর নাহার। পরনের কাপড়চোপড় ঘামে ভিজে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। পানি পিপাসায় বুকের ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করছে। পানি খাওয়া দরকার। কিন্তু বিছানা থেকে নামতে চাইছে না। দুঃস্বপ্নের ঘোরটা কাটেনি এখনো। আতঙ্ক ভাবটা গ্রাস করে আছে এখনো। বিছানা থেকে নামলেই বোধ হয় ভয়ঙ্কর চেহারার অচেনা লোকটা চকচকে ধারালো রক্তমাখা ছুরি হাতে তার দিকে ছুটে আসবে, মনে হয় নূর নাহারের।
অনেকক্ষণ ধরে বিছানায় একপাশে চুপচাপ বসে থাকে সে। ওপাশে স্বামী মনু মিয়া বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। মেয়ে দুটো অন্য ঘরে নিজেদের বিছানায় যে যার মতো ঘুমোচ্ছে। এখন তো কারো জেগে থাকার কথা নয়।
ভীষণ ভয় পেয়েছে সে, অস্থির লাগছে ভেতরটা। মনু মিয়াকে ডেকে দুঃস্বপ্নের কথাটা বলবে কিনা, একবার ভাবে নূর নাহার। এই গভীর রাতে ঘুম থেকে ডেকে তুললে রাগ করতে পারে মানুষটা। গতকাল থেকে মনু মিয়ার মন-মেজাজ বেশ চড়ে আছে। রাতে খেতে বসে তরকারিতে ঝাল বেশি হওয়ায় অনেক চোটপাট করেছে। এত বছর ঘরসংসার করার পরও রান্নাবান্না ভুলে গেছে বলে নূর নাহারকে বকাঝকা করেছে। বড় মেয়ে সায়রার স্কুলে যাওয়া নিয়েও উল্টোপাল্টা কথা বলেছে লোকটা। এখনো কেন মেয়েটা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেনি, তার নিষেধ সত্ত্বেও, প্রশ্ন করেছে।
মেয়ের স্কুলে যাওয়া নিয়ে হঠাৎ আপত্তি তুলছে কেন মনু মিয়া, ভেবে পায়নি নূর নাহার। অথচ মেয়েকে যতদূর পর্যন্ত পড়ানো যায় ততদূর পড়াবে এতদিন বলত যে মানুষটা, হঠাৎ করে এভাবে বদলে গেল কেন?
মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাইছে কেন সে? ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি নূর নাহার। স্বামীর মন-মেজাজ খারাপ দেখে পাল্টা প্রশ্ন করার সাহস পায়নি।
মংডু শহরে যে কয়েকটি ভালো স্কুল রয়েছে, তার মধ্যে একটি আরাকান হাই স্কুল। ওই স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্রী সায়রা। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে স্কুলে। শিক্ষকদের চোখে সায়রা অনেক সম্ভাবনাময়ী একটা মেয়ে। এখানে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করে বড় কিছু হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ অনেক সীমিত। রোহিঙ্গাদের অনেকটা অবহেলিত, বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। সরকারিভাবে অনেকটা ইচ্ছে করেই পিছিয়ে রাখা হয়েছে। লেখাপড়ায় ভালো হলেও সায়রাকে নিয়ে মা-বাবার উচ্চাশা পূরণ হবে না কোনো দিন। এটা বোঝে নূর নাহার। মাঝপথেই লেখাপড়া ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে হবে। উচ্চশিক্ষা লাভের স্বপ্ন পূরণ হবে না।
দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেছে মেয়েটা। সুন্দরীও হয়েছে বেশ। এর মধ্যেই বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে। সায়রাকে এখনই বিয়ে দিতে চায় না মনু মিয়া ও নূর নাহার। মা-বাবা হিসেবে তাদের ইচ্ছা, যতদূর পর্যন্ত পড়ানো যায় ততদূর পর্যন্ত পড়াবে তাকে। আর এত অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তার সব সম্ভাবনা নষ্ট করে দিতে চায় না তারা।
বিছানায় বসে কিছুক্ষণ আগে দেখা দুঃস্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে আকুল হয়ে ওঠে নূর নাহার। এ রকম একটা স্বপ্ন দেখল কেন, ভাবতে থাকে। সামনে কোনো বড় ধরনের বিপদ এলে নাকি মানুষ খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখতে থাকে। তাহলে কি সামনে বড় কোনো বিপদ আসছে? দুশ্চিন্তা চেপে বসে বুকের মধ্যে। নূর নাহার কী করবে এখন। মনু মিয়াকে ডেকে স্বপ্নের কথাটা বলা দরকার এক্ষুনি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে, এত রাতে দুঃস্বপ্নের বর্ণনা শুনে ওর স্বামী কী করবে, এখন তার করার কি-ই-বা আছে? তার চেয়ে বরং সকালেই বলা যাবে, সিদ্ধান্ত নেয় সে।
হঠাৎ কাছেই একদল কুকুর আর্তনাদ করে কান্না শুরু করে। গভীর রাতে কুকুরের কান্না নাকি ভালো নয়। পশুপাখিরা ভবিষ্যৎ বিপদ-আপদের আভাস পেয়ে যায় আগেভাগে। মানুষের আশপাশে থাকার কারণে তাদের অমঙ্গল আর বিপদের সম্ভাবনা টের পেয়ে দুঃখে তারা আর্তনাদ করে কান্না করে। রাতে কুকুরের কান্না শুনলে সতর্ক হয়ে যেতে হয়, সাবধানে পথ চলতে হয়, বুঝে শুনে জীবন যাপন করতে হয়, বিপদ-আপদ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হয়। এছাড়া দোয়া-দরুদ পড়ে আল্লাহর কাছে বিপদমুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে হয়। তাহলে বিপদ কেটে যায়। মুরুব্বিরা বলে আসছেন, সবসময় এটা এক ধরনের সংস্কার হয়ে গেছে। দুঃস্বপ্নের ঘোর না কাটতেই আবার কুকুরের কান্না এই মাঝরাতে। মনের মধ্যে অজানা আশঙ্কা আরো চেপে বসে নূর নাহারের।
রাতটা যেন আর ফুরোতে চায় না। বেশ দীর্ঘ মনে হতে থাকে। কখন যে সকাল হবে, ভাবতে থাকে নুর নাহার।
এভাবে কোন সময় যে আবার গভীর ঘুমে ডুবে যায় সে, টেরই পায় না।
সকালে যখন ঘুম ভাঙে তখন নূর নাহার দেখে, মনু মিয়া বেরিয়ে গেছে বাইরে। চিংড়ি মাছের কয়েকটা ঘের আছে তার। কয়েক বিঘা জমিতে ধানের চাষ। সব মিলিয়ে মোটামুটি ভালো আয়। মংডু শহরে সচ্ছল সুখী জীবন তাদের। তবে রোহিঙ্গা মুসলমান বলে অনেক কিছুতে অবহেলা, বঞ্চনার শিকার তারা। এ নিয়ে অনেক দুঃখ, ক্ষোভ, হতাশা থাকলেও তারা সব মেনে নিয়েই বসবাস করছে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের অধিবাসী হিসেবে।
২
ভরদুপুর এখন।
আকাশে মেঘের ছড়াছড়ি। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। সকাল থেকেই আকাশ মেঘে ঢেকে আছে। মেঘের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে আসতে পারছে না।
এখন বর্ষাকাল। বর্ষাকালে এটা প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নূর নাহার বর্ষাকালে প্রকৃতির এমন রূপ দেখে অভ্যস্ত হলেও আজকের প্রকৃতির গুমোট রূপটা তার অস্বস্তি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। পরশু রাতে দেখা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের কথা কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না এ রোহিঙ্গা গৃহবধূ। দুঃস্বপ্নের স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে ফিরছে। সেই ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে সে। কিন্তু কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছে না।
মনু মিয়াকে সেই দুঃস্বপ্নের বিবরণ দিয়েছে নূর নাহার। স্ত্রীর মুখে সেই স্বপ্নের বিবরণ শুনে ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও মুখে তা প্রকাশ করেনি।
সামনে হয়তো ভয়ঙ্কর বিপদ আসছে, নূর নাহারের দেখা স্বপ্নে তার আভাস পাওয়া যায়। অশুভ একটা আলামত এটা। আল্লাহ জানেন, কোন কেয়ামত ঘনিয়ে আসছে তাদের ওপর। ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও সেটা স্ত্রী কিংবা পরিবারের অন্যদের কাছে বুঝতে দেয় না মনু মিয়া।
নূর নাহারকে আশ্বস্ত করতে বলেছে, ‘স্বপ্ন তো স্বপ্নই, ইভা কোনো দিন হাছা ন অইবো, সব ভুলি যাও, আল্লা আল্লা করো, কিছুনো অইবো আঁয়ারার, নামাজ পরি পরি আল্লাহর কাছে বালা মুসিবত তুন হেফাজত করিবার লাই দোয়া করো, কিছু নো অইবো আঁয়ারার আল্লাহ মেহেরবান থাকিলে। আল্লার ওফর ভরসা রাখো।’
স্বামীর মুখের কথাগুলো নূর নাহারের মনে স্বস্তি এনে দিতে পারেনি।
গত কয়েক দিনে মংডু, বুচিডংয়ের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা জানার পর তার মনের মধ্যে অস্বস্তি আর ভয় আরো বেশি চেপে বসেছে। তার মনে ভয় আর শঙ্কা কেবলই খচ খচ করছে।
মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সরকারি পুলিশ ও সৈন্যদের নির্যাতন আর নির্মমতা চলে আসছে আরো আগে থেকেই। এর মধ্যে জীবনযাপন করতে হচ্ছে এখানকার রোহিঙ্গাদের। তারা বাঙালি বলে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইছে না বর্মি সরকার। বারবার আরাকান রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে চলে যেতে চাপ দিচ্ছে তারা। গত ২০ বছরে আরকান ছেড়ে অনেক রোহিঙ্গা পাশের দেশ বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
নূর নাহারের চেনাজানা অনেক আত্মীয়স্বজন আরো আগেই নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে।
এখানকার পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। স্থানীয় বর্মি মগদের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব অতিষ্ঠ করে তুলছে রোহিঙ্গাদের, তারা যা খুশি তা-ই করে বেড়াচ্ছে। তাদের অন্যায় অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে ক্রমেই। এর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারছে না। তারা মুসলমানদের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, নয়তো দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র জোর করে নিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীর লোকজনদের কাছে বিচার চেয়ে সবাই আরো বেশি বিপদে পড়ছে। বর্মি পুলিশ, সৈন্য আর স্থানীয় মগদের অত্যাচার শুধু লুটপাটে সীমাবদ্ধ নেই। তারা বাঙালি বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেকিংয়ের নামে নারীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। তাদের হাত থেকে মাঝবয়সী নারী থেকে শুরু করে কিশোরী মেয়েরা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। যখনই মন চাইছে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে হানা দিচ্ছে। কারণে অকারণে পুরুষদের বিভিন্ন অভিযোগে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সুন্দরী মেয়েদের বাইরে কোথাও যাওয়াটা ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। যে কারণে নূর নাহারের বড় মেয়ে সায়রার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মনু মিয়া।
মনু মিয়া বাড়ি থেকে তেমন বাইরে যাচ্ছে না কয়েক দিন ধরে। জরুরি কাজ থাকলে বেরোচ্ছে অল্প সময়ের জন্য। কাজ শেষে দ্রুত ফিরে আসছে বাড়িতে।
নূর নাহার স্বামীর অস্থিরতা টের পাচ্ছে। লোকটা হঠাৎ করে বেশ গম্ভীর ও চুপচাপ হয়ে গেছে। প্রাণখোলা হাসিখুশি মানুষ হিসেবে তার আলাদা পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা রয়েছে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুমহলে। গত কয়েক দিনে মনু মিয়া পুরোপুরি বদলে গেছে। তার সঙ্গে খুব দরকার না হলে কথা বলছে না নূর নাহার।
মাঝখানে গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গিয়েছিল মনু মিয়া।
ইমাম সাহেব স্বপ্নের বিবরণ শুনে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘ওবা মনু মিয়া, তোয়ার বউয়ের স্বপ্নগান পুরাপুরি বুঝিন্ন ফারির, তবে বালা মুসিবতের আলামত দেখা যার, আল্লারে ভালোমতো ডাকো, বালা মুসিবতের তুন যেন হেফাজত করে মুনাজাত করি ফরিয়াদ করো, এনডে আর পরিস্থিতি তো সুবিধার মনে ন অর, আল্লায় জানে আঁয়ারার কী অয়? সামনে বড় ধরনের বিপদ আইয়ের মনে হর।’
ইমাম সাহেবের কথা শুনে আরো বেশি ভয় পেয়ে গেছে মনু মিয়া।
৩
কাল কী ঘটবে, কার ভাগ্যে কী লেখা আছে কেউ জানে না। দারুণ উত্কণ্ঠা আর দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটছে প্রতিটি মুহূর্ত। বর্মি মিলিটারি আর লুন্টিনদের সঙ্গে স্থানীয় রাখাইন মগদের অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই। এভাবে তো আর বেঁচে থাকা যায় না। এর অবসান হওয়া প্রয়োজন। এতসব কথা ভাবতে ভাবতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল মনু মিয়া।
হঠাৎ একটানা গুলি আর বোমার শব্দে তন্দ্রাভাব কেটে যায় মনু মিয়ার। বাইরে নারী-পুরুষ শিশুর আর্তচিত্কার আর গুলি-বোমার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে নামে মনু মিয়া, জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি অনুমান করতে চায়।
বর্মি সৈন্যরা হেলিকপ্টার থেকে বোমা ছুড়ছে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি লক্ষ্য করে। গুলিও চলছে অবিরাম। কিছুক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পারে মনু মিয়া। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দু্ই কন্যা সায়রা ও রাবেয়া। ভীষণ ভয় পেয়েছে ওরা। ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে তারা। নূর নাহার মেয়েদের অভয় দেয়ার বদলে ভয়ে আতঙ্কে কাঁদতে শুরু করে নিজেই। এর আগে তেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি তারা। যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তেমন মনে হয়। এতদিন শুধু যুদ্ধের গল্প শুনেছে, এবার চোখের সামনে তেমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিপদটা খুব সাধারণ নয়। যেকোনো সময় ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ঘটে যাবে। আশপাশে কেয়ামত নেমে এসেছে, ওরা সবাই উপলব্ধি করে। এ সময়ে বাড়ির বাইরে আরো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে চেষ্টা করাটা উচিত হবে না। এতে আরো বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে।
আশপাশের কয়েকটি বাড়ি থেকে এরই মধ্যে বেশকিছু নারী-পুরুষ-শিশু একসঙ্গে হাজির হয়েছে মনু মিয়ার বাড়ির খোলা উঠোনে। সবার আতঙ্কগ্রস্ত মুখ দেখছিল নূর নাহার। আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো এক উঠোনে জড়ো হয়ে পালানোর উপায় খুঁজছে।
৪
একটানা ১২ দিন ধরে হাঁটছে মনু মিয়ার পরিবার। তাদের পা আর চলছে না। দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তারা। পথ চলতে গিয়ে আশপাশে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে চেনা-অচেনা অনেককে। সবাই আজ এক কাতারে পথ চলছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। যে করেই হোক, বাংলাদেশের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার অথবা বান্দরবানের দুর্গম প্রত্যন্ত পাহাড়ে আশ্রয় নিতে হবে তেমন একটা ভাব সবার মধ্যে।
আরাকান ছেড়ে যেতে না পারলে রোহিঙ্গাদের পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ, তেমন উপলব্ধি ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে। আর এ কারণেই প্রাণ বাঁচাতে সবাই মরিয়া হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটছে।
মনু মিয়ার মনে আতঙ্ক ভাবটা এখনো চেপে আছে। দুই মেয়ে আর স্ত্রী নূর নাহারকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে আসার সময় কিছু নগদ টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি পুঁটলির মধ্যে করে নিয়ে এসেছে তারা। বাকি সবকিছু ওখানে ফেলে রেখে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। বুচিডং ও মংডু জেলার কুন্দুপাড়া খাল, কুরমি খাল, কালা পাহাড় পাড়ি দিতে হয়েছে তাদেরকে।
সামনেই নাফ নদী। কালা পাহাড়ের নাম শুনে এসেছে তারা এতদিন, যা অতিক্রম করার দুঃসাহস হয়নি কোনো সময়ে। হাজার ফুট উঁচু এ দুর্গম পাহাড় অতিক্রমের প্রয়োজন বোধ করেনি তারা কেউই। অথচ গত কয়েক দিনে জীবন বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা সেই কালা পাহাড় অতিক্রম করেছে অনেক বিপদ মোকাবেলা করে।
আসার সময় পথের পাশে অসংখ্য নারী-পুরুষ, শিশুর লাশ পড়ে থাকতে দেখেছে তারা। খালের পানিতেও লাশ ভাসতে দেখা গেছে। অনেক জায়গায় লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মরদেহগুলোর কারো গলা কাটা, কারো হাত-পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন। বীভৎস লাশের স্তূপ পড়ে আছে পথে-ঘাটে, নদী-নালায়, ধানক্ষেতে। তারা সবাই বর্মি সৈন্য ও স্থানীয় মগ রাখাইন সন্ত্রাসীদের নির্মমতার শিকার।
৫
এখন গভীর রাত অমাবস্যা চলছে। গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করেছে চারপাশ। কিছুই দেখা যায় না।
গহিন অরণ্যে অচেনা পথ ধরে ব্যস্ত পায়ে ছুটছে একদল নারী-পুরুষ-শিশু। প্রাণ বাঁচাতে দুর্গম জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে হচ্ছে তাদের। কারো মুখে কোনো কথা নেই। অন্ধকারে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে শরীর। সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। ব্যথায় হঠাৎ কেউ আর্তনাদ করে উঠলেও আবার সংবরণ করে নিচ্ছে নিজেকে। মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে সব যন্ত্রণা। কারণ এ পথ দিয়ে তাদের যাওয়ার খবর বর্মি সৈন্যরা পেয়ে গেলে অস্ত্র হাতে ছুটে আসবে এক্ষুনি। আর ওরা যদি এসে পড়ে, তাহলে রক্ষা নেই কারো। ছেলে, বুড়ো, নারী-পুুরুষ-শিশু কাউকে ছাড়বে না। সবাইকে গুলি করে মারবে। ওরা যে কত ভয়ঙ্কর আর নির্মম হতে পারে, গাঢ় অন্ধকারে দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গল পথ পাড়ি দেয়া মানুষগুলো জানে।
রাখাইনের মংডু ও বুচিডং থেকে পালাচ্ছে তারা সবাই।
অনেকক্ষণ ছুটে চলার পর একসময় ক্লান্তিতে দুটি পা অসাড় হয়ে আসে। আর ছুটতে পারে না। তারাও প্রাণ বাঁচাতে মংডু ও বুচিডং ছেড়ে পালাচ্ছে। সবার গন্তব্য পাশের দেশ বাংলাদেশের টেকনাফ নয়তো নাইক্ষ্যংছড়ি।
কোনোভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে পারলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারবে, প্রাণ বাঁচাতে পারবে। তেমন আশায় বুক বেঁধে ছুটছে মানুষগুলো।
ভয়ার্ত সহায়সম্বলহীন, নিরাশ্রয় নারী-পুরুষ-শিশু সবাই নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং আক্রান্ত। কেউ মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে হারিয়েছে, কেউ আবার স্বামী কিংবা স্ত্রীকে হারিয়েছে, কারো সন্তান নিখোঁজ হয়েছে। ওখানে থাকলে তাদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হতো। তাই জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটছে সবাই। এরপর কী হবে কেউ জানে না। তবু ছুটছে ওরা সবাই।
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা সবাই। আরেকটু পথ বাকি। এ পথটুকু নিরাপদে পার হতে পারলেই হলো, সকাল নাগাদ ওরা পৌঁছে যাবে নো ম্যানস ল্যান্ডে।
সবাই দ্রুত পা চালায়। কোনোভাবেই পিছিয়ে পড়লে চলবে না। আর এখানে কেউ পিছিয়ে পড়লে তাকে পেছনে ফেলেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য সবাই। অন্যের দিকে তাকানোর সময় ও সুযোগ নেই। আগামীকাল সকালে হয়তোবা বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে দলটি।
সকাল হতে আর কত সময় বাকি?
জীবন বাঁচাতে শত শত মাইল পথ পায়ে হেঁটে এসেছে তারা সবাই। পেছনে ফেলে এসেছে চেনা জনপদ, বাড়িঘর, স্কুল, খেলার মাঠ, ক্ষেতের ফসল, দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য।
অন্ধকার ভাবটা কমে আসছে ক্রমেই। ভোরের আভা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সকাল নাগাদ ওরা সবাই পৌঁছে যাবে নো ম্যানস ল্যান্ডে। সীমান্ত এলাকায় বর্মি সৈন্যরা মাইন পেতে রেখেছে। এ পথে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। গত কয়েক দিনে মাইন বিস্ফোরণে কয়েকজন মারা গেছে, অনেকের হাত-পা উড়ে গেছে। তেমন খবর জানার পর নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ব্যস্ত পায়ে ছুটতে থাকা নারী-পুরুষ-শিশু সবার মনে।
সকালের আলো ফুটে উঠলে পথঘাট সব দেখা যাবে। পথে পেতে রাখা মাইনের ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণের শিকার হতে হবে না তাদের।





