অনুবাদ: শওকত হোসেন
আপনার পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে কিছু বলুন—
আমার পরিবার আটক জেলার খাত্তার গোত্রের সদস্য। ভূস্বামী পরিবার ছিল সেটা। বংশধারা বিশেষজ্ঞরা একে ১১০০ শতাব্দীর রাজপুতদের উত্তরসূরি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। ১০০ বছর পরে এ পরিবারের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ উত্তর থেকে আসা খুনে মুসলিম অভিযাত্রীদের উত্তরপুরুষের সঙ্গে আন্তঃবিবাহ উৎসাহিত করে। মোগলদের আগমনের ২০০ বছর আগেই ব্যাপারটা চুকে গিয়েছিল। গোত্রপ্রধান ১০ হাজার লোককে নিজের অধীনে রাখার অধিকারী ছিলেন। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ পরিবারটি সম্পত্তি নিয়ে কলহে লিপ্ত এক পচনশীল অভিজাত পরিবারের পরীক্ষাগার নজিরে পরিণত হয়। গরহাজির জমিদারি পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তুলেছিল। যেমন— আমার মা-বাবা জানতেনই না যে তাদের অংশ কতটুকু, তবে দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি বিক্রি করেই চলতে পেরেছিলেন বলে সেটা বিশালই হওয়ার কথা।
গোড়ার দিকে আমার দাদা ও নানা ব্রিটিশদের সমর্থক অংশের সদস্য ছিলেন। শিখ যুদ্ধের সময়ই পরিবারে বড় ধরনের বিভাজন দেখা দেয়। এক পক্ষ শিখদের সমর্থন দেয়, আর অন্য পক্ষ ব্রিটিশদের। ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও (ব্রিটিশ ইতিহাস বইয়ে বিদ্রোহ হিসেবে পরিচিত) একই ধরনের বিভক্তি ছিল। আমি তির্যকভাবে চিন্তা করতাম যে পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা বুঝেশুনেই কাজটা করেছেন: দুই পক্ষকেই সমর্থন করে গেছেন, যাতে শাসকশ্রেণীর যে পক্ষই জিতুক না কেন, পরিবার যেন কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে না পারে। প্রায় সময় এটাই ছিল আসল কথা। কিন্তু এ যাত্রা নয়।
একজন মার্ক্সবাদী হিসেবে আমি বলব, পরিবারের ভাঙনের মূলে ছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি জমি নিয়ে দুই ভাইয়ের বিবাদ। ১৮৪৬ সালের সেপ্টেম্বরে আমার পূর্বসূরি পরিবার প্রধান সর্দার কারাম খান তার ছোট সত্ভাই ফতেহ খানকে একাকী একান্ত সভায় ডেকে পাঠান। দুজনই ঘোড়ার পিঠে ছিলেন। একটা ঝরনার পাশে মিলিত হন তারা। বিনা আভাসে ধূর্ত ফতেহ তলোয়ার বের করে নিপুণ ভঙ্গিতে তার ভাইয়ের শির বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। নিহত মানুষটির বাহন মাদি ঘোড়া তার খণ্ডিত দেহ নিয়ে জমিদারির আস্তাবলে ফিরে আসে। বিবাদের শুরু ছিল সেখানেই। চাচার হাতে পাঁচ ছেলেও নিহত হতে পারে ভেবে সন্ত্রস্ত বিধবা স্ত্রী দেরি না করে আনুমানিক ৪০ মাইল দূরে জেনারেল অ্যাবটের শিবিরে (পরে অ্যাবটাবাদ নামে সেনানিবাসে পরিণত হয় এটা, এখানকারই সীমানায় বিন লাদেন শরণলাভ করেছিলেন) সাহায্য চেয়ে লোক পাঠান। কিন্তু নতুন অঘটন এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। একদল সৈনিকসহ হাজির হন অ্যাবট এবং ছেলেরা বড় না হওয়া পর্যন্ত পরিবারের এ অংশটিকে প্রতিরক্ষা জোগান। কারাম খানের বড় ছেলে সর্দার মুহাম্মদ হায়াত খান ভীষণভাবে ব্রিটিশদের অনুগত হয়ে দাঁড়ান, দুই আফগান যুদ্ধেই তাদের হয়ে লড়েছেন। দূরসম্পর্কীয় চাচাতো ভাইবোন আমার মা-বাবা ছিলেন তারই প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী। তরুণ বয়সে আমি বরাবরই পরিবারের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অংশকে ঈর্ষা করেছি। বাবা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ‘খুব বেশি বিভ্রম না থাকাই মঙ্গল; সাম্রাজ্যবাদবিরোধীরা তুমি যেমন ভাবছ, তটটা নিরেট নাও হতে পারে।’
মা-বাবা দুজনই রাজনৈতিকভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কমিউনিস্ট হয়ে যান। বাবা দলে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন, ফলে তাদের বিয়ে কিছুটা বিলম্বিত হয়েছিল। আমার নানা কমিউনিস্টের সঙ্গে মায়ের বিয়েতে রাজি ছিলেন না, কারণ হবু শ্বশুরকে বাবার নিন্দার কথা তেমন গোপন কিছু ছিল না। বাবাকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। নিশ্চয়ই বাবা আদৌ রাজি হবেন না বলেই ধরে নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সিপিআই তার সব মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সদস্যকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়ায় অপারেশন বারবারোসা কাজে এসেছিল। ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরের বিয়ের ছবিতে বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উর্দি পরে ধৃষ্ট হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বেশকিছু ব্রিটিশ কমিউনিস্টের মতোই মন্টে ক্যাসিনোতে লড়াই করেছিলেন তিনি।
মায়ের বাবা পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ঝোঁকের বশে মা তার বিয়ের বেশির ভাগ উপহার সিপিআইকে দান করে দেন। এসবের আগে কারা অন্তরীণ নেহরুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তিনি। নেহরু চা-চক্রে যোগ দিতে এলে মায়ের বাবা তাকে এই বলে পরিচয় করিয়ে দেন: ‘আমার ছোট মেয়ে, হায়, আপনার বিরাট ভক্ত সে।’ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন চিঠিপত্রে নেহরু তার কাছে ভারতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন এবং তার বিপ্লবীতে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটা কত ভালো সেটা বলেন। বাবা চিঠিগুলো দেখে ফেলতে পারেন ভেবে মা ওইসব চিঠি পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। এরপর জিন্নাহর কাছে যান তিনি। জিন্নাহ ‘ঘোরতর শত্রুকে’ সমর্থন করায় তাকে ‘খুবই দুষ্টু’ বলে উল্লেখ করেন।
বারার পরামর্শ ছিল সোজাসাপ্টা: ‘তোমার চাচা ও ফুপুরা খুবই স্নেহশীল মানুষ, ওরা তোমাকে ভালোবাসেন, কখনই অভদ্রতা করবে না। পছন্দ হোক বা না হোক, আমরা এ পরিবারেরই অংশ। তবে কখনই নির্বুদ্ধিতার মাত্রাকে খাটো করে দেখবে না। তোমার মায়ের পাঁচ ভাইয়ের নির্বুদ্ধিতার বহর দেখলে মনে হয়, নিশ্চয়ই কোথাও এক ধরনের সৃজনশীল পরিকল্পনা ছিল।’
আপনাদের ঘর কেবল ট্রেড ইউনিয়নিস্ট আর কৃষক নেতা নয়, লেখকের আনাগোনায়ও ভর্তি থাকত—
আমাদের বাড়ি হামেশা কৃষক নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন নেতা, বিপ্লবী কবি, প্রাবন্ধিক, ছোট গল্পকার এবং মাঝে মাঝে পরিবারের সদস্য বা পরিবারের পুরনো বন্ধুতে ভরে থাকত— যদিও তারা খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। দলের দুজন নেতা, ভারতের দুই মুসলিম বুদ্ধিজীবীকে পাকিস্তানের বন্ধ্যা জমিনকে উর্বর করে তুলতে পাঠানো হয়েছিল, দল গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন তারা। তাদের একজন ছিলেন পার্টির সেক্রেটারি সাজ্জাদ জহির। দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের প্রফেসরের ছদ্মপরিচয়ে জহিরকে আমাদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। এক রাতে আমরা সাপার করার সময় দরজার কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো। ভেতরে ঢুকলেন আমার দাদার সবচেয়ে পুরনো এবং প্রিয় বন্ধু; আবার দেশের পুলিশ বাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেলও ছিলেন তিনি। আমাদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলেন তিনি। কিছুটা ভীতি কাজ করছিল কিন্তু প্রফেসর/আন্ডারগ্রাউন্ড সিপি নেতা দুর্দান্তভাবে সামলে নিয়েছিলেন। এ ধরনের লোকদের মোকাবেলার কায়দা জানতেন তিনি। সাহিত্য ও কোরআনের তফসির নিয়ে আলোচনা করলেন কিন্তু সাপারের পর পিছু হঠলেন তিনি, ‘আপনি অনুমতি দিলে স্যার, আমি ক্লান্ত, শুতে যেতে চাই।’ ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ মা-বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমাদের সব বন্ধু যদি এর মতো হতো! এমন একজন সংস্কৃতিবান লোকের দেখা পেলে কোথায়?’ এক সপ্তাহ বাদে উধাও হয়ে যাওয়া সিপি নেতাদের ছবি দেখার সময় ডিনারে পরিচয় হওয়া মানুষটার আসলে মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টের একজন হওয়ার কথা জানতে পারেন তিনি! বিপরীতমুখী অস্তিত্ব ছিল এটা, যদিও কোন পক্ষে আছি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না আমার।
অন্য পক্ষে ছিল বেশি মজা; ওরা হাসত, ঠাট্টা-রসিকতা করত, তবে ট্রেড ইউনিয়ন আর রেলওয়ে শ্রমিকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল, খুব ছোটবেলায়ই আমাকে বড় মানুষ হিসেবে দেখতেন ওরা। আমি বলতাম, ‘কী হচ্ছে?’ ওরা তখন বুঝিয়ে বলতেন, ‘ব্যাপারটা এ রকম...’
কখন থেকে বিক্ষোভ ইত্যাদি আয়োজন শুরু করলেন, আপনার মা-বাবার সাড়া কেমন ছিল?
আমি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠায় বাবা ভয় পেয়েছিলেন। দেশ ছিল সামরিক শাসনের অধীন, রাজনীতি ও মিছিল নিষিদ্ধ ছিল। আমার বয়স তখন ১৬ বা সাড়ে ১৬ বছর। ১ ডলার চুরির অপরাধে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জিমি উইলসনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার খবর পড়ার সময় তখনো স্কুলে পড়ি। ওই গভীর আঘাতের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে আমার। বিশ্বাস করতে পারিনি আমরা। এমনকি ১ মিলিয়ন ডলার চুরি করলেও মৃত্যুদণ্ডটা বাড়াবাড়ি ছিল। আমি কয়েকজন স্কুলবন্ধুকে একত্রিত করে বললাম, ‘আমরা কিছুই না করে থাকতে পারি না।’ মনে হয় স্কুলের উর্দি গায়ে আমরা জনাবিশেকের মতো এম্প্রেস রোডের মার্কিন কনস্যুলেটের দিকে মিছিল করে এগিয়ে গিয়েছিলাম। পথে অসংখ্য টোকাই যোগ দেয় আমাদের সঙ্গে, পরে কাবাব আর কোক খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়ায় ওরা ভেবেছিল, উদ্দেশ্য ভালো কিছুই হবে। জিমি উইলসন পশ্চিমা নাম হওয়ায় ওরা ভেবেছিল, ‘...এর মৃত্যু চাই’ স্লোগান দিতে হবে। তো আমরা বলতে বাধ্য হই: ‘না, না, জিমি উইলসনের মৃত্যু চাই স্লোগান দিতে পারবে না— আমরা এরই প্রতিবাদ করছি।’ ওদের বুঝিয়ে বলার পর স্লোগান পাল্টে ‘জিমি উইলসন দীর্ঘজীবী হোক!’ হাঁকতে শুরু করে ওরা। তো কনস্যুলেটে পৌঁছে আমরা কনসাল জেনারেলের সঙ্গে দেখা করি। এখনো তার নাম মনে আছে, ডক্টর স্পেংলার, কঠোর, বলিরেখাপূর্ণ চশমা চোখে জার্মান বংশোদ্ভূত প্রটেস্ট্যান্ট, তার চেহারায় সহানুভূতির লেশমাত্র ছিল না। তিনি এমনকি জবাবও দেননি। আমি বলেছিলাম, ‘১ ডলার চুরির দায়ে আপনারা একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানকে মৃত্যুদণ্ড দিতে যাচ্ছেন অথচ নিজেদের গণাতান্ত্রিক দাবি করেন বলে আমরা একটা চিঠি নিয়ে এসেছি... এটা অগ্রহণযোগ্য আচরণ।’ তিনি তখন আমাদের নাম জানতে চান এবং নাম বললে পরদিন আমাদের প্রিন্সিপালের কাছে ‘তোমরা কারা, কেন তোমরা এ কাজ করছ এবং তোমাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য’ লেখার কথা বললেন। এটাই ছিল আমেরিকান গণতন্ত্রের সঙ্গে আমার প্রথম প্রত্যক্ষ সম্পর্ক। আমরা স্রেফ সরে আসি। ‘খোদা!’ বলেছিলাম আমরা। ‘লোকটা এমনকি আমাদের কথার উত্তরও দিল না! কিছুই না, স্রেফ বরফের মতো শীতল।’
ওটাই ছিল প্রথম বিক্ষোভ। দ্বিতীয়টি ছিল ১৯৬১ সালে, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। আবার খবরের কাগজে পড়লাম, কঙ্গোবাসীর নেতা প্যাট্রিস লুলুম্বাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এবং সেটা সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল, এটা আমেরিকানদের কাজ। এখন আমরা জানি, প্যাট্রিস লুলুম্বার মরদেহ সিআইএ স্টেশন হেডের ড্রাইভ করা গাড়ির বুটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়েছিল। মরদেহ ফেলার একটা জায়গার খোঁজে প্রাসাদ ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল গাড়িটা। তো এ সময় একটা সভা ডাকি আমি। আমি ছাত্র সংসদ নেতা ছিলাম কিন্তু বিরোধিতার আশঙ্কায় কারো সঙ্গে পরামর্শ করিনি। সভার হলে ২০০ লোকের সমাগম ঘটে। ১৯৬১ সালে লাহোরের ঘটনা এটা। মেজাজ পুরোপুরি আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিল। আমি বলেছিলাম, ‘এই হলো ঘটনা... আমরা এটা চলতে দিতে পারি না... লুলুম্বার হত্যাকাণ্ড বিনা প্রতিবাদে ছেড়ে দেয়া যাবে না, কেউ বাধা দেয়ার আগেই আসুন সেটা করি আমরা।’ আমরা ২০০ লোক মিছিল করে রাস্তায় নেমে এলাম। আইন অমান্য করে লুলুম্বার পক্ষে স্লোগান ছেড়ে আমেরিকান কনস্যুলেট ও গভর্নমেন্ট হাউজের দিকে এগিয়ে গেলাম।
কিছুই ঘটল না— না পুলিশ, না অন্য কিছু। আমাদের বিক্ষোভের ছবি তোলা হলো, তো কিছুটা কাভারেজ পেলাম; কলেজে ফেরার পথে নিজেদের সাফল্যে বেপরোয়া হয়ে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক!’ ‘আমরা গণতন্ত্র চাই!’ স্লোগান দিতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু লুলুম্বার হত্যার চেয়ে এটাই বরং বেশি খেপিয়ে তুলল সরকারকে। লুলুম্বার ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। এবার প্রিন্সিপালকে বলে দেয়া হলো, ‘আপনাকে এ ছেলেদের সামাল দিতে হবে।’ খুবই ভালো এবং আলোকিত প্রিন্সিপাল ছিলেন তিনি। আমাদের বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যা খুশি করতে পারো কিন্তু রাস্তায় তোমাদের বাঁচাতে পারব না। এখানে তোমাদের যা খুশি পড়তে পারো, এটা পড়ার, শেখার সময়।’ আমরা বললাম, ‘ঠিক, কিন্তু আমরা তো স্রেফ পড়তে পারি না।’ বাবাকে জানানো হলো, ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তো ওই বছর রাজনৈতিক সভা বা মিছিলে যোগ দেয়া আমার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো। নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে বন্ধুরা ‘আমরা কোকাকোলার চেয়ে বরং লাসসি বেশি পছন্দ করি’-জাতীয় শিরোনামের বিতর্কের আয়োজন করত। বক্তৃতা-বিবৃতিও ছিল উপমার। হাসি ভালো অস্ত্র বলে প্রমাণিত হয়েছিল।
আমার ১৩ বছর বয়সের দিকে লাহোরে আয়োজিত একটা বিক্ষোভ মিছিলের কথা বলতে ভুলে গেছি। ১৯৫৬ সালের বিশাল সুয়েজবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলের লক্ষ্যবস্তু ছিল ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ, আর ইসরায়েল তো অবশ্যই— বিস্ময়কর ছিল সেটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা আমাদের স্কুলে এসে স্কুল বন্ধ করে দেয়, যাতে আমরা মিছিলে নামতে পারি। প্রিন্সিপাল ব্রাদার হেন্ডারসন ওইদিনের মতো স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছিলেন। তখন সামরিক আইন বা সামরিক স্বৈরাচার না থাকায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার লোক লাহোরের রাস্তায় মিছিল করেছিল। আমাদের সরকার ব্রিটিশদের সমর্থক ছিল, ফলে তাদের বিরুদ্ধে ক্রোধের স্রোত তৈরি করেছিল। ‘স্বাধীনতার কি কোনো মানে নেই? আমরা আজো উপনিবেশের মতো আচরণ করছি।’
মা পুরোপুরি আমার কর্মকাণ্ডের পক্ষে ছিলেন। বাবা ততটা নন: ‘তুমি বিলকুল লেখাপড়া করছ না। তোমার খেয়ালখুশি মতো পড়াশোনা করছ, ভালো কথা কিন্তু পরীক্ষায় তো পাস করতে হবে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়, পরে দেখা যাবে কী করা যেতে পারে’— সতর্ক করেছিলেন তিনি। ‘এমন কিছু কাজ আছে, যা কাউকে না কাউকে করতেই হয়,’ বলেছি আমি। ‘কথাটা আমার চেয়ে বেশি জানেন আপনি।’ ‘হ্যাঁ,’ জবাব দিয়েছেন তিনি, ‘কিন্তু আমি তো ফার্স্টও হয়েছি।’ আমি বলেছি, ‘বেশ, আমার কাছে এর তত গুরুত্ব নেই।’ ‘কিন্তু আমাদের কাছে আছে,’ জবাব দিয়েছেন তিনি। তো এটা ছিল বাবা-ছেলের মামুলি সম্পর্ক, এর ভেতর আটকা পড়েছিলেন আমার মা। অর্ধেক আমার সঙ্গে একমত, অর্ধেক বাবার সঙ্গে। একদিন ওরা আমাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। মায়ের ভাই, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমার অনুপস্থিতিতে একটা বিরাট ফাইল হাতে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হন। ‘এটাই ওর এ পর্যন্ত জমানো কীর্তির বহর,’ বাবাকে বললেন তিনি, ‘এটা বাড়তেই থাকবে, সুতরাং আমার পরামর্শ, ওকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দাও। কারণ শিগগিরই আটক হতে যাচ্ছে ও। তখন আর আমার কিছুই করার থাকবে না।’ আমি দেশ ছাড়তে অস্বীকার করব জানা থাকায় ব্যাপারটা অনেক দিন আমার কাছে গোপন রেখেছিলেন ওরা। তার বদলে বলেছেন, ‘তুমি অক্সফোর্ডে গিয়ে অ্যাপ্লিকেশন করো, ক্যামব্র্রিজে অ্যাপ্লিকেশন করো।’ আমি অক্সফোর্ডে অ্যাপ্লিকেশন করে সুযোগ পেয়ে গেলাম। আমার বান্ধবী ক্যামব্র্রিজ আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল— ওর বাবা লন্ডনে কূটনীতিক হয়েছিলেন— তার মানে এটা একটা অনুপ্রেরণা ছিল। মোটের ওপর যেতে রাজি ছিলাম না আমি কিন্তু ওরা বললেন, ‘তোমাকে যেতেই হবে।’ আমি বলেছিলাম, ‘তোমরা এত জোর করছ কেন? ওখানে আমার পড়াশোনার পেছনে অযথা টাকা খরচ করতে চাও? এখানেই বেশ ভালো আছি।’ খুবই ব্যতিক্রমীভাবে জোর করলেন মা। ‘না, না, তোমাকে যেতেই হবে।’ তো এভাবেই অক্সফোর্ডে ভর্তি হই আমি।
অক্সফোর্ড কি আপনার কাছে বেশি নিষ্ফল প্রমাণিত হয়েছিল?
আমি পছন্দই করেছিলাম। কারণটা বলছি, পাকিস্তানে পড়ার মতো বইপত্রের ঘাটতি ছিল। সব ধরনের বামপন্থী সাহিত্য নিষিদ্ধ করে প্রেসিডেন্টের একটা ফরমান ছিল। ফলে অবশ্যই, গোপন পাঠচক্রে কেউ যখন মার্ক্স পড়ে শিহরিত হতো, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে পাওয়া সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। অক্সফোর্ডে যাওয়ার পর প্রথম কাজ ছিল লাগাতার পড়ে যাওয়া, পাকিস্তানে যেসব বইপত্র আদৌ পাওয়া যেত না: ডি এইচ লরেন্স, হেনরি মিলার, ইস্যাক ডয়েশ্চার, ট্রটস্কি ট্রিলজি, খোদ ট্রটস্কি, অন্যান্য বলশেভিক নেতা, আরো অনেকে। আমার কাছে অক্সফোর্ড বহুদিক থেকেই মুক্তিদায়ী ছিল।
আমি ব্রিটেনে আসার সময় এটা স্পষ্ট ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে এবং সুয়েজ বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশরা পিয়ানোর তারের তৈরি নাড়ি দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। হ্যারল্ড উইলসন শ্রমিক দলের প্রধান হিসেবে হিউ গেইটস্কেলের স্থলাভিষিক্ত হন এবং অচিরেই প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৪ সালে আমি শ্রমিক দলের পক্ষে প্রচারণা চালাই। প্রাইভেট আই-তে প্রচুর সময় কাটাতাম, ওখানে রিচার্ড ইনগ্রাম আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি দ্য থটস অব চেয়ারম্যান হ্যারল্ডের সংকলন করছ না কেন? ওর সেরা উদ্ধৃতিগুলো খুঁজে বের করো, রাল্ফ স্টিডম্যান সেগুলো অলঙ্করণ করবে।’ আমার প্রথম বইটি ছিল উইলসনের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চমত্কার উদ্ধৃতির সংকলন— মানে একের পর এক উদ্ধৃতি। ওই বইটা এখনো খুব ভালো লাগে আমার। উইলসন ভিয়েতনামে সৈন্য পাঠাননি, কাজটা করার জন্যে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন তিনি— আমাদের এ কথা কখনই ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু আদর্শগতভাবে আমেরিকান লাইন সমর্থন করেছেন তিনি, দোনোমনোভাবে হলেও ব্রিটিশ রাষ্ট্র একই পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করেছে। ডানপন্থী শ্রমিক দল প্রবলভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পক্ষে ছিল। অবশ্য একশরও বেশি শ্রমিকদলীয় এমপি আমাদের পক্ষে ছিলেন।
পুটনিতে উইলসনের ভাষণ শুনতে গিয়েছিলাম, ওই সময় ইংরেজ বিপ্লবের ব্যাপারে ততটা ওয়াকিবহাল ছিলাম না। উইলসন এই বলে শুরু করলেন: ‘আজ আমরা এক ঐতিহাসিক মঞ্চে এসে দাঁড়িয়েছি, কারণ ঠিক এখানেই এ দেশটিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণতকারী সেই মহান বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।’ ওই সভায় দু-তিন হাজার দর্শক ছিল। মনে হয় তখনই কোনো রাজনৈতিক নেতাকে শ্রোতাদের ইতিহাসের সবক দিতে শুনি।
১৯৬৭ সালে রাসেল/সার্ত্রে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের জন্য উত্তর ভিয়েতনামে যাই আমি। ওই অভিজ্ঞতা আমাকে আজীবন স্তব্ধ করে দিয়েছে। পরে ক্যামিরির জীবনরক্ষার প্রয়াসের অংশ হিসেবে রেগিস ডার্বি ট্রায়ালে বার্ট্রান্ড রাসেলের পাঠানো দলের সদস্য হিসেবে যোগ দিই। এসবই একটা দাগ ফেলে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে বামপন্থী জার্মান ছাত্রদের সংগঠন এসডি আয়োজিত বার্লিন কংগ্রেসে যোগ দেয়ার পরেই কেবল কোনো একটা সংগঠনে যোগ দেয়ার জরুরিত্ব অনুভব করেছিলাম আমি। রুডি ডয়েশকে ছিলেন ওখানে, উলরিখ মেইনহফকে নিয়ে ভুল্ফ ভাইয়েরা ছিলেন নেপথ্যে, আর তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ জিআই মিছিল করে মঞ্চে এসে স্লোগান দিচ্ছিল: ‘ভিয়েতনামে যাব না আমি, কারণ আমি ভিয়েতনামেরই। না, কিছুতেই যাব না।’
আমার মনে হয়েছিল ব্রিটেনে এসডির মতো কিছুই নেই, ভিয়েতনাম ও অভিবাসনে নিষেধাজ্ঞার প্রশ্নে আমি শ্রমিক দল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, কোথাও যোগ দেয়ার দরকার ছিল। বার্লিনে প্লাটফর্মে আমি যে মানুষটির পাশে বসেছিলাম, তিনি হলেন আর্নেস্ট ম্যান্ডেল। তিনি পরে বলেছিলেন, ‘ব্রিটেনে কমরেডদের একটা ছোট দল আছে, তোমার ভালো লাগতে পারে। ওরা খুবই আন্তর্জাতিকতাবাদী এবং ভিয়েতনামই আমাদের অগ্রাধিকার।’ এমনই কয়েকজন কমরেডের সঙ্গে দেখা করে আমি বলেছিলাম, ‘আমি মোটেই বিচলিত নই, কারণ তোমরা যা লিখছ, বিশেষ করে ও যা লিখছে, আমার ভালো লাগে কিন্তু তোমাদের সদস্য সংখ্যা কজন?’ পরস্পরের দিকে তাকিয়েছে ওরা, যেন বলতে চায়: ‘ওকে কি সত্যি কথাটা বলব?’ তারপর ওরা বলল: ‘নটিংহ্যামে চল্লিশের মতো আর লন্ডনে তিরিশ।’ আমি বললাম: ‘চমত্কার!’ কিন্তু ব্যাপারটা এমনই ছিল— এভাবেই ঘটে থাকে সবকিছু। ইন্টারন্যাশনাল মার্ক্সিস্ট গ্রুপে নাম লেখাই আমি।
ব্রিটেনে অন্য ট্রটস্কিপন্থী গ্রুপগুলো আমাকে হতবাক করে দিয়েছিল, কারণ ওরা কখনই চীন বা ভিয়েতনামে বা কিউবায় অথবা অন্য কোথাও সমাজ বিপ্লব ঘটেছে বলে মেনে নেয়নি। মাত্র ১৯১৭ সাল ছিল সেটা, এশিয়া থেকে আসা কারো কাছে বিশাল ধাক্কা ছিল, এক সংকীর্ণ মন ইউরোসেন্ট্রিক প্রাদেশিকতাবাদ তুলে ধরেছিল। ১৯৬২ বা ১৯৬৩ সালে মা-বাবার কোনো এক বিদেশ সফর শেষে সেন্ট্রাল লন্ডনের কলেটসে কেনা একটা ম্যাগাজিন নিয়ে এসেছিলেন ওরা। ওটার নাম ছিল নিউ লেফট রিভিউ। ওই সংখ্যায় ইতালিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে চলমান বিতর্কের ওপর দীর্ঘ প্রতিবেদন ছিল— স্তালিনবাদ, স্তালিনবাদবিরোধী, অ-স্তালিনবাদ নিয়ে— ওটা পড়ি আমি, আমাদের গোটা দল পুরো লাহোরে ছড়িয়ে দেয় এবং এভাবেই শুরু হয়েছিল। আরো পড়ার জন্য মুখিয়ে ছিলাম আমি। ডয়েশ্চার, ট্রটস্কির মাই লাইফ এবং বিশেষ করে দ্য স্ট্রাগল অ্যাগেইনস্ট ফ্যাসিজম ইন জার্মানি পড়ার পর মনে হলো, আইএমজিই আমার যোগ দেয়ার মতো দল, কারণ আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্ধ সমর্থক ছিলাম না। মা-বাবার সঙ্গে লক্ষণীয় পার্থক্য এনে দিয়েছিল এটা, সন্দেহ নেই বিব্রত হয়েছিলেন ওরা, কারণ আমৃত্যু সোভিয়েতপন্থী ছিলেন দুজনই। ১৯৯০ দশকে ডেনমার্কে এক শান্তি সম্মেলনে জেরেমি করবিন ওদের সঙ্গে দেখা করার সময় আমার সম্পর্কে ওদের ধারণা জানতে চেয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘ওকে নিয়ে আমরা গর্বিত,’ আমাকে সেটা দারুণ খুশি করেছিল। কারণ তিনি কখনই আমার সম্পর্কে এ ধরনের কিছু বলেননি...
ব্ল্যাক ডোয়ার্ফের ধারণা এসেছিল আমার লিটারেরি এজেন্ট ও বন্ধু ক্লাইভ গুডউইনের কাছ থেকে। তারই বাড়িতে আয়োজিত এক সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘একটা পত্রিকা বের করলে কেমন হয়, বন্ধুরা?’ তা-ই স্থির করলাম আমরা, ক্রিস্টোফার লোগকে সম্ভাব্য নামের খোঁজে এখনকার ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে পাঠানো হলো। আমি বললাম, “প্রচলিত বামপন্থী নামের ঘোরতর বিরোধী আমি— ‘শ্রমিকের এই’ বা ‘সমাজতন্ত্রী ওই’। রাজনীতিতে যারা নামতে যাচ্ছেন, তারা এ ধরনের নামে আগ্রহী হবেন না। আমাদের ভিন্ন স্টাইলও থাকতে হবে।” ক্রিস্টোফার ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে গিয়ে সেই উনিশ শতক থেকে শুরু করে সব বামপন্থী পত্রিকা ঘেঁটে পরের সপ্তাহে একটা লিস্ট হাতে দারুণ উত্তেজিত হয়ে ফিরে এলেন। তিনি বললেন, ‘কিন্তু ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ-ই আমার পছন্দ। ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ কেন বলা হচ্ছে জানো?’ ‘না।’ বলে চললেন তিনি: ‘টমাস উলার নামে চরম বিপ্লবী এক সাংবাদিকের খনি শ্রমিকদের জন্য পত্রিকা এটা: কয়েক প্রজন্ম ধরে এসব খনিতে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা খাটো হয়ে গেছে, সন্ধ্যায় ওরা খনি থেকে বেরিয়ে আসার সময় কালিঝুলিতে মুখ ভরে থাকত। তাই টম উলার কাগজের নাম ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ ভোটাভুটি করতে হলো আমাদের, সবাই পক্ষে ছিল, এটা বিরল ঘটনা— আমার মনে হয়, এমনকি এসব সভার সবচেয়ে রুষ্ট মানুষ ডেভিড মার্সারও পক্ষে ছিলেন।
এভাবেই ঘটেছিল ব্যাপারটা। ব্রডশিটের জন্য আমরা চাঁদা তুলেছিলাম। ১৯৬৮ সালের মে ডে উপলক্ষে প্রথম ব্রডশিট বের হয়। সাহায্য করার জন্য লোকজনের ঢল নেমেছিল। পেছনের দিকে তাকিয়ে যখন ভাবি, খুবই অস্বাভাবিক ছিল সেটা: প্রথমত. আাামাদের সঙ্গে কবিরা ছিলেন, ডেভিড মার্সার ছিলেন, সত্যিই অনেক সাহায্য করেছেন তিনি। নেপথ্যে বিবিসির জন্য কাজ করা মানুষজন ছিলেন, যাদের প্রকাশ্যে আসার জো ছিল না। কিন্তু এখন আমরা ওদের নাম উল্লেখ করতে পারি— কেন ট্রড, কেন লোখ, টনি গার্নেট, জন ম্যাকগ্রাথ। আপনি জানেন, সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে ক্লাইভ, ফ্রেড হ্যালিডে ছিলেন, পরে শীলা রোবোথ্যাম জড়িয়ে পড়েন এবং বিবিসির স্ক্রিপ্ট এডিটর রজার স্মিথ। কিছুটা কাহিল ও সৃজনশীলতার ঘাটতি নিয়েই বেরিয়েছিল প্রথম সংখ্যা। সাধারণভাবে প্রচ্ছদ জঘন্য হয়েছে বলে ভাবা হচ্ছিল। আমরা ওটাকে বাতিল করার জন্য ভোটাভুটির ব্যবস্থা করি এবং ডিএএন (পরবর্তীকালের এলআরবি) জোন্স ওয়াকআউট করেন। সম্পাদক হারাই আমরা। আমাকে দায়িত্ব নিতে বলা হয়, ডিজাইনার রবিন ফিয়র আমার ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দেয়ায় আমি লিখি, আমরা লড়ব এবং জিতব: প্যারিস, লন্ডন, রোম, বার্লিন। ভোটের ফল সর্বসম্মত ছিল। আমরা ইউটোপিয়ার পক্ষে ছিলাম। টাকা তোলার জন্য আমাদের হিসাবে বেশ ধনী লোকদের নাগাল পাওয়ার দরকার ছিল— ডেভিড হকনি, রন কিতাজ, ফেলিক্স টেপোলস্কি এবং অন্য চিত্রশিল্পীরা, যারা বলেছেন, ‘বেশ...আমাদের হাতে টাকা-পয়সা বেশি নেই। তবে ধরো, একটা ছবি নিয়ে যাও।’ ওই ছবিগুলো রেখে দিলে এখন আমরা ছয়টি ম্যাগাজিন চালু করতে পারতাম। কিন্তু নিলাম ডাকা হয়েছিল, আর ওই টাকা ব্ল্যাক ডোয়ার্ফের পেছনে খরচ করা হয়। বহু লোকই এর স্বাদ পছন্দ করেছিল।
পত্রিকা বেরোনোর পর অনিয়িমতভাবে প্রকাশিত হতে থাকলে সপ্তাহে একবার পত্রিকা অফিসে যাতায়াতকারী একজন আমার প্রিয় অর্থ জোগানদার ছিলেন— খুব লম্বা, কাঁধ অবধি নেমে আসা ঘন বাদামি চুল, ধূলিমলিন নীল ওভারঅলস পরতেন তিনি। সাধারণত ৫ টাকার নোটের তাড়া বের করতেন, সেই আমলে এগুলো ছিল স্বর্ণের গুঁড়ো, আমাদের জন্য রেখে যেতেন। মোট টাকার পরিমাণ ঠিক মনে নেই। তবে বেশ বড় ছিল সেটা: ১০০ পাউন্ড, ৫০ পাউন্ড, ভাগ্য ভালো থাকলে ২০০ পাউন্ড, অনেক সময় তার চেয়েও বেশি। বেশ কয়েক সপ্তাহ এভাবে চলার পর সহকর্মীরা বললেন, ‘তারিক, ওকে জিজ্ঞেস করতেই হবে তোমার’— কারণ আমার ডেস্কে এসেই টাকা রাখতেন তিনি, হাত মেলাতেন, তারপর আমাদের দিকে পেছন ফিরে চলে যেতেন। একদিন আমি বললাম, ‘দেখুন, এখানে সবাই কৌতূহলী— মানে, বলতে না চাইলে দরকার নেই, কিন্তু... কেন এ কাজ করছেন আপনি?’ পরে দেখা গেল, তিনি পোর্টোবলো রোডের একজন স্টল মালিক, বেশ ভালো ব্যবসা করছিলেন। সেজন্যই বরাবর নগদ টাকা দিতেন তিনি, চেক নয়। তিনি বললেন, ‘কেন এ কাজ করছি?’ একটু বিরতি। ‘করছি তার কারণ পুঁজিবাদ সত্যিই প্রাণহীন, বুঝলে।’ এমন সত্যি ভাষণের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারে কে: ‘বেশ, এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর... ধন্যবাদ।’ তার আসা অব্যাহত ছিল। কখনই নিজের নাম বলেননি তিনি।
অন্যজন ছিলেন ফিয়না আরমার-ব্রাউন। ওয়েলসে থাকতেন তিনি। তার বিশ্বাস ছিল, শ্রমিক দলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ওয়েলস ও উত্তর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অংশে ছোট সন্ত্রাসী দল— এ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি কিন্তু অর্থ তা-ই ছিল— গঠন করা উচিত আমাদের। তার এ কথা নিয়ে হেসেছিলাম আমরা। কিন্তু তিনি আবার মাঝে মাঝে ১০০ পাউন্ড বা তার বেশি অংকের চেক পাঠাতেন। মনে হয় উত্তরাধিকার সূত্রে টাকা-পয়সা পেয়েছিলেন। একবার অফিসে এলে আমাদের এ টাকা দেয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতি— এদিককার সেরা পত্রিকা এটা— তবে একটা ব্যক্তিগত ব্যাপারও আছে।’
‘কি সেটা?’ তিনি বললেন: ‘একবার ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় একটা ক্লিফের কিনারায় দাঁড়িয়েছিলাম—খুবই বিমর্ষ অবস্থায়, কারণ জানতে চেয়ো না—তখন চামড়ার জ্যাকেট গায়ে এক লোক মোটর বাইক চালিয়ে হাজির হলো, থেমে কঠোর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল: “নিশ্চয়ই আত্মহত্যার কথা ভাবছ না?” আমি হতবাক হয়ে বললাম: “বেশ, ঠিক তাই করতে যাচ্ছি আমি।” লোকটা তখন বলল, “বোকামী করো না! এসো, আমার মোটর বাইকের পেছনে উঠে বসো—আমার কাছে বাড়তি হেলমেট নেই—তোমাকে সবচেয়ে কাছের শহরে নিয়ে যবো, ওখানে বসে তোমার মাথা থেকে ফালতু চিন্তা বিদায় করব।” ওই লোকটা ছিল ক্রিস্টোফার লোগ। “তো,” বললেন মহিলা, “আমি আমার জীবনের জন্যে ক্রিস্টোফার লোগের কাছে ঋণী, যখন দেখলাম তোমাদের পত্রিকার একজন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সে...” ক্রিস্টোফারকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল: ‘কাজটা করেছি বলে খোদাকে ধন্যবাদ।’
এবার আমরা সর্বোচ্চ বিন্দু হিসাবে ১৯৬৮ সালে ফিরে যাবো, কিন্তু কি ঘটতে যাচ্ছে, আপনি যেমন ধারণা করেছিলেন সেই বিচারে কেমন লাগছিল এবং আপনি কি করছেন বলে জড়িয়ে গেছেন ভাবছিলেন? আমি বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী।
ভিয়েতনাম বিক্ষোভ যে বিপ্লবের মতো কিছু হয়ে যাবে সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি—এমনটা ঘটবে, এমন কোনও চিন্তাই ছিল না আমার। হয়তো গোটা ইউরোপের পক্ষে বৃহত্তম ভিয়েতনাম বিক্ষোভের পুরোধা ছিলাম আমরা—জার্মানরা আমাদের এবং ফরাসীদের কাছ থেকেই সবক নিয়েছিল—কিন্তু ১৯৬৮-৬৯ সালে বার্লিনে ফ্রান্সের পুঁজিবাদ বা মানবিক চেহারার সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘটের মতো কিছুই ঘটেনি। চেকোস্লোভাকিয়ায় সংস্কারবাদী কমিউনিস্ট কিংবা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের দাবিদার ইতালির শ্রমিকদের হাতে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। ১৯৬৮-৬৯ সালে বার্লিনে প্রচুর রাজনীতি ছিল, রাজনীতি ও সংস্কৃতির যথেষ্ট মিথষ্ক্রিয়া ছিল—প্রধানত দ্য স্টোনস, তবে পরে বীটলস এবং আরও অনেক গায়ক আর ব্যান্ড। রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতর এই সম্পর্ক ছিল আমাদের সাফল্যের সর্বোচ্চ বিন্দু-এবং অবশ্যই ভিয়েতনামীদের সাহায্য করার প্রয়াস। ১৯৭০-র দশকের আগে খনি শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট দেখা দেয়নি।
তখনই একটা কিছু ঘটতে পারে বলে চিন্তা জেগেছিল। খোদ খনি শ্রমিকদের ধর্মঘট নয়, বরং শাসকদের বেসামাল করে দেওয়া অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নের সাথে এদের সংহতি—টিঅ্যান্ডজি রাস্তাঘাট এবং পাহাড়ী গণপিকেটের আয়োজন করছিল। আমার এক বন্ধু রবিন ব্ল্যাকবার্ন বিয়ে করতে যাচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে ছোটখোটা একটা ভোজের আয়োজন করা হয়। খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটই ছিল মূল আলোচনার বিষয়। এমন সময় মেরি ফার্নেস নামে উচ্চবিত্ত পরিবারের এক তরুণী হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির হলেন। ‘দেরির জন্যে দুঃখিত,’ এক এক করে আমাদের জরিপ করে বললেন তিনি। পেরি অ্যান্ডাসন আর ব্ল্যাক ডোয়ার্ফের লোকদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিয়ে করে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় রবিনকে ভর্ত্সনা করলেন।
‘গতকাল আমি কোথায় ছিলাম জানলে আমাকে খানিকটা হতবিহ্বল মনে হওয়ার কারণ বুঝতে পারবেন,’ বললেন তিনি।
‘আমাদের বলুন, মেরি।’ তখন তিনি বললেন: ‘আমি কলিন টেনান্টের বিশাল বাড়িতে আয়োজিত একটা ডিনার পার্টিতে ছিলাম। অনুষ্ঠানর জাঁকজমক আমাকে অবাক করেনি। তবে একটু বেশিই জাঁকাল ছিল, এক বাটলার কে আসছে ঘোষণা দিচ্ছিল। কামরায় টেন্যান্ট, আরও কয়েকজন অতিথি আর হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ছিলেন। মেজবানের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বললাম: “কার জন্যে অপেক্ষা করছি আমরা?”’
“রানী আর প্রিন্স ফিলিপ।”
‘আমি ঢোক গিললাম। তারপর ওরা এসে ডিনারে বসলেন। আপনারা বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু খুবই পুলকিত হবেন—খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের আলোচনায়গোটা সন্ধ্যাটা কেটে গেল। ফিলিপ মুখ খিস্তি করছিলেন, স্কারগিলের মু্ল ফেলে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু রানীই অবাক করেছেন আমাকে: “আমার মনে হয় পরিস্থিতি সত্যি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এটাই শেষ,” বললেন তিনি। “শ্রমিকরা বেশি ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, ওরাই দেশ চালাচ্ছে—দেশকে জিম্মি করে রেখেছে ওরা।” রাজ্যের ট্যাবলয়েড বুলি নতুন করে উচ্চারিত হলো। আতঙ্কের একটা আবহ ছিল সেখানে।’ ব্ল্যাকবার্নের বিয়ের অতিথিরা বেশ আমোদিত হযেছিলেন। আমরা জানতাম বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন রকম—কিন্তু বাদ দিন সেকথা। আর হ্যাঁ, বেশ প্রীতিকর ছিল সেটা। কেউ একজন বাদ সাধে (মনে হয় পেরি ছিল): ‘ঠিক ভিক্টোরিয়ার মতো। ১৮৪৮ সাল নাগাদ ফসিল হয়ে গেছে।’
খেই ধরেছেন মেরি: ‘এটা থামাতে—যদিও তাতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছে তার—ম্যাকমিলান সরাসরি রানীর সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন: “ম্যা’ম, আমরা ইংল্যান্ড নিয়ে কথা বলছি, এখানে পেন্ডুলাম দোল খায়, কিন্তু কখনওই পুরোপুরি দোল খায় না—আপনি যখন পেন্ডুলামকে বামে দোল খেতে দেখছেন, আমি কিন্তু এরই মধ্যে ডানে কিঞ্চিত নড়তে দেখেছি—তো আতঙ্কিত হবেন না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”’
পেন্ডুলাম ঠিকই ১৬৪৯ সালে ব্যাঙ্কোয়েট হলের বাইরে পুরোপুরি দোল খেয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পরে আমরা থ্যাচারকে পাওয়ার পর আর কখনওই নয়।
আপনার মতে ১৯৬৫-৭৫ এর আশা বরবাদ হয়ে গেল কেন?
আমি সবসময়ই ভেবেছি, ব্রিটেনে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনে শ্রমিক দলের আধিপত্য এবং সংসদে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এর সামগ্রিক একচেটিয়া অধিকারই আসলে খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের আগে এর বিস্তার ঠেকিয়ে রেখেছে—এবং এমনকি এখানেও রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় থাকলে বিশাল ধর্মঘট হয়ে থাকে। এডওয়ার্ড হীথ খনিশ্রমিকদের সাথে নিয়ে সভায় আসছেন আর ইউনিয়নের ন্যাশনাল সেক্রটারি লরেন্স ডেলি কনফারেন্স টেবিলে পা তুলে তার চেয়ারে বসে আছেন। হীথ ভেতরে ঢুকলে অন্য খনিশ্রমিক নেতৃবৃন্দ উঠে দাঁড়ালেন। ডেলি বসে থেকেই হীথের দিকে তাকিয়ে স্বাগত জানালেন তাকে: ‘হ্যালো, সেইলর!’
রাজনৈতিক দিক থেকে ডেলি ব্যতিক্রম ছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত, নিউ লেফটের অংশ, এডোয়ার্ড টম্পসন, ডয়েশ্চার ইত্যাদি পড়েছেন। উত্তর ভিয়েতনামে আমার সাথে ছিলেন। হো চি মিনের জন্যে সেরা মল্টের একটা বোতল ছিল তার কাছে, কিন্তু কোনওভাবে নম ফেনে ওটা শেষ কো ফেলি আমরা। স্কারগিলের একই চেহারা ছিল। খুবই আত্মবিশ্বাসী শ্রমিক শ্রেণী ছিল সেটা, এবং তখন থেকে নব্য উদারপন্থী ব্রিটেনে প্রাধান্য বিস্তারকারী থ্যাচার আরোপিত ওদের ভাষায় সংস্কারে—আমি যাকে বলি অবনমন— অরগ্রিভে এবং অন্যান্য বিভিন্ন সংঘাতে বিচলিত হয়নি। ।
কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে...
আমরা ১৯৬০-এর দশককে ১৯৬৫ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে শেষ হওয়া সময়কে দশক হিসাবে দেখলে একমাত্র বিজয় ছিল পাকিস্তান। ছাত্রদের নেতৃত্বে শ্রমিক এবং কোথাও কোথাও কৃষক এবং কার্যত সকল শ্রেণীর পেশাজীবী, সরকারী কর্মচারী আর আইনবিদ—এবং আমি বলব পতিতারাসহ—দের অংশগ্রহণে তিনমাস ব্যাপী এক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। রাস্তায় নেমে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং স্বৈরাচারের অবসানের লক্ষ্যে মিছিল করেছে। জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল ‘পুঁজিপতি আর জমিনদাররা হট যাও। পাকিস্তান আমাদের।’ ১৯৬৮ সালের ৭ই নভেম্বর শুরু হয়ে ১৯৬৯ সালের মার্চে শেষ হয়েছিল সেটা। স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং প্রথমবারের মতো অবাধ নির্বাচনের অনুমতি দেওয়া হয়।
সেটা ছিল একটা বিজয়। আরেকটা কাছাকাছি বিজয় ছিল পর্তুগাল—সম্ভবত সবচেয়ে অগ্রসর ইউরোপিয় বিদ্রোহ। পর্তুগাল ক্ষুদ্রতম উপনিবেশিক শক্তি ছিল, তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং উপনিবেশগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকে পর্তুগীজ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গেরিলারা উৎসাহের সাথে রেডিও শুনছিল এবং ভিয়েতনাম থেকে আসা খবরে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের খে সানহে বিজয় এবং ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে ভিয়েত-কঙদের মার্কিন দূতাবাস দখল দেখছিল। এই ঘটনা সৈনিকদের বিপ্লবী করে তোলায় দারুণ প্রভাব রাখে, এখন স্রেফ শত্রুপক্ষ কিভাবে চিন্তা করছে বোঝার জন্যে ওরা মাও, চে গুয়েভারা এবং হো চি মিনের রচনা পড়ছিল এবং নিজেরাই সংক্রমিত হয়ে পড়ছিল। এবং অবশ্যই গেরিলারা বৈশ্বিক বামপন্থীদের সমর্থন পাচ্ছিল, চীনা এবং রাশিয়ানদের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছিল।
আফ্রিকায় পরাজয় পর্তুগীজ সমাজের মধ্যস্তর এবং সেই সাথে দেশে তলব করা নিয়মিত সৈনি্কদের বিপ্লবী করে তুলেছিল —উপনিবেশে রেখে দেওয়া হয়নি তাদরে। ধর্মঘট শুরু হয়ে গিয়েছিল, দেশের জরাগ্রস্ত এবং বোনাপার্টপন্থী স্বৈরাচারের পতনের দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিনা সহিংসতায় সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে এবং আমাদের মনে হয়েছিল পরিস্থিতি বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সমর্থিত মারিও সোরেস সবচেয়ে জ্বলাময়ী ভাষণ দিচ্ছিলেন—আপনি জানেন, অনেকটা দেসমৌলিনস বা ডান্টনের মতো। এই বর্ণহীন আমলা, যাকে আমরা কখনও যোগ্য ভাবিনি, লিসবনে ১৫০,০০০ লোকের এক সভায় ভাষণ দেবেন, প্রধানত পর্তুগীজ বিপ্লবের পক্ষের কৃষক, শ্রমিক এবং ছাত্র—ওরা সবাই একে ‘বিপ্লব’ বলছিল। সোরেস শ্রমিকদের প্রশ্ন করলেন: ‘আমরা কি সমাজতন্ত্র চাই?’ ‘হ্যাঁ!’ ‘আমরা কি ভূমি সংস্কার চাই?’ ‘হ্যাঁ!’ ‘আমরা কি কলকারখানা আর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় মালিকানা চাই?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ!” ‘আর আমরা কি গণতন্ত্র চাই?’ ‘হ্যাঁ!’
কিন্তু চরম বাম প্রলেতারিয়েতের গণতন্ত্রের আহ্বান জানানোর সময় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন উপেক্ষা করে গেল। অন্য কথায়, তিনি যেন দেশকে বলছিলেন একটা স্বৈরাচার আরেক স্বৈরাচারের জায়গা দখল করতে যাচ্ছে। মানুষ নির্বোধ ছিল না; বহু পর্তুগীজ শ্রমিক ফ্রান্স সফর করেছেন, তারা দুনিয়ায় কি ঘটছে জানতেন, এবং জানতেন পূর্ব ইউরোপ কেমন ছিল। তারা এমন এমন একটা অবস্থা চাননি যেখানে গণমাধ্যম একই সুরে কথা বলে; সেই অভিজ্ঞতা তাদের ছিল এবং তারা ভিন্ন কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। সোরেস এটা বুঝতে পেরেছিলেন, এবং অত্যন্ত সুললিত এবং সুসংগঠিত ভাষণের কল্যাণে জিতে যান। তো অত্যন্ত শক্তিশালী বিপ্লবী ঝোঁক এক ধরনের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুবাদে পরাস্ত হলো। অবশ্যই প্রচুর মানুষ তখন কি ঘটেছে বুঝতে পারলেও কিছুই করার ছিল না।
এবং আমেরিকায় দক্ষিণে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পতন ঘটানো সিভিল রাইটস আন্দোলন ঘটেছিল: ভিয়েতনাম যুদ্ধ বাধানো অসম্ভব করে তুলেছিলেন আপনারা; লিন্ডন জনসনকে আবার নির্বাচনে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিলেন।
অন্য কোনও সাম্রাজ্যবাদী দেশে ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের জুড়ি নেই। মার্কিন ইতিহাসে মতবিরোধের সর্বোচ্চ বিন্দু ছিল সেটা, যুদ্ধাবসানে সাহায্য করেছিল। ডান-বাম, উদার এবং প্রতিক্রিয়াশীল নির্বিশেষে গোটা দেশ ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় মেতেছিল। ১৯৬৮ সালের জানুুয়ারিতে সায়গন এবং বেশির ভাগ প্রাদেশিক শহরসহ এক শো শহরে ভিয়েতনামীজ লিবারেশন আর্মির সমন্বিত টেট আক্রমণ নাটকীয় ও ফলপ্রসূ ছিল। আমেরিকানদের উচিত ছিল অবিলম্বে শান্তির প্রয়াস নেওয়া। কিন্তু উল্টো আরও সাত বছর যুদ্ধ চালিয়ে গেছে ওরা, মানুষ হত্যা আর বিকৃত করার কাজে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে, পরিবেশ ধ্বংসে এজেন্ট অরেঞ্জ প্রয়োগ করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় রোজই এই বর্বরতা দেখা যাচ্ছিল। হররোজ লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল, গোটা যুক্তরাষ্টে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, জয় লাভ করছিল ভিয়েতনামীরা—চরম বাস্তবতা ছিল ওদের পরাস্ত করতে পারছিল না ওরা। প্রত্যেক বছর জেনারেল ওয়েস্টমোরল্যান্ড বড়দিন উপলক্ষ্যে ভাষণ দিতেন: ‘আগামী বছরই ছেলেরা ঘরে ফিরে আসবে।’ বেশ, ছেলেরা ঘরে ফিরে আসছিল বলে মনে হয়নি, কিন্তু পঙ্গু ও বিকারগ্রস্ত লোকদেরই ফিরে আসতে দেখেছে ওরা এবং এক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে নজীর বিহীন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে সেটা। সম্ভবত ১৯৭১ সালে পেন্টাগনের বাইরে মিছিলের ঘটনাটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, মূলত জিআই এবং যুদ্ধবিরোধী প্রবীন সৈনিকরা এর আয়োজন করেছিল। ওই মিছিলে ক্রাচে ভর দিয়ে, হুইল চেয়ারে করে উর্দি পরা সত্তর হাজার থেকে এক লাখ সাবেক জিআই পেন্টাগনের বাইরে মিছিল করে শ্লোগান দিচ্ছিল: ‘হো, হো, হো চি মিন, এলএলএফ জিতে যাবে!’ এই ঘটনা পেন্টাগনকে ৯/১১-এর আল-কায়েদা বোমা বর্ষণের চেয়েও বেশি আহত করেছিল।
ওই ঘটনা কেন অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশ দুটিকে একটি কার্যকর বাম বিকল্পের দিকে নিয়ে গেল না?
অন্ততপক্ষে বার্লিনে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক কাঠামো এবং ফলপ্রসূভাবে সংসদীয় কণ্ঠস্বর হিসাবে ট্রেড ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত একটা রাজনৈতিক দল এর কারণ। এটা ভাঙার জন্যে খুবই বিরাট কিছু প্রয়োজন হবে আপনার, যেমন ধরুন, একজন শ্রমিক দলীয় প্রধানমন্ত্রীর ধর্মঘটীদের উপর গুলি বর্ষণের নির্দেশ দেওয়ার মতো বিরাট মাত্রার কিছু—এই ধরনের ভীতিকর কিছু। বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলন, কিংবা যেভাবেই হোক এর সিংহভাগ, বরাবরই সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল—কখনওই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশের বিরোধিতা করেনি। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টির মতো ক্ষুদে সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রুপ বা কমিউনিস্ট পার্টি অথবা খোদ ক্ষুদে কমিউনিস্ট পার্টির মতো ক্ষুদে ট্রেড ইউনিয়ন বাদে কখনওই স্রাম্যাজবাদ বিরোধী ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। কমিউনিস্ট পার্টি কখনওই ব্রিটিশ রাজনীতিতে বিরাট শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি, যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেনেসার কল্যাণে ফ্রান্সে এবং ইতালিতে পেরেছিল ।
আপনি কি মনে করেন বাম, চরম বাম, যাদের সাথে আপনি জড়িত ছিলেন, ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারত?
আমি মনে করি গোটা চরম বাম যদি একটা দল গঠন করত...কিন্তু কি করত তারা? প্রথমত, পরস্পরের সাথে ঠোকাঠুকি করে খুনখারাবি করত, কিংবা রাজনৈতিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। এবং দ্বিতীয়ত, ব্রিটেনের নির্বাচন কাঠামো—দ্য ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থা—তৃতীয় একটি দল গঠন কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে। লিবারেলদের উত্থান-পতন, উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে আমরা যেমন লক্ষ করেছি; কিংবা গ্রিনরা যেখানে এক মিলিয়ন ভোট পেয়ে মাত্র একজন এমপি পেয়েছিল কিংবা আরও নাটকীয় উদাহরণে, এখন সানন্দে মরতে বসা ইউকিপ কয়েক মিলিয়ন ভোট পেয়ে মাত্র একজন এমপি পেয়েছিল। এতে করে নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে গেছে। শ্রমিক শ্রেণীর উপর শ্রমিক দলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ টোরিজদের হাতে এবং পরে অন্যান্য ছোট ছোট কারণে কিছু মাত্রায় কমেছিল—কিংবা স্রেফ পরে ব্লেয়ার বছরগুলোতে অনুপস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু কখনওই পুরোপুরি ভাঙেনি, এবং অবশ্যই, এখন বদলা নেওয়ার ইচ্ছা নিয়ে ফিরে এসেছে, আমি অবশ্য করবিনের কারণে তাতে কিছু মনে করি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তৃতীয় কোনও দল অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছে। ভূগোলের অনেকখানি গুরুত্ব রয়েছে এবং বামদের প্রথমেই শহর আর রাজ্যগুলোকে টার্গেট করার জন্যে পরামর্শ দিয়েছি আমি। দ্য ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অভ আমেরিকার এখন তিরিশ হাজার সদস্য রয়েছে। ছোটখাটো সূচনা?
১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে বামরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিষ্কার পিছু হটেছিল—থ্যাচারবাদের কারণে জাতীয়ভাবে এবং কমিউনিজমের পতনের কারেণে আন্তর্জাতিকভাবে—আপনি বলতে পারেন এসব সত্ত্বেও বামরা বিভিন্ন বিজয় অর্জন করছিল, কিন্তু সেসব ছিল সাংস্কৃতিক বিষয়আশয়: সমকামী অধিকার, নারীদের অধিকার আদায়, কৃষ্ণাঙ্গদেও অধিকার আদায়, সমাজের সাধারণ অর্থনৈতিক উদারিকরণ। আপনি কি মনে করেন যে বামরা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিল?
১৯৯০-র দশকে এখানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় কমিউনিজমের ভাগ্যে যেটা ঘটেছে—সেটা হলো চরম বামরা বৈশ্বিক ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর কমিউনিজমের পতনের প্রভাবকে গুরুতরভাবে খাটো করে দেখেছে, যারা বিশেষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পছন্দ না করলেও এর অস্তিত্বের কারণে খুশি ছিল। এর উপস্থিতিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটা প্রাচীর ছিল। দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়ার বিরাট একটা অংশ, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপেও অতিমেধাবী মানুষগুলো বুঝতে পেরেছিলেন যে এই ব্যবস্থার সামগ্রিক পতন বামদের পক্ষে এক বিরাট মাত্রার পরাজয়। আপনি সোভিয়েত ইউনিয়ন পছন্দ করুন বা না করুন। চরম বামদের কেউ কেউ ভেবেছেন, ‘আহ...এবার আমাদের পালা!’ তারা ভুলে গেছেন যে, জীবনভর তারা বিরাট কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্রেফ পাদটীকা ছিলেন, যা ছাড়া তাদের অস্তিত্বই সম্ভব ছিল না। এর ফলে কেউ কেউ রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ খুইয়ে আচরণের দিক থেকে, কাজের দিক থেকে আরও বেশি করে রক্ষণশীল হয়ে গেছেন, কারণ কি ঘটেছে আদৌ হূদয়ঙ্গম করতে পারেননি তারা।
বৃহত্তর বাম পক্ষের লোকজন বলেছেন, ‘এটা একটা পরাজয়, আমরা হেরে গেছি,’ কিন্তু তারা পরিচয়ের রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছেন—মনে রাখতে হবে, এটা্ও কিন্তু ১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকেরই পরিণতি। আমি বলতে চাইছি, সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্টই তৃতীয় বিশ্বে সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত নারী আন্দোলনকে কেন নারী অধিকার আন্দোলন বলা হলো? সমকামী মুক্তি আন্দোলন, কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলন, দ্য ব্ল্যাক প্যান্থারস—এসবই ১৯৬০-র দশকের শেষে এবং ১৯৭০-র দশকের প্রধান অংশে গড়ে উঠেছিল এবং জোরাল প্রভাব রেখে গেছে। আমরা যেমন জানি, সমস্যাগুলো মিটে যায়নি; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্য ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন, আফ্রিকান-আমেরিকাদের কারারুদ্ধ করার ক্রমবর্ধমান হার—ভয়াবহ। সুতরাং, এমনিক নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নেও, বিশেষ করে বর্ণবাদের ক্ষেত্রে আমরা সবকিছু জয় করিনি।
শ্রমিক আন্দোলনে প্রচলিত অর্থে যেটা করার কথা সেটা হলো দরিদ্র এবং শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা, কিন্তু সেটা থেমে গেছে, এবং যাওয়ার মতো কোনও জায়গা নেই?
প্রায়ই যে জিনিসটা এড়িয়ে যাওয়া হয় সেটা হলো ১৯৯১ সালে কেবল রাষ্ট্রীয় কমিউনিজমেরই পতন ঘটেনি: এর সাথে প্রচলিত সামাজিক গণতন্ত্রেরও পতন ঘটেছে। বিংশ শতাব্দের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে সামাজিক গণতন্ত্রের সামগ্রিক তত্পরতা ছিল পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে একটা বিকল্পের ব্যবস্থা করা যা কিছু সংস্কারের পক্ষে লড়াই করে বিপ্লব, কমিউনিজম, আপনি একে যাই বলেন তার বিরুদ্ধে প্রাচীরের কাজ করবে। পুরোনো শত্রু বিদায় নেওয়ায় পুঁজি এবং এর নেতারা আর ওই পথ অনুসরণ করার কোনও দরকার মনে করেননি। বরং টার্বো-চার্জড পুঁজিবাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন, পায়ের নিচে কে পিষ্ট হয়েছে তাতে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাননি। এবং সামাজিক গণতন্ত্র এখানে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। ফ্রান্সে বেসরকারীকরণের সিংহভাগই সমাজবাদী সরকারের হাতে ঘটেছে: মিতেরাঁ এবং জোসপিন। ব্লেয়ার, ম্যান্ডেলসন, ব্রাউন নব্যউদারবাদের গোঁড়া সমর্থক ছিলেন, লোকজনের টাকা বানানো দেখে বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন। ব্রিটেনে ধনী গরীবের ব্যবধান কামিয়ে আনা শেষ গণতান্ত্রিক সরকার, এব্যাপারে কেউ যদি অতি শীতল রক্তেরও হয়ে থাকেন, ছিল উইলসন সরকার। সামজতন্ত্র পতন পরবর্তী সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলো সেন্টার রাইট পার্টিগুলো থেকে ভিন্ন ছিল না; এবং ইউরোপের বিরাট অংশে এবং বিশ্বের অন্যান্য এলাকায়ও যা ঘটেছে—ভারত এর একটি উদাহরণ—একে আমি এক্সট্রিম সেন্টার বলে বর্ণনা করেছি। সেন্টার লেফট বা সেন্টার-রাইট, আপনি কোন দলের তাতে কিছু এসে যায় না: মূলত, আপনি কিছু পরিমাণ নব্যউদার অর্থনৈতিক নীতিরই পক্ষে; আপনি মোটামুটিভাবে বিশ্বব্যাপী আমেরিকানদের যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন; আপনি ন্যটোর গোড়া সমর্থক। ফলে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, দুটো ব্যাপার ঘটেছে তাতে: একটি হলো বর্জনের সংখ্যা বৃদ্ধি— সামাজিক গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী সমর্থকবহু মানুষ ভোট দান থেকে পুরোপুরি বিরত থেকেছেন। ব্রিটেনের সামপ্রতিককালের নির্বাচন বাদে, সংখ্যাগুলো রীতিমতো বিস্ময়কর। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের একটা বিরাট অংশ আদৌ ভোট দেয়নি; ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশেও একই হাল। ওয়াল স্ট্রীট ক্র্যাশের সাথে মিলে শূন্যতার সৃষ্টি বিভিন্ন বৈষম্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যেগুলো বেশিরভাগ সময়ে বিরাট ডানপন্থী বিভিন্ন গ্রপের উত্থানের ভেতর দিয়ে ফ্রান্সে এবং এখন জার্মানিতে পূরণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের সামনে দুটো পরিষ্কার বিকল্প ছিল। জনমতগুলো দেখাচ্ছিল, বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে পরাস্ত করবেন। কিন্তু ক্লিন্টন প্রচলিত চরম মধ্যপন্থী ধরনের রাজনীতির হাত ধরে প্রেসিডেন্সিকে এক বিচিত্র, মেভেরিক, শ্বেতাঙ্গ সুপারম্যাসিস্ট বিলিওনিয়ারের হাতে তুলে দিলেন, যিনি মোটামুটিভাবে রিপাবলিকান পার্টিকে নিজস্ব উদ্দেশ্যে দখল করে নিয়েছেন এবং এমন একটা প্ল্যাটফর্মে চেপে ক্ষমতায় এসেছেন যা বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেগুলোর কোনওটাই এখনও ঘটেনি। তো আমরা এখনও এই পরিস্থিতির ভেতরই আছি।
বামরা ক্র্যাশের সুযোগ গ্রহণ করছেন না কেন?
সামাজিক-গণতান্ত্রিক দলগুলো—এদের দিয়েই শুরু করা যাক, বিশেষ করে নিউ লেবার—বড় বেশি ডানে সরে গিয়েছিল, কারণ তারা ভেবেছিল অবস্থা সেদিকেই গড়াবে। ফলে যখন ক্র্যাশ দেখা দিল, পুঁজিবাদকে বাঁচাতে তারা কেবল ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতভাবে টাকার যোগান দিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। ডান ও বামের ভেতর কোনও তফাৎ ছিল না। ব্লেয়ার বা ব্রাউন প্রথম যে কাজটা করেছিলেন সেটা ছিল ধারাবাহিকতা দেখাতে থ্যাচারকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রীটে দাওয়াত করে এনে তার সাথে ছবি তোলা। অবার ক্যামেরন নিজেকে ব্লেয়ারের বিরাট ভ্ক হিসাবে তুলে ধরা গোপন করেননি। এক চরম মধ্যপন্থী সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের এই ধারাবাহিকতা ছিল। এর পরিণতি ছিল সুযোগসন্ধানী, ডানপন্থী, আধা ফ্যাসিবাদী, কট্টর ডানপন্থী—আপনি যেনামেই ডাকুন না কেন—প্রবাহ তাদের বেশিরভাগ পোশাক কেড়ে নিয়েছে। জার্মানিই প্রথম সত্যিকার অর্থে ডাই লিঙ্কেৎ, দ্য লেফট, নামে বামদের একটা দলের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করে। এই দলটি সাবেক পূর্ব জার্মানি শাসক দলকে পশ্চিম জার্মান সামাজিক গণতন্ত্রের বিভিন্ন অংশের সাথে ঐক্যবদ্ধ করে। আপনি চাইলে বলতে পারেন, জার্মানিতেই সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছিল। এখানে অস্কার লাফোন্টাইনের একটি বামপন্থী কিনেসিয় কর্মসূচি ছিল, তিনি জার্মান রাষ্ট্রের এখনও যুগোস্লাভিয়ার সাথে সম্পর্কচ্যুতির দায় স্বীকার করা বাকি রয়ে গেছে বলে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ বাঁধানোর বিরোধিতা করেছেন। তার প্রকাশ্যে এবং খোলাখুলি সরে আসার বাস্তবতাকে বাম পন্থার বহু লোক ইতিবাচক হিসাবে দেখেছেন। এটা পূর্ব জার্মান এবং পশ্চিম জার্মানি বামকে ঐকবদ্ধ করেছে, খুব একটা খারাপ করছে না এটা। ইতালি ও ফ্রান্সে এক্সট্রিম লেফট বিরাট আঘাত পেয়েছে। শেষের দেশটিতে অভিজাতরা ম্যাখোঁকে ক্ষমতায় আনতে সফল হয়েছে এবং এখন তিনি থ্যাচারীয় অপারেশনে নেমেছেন। আমরা কথা বলার সময় ইতালিতে কোনও সরকারের অস্তিত্ব নেই।
গত বছরের ৮ই জুনের বিস্ময়ের কি অর্থ করবেন আপনি?
দুটো কারণ। প্রথমটি হলো, হাতছাড়া হয়ে গেলেও স্কটিশ স্বাধীনতার লড়াই—উভয় পক্ষের তরফে যেভাবে লড়াই করা হয়েছে; স্বাধীনতার পক্ষেই বেশির ভাগ তরুণরা ছিল—টনিকের মতো ছিল সেটা। ওই সময় স্বটল্যান্ডে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি, বিভিন্ন সভায় কথা বলেছি, আনন্দময় ব্যাপার ছিল সেটা—এর আগে এই দ্বীপগুলোয় এমন কিছু প্রত্যক্ষ করিনি। স্কটল্যান্ডের প্রত্যেকে হয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিল বা ভাবছিল—দুপক্ষেরই সবাই। সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের কথা ভুলে যাওয়া কিভাবে সম্ভব, শ্রমিক দলীয় এমপি-দের জোর করে গ্লাসগোতে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযানে নামিয়ে দেওয়া হলে একজনমাত্র ব্যাগপাইপার কিভাবে পুরো দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছিল। ‘ওই যে লন্ডন থেকে বিশ্বাসঘাতক এসেছেন, ইউনিয়নের সমর্থক হাউস অভ কমন্সের সদস্য!’ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পরে তাদের বেশিরভাগই আসন হারান।
দ্বিতীয় কারণটি ছিল ভোট দানের বয়স ১৬ বছরে কমিয়ে আনা, ফলে সমস্ত স্কুল জড়িয়ে পড়ে। তরুণরা প্রায় সাফল্য কেড়ে নিচ্ছিল। ইংল্যান্ডের বহু তরুণ সামাজিক নেটওয়ার্কে এটা দেখেছে। ওরা ভাবতে শুরু করে, কেবল স্কটল্যান্ডেই কেন এটা সীমিত থাকবে। ওদের অনুভূতি ছিল: ‘ভাগ্যবান স্কটদের দেখ—ওরা অন্তত ওদের সিস্টেম পাল্টানোর চেষ্টা করছে, অথচ আমরা এখানে একেবারে নিঃসাড় হয়ে আছি।’ এবং তারপর, লেবার পার্টি নির্বাচনের পরাজিত হওয়ার পরপরই এড মিলিব্যান্ড ইস্তফা দিলে উত্তরাধিকারের লড়াই হয়, বেশির ভাগ প্রার্থীই মোটামুটি একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিউ লেবারের অধীনে লেবার লেফটকে প্রায়ই একজন প্রতীকি প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, এবার প্রতীকই জয়লাভ করল।
বেশ, করবিনের পালা ছিল সেটা, তাই না?
এযাত্রা অনিচ্ছার সাথেই পতাকা বহনে রাজি হয়েছিলেন তিনি। তারপরের ঘটনা অবিশ্বাস্য। টেলিভিশন এবং রেডিওতে সকল প্রার্থীকে সমান সময় দেওয়া হয়; এবং করবিন তার বিশ্বাসের কথাই বলেছেন, যা কিনা প্রথাগত বাম বা অনেক সময় পুরোপুরি বাম নয়, এমন সামাজিক-সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এক বিরাট সমাবেশের পর তিনি আমাকে বলেছিলেন, লোকজন, বিশেষ করে তরুণরা, বেশি করে তার কাছে আসছে, কারণ ওরা তাকে টেলিভিশনে এমন কথা বলতে দেখেছে যেটা আর কেউ বলেনি, তাই তার কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ছিল সেটা—এক ধরনের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ। তরুণদের উপস্থিতিতে সভা ভরে উঠছিল। করবিন বলতেন: ‘আমরা আবার উচ্চশিক্ষা ফ্রি করে দিতে যাচ্ছি।’ তাকে যে জিনিসটা বিস্মিত করেছিল সেটা হলো তার কাছে আসা বেশ উল্লেখযোগ্য তরুণ জানতে চেয়েছে: ‘উচ্চশিক্ষা কি এক সময় ফ্রি ছিল?’ নব্যউদারবাদী আমলে ওই স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে বলে তার মনে হয়েছে। সেজন্যেই ‘ব্যাপারটা ছিল এরকম এবং আমরা আবার সেটা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি’ বলার পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। রেলওয়ে এককালে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ছিল, তখন ঢের ভালো ছিল...’ তো তিনি রেলওয়ে এবং পাবলিক ইউটিলিটি এবং শিক্ষাকে ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রচারণা চালিয়ে গেছেন—১৯৬০-র দশকে এসব ধারণা আমাদের কাছে খুবই তুচ্ছ ছিল। মানে আমরা স্রেফ এসব কিছু নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এসব হারিয়ে গিয়েছিল, কারণ এসমস্ত কিছুই হারিয়ে গিয়েছিল। এবং একজন ভদ্রচেহারার নেতা ছিলেন, আদৌ গণমাধ্যমে তুলে ধরা বুনো কেউ নন, লেবার পার্টির প্রথম নেতা যিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, যুদ্ধ সর্মথন করেন না, স্টপ দ্য ওয়ারের সদস্যপদ রক্ষা করেন। মানুষ তাদের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি; এবং এটা বেড়ে উঠছিল, সহসা গণমাধ্যম এবং লন্ডনের মিডিয়া বাবলের ভেতরে যারা অবস্থান করছে, তারা ভীত হয়ে উঠল—করবিন জিতে যেতে পারেন ভেবে তাদের চেহারায় নির্ভেজাল আতঙ্ক ফুটে উঠেছিল। এটা লক্ষ করা আনন্দদায়ক ছিল।
পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির বড় অংশ তার বিরোধী ছিল। দ্বিতীয় দফা তার নেতৃত্বের জন্যে দাঁড়ানো ঠেকানোর প্রয়াসে তাকে এমন ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে যেমনটা অতীতে কোনও লেবার নেতা মোকাবিলা করেননি। যখন ডাক এলো, ওই ছেলেরা করবিনকে ভোট দিতে লেবার পার্টিতে যোগ দিল। আধ মিলিয়ন লোক যোগদান করে একে ইউরাপের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত করল। এবং এখনও দলের ভেতরে ব্রাউন ও ব্লেয়ার অংশ তরুদের এইসব পরিবর্তন চাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেনি। তো তাকে পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির এক সভায় তলব করা হয়, ওখানে অনাস্থা ভোট গ্রহণ করা হয়, আমরা প্রবলভাবে আশা করছিলাম তিনি যেন এটা মেনে না নেন। তিনি নেননি। তিনি বলেছেন: ‘আমার প্রতি আপনাদের আস্থা না থাকতে পারে; আমরা যে লেবার পার্টি গড়ে তুলছি তাদের আস্থা আছে, এবং আমি ফের এর জন্যে লড়তে যাচ্ছি।’ সুতরাং, তার রাজনীতি এবং দৃঢ়তা, দুটোই মানুষকে বিস্মিত করেছিল। ওই মুহূর্তে তার স্বাভাবিকতা ছিল লক্ষণীয়। মনোবল ভেঙে দিয়ে তাকে ইস্তফা দানে বাধ্য করাই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু তিনি সাহস ধরে রেখেছেন।
আপনি তরুণদের এক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন, এর শ্লোগান ছিল: ‘তিরিশের উপর বয়সী কাউকে বিশ্বাস নেই।’ ১৯৬০-র দশকের অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা লাভ করতে পারেন? আপনি কি এখন সামনে এগুনোর একটা উপায় বাতলাতে পারেন যেটা আরও নিরাপদ হতে পারে?
বেশ, ১৯৬০-র দশকের আন্দোলনগুলো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের সংসদবহির্ভূত চ্যালেঞ্জের সাথে সম্পর্কিত ছিল। মনে, আমরা ছোট ছোট গ্রুপে ছিলাম, কিন্তু মূলত এটা ছিল গণ আন্দোলন। এবং আমাদের মনে হয়েছে কোনও পরিবর্তন এলে সেটা রাস্তায়ই আসবে, ধর্মগটের তরঙ্গের ভেতর দিয়ে আসবে—কিন্তু সেটা ঘটেনি। যেসব দেশে ব্যাপারটা ঘটেছে—ফ্রান্স এবং ইতালিতে—সেসব দেশে চূড়ান্ত মুহূর্তে ‘এবার আমরা চেষ্টা চালাব, আমরা হয়তো হেরে যেতে পারি, হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারি, কিন্তু আমরা চেষ্টা করবই’ বলার মতো বড় আকারের কোনও রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না—প্যারিস কমিউন মুহূর্ত, ১৯১৭ সালের মতো কোনও একটি মুহূর্ত। পর্তুগালে ওই মুহূর্ত এসেছিল এবং হাতছাড়া হয়ে গেছে। ব্রিটেনে বামে লক্ষণীয় কিছুর অনুপস্থিতিতে এইসব তরুণ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলে গেছে এবং সেটাই হয়তো পার্থক্য গড়ে দিতে পারত।
লেবার পার্টিকে সংসদে বৃহত্তম দলে পরিণত হওয়ার খুব কাছে নিয়ে যাওয়া নির্বাচনী ফল মানুষকে প্রচুর আশাবাদী করে তুলেছিল। ফল প্রকাশের পর আরও বহু লোক যোগ দিয়েছিল, ফলে প্লাবনের জোয়ার ক্রমেই বেড়ে উঠছিল। এক ধরনের প্রবল বেগ তৈরি করেছিল তারা, লেবার পার্টির ভেতরে-বাইরে স্বাধীনভাবে প্রচার চালিয়েছে সেটা। তো কাঠামো একেবারেই ভিন্ন, সময়ও অন্যরকম। এখন আপনি যদি জানতে চান, করবিনের নেতৃত্বে এই নতুন লেবার পার্টি আগামী নির্বাচনে জিততে পারবে কিনা? আমি বলব: ‘হ্যাঁ, যদি খুব বেশি দূরে না গিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, জিততে পারবে।’ এবং বিশ্রীভাবে আমি না ভেবে পারছি না যে, গ্রেনফিল অগ্নিকা্ল নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে ঘটলে সম্ভবত তা লেবার পার্টির বিজয়ে পরিণত হতো, কারণ ওই ভয়ঙ্কর অগ্নিকা্ল নব্যলিবারেল ব্রিটেনের সমস্ত ত্রুটিকে প্রতীকায়িত করেছিল। তবে এই তরুণরা কি করবিনকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে পারবে? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। সমস্যা হলো, করবিন এমন এক লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যার বড় অংশ সামাজিক গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু যার সংসদীয় প্রতিনিধিরা এখনও নব্যউদারবাদী অগ্রাধিকার এবং ব্লেয়ার/ব্রাউন যুগের সংরক্ষণবাদের ছাঁচে গড়া। কেউ কেউ তাদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে আড়াল করতে পরিচয়ের রাজনীতির প্রয়াস পেয়েছেন, কিন্তু সেটাও খুব একটা কাজ দিচ্ছে না। সাদিক খান, চুকা উমুন্না এবং মুষ্টিমেয় কিছু মহিলার চেয়ে বেশি বিছু ক্যামেরন স্টাইল টোরি দল নিয়ে স্রেফ খুশি। আসলে তারা এবং তাদের সহকর্মীরা টোরি বাজেট এবং অভিবাসী আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নিউ লেবার দলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, আঞ্চলিক প্রধানদের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা দিয়েছেন তারা, কন্সটিটিউয়েন্সি লেবার পার্টিগুলোর ক্ষমতা হ্রাস করেছেন, উদার গণমাধ্যমের তরফে অসন্তোষের কোনও গুঞ্জণ ছাড়াই ব্লেয়ার এ্ং ব্রাউনের বিষয়আশয়কে নিরাপদ শ্রমিক শ্রেণী নির্বাচকম্ললীতে পরিণত করেছেন। মূলত সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল—এবং সেটা বদলানো সহজ প্রমাণিত হচ্ছে না।
আমার চিন্তা হচ্ছে...ধরুন করবিন জিতে গেলেন। এই বিজয় টনিক হয়ে দাঁড়াবে, এবং কিছু সময়ের জন্যে তার বিরোধিতা করা দুরুহ আবিষ্কার করবে ওরা; কিন্তু বড় বড় সমস্ত ইস্যুতে—যুদ্ধ, মূলধনের পুনর্জাতীয়করণ বা নিয়ন্ত্রণ—আমার ধারণা বিপদে পড়তে যাচ্ছেন তিনি; এবং আমার নিজস্ব অনুভূতি হচ্ছে যে লেবার রাইট তাকে অষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলতে সম্পূর্ণ নিরীহ রোমানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে যাতে প্রধানত গণভোটকে অগ্রাহ্য করা হবে। ওরা এরই পরিকল্পনা করছে: সরাতে না পারলে ওর হাতপা বেঁধে ফেল। এভাবেই হামলা চালাবে ওরা আর একমাত্র আশার কথা হলো, অন্তত আগামী বছরে আরও বেশি করে স্থানীয় লেবার দলীয় আমলাতন্ত্র নয়, বরং সদস্যসংখ্যা তুলে ধরবে।
আপনার কি মনে হয় যে ব্রিটেনে—এবং কে জানে আমেরিকায়ও—আপনি যাকে লেফট-কিনিসিয়ান পার্টি বলে উল্লেখ করেছেন, ক্ষমতায় আসার একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে যা আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার যেসব প্রত্যাশা করছি তার অনেক কিছু বাস্তবায়িত করতে পারবে?
লেবার ইশতেহার ইউটিলিটিজ ফের সরকারী মালিকানায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ইইউ বিধিবিধানে মোটামুটি এটা নিষিদ্ধ। ‘আনক্রিটিক্যাল রিমেইনার’রা এটা মানতে অস্বীকার করেছে: তাদের চোখে ব্যক্তি পুঁজির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠিত বা রাষ্ট্র কর্তৃক অধিকারে নেওয়া যেকোনও কিছুকে বড়জোর আধা-আইনী বলে মনে করা হয়। অবশ্যই এসব নিয়ে বিতর্ক আছে, কারণ অন্যান্য দেশও এইসব আলোচনার কোনও কোনওটায় জড়িত। কিন্তু সেটা হবে প্রথম বাধা, লেবার ইইউতে না থাকলে কোনও বাধা হবে না। সুতরাং, কৌতূহলোদ্দীপকভাবে বামপন্থী সরকারের অধীনে ইইউর বাইরে থাকাটা সুবিধাজনক হতে পারে। আমার মনে হয়, এইসবের কিছু বিষয় এগিয়ে নেওয়া হবে। ভেতর থেকে বিরোধিতা আসবে, তবে আমি মোটামুটিভাবে আশাবাদী যে, করবিন ইতিমধ্যে যেকাজে দক্ষ সেটার সুবাদেই—আসলে প্রচারণা সংগঠিত করা এবং লেবার যতদূর সম্পর্কিত রাজনীতিকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে—এর মোকাবিলা সম্ভব হবে। সুতরাং ইউটিলিটিজ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রতিরক্ষা—যদি সেগুলো ঘিরে সামাজিক আন্দোলন থাকে—কাজ দিতে পারে এবং সেটা লেবারের ডানপন্থী সংসদ সদস্যদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যারা হয়তো এর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন বা অনুপস্থিত থাকতে বা অন্য কিছু করতে পারেন। এছাড়া ১৯৬০ এবং ১৯৭০-ও দশকে আমরা যাকে আংশিক বিজয়ের দ্বন্দ্বিকতা বলতাম সেই বিষয়টিও রয়েছে, অর্থাৎ ইতিমধ্যে যে বিজয় আমরা অর্জন করেছি সেটাই আঁঁকড়ে থাকব নাকি আরও বেশি কিছু পাওয়ার চেষ্টায় সেটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলব? যুদ্ধ পরবর্তী কাল থেকে ১৯৯১ সাল অবধি সামাজিক-গণতন্ত্রী এবং কমিউনিস্টরা এই প্রশ্নের মোকাবিলা করেছে, আজও করবিনিস্টা লেবার পার্টিসহ বহু দলকে এর মোকাবিলা করতে হচ্ছে: কতদূর যাওয়া সম্ভব? এগুলো রাজনৈতিক কলাকৌশল এবং রণনীতির অংশ; কিন্তু, সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত করবিন এক্ষেত্রে ভালোই করছেন, লেবার পার্টির ভেতরে বাইরে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুদ্ধ করছেন—তবে শেষতক দলের বাইরের অংশই সফল হয়েছে।
আপনি কি মনে করেন যে, যা ঘটেছে সেটা আগেই ঘটতে পারত?
মোটেই তা বিশ্বাস করি না। এক দশকেরও বেশি সময় আগে ট্রেনে করে বেলজিয়ামে যাওয়ার কথা মনে আছে। আমার উল্টোদিকে বসা এক ভদ্রলোক একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি যখন তার দিকে তাকালাম, চেহারা আড়াল করে ফেললেন তিনি। ট্রেন থেকে নামার সময় তিনি বললেন: ‘তুমি আমাকে চিনতে পারোনি, তারিক, আমার জন্যে সেটা বরং ভালোই হয়েছে।’ আমি কারণ জানতে চাইলাম। ‘বেলজিয়ামে আমি ট্রটস্কিবাদী ছিলাম, তোমার মতো একই আন্তর্জাতিক সংগঠনে।’
‘তুমি এখন কোথায়?’
‘বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রী।’
আমি বললাম: ‘বেশ, একটা কিছু তো হয়েছ, কারণ তুমি তো অর্থ বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও হতে পারতে, সেটা তোমার মুখ ঢাকার পক্ষে যুক্তিযুক্ত হতো। তবে ভালো কিছু কি করছ?’
‘বেশ, সে বিচারের ভার তোমার উপর।’
কার্যত প্রতিটি ইউরোপিয় সরকারে চরম বামের কাউকে না কাউকে আপনি পাবেনই। দশ বছরের জন্যে ইইউর প্রধান হোসে ম্যানুয়েল বররোসো পর্তুগালে মাওবাদী ছিলেন, লিসবনে মাওবাদী দপ্তরের জন্যে আসবাবপত্র ছিনতাইয়ের হামলা সংগঠনের জন্যে বেশি পরিচিত তিনি। এখন তিনি গোল্ডম্যান শ্যাচের অনির্বাহী চেয়ারম্যান। ড্যানিয়েল কোহন-বেনডিট এই মুহূর্তে আমরা যখন আলাপ করছি, এলিসি প্রাসাদে ম্যাখোঁকে পরামর্শ যোগাচ্ছেন। এমন নয় যে তারা চেষ্টা করেননি: তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ ততদিনে তারা পুরোপুরি ছিদ্রান্বেষীতে পরিণত হয়েছিলেন। আমার কাছে যেটা রীতিমতো আমুদে ব্যাপার সেটা হলো চরম বামের বেশ কিছু গোঁড়া কিংবা এর প্রান্তসীমায় থাকা লোকজন এখন সমানভাবে সরকারের মন্ত্রী হিসাবে গোঁড়ামী করছেন, কিন্তু অন্যপক্ষে। ব্রাজিলে যারা লূলার সাথে ছিলেন তাদের কেউ কেউ ল্যাম্বারটিস্টে উপদলের সাবেক ট্রটস্কিপন্থী ছিলেন, এই উপদলটি ফরাসী সোশ্যালিস্ট পার্টিতে প্রবেশ করে আমাদের জোসপিনকে উপহার দিয়েছে, যিনি নিজের প্রথম মেয়াদে নব্য উদারীবাদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রধান মন্ত্রী হিসাবে জোসপিনযেটা বিদ্রোহ করেনি এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বী একটি উপদলের অ্যালাইন ক্রিভাইনের মুখোমুখি হয়ে তার কানে ফিসফিস করে বলেছেন: ‘আমরা সবসময় আপনাকে বলেছি আপনার আগেই আমরা ক্ষমতায় আসব।’
লেবার পার্টিতে কি ঘটবে সেটা এক কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। দলের অভ্যন্তরসহ অনেকেই লেবার পার্টিতে বাতিল করে দিয়েছেন। তারপর যা ঘটার ঘটেছে। এবং এখন সন্দেহাতীতভাবে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে নিজেকে কোনও কিছুতে পরিবর্তিত করতে পারে কিনা দেখার জন্যেদলের অভ্যন্তরে সংগ্রাম চলছে। যদি না পারে, ওরা বিদায় নেবে—আজকের দিনে রাজনীতি বড়ই অস্থির। লেবার পার্টির কর্তব্যক্তিরা এটা বুঝতে পারবেন বলে আমি আশা করি: দীর্ঘদিন ধরে কোনওকিছুই নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না, কারণ তরুণদের কোনও সংগাঠনিক আনুগত্য নেই—লেবারে যোগদানকারীরা ব্যক্তি হিসাবেই যোগ দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন-লেবার সংযোগ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক। এখন আর সে জিনিসের অস্তিত্ব নেই—ইউরোপ জুড়ে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দারুণ কমে গেছে, ব্রিটেনে বিপুল কমতি ঘটেছে। সুতরং, লোকে যদি মনে করে যে তাদের হতাশ করা হয়েছে, প্রথম মেয়াদে প্রতিশ্রুতি লেবার পূরণ করতে পারবে না, ওরা স্রেফ সরে দাঁড়াবে, তখন খোদাই জানেন কি অবস্থা হবে। এদিকে লেবার পার্টির পরাজয়সহ করবিনকে যেকোনও মূল্যে অপদস্থ করার লক্ষ্যে নতুন করে অভিযান শুরু হয়েছে। ব্লেয়ার তো প্রকাশ্যে করবিনকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় হিসাবে গণভোটের ফলাফলকে বাতিল করতে একটা কমন প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে টোরিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি মনে করি করবিন জিততে পারেন। তার হাবভাব এবং আচরণ প্রথাগত রাজনীতিবিদদের মতো না হওয়াটা লেবারে ফিরে আসা বা প্রথমবারের মতো বামপন্থী সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক রাজনীতি আবিষ্কারকারী বেশিরভাগ লোকের জন্যেই প্লাস পয়েন্ট।





