পার্সি বংশোদ্ভূত ভারতীয় শিল্পপতি জামশেঠজি টাটা ১৯০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত টাটা গ্রুপ তখন ভারতে প্রথম স্টিল মিল চালু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এর বাজার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি সেবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন। ক্রীড়ামোদী প্রেসিডেন্ট তার কাছে প্রথম যে বিষয়টি জানতে চান তা হলো পার্সিদের ক্রিকেট খেলা কেমন চলছে?

পার্সিদের ক্রিকেট! বর্তমান প্রেক্ষাপটে কথাটি যতই আজগুবি শোনাক না কেন, ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেটকে প্রথম সাদরে বরণ করেছিল এখানকার পার্সি সম্প্রদায়। এ অঞ্চলে খেলাটিকে জনপ্রিয় করার নেপথ্যে আছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এতটাই যে ভারতবর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে সে খবর পৌঁছে গিয়েছিল সুদূর আমেরিকায়। সপ্তম শতাব্দীতে আরব মুসলিমরা পারস্য জয় করে। জরথুস্ত্রের অনুসারী এসব অগ্নি উপাসক তখন সেখান থেকে পালিয়ে ভারতবর্ষে চলে আসে। ভারতের পশ্চিম উপকূলের গুজরাট রাজ্যে তারা বসতি স্থাপন করে। তারা গুজরাটি ভাষা আয়ত্ত করে নেয়। বাণিজ্যে তারা খুব সহজে ও দ্রুততার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করে। উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ব্যবসার প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করত। তাই এক্ষেত্রে পার্সিদের কোনো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়নি। ব্রিটিশরা যখন উপমহাদেশে আগমন করে, ততদিনে পার্সিরা এ অঞ্চলের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হয়ে গেছে। স্থানীয় অধিবাসী হিসেবেই তারা বিবেচিত হতো। গুজরাট রাজ্যভুক্ত উপকূলবর্তী শহর ভারুচ, অঙ্কলেশ্বর, সুরাট ও নবসারিজুড়ে ছিল তাদের আবাস। নিজেদের ব্যবসায় অধিকতর মুনাফা অর্জনের স্বার্থে পার্সিরা ইংরেজদের সঙ্গে সখ্য স্থাপনের সচেতন প্রয়াস চালায়। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের আইনকানুন তারা রপ্ত করে। ব্রিটিশদের অধীনে বোম্বে (বর্তমান মুম্বাই) ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পার্সিরা তখন গণহারে সেখানে হিজরত করে।

বাণিজ্যপ্রীতি ইংরেজ শাসকদের অধিকতর কাছাকাছি নিয়ে আসে পার্সিদের। হিন্দুরা তখনো জাতপাতসহ নানা সংস্কারে আবদ্ধ। স্বভাবত ইংরেজদের সহজে মেনে নেয়ার কোনো কারণ তাদের ছিল না। আর ভারতীয় মুসলমানরা তো নিজেদের হারানো গৌরবের স্মৃতিচারণে মগ্ন। পক্ষান্তরে পার্সিরা ছিল উদার। খোলা মনে তারা গ্রহণ করেছিল পাশ্চাত্য পোশাক, সংগীত ও ইংরেজি ভাষা। সেই সঙ্গে আপন করে নিয়েছিল ‘ভদ্রলোকের খেলা’—ক্রিকেট।

অষ্টাদশ শতাব্দীর বোম্বে। এর দক্ষিণতম প্রান্তে কালো শিলা নির্মিত প্রাচীন দুর্গ। প্রাচীরের বাইরে যতদূর চোখ যায় উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর। ১৭৭২ সালে ফরাসিদের আক্রমণ আশঙ্কায় ইংরেজরা সম্পূর্ণ এলাকা ভালোভাবে পরিষ্কার করে। উদ্দেশ্য, গোলাগুলির সময় প্রয়োজনীয় সীমানা লাভ করা। কালক্রমে ফরাসি হুমকি দূরীভূত হয়। আর সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ প্রান্তরটি হয়ে ওঠে এখানকার অধিবাসীদের অবসর যাপনের উত্কৃষ্ট স্থান। সেনাবাহিনীর কাছে তা প্যারেড মাঠ, সাধারণ ইংরেজ নাগরিকদের কাছে এসপ্লানেড আর ভারতীয়দের প্রিয় ময়দান। শারীরিক কসরত ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে তারা ময়দানে যেত। আর এ ময়দান থেকেই তৈরি হয় ইতিহাস, উপমহাদেশে ক্রিকেটের যাত্রা।

ময়দানের উত্তর প্রান্তে ইংরেজ সৈন্যরা ক্রিকেট খেলত। সঙ্গে থাকত তাদের বিবিরা। ব্যাট-বল আসত ইংল্যান্ড থেকে। তখন পার্সি বালকরা খেলাটির সঙ্গে পরিচিত হয়। তারা ময়দানে যেত ডাংগুলি খেলতে। ক্রিকেট খেলা তাদের সামনে নব উদ্দীপনা রূপে হাজির হয়। অতি দ্রুত তারা ইংরেজদের অনুকরণে ক্রিকেট খেলা শুরু করে। ১৮৩০-এর দশককে এর সূচনালগ্ন ধরা হয়।

শুরুতে পার্সি বালকদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। উপকরণের অভাব। পিচ ছিল অসমতল। উঁচু ঘাসে ঢাকা। তথাপি কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাদের। নাগালে থাকা জিনিসপত্র দিয়েই তারা বানিয়ে নিয়েছিল প্রয়োজনীয় উপাদান। তাদের ব্যবহূত চিমনির পাইপকে উইকেট, ছাতাকে ব্যাট এবং মুচি কর্তৃক পরিত্যক্ত কাপড় দিয়ে সেলাইকৃত উপবৃত্তাকার বস্ত্রখণ্ডকে বল বানিয়ে তারা মহাসমারোহে চালিয়ে যাচ্ছিল ক্রিকেটীয় আয়োজন। আনুষ্ঠানিক পোশাকের বালাই তাদের ছিল না। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকেই তারা মাঠে নামত। কপালে সাদা ফেট্টি, আজানুলম্বিত জামা, তার ওপর কোমরের চারপাশে ধর্মীয় নিদর্শনস্বরূপ পবিত্র সুতার বেষ্টনী। এ ছিল পার্সি ক্রিকেটারদের প্রাথমিক চিত্র। তবে সমস্যা আরো ছিল। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ময়দানের একটি অংশ মুসলমান রজকদের দখলে থাকত। তারা নীল দেয়া লম্বা কাপড়ের থান সেখানে শুকোতে দিত। অনেক সময় বল লেগে কাপড়ে দাগ হয়ে যেত। এ নিয়ে রজকদের সঙ্গে লাগত ধুন্ধুমার ঝগড়া। রজকরা বলগুলো আর ফেরত দিত না। একবার এক ইংরেজ কনস্টেবলের স্ত্রী সান্ধ্যকালীন ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। বল উড়ে গিয়ে আঘাত করল তার মাথায়। এ ঘটনার পর পার্সি ক্রিকেটারদের ময়দানে আসা সাময়িক নিষিদ্ধ হলো। তবে অবস্থার উন্নতি ঘটছিল। ক্রিকেট নিয়ে পার্সি বালকদের এ আগ্রহ সম্প্রদায়টির ব্যবসায়ীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। ইংরেজদের সঙ্গে যোগাযোগ আরো দৃঢ় করার চমৎকার একটি হাতিয়ার হিসেবে তারা খেলাটিকে চিহ্নিত করে। ক্রিকেটের প্রতি পার্সি ব্যবসায়ীদের এ আগ্রহে কপাল খোলে ক্রিকেটারদের।

১৮৪৮ সাল। পার্সি বালকেরা তখন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষে পরিণত হয়েছে। সে বছর তারা প্রথমবারের মতো নিজেদের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে। ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব। দুই বছর পর তা বিলুপ্ত হয়। আত্মপ্রকাশ করে ‘ইয়াং জোরোস্ট্রিয়ান ক্লাব’। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জনৈক হিরাজী গোস্তা ওরফে কোকা দারু। তিনি সদস্যদের জন্য প্রতি মাসে দুই আনা চাঁদা নির্ধারণ করেন। যারা তা দিতে সক্ষম ছিল না, তারা দিনপ্রতি এক পয়সা দিয়ে অনুশীলনের সুযোগ পেত। ক্লাবটি পার্সি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টাটা এবং ওয়াদিয়া গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ইয়াং জোরোস্ট্রিয়ানরা প্রতিদিন ময়দানে ক্রিকেট খেলত। পরনে থাকত নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘বন্দিশ’ ও ‘পাজামা’। এসব পোশাকে ক্রিকেট খেলা ছিল ইংরেজদের হাসির খোরাক। তবে পার্সিরা এসব থোড়াই কেয়ার করত। ১৮৫০ ও ১৮৬০-এর দশকে অন্তত ৩০টি পার্সি ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। রোমান দেবতা ও ইংরেজ রাজনীতিবিদদের নামে এসবের নামকরণ হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘জুপিটার’, ‘মার্স’, ‘গ্ল্যাডস্টোন’, ‘রিপন’ ইত্যাদি নাম উল্লেখযোগ্য।

রাস্ত-গুফতার। পার্সি সম্প্রদায়ের পত্রিকা। এ পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপন নজর কাড়ে সবার। প্রভাবশালী পার্সি ব্যক্তিত্ব স্যার কাওয়াসজি জাহাঙ্গীরের নামে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা ছিল, তিনি ক্রিকেটারদের প্রয়োজনীয় ক্রিকেট সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করবেন। আরেক পার্সি সোরাবজি সাপুরজি বাঙ্গালী ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক। মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ডের জন্য তার সুনাম ছিল। তিনি সেরা পার্সি ক্লাবের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেন। খেলা চলাকালীন ব্যান্ড পার্টি, খেলোয়াড়দের সুবিধার জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা এবং খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য খাবার সরবরাহ করতেন তিনি। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৭ পর্যন্ত প্রতি বছর পার্সি ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণে এ টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। যে ক্লাবই জয়ী হোক না কেন, পুরো সম্প্রদায় সে আনন্দ সমান ভাগে ভাগ করে নিত। সাম্প্রদায়িক সংহতির বহিঃপ্রকাশ রূপে খেলোয়াড়রাও পুরস্কারের অর্থ সম্প্রদায়ের কল্যাণে ব্যয় করতে দ্বিধা করত না। ১৮৬৯ সালে ‘ইয়াং জোরোস্ট্রিয়ান ক্রিকেট ক্লাব’ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। প্রাইজমানি হিসেবে তারা নগদ ১০০ রুপি লাভ করে। এ অর্থ তারা এভাবে বণ্টন করে—নির্মাণাধীন একটি পার্সি জিমনেশিয়ামের জন্য ২৫ রুপি, কলেরাপীড়িত পার্সিদের চিকিৎসায় ২০ রুপি, দরিদ্রদের সহায়তায় ৫ রুপি, ব্যাট কেনার জন্য ২০ রুপি। অবশিষ্ট ৩০ রুপি তারা ক্লাবের তহবিলে জমা রাখে। সোরাবজির পৃষ্ঠপোষকতায় এসব টুর্নামেন্ট দ্রুত গণআকর্ষণে পরিণত হয়। এমনকি বৃদ্ধ লোকেরা, যারা সবসময় বল-ব্যাটকে অবজ্ঞা করে এসেছে, তারাও ভরদুপুরে ক্রিকেট মাঠে বসে রোদে পুড়ে খেলা উপভোগ করা শুরু করল। প্রতিযোগিতার উদ্দীপনায় কেটে গেল সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা।

ক্রিকেটের এ অগ্রযাত্রায় ১৮৭০-এর দশকের মধ্যে ময়দান থেকে তাস খেলুড়ে এবং রজকরা সম্পূর্ণ উত্খাত হলো। টিকে থাকল ইংরেজরা। ১৮৭৫ সালের জুন মাসে তারা বোম্বে জিমখানা প্রতিষ্ঠা করল। এটি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অর্থ সহায়তা করেছিলেন স্যার কাওয়াসজি জাহাঙ্গীর। প্যাভিলিয়ন নির্মাণ ও সাজসজ্জার সম্পূর্ণ খরচ তিনি বহন করেছিলেন। বিনিময়ে পেয়েছিলেন ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা। ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ফল বয়ে এনেছিল তার অবদান। তার বদান্যতায় সন্তুষ্ট হয়ে পার্সিদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জিমখানার সদস্যরা তাদের সঙ্গে দুই দিনের একটি ম্যাচ খেলতে সম্মত হলো। পার্সি খেলোয়াড়দের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল যথাযথ পোশাক ও উপাদান। সাল তখন ১৮৭৭। এতদিন পার্সিরা নিজেদের মধ্যে ক্রিকেট খেলেছে। এবার খোদ তাদের বিরুদ্ধে খেলা, যাদের দেখে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। এ ম্যাচকে ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনা জমে উঠল। ক্রিকেট মাঠের চারপাশে গাছের ছায়ায় জড়ো হলো শত শত মানুষ। তাদের অধিকাংশই পার্সি। জিমখানার তাঁবুগুলোতে ছিল সাদা চামড়ার ভিড়। ইংরেজদের প্রতিটি উইকেট পতনের পর ভারতীয় দর্শকরা যেভাবে উল্লাসে ফেটে পড়ছিল, তা যেন এ অঞ্চলে ক্রিকেটের সোনালি ভবিষ্যতের বার্তা দিচ্ছিল। এ ম্যাচে পার্সিরা আশাতীত নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা ইংরেজদের সঙ্গে সমান টক্কর দিয়েছিল। ম্যাচের ফলই তার প্রমাণ। খেলাটি ড্র হয়েছিল। তবে পার্সিদের জন্য তা ছিল জয়ের সমান। তারা ক্রিকেট খেলায় আরো মনোযোগী হয়।

পার্সিদের ক্রিকেট দক্ষতা খেলাটির জন্মভূমি ইংল্যান্ডে পৌঁছতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ১৮৮৭ সালে পার্সিদের নিজস্ব জিমখানা তৈরি হয়।  পার্সিরা একটি ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড সফরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর অংশ হিসেবে ১৮৮৫ সালের শীতকালে ইংল্যান্ডের সারে কাউন্টি থেকে তারা একজন প্রশিক্ষককে আমন্ত্রণ জানায়। তার নাম রবার্ট হ্যান্ডারসন। দায়িত্ব পালনে তিনি যে কার্পণ্য করেননি, তার প্রমাণ মেলে দেশে ফিরে যাওয়ার সময় তাকে দেয়া পার্সিদের বিদায় সংবর্ধনায়। বোম্বে ত্যাগ করার সময় তাকে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল। সমুদ্রে নিক্ষেপ করার জন্য দেয়া হয়েছিল একটি রঙ করা নারকেল, যেন যাত্রা নির্বিঘ্নে সম্পাদিত হয়। হ্যান্ডারসনের শিষ্যরা দ্রুত তাকে অনুসরণ করে ইংল্যান্ডে গিয়েছিল। সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ভারতবর্ষের প্রথম ক্রিকেট দল হিসেবে তারা যাত্রা করে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে। তাদের অভিবাদন জানান পার্সি আইনজীবী ফিরোজশাহ মেহতা। তার বক্তব্যে একই সঙ্গে ক্রিকেটের প্রতি পার্সি সম্প্রদায়ের আবেগ এবং ইংরেজ ক্রিকেটারদের প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি ক্রিকেটারদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমাদের সফরের উদ্দেশ্য মহৎ। তোমরা জানো, ক্রিকেট ইংল্যান্ডের জাতীয় খেলা। পার্সি সম্প্রদায়ের গভীরে প্রোথিত এর শেকড়। একজন শিল্পী যেমন ইতালি যায় বড় শিল্পীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে, তীর্থযাত্রীরা যেমন জেরুজালেমে যায় প্রার্থনা করতে অথবা মধ্যযুগে বিদ্যার্থীরা বিজ্ঞান ও দর্শনের প্রধান কেন্দ্রগুলোতে গিয়েছিল, সেভাবে এখন পার্সিরা ইংরেজ ক্রিকেটারদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে এবং মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ খেলাটি সম্পর্কে জানতে ক্রিকেটের আদি নিবাস ইংল্যান্ডে যাচ্ছে।’

১৮৮৮ সালের গ্রীষ্মে দলটি ইংল্যান্ড সফর করে। সতর্ক বাছাইয়ের মাধ্যমে ১৬ জন ক্রিকেটারের সমন্বয়ে গঠিত এটি। এ সফরে মোট ৩১টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। পার্সিরা ৮ ম্যাচে জয়লাভ করে। ১১টি হারে। অবশিষ্ট ম্যাচগুলো ড্র হয়। পার্সিদের মধ্যে সেরা খেলোয়াড় ছিলেন মহল্লাশা ইদুজি পাভরি।  এম ই পাভরি নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। পেশায় ডাক্তার। তিনি পার্সিদের কাছে ডব্লিউ জি গ্রেস হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন (উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস ওরফে ডব্লিউ জি গ্রেস ছিলেন পেশায় ডাক্তার। নেশায় ক্রিকেটার। ১৮৬৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছেন। খেলাটির উন্নয়নে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি ডানহাতি অলরাউন্ডার ছিলেন।) এ সফরে তিনি মোট ১৭০টি উইকেট নিয়েছিলেন। গড় ছিল ১১.৬৬।

প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড সফর পার্সি ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ করেছিল। পরবর্তী খেলাগুলোতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ১৮৮৯ সালে অনুষ্ঠিত পার্সি জিমখানা বনাম বোম্বে জিমখানা ম্যাচে পার্সিরা বিজয় অর্জন করে। ম্যাচে রান হয়েছিল কম। চতুর্থ ইনিংসে ইংরেজরা ৫৩ রানের টার্গেট তাড়া করতে নামে। এম ই পাভরির দুর্দান্ত বোলিং এবং সাজানো ফিল্ডিংয়ে তারা ৫০ রানে অলআউট হয়ে যায়। ম্যাচটিতে যে কৌশল  দক্ষতার পরিচয় তারা দিয়েছিল, এতে ‘পার্সিরা ক্রিকেট খেলতে পারে না’—এমন অপবাদ চিরতরে ঘুচে গিয়েছিল। তবে তখনো আরো বড় সাফল্য তাদের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল।

১৮৮৯-৯০ সালের শীতকালে ইংল্যান্ডের মিডলস্যাক্স কাউন্টির ক্রিকেটার জি এফ ভার্নন একটি ক্রিকেট টিম নিয়ে ভারত সফরে আসেন। এ দলে ছিল ইয়র্কশায়ার কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের ক্যাপ্টেন লর্ড হকের মতো দক্ষ খেলোয়াড়। বোম্বে জিমখানাকে তারা ইনিংস ব্যবধানে হারিয়েছিল। এ থেকে তাদের শক্তি সহজেই অনুমেয়। ১৮৯০ সালের ৩০ জানুয়ারি পার্সি জিমখানার সঙ্গে তাদের ম্যাচ শুরু হয়। এর নাম দেয়া হয় ‘ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ অব ইন্ডিয়া’। শেষ দুপুরে খেলা শুরু হয়। প্রথম দিনের খেলায় ৯৭ রানে অলআউট হয় সফরকারী দল। ভার্নন ৪৫ রানে অপরাজিত থাকেন। টার্গেট তাড়া করতে নেমে পার্সিরা ৯ উইকেটে ৮০ রান নিয়ে দিন শেষ করে। পরের দিন তারা এ স্কোরেই ইনিংস ঘোষণা করে সফরকারী দলকে ব্যাট করতে পাঠায়। ত্রাতা হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হন এম ই পাভরি। ৩৪ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট নিয়ে তিনি বিধ্বস্ত করে দেন বিপক্ষ শিবির। ৬১ রানে থেমে যায় প্রতিপক্ষের রথ। চতুর্থ ইনিংসে বিজয়ের জন্য পার্সিদের প্রয়োজন ছিল ৭৯ রান। সে লক্ষ্য অর্জনে ব্যাট করতে নেমে ৪০ রানে প্রথম পাঁচ উইকেট হারালেও, অবশেষে তারা ৪ উইকেটের বড় বিজয় অর্জন করে। এ পরাজয় হজম করতে ইংরেজদের বেশ কষ্ট হয়েছিল। তারা বলতে লাগল, যদি ভার্নন রান আউট না হতেন, তাহলে ফল অন্য রকম হতো। মোট কথা, পার্সিদের ক্রীড়া দক্ষতার স্বীকৃতি দিতে তারা ছিল নারাজ। তবে এটি যে বোম্বের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ম্যাচ, এ ব্যাপারে সবাই একমত ছিল। উত্তেজনায় সম্পূর্ণ শহর যেন পাগল হয়ে গিয়েছিল। বোম্বে জিমখানায় অনুষ্ঠিত ম্যাচটি দেখতে ১২ হাজারের অধিক জনসমাগম হয়েছিল। বোম্বের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি স্যার চার্লস সার্জেন্ট বিজয়ীদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাদের সম্মানে পার্সিদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রিপন ক্লাব নৈশভোজের আয়োজন করেছিল।

ইংরেজদের দেখে পার্সিরা ক্রিকেট খেলা শুরু করেছিল। তাদের অনুকরণে হিন্দুরা উৎসাহী হয় খেলাটির প্রতি। আরো পরে যুক্ত হয় মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়। বর্তমানে উপমহাদেশের সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্মিলনে ক্রিকেট যে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে, সে বর্ণনা এখানে বাহুল্য।

 

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক