এক পক্ষে দিল্লির সেন্ট স্টিফেন’স, অন্য পক্ষে আলীগড় কলেজ। মর্যাদাপূর্ণ দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে ক্রিকেট দ্বৈরথ। ভেনু—কোম্পানি বাগ, দিল্লি। সময়—১৮৯০-এর দশকের শুরু। পরিচয়ের দিক থেকে সেন্ট স্টিফেন’স সর্বজনীন। আলীগড় কেবল মুসলমানদের। এর আগে তারা পার্সিদের হারিয়েছে নিজেদের মাঠে। স্বাভাবিকভাবে তাদের প্রত্যাশার পারদ ছিল চড়া। সেন্ট স্টিফেন’সও এরই মধ্যে রেখেছে তাদের ক্রিকেট প্রতিভার স্বাক্ষর। দিয়েছে যোগ্যতার প্রমাণ। জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতীক্ষায় ব্যাকুল সমাগত বিপুল দর্শক। অবশেষে শুরু হলো খেলা। টসে জিতে ব্যাট করতে নামে স্টিফেনের সন্তানরা। ১১৪ রানের টার্গেট ছুড়ে দেয় আলীগড় একাদশের দিকে। মাঝবিরতি। দিল্লির বিখ্যাত জামে মসজিদে নামাজ আদায় করে আলীগড়ের ক্রিকেটাররা। মোনাজাতে আরো একটি বিজয় যে তারা কামনা করেছিল, তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু বিধিবাম! দুপুরের খাবারের পর পুনরায় শুরু হওয়া খেলায় মাত্র ৭৬ রানে অলআউট হয় সফরকারী দল। হেরে যায় ৩৮ রানের ব্যবধানে। চুপচাপ তারা হেঁটে যাচ্ছে কোয়ার্টারের দিকে। চোখে-মুখে স্পষ্ট পরাজয়ের গ্লানি। লজ্জার ছাপ। এমন সময় ভেসে এল দুয়ো। ‘আলীগড়ে ফিরে যাও আর গাজাক (তিল ও গুড় দিয়ে তৈরি আলীগড়ের বিখ্যাত মিষ্টান্ন) খাও’। দিল্লিওয়ালাদের একটি দল এ আওয়াজ দিতে দিতে তাদের তাড়া করে সম্পূর্ণ পথ। এ যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া। অপমানের আর কিছু বাকি থাকে! কিন্তু না। আলীগড়ের যুবাদের নসিবে আরো পাওনা ছিল। একই সময় দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল মুসলমানদের প্রথম শিক্ষাবিষয়ক কনফারেন্স। সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন আলীগড়ের অভিজাত স্যার সৈয়দ আলিয়া রহমত। দিল্লির অ্যাংলো-অ্যারাবিক কলেজে তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। অতিথি ক্রিকেটারদের আবাসও ছিল সেখানেই। আলীগড়ের পরাজয়ের কথা তার কানে পৌঁছে। যখন ক্রিকেটাররা কলেজে পৌঁছল, তিনি তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি করে নাকফুল আনার নির্দেশ দিলেন। তিনি বলেন, সেন্ট স্টিফেন’সের কাছে হেরে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা পুরুষ নয়, নারী!

এর বিপরীত চিত্রও ছিল। যখন তারা কোনো ম্যাচে জয়লাভ করত, তখন প্রশংসার বন্যা বয়ে যেত। কলেজের ছাত্ররা বিজয়ী খেলোয়াড়দের সম্মানে উর্দু কবিতা রচনার প্রতিযোগিতা করত। ক্রিকেটের প্রতি মুসলমানদের ছিল এমনই আগ্রহ। আর তার কেন্দ্রে ছিল আলীগড়। আরো নির্দিষ্ট করে বললে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। 

মোহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ। ১৮৭৫ সালে সমাজ সংস্কারক স্যার সৈয়দ আহমদ খান ভারতের উত্তর প্রদেশের আলীগড় শহরে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে তা আলীগড় কলেজ নামে পরিচিতি পায়। ১৯২০ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। নাম হয় ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। মুসলমানদের মধ্যে তিনি নবজাগরণ ঘটাতে সক্ষম হন। তার প্রচেষ্টায় মুসলমানরা ইংরেজি ভাষা এবং পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে প্রচেষ্টারই অন্যতম মূর্তরূপ এ বিদ্যায়তন। নামের মতোই তিনি এখানকার মুসলমান শিক্ষার্থীদের জীবনে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যথার্থ যোগাযোগ ঘটাতে সচেষ্ট ছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ঘটে ক্রিকেট যোগ। 

মজার ব্যাপার হলো, মুসলমানদের ক্রিকেট যাত্রা যার মাধ্যমে হয়েছিল, তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ। নাম রাম শংকর মিশ্র। তিনি আলীগড় কলেজের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন। ১৮৭৮ সালে তিনি কলেজে একটি ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। এর সদস্য ছিল ২২ জন। প্রতি সদস্যকে অগ্রীম ৩ রুপি করে চাঁদা দিতে হতো। সে রুপি দিয়ে তাদের জন্য ক্রিকেট উপকরণ ও টিফিনের ব্যবস্থা করা হতো। অনুশীলনের পর পরিবেশন করা হতো ভাজা ছোলা ও বিস্কুট। হিন্দু পণ্ডিত নাও ভাসিয়েছিলেন। তবে পালে জোর হাওয়া দেয়ার কাজটি করেছিলেন এক ইংরেজ ভদ্রলোক, থিওডোর বেক। 

১৮৮৩ সালে থিওডোর বেক আলীগড় কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এ পদে থেকেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। দায়িত্ব পালনের ১৬ বছরে তিনি ক্রিকেটকে পরিণত করেছিলেন কলেজটির প্রাণভোমরায়। তার শিক্ষা কর্মসূচির প্রধান অংশ ছিল ক্রিকেট। তার কাছে ক্রিকেট ছিল আত্মনির্ভরশীলতা, শারীরিক উদ্দীপনা, সাহস ও দলীয় চেতনার প্রতীক। তার মতে, একটি কলেজের খ্যাতি মূলত এর ক্রিকেট একাদশের সাফল্যের ওপরই নির্ভর করে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরই তিনি তার দল নিয়ে পাঞ্জাবে ক্রিকেট সফরে যান। এ সফর ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। ১৮৮৭ সালে অধ্যাপক ওয়ালাস নামে আরেক ইংরেজকে তিনি কলেজের ক্রিকেট ক্লাব পরিচালনার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। ওয়ালাস যখন দায়িত্ব নিয়ে আসেন, তখন কলেজের ক্রিকেট একাদশের ইউনিফর্মে ছিল পশমি ট্রাউজার, সাদা শার্ট, লাল বেল্ট ও তুর্কি টুপির সমন্বয়। এর সঙ্গে তিনি যোগ করলেন লাল সাটিন কাপড়ের বর্ডার দেয়া কালো চোস্ত একটি জ্যাকেট। বাম পকেটে সুন্দর করে সেলাই করা ছিল কলেজের মনোগ্রাম। কলেজের ভেতরে ও বাহিরে সব অনুষ্ঠানে এ জ্যাকেট পরিধান করা বাধ্যতামূলক ছিল। এ পরিচ্ছদ তাদের স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলত, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঈর্ষার কারণ হতো। ওয়ালাস আরেকটি কাজ করেছিলেন। প্রতি বছর কলেজের ক্রিকেট একাদশের সদস্যদের নাম একটি বোর্ডে লিখে কমন রুমের দেয়ালে টাঙানোর রেওয়াজ চালু করেন। ক্রিকেট টিম দ্রুত কলেজের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। যে ছাত্ররা ক্রিকেট খেলতে জানত, তারা খেলত; যারা পারত না, তারা হাততালি দিত। মোটকথা, ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে কলেজটির বর্তমান ও সাবেক সব শিক্ষার্থীর আগ্রহ উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। 

ক্রিকেটের প্রতি আলীগড়ের ছাত্রদের ভালোবাসা ছিল নিঃস্বার্থ। তবে বাড়তি পাওনা হিসেবে এটি তাদের সামাজিক অগ্রগতির বাহন হয়ে উঠেছিল। কলেজের অন্তর্ভুক্ত দক্ষ খেলোয়াড়রা স্থানীয় ইংরেজদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। ক্রিকেট দক্ষতা তাদের এমন সব চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দিত, অনেকের শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে তা লাভ করা ছিল অসম্ভব। তারা পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারপতি, শিক্ষকসহ আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সব চাকরিতে নিয়োগ পেত। আলীগড়ের মুসলমান অভিজাতরা এমনিতেই ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন, ক্রিকেট তাদের শাসকের আরো কাছাকাছি নিয়ে এল। 

আনলাকি থার্টিন বলে একটি কথা আছে। তবে আলীগড় কলেজের ক্ষেত্রে এটিই ছিল সবচেয়ে লাকি সংখ্যা। এ কলেজের সবচেয়ে মর্যাদাবান ছাত্র হিসেবে বিবেচিত হতেন ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। আর অধিনায়কের জন্য বরাদ্দ ছিল স্যার সৈয়দ ছাত্রাবাসের পূর্ব দালানের ১৩ নম্বর কক্ষ। রেওয়াজ অনুসারে, যখন যিনি অধিনায়ক হতেন, তিনি এ কক্ষেই থাকতেন। অসংখ্য ট্রফি ও কাপে ভরপুর কক্ষটি ছিল আলীগড়ের তীর্থভূমি। অধিনায়কদের অন্যতম ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা মাওলানা শওকত আলী।

ভারতের ক্রিকেট খেলার প্রাথমিক যুগে সব মুসলমান খেলোয়াড় আলীগড় কলেজ থেকেই বের হয়ে আসত। বিংশ শতকের প্রথম ভাগে একটি সর্বভারতীয় ক্রিকেট দল ইংল্যান্ডে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে ১৯১১ সালের জানুয়ারিতে খেলোয়াড় সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বোম্বেতে কয়েকটি ট্রায়াল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সারা দেশ থেকে আগ্রহী ক্রিকেটাররা এতে অংশগ্রহণ করে। যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি দল চূড়ান্ত করা হয়। এদের মধ্যে ছয়জন পার্সি, তিনজন মুসলমান ও পাঁচজন ছিল হিন্দু। মুসলমান তিনজনই ছিল আলীগড় কলেজের ছাত্র। 

আলীগড় কলেজে মুসলমানদের ক্রিকেট খেলার যে যাত্রা, ১৯১২ সালে তা নতুন মাইলফলক অর্জন করে। সে বছর মুসলমানরা বোম্বের বার্ষিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পায়। এর আগে ইংরেজ, পার্সি ও হিন্দুদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতো এ টুর্নামেন্ট। মুসলমানদের অংশগ্রহণে পূর্ণ হলো চতুর্ভুজ। টুর্নামেন্টের আকর্ষণ বহুগুণে বেড়ে গেল। বাড়ল দর্শকসংখ্যা। বোম্বে টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া প্রথম মুসলিম দলটির অধিনায়ক ছিলেন দাউদ ন্যান্সি। কাঁটাচামচ ও ছুরিতে অভ্যস্ত সাহেবি কেতার ভদ্রলোক।

তৎকালীন আলীগড় কলেজ থেকে যাত্রা করেছিল মুসলমানদের ক্রিকেট। সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সর্বভারতীয় ক্রিকেট একাদশে মুসলমানদের অংশীদারত্ব চলমান। ১৯৮৩ সালে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ জয় করে। বিজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন উইকেটকিপার সৈয়দ মুজতবা হোসাইন কিরমানী। এ বিশ্বকাপে সেরা উইকেটকিপারের পুরস্কার লাভ করেন ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বরে মাদ্রাজে জন্মগ্রহণকারী এ মুসলিম ক্রিকেটার। ২০১১ সালে ভারত দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে বিজয় লাভ করে। এ দলের মুসলিম সদস্য ছিলেন জহির খান ও ইউসুফ পাঠান। বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেট একাদশের মধ্যে মোহাম্মদ শামি, উমরান মালিক ও মোহাম্মদ সিরাজ সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন। 


রবিউল হোসাইন: লেখক