দিন কয়েক হলো আমি ও আমার স্ত্রী শ্রীমতি হলেণ গ্রিন জোহানেসবার্গ শহরের একটি গেস্টহাউজ সংলগ্ন ছোট্ট কটেজে বাস করছি। গেল রাতে সে জানতে চায়, ‘আর ইউ স্টিল ইন্টারেস্টেড টু লিভ ইন জোহানেসবার্গ?’ আমি প্লেয়ারে একটি সিডি চড়াতে চড়াতে জবাব দেই, ‘ইনডিড অ্যান ইন্টারেস্টিং মেট্রোপলিটন, চলো— আগামীকাল একসঙ্গে জোহানেসবার্গ এক্সপ্লোর করি।’
একসঙ্গে এক্সপ্লোর করার প্রস্তাবটি যে হলেণ সিরিয়াসলি নিয়েছে, তার পরিষ্কার আলামত পাওয়া যায় আজ সকালে ডাইনিংরুম থেকে ব্রেকফার্স্ট সেরে কটেজে ফেরার পর। পর্যটনী তথ্যে ভরপুর পুস্তকাদি ও চিত্রিত ব্রশিয়রগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে সে বিছানার ওপর মেলে ধরে জোহানেসবার্গ নগরের একাধিক মানচিত্র। তারপর টেলিফোন তুলে রিং করে ইহোনিকাকে। ইহোনিকার পুরো নাম ইহোনিকা ভেন ডের ব্রেগ। বুয়ার সম্প্রদায়ের এ কন্যাটি নগরীর অভিজাত বলে খ্যাত হৌগটন এলাকায় বসবাস করছে। তার সঙ্গে আমাদের দুজনের ঘনিষ্ঠতা হয় প্রায় ১৫ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থহাম্পটন শহরে। সামার ইনস্টিটিউট ফর লিটারেসি প্রফেশনালস নামে একটি ছয় সপ্তাহের আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সাউথ আফ্রিকা থেকে ইহোনিকা যোগ দিয়েছিল। হলেণ ছিল সামার ইনস্টিটিউটের প্রশাসক এবং আমি কাজ করছিলাম প্রশিক্ষক হিসেবে। তো এ সুযোগে আমাদের সঙ্গে গড়ে ওঠেছিল ইহোনিকার অন্তরঙ্গতা।
ফোন কল শেষ হতেই আমি জানতে চাই, ‘এতদিন পর ইহোনিকার সঙ্গে আমাদের কন্টাক্টকে ফের রিভাইভ করলে কীভাবে?’ হলেণ বুঝদারের মতো হেসে ছোটখাটো একটি ব্রিফকেস খুলে তার সংস্থার দেয়া সেলুলার ফোনটি দেখিয়ে এমন ভান করে যে— অদ্ভুত এ যন্ত্র দিয়ে চাইলে স্বর্গের দেবদূতের সঙ্গে পর্যন্ত কনভারসেশন করা যায়। আন্দাজ করি, অবসর সময়ে সে সেলুলার ফোন দিয়ে ইহোনিকার সঙ্গে পুরনো দিনের বাতচিত করে সময় কাটিয়েছে। আমি ‘হোয়াট ইজ গোয়িং অন উইথ ইহোনিকা টু-ডে,’ বলে আরেক দফা কৌতূহল প্রকাশ করলে— হলেণ সাসপেন্স বজায় রেখে জবাব দেয়, ‘ ইহোনিকা ইজ গোয়িং টু হেল্প আস উইথ টুডেজ ট্রিপ। আমি তার সঙ্গে আজকে ঘুরে বেড়ানোর একটি প্রোগ্রাম তৈরি করছি।’ অতঃপর সে মানচিত্রে গোটা তিনেক স্পট হাইলাইটার দিয়ে রঞ্জিত করে, অনলাইনে ব্রাউজ করে এক স্পট থেকে অন্য স্পটের ড্রাইভিং ডিসটেন্স ও যাতায়াতে কতটা সময় লাগতে পারে, তার ওপর উপাত্ত সংগ্রহ করে। অতঃপর কখন, কোথা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হবে, কোন জায়গায় প্রথম যাত্রাবিরতি ইত্যাদি নোটবুকে টাইপ করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জোহানেসবার্গের গলিগুঁজিতে ঘোরাফেরার জন্য সে একটি কর্মসূচি তৈরি করছে। জীবনের সব কিছুতেই সে পছন্দ করে নির্দিষ্ট রুটিন, তার ভ্রমণের তরিবত দেখে নিজেকে অর্বাচীন মনে হয়।
আরো বারকয়েক ইহোনিকার সঙ্গে হলেণের ফোনাফোনি হয়। স্ল্যাক্সের সঙ্গে ওয়াকিং সু পরে সে ব্যাকপ্যাকে ক্যামেরা, বাইনোকুলার ইত্যাদি গোছায়। আয়োজন দেখে মনে হয়, হলেণ পর্বতারোহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে! অতঃপর কাটায় কাটায় ১০টা ৪৫ মিনিটে ইহোনিকার পাঠানো ঝাঁ চকচকে বিএমডব্লিউ গাড়িটি আমাদের পিক করতে গেস্টহাউজে এসে পৌঁছায়। উর্দি পরা কৃষ্ণাঙ্গ শোফারের পেছনে আমরা কুশনে হেলান দিয়ে বসি।
জোহানেসবার্গের অলিগলি মসৃণভাবে পেরিয়ে যেতে যেতে অনেক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থহাম্পটন শহরে ইহোনিকার সঙ্গে পরিচয়ের দিনগুলো নিয়ে ভাবি। তার প্রাণবন্ত আচরণে আমরা কাছাকাছি এসেছিলাম দ্রুত। সামার ইনস্টিটিউটের সব সহকর্মীর সঙ্গে মিলেঝুলে দারুণ প্রাণপ্রাচুর্যে সে নিজেকে লিপ্ত রেখেছিল হরেক কিসিমের অনানুষ্ঠানিক তত্পরতায়। প্রচুর সিগ্রেট খেত ইহোনিকা। আর তার তীব্র নীল চোখ দুটিতে খনিজ বুদ্বুদে ভরপুর প্রস্রবণের মতো ঝিলিক পেড়ে ওঠত নিত্যনতুন আইডিয়া। শখের থিয়েটার দল গড়ে সে মঞ্চস্থ করেছিল শেক্সপিয়ারের ওথেলো নাটকের কিয়দংশ। তারপর কী কারণে জানি ইতালীয় ভাষায় সংলাপ উচ্চারণ করে চমকে দিয়েছিল আমাদের। আমি চলমান বিএমডব্লিউর মসৃণ শব্দের ভেতর যেন ইহোনিকার কণ্ঠস্বর পরিষ্কারভাবে শুনতে পাই, ‘উন বাছিও ডি পিন কারা, উন সসপিরো ডি পিউ, সোলো কোয়েস্তো কারা,’ বা ‘আরেকটি চুম্বন প্রিয়, দীর্ঘশ্বাস শুধু একবার, শুধু এটুকুই।’
ইহোনিকার চরিত্রের আরেকটি বিষয় আমাদের আকর্ষণ করেছিল। সাউথ আফ্রিকায় তখনো জারি ছিল শ্বেতাঙ্গশাসিত ‘এপারটাইট’ বা ‘বর্ণবিভাজন’ প্রথা। নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল কারামুক্ত হয়েছেন। ২৭ বছরের শ্বেতাঙ্গ বুয়ার কন্যা ইহোনিকা প্রশাসনিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে জোহানেসবার্গের শান্টি টাউন বা কৃষ্ণাঙ্গ বস্তিতে শুরু করেছিল বয়স্ক শিক্ষার ক্লাস। আপ্যায়নেও দরাজহস্ত ছিল সে। বয়স্ক শিক্ষার পদ্ধতির ওপর আমি লাইব্রেরি ঘেঁটে তাকে কিছু তথ্য জোগাড় করে দিলে সে আমাকে একটি মেক্সিকান রেস্তোরাঁয় ডিনারে নিয়ে গিয়েছিল। ভরপেট মসলাদার খাবারের সঙ্গে আমরা পান করেছিলাম রুপালি রিবন জড়ানো পেয়ালায় টাকিলা। মদালসা হতে তার দেরি হয়নি সেদিন। আমি ইতালীয় ভাষায় সংলাপটি ফের শুনতে চাইলে সে ইংরেজিতে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ওয়ান মোর কিস ডিয়ার.. ওনলি দিস’ বলে গণ্ডদেশ বাড়িয়ে দিয়ে ছড়িয়েছিল অন্তরঙ্গ উষ্ণতা।
আমাদের বিএমডব্লিউটি এসে পৌঁছায় হৌগটন আবাসিক এলাকায়। বিরাট আকারের শতাধিক শেডট্রির ছায়ায় রাজপথটি শ্যামল হয়ে আছে। আমরা অতিক্রম করে যাই তোরণে তোরণে বন্দুকধারী দারোয়ানঅলা বিশাল সব ম্যানসন। এক পাশে প্রসারিত গলফকোর্স আমাদের দৃষ্টিতে ছড়িয়ে দেয় সবুজ ঘাসের স্নিগ্ধ আবেশ। কোনো কোনো ম্যানসনের রড-আয়রনে তৈরি ফেন্সের ভেতরে লনে পোষা ঘোড়া বা জেব্রাকে চরে বেড়াতে দেখি। হলেণ আমার কব্জি চেপে ধরে বিরাট বিরাট ভিলাগুলোর দিকে ইশারা দিয়ে বলে, ‘দিস নেইভারহুড ইজ সো এলিগেন্ট।’ প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির লোগো আঁকা পিকআপ ট্রাকে সশস্ত্র গার্ডরা ধীরগতিতে টহল দিচ্ছে। এক জামানার শ্বেতাঙ্গ এ আবাসিক এলাকার আপাতত নিরাপত্তায় আমি রিলাক্সড বোধ করি। তখনই খেয়াল হয়, জাকারান্দার কিছু কিছু গাছপালায় ঝেঁপে এসেছে হালকা গোলাপিতে বেগুনি রঙের ১ সেন্ট দেয়া পত্রালি। দূর থেকে দেখি, জাকারান্দা ঝাড়ের বর্ণাঢ্য ছত্রীতলে রিলাক্সড ভঙ্গিতে গল্প করতে করতে বাইসাইকেল হাঁকাচ্ছেন দুই শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। তাদের পাশ দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ এক মহিলা মেইড ঠেলছেন বেবিস্ট্রলার, তাতে তুলতুলে কম্বল মুড়ে বসা একটি শ্বেতাঙ্গ শিশু।
ইহোনিকা যে ভিলায় বসবাস করছে, সে ত্রিতল দালানটি তার পিতামহ নির্মাণ করেছিলেন ১৯০৭ সালে। এ ইমারতের সামনে ছোটখাটো পার্কের মতোই পুষ্পিত ঝাড়-লতা ও হরেক রকমের অলঙ্কৃত বৃক্ষে সাজানো আঙ্গিনা। ওখানে শনের বৃত্তাকার ছত্রীতলে সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার অভ্যর্থনা উষ্ণ হলেও ইহোনিকার ভেতর আমি ঠিক আগের প্রাণচাঞ্চল্য খুঁজে পাই না। তার শান্ত আচরণে চলে এসেছে খ্রিস্টীয় গির্জার সংসারত্যাগী নানদের উদাসীন নির্লিপ্তি। তার পোশাক-আশাকেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আগের মতো সংবেদন ছড়ানো শর্টস ও স্লিভলেস টপের জায়গায় সে পরে আছে ফ্লোরাল ডিজাইনের একটি সার্কোল স্কার্ট, সঙ্গে ছাই রঙের ঘটিহাতা টপ। চোখের নীলাভ দৃষ্টিপাতেও এসেছে কৌতূহলহীন অবসন্নতা। তবে মেয়েটি আগের মতোই আছে আপ্যায়নে ব্যতিক্রমী রকমের উষ্ণ। টেবিলে সে রুপার ছোট্ট বালতিতে বরফে ঘেরা শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সম্ভাষণ বিনিময়ের পর নিপুণ হাতে সে ছিপি খুলে তাতে অরেঞ্জ জুস মিশিয়ে মিমোজা মিক্স তৈরি করে। আমরা তা পান করতে করতে আমাদের দিনযাপনের হালচাল নিয়ে কথা বলি। ইহোনিকা মাসখানেক আগেও ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা বা ইউনিসাতে ফেকাল্টি হিসেবে পড়াত বয়স্ক শিক্ষাবিষয়ক কোর্সগুলো। মাত্র কিছু দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অধ্যাপনা থেকে মুক্তি দিয়েছে। এ চাকরিচ্যুতির পেছনে মূল কারণ হচ্ছে— ‘ব্ল্যাক এমপ্লয়মেন্ট এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাক্ট’-এর বাস্তবায়ন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সিংহভাগই হচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাদামি গাত্র বর্ণের ‘পিপল অব কালার’, তাই প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছে শ্বেতাঙ্গ ফ্যাকাল্টিদের ছাঁটাই করে তার জায়গায় কৃষ্ণাঙ্গ বা পিপল অব কালার ফ্যাকাল্টি নেয়ার। ইহোনিকার চাকরিচ্যুতির সংবাদে আমরা ব্যথিত হই। সমবেদনা জানিয়ে বলার মতো কোনো পয়েন্ট খুঁজে পাই না। আমাদের কথাবার্তার সুর যেন কেটে যায়। গ্লাসের গায়ে জমা বরফ গলা জলের বিন্দুগুলো নখে খুঁটতে খুঁটতে ইহোনিকা তাকিয়ে থাকে আঙ্গিনার ছায়াচ্ছন্ন পরিসরের দিকে। তার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে আমিও তাকাই ওই দিকে, দেখি— বাঁশবনে মৃদু হাওয়ায় ঝংকারের মতো কাঁপছে পত্রালি। ওখানে কাঠে তৈরি দুটি রঙচঙে জিরাফ কেন জানি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে।
পেয়ালায় আরেক দফা মিমোজা ঢেলে ইহোনিকা আলাপের প্রসঙ্গ বদলায়। তার সহানুভূতিসুলভ কথাবার্তা শুনে মনে হয়— সপ্তাহখানেক আগে জোহানেসবার্গে আমাদের ভাড়া করা বাড়ি থেকে আসবাবপত্রের লুণ্ঠন এবং আমার ছিনতাইকারীদের পাল্লায় পড়ে ছুরিকাহত হওয়ার বিষয়আশয় সম্পর্কে সে ভালোভাবেই অবগত। আন্দাজ করি, তথ্যগুলো সে জেনেছে হলেণের সঙ্গে সেলুলার ফোনে বাতচিত করে। জানতে পারি, জোহানেসবার্গ শহরে এ ধরনের ঘটনা হালফিল এত বেশি ঘটছে যে, সে ছিনতাই ভিকটিমদের ত্রাণ দেয়ার জন্য নিজেই ছোট্ট একটি কর্মসূচি চালাচ্ছে। তার ভিলার পেছন দিকে আছে দুই কামরার একটি পারিবারিক গেস্টহাউজ। কেউ যথাসর্বস্ব খোয়ালে এখানে এসে দু-এক রাত থাকতে পারেন। প্রয়োজনে হাসপাতাল বা এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য ভিকটিমরা তার একাধিক গাড়ি ও ড্রাইভারের সহায়তা নিতে পারেন। উপরন্তু ট্রমা কাউন্সেলিং ওপর বিলাতের ডিগ্রিধারী ইহোনিকা ভিকটিমদের পরামর্শ দিয়েও সাহায্য করছে।
কথা বলতে বলতে আমরা কাটগ্লাসের পেয়ালা হাতে ভিলার বাগান দেখতে উঠে পড়ি। জিরাফের বর্ণাঢ্য মূর্তি দুটি ছাড়িয়ে বাঁশবনের পেছনে আসতেই দেখতে পাই স্তূপ করে রাখা অনেকগুলো ছোট-বড় পাথর, তার পাশে পেতে রাখা বেতের চেয়ার-টেবিল। জানতে পারি, ভিকটিমরা ভিলা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এখানে বসে তাদের পছন্দ মতো পাথরে একটি ‘উইশ’ বা আকাঙ্ক্ষা বা প্রার্থনা লিখে রেখে যান। ইহোনিকা আমাদের হাতে দুটি মার্কার পেন তুলে দিলে— তার অনুরোধটি আমরা বুঝতে পারি। আমি ও হলেণ দুটি পাথর তুলে নিই। একটিতে আমি ‘মে উই সেফলি মুভ অ্যারাউন্ড ইন জোহানেসবার্গ’ লিখলে হলেণ অন্যটিতে লিখে ‘মে ইউ ফাইন্ড ইন্সপায়ারেশন টু লিভ ইন জোহানেসবার্গ।’ লেখা হলে আমরা পাথর দুটি নিয়ে পুষ্পিত জেসমিন কুঞ্জের পেছনে আসি। ওখানে সিমেন্টে বাঁধানো চতুষ্কোণ ফ্রেমের ভেতর রাখা অন্য ভিকটিমদের উইশ লেখা অনেকগুলো পাথর। খানিক নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে আমরাও আমাদের পাথর দুটি তাতে মেশাই।
হলেণের কর্মসূচি অনুযায়ী আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নেলসন ম্যান্ডেলার স্মৃতিবিজড়িত লিলিজলিফ ফার্ম। আমি ওখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠি। কিন্তু ইহোনিকা তার গ্র্যান্ড পেরেন্টসদের সংগৃহীত বইপত্রে ভরপুর পারিবারিক লাইব্রেরিটি দেখানোর জন্য ইনসিস্ট করে। গ্রন্থাগারটির অবস্থান বাসভবনের তিনতলায়। আমরা ওখানে যেতে প্রথমে নিচ তলার গ্র্যান্ড হলরুমে ঢুকি। কামরাটি বেশ বড়, চারদিকের দেয়ালে ঝুলছে বিগত জামানায় জোহানেসবার্গে বলনাচের দৃশ্য আঁকা তৈলচিত্রাদি। সিনেমা দেখানোর জন্য আদ্যিকালের একটি প্রজেক্টরও ওখানে দেখতে পাই। তার পাশে কাচের কাসকেটে রাখা পরিবারের পোষা জিরাফের দীর্ঘ গলার হাড়গোড়ে তৈরি কঙ্কালের খণ্ডাংশ। যে লিফট যোগে আমরা তিনতলায় রওয়ানা হই, তাও মহর্ঘ কাঠ খোদাই করে তৈরি খোলামেলা পিঞ্জিরার মতো। তাতে চড়ে ইহোনিকা খুব গর্বের সঙ্গে জানায়, তার জন্মের অনেক আগে ডোমেস্টিক সারভেন্টসরা এ বস্তু কপিকল দিয়ে টেনে ওঠানামা করাত। বর্তমানে অবশ্য দ্রুতগতির নিশ্চয়তা বিধান করতে একটি মোটর যুক্ত করা হয়েছে। লিফটটি পাকাপোক্তভাবে দেয়ালে আটকানো আছে কিনা, সে দুর্ভাবনায় আমি দোয়াদুরুদ পাঠ করার চিন্তা করি।
পারিবারিক লাইব্রেরিটি আকারে তেমন বড় নয়, তবে গালিচা পাতা কামরাটিতে আলো-হাওয়া খেলছে প্রচুর। মধ্যিখানে বেতের সোফায় আয়েশ করে বসে ম্যাগাজিন দেখার বন্দোবস্ত। ইহোনিকার পিতামহ ভালোবাসতেন গবাদিপশু, তার খামারে ছিল পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সংগ্রহ করা হরেক আকৃতির গরু। তার কিতাবাদির সংগ্রহেও স্পষ্টত সে আগ্রহের প্রতিফলন দেখতে পাই। গরু বিষয়ে যে নানা ভাষায় এত বইপুস্তক লেখা হয়েছে, এ বিষয়ে আমি অবগত নই বলে লজ্জিত হই, ইহোনিকা আমার প্রতিক্রিয়ায় হতচকিত হয়ে বলে, ‘খুঁজলে হয়তো অন্য বিষয়েও দুই-চারটা বই তুমি পেয়ে যাবে।’ আমি খোঁজাখুঁজি করতে তেমন একটা উৎসাহ পাই না। তবে কথাবার্তায় বুঝতে পারি, তার পিতামহের গরু ছাড়া জরুতেও আগ্রহ ছিল ব্যাপক মাত্রায়। জীবনে তিনি বিবাহিত হয়েছিলেন মোট পাঁচবার। প্রথম পত্নী জোহানেসবার্গে দিনযাপনের ক্লেশে অতিষ্ঠ হয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। দ্বিতীয় জন পালিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে ঘর বাঁধেন পাশের দেশ নামিবিয়ার এক ঔপনিবেশিক যুগের জার্মান রাজপুরুষের সঙ্গে। তৃতীয় ও চতুর্থ পত্নী সম্পর্কে ইহোনিকা নিজেও তেমন কিছু জানে না। তবে তাদের সবার বলগাউন পরা তৈলচিত্র ঝুলছে লাইব্রেরি কামরায় নানা অ্যাঙ্গেল থেকে। আন্দাজ করি, তার পিতামহ গরুবিষয়ক গভীর রসের প্রবন্ধাদি পাঠ করতে করতে মাঝে মাঝে তার অপঘাতে প্রয়াত বা পলাতক পত্নীদের চিত্রে আঁকা অবয়ব প্রত্যক্ষ করে স্মৃতিকাতর হতেন।
পরিবেশিত হয় হালকা সৌরভে মন চনমন করা জেসমিন টি। তা পান করতে করতে ইহোনিকা স্ক্রিন ঠেলে আমাদের নিয়ে ঢোকে খুপরি মতো আরেকটি কামরায়। তার পিতামহের পঞ্চম বা সর্বকনিষ্ঠ স্ত্রী ছিলেন ইহোনিকার দাদি। মহিলার জন্ম হয় তত্কালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার জয়পুরে। তার পিতা রাজপুতানার করদরাজ্য জয়পুরে পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। বাবার কর্মসূত্রে ইহোনিকার দাদি কিছু দিন দিল্লি ও কলকাতায়ও কাটান। তার সংগ্রহের পুরোটা জুড়ে আছে ভারতবর্ষ নিয়ে ঔপনিবেশিক প্রশাসক ও ইউরোপীয় পর্যটকদের লেখা বইপত্র। আমি আগ্রহ নিয়ে পুস্তকগুলো দেখতে শুরু করলে ইহোনিকা দেয়াল থেকে চিত্র সরিয়ে নেয়া খালি দুটি পরিসর দেখিয়ে বলে, ‘ক্যালকাটা থেকে আমার গ্র্যান্ডমাদার দুটি চিত্র সংগ্রহ করেছিলেন, তার একটি ছিল যামিনী রায়ের আঁকা, অন্যটির শিল্পী ছিলেন রবি বর্মা। আমার বড় ভাইয়ের চিত্র সংগ্রহে ঝোঁক আছে, বছর দেড়েক আগে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হয়ে দেশত্যাগের সময় সে চিত্র দুটি নিয়ে গেছে।’
হলেণ ভারতবর্ষবিষয়ক বইপত্রে কোনো আগ্রহ দেখায় না। আমি যামিনী রায় ও রবি বর্মা নিয়ে তাকে একটু ধারণা দিতে চেষ্টা করি। কিন্তু তার চেহারা-সুরত দেখে মনে হয়, আফ্রিকান সাফারি নিয়ে বাতচিত করলে সে বরং খুশি হবে। তো আমরা বেরিয়ে আসি খোলামেলা ছাদে। ওখানে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা পাথর খণ্ড দিয়ে তৈরি একটি রুকাসুখা রক গার্ডেন। বেজায় ভারী বোল্ডারের ওপর থেকে লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি ওঠে গেছে গোলাকার খোলামেলা লুকআউট টাওয়ারে। ওখানে উঠে পড়তেই সবুজাভ গাছপালায় ছায়াচ্ছন্ন হৌগটন আবাসিক এলাকাটি পুরো দেখা যায়। ইহোনিকা পিলারের আড়ালে গিয়ে বাতাস বাঁচিয়ে সিগ্রেট ধরায়। দুপুরের চড়া রোদ্দুরে ম্যানসনগুলোর পেছনের আঙ্গিনায় নীলাভ দ্যুতি ছড়িয়ে ঝলমল করছে অনেকগুলো সুইমিংপুল। আমি আলাভোলা হাওয়ায় শরীর জুড়াতে জুড়াতে রেলিংয়ে ভর দিয়ে তাকিয়ে থাকি কাছাকাছি একটি ম্যানসনের ব্যাকইয়ার্ডে। কাঠের ফেন্সে ঘেরা হর্স-ক্র্যালে কয়েকটি দৌড়ের ঘোড়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে।
হলেণ এক্সাইটেড হয়ে বলে ওঠে, ‘লুক, দেয়ার আর লায়নস!’ আমি ঘুরে লুকআউট বেলকনির অন্যদিকে চলে আসি। দেখি— খানিক দূরে, হর্স-ক্র্যালের বাইরে পাথরের একটি প্রাকৃতিক ঢিবি। তাতে চড়ে বসেছে বাদামি রঙের একটি মাদি সিংহ। স্বাস্থ্যবান এক শ্বেতাঙ্গ বুয়ার প্রাপ্তবয়স্ক সিংহীর পিঠে হাত বুলিয়ে খাড়া হয়ে চারদিকে তাকিয়ে যেন স্ক্যান করে। দুটি সাদা রঙের শিশু-সিংহ গুটিগুটি পায়ে উঠে আসে পাথরের ঢিবির ওপর। বুয়ার তরুণ লুকআউট টাওয়ারে আমাদের স্পট করতে পেরে হাত নাড়ে। ইহোনিকা ওয়েব-ব্যাক করে বলে, ‘যুবকটির নাম আরনো কমোগেলো। এ পরিবার দৌড়ের ঘোড়া ব্রিড করে বিদেশে চালান দেয়। তার বাবা সিংহ ব্রিডিংয়ের একজন খ্যাতনামা এক্সপার্ট। তাদের গেম রিজার্ভে কমারশিয়ালি পোষা সিংহ শিকার করার ব্যবস্থা আছে।’ আরনো এবার ইহোনিকার দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত চুমোর ভঙ্গি করলে ইহোনিকা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘এ হচ্ছে পাজির পা ঝাড়া। স্কুলে পড়ার সময় আমার ওপর তার ক্র্যাশ হয়। কতবার কতভাবে রিজেক্ট করেছি, তার পরও আমাকে হামেশা জ্বালাতন করে। চলো— আমরা নিচে নামি, এখানে থাকলেই সে এখন সিংহের পোষা বাচ্চা দিয়ে সার্কাসের ট্রিক দেখাতে শুরু করবে।’
বাগানে নেমে আসতেই দেখি— শনের ছত্রীতলে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ডোমেস্টিক ওয়ার্কার লাঞ্চের আয়োজন করে বসে আছে। বাসমতি রাইসের সঙ্গে আমাদের পরিবেশন করা হয় গলদা চিংড়ির কেইপ মালয় কারি। খেতে খেতে হলেণই প্রথমে নজর করে— ইহোনিকার অনামিকায় ডায়মন্ডের আলো ঝলাসানো এনগেজমেন্ট রিং। বিষয় কী— জানতে চাইলে ইহোনিকা জবাব দেয়, ‘ইয়েস, আই ওয়াজ এনগেইজড এইট মান্থস এগো। তার নাম এডোনিস ল্যানচোর। বাট হি ইজ নো লংগার আরাউন্ড।’ হলেণ ফের জানতে চায়, ‘সে কী বর্তমানে বিদেশে আছে?’ ইহোনিকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘দ্যাটস অ্যা লং স্টোরি, প্রথমে তোমরা খাওয়াটা এনজয় করে নাও। আজকে তো সারা দিন আমরা একসঙ্গে আছি। ঠিক আছে হলেণ, তোমাদের পুরো ঘটনাই খুলে বলব।’ ঠিক বুঝতে পারি না, ইহোনিকার এনগেজমেন্ট নিয়ে কী ঘটেছে। আমি কৌতূহলে উদগ্রীব হই। ডোমেস্টিক ওয়ার্কার হাফ প্লেটে করে এবার পরিবেশন করেন কয়েকসিসটার নামে শুকনা নারকেলের কুচি মাখানো এক ধরনের কেক বা ডোনাট। সঙ্গে কড়া ধাচের অ্যাসপ্রেসো কফি। তিতকুটে অ্যাসপ্রেসোর সঙ্গে সুপার সুইট কয়েকসিসটার খাওয়ার পরই উর্দি পরা শোফার এসে জানায়, গাড়িবারান্দায় জাগুয়ার কানভার্টিবল গাড়িকে রেডি করা হয়েছে, সে ইহোনিকার হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিলে বুঝতে পারি— এবার আমাদের উঠতে হবে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।






