‘ও ইয়ার হ্যায় জো খুশবু কি তারাহ

জিস কি জুবান উর্দু কি তারাহ।’

বন্ধু আমার সুবাসের মতো

তার কথা উর্দুর মতো মিষ্টি।

বলিউডের অসম্ভব জনপ্রিয় ‘সাইয়া! সাইয়া!’ গানের প্রথম দুটি লাইন। গানটি ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া দিল সে সিনেমার। গানটির গীতিকার গুলজার। কবি তার বন্ধুর মুখের কথাকে উর্দুর মতো মিঠা কল্পনা করেছেন। গুলজার নিজেও উর্দুতে কবিতা লিখেছেন। আমির খসরু থেকে গালিব আর গালিব থেকে জাভেদ আখতার— উর্দু কাব্যের ঋদ্ধ ইতিহাস সবারই কমবেশি জানা আছে। প্রেম থেকে প্রতিরোধ সংগ্রাম— সবখানেই উর্দু কাব্যের সরব উপস্থিতি। আজকের আলোচনা উর্দু কাব্যের প্রতিবাদী ধারা প্রসঙ্গে। ফৈজ আহমেদ ফৈজ (১৯১১-১৯৮৪) উর্দুতে লিখেছিলেন—

আমার কলম ছিনিয়ে নিলে

হূদয়ের রক্তে আঙুল ডুবিয়ে লিখব

মুখে শিকল পরিয়ে দিলে

শিকলের প্রত্যেকটা খণ্ডই আমার কথা বলার জিহ্বা হয়ে যাবে।

ফৈজ আহমেদ ফৈজের এ বক্তব্য দারুণভাবে রাজনৈতিক। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রবেশের আগে আমরা একবার শিল্প-কাব্যের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে কয়েকজন উর্দু কবির ধারণাকে আমলে নিতে চাই। কারণ নন্দনতত্ত্ব নিয়ে এ ধারণা তাদের রাজনৈতিক, প্রতিরোধের চিন্তার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত বলেই মনে হয়। গালিব লিখেছিলেন—

কারো প্রশংসা পাবার লোভ নেই, পুরস্কারেরও পরোয়া করি না।

আমার কবিতা যদি আপনার কাছে অর্থহীন মনে হয়, তাহলে তা তা-ই।

অন্যদিকে গত শতকের অন্যতম উর্দু কবি, গীতিকার সাহির লুধিয়ানভি (১৯২১-১৯৮০) বলেছিলেন—

মানুষ আমাকে শিল্পী মনে না করলে আমার কোনো আফসোস নেই

চিন্তা ও শব্দের ব্যাপারিরা আমার কবিতাকে কাব্য বলে মনে করে না।

অর্থাৎ সাহিরের কথা স্পষ্ট, তিনি কবিতার প্রথাগত রীতির কাছে আবদ্ধ নন। মানুষ তাকে শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দিল কিনা, তা নিয়েও তার মাথাব্যথা নেই। সাহির সাড়া দিয়েছিলেন গত শতকের চল্লিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বানে— শিল্পকে গরিব-নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অধীনস্থ হতে হবে।

গালিব ও সাহির দুজনই খ্যাতি কিংবা স্বীকৃতিকে পাত্তা দেননি। পাঠক তাদের মূল্য দিচ্ছে কিনা, তা নিয়েও তাদের মাথাব্যথা ছিল না। তবে গালিব ও সাহিরের এ ধারণার মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য অবশ্য ছিল। গালিবের কবিতা তার ভাষার কারুকাজে সবাই বুঝতেন না। আর সে পরিপ্রেক্ষিতে গালিব বলেছিলেন, তার কবিতা মানুষ বুঝল কিনা, তা নিয়ে তিনি ভাবিত নন। আর সাহিরের ভাবনা ছিল ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে। সাহির আধ্যাত্মিক ধারণা ও ভাষার কারুকাজ নিয়ে আভিজাত্যে ভুগতেন না। তার কথা ছিল, কবিতাকে সমসাময়িক বিষয়বস্তুর সঙ্গে আত্মীয়তা করতে হবে।

গালিব তার কাব্যের প্রেরণার উৎস সম্পর্কে বলেছেন—

এ কাব্য আসে শূন্য থেকে

গালিব, কাগজের ওপর কলমের আওয়াজ

যেন ফেরেস্তার ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

আর সাহিরের প্রেরণা কিন্তু একেবারে ভিন্ন। সাহির আধ্যাত্মিক কিংবা পরকালের জগৎ নিয়ে চিন্তিত নন। তার মনোযোগ এ দুনিয়াতেই, তাই নিজের কাব্যগ্রন্থ তালখিয়ার এপিগ্রাফ হিসেবে লিখেছেন—

‘দুনিয়া আমায় অভিজ্ঞতা আর দুর্ঘটনা হিসেবে যা উপহার দিয়েছে, সেসব বলতেই আমি ফিরে এসেছি।’ উল্লেখ্য, ২৩ বছর বয়সেই সাহিরের কাব্যগ্রন্থ তালখিয়ান প্রকাশিত হয়েছিল এবং এ গ্রন্থকে দিওয়ান-ই গালিবের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় উর্দু কাব্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সাহির আরো লিখেছেন—

শরীর আর জিহ্বা মরে যাবার আগে

আওয়াজ তোলো, কারণ সত্য এখনো জীবিত

বলো যা তোমার বলা উচিত।

‘জনগণের সাহিত্য’ টার্মটি শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিকদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, বিতর্কের অবসান হয়নি। তবে এটা বোধহয় মেনে নেয়া ভালো যে, এ বিতর্কের হয়তো সমাধান নেই; বরং এ দ্বন্দ্বেই দুনিয়ার সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে। আমাদের আলোচনায় ফিরে যাই, ‘জনগণের সাহিত্য’র পক্ষে সাহিরের অবস্থান বেশ কঠোর—

যে শিল্প গরিবের কাছে পৌঁছায় না

সে তার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

‘জনগণের সাহিত্য’ কী বস্তু? সামাজিক পরিবর্তন আনতে সাহিত্য কি উসকানি দিতে পারে? সাহিত্য কি জনগণের বোধগম্যতার মান অনুযায়ী রচিত হবে, নাকি লেখকের মর্জি মোতাবেক? শ্রমজীবীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রামের সংগঠনের পাশাপাশি কি সাহিত্য সংগঠনেরও প্রয়োজন আছে? ১৯৩০-এর দশকে এসব প্রশ্ন ঘনিয়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের সাহিত্য সমাজে। এ সময় প্রতিষ্ঠিত হয় আলোচিত প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন (পিডব্লিউএ)। তখনকার ভারতবর্ষের উর্দুভাষী সাহিত্যিকরাই ছিলেন এ সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি। সংগঠনটি ১৯৩৫ সালে তাদের প্রকাশিত ম্যানিফেস্টোতে সাহিত্যকে অভিজাত, একাডেমিক ও অধঃপতিত মানুষদের দখল থেকে মুক্ত করতে চান। পিডব্লিউএর মতে, তারা সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে চান, তাদের বাস্তব সমস্যাকে সাহিত্যে ধারণ করতে চান। পিডব্লিউএ তাদের মতাদর্শের অনেকটাই ধার করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। প্লেখানভ, গোর্কি, মায়াকোভস্কির ধারণা পিডব্লিউএকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। পিডব্লিউএর উদ্বোধনী সভায় সভাপতি প্রেমচাঁদ ঘোষণা করেছিলেন, ‘সৌন্দর্যের ধারণাকে আমাদের বদলে দিতে হবে।’ সংগঠনের কবি-সাহিত্যিকরা প্রেমচাঁদের এ বক্তব্যকে হূদয়ে ধারণ করেছিলেন, আর তার ছাপ পড়েছিল তাদের সৃষ্টিতেও। সৌন্দর্যের উৎস কেবল নারীর শরীর নয়, বরং শ্রমিকের ঘামে ভেজা তোবড়ানো শরীরেও তারা সৌন্দর্যের দেখা পেলেন। যে-ই কথা সে-ই কাজ। মখদুম মহিউদ্দিন (১৯০৮-১৯৬৯) তার কবিতায় তেলেঙ্গানার শ্রমজীবী নারীদের নিয়ে লিখলেন—

তোমার নাম শুনে রাতের আকাশে তারারা দেখা দেয়

ভোর আর সাঁঝবেলার সৌন্দর্য তোমার চোখে কথা বলে

দেখো এ প্রকৃতি তোমায় সালাম জানাচ্ছে।

মাজরুহ সুলতানপুরী (১৯১৯-২০০০) লিখেছেন—

আমি শ্রমিক, আমি অন্ধকারের শত্রু

আমার হাসিই নতুন ভোর নিয়ে আসে।

শুধু শ্রমজীবীদের জীবন নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম, দেশভাগের যন্ত্রণা, বাংলার দুর্ভিক্ষ, সাম্রাজ্যবাদী লড়াই, যুদ্ধ বিরোধিতা, ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসন— সবই উর্দু কবিদের কবিতায় জায়গা করে নিয়েছিল।

কাব্যের মাধুর্যকে উর্দু কবিরা আর জাগাতে চাইলেন না, সুকান্তের মতো তারা গদ্যের হাতুড়ি পেটাতে চাইলেন পুঁজিপতি শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের কবিরা তখন শোষণের সমাজ ভেঙে শ্রমিকরাজ বা সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর। কবিতার বিষয়বস্তু আর ভাষায় সেটা স্পষ্ট। আজকের দিনে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমীর পিতা কাইফি আজমী (১৯১৯-২০০২) উর্দু সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি। কাইফি শ্রমিকের সব সমস্যার সমাধান দেখেছিলেন বিপ্লবে—&dquote;&dquote;

আর কতদিন আমি এই মরে বেঁচে থাকব

সময় এবার বদলাবে

আমার রক্ত গরম হচ্ছে, আমার কপাল ঘামে ভেজা

আমার হূদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে

বিপ্লব নেমে আসো, আমি প্রস্তুত আছি। 

সাহির লুধিয়ানভির কলমে যেন কাইফির আহ্বানের জবাব শোনা যায়—

ও সুভা হামি সে আয়েগি

সেই ভোর আমরাই আনব।

স্মরণ করা যেতে পারে ফৈজ আহমেদ ফৈজের বিখ্যাত কয়েকটি লাইন—

হাম দেখেঙ্গে

লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে, হাম দেখেঙ্গে

ও দিন কে জিস কা ওয়াদা হ্যায়

জো লাহু-এ আজল পে লিখা হ্যায়

হাম দেখেঙ্গে।

এখানে প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের কবিদের অবস্থান স্পষ্ট, দৃঢ়। গোর্কির সেই প্রশ্নের— ‘তুমি কোন পক্ষে?’— জবাব ফৈজ, সাহির, মখদুম, জাফরিরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দিয়েছিলেন। তারা নিপীড়িতের পক্ষে, তারা আন্তর্জাতিকতাবাদী। ফিলিস্তিন থেকে ভিয়েতনাম, পল রোবসন থেকে মার্টিন লুথার কিং— সবাই তাদের আপন। এখানে ইকবালের সঙ্গে ফৈজ, সাহিরদের একটি পার্থক্য স্পষ্ট। ইকবাল প্যান-ইসলামী ধারণার মানুষ, তার চিন্তার জোর ছিল নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে। কিন্তু ফৈজ, সাহিররা দুনিয়ার সব ধর্ম-বর্ণের শোষিত মানুষকে আপন করে নিয়েছিলেন। সাহির তার কবিতার প্রেরণা, নন্দনতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করলেন এক কবিতায়—&dquote;&dquote;

মেরে সারকাশ তারানো কি হাকিকত হ্যায় তো ইতনি হ্যায়

কে জব ম্যা দেখতা হু ভুক সে মারে কিসানো কো

গারিবো, মুফলিসো কো, বেকাসো কো বেসাহারো কো

তো দিল তাব-এ নিশাত-ই বাজম-এ ইশরাত লা নাহি সাকতা

ম্যায় চাহু তো ভি খোয়াবয়াভার তারানে গা নাহি সাকতা।

আমার গানগুলো রাগী রাগী হওয়ার কারণ আছে

আমি যখন ক্ষুধার্ত কৃষকদের দেখি

যখন গরিব, শোষিত, নিঃস্ব, নিরুপায় মানুষদের দেখি

তখন আমার হূদয় আনন্দে, উদযাপনে আপ্লুত হতে পারে না

আমি চাইলেও আর প্রেমের গান লিখতে পারি না।&dquote;&dquote;

এই ছিল সেই কাল পর্বে প্রগতিশীল উর্দু কবিদের প্রেরণা এবং এটাই ছিল প্রগতিশীল নন্দনতত্ত্ব; যা সফল হয়েছিল। আজো মানুষ এ কবিদের স্মরণ করে। সম্প্রতি পাকিস্তান কোক স্টুডিওতে ফৈজের হাম দেখেঙ্গে কবিতাটি থেকে নতুন করে গান তৈরি হয়েছে এবং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত, সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। এর আগে পাকিস্তানের প্রগতিশীল ব্যান্ড দল লালও গানটি তাদের বিভিন্ন শোতে গেয়েছে। তবে এখানে প্রসঙ্গত আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সাহির, ফৈজ, কাইফিদের কবিতা প্রলেতারিয়েতদের নিয়ে লেখা হলেও এদের মূল পাঠক ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ মধ্যবিত্তরা সমাজ বদল চাইলেও তারা সেই বিপ্লবে অংশ নিতে আগ্রহী ছিল না। পুরনো একটি প্রশ্ন এখানে নতুন করে রাখা যেতে পারে— দিন শেষে সাহিত্যের ভোক্তা কি সেই মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তরাই? ফৈজের হাম দেখেঙ্গে গানটিকে কোক স্টুডিওতে যে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে, তার গায়ক ও শ্রোতা মূলত মধ্যবিত্তই। 

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি নতুন কাল পর্বে প্রবেশ করে। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটতে শুরু করে। বিকশিত হয় বিরাট মধ্যবিত্ত শ্রেণী। ধীরে ধীরে সমাজের বিক্ষুব্ধ চরিত্রে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। মানুষের সামনে নানা ধরনের সুযোগ তৈরি হয়। সুবিধাবাদ বিকশিত হয়। মধ্যবিত্ত সমাজ নয়, বরং নিজের অবস্থান পরিবর্তনে চেষ্টা শুরু করে। সে সমাজ পরিবর্তন না করে বরং নতুন নতুন সুযোগকে ব্যবহার করে নিজে এগিয়ে যেতে চায়। দুই দেশেই নানা ধরনের আঞ্চলিক আন্দোলন মাথাচাড়া দেয়, মানুষের স্বার্থের পরিধি ছোট হয়ে আসে। সব মানুষের জন্য ন্যায়বিচার, বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার তীব্রতায় পতন লক্ষ করা যায়। এর প্রভাব উর্দু সাহিত্যেও পড়ে।&dquote;&dquote;

নিজের দেশের মানুষের অধিকারের পাশাপাশি উর্দু কবিদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভাবনার স্ফুরণও দেখা যায়। ১৯৫৫ সালে ফৈজ আহমেদ ফৈজ রাওয়ালপিন্ডির মন্টগোমারি কারাগারে বন্দি। কারাগারে বসেই আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের সমর্থনে কবিতা লেখেন—

আ যাও আফ্রিকা

আও বাবর কি চাল 

আ যাও আফ্রিকা।

মাথা তোলো আফ্রিকা

সিংহের মতো হেঁটে আসো

মাথা তোলো আফ্রিকা।

আমেরিকার বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ গায়ক ও অ্যাক্টিভিস্ট পল রোবসনকে নিয়ে আলী সর্দার জাফরি লেখেন—

কৃষ্ণা কা গীত হ্যায়, গোকুল কি হাসিন শাম হ্যায় তু

আ কলেজে মে লাগালে কে সিয়া-ফাম হ্যায় তু।

তুমি কৃষ্ণের গান, গোকুলের সুন্দর সন্ধ্যা

আলিঙ্গন করো আমায়,

কারণ তুমি আর আমি দুজনই তো কালো মানুষ&dquote;&dquote;

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন শুরু হয় ১৯৫৫ সালে। এরপর জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর মধ্যে সাহিত্যের আদান-প্রদান গতি পায়। ফৈজের কবিতা সোয়াহিলি, চীনা, ভিয়েতনামি ভাষায় অনূদিত হয়। অন্যদিকে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের প্রগতিশীল কবিদের কবিতা উর্দু ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে। লন্ডন, প্যারিস, জার্মানি কিংবা রাশিয়ার যেকোনো সাহিত্য আন্দোলন বা চিন্তা দিল্লি, লক্ষেৗ কিংবা লাহোরের উর্দুভাষী কবিদের আলোড়িত করত। তবে প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের কবিরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ছিলেন রুশ চিন্তা দিয়ে, তাদের সমাজতান্ত্রিক ধারণা দিয়ে। এমনকি ষাটের দশকের পরও সেই প্রভাব অব্যাহত ছিল। ১৯৭০ সালে দুনিয়াব্যাপী লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছিল। সে উপলক্ষে সাহির লিখেছিলেন—

ইনসান কে মাকাদ্দার কো আজাদ কিয়া তু নে

মাজহাব কে ফারেবো নে, শাহি কে আজাব সে।

আপনি ভাগ্যের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্ত করেছেন

মুক্ত করেছেন ধর্মের ধোঁকাবাজি আর জমিদারদের আজাব থেকে।

উর্দু কবিদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর উদাহরণ দেখা যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। কাইফি আজমি লেখেন—

যায়ু, ও ভিয়েতনাম কে জাঙ্গল

উস কে মাসলুব শহর, ভিরান গাও

যিন কো ইনজিল পাড়নে ওয়ালো নে

রওন্ড ডালা হ্যায়, ফুঙ্ক ডালা হ্যায়

জানে কাব সে পুকারতে হ্যায় তুমহে।

ভিয়েতনামের জঙ্গলে যাও

ভিয়েতনামের ক্রুশবিদ্ধ শহর, বিরান গ্রাম

বাইবেল পড়ুয়াদের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে, পুড়ে গেছে

ভিয়েতনামের মানুষরা তোমাকে ডাকছে।

১৯৬১ সালে সাম্রাজ্যবাদী মদদে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর ক্যুতে নিহত হন রিপাবলিক অব কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আফ্রিকার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অন্যতম নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা। এ মৃত্যু নাড়া দেয় উর্দুভাষী কবিদেরও। এ কবিদের অনভূতির প্রকাশ দেখা যায় মখদুমের কলমে। কবিতার নাম চুপ না রাহো (চুপ থেকো না)— 

বধ্যভূমি চিত্কার করে বলছে: চুপ করে থেকো না।

আর সাহির লুধিয়ানভি লিখলেন—

জুলম ফির জুলম হ্যায়, বাড়তা হ্যায় তো মিট জাতা হ্যায়

খুন ফির খুন হ্যায়, টপকেগা তো জম জায়েগা।

জুলুম তো জুলুমই, বেড়ে গেলে ধ্বংস হয়ে যায়

রক্ত তো রক্ত, বের হলে জমে যায়।

 

পরবর্তীকালে পাকিস্তানে জিয়াউল হকের কুখ্যাত সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও দেশটির উর্দু কবিরা সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। ফৈজ আহমেদ ফৈজকে তো দেশ ছাড়তে হয়েছিল। আরেকজন কবি, যিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তিনি হাবিব জালিব।  

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                          এতক্ষণ উর্দুভাষী কবিদের যে দ্রোহের শব্দমালা আমরা পড়লাম, সেগুলো নিশ্চয়ই অসমাপ্ত রয়ে গেছে। আজকের দুনিয়ায় যুদ্ধ, জাতি ও ধর্মের নামে ঘৃণার বাণিজ্য, অর্থনৈতিক শোষণ, নানা মোড়কে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন সে কথাই বলে। গালিব হয়তো এ সত্য সে আমলেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, তাই লিখেছিলেন—

আমি আমার কল্পনার বয়ে আনা আনন্দে গান গাই

আমি সেই বাগানের বুলবুলি, যেটা এখনো দুনিয়াতে তৈরি হয়নি।

হিন্দি সিনেমার সংগীতে উর্দু কবিতার যথেষ্ট ব্যবহার দেখা যায়; ক্ল্যাসিকাল ও আধুনিক উভয় ধারার কবিতাই হিন্দি সিনেমার গানে কিংবা সংলাপে শোনা যায়। পঞ্চদশ শতকের দাক্ষিণাত্যের কুলি কুতুব শাহ থেকে গালিব— সবার গানই স্থান পেয়েছে হিন্দি ছবিতে। আরো আছে অনেক বড় বড় নাম— বাহাদুর শাহ জাফর, আমির খসরু, মিয়া ত্বকী মীর, মোহাম্মদ ইকবাল, ওয়াজিদ আলী শাহ। ১৯৮১ সালে উমরাও জান সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছিল আমির খসরুর লেখা গান। ফার্সি ভাষায় অনেক লিখলেও আমির খসরুকে উর্দু ভাষার বিকাশে অগ্রদূত বিবেচনা করা হয়। তাকে ‘উর্দু সাহিত্যের পিতা’ বলা হয়। এ ক্ল্যাসিকাল উর্দু কাব্য ছাড়াও সমকালীন কবিদের উর্দু কবিতা-গানও হিন্দি সিনেমায় ব্যবহার হয়েছে। প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জড়িত উর্দু কবিদের অনেকের রুটি-রুজির উৎস ছিল হিন্দি সিনেমার জন্য গান, চিত্রনাট্য লেখা। এদের মধ্যে সাহির লুধিয়ানভি ও মাজরুহ সুলতানপুরী হিন্দি সিনেমার গীতিকার হিসেবে দারুণ সফল হয়েছিলেন। এছাড়া প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফৈজ আহমেদ ফৈজ, ফিরাক গোরখপুরি, ইসরার-উল-হক মাজাজ, কাইফি আজমি, জান নিসার আখতার, মাখদুম মহিউদ্দিন ও হাসরাত মোহানির কাজ হিন্দি সিনেমায় গানের কথা হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এ কবিদের ভাষা ছিল সরল এবং পারিপার্শ্বিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত; তাই সাধারণ মানুষ সহজেই তাদের লেখা গানের সঙ্গে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করতে পারত। তাই হিন্দি সিনেমায় তাদের গানের ব্যবহার চোখে পড়ে। এ গানগুলোয় লেখকদের সেই প্রতিবাদের সুরও টের পাওয়া যায়, এমনকি প্রেমের গানেও; গরিব প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে সমাজের ক্ষমতাবানদের লড়াই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৬৩ সালের তাজমহল সিনেমার জন্য লেখা সাহির লুধিয়ানভির একটি গান—

তাখ্ত কেয়া চিজ হ্যায়, অউর লাল-ও জেভর হ্যায় কেয়া?...

এ সিংহাসন, দামি গহনার কী দাম আছে?

সত্যিকার প্রেমিক-প্রেমিকা তো স্বর্গকেও ছাড়তে পারে

বুট পালিশ (১৯৫৪) ছবিতে সাহিরের লেখা গানে গরিব মানুষের ক্ষোভের কথা শোনা যায়। ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া মজদুর সিনেমায় সাহিরের সে কথা যেন ফিরে আসে হাসান কামালের কলমে—

আমরা শ্রমিকরা যখন আমাদের অধিকার চাইব

তখন একটা বাগান কিংবা ফসলের ক্ষেত নয়

আমরা চাইব পুরো দুনিয়া।

আশির দশকে অসময়ে মারা যান সাহির লুধিয়ানভি, এরপর আরো দুনিয়া ছাড়েন হাসরাত জয়পুরী, রাজা মেহদি আলী খান, শাকিল বদায়ুনি প্রমুখ। এর মাধ্যমে হিন্দি সিনেমার গীতিকার সংকট দেখা দিয়েছিল। আর  এ নতুন সহস্রাব্দের শুরুতেই দুনিয়া ছাড়েন মাজরুহ সুলতানপুরী ও কাইফি আজমি। এক কথায় উর্দু কবিতার সেই প্রগতিশীল ধারার সমাপ্তি ঘটল। এরপর এখন জাভেদ আখতারই সেই প্রগতিশীল আন্দোলনের ধারাকে জীবন্ত  রেখেছেন বলে অনেকে মনে করেন। জাভেদ নিজেও বহুবার প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে তার ঋণের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে জাভেদ সেই ধারায় নিজের সংবেদনশীলতা আর সমসাময়িকতার মিশেল ঘটিয়েছেন। 

সূত্র : প্রগ্রেসিভ উর্দু পোয়েট্রি : অ্যানথেম অব রেসিস্ট্যান্স, আলী হুসাইন মীর; রাজা মীর