মাহ লাকা বাই ছিলেন আসাফ জাহি শাসনামলে হায়দরাবাদের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র। তাই সে সময়ের চিত্রকর্মগুলোয় তার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তেমনই একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, তিনি তার দল নিয়ে হায়দরাবাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজা চণ্ডুলালের প্রাসাদে গজল ও নাচ পরিবেশন করছেন। তার শৈল্পিক উপস্থাপনা উপভোগ করতে সুশৃঙ্খলভাবে বসে আছেন অভিজাত ব্যক্তিরা। তাদের পরনে লাল ও কমলা বর্ণের পোশাক। মধ্যমণি হয়ে বসে আছেন রাজা চণ্ডুলাল। আর নৃত্যগীত পরিবেশনকারী দলটির প্রধান চরিত্র যে মাহ লাকা বাই, তা তো বলাই বাহুল্য। সম্পূর্ণ দলের মধ্যে তিনিই কেবল রাজা চণ্ডুলালের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছেন। তার সহচরীদের তুলনায় চিত্রে তাকে বড় করে দেখানো হয়েছে। নৃত্যগীত পরিবেশনকালীন এক হাত উঁচু করে স্থির হয়ে আছেন তিনি। চিত্রকর তার প্রতিকৃতির ওপর আরবি হরফে নাম লিখে দিয়েছেন ‘মাহ লাকা বাই চান্দা বিবি’। না লিখলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। উৎসুক দর্শকের চোখ ঠিকই মাহ লাকা বাইকে খুঁজে নিতে পারত। তবে নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে মাহ লাকা বাইকে অন্য তাওয়ায়েফদের থেকে আলাদা করা হয়েছে। বোঝানো হয়েছে যে তিনি কোনো সাধারণ তাওয়ায়েফ নন। একমাত্র তাওয়ায়েফ যিনি হয়দরাবাদের নিজামের দরবারে আমিরের মর্যাদা পেয়েছেন। আসাফ জাহি শাসনামলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় নিজাম যথাক্রমে নিজাম আলী খান ও সিকান্দার জাহার ওপর তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল। চিত্রকর্মটি ‘ভাব বাতানা’র একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে। ‘ভাব বাতানা’ মানে হলো ভাব প্রকাশ করা। অর্থাৎ, গান পরিবেশনের সময় মুখভঙ্গী ও অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে সে গানের ভাব দর্শকের সামনে ফুটিয়ে তোলা। এটি রাজদরবারে নৃত্যগীত পরিবেশনকারী দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। চিত্রটি জলরঙে আঁকা।
আরেকটি চিত্রকর্মে একটি সাদা প্রাসাদে মাহ লাকা বাই নিজের মসনদে বসে অবসর যাপন করছেন। চারজন নারী তার হুকুম তামিল করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রকর্মটির ওপরের দিকে আরবি হরফে খোদাই করা আছে, ‘তাসবির-এ-মাহ লাকা’। অর্থাৎ, মাহ লাকার প্রতিকৃতি। এ চিত্রকর্মের অঙ্কনশৈলী ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে গবেষকদের অনুমান, এটি নিজাম আলী খানের দরবারের প্রধান চিত্রকর রায় ভেঙ্কটচেল্লামের আঁকা হতে পারে। এ চিত্রে মাহ লাকা বাইর ক্ষমতা ও আভিজাত্যের দিকটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রায় ভেঙ্কটচেল্লাম। আঠারো শতকের শেষ দিকে আঁকা চিত্রকর্মটিও জলরঙে আঁকা।
এসব একক চিত্রকর্ম ছাড়াও খুশহাল খান রচিত ‘রাগদর্শন’-এর সচিত্র পাণ্ডুলিপিতেও মাহ লাকা বাইর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। খুশহাল খানের পিতার নাম করিম খান। তিনি তানসেনের বংশধর। প্রথম দিকে খুশহাল খান নিজাম আলী খানের মারাঠা সেনাপতি রাজা রাও রম্ভ বাহাদুরের দরবারের সংগীতজ্ঞ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নিজাম আলী খান ও সিকান্দার জাহার দরবারে সংগীতজ্ঞ হিসেবে নাম করেছিলেন। রাগদর্শনের ঠাঁই পাওয়া চিত্রকর্মগুলোয় মাহ লাকা বাইর ব্যক্তিত্ব আরো চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। পাণ্ডুলিপির একটি চিত্রে ‘খাম্বাবতী রাগিনী’র মূর্তরূপ হিসেবে মাহ লাকা বাইকে উপস্থাপন করা হয়েছে। চিত্রে দেখা যায়, মাহ লাকা বাই একটি লাল প্যাভিলিয়নের নিচে তার জন্য নির্ধারিত আসনে বসে অন্যদের নৃত্যগীত পরিবেশনা উপভোগ করছেন। তার গায়ে লাল জামা। সুবেশ ও সালঙ্কারা মাহ লাকা বাইর অভিব্যক্তি থেকে যেন আভিজাত্যের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মাহ লাকা বাইর প্রকৃত নাম চান্দা বিবি। ‘মাহ লাকা’ তার উপাধি। এর অর্থ চাঁদের মতো মুখ যার। চিত্রে উপস্থাপিত পূর্ণিমার চাঁদ যেন মাহ লাকা বাইর উপাধিকেই সত্যায়ন করছে।
রাগদর্শনের পাণ্ডুলিপির আরেকটি চিত্রে দেখা যায়, রাজা রাও রম্ভ বাহাদুরের প্রাসাদে ছোট একটি জমায়েত। মোমবাতি জ্বালিয়ে জায়গাটি আলোকিত করা হয়েছে। মাহ লাকা বাই তার দল নিয়ে গালিচার ওপর নাচছেন। রাজা রাও রম্ভ বাহাদুর সপারিষদ সে নাচ উপভোগ করছেন। প্রেক্ষাপটে নীল রঙের আকাশ তারায় সজ্জিত। মাহ লাকা বাইর মাথার ওপর আরবি হরফে লেখা চান্দা বিবি। রাজা রাও রম্ভ বাহাদুরের মাথার ওপরও একইভাবে তার নাম লেখা। চিত্রকর্মটির একটি বিশেষত্ব আছে। মাহ লাকা বাইর মাথা চাঁদের আভা দিয়ে ঘেরা। আর রাজা রাও রম্ভ বাহাদুরের মাথা ঘিরে আছে সূর্যরশ্মি। এর দ্বারা যেন বোঝানো হচ্ছে, কেউ চন্দ্রসম মাহ লাকা বাইর ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে তাকে সূর্যের মতোই তেজোদীপ্ত হতে হবে। এর মাধ্যমে একই সঙ্গে মাহ লাকা বাইর আভিজাত্য ও রাজা রাও রম্ভ বাহাদুরের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়েছে।
কেবল চিত্রকর্মই নয়, মাহ লাকা বাইর বর্ণিল এবং বহুমাত্রিক জীবন উপন্যাস রচনা ও সিনেমা নির্মাণেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। অনেক গবেষকের মতে, মীর্জা হাদি রুসওয়ার বিখ্যাত উর্দু উপন্যাস ‘ওমরাও জান আদা’ মাহ লাকা বাইর চরিত্রকে কেন্দ্র করে রচিত। উপন্যাসটির আলোকে নির্মিত সিনেমাটিও দারুণ জনপ্রিয়তা আছে। ১৯৮৩ সালে শ্যাম বেনেগাল নির্মাণ করেন ‘মান্দি’ সিনেমা। সেখানে বাইজিদের এমন একটি শহরে বাস করতে দেখা যায়, যার তারকাখচিত আকাশের নিচে একসময় নাচতেন মাহ লাকা বাই।
আহমদ শাকিল: লেখক





