২০২১ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে হায়দরাবাদের এমএএম কলেজে শিক্ষার্থীরা জমা হয়েছে। গল্প করছে, কেউ আলোচনা অনুষ্ঠানে কী বলা হচ্ছে তা শুনছে। ওদের কেউই হয়তো জানে না যে ঠিক এ জায়গায়ই ২০০ বছর আগে একটা প্রতিষ্ঠান ছিল। সেটাও তৈরি করা হয়েছিল মেয়েদের নাচ আর গানের তালিম দিতে। এ শহরেই মওলা আলী দরগার কথা শহরের সবাই জানেন। কিন্তু সে দরগার ঠিক নিচেই উদ্যান আর একটা পুরনো ভবন। নাম খাস রঙ্গমহল। সেটার ইতিহাস অবশ্য জানেন খুব কম মানুষ। সেখানে যার সমাধি আছে তার নাম মাহ লাকা বাই। তিনি নাচ-গান শেখানোর সে পুরনো প্রতিষ্ঠানটি গড়েছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন ‘চান্দা’ কবি নামে, লেখার ভাষা ছিল উর্দু। মাহ লাকা উর্দু ভাষার প্রথম নারী কবি, যিনি কবিতার সংকলন গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছিলেন।
ইতিহাসের ভুলে যাওয়া চরিত্র
মাহ লাকা বাই ছিলেন উর্দু কবি, রাজনীতিবিদ, জনহিতৈষী, যোদ্ধা, ইতিহাস সংরক্ষক। হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে তিনি প্রভাবশালী আমির ছিলেন, আরো নির্দিষ্ট করে বললে তিনিই একমাত্র নারী, যিনি সেখানে এ সম্মান পেয়েছিলেন। নিজাম তাকে একাধিক কূটনৈতিক মিশনের ভার দিয়েছিলেন। এসব দায়িত্ব পালনে সফলতার পুরস্কার পেয়েছেন মাহ লাকা বাই। একাধিক বড় জায়গিরের মালকিন হয়েছিলেন। তীরন্দাজি, বর্শা ছোড়া আর যুদ্ধের ময়দানে শিবির স্থাপনের কাজে তিনি ছিলেন পারদর্শী। নিজামের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। কূটনীতি আর রণনীতি নিয়ে ময়দানে মাথা ঘামানো এমন মানুষটি আবার বিশাল এক লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে সারা উপমহাদেশ আর মধ্য এশিয়া খুঁজে বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করিয়েছিলেন। সেখানে কবি, দার্শনিক আর জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য দ্বার ছিল উন্মুক্ত। হায়দরাবাদ শহরের স্থাপত্য ইতিহাসও তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকার কথা। কিন্তু এসব ছাপিয়ে তিনি জনমানসে পরিচিত এক ‘নাচনেওয়ালি’ তাওয়ায়েফ হিসেবে। এর একটা ইতিহাস আছে। সে ইতিহাসেরও আছে আরেকটা ইতিহাস।
কে তাওয়ায়েফ?
মানুষের ব্যক্তি হিসেবে কিছু গুণ থাকে। আধুনিক যুগ শুরু হওয়ার আগে সেসব গুণের কদর হতো অভিজাতদের দরবারে। রাজা মহারাজারা গুণী মানুষকে দরবারে নিয়ে আসতেন। রাজা নিজে হয়তো কদরদান নন। কিন্তু গুণীর কদর করলে দরবারের সম্মান বাড়ে। তাই গুণীদের দরবারে কদর করে রাখা হতো। যারা নৃত্য আর সংগীতে বিশারদ ছিলেন, তাদের রুটিরুজি হতো এসব দরবারে। যে নারীরা এ শাস্ত্রে দক্ষ ছিলেন তাদের বলা হতো ‘তাওয়ায়েফ’। এরা মূলধারার ‘অপর’ নারী’। উঁচু মাপের শিল্পী। ধ্রুপদি সংগীত ও নৃত্যে অসামান্য পারদর্শী। একাধিক ভাষায় দক্ষ। কাব্য আর দর্শন চর্চায় প্রশিক্ষিত। অনেকেই কবি। সে সময়ের কবিরা তাওয়ায়েফদের কাছে ধর্ণা দিতেন। কোনো নামি তাওয়ায়েফ যদি একজন কবির গজল সুর করে কোনো আসরে গাইবেন তো রাতারাতি সে কবি বিখ্যাত হয়ে যাবেন। মির্জা গালিব এক চিঠিতে রামপুরের নবাবের কাছে লিখেছিলেন তার দরবারের একজন খ্যাতনামা তাওয়ায়েফ যদি কবির একটি গজল গাইতেন, তবে তিনি কৃতজ্ঞ থাকবেন। এরা অর্থ বিত্তেও ছিলেন সমাজের উঁচুতলার মানুষের কাতারে। ইংরেজরা যখন কর ব্যবস্থা চালু করেন তখনকার অবিভক্ত ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ করদাতার অনেকেই ছিলেন তাওয়ায়েফ। সব মিলিয়ে তাওয়ায়েফরা ছিলেন আধুনিক যুগের আগের কালের, এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হওয়ার আগের ‘সেলিব্রিটি’।
মাহ লাকা বাই চান্দার জীবন শুরু হয়েছিল একজন তাওয়ায়েফ হিসেবে। পরবর্তী সময়ে ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংরেজ নৈতিকতায় যে তাওয়ায়েফরা নিতান্ত নাচিয়ে মেয়ে—নচ গার্ল হয়ে গিয়েছিল। ইংরেজদের তৈরি করা ভাষা আর বিশ্ববীক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক মানুষের ইতিহাসে, সাহিত্যে এরা হয়ে গেছে ভদ্রলোকের সুখের সংসার ভাঙা নিচু নৈতিকতার নারী। যেসব উপন্যাস লেখা হয়েছে, সিনেমা বানানো হয়েছে সেখানে তারা তেমনই অসহায় এক চরিত্র মাত্র। ফল হচ্ছে এই যে এখন ভারতবর্ষের মানুষ মাহ লাকা বাই চান্দাকে কেবল একজন নাচিয়ে মেয়ে বলেই জানে।
পুরুষের দুনিয়ায় প্রভাবশালী নারী
চান্দা বিবি তার পরিবারের দেয়া নাম। জন্মেছিলেন ৭ এপ্রিল ১৭৬৮ সালে আওরঙ্গবাদে। সে জায়গা আজকের মহারাষ্ট্রে। মায়ের নাম রাজ কুয়াঁর। রাজপুত এক তাওয়ায়েফ। বাবার নাম বাহাদুর খান। মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহের একজন সেনা কর্মকর্তা। মা কম বয়সে গত হলেন। চান্দাকে দত্তক নিলেন নিঃসন্তান মায়ের বোন মেহতাব। মেহতাব ছিলেন নিজামের প্রধান অমাত্য নওয়াব রোকনউদদৌলার দরবারের শিল্পী। শিশু চান্দার গুণপনা দেখে নওয়াব বিস্মিত হয়ে তার শিক্ষার দায়িত্ব নিলেন। লেখাপড়া শেখালেন সে আমলের সেরা শিক্ষকদের কাছে পাঠিয়ে। তার নিজস্ব বিশাল পাঠাগারে চান্দা ছিলেন নিবিষ্ট পাঠক। সৈনিকদের কাছে শিখলেন তীরন্দাজি, বর্ষা নিক্ষেপ আর অশ্বচালনা। সংগীত আর নৃত্য তো পরিবারের ঐতিহ্যে ছিলই। সে কালের সেরা ওস্তাদদের কাছে শিখে তা নিখুঁত হলো।
কালে কালে চান্দা বিবির সুনাম নিজামের কাছে পৌঁছাল। মুগ্ধ নিজাম চান্দা বিবিকে উপাধি দিলেন ‘মাহ লাকা’, যার অর্থ ’চন্দ্রমুখী’। নিজামের সঙ্গে মাহ লাকা বাই চান্দা যুদ্ধে যাওয়া শুরু করলেন। যুদ্ধে সাহসিকতা আর কৌশল নিপুণতার কারণে মাহ লাকা একাধিক জায়গির পুরস্কার পেলেন।
হায়দরাবাদের দ্বিতীয় আর তৃতীয় নিজামের দরবারে মাহ লাকা ছিলেন প্রভাবশালী। পুরো হায়দরাবাদের ইতিহাসে একমাত্র নারী আমির। কারো স্ত্রী হিসেবে অন্তুপুর থেকে কলকাঠি নাড়া নয়, নিজের যোগ্যতায় পুরুষশাসিত দরবারে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা আমির। ইংরেজদের সঙ্গে কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় নিজাম মাহ লাকা বাইয়ের পরামর্শ গুরুত্ব দিতেন। যখন তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় কাজে কোথাও যেতেন, সঙ্গে নিযুক্ত থাকত ৫০০ যোদ্ধার দল।
শিল্পী মাহ লাকা
মাহ লাকা পেশাদারি সংগীত শিক্ষা করেছিলেন ওস্তাদ খুশহাল খানের কাছে। এ ওস্তাদ ছিলেন সেকালের সেরা ওস্তাদদের অন্যতম। বংশমর্যাদা তার অনন্য—তানসেনের সরাসরি বংশধর। গজল গায়কির বিশেষ ধারা প্রবর্তন করেছিলেন মাহ লাকা বাই। নিখাদ প্রেমের গজল গাইতেন ভিমপলশ্রী রাগে। ইমন রাগে গাইতেন বিশেষ আসর হলে। সুফি কালাম গাইতে পছন্দ করতেন ধ্রুপদ অঙ্গে বিশেষ করে ভৈরবি রাগে।
গাওয়ার সময় অঙ্গবিক্ষেপ ঘটত দক্ষিণী কত্থক নাচের মুদ্রায়। কত্থক আজ কেবল উত্তর ভারতের নৃত্যশৈলী হিসেবেই পরিচিত। দক্ষিণী কত্থকের আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। মাহ লাকার একাধিক মিনিয়েচার পেইন্টিং থেকে তার নাচের ধরন সম্পর্কে জানা যায়। নিজে অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন এ শৈলী টিকিয়ে রাখতে। নিজের দত্তক নেয়া মেয়ে হুস্ন লাকা’কে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণী কত্থকের একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তার নিজের নৃত্য গুরু ছিলেন পান্না মহারাজ। মাহ লাকার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৩০০ মেয়ে নৃত্য শিক্ষা করত। সে সময়ের শ্রেষ্ঠ গুরুদের আনা হয়েছিল সে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিক্ষক হিসেবে।
কবি চান্দা
ভারতবর্ষের যে অংশে চান্দা জীবন কাটিয়েছেন সে দাক্ষিণাত্য উর্দু ভাষা আর সাহিত্যের বিকাশে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছে। উর্দুর জন্ম উত্তর ভারতে। দিল্লি আর তার আশপাশের মানুষের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে এর জন্ম। দিল্লির অষ্টাদশ সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩২৭ সালে পুরো রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে নিয়ে যান। সঙ্গে যায় নগরের সব বাসিন্দা। এ কাণ্ড স্মরণ করেই এখনো ’তুঘলকি কাণ্ড’ কথাটা ব্যবহার করা হয়। এ রাজধানী স্থানান্তরে মানুষের সঙ্গে যায় উর্দু ভাষাও। উর্দুর আদি যুগ তাই এ দিল্লির দক্ষিণেই বিকশিত হয়েছে। পরে যখন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব এ দাক্ষিণাত্য জয় করলেন, উর্দু কাব্য আবার তার জন্মভূমি দিল্লিতে ফিরে এসেছিল।
দিল্লি থেকে দক্ষিণে এসে উর্দু কাব্য ভারতীয় ভক্তিধারার ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। পণ্ডিতদের আরবি-ফার্সির সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভাব ভালোবাসা আর শব্দ গ্রহণ করে নিয়েছিল নতুন রূপ। বাদশাহ কুলি কুতুব শাহের কবিতাগুলো সে রকম কবিতার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত—
প্রিয় ছাড়া পেয়ালায় চুমুক দেয়া যায় না
প্রিয় ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচা যায় না
(পিয়া বাজ পিয়ালা পিয়া জায়ে না
পিয়া বিন ইক তিল জিয়া জায়ে না)
পারস্যের দর্শনাশ্রয়ী কাব্য মানুষের জীবন আর উৎসবের রঙ আপন করে নিয়েছে এ দক্ষিণের উর্দু কবিতায়। মাহ লাকা বাই চান্দা ছিলেন কবি মীর তকি মীরের সমকালীন। তার কবিতা উর্দু কাব্যের একাল অতিক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
মাহ লাকা ছিলেন কবি সিরাজ আওরঙ্গবাদীর ভাবশিষ্য। সিরাজ বিখ্যাত সুফি দকনি মানে দক্ষিণি কবি। জগতের মাঝে আরো বড় কোনো সত্যের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা তার কবিতার উপজীব্য। ভারতীয় ভক্তিরসের সঙ্গে সুফি ভাবের মিলন ঘটিয়েছেন তিনি। জগতের সঙ্গে এখানে সংযোগ ঘটে কেবল প্রেমের মাধ্যমে। দুঃখ সেখানে প্রতিবন্ধকতা নয় বরং প্রেমাষ্পদের কাছ থেকে পাওয়া উপহার—
অদৃশ্য থেকে আসা এক হাওয়া আনন্দের উদ্যান ছাই করে গেল
কিন্তু সেই যে দুঃখের একটি কিশলয় সে তেমনই সবুজ রয়ে গেছে
(চলি সিমতে গ্যায়েব সে ইক হাওয়া কে চমন সুরুর কে জ্বল গ্যায়া
মাগার ইক শাখে নিহালে গম জো হারি থি সো হারি রহি)
মাহ লাকা বাই কবিতায় ‘চান্দা’ ভনিতা ব্যবহার করতেন। তিনি নিজের গুরু সিরাজের কাছ থেকে প্রেমের সর্বগ্রাসিতাকে জীবনের আটপৌরে আঙিনায় নিয়ে এসেছিলেন। সেখানে দুঃখ আছে, তবে জগৎজনের কাছ থেকে তা দূরে নিয়ে যায় না—
পরের কাছ থেকে কিছু নয় চাই শুধু সেই পরমের কাছে
তবে পৃথিবীর মানুষের কাছে শুধু ভালোবাসা চাই
(বাজুয হক কে নেহিঁ গ্যায়ের সে হরগিয তাওয়াক্কো কুছ
মাগার দুনিয়া কে লোগোঁ মেঁ মুঝে হ্যায় পেয়ার সে মাতলাব)
জীবনে কয়েকবার প্রেমে পড়েছেন। তিনি চাইলে না পাওয়ার মতো কোনো পুরুষ মাহ লাকার চারপাশে ছিল না। কিন্তু সারা জীবন একাই থেকে গেছেন। সফলতা তার জীবনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছিল। আজও নারীদের জীবনে যেমন হয়। তার কবিতায় তাই না-পাওয়া যায় যাকে তারই আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়—
হৃদয়ে আমার আবার কী ভাবনা আসে আজ
কোন অদ্বিতীয় প্রিয় আসে যেন আজ
(দিল মেঁ মেরে ফির খায়াল আতা হ্যায় আজ
কোয়ি দিলবর বেমিসাল আতা হ্যায় আজ)
এ ‘আজ’ শব্দটা এখানে বড় বিস্ময়কর। প্রথম লাইনে বলছেন যে সে ভাবনা আসছে আবার। কী ভাবনা? আজ কোন অদ্বিতীয় প্রিয় আসছে। কিন্তু সে ভাবনা তো আগেও এসেছে। এর মানে এ ভাবনা আসে প্রায়ই। আর প্রতিবারই মনে হয় আজই বুঝি সে দিন। কিন্তু কোনো দিনই সে দিন আর আসে না। এ প্রাপ্তিতে নয়, অপেক্ষায়ই নিজের জীবন—
ফুল হয়ে ওঠার আশা নিয়ে বেঁচে আছে
প্রতিটা কলি মুঠোয় প্রাণ নিয়ে বসে আছে
(গুল কো হোনে কি তাওয়াক্কো পে জিয়ে ব্যায়ঠে হ্যায়
হর কলি জান কো মুঠঠি মেঁ লিয়ে ব্যায়ঠে হ্যায়)
উর্দু কবিতায় কলির ফুল হয়ে ওঠা, বর্তমানের সত্ত্বাকে বিসর্জন দেয়ার মূল্যে অর্জন করতে হয়। কলি থাকে অটুট। ফুল হয়ে ফুটে ওঠা মানে সে কলি ছিঁড়ে পাপড়ি মেলে দেয়া। সেও ক্ষণিকের জন্য। কিন্তু সে আশা নিয়েই কলি বাঁচে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে। সব নিয়ে সে বসে থাকে সর্বনাশের আশে। সব হারিয়ে সে হয়ে ওঠাও কি কারও জন্য? কিন্তু সে তো হৃদয় চুরি করে নিয়ে স্বীকারও করে না:
যদি তুমি আমার হৃদয় চুরি নাই করে থাকো হে নির্দয়
খোলো তো বন্ধ মুঠি দেখাও তোমার হাত
(গর মেরে দিল কো চুরায়া নেহিঁ তু নে যালিম
খোল দে বন্দ হাথেলি কো দিখা হাথোঁ কো)
সেই প্রেমাষ্পদ হৃদয় নিলেই স্বীকার করে না। হয় তো সে জানেই না কার হৃদয় সে কখন নিয়ে গেল কেড়ে! পুরো জগৎ যে তাকে চায়। তার দৃষ্টিতে যে সব জগৎ দেখার আয়না। চান্দা তাই জগতের সব জীবের কাছে প্রাণের মদিরা পরিবেশনকারী সাকিকে উপদেশ দেন—
তাকে মাদকতাময় দৃষ্টি একটু দেখাও তো সাকি
যে কি না বার বার তোমার কাছে চাইছে মদিরা
(উন কো আঁখে দিখা দে টুক সাকি
চাহতে হ্যায় জো বার বার শরাব)
শেষ কথা কে বলবে
মাহ লাকা চান্দা নিজের হাতে ক্যালিগ্রাফি করে ১২৫টি উর্দু গজলের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন। চান্দা নানা রকম কূটনৈতিক কাজে মারাঠা, ইংরেজদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। সে রকম এক সাক্ষাতের সময় তিনি এ পাণ্ডুলিপি হায়দরাবাদের ইংরেজ সহকারী রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন স্যার জন ম্যালকমকে উপহার দেন। এটা খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। ইংরেজরা অনেকেই সে সময় উর্দু কবিতার অনুরাগী ছিলেন। অনেক ইংরেজ রীতিমতো ওস্তাদের শাগরেদ হয়ে গজল লিখতেন। উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসবিদ রামবাবু সাক্সেনা এ রকম ৭০০ ইংরেজ উর্দু কবির সংকলন ছেপে বের করেছিলেন। মাহ লাকা চান্দার সে হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে।
চান্দা মারা যান ১৮২৪ সালে। নিজের সব সম্পদ তিনি রেখে যান সম্বলহীন নারীদের জন্য। মওলা আলী দরগার নিচে একটা সৌধ বানিয়েছিলেন। সেখানে প্রায়ই কবি সম্মিলন মুশায়রার আয়োজন করতেন। সে সৌধের ভেতরে চান্দার নিজের মায়ের সমাধি ছিল। মৃত্যুর পর মায়ের পাশে তার নিজের সমাধি হয়।
মাহ লাকার জীবনের ছায়া অবলম্বন করে মির্জা হাদি রুসওয়া লেখেন উর্দুর প্রথম সার্থক উপন্যাস উমরাও জান। একই নামে তৈরি হয় সুপারহিট ছবি। কিন্তু কী পরিহাস! সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়ে প্রবল প্রতাপের রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা, কবি—এ নারী সেসব ছবি আর উপন্যাস থেকে জনমানসে পরিচিত হয়ে ওঠেন এক অসহায় তাওয়ায়েফ হিসেবে।
তার তৈরি করা সে প্রাঙ্গণে এখন মেয়েদের স্কুল। সেখানে মাহ লাকা বাই চান্দার হাতে লাগানো একটা গাছ এখনো বেঁচে আছে। সে গাছে পুরনো পাতা ঝরে পড়ে, নতুন পাতা গজায় মাহ লাকার অপেক্ষা হয়ে:
না ফুলের কাছে না ফুলবাগান, কারো কাছে কিছু চাওয়ার নেই
প্রিয়কে দেখব বলে শিশির বিন্দুতে দৃষ্টি রেখে দিয়ে অপেক্ষা করি
(না গুল সে হ্যায় গরয তেরে না গুলযার সে মাতলাব
রাখখা চশমে নযর শবনম মেঁ আপনে য়ার সে মাতলাব)
জাভেদ হুসেন: উর্দু-ফারসি সাহিত্য গবেষক ও অনুবাদক





