হায়দরাবাদের নিজাম ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে নওরোজ উৎসব পালন করতেন। পারস্য নববর্ষের এ উৎসবে সৈনিক ও সভাসদদের তাদের কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ উপহার, খেতাব, জায়গিরসহ নানা ধরনের সম্মানে ভূষিত করা হতো। উৎসবে নিজাম নিজের সম্পদ ও জাঁকজমকের প্রদর্শনী করতেন। নওরোজ উৎসবে নিজামের দরবারের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন চান্দা বিবি। তেমনই এক বসন্ত উৎসবে নাচ পরিবেশন করলেন তিনি। স্বরচিত গজলও গাইলেন। নিজামের প্রশংসায় রচিত গজলটির শেষ দুটি পঙ্‌ক্তি এমন, ‘আমাদের রক্ষাকর্তা, আসাফ জাহি রাজ্যের অধিপতি, বারো ইমামের আশীর্বাদে তিনি খিজিরের মতোই আয়ু পাক।’ চান্দা বিবির নাচ ও গজলে মুগ্ধ নিজাম। তিনি তাকে খেতাব দিলেন—‘মাহ লাকা বাই’। এর অর্থ ‘চন্দ্রবদনী মর্যাদাসম্পন্ন নারী’। আর পেলেন বিস্তীর্ণ এলাকার জায়গির। শহর ও গ্রাম দুই জায়গায়ই। সেই সঙ্গে দেয়া হলো সভাসদের মর্যাদা। তার জন্য বরাদ্দ করা হলো ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর দল ও রাজকীয় পালকি। ঢাক বাজিয়ে তার গমনপথ নির্জন ও নির্বিঘ্ন করার আদেশ জারি করা হলো। তখন ১৮০২ সাল। মাহ লাকা বাইর বয়স তখন ৩৫ বছর। আর হায়দরাবাদের সিংহাসনে আসীন নিজাম আলী খান। আসাফ জাহি বংশের দ্বিতীয় নিজাম। শাসক হিসেবে তিনি সফল ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তার সাফল্যের নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন একজন নারী। চান্দা বিবি ওরফে মাহ লাকা বাই। নিজাম তাকে আমিরের মর্যাদা দিয়েছিলেন। হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে এতটা সম্মান, ক্ষমতা ও প্রাধান্য অর্জন করা একমাত্র নারী ছিলেন তিনি। নিজামের দরবারে তার ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন একাধারে নর্তকী, সংগীতজ্ঞ, রসিক ও পরামর্শক। তিনি ধর্মীয় ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। 

অসি ও মসিতে সমান পারদর্শী ছিলেন মাহ লাকা বাই। সমরবিদ্যায় পারঙ্গমতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন তিনি। নিজাম আলী খানের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৭৮১ সালে কোলার, ১৭৮২ সালে নির্মল ও ১৭৮৯ সালে পাঙ্গালের যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন তিনি। পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধ করতেন মাহ লাকা বাই। তিনি কূটনীতিতে দক্ষ ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে পারদর্শী ছিলেন। তাই হায়দরাবাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় নিজামের বিশ্বাসভাজন ছিলেন তিনি। নিজাম আলী খান ও সিকান্দার জাহা ছিলেন তার গুণমুগ্ধ অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক। তবে মাহ লাকা বাইর গুণের প্রথম স্ফুরণ ঘটেছিল হায়দরাবাদের প্রধানমন্ত্রী আরস্তু জাহার দরবারে। নিজাম আলী খানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আরস্তু জাহা নিজের দরবার বসাতেন। সেখানে আরস্তু জাহার প্রশংসা করে কবিতা রচনা করতেন মাহ লাকা বাই। একটি কবিতায় আরস্তু জাহার নিরাপত্তা কামনা করে  তিনি লেখেন, ‘মওলা আলী যেন তাকে সর্বত্র রক্ষা করেন।’ তিনি আরস্তু জাহাকে হাতেম তাইয়ের চেয়েও বড় দাতা ও সাইরাস দ্য গ্রেটের চেয়েও বড় সেনাপতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। নওরোজ উৎসব উপলক্ষে আরস্তু জাহার দরবারে পরিবেশিত এক কবিতায় তিনি বলছেন, ‘তাকে দেখলে হাতেম তাইও দাতা হিসেবে পরিচিত হতে দ্বিধা করতেন। তার দক্ষ নেতৃত্ব সাইরাস দ্য গ্রেটকেও যেন হারিয়ে দেয়!’ মাহ লাকা বাইর অনেক গুণ ছিল। কিন্তু সেই গুণের সমঝদার পৃষ্ঠপোষক যদি না পেতেন, তাহলে তিনি এতটা ক্ষমতাধর হতে পারতেন না। তার উত্তরোত্তর উন্নতির ক্ষেত্রে কয়েকজন পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা ছিল। তাদের অন্যতম ছিলেন আরস্তু জাহা। মাহ লাকা বাইর একটি গজলেই তার প্রমাণ, ‘আরস্তু জাহার কাছ থেকে ছোট একটি বিষয় চান্দা চায়, আপনি এরই মধ্যে তাকে স্বর্ণ ও হাতি দিয়েছেন, এবার কিছু জমিও দিন।’ মাহ লাকা বাইকে পৃষ্ঠপোষকতা করার পেছনে আরস্তু জাহার অন্য উদ্দেশ্যও ছিল। তিনি মাহ লাকা বাইকে নিজাম আলী খানের পত্নী কিংবা উপপত্নী হিসেবে হারেমে প্রবেশ করাতে চেয়েছিলেন। যেন নিজামের অনেক গোপন বিষয় তিনি জানতে পারেন। মাহ লাকা বাইকে নিজামের দরবারে নিয়ে যান আরস্তু জাহা। ১৫ বছর বয়সে নিজাম আলী খানের সঙ্গে মাহ লাকা বাইর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। এতটাই যে নিজামের সঙ্গে রাজকীয় হাতিতে আরোহণের সুযোগও লাভ করেন তিনি। কিন্তু আরস্তু জাহার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হলো না। নিজাম আলী খান মাহ লাকা বাইর সৌন্দর্য ও গুণের প্রশংসা করলেও তাকে নিজের প্রাসাদে স্থান দেননি। 

১৮০৩ সালের ৬ আগস্ট নিজাম আলী খান মারা যান। তার পরের বছর ৯ মে মারা যান আরস্তু জাহা। সিংহাসনে তখন সিকান্দার জাহা। আর প্রধানমন্ত্রী হলেন মীর আলম। আরস্তু জাহার সঙ্গে মীর আলমের শত্রুতা ছিল। কিন্তু মাহ লাকা বাইর প্রতি তিনি অনুরক্ত ছিলেন। তবে আরস্তু জাহার জীবদ্দশায় তার কাছে ঘেঁষতে পারেননি মীর আলম। আরস্তু জাহার মৃত্যুতে সে বাধা আর রইল না। মাহ লাকা বাইর অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করেন মীর আলম। মাহ লাকা বাই সিকান্দার জাহার অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। তাই নিজের ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য তাকে নিজের দলে টানার চেষ্টা করেন মীর আলম। মাহ লাকা বাইর সৌন্দর্যের প্রশংসা করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। কবিতার একটি পঙ্‌ক্তি এমন, ‘আপাদমস্তক তুমি মনোহরা এক মূর্তি।’

দুই নিজাম ও দুই প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এক মারাঠা সেনাপতির সঙ্গেও মাহ লাকা বাইর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তার নাম রাজা রাও রম্ভ বাহাদুর। তিনি একবার নিজাম আলী খানের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজাম তাকে সেনাবাহিনীর উচ্চপদে আসীন করেন। নিজাম তাকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়েছিলেন। রাজা রাও রম্ভ বাহাদুর মাহ লাকা বাইর গুণমুগ্ধ ছিলেন। মাহ লাকা বাইর পরামর্শে তিনি হায়দরাবাদের ‘মওলা আলী’ টিলায় ‘বারাহ-দারি’ নামে একটি চাতাল তৈরি করে দিয়েছিলেন। 

মাহ লাকা বাইর উন্নতির পেছনে কয়েকজন কবির ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। নিজাম আলী খানের শাসনামলে আওরঙ্গাবাদ ও হায়দরাবাদে কবিরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। তাদের অন্যতম ছিলেন শাহ তাজাল্লি আলী। তিনি মাহ লাকা বাইর মায়ের বন্ধু ছিলেন। তার কাছ থেকে কবিতার বিভিন্ন ছন্দ ও অলংকারের তালিম নিয়েছিলেন মাহ লাকা বাই। কাব্যে মাহ লাকা বাইর আরেক শিক্ষক ছিলেন কবি মুহাম্মদ শের খান। তিনি ‘ঈমান’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। মাহ লাকা বাইর সৌন্দর্যের প্রশংসা করে কবিতা লিখেছেন ঈমান। 

মাহ লাকা বাই তার পৃষ্ঠপোষক ও অনুরাগীদের সহায়তায় প্রভূত ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। জনহিতৈষী কর্মকাণ্ডে সে ক্ষমতা তিনি কাজে লাগিয়েছেন। সে সময়ে নারী শিক্ষার জন্য তিনি এক কোটি রুপি ব্যয় করেছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি তার সম্পত্তি অসহায় নারীদের সাহায্যার্থে দান করে গেছেন। নিজের জায়গিরের একটি অংশ তিনি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করেছিলেন। সব মিলিয়ে তৎকালীন সময়ে মাহ লাকা বাই ছিলেন অতুলনীয় এক নারী।

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক