আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন উৎসবের প্রধান সংগঠক ডা. লঙ্কা প্রসাদ। কলকাতার উদ্দেশে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ছাড়ল রাত ৯টা ২৫ মিনিটে। ৫০ মিনিটের ফ্লাইট, ঘড়ির কাঁটা পেছাতে হলো ৩০ মিনিট। ফলে সাকল্যে যোগ হলো ২০ মিনিট। দুই বাংলার রাজধানীর মাঝে নৈকট্য এতটাই। সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতা বিমানবন্দর আমূল পাল্টে গেছে। চমত্কার বিমানবন্দরটিতে রাত কাটিয়ে দিলাম! এয়ার ইন্ডিয়ার হায়দরাবাদগামী প্রথম ফ্লাইট ৯টা ৪০ মিনিটে। সিকিউরিটি চেক শেষে ডিপারচার জোনে এসে দেখি, পূর্বের সূর্যে ঝলসে যাচ্ছে সব যাত্রী, চেয়ারগুলো। ইস্পাত ফ্রেমে আটকানো বড় কাচ কিছুটা বাঁকা হয়ে উঠে গেছে উঁচু ছাদে। তার ভেতর দিয়ে জ্যোতির্ময় তার কিরণ করুণাধারার মতো ঢেলে দিচ্ছেন, তাতে আমার মতো কৃষ্ণরাও শ্যাম-উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, রাধাদের তো রূপ রাখার জায়গাই নেই। কলকাতা থেকে প্লেন প্রথমে যাবে ভুবনেশ্বর; পরে হায়দরাবাদ। কলকাতা থেকে ভুবনেশ্বর সরলরেখা টানলে ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী জল প্রদেশ পড়ে, প্লেন উড়ে যাচ্ছিল সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা দিয়ে। আর সমুদ্র মানেই হলো সব নদীর সমর্পণ, সাগর রাজাকে জলের নৈবেদ্য দিতে চলেছে নদী প্রজারা। সে যাত্রায় কত যে মোচড় তাদের দেহে ও কোমরে, আকাশ থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। নদীরা যে নিম্নভূমিমুখী, তাদের যে গভীরতা আছে, তা ওই উচ্চতা থেকে বোঝার উপায় নেই। মনে হয় জলকষ্টে আছে তারা, একেবারে সমতল ভূমিতে জল গড়াচ্ছে না একবিন্দু। আকাশে মেঘের অপূর্ব সমাবেশ দেখি। ভূমি থেকে এসব রূপের কিছুই ধরা পড়ে না। মেঘ যে কত বিচিত্র আকার ধারণ করে থাকতে পারে, কত যে বিবিধ তাদের গড়ানো আর সমাবেশ, তা আকাশ উচ্চতা ছাড়া বোঝা যায় না। ভাবলাম কত হাজার হাজার টন চৌবাচ্চা আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। ভুবনেশ্বরে অবতরণের আগে প্লেন একটি চওড়া নদীর ওপর সম্পূর্ণ ঘুরে এলে নদীটিকে চমত্কাররূপে দেখতে পেলাম। বিমান থেকে আপনি যতই খোঁজেন, রানওয়ে দেখতে পাবেন না, ওটা দেখতে পান কেবল পাইলট, আর সেটাই জরুরি!

হায়দরাবাদ এখন ভারতের দুটি রাজ্যের যৌথ রাজধানী। আগের অন্ধ্র প্রদেশ দুই ভাগ হয়ে নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানা হয়েছে। দুটি রাজ্যের মানুষের মুখের ভাষা একই— তেলেগু; ধর্মও এক— হিন্দু ধর্ম। তাহলে বিভক্তি কেন? বিভক্তির কারণ ঐতিহাসিক। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি মেঘ বিজয় শেষে হায়দরাবাদ বিমানবন্দরের রানওয়েতে তার ভারী দেহটি রাখল বেশ গতির সঙ্গেই, পরক্ষণেই ‘হার্ড ব্রেক’। যে ঘোড়া ছুটে চলে বিপুল গতিতে, তার রাশ টেনে ধরা কঠিন, আর এ হলো পঙ্খীরাজ, ডানা গুটিয়ে ডাঙায় যে নেমেছে, সেটাই অপারকরুণা। পাইলটরূপী সহিস তার মুখ ঘুরিয়ে দিল আস্তাবলের দিকে। যাকে আস্তাবল বলছি, সেই হায়দরাবাদ এয়ারপোর্টের রূপ দেখে আমি মুগ্ধ!

আমাকে বিমানবন্দর থেকে আয়োজকদের নিয়ে যাওয়ার কথা। কাউকে না দেখে তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, রামোজি ফ্লিম সিটিতে যাওয়ার উপায় কী? তারা আমাকে অন্য পাশের দিকে আঙুল তুলে দেখান। দেখি দুটি রেস্তোরাঁর মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে আছে রামোজি ফিল্ম সিটি কাউন্টারটি। এক তরুণী এগিয়ে এসে শুধাল, ‘Have you come to join the poetry festival?’ মাথা নাড়তেই সে পরিচয় দিল; তার নাম অপূর্বা। অপূর্বা আমাকে অনুরোধ করে বলল, আরো কিছু আমন্ত্রিত অতিথি আসবেন। তারা পৌঁছলেই সবাই একত্রে রওনা হব। সেখানে আলেখ্য নামের আরেকটি মেয়ে ছিল। বেলা গড়ায়, পৃথিবীর কোনো প্রান্ত থেকেই নতুন কোনো অতিথি কবি আসেন না। ওরা তখন একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে আমাকে রামোজি সিটির দিকে পাঠিয়ে দেয়।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে যে পথটি ধরে ট্যাক্সি এগোল, সে পথটাকে এতকাল যে ভারতবর্ষকে চিনেছি, সে ভারতবর্ষের মনে হলো না। দুই পাশে দুটি করে চার লেনের সড়ক। মাঝের আইল্যান্ডে কোথাও নারকেল বীথি, কোথাও পাম গাছ, কোথাও খেজুর গাছের সারি। গাড়ি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। দূরে পাহাড়ের দেয়াল চোখে পড়ল। দূর থেকেই দেখেছিলাম বড় অক্ষরে প্রতিটি বর্ণ যেন একটি স্তম্ভ, ‘রামোজি’ শব্দটি লেখা। এ নির্জন পথ, তার পার্বত্য রূপ, বাতিমালা, প্রবেশপথের ওই বিশাল সাইনপোস্ট ঢোল বাজিয়ে জানিয়ে দিল, কবি, তুমি এসে পড়েছ এক রঙিন জগতে। প্রবেশপথেই দেখেছি চার ঘোড়ায় টানা সিংহাসনরূপী রথে চড়ে আছেন এক দীপ্ত পুরুষ। মাথার মুকুট আর সিংহাসন বলে দেয় রাজাই হবেন। প্রদীপ্ত ভঙ্গিতে দুরন্ত চার অশ্বের গতিময়তা নিয়ে পাথর হয়ে আছেন। গোলাকার চত্বরটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেখানে পথ উঠে গেছে চড়াই। বাঁকানো পথ থেকেই দেখেছি ১০ তলা দালানটি, তার চেহারা হোটেলের মতো। গাড়ি আরো ঊর্ধ্বারোহী হয়ে সেই বড় দালানটিতেই থামল। এটিই হোটেল সিতারা, উৎসবের ভেনু ও আমাদের থাকার স্থান। ঢুকতেই উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মূল মানুষটির দেখা পেলাম। তিন দেবতার নাম এক নামে গেঁথে তোলা ডা. লঙ্কা শিবা রাম প্রসাদ। হাসি লেগেই আছে, আর রজনীকান্তের মতোই লম্বা চুল, ভাবভঙ্গিও সিনেমার হিরোদের মতো। কিছুক্ষণ পরই টের পেলাম, মানুষটি মজার, কৌতুকপ্রিয়। অতিথিদের একটি দল সকালেই এসে গেছে, কেউ এসেছে দুপুরে। সেখানে কয়েকজন ভারতীয় ও বিদেশী কবির সঙ্গে দেখা ও পরিচয় হলো। সবার মাঝে আলো ছড়িয়ে বসে ছিল রওলা পোলার্ড নামে এক তুষারধবল রঙের কবি। রওলা ইংল্যান্ডের মেয়ে, কিন্তু থাকেন গ্রিসে। যৌবনে যে প্রখর সুন্দরী ছিলেন, তা এই পড়ন্ত বয়সেও দীপ্যমান। সেখানে ছিলেন হিন্দি বলয়ের কিছু নারী কবি। আহার ও সামাজিকতা শেষে হোটেলের বাইরে আসি। দেখি সম্মুখেই বাগান, সেখানে একটি (বোধি) বৃক্ষের নিচে স্বয়ং ভগবান বুদ্ধ বসে আছেন। দেবতা বা ঈশ্বরদের মাঝে একমাত্র তাকেই মনুষ্যরূপে দেখা গেছে। একমাত্র তিনিই নিরীশ্বরবাদী, নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করেননি। যদিও ভক্তরা তাকে ঈশ্বররূপেই পূজা করছে। আমি সেই চত্বরে নেমে আসি, যেখানে বীর যোদ্ধাবেশী রাজা চার ঘোড়া নিয়ে চিরকালের ফ্রিজশট হয়ে আছেন। প্রবেশপথের কাছটায় লাল পাথরের তিনটি স্ট্যাচু আছে। তাদের চেহারাও দেবতাসুলভ। আমার ধারণা, ভারতে যত স্ট্যাচু আছে, তার সিংহভাগই দেবদেবীর মূর্তি।

হোটেল সিতারার কাছাকাছি আরেকটি পথ গেছে জঙ্গলসম গুল্ম কুজ্ঝটিকার ভেতর, পাথর নির্মিত পথ, উদ্যান, গুল্মঘেরা— সবই মানবযত্নে সজ্জিত। এগোতেই আরেক দেবতার মুখোমুখি। অচেনা মুখ নিয়ে তিনি আমাকে ভড়কে দিয়েছিলেন। তাকিয়ে দেখি, নিচে একটি বৃহৎ অথচ শুষ্ক জলাশয়ের চারপাশে বিবিধ প্রাণীর ভাস্কর্য, কোত্থেকে যেন মন্ত্রোচ্চারণের ধ্বনি ভেসে আসছিল। সন্ধ্যা আসন্ন লগ্নে সেই ধ্বনিগাম্ভীর্য আশ্চর্য কুহক সৃষ্টি করল কানে। কোনদিকে যাব আমি, মন্ত্রের উৎস সন্ধানে এক নির্জন গুহার ভেতর, নাকি বিলাসপ্রতিম এক চারতারকা খচিত হোটেলের দিকে? দ্বিধাময় সে মুহূর্তে আমার মাঝে এসে গৌতম কি ভর করলেন?

হোটেল সিতারার লবি ভরে আছে নতুন আসা সব অতিথিতে। সেখানে হাস্যোজ্জ্বল এক পুরুষ সবার মনোযোগের কেন্দ্রে, তার চেহারায় মঙ্গোলয়েড ছাপ থাকলেও ককেশয়েডদের মতো ধারালো রেখা। সে রাতেও তিনি পরে আছেন সানগ্লাসের মতো কালো চশমা। জানি না তার চোখ দুটোকে লুকাতে চান কিনা। ইনিই ডা. পেনপেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ ভার্চুয়াল কবিগোষ্ঠী Pentasi ই-এর প্রেসিডেন্ট, তিনি ফিলিপাইনের কবি। সেখানে আরো এক বিশিষ্ট মানুষ দৃষ্টি কাড়ে আমার। দীর্ঘদেহী কৃষ্ণকায় মানুষটি যে কালো আফ্রিকার, নাম রাশিদ হাসান পেলপু। তিনি ঘানার কবি। ছবি তুলতে চারজন দাঁড়ালে দুই পাশ থেকে প্রায় উড়াল দিয়ে আসে আরো দুজন। এভাবে চার থেকে ছয়, ছয় থেকে আট, ছবির ফ্রেম বড় হতে থাকে।

আজ কবিতা উৎসবের শুরু। উৎসবের মূল ভেনুর প্রবেশপথের দুই পাশে আমন্ত্রিত অতিথি কবিদের ছবি দিয়ে দুটি বড় পোস্টার মুদ্রিত করে রাখা হয়েছে। কেন্দ্রে একটি বেদির ওপর দীপশিখার আদলে একটি কাচের ভাস্কর্য। তার ওপর নেমে এসেছে বড় বহু দীপশিখার গোলাকার ঝাড়বাতি। নিচের বৃত্তাকার নকশা আঁকা কার্পেট আর ওই ছাদের বৃত্ত সমআয়তনের। কাল রাতেই দেখেছি, আজ উৎসবের রঙে আরো রঙিন। প্রবেশপথের দরজার কাছে দুটি চেয়ার পাতা, টিভি ক্যামেরা, মাইক্রোফোন দেখে বুঝলাম, সাক্ষাত্কার নেয়া হবে। প্রথম সাক্ষাত্কারটি আমাকেই দিতে হলো। মূল মঞ্চের পেছনে নীল রঙের বৃহৎ ব্যানার। হলঘরজুড়ে গোলাকার টেবিল ঘিরে সাদা কাপড়ে মোড়ানো চেয়ারে কবিরা এসে বসছেন। লঙ্কা প্রসাদ ঘোষণা দিলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চমক রয়েছে। অতিথিদের বলা হলো সামনের লবিতে গিয়ে জড়ো হতে, প্রধান অতিথিকে বরণ করে নিতে। লবিতে যাওয়ার পর সবাইকে সমাবর্তনে স্নাতকরা যেরূপ কালো গাউন পরিধান করে, তা দেয়া হলো। গাউন পরে অপেক্ষায় আছি আর ভাবছি, কে হতে পারেন এই মহাসম্মানিত প্রধান অতিথি। ফুলের তোড়াগুলো কোন হাতে জমা হচ্ছে দেখে বুঝতে পারলাম পুরু গোঁফের মধ্যম আকৃতির সাদাসিধে মানুষটিই প্রধান অতিথি। মানুষটি লাজুক প্রকৃতির, সংবর্ধনার বহর দেখে ঘাবড়ে গিয়ে থাকবেন হয়তো। তাকে মুগ্ধ করে দিতে লঙ্কা প্রসাদ লঙ্কাদ্বীপ থেকে প্রাসাদ না হোক, প্রসাদ এনে দেবেন নির্ঘাৎ। তিনি একজন শিল্পপতি, এ অনুষ্ঠানের একজন বড় স্পন্সর।

 সূচনা সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। তেলেঙ্গানার বিশিষ্ট সন্তানদের (যার ভেতর ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক নরসিংহ রাও, ডা. পেনপেনসহ সাতজন বিশিষ্ট অতিথি)। সম্মুখে রাখা মঙ্গলদীপ জ্বালিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হলো শৈল্পিকভাবে। এরপর প্রত্যেক বিশিষ্ট অতিথির বক্তৃতা। তাদের প্রত্যেককে একটি গোল্ডপ্লেটেড পদক, সার্টিফিকেট ও শাল (উত্তরীয়) উপহার দেয়া হলো। ঘোষণায় যদিও দু-একজনকে কদাচিৎ দেখা গেছে। প্রায়ই ঘোষণার কাজটি করেন লঙ্কা প্রসাদ। পুরো অনুষ্ঠানই তার একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। মঞ্চে এসে কে বসবেন, কে সম্মাননা পাবেন, তিনিই নির্ধারণ করছেন। অন্যান্য ঘোষকের চেয়ে তিনি অবশ্য অধিকতর আকর্ষণীয়। কেননা তার রসবোধ রয়েছে। প্রায়ই মজার মন্তব্য করে শ্রোতৃমণ্ডলীতে হাসির জোয়ার বহাচ্ছেন। প্রশংসায়ও তিনি প্রচণ্ড উদার। তেলেঙ্গানার কৃতী সন্তানদের প্রশংসায় তিনি superlatives-এর একটি অভিধানই খুলে বসলেন। মঞ্চের এক পাশে সার্টিফিকেট, শাল, পদক ও ক্রেস্টের এক আড়তই গড়ে তুলেছেন তিনি। সেখান থেকে তার নির্দেশনায় অতিথিদের জন্য সম্মাননা দেয়া হচ্ছিল। আরেকটি বিষয় খুব পরিষ্কার হলো যে, তেলেঙ্গানার সন্তান হিসেবে তিনি খুবই গৌরবান্বিত। বিশ্বকবিতা উৎসব তাই শুরু হলো তেলেগু কবিতা দিয়ে। কেউ কেউ ইংরেজি অনুবাদসহ পাঠ করলেন। নইলে সেসব কবিতা বোঝার সাধ্য নেই ভাষার কারণে। আগের সেশনে কিছু বক্তা তেলেগুতেই বক্তৃতা করেছিলেন। স্বভাবতই তা ভিন্নভাষীদের বোধগম্য হয়নি। কোনো কোনো বক্তা অবশ্য কিছু অংশ বিদেশীদের বোধগম্যতার স্বার্থে ইংরেজিতে বলছিলেন। সব মিলিয়ে তেলেগু ভাষাই হয়ে উঠল আজকের দুটি সেশনের প্রধান ভাষা। একই পঙিক্তর পুনরাবৃত্তি শুনে বুঝতে পারলাম, হিন্দিবলয়ে যে ঢঙে শায়েরি পাঠ হয়, সেই ঢঙ প্রভাবিত করেছে এদেরও। অনুবাদ শুনে মনে হলো, ফুল, পাখি, প্রেম নিয়েই আবিষ্ট কবিরা। ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে এসেছেন বেশকিছু নারী কবি। এরা হলেন সন্তোষ বাকাইয়া, নন্দিতা সামন্ত, গৌরি দীক্ষিত, লিলি স্বরণ।

শুনলাম, প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিদেশ থেকে এসেছেন ৩৩ জন কবি, ভারত থেকে ৭০ জন— সব মিলিয়ে ১০৩ জন কবি। ইতালি থেকে এসেছেন সের্গেই ক্যামিলিনি। তিনি ইংরেজি ভাষায় স্বচ্ছন্দ নন। তার সঙ্গে একজন দোভাষী। তুরস্ক থেকে আসা লেইলি ইসকও একজন দোভাষী নিয়ে এসেছেন। অবাক ব্যাপার, তিনি কবিতা লেখেন ইংরেজিতে, কিন্তু ইংরেজি বলতে পারেন না। পরিচয় ঘটল একজন অভিবাসী ভারতীয় কবির সঙ্গে, যিনি ৪০ বছর ধরে কানাডায় বাস করেন, নাম অশোক ভার্গব। কানাডার কবিতা সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। উত্তর সাইপ্রাস থেকে এসেছেন সেভিল এমিরজাদে।

আন্তর্জাতিক কোনো উৎসবে এলে এই এক মস্ত সুযোগ, এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, যাদের দেখা আপনি আগে কখনো পাননি, পরেও যে আর পাবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। ভ্রমণপথে কত মানুষকে আমরা দেখি, জীবনে ওই একবারই। চোখের আড়ালে চলে গেলে ইহজনমে আর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা অঙ্কে কোনো ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে থাকতে পারে, বাস্তবে শূন্য।

কবিতা উৎসবের হলঘরটির ছাদে লতা-পাতা-ফুলের গ্লাস পেইন্টিংয়ের মোহময় সৌন্দর্য ফুটে আছে। তাতে সবুজাভ হলুদের একটি আভা প্রজ্বলিত। মঞ্চে যে কবিতা পড়া হচ্ছে তেলেগু ভাষায়, যার ইংরেজি অনুবাদ যতটুকু কানে আসছে, তাতে লতা-পাতা-ফুলের মুগ্ধতাই বেশি। আর সেসবে জড়িয়ে আছে মানুষের চিরন্তন প্রেমবাসনা, বিরহযাতনা। হলঘরটির ছাদের ঠিক কেন্দ্রে বড় এক ঝাড়বাতি চারদিকটা আলোকিত করে রেখেছে। এ অনুষ্ঠানমালার ঝাড়বাতিটি হচ্ছেন লঙ্কা প্রসাদ।

আজ পুরো দিনটিই কেটে গেল তেলেঙ্গানার কবি ও বিশিষ্টজনের কবিতা পাঠ, বক্তৃতা ও সংবর্ধনায়। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে কত বিশিষ্ট মানুষ আমাদের অগোচরে রয়ে যান, তার ইয়ত্তা নেই। কেবল কিছু নাম, আপন প্রতিভা বা মিডিয়ার জোরে বিশ্বমঞ্চে উঠে আসে। ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রির মঞ্চটিকে আমি ক্রমেই তার আন্তর্জাতিকতা হারিয়ে স্থানীয় হয়ে উঠতে দেখলাম। বৈকালিক চায়ের পর আমি কিছুক্ষণ হলঘরে অনাকর্ষণীয় বক্তৃতা ও গত্বাঁধা কবিতা শুনি। অতঃপর বেরিয়ে পড়ি। কেননা বাইরের প্রকৃতি ও মানব নির্মাণ তার চেয়ে অধিকতর আকর্ষণীয়। কার্নিভাল স্কোয়ার আমাকে চুম্বকের মতো টানে।

তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, জ্বলে উঠেছে বাতিমালা। হোটেল সিতারা বিভিন্ন রঙের পোশাক পরছে আর পাল্টাচ্ছে। সম্মুখের ঢাল পাথরের বুদ্ধমূর্তির ওপর আলো, যিনি আলোক ছড়িয়েছেন জগতে, তাকে আলোকিত হূদয়ে ধারণ করছে মানুষ। সম্মুখের গাড়ি চলা পথখানি অজস্র সাদা তারাবাতির উজ্জ্বলতায় স্বর্গের একটি পথ হয়েছে। আমি সেই জায়গাটিতে এসে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকি, যেখানে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরনা ঝরছে, আলোর ঝরনা, তবে জলহীন নয়। জল বর্ণিল পোশাক পরে আঁকা ও বাঁকা পথ ধরে অবিরল নিচে নেমে আসছে। আমি পার হয়ে যাই তিন প্রকার আলোকস্তম্ভের প্রহরায় নির্মিত বর্ণিল পথ। অতঃপর এসে পড়ি সেই তিন উর্বশীর কাছে, যাদের রূপ স্থাপত্য ফুটে প্রোজ্জ্বল। ভাস্করের নিখুঁত নির্মাণে তাদের নগ্ন দেহবল্লরী সৌন্দর্য ও কামনার যুগপৎ উদ্ভাসন চারপাশের অন্ধকারকে আনন্দিত করে জ্বলছিল। চৌরাস্তার বড় ফোয়ারাটির দুই পাশে তারা নিজ সৌন্দর্য নিয়ে স্থির ছিল; তরঙ্গায়িত তবু নিশ্চল। সেলিব্রেশন ফোয়ারাটি জ্বলছিল বিবিধ আলোয়। পাথরের ফ্রেসকোয় মানব-মানবীর প্রেমলীলা জলের আস্তর সরিয়ে প্রতিভাত, যেন এক ঘূর্ণ্যমান গ্যালারি, ঘুরে ঘুরে বৃত্তাকার ফোয়ারাটির শিল্পকর্ম দেখি। একটি বৃহৎ মঞ্চে উদ্দাম সুরলহরীর সঙ্গে ছন্দোবদ্ধ নৃত্য চলছিল। ১০ পুরুষ আর ১০ রমণীর মুম্বাই থেকে আসা দলটি বেশ নৃত্যপটু। তারা সম্মুখের বড় প্রাঙ্গণ ভরাট করে বসে থাকা দর্শককুলকে চোখের পলক ফেলতে দিচ্ছিল না। আমি হোটেল সিতারায় ফিরে অািস। কেননা সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে।

কবিতা উৎসবের প্রথম সন্ধ্যায় আমাদের নাচের সৌন্দর্য দেখাতে এলেন যশোদা ঠাকুর। ইনি কুচিপুডি ঘরানার শিল্পী। তার নাচে অভিনয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে মুখের অভিব্যক্তি। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নারী চরিত্র তিনি অভিনয় ও নৃত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুললেন। নারীর সব অভিব্যক্তি ও আবেগ এক অবয়ব আর দেহে ফুটে উঠল নৃত্যের ছন্দে। একজন যুবতী রমণী চরিত্রগুলো প্রথমে বিধৃত করছিলেন ভাষায়। আরেক সুদর্শনা সুললিত কণ্ঠে ধ্রুপদী রাগ গাইছিলেন। তাকে সহবৎ করছিলেন যন্ত্রীরা। নিপুণ পদবিক্ষেপ, হাতের মুদ্রা, দেহের বাঁক, চোখ ও মুখের অভিব্যক্তিতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুললেন যশোদা ঠাকুর। নৃত্য তার পায়ের ভৃত্য বলেই মনে হলো।

পরিচয় হলো কেসি শেঠি নামে একজন কবি ও লেখকের সঙ্গে। Coffee Table Book বলে তার কাছে দুটি ছবি ও কবিতার যুগলবন্দি আর্ট কাগজে মুদ্রিত মোটা পুস্তক দেখলাম। প্রতিটি ছবির সঙ্গেই বড় অক্ষরে পুরু চকচকে কাগজে কবিতা ছাপানো। ছবি যত সুন্দর, কবিতা ততটাই দুর্বল। সেভিল এমিরজাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট ধারণা পেলাম সাইপ্রাস নামের ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ দেশটির অন্তরের রক্তক্ষরণের ইতিহাস। মৃদুভাষী এ মাধুর্যময়ী কবি তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত। তিনি সংগ্রহ করেন পূর্বপুরুষের কাহিনী, লোকগাথা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নানা উপাদান। সেসব নিয়ে রচনা করেন নাটক। আমি তো ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভালকে ইংরেজি ভাষার কবিতা উৎসবই ভেবেছি। কিন্তু তা হওয়ার কথা নয়। পৃথিবীর লোকেরা তো কেবল ইংরেজি ভাষায় কথা বলে না। তবে জগতের lingua franca এ উৎসবেরও বাহন। নইলে কী করে তেলেগু ভাষার কবিতা বুঝব, কিংবা এ আরবি ভাষার কবিতা?

প্রথম দিনটি কেটেছে তেলেগু কবিদের কবিতা পাঠ ও আলোচনায়। সঙ্গে ছিল তেলেঙ্গানার গুণীজনদের সংবর্ধিত করা। আজ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও কবিতা পাঠ হবে বলে জানি। প্রাতরাশ শেষে মূল উৎসব হলে এসে বসি। মঞ্চে সাজানো রয়েছে ১০টি চেয়ার। সাদা কাপড়ে আগাগোড়া মোড়ানো কেদারাগুলোর মাঝের তিনটি একটু আলাদা, অলঙ্কৃত। বুঝলাম ওই তিনটি বিশিষ্ট তিনজনের জন্য। ঘোষণা এল, অনেকগুলো ‘সারপ্রাইজ’ আছে। প্রথম ‘সারপ্রাইজ’ হিসেবে কবিদের বলা হলো লবিতে গিয়ে জড়ো হতে। কাল কবিদের সমাবর্তন হয়েছিল, আজ কী? লবিতে গিয়ে দেখি, কাচের ভেতর দিয়ে প্রভাতের সোনা রোদ এসে ছড়িয়ে পড়েছে আসবাবে, নকশাকাটা দেয়ালে, ছবি অঙ্কিত ছাদে, কলকাকলিরত অতিথিদের পালকে। জড় ও জীব— জগতের সব বস্তু উজ্জ্বল প্রতিভাত।

সেখানেই পরিচয় হলো বেঙ্গালুরু থেকে আসা যুবতী কবি রেশমা রমেশের সঙ্গে। গতকালই এ প্রখরনয়না, কাটা কাটা চেহারার শ্যামাঙ্গিনীকে দেখেছিলাম আপনরূপ নিয়ে গরবিনী, উদাসীন। আজ পরেছেন কালো পাড়ের সাদা শাড়ি। তাতে তার রূপ, ওই তরুণ বয়সের বিদ্যুত্প্রভায় ধারালো প্রখরতর হয়েছে। কাল এড়িয়ে গেছেন, আজ আর পারলেন না, একেবারে মুখোমুখি। ততক্ষণে বেশির ভাগ কবি ও অতিথি হোটেল সিতারার সম্মুখের মাঠে গিয়ে জড়ো হয়েছেন।

দিনটি রৌদ্রকরোজ্জ্বল, তাতে সবুজ প্রাঙ্গণখানি চকচক করছে। সে প্রাঙ্গণেই হোটেলের সুইমিং পুলটি। গাঢ় সবুজের চাদরখানির মাঝে ওই নীল পুকুর। পেন্টাসি-বি ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রির বিশাল এক ব্যানার ধরে কবিরা একে একে দাঁড়ালেন। কবির সংখ্যা এত বেশি যে, সবাই ব্যানারের পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলেন না। কেউ কেউ বসে পড়লেন সম্মুখে। যখন বৃহৎ ব্যানারটি নিয়ে দিক পরিবর্তন করছিল, অনেকটা মিছিলের মতো। তখন বলা হলো হাত তুলে হোটেল সিতারার দিকে নির্দেশ করতে। কেন? কেননা, সেখানে পঞ্চম তলা থেকে ভিডিও ক্যামেরায় রেকর্ডিং করা হচ্ছে আমাদের যাবতীয় বয়স্ক উল্লাস। তরুণ হওয়ার আপ্রাণ ব্যর্থ কসরত। এ উৎসবের প্রতিটি ঘটনা রেকর্ডিং করা হচ্ছে, ক্যামেরাগুলো খুব তত্পর।

প্রভাতফেরি শেষে কবিরা ফিরে এসেছেন উৎসগৃহে। মঞ্চের পেছনের মাঝের বড় অংশটি একটি টেলিভিশন পর্দা। সেখানে কাল প্রভাতে যে তরুণীর সাক্ষাত্কার বারবার দেখানো হয়েছিল, আজ সেই অপূর্বা প্রসাদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন দিয়ে সূচনা হবে উৎসবের দ্বিতীয় ও শেষ দিনটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। যখন ভিডিও চলে না, তখন সেখানে উৎসবের প্রধান ব্যানারটি নীল আকাশের মাধুর্য নিয়ে জ্বলতে থাকে। ওই প্রধান পর্দার দুই পাশে দুটি ছোট পর্দা। এগুলো স্টিল ছবি, চলমান নয়। তারা ধরে আছে পেন্টাসি-বির লোগো, যেখানে কমলালেবু পৃথিবীর বৃত্তজুড়ে কবিদের মুখ। পেন্টাসি-বির কবিসংখ্যা এত বিপুল যে, সব মুখ ঠাঁই দিতে গেলে সবাই বিন্দু হয়ে যাবে, যেন এক নক্ষত্রখচিত মহালোক।

অনুষ্ঠান শুরু হলো ধীরলয়ের সংগীতের সুরলহরীর মাধুর্যে। লঙ্কা প্রসাদ মঞ্চে ডেকে নিলেন সাতজন বিশিষ্ট অতিথিকে। একটি চেয়ার আলাদা করে কিছুটা সম্মুখে রাখা হয়েছে। এতে বসবেন যার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হবে তিনি। সাত অতিথি আসন গ্রহণ করার পর অপূর্বা এসে আসনটিতে সলজ্জভাবে বসল। সব চোখ তার দিকে। উৎসবের সব আলো তার ওপর পড়ছে। এটা অনুভব করে কিছুটা সংকুচিত হয়ে রইল। প্রথমে তার লেখার গুণকীর্তন করে বক্তৃতা, পরে সাত অতিথির প্রত্যেকে অপূর্বাকে একটি করে প্রশ্ন করল। অনেকটা বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার বিচারকদের ঢঙে। ছয় অতিথি God is Sick বইটির মোড়ক উন্মোচন করল। আমার মনে পড়ল God is Dead গ্রন্থটির কথা। তাহলে তরুণী মেয়েটি ঈশ্বর, পৃথিবী, সময় নিয়ে ভাবে। নবীন কবির প্রতিভায় সবাই বেশ গদগদ। আবির্ভাবেই সে সাড়া ফেলে দিয়েছে, এমন অভিমত বক্তাদের। তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করল তেলেঙ্গানার একটি কাব্য পরিষদ। দ্বিতীয় পদক এল বেঙ্গালুরু সাহিত্য পরিষদ থেকে। এর সভাপতি বেশ বয়স্ক। তিনি শংসাপত্র পাঠ করে ক্রেস্ট উপহার দিলেন। গত রাতেই তিনি অপূর্বার বইটি পড়েছেন এবং নবীন কবির প্রতিভায় মুগ্ধ হয়েছেন। চণ্ডীগড়ের কবি লিলি স্মরণ তার অকালপ্রয়াত পুত্র গোবিন্দ শাহবাজের নামে চালু হওয়া স্বর্ণপদক প্রতিভাবান তরুণ কবি হিসেবে অপূর্বাকে উপহার দিলেন।

গোটা সকালটি উৎসর্গিত হলো একটিমাত্র কাব্যের মোড়ক উন্মোচনে। শুনেছি, আজ কমপক্ষে ২৫টি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন হবে। প্রথমটির আনুপাতিক হারে কত সময় লাগতে পারে, সে মানসাঙ্ক যখন করছি, তখন দেখি শফিকুল আমাকে ডাকছে। প্রচণ্ড ইচ্ছা হলো অপূর্বার বইটি দেখার। আলেখ্য একটি কপি এনে দেয়। চতুষ্কোণ, বড় আকারের গ্রন্থটির প্রচ্ছদে রাজার মতো সিংহাসনে বসা ঈশ্বরের কার্টুনচিত্র আঁকা। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টে আমার ভিরমি খেয়ে উল্টে পড়ার জোগাড়। পাতায় পাতায় কার্টুন আর সেসব চরিত্রের মুখে সংলাপ। আগাগোড়াই একটি কার্টুন বই, এক প্রচণ্ড ঠাট্টা, কবিতা কোথাও নেই। এ বই নিয়ে এত উচ্ছ্বাস, এত অতিশয়োক্তি, এত উপহার! আবির্ভাবে সাড়া ফেলার মতো বই এটি নয়। তবে ওই জাগতিক মশকরা নিয়ে মঞ্চে যে সার্কাস হয়ে গেল, তা ছিল সাড়া জাগানো!