ষোড়শ শতক থেকেই গোটা মুসলিম বিশ্ব ও অমুসলিম বিশ্বের কিছু অঞ্চলে জ্ঞানী মানুষ হিসেবে মোল্লা নাসিরুদ্দিন বিখ্যাত হয়ে আছেন। ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ থেকে জানা যায় যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) বাস করতেন তিনি। পণ্ডিত কিংবা নিদেনপক্ষে শিক্ষিত মানুষ ছিলেন তিনি। ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে শত শত বছর ধরে তাঁর কৌতুকগুলো বয়ান করা হয়েছে, কোনোটা নেহাত রসিকতার জন্য, আবার কোনো কোনোটা জ্ঞান ও তাত্পর্যমণ্ডিত কাহিনী তুলে ধরার জন্য।

সূচনা
দুনিয়াজুড়ে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি দেশগুলোর বিপুল সংখ্যক রসগল্পের মূল নায়ক নাসরুদ্দিন হোজ্জা; মোল্লা নাসরুদ্দিন কিংবা স্রেফ নাসিরুদ্দিন নামেও তিনি পরিচিত। প্রতিটি গল্প নাসিরুদ্দিনকে ভিন্ন কোনো অবস্থানে তুলে ধরে তাঁর চোখ দিয়ে হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে জীবন-সম্পর্কিত ব্যাখ্যা আর শিক্ষা তুলে ধরছে। মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, মজাদার হওয়ার পাশাপাশি এগুলো শিক্ষামূলক এবং চিন্তাজাগানিয়াও বটে।

বিভিন্ন সূত্র মোতাবেক নাসরুদ্দিন হোজ্জা দারুণ রসবোধের অধিকারী একজন দার্শনিক, বিজ্ঞ, বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ ছিলেন। পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই তাঁর গল্প প্রচলিত, ছড়িয়ে পড়েছে তুর্কি দুনিয়ার বিভিন্ন গোত্র এবং পারস্য, আরব, আফ্রিকা, সিল্করুট হয়ে চীন, ভারত ও ইউরোপেও। অবশ্য এসব গল্প প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁর নামে চালানো হলেও মূলে তিনি ছিলেন না। বেশির ভাগই কেবল তুর্কিদের নয়, বরং ইসলামী ও এশীয় সংস্কৃতির সমন্বিত রসিকতার ফল। সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন নামে নাসিরুদ্দিন পরিচিত। প্রধান প্রধান রূপগুলো হলো: তুর্কিরা বলে ‘নাসরেন্দিন হোকা,’ কাজাখদের কাছে তিনি ‘কোজা নাসরেদ্দিন’; গ্রিকরা তাকে বলে ‘হোজা নাসরেদ্দিন,’ চীনে নাসরদ্দিন আফেন্দি; অন্যদিকে আজারবাইজেনীয়, আফগান ও ইরানিরা তাকে ‘মোল্লা বা মুল্লা নাসরুদ্দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার লোককাহিনীতে তিনি ‘জুহা’। তাঁর আরবি নাম নসর আল-দিন-এর প্রথম অংশের কিছু বানান এই রকম: নাসরেদ্দিন, নাসরুদ্দিন কিংবা নসর এদ-দিন। ১৯৯৬ সালকে ইউনেস্কো ‘নাসরেদ্দিন হোকা বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। আজ ২০১৭ সালে তাঁর বয়স ৮০৮ বছরেরও বেশি।

সংক্ষিপ্ত জীবনী
তুর্কি-ইসলামী প্রভাবান্বিত বলকান অঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়ার তুর্কি ভাষাভাষী লোকজন এবং ইসলামী দুনিয়ার অন্যান্য জায়গায়ও রসগল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রের নাম নাসিরুদ্দিন। তাঁর জীবনী-সংক্রান্ত বিভিন্ন তত্ত্ব বিশেষ কিছু তথ্য নির্মাণে সফল না হওয়ায় এখনো তিনি ঐতিহাসিক অস্তিত্ব সমস্যাসংকুল থেকে যাওয়া এক বিখ্যাত মানুষ। ষোড়শ শতক থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান হারে ভিন্ন ভিন্ন উেসর এমনিতে রূপহীন প্রবচন, শ্লেষাত্মক গল্প, কৌতুক, রসিকতা আর ব্যক্তি-সম্পর্কিত মজার ঘটনার জনপ্রিয় ধারার একীভূত হওয়ার কেন্দ্রের ভূমিকা রেখে আসছেন এই ব্যক্তিত্ব।

সেই পনেরো শতক থেকেই নাসিরুদ্দিনের নামে চালু নানা গল্প বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে পাওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে প্রাচীন কাহিনীটি পাওয়া গেছে ইবু’ল-ভায়ের-ই রুমি’র সালতুকনামায় (১৪৮০)। এ বইয়ের ভাষ্যমতে, নাসিরুদ্দিন আধুনিক তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমের আকসেহিরের সায়ীদ মাহমুদ হেরানির একজন দরবেশ ছিলেন। তাঁকে নিয়ে তুর্কি ভাষায় অন্য কাহিনীগুলো লামি চেলেবি’র (মৃ: ১৫৩১) গল্পের বই লেতাঈ’ফ-এ উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য নাসিরুদ্দিন হোজ্জার সত্যিকারের পরিচয়ের ব্যাপারে ইতিহাসবিদদের ভেতর ঐকমত্য নেই। লামি চেলেবি নাসরুদ্দিনকে শেয়ীদ হামজার (চতুর্দশ শতাব্দী) সমসাময়িক বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে পরবর্তীকালে জনপ্রিয় কাহিনীতে জোরালো প্রভাব, বিশেষ করে সতেরো শতকে আকসেহিরে নাসরুদ্দিনের কথিত কবর জিয়ারতকারী এবং তাঁর একটি ঘটনার উল্লেখকারী এভিলিয়া চেলেবি থেকে উদ্ভূত ইউরোপীয় প্রাজ্ঞ আলোচনায় নাসিরুদ্দিনকে আরো পরে মৃত্যুবরণকারী মঙ্গল শাসক তৈমুর লংয়ের (মৃ: ১৪০৫) সঙ্গে দেখিয়েছে।

পরবর্তী শতকগুলোয় সিভরিহিসারের মুফতি হুসেইন এফেন্দি (মৃ: ১৮৮০) মেকমুয়া-ই মা’রিফ-এ লিখেছেন যে, সিভরিহিসার অঞ্চলের হোর্তু গ্রামে (বর্তমানে হোকা কোয়) ১২০৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন নাসিরুদ্দিন এবং আকসেহিরে মৃত্যুবরণ করেন। এখানে বসতি করেছিলেন তিনি। এই সূত্রমতে যথাক্রমে সিভরিহিসার ও কোনিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি। ফিকহ বিষয়ে পড়াশোনা শেষে কোনিয়ায় মাওলানা জালাল আল-দিন রুমির (১২০৭—১২৭৩) সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর কাছে সুফিবাদে তালিম নেন। সায়ীদ মাহমুদ হেইরানিকে গুরু মেনেছেন তিনি। এভাবে আকসেহিরে গিয়ে সেখানেই বিয়ে করেন। প্রথমে ইমাম এবং পরে সেখানকার কাজি হন তিনি। এ শহরেই তাঁর দুর্দান্ত রসবোধ ও চৌকস মন্তব্য, সিদ্ধান্ত আর মজার ঘটনাগুলো তাঁকে সমাজের একজন মানী ও কাঙ্ক্ষিত মানুষে পরিণত করে।

কোনিয়ায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দুটি ভিন্ন ভিন্ন ওয়াকফ্-নামায় নাসিরুদ্দিনের অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে। সেগুলোর একটা ১২৫৭ সালে সায়ীদ মাহমুদ হেইরানির অধিকারে, অন্যটি ১২৬৬-৬৭-তে হাজি ইব্রাহিম সুলতানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তা সত্ত্বেও নাসিরুদ্দিন হোজ্জার জীবন সম্পর্কে খুবই সীমিত প্রতিষ্ঠিত বাস্তব ঘটনা রয়েছে। এটা নিশ্চিত যে, ১৩ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আনাতোলিয়ায় বাস করতেন তিনি। একটা গ্রহণযোগ্য বাস্তবতা হলো, ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ আকসেহির অঞ্চলের হোর্তু নামে একটা গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি এবং তারপর প্রথমে আকসেহিরে ও পরে কোনিয়ায় থিতু হন। কোনিয়ার কাছে আকসেহির শহরেই তাঁর কবর রয়েছে। একটা বিশাল তালা লাগানো লোহার দরজা আছে সেই কবরে, তাই বলে তালাবদ্ধ দরজা দেখে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কবর ঘিরে কোনো দেয়াল নেই!

নাসরুদ্দিন হোজ্জার জীবনীর সঙ্গে আরেকটি উপাদান সংশ্লিষ্ট। মাওলানা জালাল আল-দিন রুমির গোরস্থানে নাসিরুদ্দিনের মেয়ে ফাতিমার নামে প্রচলিত একটি সমাধি ফলক রয়েছে। সমাধি ফলকের লিপি মোতাবেক ১৩২৬ সালে তিনি মারা যান। এই সমাধি ফলকটি কোনিয়ার আশপাশে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে নাসর আল-দিনের বসবাসের বিষয়টিকে সমর্থন করে।

নাসর আল-দিনের গল্পের সবচেয়ে পুরনো পাণ্ডুলিপি খুবই ছোট একটা সংগ্রহ তুলে ধরে, পরবর্তী শতকগুলোয় অবিরাম আকারে বড় হয়েছে সেটা। উত্তর-পশ্চিম ও মধ্য এশীয় তুর্কি ভাষায় ছাপানো সংকলনগুলো প্রায় হুবহু প্রথম তাতার সংস্করণ থেকে নেয়া হয়েছিল, যেগুলোর উত্স ছিল অটোমান তুর্কি ভাষ্য। পনেরো শতক থেকে নাসিরুদ্দিনের কাহিনীগুলো সংগৃহীত হতে শুরু করে। তবে ১৮৩৭ সালেই প্রথম ইস্তাম্বুলে মাতবা’-ই আমিরি (রাজকীয় ছাপাখানা) লেতাঈফ-ই হেস নাসরেদ্দিন (খোজা নাসরুদ্দিনের মজার গল্প) নামে সেগুলো ছাপানো হয়। বর্তমানে তোপকাপি প্রাসাদের জাদুঘরে রক্ষিত সতেরো শতকের একটি পাণ্ডুলিপিতে প্রথম তাঁর মিনিয়েচার ছাপা হয়েছিল। এ মিনিয়েচারটি একটি গাধার পিঠে পেছন ফিরে বসে থাকা অবস্থায় তুলে ধরেছে তাঁকে।

তুর্কি কথাকাহিনীর ভেতর দিয়ে শুরু হয়ে নাসিরুদ্দিনের খ্যাতি অচিরেই অটোমান রাজ্যের সব প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন উপাদানও আত্মস্থ করতে থাকে চরিত্রটি। তুরস্ক বাদেও স্বয়ং নাসিরুদ্দিন এবং তাঁর গল্পগুলো বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে আরবি ও পারসি লোককাহিনীতে সুবিদিত। ব্যাপক বিস্তৃত অঞ্চলে তাঁর কাহিনীগুলো শোনানো হয় এবং বহু ভাষায় তা রূপান্তরিত হয়েছে। [বাংলাদেশে মোহাম্মাদ নাসির আলীর ভিনদেশী এক বীরবল সম্ভবত বাংলা ভাষায় প্রথম এবং খুবই জনপ্রিয় একটি সংকলন] বহু এলাকায় নাসিরুদ্দিন সংস্কৃতির একটা প্রধান অংশ এবং দৈনন্দিন জীবানাচারে তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। নাসিরুদ্দিনের হাজার হাজার গল্প চালু থাকায় যেকোনো উপলক্ষের সঙ্গে জুতসই একটি গল্প অনায়াসেই মিলে যায়। আলবেনীয়, আরবি, আযেরি, বাংলা, বসনীয়, হিন্দি, পশতু, ফারসি, সার্বীয় এবং উর্দু লোককাহিনীতে এবং ক্রোয়েশীয় ও ককেশীয় ভাষার মতো নানা অঞ্চল আর ভাষায়, এমনকি একই নামে চীনা ভাষায়ও তাঁর কাহিনীগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে।

এভাবে তুর্কি ঐতিহ্যে যোগ করা আরবি ও ফারসি ভাষ্যের বাড়তি ভাণ্ডারের পারস্পরিক বিনিময় এখনো পরখ করা হয়ে ওঠেনি। তবে এটা নিশ্চিত যে, উনিশ শতকের শেষ বা বিশ শতকের শুরুতেই গোটা অটোমান রাজ্যে নাসিরুদ্দিন এমন এক ধরনের জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন যে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদানগুলোর উত্স খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেনি, বরং জনপ্রিয় অনুভূতি থেকে আঁকা সাধারণ কাঠামোর সঙ্গে খাপ খেলে যেকোনো গল্পই এ চরিত্রের সঙ্গে জুড়ে দেয়াটাই সিদ্ধ হয়ে উঠেছিল।

পাণ্ডুলিপি ঐতিহ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদেই হয়তো ধরে নেয়া যেতে পারে যে, এসব কাহিনী বড় ধরনের আক্রমণের বস্তুতে পরিণত হয়নি, বরং এটাই ধরে নিতে হবে— পরিমার্জিত সাহিত্যিক বিকাশের হাতে প্রতিষ্ঠিত বিধিনিষেধের কাছে আত্মসমর্পণ না করেই এগুলো সোজাসাপ্টা ও স্পষ্টবাদী ধরনের রসিক ঝোঁক তুলে ধরে। গোড়ার দিকের সংকলনগুলো ‘লোক’ সাহিত্য হিসেবে উল্লেখ করার মতো কোনো কিছু তুলে ধরে কিনা, তাতে সন্দেহ থেকে গেলেও এটা নিশ্চিত বলে মনে হয় যে, এ ধরনের অমার্জিত কাহিনী আজো বিপুল খ্যাতি উপভোগ করে।

ইচ্ছাকৃত আক্রমণাত্মক অংশগুলো বাদ দিলে নাসিরুদ্দিনের নামে চালু কাহিনীর ভাণ্ডার আন্তর্জাতিক বয়ানের ঐতিহ্যে লিখিত বিপুল সংখ্যক গল্প ধারণ করে। এসব গল্প গোটা মধ্যপ্রাচ্য, বলকান অঞ্চল ও ভূমধ্যসাগরীয় এলাকাজুড়ে সফরের সময় নাসিরুদ্দিন চরিত্রটির সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া একটি সাধারণ চিত্র ।

এ পরিপ্রেক্ষিতে অনায়াসেই দাবি করা যেতে পারে যে, হোজ্জার নামে চালু সংখ্যাগরিষ্ঠ কাহিনী উেসর দিক থেকে সামাজিক রসিকতা, তুর্কি প্রভাবের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভাষার দিক থেকে সম্পর্কিত এলাকায় ব্যাপকভাবে মিশে যাওয়া তুর্কি জনগণের দর্শন ও মননেরই সৃষ্টি।

আপনাকে কেবল হোজ্জার নাম উচ্চারণ করতে হবে। ব্যস, তাহলেই প্রতিটি তুর্কি হাসতে শুরু করবে। মজার একটা গল্প শোনার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকবে না তার মনে। এমনকি অন্য কারো কাছে নীরস ঠেকা কোনো গল্পেও একজন তুর্কির কাছে আবেদনময় একটা কিছু থাকবেই। আকসেহিরের কাছে লবণ হ্রদে হোজ্জার ইস্ট ফেলে দেয়ার সেই গল্পটার কথাই ধরুন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, সামান্য একটু ইস্ট গোটা হ্রদকে দই বানাতে পারবে না। কিন্তু কে জানে, যদি পেরে যায়! দারুণ ব্যাপার হবে না!

প্রজন্মান্তরে নতুন নতুন কাহিনী যোগ হয়েছে, অন্যগুলো বদলে গেছে আর চরিত্র আর তাঁর গল্পগুলো অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে গেছে। বেশ কয়েকটা জাতির লোককাহিনীর অংশে পরিণত হয়েছে এবং গল্পের মূলভাব ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কল্পনাকে তুলে ধরছে। বেশির ভাগ গল্পেই নাসিরুদ্দিনকে প্রাচীন কোনো ছোট গাঁয়ে তুলে ধরা হলেও সেগুলো এক ধরনের সময়হীন ধারণা নিয়েই কাজ করে। 

নাসিরুদ্দিনের গল্প
নাসিরুদ্দিনের গল্পগুলো গোটা মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় সুবিদিত এবং সারা পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে পৌঁছে গেছে। দৃশ্যত, নাসিরুদ্দিনের বেশির ভাগ গল্পই কৌতুক বা রসিকতাপূর্ণ গল্প হিসেবে শোনানো হয়ে থাকে। এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও অন্যত্র কফি হাউজ ও কারাভানসেরাইতে অন্তহীনভাবে বারবার এগুলো উচ্চারিত হয়ে চলে, বাসাবাড়ি আর রেডিওতেও শোনা যেতে পারে। কিন্তু নাসিরুদ্দিনের যেকোনো গল্প নানা স্তরে বোঝা যাওয়ার ব্যাপারটা এর সহজাত। কোনো কৌতুকের পরই রয়েছে নীতিকথা এবং সাধারণভাবে সম্ভাব্য মরমি চেতনাকে উপলব্ধির আরো খানিকটা কাছাকাছি নিয়ে আসা বাড়তি কিছু। 

নাসিরুদ্দিনের নামে চালু গল্পকাহিনীগুলো ধারালো জিভের অধিকারী এক বিদ্রূপাত্মক ব্যক্তিকে তুলে ধরে, তাঁর সময়ের চরম স্বাৈরচারী শাসকদেরও ভয় পেতেন না তিনি। তিনি এককালে বিশ্বের এই অংশকে শাসনকারী বিভিন্ন রাজবংশের বিরুদ্ধে মানুষের শ্লেষাত্মক, পরিহাসময় এবং বিদ্রূপাত্মক ও বিদ্রোহী মনোভাবেরই প্রতীক। গল্পগুলোর পটভূমির একটা অংশ আবার সমাজের চলমান নৈতিকতার বিরুদ্ধে তির্যক দৃষ্টি তুলে ধরেছে, যেখানে লোকে সত্কাজের  নীতির বদলে স্বার্থপরতারই খোঁজ করে।

নাসিরুদ্দিনের কিছু গল্প আবার সুফি তরিকার অনুসারীদের শিক্ষামূলক কাহিনীও গ্রহণ করেছে। এটা এতটাই প্রচল ধারা ছিল যে, নাসিরুদ্দিনের কৌতুকগুলোর ধরনের কারণেই বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করা যেতে পারে। 

হোজ্জার কয়েকটি গল্প

সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না
ছেলেসহ গ্রামের দিকে যাচ্ছে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। ছেলেটা বসেছিল গাধার পিঠে। পথে দুজন মহিলার সঙ্গে তাদের দেখা হলো। তাদের একজন অন্যজনকে বলছে:

‘আজকালকার ছেলেদের অবস্থা দেখো! বুড়ো বাবা হাঁটছে আর ছেলেটা আরামে গাধার পিঠে চড়েছে। আশ্চর্য!’

‘বাবা’, বলে উঠল ছেলেটা, ‘আমার বদলে তুমিই চড়ো, কেমন? কই, এসো, ঝামেলা করো না। তুমিই গাধার পিঠে চড়ো!’

তারপর রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল ওরা। গাধার পিঠে খোজা, ছেলেটা হাঁটছে। কিছুক্ষণ বাদে দুজন খুঁড়িয়ে চলা বয়স্ক লোকের সঙ্গে দেখা হলো।

‘আরে, বুড়ো মিয়া!’ বলল ওরা, ‘তোমার হাড়গোড় তো এমনিতেই বুড়িয়ে খটখটে হয়ে গেছে। এক পা কবরে চলে গেছে তোমার। কিন্তু এই ছোকরা, ওর তোমার মতো বুড়িয়ে যাওয়ার দরকার কী? ওকে চড়তে দাও!’

ওরা বিদায় হলে ছেলেকে গাধার পিঠে নিজের পাশে তুলে নিল হোজ্জা। কড়া রোদের ভেতর এগিয়ে চলল ওরা। এবার রাস্তার পাশে বসে গল্পগুজবে মত্ত একদল লোকের সামনে হাজির হলো।

‘কী নিষ্ঠুর! আহা, বেচারা পশুটা। এটা বড্ড বাড়াবাড়ি। দুজন চেপে বসেছে! জানোয়ারটা মরবে তো। লোকটার দিকে তাকাও, এ যে দেখছি খোজা!’

‘উফ্, খোদার কসম,’ বলল হোজ্জা। গাধার পিঠ থেকে নেমে দুজনই গাধাটাকে সামনে রেখে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু পরক্ষণেই রাস্তার পাশে দাঁড়ানো দুজন লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ওদের।

‘হায় আল্লাহ, বুদ্ধুগুলোকে একবার দেখো! গাধাটা যাচ্ছে আগে, পিঠের ওপর কোনো বোঝা ছাড়াই লাফাতে লাফাতে চলেছে ওটা, আর ঘামে ভিজে ধুলোয় আচ্ছন্ন হয়ে পেছন পেছন চলেছে ওরা। দুনিয়ায় যে কত বেকুব আছে!’ অবশেষে ছেলের দিকে ফিরে খোজা বলল, ‘শোনো! মানুষের জিভের ধার থেকে যে রেহাই পেয়েছে, তাকে সাবাস দিই! তোমার কাজে খুশি নয়, এমন লোক সবসময়ই পাবে। তো স্রেফ আল্লাহকে খুশি করতেই কাজ করো।’

পেছন ফিরে গাধার পিঠে
একদিন হোজ্জা এবং তার ছাত্ররা পড়ার জন্য যাচ্ছিল। গাধার পিঠে পেছন ফিরে বসেছিল খোজা। ‘হোজ্জা,’ ওকে প্রশ্ন করল ওরা, ‘কী কারণে ওভাবে বসে আছেন? ব্যাপারটা অস্বস্তিকর না?

‘আমি অন্যভাবে বসলে,’ জবাব দিল সে, ‘তোমরা তো সবাই আমার পেছনে পড়ে যাবে, তাহলে মুখোমুখি থাকতে পারব না। এভাবে চড়াই শ্রেয়।’ 

আমরা এখানে উঠছি না?

এক রাতে এক চোর হোজ্জার বাড়িতে ঢুকে সব জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেল। লোকটা বিদায় নিতেই হোজ্জা হাতের কাছে পাওয়া প্রথম জিনিসটা নিয়েই— ঘটনাক্রমে সেটা ছিল একটা ছাঁকনি— অনুসরণ করল তাকে। চোরের পিছু পিছু তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করল। বিস্মিত চোর বলল, ‘আমার বাড়িতে আপনি কী করছেন?’

‘তুমি আমাদের সব জিনিস এখানে নিয়ে এলে— ভাবলাম আমরা বুঝি এখানেই এসে উঠব।’

যারা জানে তারা অন্যদের বলুক
একদিন গুরু নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এক মসজিদের মিম্বার থেকে ভাষণ দিচ্ছিল। ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা কি জানো, আমি তোমাদের উদ্দেশে কী বলতে যাচ্ছি?’

শ্রোতারা জবাব দিল, ‘না।’

তো হোজ্জা তখন ঘোষণা দিল, ‘যারা আমি কী বলতে যাচ্ছি, তার সম্পর্কে এতটুকু ধারণা রাখে না, তাদের সামনে কিছু বলার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই।’ বলে মিম্বার থেকে নেমে মসজিদ ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।

লোকজন বিব্রত বোধ করল। আরেকদিন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এল ওরা। সেদিন মিম্বরে উঠে একই প্রশ্ন করল সে। কিন্তু এবার সবাই উত্তর দিল, ‘আমরা জানি।’

‘বেশ, আমি কী বলতে যাচ্ছিলাম, সেটা যখন তোমরা আগে থেকেই জেনে গেছ, আমি আর তোমাদের সময় নষ্ট করব না।’ আবার মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল সে। সবাই তো রীতিমতো হতভম্ব।

‘এর পরের বার যখন সে আসবে, আমরা বলব, আমাদের কেউ কেউ জানি আর কেউ কেউ জানি না।’

তাই সই, আরেকদিন মিম্বারে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন করল হোজ্জা।

বামদিকে যারা ছিল তারা বলল, ‘আমরা জানি।’

আর যারা ডানপাশে ছিল তারা বলল, ‘আমরা জানি না।’

‘বেশ তো,’ বলল নাসিরুদ্দিন, ‘আমি কি বলতে চাই যারা জানো, তারা বাকি অর্ধেককে বলে দাও!’ তার পর মসজিদ থেকে বিদায় হয়ে গেল সে।

অবিশ্বাস্য হিসাব
এক রমজানে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা ভাবল, ‘আমি কেন অন্য সবার মতো রোজা রাখব? একটা গামলা জোগাড় করে রোজ সেটায় একটা করে পাথর রাখব। তিরিশটা পাথর জমলে ভোজের ব্যবস্থা করব!’

কিন্তু কয়েক দিন পেরুনোর পর মেয়ে তার মতলব টের পেয়ে একমুঠি পাথর রেখে দিল ওই গামলায়! কয়েক দিন পর কয়েকজন লোক জানতে চাইল, ‘হোজ্জা, আজ রমজান মাসের কত তারিখ?’

‘একটু অপেক্ষা করো, বলছি,’ বলে ঘরে ঢুকে গামলা খালি করে পাথরগুলো গুনতে শুরু করল। একশ বিশটা পাথর দেখে আপনমনে ভাবল, ‘সত্যি কথা বললে নির্ঘাত আমাকে পাগল ঠাওরাবে ওরা।’ ওদের কাছে ফিরে এসে বলল, ‘আজ রমজানের চুয়াল্লিশ তারিখ।’

‘হায় হোজ্জা, কী বলছ তুমি? রমজান মাসে তো মাত্র তিরিশ দিন!’

‘তাই, কিন্তু আমি তো কমিয়েই বলেছি! গামলার হিসাব ধরলে তো আজ রমজানের একশ বিশ তারিখ হয়!’

নাসিরুদ্দিন আর জোব্বা
সকাল ৮টা। দোতলায় ছিলেন নাসিরুদ্দিন। নিচে রান্নাঘরে ছিল তার স্ত্রী।

‘তোমার নাশতা হয়ে গেছে!’ বলে হাঁক ছাড়ল তার স্ত্রী। মিনিট দুই পর হলঘর থেকে জোরালো আওয়াজ শোনা গেল।

ধুপধাপ!

‘হায় খোদা! কিসের আওয়াজ?’ জানতে চাইল সে।

থালা ফেলে হলঘরের দিকে ছুটল। সিঁড়ির একেবারের পায়ের কাছে চিত্পটান হয়ে আছে নাসিরুদ্দিন।

‘অত জোরে কিসের শব্দ হলো?’ জানতে চাইল তার স্ত্রী। ‘তুমি ঠিক আছো তো, নাসিরুদ্দিন?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি, বিবি,’ জবাব দিল নাসিরুদ্দিন। ‘আমার জোব্বাটা সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিল আরকি।’

‘কিন্তু জোব্বা তো অমন শব্দ করে না!’ বলল তার স্ত্রী। ‘জোরালো ধুপধাপ শব্দ পেলাম!’

‘ইয়ে... মানে কিনা,’ বলল নাসিরুদ্দিন, ‘তখন জোব্বাটার ভেতর আমি ছিলাম।’

নাসিরুদ্দিন আর মাংস
কসাইয়ের দোকান থেকে তিন কিলো মাংস কিনে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর হাতে তুলে দিল নাসিরুদ্দিন। তার পর কাজে চলে গেল সে।

তার স্ত্রী নিমেষে বাইরে গিয়ে বান্ধবীদের ডেকে নিয়ে এল। ‘আজ আমার সঙ্গে দুপুরের খাবার খাবে এসো!’ বলল সে। সেদিন বিকালে নাসিরুদ্দিন বাড়ি ফিরে এলে টেবিলে এক টুকরো রুটি আর পেঁয়াজ তুলে দিল তার স্ত্রী।

‘কিন্তু সকালে তোমার হাতে যে মাংস দিলাম, তার কী হলো?’ জানতে চাইল নাসিরুদ্দিন।

‘বিড়াল খেয়ে নিয়েছে,’ জানাল তার স্ত্রী।

চট করে বাইরে গিয়ে একটা পাল্লা নিয়ে এল নাসিরুদ্দিন। বিড়ালটাকে তুলে পাল্লায় বসিয়ে দিল। কাঁটায় কাঁটায় তিন কিলো ওজন দেখাল ওটা।

‘বড় তাজ্জবের ব্যাপার,’ বলল সে। ‘বিড়ালের ওজন তিন কিলো হলে মাংস গেল কোথায়। আর এটা যদি মাংস হয় তো বিড়াল গেল কোথায়?’ 

নাসিরুদ্দিন আর ভিখিরি
একদিন শোবার ঘরের মেঝেতে পানি জমে রয়েছে দেখল নাসিরুদ্দিন। চোখ তুলে মাথার ওপর তাকিয়ে বলে উঠল, ‘হায় আল্লাহ, ছাদে ফুটো দেখতে পাচ্ছি। মেরামত করতে হয়।’

মই বেয়ে উপরে উঠে কাজে লেগে গেল সে।

এক গরিব ভিক্ষুক হাজির হলো।

‘নাসিরুদ্দিন!’ হাঁক ছাড়ল সে।

‘কী চাও?’ জানতে চাইল নাসিরুদ্দিন।

‘নিচে নেমে এসো, তারপর বলছি!’

খুশি হতে পারল না নাসিরুদ্দিন, তবু নিচে নেমে এল সে। ভিখেরির কথা শুনল।

‘এবার বলো,’ জানতে চাইল নাসিরুদ্দিন। ‘কী দরকার?’

‘আমি গরিব মানুষ। আমাকে কিছু টাকা দিতে পারো?’

‘আমার সাথে এসো!’ বলল নাসিরুদ্দিন।

মই বেয়ে আবার উঠতে শুরু করল সে। ওকে অনুসরণ করল ভিখিরি। দুজনই ছাদে ওঠার পর নাসিরুদ্দিন ভিখিরির দিকে ফিরে বলল, ‘হবে না!’ 

নাসিরুদ্দিন আর পণ্ডিত
একটা জটিল সমস্যা নিয়ে আলাপ করবে বলে নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে সময় ঠিক করল এক পণ্ডিত।

‘আগামীকাল দুপুর ১২টায় তোমার বাড়িতে আসছি আমি,’ বলল সে।

পরদিন নাসিরুদ্দিনের বাড়িতে এসে কড়া নাড়ল সে। কেউ সাড়া দিল না। ফের কড়া নাড়ল সে। তবুও কোনো সাড়া মিলল না। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে কাউকে দেখতে পেল না সে।

দারুণ ক্ষেপে গেল পণ্ডিত। এক টুকরো চক নিয়ে দরজার গায়ে বড় বড় হরফে গাধা লিখে রাখল সে।

পরে বাড়ি ফিরে লেখাটা দেখল নাসিরুদ্দিন। সঙ্গে সঙ্গে পণ্ডিতের বাড়ির দিকে ছুট দিল সে।

‘আমি খুবই দুঃখিত,’ বলল সে। ‘তোমার আসার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। দরজায় তোমার নাম লেখা দেখেই না মনে পড়ল!’ 

নাসিরুদ্দিন আর হারানো চাবি
একদিন সন্ধ্যায় নাসিরুদ্দিনের পড়শি ঘরে ফেরার সময় দেখে বাঁধাকপির ক্ষেতে হামাগুড়ি দিচ্ছে নাসিরুদ্দিন।

‘করছ কী, নাসিরুদ্দিন?’ জানতে চাইল সে।

‘চাবি খুঁজছি,’ উত্তর দিল নাসিরুদ্দিন।

‘আমি সাহায্য করছি তোমাকে,’ বলে চাবির খোঁজে লেগে গেল সেও। সে রাতে পূর্ণিমা ছিল। তো ভালোভাবেই সব দেখা যাচ্ছিল। বাঁধাকপি আর পেঁয়াজের ক্ষেতে খোঁজ চালাল ওরা। গাজরের ক্ষেতেও খুঁজল, কিন্তু চাবির দেখা মিলল না।

‘ঠিক কোথায় হারিয়েছিলে চাবিটা?’ জানতে চাইল লোকটা।

‘আমার ঘরে,’ জবাব দিল নাসিরুদ্দিন।

‘তাহলে ক্ষেতে খুঁজছ কী কারণে?’

‘কারণ বাড়ির ভেতরের চেয়ে এখানে আলো অনেক বেশি,’ উত্তর দিল নাসিরুদ্দিন। 

নাসিরুদ্দিন আর ভালুক শিকার
একদিন সুলতান নাসিরুদ্দিনকে তার সঙ্গে ভালুক শিকারে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন।

ভালুককে ভীষণ ভয় পেত নাসিরুদ্দিন। কিন্তু সুলতানকে ‘না’ বলার জোর ছিল না তার।

‘শুকরিয়া,’ বিনয়ের সাথে জবাব দিল সে। ‘কাল ঠিক ভোরেই প্রাসাদে হাজির হয়ে যাব।’

তারপর পাঁচদিন আর ধারেকাছে থাকল না নাসিরুদ্দিন। তারপর গ্রামে ফিরে এলে পড়শি জানতে চাইল, ‘তো কেমন হলো ভালুক শিকার?’

‘দুর্দান্ত!’ জবাব দিল নাসিরুদ্দিন।

‘কতগুলো ভালুক দেখেছ?’ জানতে চাইল পড়শি।

‘একটাও না!’ উত্তর নাসিরুদ্দিনের।

‘তাহলে ভালুক শিকার দুর্দান্ত বললে কেন?’

মুচকি হেসে নাসিরুদ্দিন বলল, ‘কারণ সুলতান যখন তোমাকে ভালুক শিকারের দাওয়াত করে আর ভালুককে তুমি ভয় পাও, তখন ভালুকের দেখা না পাওয়াটা দুর্দান্ত ব্যাপার না!’ 

নাসিরুদ্দিন আর কাক
একদিন নাসিরুদ্দিন এক টুকরো সাবান কিনে এনে স্ত্রীকে দিল।

‘এই যে সাবান, বিবি। আমার শার্টটা ধুয়ে দেবে?’

বাগানে গিয়ে শার্টটা ধুতে শুরু করল তার স্ত্রী। হঠাত্ বিরাট একটা কাক উড়ে এসে সাবানটা মুখে নিয়ে সটকে পড়ল। নাসিরুদ্দিনের স্ত্রী মুখ তুলে তাকিয়ে একটা গাছের ডালে বসে থাকতে দেখল ওটাকে। রাগে চিত্কার করে উঠল সে। তার কণ্ঠস্বর শুনে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল নাসিরুদ্দিন।

‘তুমি ঠিক আছো তো, বিবি?’ জানতে চাইল সে।

‘ওই কাকটা সাবান নিয়ে গেছে!’ বলল তার স্ত্রী।

কাকটার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুচকি হাসল নাসিরুদ্দিন। ‘আমার শার্টের রঙটা একবার দেখো, তারপর ওই পাাখির রঙের দিকে খেয়াল করো!’ স্ত্রীকে বলল সে। ‘নির্ঘাত আমার চেয়ে সাবানটা ওরই বেশি দরকার!’ 

নাসিরুদ্দিন আর জাদুঘরের গাইড
একদিন কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে জাদুঘরে গেল নাসিরুদ্দিন। জাদুঘরের গাইড একটা পাত্র দেখিয়ে বলল, ‘এই পাত্রটা পাঁচ হাজার বছর আগের।’

‘মাফ করবে,’ বলে উঠল নাসিরুদ্দিন, ‘আমার মনে হয় এটা পাঁচ হাজার চার বছর আগের।’

পর্যটকরা বিস্মিত হলেও খানিক ক্ষিপ্ত হলো গাইড। সে তাদের আরেকটা কামরায় নিয়ে কিছু স্বর্ণমুদ্রা দেখাল।

‘এই মুদ্রাগুলো তিন হাজার বছর আগের,’ জানাল সে।

‘তিন হাজার চার বছর আগের,’ বলল নাসিরুদ্দিন।

এবার দারুণ ক্ষেপে উঠল গাইড। ‘তুমি ঠিক সময়টা জানলে কীভাবে?’ জানতে চাইল সে।

মৃদু হেসে নাসিরুদ্দিন জবাব দিল, ‘খুবই সোজা। আমি চার বছর আগে যখন এখানে এসেছিলাম তখন তুমি বলেছিলে মুদ্রাগুলো তিন হাজার বছর আগের!’

নাসিরুদ্দিন ও কাঠুরে
একদিন নাসিরুদ্দিন বনে কাজ করে এমন বন্ধুকে গিয়ে বলল, ‘আমি কাঠুরে হতে চাই।’

‘কিন্তু কাঠুরেদের তো তরুণ আর শক্তিশালী হতে হয়,’ বলল তার বন্ধু।

‘একবার পরখ করেই দেখো না!’ বলল নাসিরুদ্দিন।

‘বেশ,’ বলল বন্ধুটি। ‘ওই মাঠে পাঁচশ গাছ আছে। ওগুলো কেটে ফেলো।’

তিনদিন পর ফিরে এল নাসিরুদ্দিন।

‘কয়টা গাছ কাটলে?’ জানতে চাইল তার বন্ধু।

‘সব,’ জানাল নাসিরুদ্দিন।

সত্যিই তাই। একটা গাছও অবশিষ্ট ছিল না ওই মাঠে। অবাক মানল ওর বন্ধুটি।

এত দ্রুত গাছ কাটা শিখলে কোথায়?’ জানতে চাইল সে।

‘সাহারা মরুভূমিতে,’ বলল নাসিরুদ্দিন।

‘কিন্তু সাহারা মরুভূমিতে কোনো গাছই নেই,’ বলল ওর বন্ধু।

‘এখন কোনো গাছ নেই!’ জবাব দিল নাসিরুদ্দিন। 

নাসিরুদ্দিন আর পাথর
নাসিরুদ্দিনের বন্ধুর অভাব ছিল না। ওদের কেউ কেউ প্রবীণ আবার অনেকে তরুণ। একদিন তাদের সে বলল, ‘বয়স্করা অল্পবয়সীদের তুলনায় বেশি বুদ্ধি রাখে।’

‘ঠিক কথা,’ জবাব দিল ওর বয়স্ক বন্ধুরা। ‘কিন্তু তরুণরা বুড়োদের চেয়ে শক্তিশালী,’ বলল তরুণ বন্ধুদের একজন।

‘আমি মানি না,’ বলল নাসিরুদ্দিন। ‘আমি এখনো তরুণ বয়সের মতোই শক্তিমান আছি।’

‘সেটা কীভাবে হয়?’ বন্ধুরা জানতে চাইল। ‘দয়া করে বুঝিয়ে বলো, নাসিরুদ্দিন!’

‘বেশ,’ বলল সে, ‘ওই বিরাট পাথরটা দেখতে পাচ্ছো?’

পাথরটার দিকে তাকাল সবাই।

‘আমার বয়স যখন কম ছিল, চেষ্টা করেও ওটা নাড়াতে পারিনি,’ খোলাসা করল নাসিরুদ্দিন। ‘এখন আমার বয়স হয়েছে কিন্তু এখনো ওটাকে নাড়াতে পারি না!