নাসিরুদ্দিন হোজ্জা কিংবা মোল্লা নাসিরুদ্দিনের নামে যে কৌতুকগুলো প্রচলিত আছে, তিনি সবগুলোর স্রষ্টা নন কিংবা তাঁকে ঘিরে সবগুলো সৃষ্টি হয়নি। অনেকটা সর্দারজি কৌতুকের মতো। যিনিই তৈরি করুন না কেন, শেষ পর্যন্ত সৃষ্টির ভার গিয়ে পড়ে একজন সর্দারজির ওপর।

প্রতি বছর ৫ থেকে ১০ জুলাই তুরস্কে হোজ্জা উত্সব হয় এবং তাঁর মৃত্যুর সাড়ে সাতশ বছর পরও তাঁর নামে যোগ হয় নতুন কৌতুক।

এ লেখাটিতে হোজ্জাকে তাঁর সনাতন পরিচিতি থেকে বের করে আনা হয়েছে, তাঁর বয়স বাড়ানো-কমানো হয়েছে, তাঁর পেশা বদলে দেয়া হয়েছে, তাঁকে কেবল জ্ঞানী দার্শনিক কিংবা আস্ত আহাম্মকের পরিচিতি থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

ফিউশন ও রিমিক্সের এ নাসিরুদ্দিন হোজ্জা একালের। এখানে কৌতুকের অদলবদল ও মিশ্রণ ঘটেছে। কেন্দ্রবিন্দুতে হোজ্জাকে রেখে নতুন কৌতুকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এগুলোর কপিরাইট কেউ দাবি করবেন না।

সনাতন হোজ্জা
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পড়াশোনা আর ভাল্লাগছে না। ঠিক করলেন চাকরি করবেন। ম্যানেজার পদে। প্রথম ইন্টারভিউতেই বোর্ড তাঁর জবাবে মুগ্ধ। তাঁকে অনুরোধ করা হলো, কালই জয়েন করুন।

হোজ্জা বেতনের ব্যাপারটা নিশ্চিত হতে চাইছিলেন।

ইন্টারভিউ বোর্ডের চেয়ারম্যান বললেন, প্রথম ছয় মাস কুড়ি হাজার। এ সময় কোনো ভাতা নেই। ছয় মাস পেরোলেই বেতন ৩০ হাজার, বেতনের অর্ধেক বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিত্সা ভাতা, উত্সব ভাতা। কেমন মনে হচ্ছে?

হোজ্জা বললেন, বেশ।

তাহলে কালই জয়েন করুন।

হোজ্জা বললেন, কাজ শুরু করলে ছুটি পাওয়া মুশকিল হবে। আমাকে শুরুতেই ছয় মাসের ছুটি মঞ্জুর করুন। ছয় মাস পরেই বরং ৩০ হাজার টাকা বেতনে জয়েন করি, কী বলেন?

এ কালের হোজ্জা
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা শেষ পর্যন্ত চাকরি নিলেন ঢাকা শহরের সবচেয়ে চালু একটি পিৎজার দোকানের ডেলিভারি বয় হিসেবে।

অল্পদিনের মধ্যেই সে এলাকার ধর্মগুরু দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। দু-একদিন পর পরই প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য টিনের বাক্সে ৫০০ টাকা ফেলে কনফেশন করছেন। ডেলিভারি বয়টা যখন পিৎজা নিয়ে এল, আমি বাড়িতে একাই ছিলাম। তারপর কী থেকে কী যে হয়ে গেল, আমি তার কথায় একেবারে অভিভূত হয়ে তার সঙ্গে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তারপর ওই অবৈধ পাপ কাজটা করে ফেললাম। এ কথা বলেই তিনি কাঁদতে শুরু করলেন।

ধর্মগুরু বললেন, কেঁদো না। তুমি যেহেতু তোমার অপরাধ বুঝতে পেরে কনফেশন করেছ এবং প্রায়শ্চিত্তের ফি দিয়েছ, তুমি ক্ষমা পেয়ে যাবে।

যিনিই আসেন ওই পিৎজা ডেলিভারি বয়টার সঙ্গে শুয়ে পড়ার কথা বলেন, অনুশোচনায় কাঁদতে থাকেন, ধর্মগুরু প্রবোধ দিয়ে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

সবার কনফেশন থেকে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, অপকর্মটি ওই পিৎজা ডেলিভারি বয় নাসিরুদ্দিন হোজ্জারই কাজ।

একদিন ধর্মগুরু দেখেন ডেলিভারি বয় নিজেই তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বসে আছেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হোজ্জা তোমার আবার কিসের কনফেশন?

যা শুনেছেন সব সত্য।

তুমি তাহলে পাপকার্য থেকে বিরত থাকো।

হোজ্জা বললেন, তাহলে প্রায়শ্চিত্তের টাকা পাবেন কোথায়?

এখন থেকে প্রায়শ্চিত্তের যে টাকা জমা হবে, তার অর্ধেক আমাকে দিতে হবে।

তার মানে?

হোজ্জা বললেন, মানেটানে নেই। যদি দেন ভালো, না দিলে আমি চট্টগ্রাম চলে যাব। সেখানে ফিফটি পার্সেন্ট পাওয়ার গ্যারান্টি আছে।

হোজ্জা দ্য পেইন্টার
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা শেষ পর্যন্ত পেইন্টার হলেন। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে কিছু বিক্রি হলো?

হোজ্জা বললেন, কেন হবে না? বাড়িঘর, জমাজমি সব। গতকাল বিক্রি হলো আমার উট আর গাধাটা। বিক্রি করার মতো আর কিছু নেই।

হোজ্জা দ্য কনসালট্যান্ট

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাণ্ডিত্য সর্বজনবিদিত। তিনি যেকোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারেন। তিনি একজন খ্যাতনামা কনসালট্যান্ট।

খুব বয়স্ক একজন লোকের স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ায় সন্দেহপ্রবণ কিছু লোক হোজ্জার কাছে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, শতবছর বয়সী বৃদ্ধের পক্ষে কি কোনো নারীকে গর্ভবতী করা সম্ভব?

হোজ্জা বললেন, শতবছর বয়সী বৃদ্ধার পক্ষে গর্ভবতী হওয়া সম্ভব নয়।

দেখুন, আমরা বৃদ্ধ সম্পর্কে প্রশ্ন করেছি, বৃদ্ধা সম্পর্কে নয়।

হোজ্জা বললেন, অবশ্যই সম্ভব যদি বৃদ্ধের কোনো যুবক প্রাইভেট সেক্রেটারি থাকে।

হোজ্জা দ্য ওয়েটার
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা পুরান ঢাকার একটি রেস্তোরাঁর ওয়েটার।

খদ্দের দেখলেন, তার ডালে ভাসছে একটি মাছি।

তিনি ডাকলেন, ওয়েটার ওয়েটার, ডালে মরা মাছি ক্যান?

ওয়েটার হোজ্জা সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললেন, জিন্দাই তো ছিল। হমন্দির পো সাঁতার জানে না।

হোজ্জা দ্য ওসি
নাসিরউদ্দিন হোজ্জা লালবাগ থানার ওসি। আব্বাস সাহেব লালবাগের একজন সম্ভ্রান্ত মানুষ।

আব্বাস সাহেবের মোটাসোটা স্ত্রী বাগানে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। কেউ একজন একটা মরা বিড়াল ছুড়ে মারায় তা মিসেস আব্বাসের গায়ে লাগে।

জনাব এবং বেগম আব্বাস থানায় এলেন মামলা করতে। ওসি বললেন, একদম চিন্তা করবেন না। তিন মাস পর আবার আসবেন। এর মধ্যে বিড়ালের প্রকৃত মালিক যদি প্রমাণ দিয়ে এটা নিতে না পারেন, তাহলে এটা আপনাদের হয়ে যাবে। নিয়ে যাবেন।

হোজ্জা যখন ছাত্র
১. হোজ্জা ক্লাসটিচারকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার যে কাজ কেউ করেনি, সেজন্য কি তার শাস্তি পাওয়া উচিত? টিচার বললেন, অবশ্যই না।

হোজ্জা বললেন, আলহামদুলিল্লাহ্, তাই তো হওয়া উচিত। আমিও বাড়ির কাজ করিনি।

২. গণিত টিচার বললেন, হোজ্জা, তোমাকে যদি আজ তিনটা আর কাল তিনটা টেনিস বল দিই, তাহলে মোট ক’টা হবে?

হোজ্জা বললেন, নয়টা।

শিক্ষক চটে গিয়ে তাঁকে শাস্তি দিতে চাইলেন।

হোজ্জা বললেন, আমার বাসার তিনটা বল আমি কাউকে দিয়ে দেব— এটা আপনি কেন মনে করলেন?

৩. স্কুল লাইব্রেরি থেকে নেয়া হাউ টু বি অ্যা মিলিয়নেয়ার ফেরত দেয়ার সময় লাইব্রেরিয়ান দেখলেন অর্ধেক পাতাই নেই, তিনি হোজ্জার ওপর চটে গেলেন। হোজ্জা বললেন, আপনার মতো একজন টিচারের জন্য কি পয়েন্ট ফাইভ মিলিয়ন যথেষ্ট নয়?

পর্বতারোহণ প্রশিক্ষক
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা অনেক দিন ধরে হিমালয়ে এভারেস্ট আরোহণের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। একজন নার্ভাস পর্বতারোহী ভয়ে ভয়ে এগোচ্ছে। গিরিশৃঙ্গ অনেক উপরে। নিচে গভীর খাদ। নিচে চোখ পড়ার পর পর্বতারোহী ভয়ে আঁতকে ওঠে।

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে: ওস্তাদ পর্বতারোহীরা কি প্রায়ই ওপর থেকে খাদে পড়ে যায়?

হোজ্জা গম্ভীর স্বরে বললেন, না। পর্বতারোহী একটু আশান্বিত হলেন।

হোজ্জা আরো গম্ভীর স্বরে বললেন, একবার পড়াই যথেষ্ট।

সিনিয়র সাইকিয়াট্রিস্ট
নাসিরউদ্দিন হোজ্জা সিনিয়র সাইক্রিয়াট্রিস্ট। তাঁর সঙ্গে পেশাগত বিষয়ে আলাপ করতে এসেছেন একজন জুনিয়র সাইকিয়াট্রিস্ট। জুনিয়র তাঁর কাছে এসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে জটিল কেসটির হিস্ট্রি শুনতে চাইলেন। হোজ্জা বললেন, এ পর্যন্ত যত রোগী পেয়েছি, সবচেয়ে জটিল কেসটিতে রোগী এক কল্পলোকে বাস করত। তার বিশ্বাস, উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত কোনো এক ধনকুবের তাকে অঢেল সম্পত্তি উইল করে দিয়েছেন। সম্পত্তির মূল্য ৪০ মিলিয়ন ডলার। সেই উইলটি ডাকযোগে যেকোনো দিন তার কাছে পৌঁছবে।

পাছে ডাকপিয়ন এসে ফিরে যায়, এ আশঙ্কায় সে বাড়ি থেকে বের হয় না। এই রোগীকে সারিয়ে তুলতে তাঁর সাড়ে নয় বছর লেগেছে। শেষদিকে রোগীর নিবিড় পরিচর্যার জন্য তারই অনুরোধে রোগীর বাড়ির একটি কক্ষে থাকতে শুরু করেন।

সুস্থ হওয়ার ছয় মাস পর হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে এই রোগী ধনকুবেরের ৪০ মিলিয়ন ডলারের চার ভাগের এক ভাগ তার চিকিত্সক সিনিয়র সাইকিয়াট্রিস্ট নাসিরউদ্দিন হোজ্জাকে উইল করে লিখে দেন।

হোজ্জা জুনিয়র সাইকিয়াটিস্ট্রকে বললেন, সেই থেকে আমিও আমেরিকান উইলের জন্য ডাকপিয়নের অপেক্ষায় আছি প্রায় ১০ বছর। আমারও তো ১০ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি পাওয়ার কথা।

বার্ধক্যে হোজ্জা
নাসিরউদ্দিন হোজ্জা তখন বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন। এক তরুণ ভক্ত জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগছে ওস্তাদজি? হোজ্জা বললেন, আগে সারা রাত ধরে যা করতাম, এখন সারা রাত চেষ্টা করেও তা পারি না।

জামদানি ফ্যাশন শোতে হোজ্জা

ঢাকায় জামদানি ফ্যাশন শোতে নাসিরুদ্দিন হোজ্জাকে প্রধান অতিথি করে আনা হয়। জামদানি শাড়ি পরা সুন্দরীদের দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। প্রধান অতিথির ভাষণের আগে তাঁকে ঢাকার বিখ্যাত জামদানি শাড়ি উপহার দেয়া হলো।

প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি আয়োজকদের ঠক ও প্রতারক বলে গাল দিলেন এবং বললেন, ওরা আমাকে সামনে বসিয়ে রেখে দেখাল ক’জন সুন্দরী অথচ উপহার দিল শাড়ি। সেই যে ফিরে গেলেন, বাংলাদেশের কোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে আর আনা যায়নি।

বিপত্নীক হোজ্জা
হোজ্জার স্ত্রী বিয়োগ হলো।

দাফনের পর দেখা গেল এক যুবক হোজ্জার স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

হোজ্জা জিজ্ঞেস করলেন, মারা গেল আমার স্ত্রী, কিন্তু তুমি এখানে এসে কাঁদছ কেন?

যুবক বলল, আরে আহাম্মক স্বামী, প্রেমিকের ক্ষতি তুমি কেমন করে বুঝবা। আমি ছিলাম তোমার স্ত্রীর গোপন প্রেমিক।

হোজ্জা বললেন, তুমি শান্ত হও বোকারাম। আমি শিগগিরই বিয়ে করতে যাচ্ছি। তোমার ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।

হোজ্জার গার্লফ্রেন্ড
হোজ্জার গার্লফ্রেন্ড তাঁকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি করে বলো, আমিই তো তোমার জীবনের প্রথম নারী, তাই না?

হোজ্জা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ঘরে ফিরে তাকে ভালো করে দেখে বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। সেজন্যই তো তোমাকে কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল।

হোজ্জা যখন বাবা
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বড় ছেলে এসে বলল, বাবা আমার গার্লফ্রেন্ড খুব সুন্দর।

হোজ্জা বললেন, কার ছেলের গার্লফ্রেন্ড দেখতে হবে না?

ছেলে বলল, বাবা ও প্রেগন্যান্ট।

হোজ্জা বললেন, তা তো হবেই। এখন কত চাস?

ছেলে বলল, এক হাজার ইউরো।

দ্বিতীয় ছেলে এসেও বাবাকে একই কাহিনী শোনাল। বলল, তার গার্লফ্রেন্ডও প্রেগন্যান্ট।

হোজ্জা বললেন, কত চাই?

ছেলে বলল, এক হাজার ইউরো।

এর পর বড় মেয়ে এসে বলল, বাবা আমার বয়ফ্রেন্ডের কারণে আমি প্রেগন্যান্ট।

হোজ্জা হাত তুলে মোনাজাত করে বলল, উপরওয়ালা আমার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। ছেলেদের কারণে যে ক্ষতিটা হলো, আমার মেয়েটা নিশ্চয়ই তা পুষিয়ে দেবে।