অ্যারিস্টটলের এক
ছাত্র বিয়ে
করতে অস্বীকৃতি
জানিয়েছিলেন। কেউ
কল্পনাও করতে
পারেনি, সে
ছাত্রই ইরানের
প্রান্তদেশীয় অঞ্চলের
এক মেয়ের
প্রেমে পড়বেন
এবং তাকে
বিয়ে করে
বসবেন। অ্যারিস্টোটলের
সে ছাত্রর
নাম আলেকজান্ডার।
তিনি বিয়ে
করেছিলেন পারসিক
কন্যা রোক্সানাকে।
এ বিয়ে
ছিল পারস্যের
প্রতি তার
সুসম্পর্ক স্থাপনের
আগ্রহের প্রমাণ।
রোক্সানা ছিলেন
পারস্যের সগদীয়
জমিদার অক্সিয়ারটেজের
কন্যা। রোক্সানাকে
স্বচক্ষে দেখেছেন
এমন যতজনের
দেয়া বিবরণী
টিকে আছে,
তা থেকে
দেখা যায়
সবাই একটি
বিষয়ে একমত—রোক্সানার
মতো সুন্দরী
সেকালে এশিয়ায়
আর একজনও
ছিল না।
রোক্সানার পারসিক
নামের অর্থ
‘লিটল
স্টার’।
রোক্সানাকে যিনি
দেখেছেন, তিনিই
একমত হয়েছেন
রোক্সানার এ
নাম সার্থক।
আজকের
দিনের কাজাখস্তানের
কাছে ছিল
সগদীয় শিলা
নামে পরিচিত
আরিয়ামাজেস দুর্গ।
দুর্ভেদ্য বিধায়
আলেকজান্ডারের হাত
থেকে বাঁচতে
অনেক অভিজাত
তাদের স্ত্রী-সন্তানদের
নিয়ে আশ্রয়
নিয়েছিলেন এ
দুর্গে। এদের
মধ্যে ছিলেন
অক্সিয়ারটেজ ও
তার কন্যা
রোক্সানা। এ
দুর্গ দখল
করেই আলেকজান্ডার
পেয়েছিলেন রোক্সানার
দেখা।
রোক্সানাকে
আলেকজান্ডার প্রথম
দেখেছিলেন কোনো
এক ভোজের
অনুষ্ঠানে। প্রথম
দেখাতেই প্রেমে
পড়েছিলেন। অবশ্য
এই প্রথম
সাক্ষাতের স্থান
নিয়ে মতভেদ
আছে। তবে
এ বিষয়ে
সবাই একমত
যে প্রথম
দেখাতেই রোক্সানাকে
পছন্দ করেছিলেন
আলেকজান্ডার। আধুনিককালে
ইতিহাসবিদ, লেখকদের
মধ্যে প্রচলিত
একটি জনপ্রিয়
ধারণা এমন
যে রাজনৈতিক
কারণেই আলেকজান্ডার
রোক্সানাকে বিয়ে
করেছিলেন, প্রেম
এখানে মুখ্য
নয়। আলেকজান্ডারের
জীবনীকার ইতিহাসবিদ
রবিন লেন
ফক্স এ
ধারণাকে কিছুটা
খোঁচা দিয়েছেন।
তিনি তার
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট
গ্রন্থে
লিখেছেন, ‘এখনকার
দিনে এটা
একটা ফ্যাশন
হয়ে দাঁড়িয়েছে
যে এ
সম্পর্কে (আলেকজান্ডার-রোক্সানা)
আবেগকে উড়িয়ে
দিয়ে কেবল
রাজনীতিতে জোর
দেয়া, কিন্তু
সমকালীন মানুষেরা
বিষয়টিকে এভাবে
দেখতেন না।
বিয়ের অবশ্যই
রাজনৈতিক দিক
আছে, কিন্তু
সে সময়
আরো অনেক
ইরানি নারী
ছিলেন, যাদের
বিয়ে করলে
আলেকজান্ডারের উদ্দেশ্য
সফল হতে
পারত। আলেকজান্ডার
তার হূদয়ের
চেয়ে কূটনীতিকে
প্রাধান্য দিতে
পারতেন। কিন্তু
তিনি তা
না করে
হূদয়ের কথাই
শুনেছিলেন এবং
যে নারী
তার হূদয়ে
আগুন জ্বালিয়েছিলেন
তাকেই বেছে
নেন।’ এক্ষেত্রে
কাছাকাছি সময়ের
গ্রিক ইতিহাসবিদ
আরিয়ানের বিবরণীও
এ কথা
সমর্থন করে।
আরিয়ান লিখেছেন,
প্রেমে পড়ার
কারণেই আলেকজান্ডার
রোক্সানাকে যুদ্ধবন্দি
হিসেবে বিবেচনা
না করে
বিয়ে করে
স্ত্রীর মর্যাদা
দিয়েছিলেন।
আলেকজান্ডার
ও রোক্সানার
বিয়ে হয়েছিল
মহাধুমধামে। হবেই
বা না
কেন, বিশ্বজয়ী
সেনানায়কের বিয়ে
বলে কথা!
আকাশছোঁয়া সিসিমিথ্রেসের
দুর্গে তাদের
বিয়ের অনুষ্ঠান
ও ভোজ
হয়েছিল। বিয়েতে
আলেকজান্ডার তার
নিজের শৈলী
ও শৌর্যের
প্রতীকী নিদর্শন
রাখতে ভোলেননি।
নবদম্পতি অতিথিদের
সামনে এক
টুকরো রুটি
একটি তলোয়ার
দিয়ে দুই
টুকরো করেন
এবং উভয়
একেক টুকরো
খেয়ে নেন।
রুটির এ
ভাগাভাগি পারসিক
সংস্কৃতির অংশ।
এ রীতি
এখনো তুর্কমেনিস্তানে
প্রচলিত আছে।
তবে রুটি
তলোয়ার দিয়ে
কাটা ছিল
আলেকজান্ডারের নিজস্ব
পছন্দ। দৃশ্যটি
সবচেয়ে ভালোভাবে
এঁকেছিলেন সেকালের
অভিজ্ঞ গ্রিক
চিত্রশিল্পী এতিয়োন।
তবে আমাদের
দুর্ভাগ্য যে
মূল চিত্রকর্মটি
কালে গর্ভে
হারিয়ে গেছে।
গ্রিক
অলিম্পিয়ার একটি
উৎসবে ‘রোক্সানার
সঙ্গে আলেকজান্ডারের
বিয়ে’ শিরোনামের
চিত্রকর্মটি পুরস্কার
জিতেছিল। আর
চিত্রকর্মে কী
ছিল সে
বিবরণ আমরা
পাই একজন
রোমান দর্শনার্থীর
কাছ থেকে।
চিত্রকর্মটি একসময়
ইতালিতে পৌঁছেছিল
আর সেখানেই
এটি দেখেছিলেন
রোমান লুসিয়ান।
এ লুসিয়ানের
বিবরণী থেকেই
আমরা ছবিটির
বিষয়বস্তুর সম্পর্কে
ধারণা পাই।
আর তার
বিবরণ প্রভাব
বিস্তার করেছিল
সোদোমা ও
বতিচেল্লির ওপর।
ইতালির রেনেসাঁ
যুগের চিত্রকর
সোদোমা লুসিয়ানের
বিবরণী থেকে
আলেকজান্ডার ও
রোক্সানার বিয়ের
ছবিটির ফ্রেসকো
করেছিলেন।
আলেকজান্ডার
ও রোক্সানার
বিয়ে হয়েছিল
৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
এরপর পারস্যের
আরো দুই
নারীকে আলেকজান্ডার
স্ত্রী হিসেবে
গ্রহণ করেছিলেন—তৃতীয়
দারিয়ুসের কনিষ্ঠ
কন্যা স্টাটেরিয়া
ও তৃতীয়
আর্টাজেরজের কন্যা
প্যারিসাটিস। রোক্সানার
তুলনায় আভিজাত্যে
এরা দুজনই
উঁচু বংশীয়
ছিলেন। এদের
দুজনের সংযুক্তিতে
আলেকজান্ডারের দরবারে
রোক্সানার অবস্থান
কিছুটা নিষ্প্রভ
হয়ে গিয়েছিল।
অন্যদিকে আলেকজান্ডারের
জীবদ্দশায় কোনো
সন্তানের জন্ম
না হওয়ার
কারণেও রোক্সানার
অবস্থান নড়বড়ে
হয়ে গিয়েছিল।
(তবে
এখানে উল্লেখ
করা যায়,
উলরিখ উইলকেন
তার আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট
বইতে লিখেছেন, বিয়ের পর
৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের গ্রীষ্মে আলেকজান্ডার ব্যাকট্রিয়া থেকে
যাত্রা শুরু
করেন এবং
তখন তার
সঙ্গে ছিলেন
স্ত্রী রোক্সানা। এ যাত্রায় আলেকজান্ডারের সঙ্গে
এ তরুণী
রানী ভারতে
এসেছিলেন। পরের
বছর ভারতের
মাটিতে রোক্সানা আলেকজান্ডারের এক
পুত্রসন্তানের জন্ম
দেন, কিন্তু
সে সন্তান
বাঁচেনি। উলরিখের বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩২
সালে এবং
আলেকজান্ডারচর্চায় বইটি
উল্লেখযোগ্য)
কিন্তু আলেকজান্ডারের
মৃত্যুর পর
আকিমেনিড শাহজাদীদের
তুলনায় রোক্সানাই
আধিপত্য বিস্তার
করেন। আলেকজান্ডারের
স্ত্রীদের মধ্যে
রোক্সানাকেই ইতিহাস
করুণা করেছে,
অন্যদের তুলনায়
তিনিই সবচেয়ে
খ্যাতিমান। তার
সন্তানকেই আলেকজান্ডারের
একমাত্র বৈধ
উত্তরাধিকারী হিসেবে
স্বীকৃতি দেয়া
হয়েছিল। রোক্সানা
ও আলেকজান্ডারের
কাহিনী নিয়ে
রচিত হয়েছিল
সাহিত্য, তৈরি
হয়েছে কিংবদন্তি।
বিয়ের
পরই রোক্সানা
মঞ্চ থেকে
প্রায় হারিয়ে
যান। ইতিহাসের
মঞ্চে তিনি
আবার উজ্জ্বল
হয়ে আবির্ভূত
হন আলেকজান্ডারের
শেষ দিনগুলোতে।
অনেকে বলেন,
রোক্সানাকে বিয়ে
করার মাধ্যমে
আলেকজান্ডার অক্সিয়ারটেসের
পক্ষ থেকে
আর কোনো
বিদ্রোহের আশঙ্কা
থেকে মুক্ত
হয়ে গিয়েছিলেন,
তাই রেক্সোনার
রাজনৈতিক গুরুত্বও
কিছুটা কমে
গিয়েছিল। আর
উচ্চাভিলাষী সামরিক
নেতার জীবনে
বিয়ে, সন্তান
নিয়ে উচ্ছ্বাস-আগ্রহ
খুব বেশি
দিন থাকবে
না তা
স্বাভাবিক।
রোক্সানার
সঙ্গে আলেকজান্ডারের
বিয়ের রাজনৈতিক
গুরুত্বও ছিল।
এ বিয়ের
মধ্য দিয়ে
এমনকি পারসিক
জাতীয়তাবাদীরাও মানতে
বাধ্য হয়েছিলেন
যে আলেকজান্ডার
সমঝোতাপ্রত্যাশী। এখানে
আরো একটি
তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা
ছিল। আলেকজান্ডার
রোক্সানাকে বিয়ে
করেছিলেন পারসিক
রীতি মেনে।
এ ঘটনাও
পারসিক জাতীয়তাবাদীদের
কিছুটা সান্ত্বনা
দিয়েছিল। তবে
রোক্সানার সঙ্গে
আলেকজান্ডারের বিয়েতে
একজন পারসিক
পিতা অসন্তুষ্ট
হয়েছিলেন—তিনি
আর্টাবাজুস, আলেকজান্ডারের
রক্ষিতা বারসাইনের
পিতা। আলেকজান্ডার
যখন রোক্সানাকে
বিয়ে করেন,
তখন বারসাইনের
গর্ভে তার
এক সন্তান।
বারসাইন আলেকজান্ডারের
এক পুত্রসন্তান
প্রসব করেছিলেন,
যার নাম
হেরাক্লেস।
আগেই
উল্লেখ করা
হয়েছে যে
উলরিখ উইলকেনের
বই থেকে
পাওয়া যায়,
রোক্সানা আলেকজান্ডারের
ভারত অভিযানের
সময় তার
সঙ্গে ছিলেন।
ভারতীয় রাখি
বন্ধনের ইতিহাস
ঘাঁটলেও রোক্সানার
নাম পাওয়া
যায়। আলেকজান্ডার
ভারতের মাটিতে
স্থানীয় শাসক
পুরুকে পরাজিত
করেছিলেন। শোনা
যায়, ঝিলামের
তীরে আলেকজান্ডার
ও পুরু
সম্মুখসমরে নামার
আগে রোক্সানা
পুরুকে রাখি
পাঠিয়েছিলেন এবং
অনুরোধ করেছিলেন
তার স্বামীর
প্রাণ সংহার
না করতে।
মৃত্যুর
পর আলেকজান্ডার
স্বর্গে স্থান
পেয়েছেন—এটাই
ছিল তার
অনুসারী, নিকটজনদের
বিশ্বাস। কিন্তু
তার মৃত্যুর
পরবর্তী ১২
বছর তার
নিকটজনদের ওপর
নরক নেমে
এসেছিল। আলেকজান্ডারের
মৃত্যুর সময়
রোক্সানা গর্ভবতী
ছিলেন। শিশুটির
জন্মের তখনও
বাকি কমপক্ষে
ছয় সপ্তাহ।
ধারণা করা
হচ্ছিল, আলেকজান্ডারের
এ উত্তরসূরি
হবেন কন্যা।
আলেকজান্ডারের অবশ্য
আরেকজন উত্তরাধিকারী
ছিল। তার
পারসীয় রক্ষিতা
বারসাইনের গর্ভে
জন্ম নেয়া
পুত্রসন্তান হেরাক্লেস।
রোক্সানা যখন
আলেকজান্ডারের সন্তানকে
জন্ম দিতে
চলেছেন, তখন
এই হেরাক্লেসের
বয়স তিন
বছর। কিন্তু
এ সন্তানকে
কেউ গুরুত্ব
দেয়নি এবং
কোনো মেসিডোনিয়ান
হেরাক্লেসকে মেনে
নিতে রাজি
ছিল না।
তাদের পছন্দ
ছিল আলেকজান্ডারের
পিতা দ্বিতীয়
ফিলিপের জারজ
সন্তান আরিডেয়াস।
তাদের মতে
এ আরিডেয়াসই
আলেকজান্ডারের রাজকীয়
পরিবারের একমাত্র
জীবিত পুরুষ
সদস্য। আলেকজান্ডারের
উত্তরাধিকারী নির্ণয়
করা জরুরি
হয়ে উঠেছিল।
এ বিষয়ে
তিনি সিদ্ধান্ত
নেয়ার ক্ষমতা
দিয়ে গিয়েছিলেন
তার সভাসদ
পার্ডিক্কাসকে। এ
পার্ডিক্কাস ম্যাসিডোনীয়দের
মতামতকে পাত্তা
দেননি। তিনি
বরং দেহরক্ষী
ও অশ্বারোহী
বাহিনী মোতায়েন
করেছিলেন রোক্সানা
ও তার
ভূমিষ্ঠ হতে
যাওয়া সন্তানের
নিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে। কিন্তু
সাধারণ সেনারা
ব্রিগেডিয়ার মেলেগারের
প্ররোচনায় উৎসাহী
হয়ে আরিডেয়াসকে
ক্ষমতায় বসানোর
প্রক্রিয়াকে সমর্থন
জানায়। তারা
আরিডেয়াসকে চেনে
এবং আর
অনেক দোষ
থাকলেও সে
অন্তত প্রাচ্যের
রক্ত বহন
করছে না।
গ্রিকদের মধ্যে
আলেকজান্ডারের প্রাচ্য
নীতি নিয়ে
ক্ষোভ ছিল
আর তা
তার মৃত্যুতে
নিঃশেষ হয়ে
যায়নি। আলেকজান্ডার
বিজিত ভারতীয়দের
যে মর্যাদা
দিয়েছিলেন, তা
নিয়ে অভিযোগও
করেছিলেন মেলেগার।
আরিডেয়াসকে ডেকে পাঠানো নিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। পার্ডিক্কাস ও টলেমি তাদের বন্ধুদের নিয়ে ছুটে যান আলেকজান্ডারের শব রাখা হয়েছে যে ঘরে সেখানে। তারা দেখেন ঘরের দরজা ভাঙা, মেলেগারের পদাতিক সেনারা বর্শা দিয়ে দরজা ফুঁড়ে ফেলেছিল। পার্ডিক্কাসের পথ আটকে দেয়া হয়। তখন তিনি তার অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে ব্যাবিলনের বাইরের প্রান্তরে অবস্থান নেন। এখানে তিনি মেলেগারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার আয়োজন করেন। শহরে খাবার প্রবেশের পথ আটকে দেন এবং শেষমেশ মেলেগার তার সঙ্গে এক চুক্তি করতে বাধ্য হন। এ চুক্তির শর্ত ছিল এমন যে রোক্সানা যদি পুত্রসন্তান প্রসব করেন, তাহলে আরিডেয়াসকে রাজত্ব ভাগাভাগি করতে হবে এবং রোক্সানার শিশুসন্তানের নিরাপত্তার ভার যৌথভাবে পার্ডিক্কাস ও মেলেগারের ওপর থাকবে। নিজের লক্ষ্য পূরণের আর আশা নেই দেখে মেলেগার আত্মহত্যা করেন। এথেন্স থেকে পারস্য—পুরো অঞ্চলজুড়ে এ সময় শাসনভার ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা।
আলেকজান্ডারের
ঘনিষ্ঠদের চারপাশেও
ঘনিয়ে ওঠে
দুর্যোগের ঘূর্ণিবাতাস।
ব্যাবিলনে রোক্সানা
ডেকে পাঠান
আলেকজান্ডারের দ্বিতীয়
স্ত্রী স্টাটেরিয়াকে।
এ স্টাটেরিয়া
ছিলেন দারিয়ুসের
কন্যা। পার্ডিক্কাসের
অনুমোদন নিয়ে
রোক্সানা স্টাটেরিয়াকে
বিষ প্রয়োগে
হত্যা করেন।
এরপর রোক্সানা
হত্যা করান
আলেকজান্ডারের আরেক
পারসিক স্ত্রী
প্যারিসাটিসকে।
রোক্সানা
জন্ম দেন
এক পুত্রসন্তানের—চতুর্থ
আলেকজান্ডার। এ
পুত্রশিশুর অভিভাবক
নিযুক্ত করা
হয় পার্ডিক্কাসকে।
তিন বছরের
মধ্যে পার্ডিক্কাস
তার রক্ষীদের
ছুরিকাঘাতে নিহত
হলেন। কারণ
ছিল তিনি
তার রক্ষীদের
বালুচর আর
কুমির ভরা
নীল নদ
পাড়ি দেয়ার
নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ক্রাটেরাস
ছিলেন প্রকৃত
মেসিডোনীয় আর
তাই তাকে
সেনারা ভালোবাসত।
পার্ডিক্কাস নিহত
হলেন যে
মাসে, সেটা
ছিল ক্রাটেরাসের
জীবনেরও শেষ
সময়। ক্রাটেরাসও
প্রতিপক্ষের সঙ্গে
যুদ্ধে নিহত
হলেন। অন্যদিকে
টলেমি মিসর
দখল করে
নিয়েছেন। তিনি
পার্ডিক্কাসের সঙ্গে
তার সম্পর্ক
পায়ে মাড়িয়ে
এগিয়ে গেলেন।
আলেকজান্ডারের পুরনো
বন্ধু সিরিয়ার
এক প্রাদেশিক
রাজা লাওমিডনকে
হত্যা করেন
টলেমি। এ
রকম আরো
হত্যাকাণ্ড এক
জটিল পরিস্থিতি
সৃষ্টি করে।
এবার মঞ্চে
আবির্ভূত হন
মেসিডোনিয়ার রাজা
দ্বিতীয় ফিলিপের
স্ত্রী ও
আলেকজান্ডারের মা
অলিম্পিয়াস।
গ্রিক
উপদ্বীপের প্রথম
নারী হিসেবে
অলিম্পিয়াস রাজনীতিতে
নির্ধারক ভূমিকা
রাখেন। সেকালের
গ্রিক শাসকদের
মতো অলিম্পিয়াসও
ছিলেন সাহসী,
উচ্চাভিলাষী ও
প্রতিশোধপরায়ণ। ৩১৭
খ্রিস্টপূর্বাব্দে অলিম্পিয়াস
সেনাপতি পলিপার্সোন
ও এসিডাসকে
নিয়ে সেনাদলের
নেতৃত্বসহকারে মেসিডোনিয়ায়
হাজির হন।
তাকে প্রতিরোধ
করতে সেনাবাহিনী
নিয়ে হাজির
হন আরেক
নারী—ফিলিপের
ভাগ্নি ইউরিডাইস।
অনেক ইতিহাসবিদ
মনে করেন,
এটাই দুনিয়ারতে
দুই নারী
নেতৃত্বের মধ্যে
সংঘটিত প্রথম
যুদ্ধ। কথিত
আছে, যুদ্ধের
ময়দানে অলিম্পিয়াস
হাজির হয়েছিলেন
পুরোহিতের পোশাকে।
মেসিডোনিয়ার সেনারা
অলিম্পিয়াসের পক্ষ
নেন। ইউরিডাইস
পরাজিত হন।
অলিম্পিয়াস ইউরিডাইসকে
হেমলক, ফাঁসির
রজ্জু ও
তলোয়ার পাঠিয়েছিলেন
মৃত্যুর পদ্ধতি
বেছে নেয়ার
বিকল্প হিসেবে।
ইউরিডাইস তার
কোমরবন্ধ দিয়ে
গলায় ফাঁস
নেন। অলিম্পিয়াস
রাজা আরিডেয়াসসহ
ক্যাসান্ডারের বন্ধু
ও আত্মীয়
মিলিয়ে শ’খানেক
মানুষকে হত্যা
করান। কিন্তু
তার এ
বিজয়যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী
হয়নি। পাল্টা
আঘাত হানেন
ক্যাসান্ডার। এ
ক্যাসান্ডার হলেন
গ্রিক সেনাপতি
অ্যান্টিপেটারের পুত্র।
ক্যাসান্ডার অ্যারিস্টটলের
কাছে আলেকজান্ডারের
সঙ্গেই শিক্ষালাভ
করেছিলেন। ক্যাসান্ডার
উপকূলীয় নগর
পিডনায় অলিম্পিয়াসকে
অবরোধ করেন।
অবস্থা এমন
দাঁড়ায় যে
তাকে মৃত
হাতি ও
চাকরদের মাংস
খেতে হয়েছিল।
নয় মাস
অবরুদ্ধ থেকে
অলিম্পিয়াস আত্মসমর্পণ
করেন এবং
সাহসের সঙ্গে
মৃত্যুকে বরণ
করেন। ক্যাসান্ডার
তাকে পরিবারসহ
হত্যা করেন।
এরপর ক্যাসান্ডার
নজর দেন
রোক্সানার দিকে।
রোক্সানা তখন
পুত্র চতুর্থ
আলেজান্ডারকে নিয়ে
গ্রিস সফর
করছেন। ক্যাসান্ডার
মা ও
পুত্রকে বন্দি
করেন এবং
এক বছর
পর তার
লোকেরা দুজনকে
হত্যা করে।
অ্যান্টিপেটারের সন্তানদের
মধ্যে ক্যাসান্ডারই
ছিলেন সবচেয়ে
নিষ্ঠুর। নিজের
ভাইবোনকেও তিনি
নিস্তার দেননি।
রোক্সানা
ও তার
সন্তানের পরিণতি
ইতিহাসে একটি
বিষয় পরিষ্কার
করে দেয়।
মেসিডোনিয়ার মানুষ
আলেকজান্ডারের পারস্য
বা প্রাচ্য
নীতি নিয়ে
সন্তুষ্ট ছিল
না। কোনো
পারস্য বংশোদ্ভূত
সন্তানকে তারা
শাসক হিসেবে
মেনে নিতে
নারাজ। গ্রিক
ও মেসিডোনিয়ার
মানুষ রোক্সানাকে
দুর্ভাগ্য বয়ে
আনা ডাইনি
ভাবে। তাদের
কথা ছিল,
এ প্রাচ্য
দেশীয় ডাইনি
আলেকজান্ডারকে তাদের
কাছ থেকে
চুরি করে
নিয়েছে এবং
এ বীর
যোদ্ধার ভবিষ্যেক
ধ্বংস করে
দিয়েছে। আলেকজান্ডারের
মা অলিম্পিয়াস
রোক্সানাকে সর্বোতভাবে
সহায়তা করেছিলেন।
কিন্তু গ্রিসের
সেনা ও
সেনাপতিদের মধ্য
রোক্সানার প্রতি
ঘৃণা ছিল।
আলেকজান্ডারের
রোমান্স নিয়ে
গ্রিক সাহিত্যে
রোক্সানার নামটি
এসেছে ফুটনোটের
মতো করে।
আলেকজান্ডারের জীবদ্দশায়
রোক্সানা নিজে
থেকে কোনো
রাজনৈতিক কিংবা
সামাজিক ভূমিকা
রাখতে পারেননি।
এসবেরই কারণ
রোক্সানার প্রাচ্য
দেশীয় রক্ত।
দিগ্বিজয়ীর প্রথম
প্রেমিকা ও
সন্তানের মা
হয়েও রোক্সানার
জীবনের উপসংহার
সাফল্যমণ্ডিত ছিল
না, বরং
ট্র্যাজেডিই ছিল
তার নিয়তি।
রোক্সানা স্বামীর
মৃত্যুর পর
উত্তরাধিকারী সন্তানের
মা হিসেবে
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
ওঠেন, কিন্তু
খুব বেশি
দিনের জন্য
নয়। ইতিহাসের
অন্যতম সেনানায়ক,
শাসক, বীরের
সন্তানসহ অকালেই
প্রাণ হারাতে
হয় প্রাচ্য
দেশীয় সুন্দরী
রোক্সানাকে। আলেকজান্ডারের
বিশ্বজয় করা
হয়নি, তার
মা অলিম্পিয়াসও
অনেক পথ
এগিয়ে হেরে
গিয়েছিলেন, বাকি
ছিলেন রোক্সানা
এবং শিশু
পুত্র চতুর্থ
আলেকজান্ডার। রোক্সানার
ইতিহাসও সমাপ্ত
হয় ট্যাজেডিতে।





