খিভা থেকে রওনা হয়েছি সকাল সাড়ে ৮টায়। ৪৮০ কিলোমিটার দূরত্বে বুখারা এসে পৌঁছলাম বিকাল ৪টায়। সড়ক কোথাও চার লেন, কোথাও দুই লেন, কোথাও চমত্কার মসৃণ, কোথাও অমসৃণ, তবে চার লেনের হাইওয়ে নির্মাণাধীন। পুরাকীর্তিগুলোর সংস্কার ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনর্নির্মাণ, তার সঙ্গে মহাসড়কের উন্নয়ন এ কথাই বলে, উজবেক সরকার অদূরভবিষ্যতে প্রচুর পর্যটক আশা করছে দেশটিতে। কিজিল কুম মরুভূমি খুবই বৈচিত্র্যহীন, দেখার কিছু নেই, কেবল দেখি বিদ্যুতের খুঁটি চলে গেছে দূর থেকে দূরে। বিদ্যুতের তার ও খুঁটির প্রকার দেখে বোঝা যায়, সেগুলো কোনো উচ্চবিভব পরিবাহী নয়, কেবলই দূরাঞ্চলের সংযোগ।
বুখারায় যেখানে এসে নেমেছি, সেই হোজে কাউসই যে বুখারার প্রধান কেন্দ্র, ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির প্রাণবিন্দু, তখন বুঝতে পারিনি। নেমে যার মূর্তি দেখলাম, জগৎ তাকে চেনে। তারই সঙ্গে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া গাধাটির মূর্তিও দেখলাম। মোল্লা নাসিরুদ্দিন, যিনি নাসিরুদ্দিন হোজ্জা (হোজ্জা মানে জ্ঞানী) নামেই সমধিক পরিচিত, তার জন্মস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।
বুখারা এসে ড্রাইভার বিদায় নিল, তার নিবাস বুখারাতেই। চালককে বিদায় জানিয়ে ব্যাগ পিঠে নিয়ে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার স্ট্যাচুর কাছে যাই। মিশ্র ধাতুর স্ট্যাচুটি অনবদ্য। গাধাটি মাথা নুইয়ে আছে। তার পিঠে বসে থাকা হোজ্জার কৌতুককর ঠোঁটে একচিলতে রহস্যময় হাসি, মুখে চমত্কার করে ছাঁটা সুচালো দাড়ি, মাথায় ভাঁজ করা টুপি, নাগরা পরা পা দুটো প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই, একটি হাত সে তুলে আছে মজাদার ভঙ্গিতে। আমার তত্ক্ষণাৎ মনে পড়ল, বুখারার পথে কিজিল কুম মরুভূমিতে গাধার পিঠে এক বয়স্ক মানুষকে দেখেছিলাম, যার পোশাক, টুপি, পায়ের নাগরা জুতো হুবহু এমন ছিল। যে যাচ্ছিলও এক গাধার পিঠে চড়ে। এ কি দৈব কোনো ব্যাপার, নাকি বুখারায়, কিংবা বলা যায় গোটা মধ্য এশিয়ায়, এমন বহু বয়স্ক পুরুষ আছেন, যারা হোজ্জার মতো বেশ নিয়েছেন। কোনো কোনো গবেষকের মতে, নাসিরুদ্দির হোজ্জা কোনো একক ব্যক্তি নাও হতে পারেন, হয়তো অনেক সমরসবোধের মানুষের সামষ্টিক নাম নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। এটা ভাবার আরেকটি কারণ, হোজ্জার অনেক গল্প প্রতিবাদী তত্কালীন শাসকদের সমালোচনামুখর, এমন সব কৌতুক বা গল্পের প্রকৃত রচয়িতারা হোজ্জার commom noun-এর আড়ালে পরিচয় লুকিয়েছেন মাত্র।
নাসিরুদ্দিন হোজ্জা জন্মগ্রহণ করেন ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের খয় নগরীতে, চতুর্দশ শতকে। জন্মসূত্রে তিনি একজন সেলজুক, যার হাজার হাজার কৌতুককর গল্প ছড়িয়ে আছে গোটা মধ্য এশিয়ায়, ছড়িয়ে আছে সমগ্র পৃথিবীতে। কিংবদন্তি একেই বলে! তিনি শিক্ষালাভ করেন ইরানের খোরাসান প্রদেশে আর মৃত্যুবরণ করেন বর্তমান তুরস্কের আকশেহিরে। উজবেকরা কিন্তু বিশ্বাস করে, তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন বুখারায়, যে স্থানে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি, তার অতি সন্নিকটেই। একইভাবে তুর্কিরা বিশ্বাস করে, হোজ্জা তাদেরই লোক, পারসিরাও তা-ই ভাবে। আজকের দিনের দুনিয়াখ্যাত সেলিব্রেটিরাও হোজ্জাকে ঈর্ষা করবেন।
বৃক্ষছাওয়া প্রাঙ্গণটি ঝরাপাতায় ভরে আছে। দুই পাশে দুটো মাদ্রাসা, অন্য পাশে একটি হোটেল। ভাবলাম, এ হোটেলেই আমরা থাকব। কিন্তু পালোয়ান আমাদের নিয়ে গেল পছন্দের হোটেলটির পাশ দিয়ে যে সরু গলি গেছে সেই সরু গলিতে। কাঠের একটি দরোজা খুলে আমরা একটি ছোট প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াই। সিঁড়ি উঠে গেছে, প্রথমটায় বুঝিনি, পরে বুঝলাম, সেটি একটি হোটেল, পালোয়ান আমাদের সেখানে রাখার বন্দোবস্ত করেছে। সে আমাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার অনুরোধ জানাল, ওপরের বারান্দা থেকে মোটামতো এক রমণীও ইশারা করছিলেন ওপরে ওঠার; কিন্তু খায়রুল ও আমি বেঁকে বসি। চার তারকা হোটেলে রাখার কথা বলে এই বন্দোবস্ত? উপায়ন্তর না দেখে পালোয়ান আমাদের এশিয়া বুখারা হোটেলে নিয়ে আসে।
হোসে কাউস চত্বরে বেশকিছু হোটেল আছে। সেগুলোর প্রবেশপথ উজবেকিস্তানের ট্রেডমার্ক প্রাচীন মাদ্রাসার দরোজার মতো করে বানানো হয়েছে। হোটেল এশিয়ার দরোজাটিও তদ্রূপ বিশাল। ভেতরে ঢুকে স্বস্তি পেলাম, খিভায় আমরা যে হোটেলে ছিলাম, এটি তারই শাখা, নাম এশিয়া বুখারা। এখানেও সবকিছুতে হলুদ রঙের আধিক্য দেখলাম। গলির ভেতরে হোটেলে নেয়ার স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে পালোয়ান বলল, সে আমাদের উজবেকিস্তানের ঐতিহ্যিক আতিথেয়তা দেখাতে চেয়েছিল। বাইরে থেকে unimpressive লাগলেও ভেতরে গেলে আমরা নাকি impressed হতাম। হতাম হয়তো, কিন্তু থাকব মাত্র এক রাত, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফুরসত কোথায়? ফের কোনোদিন বুখারায় এলে না হয় জেনে নেব উজবেকদের ঐতিহ্যিক আতিথেয়তা। দীর্ঘ ভ্রমণে ক্লান্ত আমাদের প্রয়োজন ইউরোপীয় ব্যবস্থা। হোটেল এশিয়া বুখারা সে ব্যবস্থাই সুন্দর সাজিয়ে রেখেছে।
বুখারা মধ্য এশিয়ায় ইসলামের ঐতিহ্যবাহী নগরী, ইসলামী সংস্কৃতি ও ধর্মীয় দর্শনের অন্যতম পীঠস্থান, আরেক বিখ্যাত নগর সমরকন্দের সঙ্গে সমুচ্চারিত তার নাম। যদিও একসময়ে তা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের একটি অঞ্চল। কিন্তু পরবর্তীতে সপ্তম শতক থেকেই এখানে ইসলামের বিকাশ ঘটে। এ অঞ্চলে মানববসতি প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। আমরা কৈশোরে এসব নাম শুনে মোহিত হয়েছি। কখনো ভাবিনি, মরজীবনে এসব ইতিহাসের সুবাস মাখানো নগরী দেখতে পাব। অথচ এ মুহূর্তে আছি সেই সুদূরস্বপ্নসম্ভব নগরীগুলোর একটিতেই।
বুখারা নগরী পত্তনের সময় শুনলে চমকে উঠতে হয়— আড়াই হাজার বছর! হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো প্রাচীন এ নগরীর পুরাকীর্তিগুলো নির্মিত হয় নবম থেকে সপ্তদশ শতক— প্রায় সহস্র বছর ধরে। সময়ের আঁচড়ে ধ্বংস হয়ে গেছে প্রায় সবই, আক্রমণকারী সেনাদলও কম তাণ্ডব চালায়নি। ফলে পুনর্নির্মাণ করতে হয়েছে অনেক স্থাপনা। ১৪০টি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে টিকে থাকা বুখারাকে বলা হয় City of Museum, যা ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যেরই অংশ।
কিজিল কুম মরুভূমির ধুলি উজিয়ে এসেছি, যা প্রয়োজন ছিল তা হলো, শরীরের প্রতি লোমকূপ ভেজানো গোসল। তা সেরে খায়রুল ও আমি নিচের লবিতে এসে বসি। কাউন্টারে কাজ করছেন দুজন, মোটামতো এক মধ্যবয়সী লোক আর ত্রিশানুবর্তী এক ছিপছিপে যুবতী। যুবতীর চোখ-মুখ এ অঞ্চলের রূপে আঁকা। তাকে যে মুগ্ধ হয়ে দেখছি আমি, তা সে বুঝে যায় অবলীলায়, আর কী যেন অহেতুক কাজ পড়ে যায় টেবিলের সমুখেই। ফলে এদিকেই মুখ করে ঝুঁকে ঝুঁঁকে কাজ করে যায় সে, আপেলরঙা মুখাবয়বের দ্যুতি ছড়িয়ে। পালোয়ান এলে আমরা ডিনারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।
সেই ঐতিহ্যিক হোটেলটির মতোই দরোজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে একটি ছোট উঠোন, মলিন ও দরিদ্র। তাতে চেয়ার পাতা, বসে বাদশাহি হুঁকো টানা যায়। চারপাশে অনেকগুলো দরোজা, তাদেরই একটি দিয়ে ভেতরে ঢুকে আমরা হতবাক, বাইরের অনুজ্জ্বল, মলিন প্রাঙ্গণ থেকে যা অনুমান করা যায়নি। চমত্কার ঝলমলে এক রেস্তোরাঁ ভেতরে, সাদা পোশাকের সঙ্গে জরিদার কালো কুর্তা পরে পরিবেশকরা ঘুরছে। জানালায় নকশা আঁকা রঙিন কাচ, দেয়ালগুলো খোদাই করা কাঠ ও কাপড়ে ঢাকা। টেবিলে ওয়াইন গ্লাস রাখা। মুসলমানপ্রধান দেশ হলেও এরা উদার প্রকৃতির, অক্লেশে মদ্যপান করে। ছাদ থেকে রঙিন ফিতা ও বেলুন ঝোলানো দেখে বুঝি পার্টি হবে। আমরা চারজন একটা জুতসই টেবিল ঘিরে বসে খাবারের অর্ডার দিচ্ছি, তখনই দেখি অপরূপ তিন রমণী একটি ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করছে। তাদের রূপবৈভব চারপাশের উজ্জ্বলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়ে তাদের অনুরোধ করি আমার ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি হতে। সহজেই রাজি হয়ে যান তারা, ফ্যাশন শোর তুখোড় ললনাদের মতো পোজ দেন। এ সুললিত দৃশ্য দেখে আমাদের রসিক গাইড পালোয়ান এগিয়ে এসে আমাকে তাদের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে বলেন। মোহনীয় রমণীরা আমার সঙ্গে একই ঢঙে ছবি তোলেন। বদান্যতা রূপচ্ছটার সঙ্গে মিলে তাদের অপরূপা করে তোলে। মাংসের কাবাবের সঙ্গে রুটি— আমাদের আহার মন্দ হয়নি। কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল বেশ কজন সুদর্শন পরিবেশক। আমার ছবি তোলার বাতিক দেখে তারাও আগ্রহী হলো ছবি তুলতে।
কারাভান নামের রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে আমরা রাতের বুখারা দেখতে বেরিয়ে পড়ি। রাস্তার পাশে অবস্থিত বিভিন্ন দোকানপাটের সাইনবোর্ড থেকে কিছু কিছু উজবেক শব্দ শেখার চেষ্টা করি, Muzey হচ্ছে মিউজিয়াম, Dorixone মানে ওষুধের দোকান, Mebel হচ্ছে আসবাব, আর Optika চশমার দোকান। বুখারা শহরে উঁচু দালান তেমন চোখে পড়ল না, বেশির ভাগই একতলা। বুখারা নগরীর লোকসংখ্যা শুনে আমি একটু অবাকই হলাম, তিন লাখের কাছাকাছি, অর্থাৎ মিরপুরের জনসংখ্যার পাঁচ ভাগের এক ভাগ। অথচ এটি উজবেকিস্তানের পঞ্চম বৃহৎ শহর। এ শহরের অনেকগুলো নাম, একটি নাম নুমিজকাত, অন্যটি বুমিসকাত। রয়েছে দুটি আরবি নামও— মদিনাত আল সুফরিয়া বা তাম্রনগরী, আরেকটি মদিনাত আল তুযযার বা বণিকনগরী। ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল বুখারা, ষষ্ঠ শতকে যা ছিল পৃথিবীর বাণিজ্যিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বণিজ্যিক কেন্দ্র।
গাড়ি যেখানে এসে পৌঁছে, সেটি একটি প্রাচীন মাদ্রাসা। সপ্তদশ শতকে নির্মিত মাদ্রাসাটির নাম আবদুল আজিজ মাদ্রাসা। সমগ্র উজবেকিস্তানে এখন যে তিনটি মাদ্রাসা চালু রয়েছে, তার একটি হলো এই মাদ্রাসা। সমুখেই জুমা মসজিদ। মাদ্রাসায় প্রবেশ নিষেধ হলেও মসজিদ উন্মুক্ত। হালকা হলুদ রঙের আলোয় কিছুটা রহস্যঘেরা প্রাঙ্গণে মানুষ বলতে আমরা চারজনই। শীতের প্রকোপে ও রাতের কারণে আর কোনো দর্শনার্থী দেখা গেল না। সে চত্বরে সবচেয়ে দর্শনীয় হচ্ছে কল্যাণ মিনারেট বা গ্রান্ড মিনারেট, বুখারার সবচেয়ে উঁচু ও দর্শনীয় মিনার। মিনার শব্দটি এসেছে আরবি মানার থেকে, যার অর্থ বাতিঘর বা এমন চূড়া, যা প্রজ্বলিত। ইসলামে মিনার চূড়া থেকে আজান দেয়া হলেও মূলত আলোকস্তম্ভ হিসেবেই এর সূচনা। সুদৃশ্য কল্যাণ মিনারের সবচেয়ে সুন্দর অংশ হচ্ছে এর চূড়াটি, যেখানে দারুণ আলো জ্বলছে। উল্লেখ্য, ১২২০ সালে দুই সপ্তাহের বুখারা অভিযানের সময় চেঙ্গিস খানের ধ্বংস ও তাণ্ডবলীলার সময় বুখারার যে দুটি পুরাকীর্তি অক্ষত ছিল, তার একটি এই কল্যাণ মিনার। অতীব সুন্দর মিনারটির অন্য নাম Minaret of Deatয, কেননা দাগি অপরাধীদের শাস্তি হিসেবে এর চূড়া থেকে ছুড়ে ফেলা হতো অবধারিত মৃত্যুর পাটাতনে।
গাড়ি হোটেলে ফিরে এলে খায়রুল ও পালোয়ান খোশগল্পে মেতে ওঠে। আমি বেরিয়ে পড়ি চত্বরের মায়াবী আলোয় ডুবে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখতে। এশিয়া বুখারা হোটেলটি বুখারার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর কেন্দ্রেই অবস্থিত। যেখানে নেমেছিলাম, সেই লাবি হাউজের (Labi Hauz) চারপাশে অনেক প্রাচীন স্থাপনা। হাউজ মানে পুকুর, পুরাকালে এখানে অনেক পুকুর ছিল, যেগুলো ছিল বুখারার প্রধান জলউৎসাধার। এখন একটিমাত্র পুকুর রয়েছে, যার পানি সবুজ রঙ ধারণ করেছে। বোঝাই যায়, দূষিত পানি। একসময় এসব পুকুরের পানি পান করে মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল বুখারায়, যে কারণে বেশকিছু পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়।
সবুজ বৃক্ষঢাকা হোসে কাউস চত্বরের চারপাশে, যেখানে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ধাতব মূর্তি রয়েছে, অনেক মসজিদ ও মাদ্রাসা। রয়েছে চমত্কার পায়ে চলা পথ। রাতের মায়াবী আলোয় জ্বলছে মাগোকি আত্তর মসজিদ। এটি পুকুরের পশ্চিম পাশে। পূর্ব পাশে রয়েছে নাদির-ডিভান বেগি নির্মিত মাদ্রাসা, উত্তর পাশে সড়কের পাশেই নাদির-ডিভান বেগি নির্মিত একটি খানকা বা সুফিদের জন্য বিশ্রামাগার। সেসবের প্রকাণ্ড দরোজায় ছোট নীল পাথরে ফুটিয়ে তোলা মনোরম সব নকশা। শীত ও ক্লান্তি মিলিয়ে শরীর না কুলালে হোটেলের উষ্ণ আতিথেয়তার ভেতর বিশ্রামের শয্যায় ফিরে আসি। ঘুমে চোখ জড়িয়ে যেতে সময় লাগেনি। দ্রুতই চলে যাই স্বপ্ন প্রদেশে, মাথার ভেতর এই বোধ নিয়ে যে হাজার হাজার বছরের সভ্যতার কেন্দ্রে আমার নশ্বরদেহ নিদ্রাশীল, কাছেই ধাতব মূর্তির পিঠে জেগে আছেন মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্রটি আর বাতাসে মৃত হাজার সুফির আত্মা জ্বলছে আকাশে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রের মতো!
খিভায় জানালার পর্দা সরিয়ে দেখেছিলাম ইচান দুর্গের উঁচু প্রাচীর, বুখারায় ঘুম ভেঙে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্যঘেরা একটি চত্বর। ঠিক পেছনেই একটি পুরনো নগর অংশের দালানকোঠা, তেমন জৌলুশ নেই, কিন্তু আভিজাত্য রয়েছে। আর পর্যটকের চোখে জৌলুশের চেয়ে আভিজাত্যের আবেদন বেশি। সেসবের টানে ছটফট করে নিচে নেমে যাই। কাল বিকালে ওই চত্বরে বালিকা তনয়াকে নিয়ে হেঁটে চলা এক যুবতী মা ও অন্য দুজন নারীর ছবি তুলেছিলাম, আজ প্রভাতে চত্বরটি একেবারে সুনসান।
আমরা যে হোটেলে আছি, তার প্রায় লাগোয়া পেছন দিকটায় একটি গম্বুজ, যার নিচ দিয়ে পথ চলে গেছে, গাড়ি যাওয়ার পথ নেই, কিন্তু সাইকেল যাওয়ার পথ আছে, অর্থাৎ হেঁটেও যাওয়া যাবে। এশিয়া খিভা হোটেলের বিশাল মাদ্রাসা-নকশার তোরণের মতো দরোজার বাইরে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে নিচের সড়কে দাঁড়ালে মনে হবে, গম্বুজটির প্রান্ত একটি dead end, ক্ষণিক পরই ভুলটা ভাঙল যখন দেখলাম, দুজন সাইকেলারোহী সুড়ঙ্গের মতো পথ দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। কৌতূহলবশত এগিয়ে গিয়ে দেখি, তিনটি গম্বুজের ছায়ায় নির্মিত স্থানটি কিছুটা আঁধারসম্পন্ন, সে ছায়ায় শুয়ে আছেন হোজা আহমেদি পারন নামের এক সুফি সাধক।
খায়রুলের আগে ঘুম থেকে উঠে একা একাই জায়গাটিতে গিয়েছিলাম, ব্রেকফাস্ট টেবিলে পৌঁছতে দেরি হবে ভেবে যে পথ চলে গেছে তিন গম্বুজের মিলিত ছায়া থেকে আলোকময়তার দিকে, সেদিকে আর যাইনি। হোটেলে ফিরে দেখি, খায়রুল গোসল সেরে কাপড় পরে প্রস্তুত। দুই ভাই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে প্রাতরাশের জন্য ডাইনিং হলের দিকে এগোই। খিভাতেও দেখেছি, এশিয়া চেইন হোটেলটির রেস্তোরাঁ বলি আর ডাইনিং হল বলি, বেশ জৌলুশপূর্ণ! নকশাতোলা কাঠির আসবাবের ওপরে বড় বড় ঝাড়বাতি, দেয়ালে তৈলচিত্র, চারপাশে খাদ্যসম্ভারে পরিপূর্ণ টেবিল, কোথাও খাদ্য পরিবেশনার কাউন্টার, ধাতুর তৈরি চকচকে তৈজসপত্র, উর্দি পরা পাচক, কেতাদুরস্ত বেয়ারা— সব মিলিয়ে বেশ আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশ, একটা রাজকীয়ভাব এসে যায়। রাজারা যেমন সবকিছু একটু চেখে দেখেন, তা খাদ্য হোক কিংবা নারী, আমরাও অনেক কিছু চেখে দেখি, প্রচুর খাবার থাকলে যা হয় আর কি!
প্রাতরাশ শেষে খায়রুল ও আমি সেই তিন গম্বুজের তৈরি প্রাচীন স্থাপনাটির দিকে যাই। কিছুটা অন্ধকারাবৃত গুহাপথ ছেড়ে আলোকিত চত্বরের দিকে এগোই। দেখি, এক পাশে হস্তশিল্পের কয়েকটি দোকান, অন্য পাশে দেয়ালের লাগোয়া একটি টেবিল পেতে কিছু হস্তশিল্প সাজিয়ে বসে আছেন এক সুন্দরী যুবতী। হস্তশিল্পের চেয়ে তার প্রতিই আমার মনোযোগ বেশি— যুবতী তা বুঝে ফেলেন। সে সময় বিপরীত দোকান থেকে এক প্রৌঢ়া বেরিয়ে আসেন, তিনি আমাদের দোকানের ভেতরে নিয়ে যেতে চান। ‘কিছু কিনতে হবে না, শুধু একঝলক দেখবে’— তার বায়না শুনে দোকানটিতে ঢুকতেই হলো। হস্তশিল্পসামগ্রীতে ঠাসা দোকানটি, তাসখন্দের চরসু বাজারে যেমনটা দেখেছি। অভিজ্ঞা মানবী জানেন, একঝলক দেখলে পাওয়ার বাসনা জাগে, যেমন জেগেছিল বাইরের যুবতীটির প্রতি, কিন্তু সবকিছু তো আর মুদ্রা বিনিময়ে হয় না, যা হয়, আমি তাই কিনি— সমরখন্দ, বুখারার ঐতিহাসিক স্থাপনার চিত্রসংবলিত সিরামিকের কয়েকটি প্লেট। খুশি হয়ে আমার আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমার ও খায়রুলের সঙ্গে ছবি তোলেন প্রৌঢ়া, যুবতীকে নিয়ে অবশ্যই, কেননা উপলক্ষ তো তিনিই। তখন সোনালি কিরণ নিয়ে গ্রহটির একমাত্র নক্ষত্র দেদীপ্যমান, সে আলোয় ঝলমল করে উঠছে বুখারার প্রাচীন পুরাকীর্তিগুলো, রূপের প্রভা নিয়ে সপ্রতিভ যুবতী আরো সোনালি উজ্জ্বল। ভাবি, পণ্যের বাহার নাকি তার বাহারি রূপ, কোনটা টানে বেশি, আর কেনাকাটার মূল রহস্যটি আসলে কোথায়!
কিছুটা এগোতেই দেখি একটি চত্বর, যার চার পাশে পুরাকীর্তির এক জমজমাট মেলা। শত শত বছর আগে এ স্থানই যে বুখারার প্রাণকেন্দ্র ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। চত্বরের এক পাশে কিছুটা উঁচুতে একটি মসজিদ, অন্য পাশে Abdull Oxon-এর সমাধি। সমাধিগাত্রে চতুর্দশ শতকের একটি বর্ষ লেখা, অর্থাৎ এর বয়স ৫০০ বছরের বেশি। এরপর হাতের ডানে একটি মসজিদ পেরিয়ে দুটি মুখোমুখি মাদ্রাসার অতিকায় দরোজা ও অন্যান্য স্থাপনা চোখে পড়ে। খায়রুল ও আমি সেদিকে এগোই। দুটি প্রকাণ্ড দরোজাতেই দুটি তেমন বৃহৎ নয় প্রবেশ দরোজা, সেগুলো বেমানানরূপে ক্ষুদ্র তালা দিয়ে আটকানো, বুঝি অতীতের বিরাট স্থাপনা বর্তমানের মানুষের কাছে ক্ষুদ্রতর রূপপরিগ্রহ করেছে, নাকি বর্তমানের মানুষই সেসবের মাহাত্ম্য বেশি বুঝেছে? এক রাজার স্থাপনা আরেক রাজা ধ্বংস করেছে, বর্তমানের মানুষ সেসব ধসে পড়া স্থাপনাকে যথাসম্ভব টিকিয়ে রাখছে। কেননা আধুনিক মানুষ জানে, ঐতিহ্যের অহঙ্কার কী আর পুরাকীর্তির মূল্য কতখানি!
ভেতরে কীভাবে প্রবেশ করব, এ কথা যখন ভাবছি, তখন আবির্ভূত হলেন এক দীর্ঘকায়া রমণী, তিনিই চাবি ঘুরিয়ে খুলে দিলেন লৌহফ্রেমে নির্মিত কাঠের অপেক্ষাকৃত ছোট দরোজা। তার কাছে দুটি মাদ্রাসারই চাবিগুচ্ছ, তিনিই এ চত্বরের তত্ত্বাবধায়ক। নারী সংখ্যাধিক্যের দেশে এমন সব স্থানে নারীদের দায়িত্বরত দেখা যায়, যা আমাদের দেশে অভাবিত। তিনি বেশি নয়, চার হাজার করে আট হাজার সুম নিয়ে আমাদের দুটি টিকিট দিলেন আর বললেন, আমরা যেন টিকিট দুটি যত্ন করে রাখি। কেননা অন্য স্থাপনা দেখার জন্যও এ টিকিট কাজে লাগবে আর সারা দিনে টিকিট একবার কাটলেই চলে। আমির আলী মাদ্রাসার ভেতরে যথারীতি হস্তশিল্পসামগ্রীর দোকান, তখনো সেসব খোলেনি। মাঝের আয়তাকার চত্বরে অনেক হস্তশিল্প রোদে শুকাতে দেয়া। মনে হলো, এটি একটি হস্তশিল্পসামগ্রীর উৎপাদন চত্বর। দীর্ঘকায়া আকর্ষণীয়া রমণী আমাদের অতঃপর নিয়ে যান বিপরীতে দাঁড়ানো দ্বিতীয় মাদ্রাসা, উলুগ বেগ মাদ্রাসার অভ্যন্তরে।
যে চত্বরে কল্যাণ মিনার তার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গৌরব ও অগৌরবে, তার দুই পাশে বুখারার দুটি বিখ্যাত পুরাকীর্তি— মীরি আরব মাদ্রাসা ও কল্যাণ মসজিদ। দুটি স্থাপনার মধ্যকার চত্বরের নাম পই-কল্যাণ, যার অর্থ কল্যাণ মিনারের পাদভূমি। কাল রাতে এখানে এসেছিলাম, তখন ছিল শীতরাত্রির কুয়াশা জড়ানো কুহক। আজ প্রভাতে তা আলোময়, রহস্যের অবগুণ্ঠনমুক্ত। কল্যাণ মসজিদের ভেতরকার ইট বাঁধানো চত্বরের মাঝে একটি অনুচ্চ গাছ, তিন পাশে অনেক গম্বুজ ও স্তম্ভ দিয়ে নির্মিত টানা বারান্দা। কল্যাণ মসজিদটি এর বিরাট প্রবেশ দরোজার ঠিক বিপরীতে অবস্থিত। দরোজাটি ভেতর দিকে অনেকখানি স্পেস তৈরি করেছে, ফলে বাঁকানো ছাদ সৌন্দর্যময়। সবুজাভ নীল পাথরে ঢাকা সুদৃশ্য বৃহৎ গম্বুজ মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক মসজিদটি, যেখানে প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ পড়া হয়। নীলাভ গম্বুজের নিচে কোরআনের লিপি উদ্ধৃত রয়েছে।
পুরো উজবেকিস্তানে বর্তমানে চালু থাকা তিনটি মাদ্রাসার একটি মীরি আরব মাদ্রাসা, নির্মিত হয় ষষ্ঠদশ শতকে, যা সেবানিদ (Sheybanid) ঘরানার প্রধান ধর্মীয় বিদ্যালয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নে চালু থাকা একমাত্র মাদ্রাসা এটি, ফলে সে সময়কার প্রায় সব ইমাম ও ধর্মীয় গুরু মূলত এ মাদ্রাসারই ছাত্র ছিলেন। সুতরাং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ মাদ্রাসা। কল্যাণ মসজিদের অনুরূপ দুটি গম্বুজ রয়েছে মাদ্রাসাটির। তার সুবৃহৎ দরোজাটি দারুণ কারুকার্যখচিত। গম্বুজের চূড়ার রঙ সবুজাভ নীল হলেও দরোজায় খয়েরি রঙের পাথরের কারুকার্য দেখা যায়। ছোট ছোট মার্বলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কোরআনের বাণী, ফুল-লতাপাতা, বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার প্রভৃতি। এটি নির্মাণ করেন তত্কালীন বুখারার আমির ওবায়দুল্লা খান। ইতিহাস বলে, ওবায়দুল্লা খান তিনবার পারস্য সাম্রাজ্য আক্রমণ করে তিনবারই জয়লাভ করেন। তিনবারই তার সেনাদল হিরাত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। এসব যুদ্ধে বন্দি করা তিন হাজার পারসি সৈন্যকে দাস হিসেবে বিক্রি করে তিনি যে অর্থ লাভ করেন, তা দিয়েই নির্মাণ করেন এ মাদ্রাসা। কথিত আছে, সেবানিদদের আধ্যাত্মিক গুরু শেখ আবদুল্লাহ ইয়েমনির স্মরণে এ মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়। আমরা মাদ্রাসার দরোজা দিয়ে ঢুকে ভেতরের প্রাঙ্গণে চোখ ফেলতে চাই, দৃষ্টির বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইটের তৈরি ছোট ছোট ফোকরওয়ালা দেয়াল, যা কিছুটা দেখার অবকাশ দিলেও পুরোটা দেয় না। ভেতরে ঢোকা নিষেধ। কেননা মাদ্রাসায় ক্লাস চলছে। ছাত্ররা দ্বিতল ভবনটির কক্ষগুলোতেই থাকেন। এক মা ও বাবা এসেছেন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত গুম্ফউঠতি যুবা অনুমতি নিয়ে গেটে এলে তার মা-বাবা তাকে জড়িয়ে ধরেন। অপত্যস্নেহ সব জনগোষ্ঠীর ভেতরে একই প্রকার ক্রিয়াশীল। কল্যাণ চত্বর ছেড়ে আমরা পা বাড়াই আর্ক দুর্গের দিকে।






