হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দ্বিতীয় স্ত্রী ভেরা তিশেঙ্কো ছিলেন অভিনেত্রী। পোলিশ রক্তের অধিকারী ভেরা আলেকজান্দ্রোভনা তিশেঙ্কো ক্যালডর ছিলেন মস্কো আর্ট থিয়েটারের সদস্য। তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তিনি অভিনয়ে আসেন। তার ১৯ বছর বয়সে চেখভের স্ত্রী ওলগা নিপারের সুদৃষ্টি লাভ করেন। এরপর তিনি বহুদিন মস্কো থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থেকে অভিনয় করেছেন। মঞ্চকে তিনি ভালোবাসতেন। এ কারণে তার প্রতিটি অভিনয় প্রশংসিত হতো। তার প্রথম স্বামী ইউজিনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময় প্রেমের সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন, কিন্তু সে বিয়ে সুখের হয়নি। এমনকি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গেও তার বিয়ে টেকেনি। তিনি ফের অভিনয়ে নিজেকে ব্যস্ত করেছিলেন।

আমেরিকায় জীবনযাপনের সময় তিনি নিজের নাম ভেরা ভ্লাসোভা করেন। ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি। আমেরিকায় ভেরার বোন লিডিয়া বসবাস করতেন ম্যানহাটনে। লিডিয়ার স্বামী ছিলেন ডক্টর জেডওয়াবনিক। এ বাড়ি তিনি তার ভাই আব্রামের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। ১৩০ ওয়েস্ট ৫৭ স্ট্রিটের বাড়িটিতে তারা প্রায় ৫০ বছর বসবাস করেছেন। বাড়িটি একটি পুরনো স্টুডিও হাউজ। চার পুরুষ ধরে পরিবারটি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ভেরার মতো লিডিয়া অভিনয়ের সঙ্গে না থাকলেও তিনি ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী।

লিডিয়ার জন্ম ১৯০৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ওডেসায়। প্রথমে মস্কো ও পরে ভিলনায় বসবাস করতেন। পোল্যান্ডের ভিলনায় ছিল মূলত তার স্বামীর বাড়ি। ১৯৩৯ সালে তিনি স্বামীর সঙ্গেই আমেরিকা যান। এর পর থেকেই আমৃত্যু নিউইয়র্কে বসবাস করেছেন। ভিলনায় তার পরিবারের সদস্যরা হলোকাস্টে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ভিলনা ও নিউইয়র্কে নিজের চিত্রের প্রদর্শনী করতেন। তিনি চিত্রশিল্পী হিসেবে খ্যাতি ও স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ৮০ বছর বয়স অবধি তিনি নিজেকে ছবি আঁকার কাজে জড়িত রাখেন। লিডিয়া রাশান, পোলিশ, জার্মান, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষা জানতেন।

ভেরা তিশেঙ্কো ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন লন্ডনে। রাশেদ সোহরাওয়ার্দী মায়ের মতো অভিনয়কেই নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। মূলত ভেরা ও তার পরিবারের শিল্পানুরাগ তার মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল। তিনি অভিনেতা হিসেবে স্বনামখ্যাত। রয়্যাল শেকসপিয়ার একাডেমিতে তিনি বহু বছর অভিনয় করেছেন। আইএমডিবির হিসাব অনুসারে তিনি ৪৬টি সিনেমা ও টিভি সিরিজে অভিনয় করেছেন। তবে রাশেদ সোহরাওয়ার্দী মূলত রবার্ট অ্যাশবি হিসেবে মঞ্চে অভিনয়ের জন্যই বিখ্যাত।

রবার্ট অ্যাশবি তথা রাশেদ সোহরাওয়ার্দী প্রথমে চার্টারহাইজ স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর গ্র্যাজুয়েশন করেছিলেন ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড থেকে। পিতা একজন বড় রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও রাজনীতিতে তার তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। ধরে নেয়া যায়, মায়ের প্রভাবই তার মধ্যে বেশি কাজ করেছে। তিনি নিজেকে নিবেদন করেছেন শিল্পে। তবে বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন ছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে বেগম আখতার সোলেমান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু রাশেদ সোহরাওয়ার্দী লন্ডন থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছিলেন। ফলে বোনসহ অন্যান্য আত্মীয়র সঙ্গে তার সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছিল।

রাশেদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পুরোদস্তুর একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিনেতা। তিনি রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট থেকে অভিনয়ের শিক্ষা নিয়েছিলেন। এরপর রয়্যাল শেকসপিয়ার কোম্পানিতে দীর্ঘকাল অভিনয় করেন। এ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক অভিনেতাই নিজেকে মঞ্চ ও অভিনয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি করেন। তবে থিয়েটারের এ অভিনয় গণমানুষের কাছে ততটা পরিচিত নয়। রবার্ট অ্যাশবি বিস্তৃত পরিচিতি পেয়েছিলেন টিভি সিরিজ ডক্টর হুয়ের মাধ্যমে। এ সিরিজে তিনি বোরাড চরিত্রে অভিনয় করেন। এছাড়া ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া জামিল দেহলভী পরিচালিত জিন্নাহ সিনেমায় তিনি জওহরলাল নেহরুর চরিত্রে অভিনয় করে মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন।

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৮ সালেও একটি ভিডিও গেমে কণ্ঠ দিয়েছিলেন রাশেদ সোহরাওয়ার্দী।

 

আলী আমজাদ: লেখক