আদৌতে আবু সাঈদ আবুল খায়েরের অলৌকিকতা বা রহস্যময়তা হচ্ছে খেয়ালি, বিষম পরিণতি ও বৈপরীত্যে ভরা। যে কারণে তার জীবনের আধ্যাত্মিক যাত্রাও দুটি অংশে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে প্রথম চৌদ্দ বছর বা তারও বেশি সময় ছিলেন উগ্র তপস্যী এবং দ্বিতীয় অংশ রহস্যময় প্রফুল্লতায় পূর্ণ। বিস্তারিতে যাওয়া আগে স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো, সুফি দর্শনে অলৌকিতা বা কিংবদন্তি স্থান অতি উচ্চ। অনেকটা—অলৌকিকতা নেই তো সাধকের শিষ্য গ্রহণ ক্ষমতাও নেই। সে বিচারে তার জীবনও কম রহস্যময় নয়। তার একটা প্রেক্ষাপট তার সময়ের ইতিহাসে খুঁজতে হবে প্রথমে।

নবী মোহাম্মদ (সা.) পরবর্তী আরবের শাসন যখন দুনিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আয়ত্তে এনেছেন, সে সময় আরবে জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্যের বিশেষ উন্মেষও ঘটে। আরব ও পারস্যের সীমানা নদী ট্রাইগ্রিসের পারে বসরা শহরে ছিল এর কেন্দ্র। তবে জ্ঞানের এই উন্মেষ ইরোপীয় ধাঁচে রাজদরবারের আনুকূল্যে কবি-দার্শনিক বা যাজকদের উত্থানের মতো নয়। এরা বরং দরবারের বাইরে একদল মানুষ, যারা কোনোভাবেই দরবারের মুখাপেক্ষী নয়। এদের অধিকাংশই হাকিম ছিলেন, চিকিৎসা ও পারিবারিক বাণিজ্যের সুবাদে স্বাধীন জীবন-যাপন করতেন। তারা ছিলেন জিজ্ঞাসু প্রবণ; নতুন পথ অনুসন্ধানে তর্কের ভেতর দিয়ে জ্ঞানের নতুন প্রস্তাব আনতেন। স্পষ্টভাবে জ্ঞান চর্চায় অনুশাসনের কড়াকাড়ি ও কর্তৃত্ব পছন্দ করতেন না তারা। তাই বলে তাদের ‘অধার্মিক’ বলা যাবে না, বরং তারা ছিলেন নগরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ। প্রার্থনায় কাটত তাদের অধিকাংশ সময়। উমাইয়াদের শাসনামলে অনুসন্ধিত্সুদের মধ্যেই নতুন তর্ক শুরু হয়। সপ্তম শতকের শুরুতে মুতাযিলারা যে মতবাদের বীজ বপন করেছিলেন শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে, তা ডালপালা ছড়িয়ে দুটি গোষ্ঠী গড়ে উঠল কাদেরিয়া ও জাবারিয়া নামে। এর কেন্দ্রে ছিল খোদার সার্বভৌমতা, অর্থাৎ সবকিছুই খোদার পূর্ব নির্ধারিত, এর ব্যত্যয় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সে হিসেবে মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচারের সুযোগ থাকে না। এর বিপরীতে ছিল মানুষের জ্ঞানের সীমানা প্রসঙ্গ, অর্থাৎ খোদা সর্বক্ষমতার আধার হলেও মানুষকে চিন্তার ক্ষমতা ও জ্ঞান দান করেছেন, তাই তাকে কৃতকর্মের দায় বহন করতে হবে। ইবনে সিনার হাতে এর বিকাশ ঘটে। তবে প্রথম যুক্তিকে প্রণোদনা দিয়ে উমাইয়ারা নিজেদের শাসনকে জায়েজ করার চেষ্টা করে, আর দ্বিতীয় পক্ষ ক্রমেই গ্রিক দর্শনের দিকে ঝুঁকে বস্তুবাদদের দিকে এগিয়ে যায়। দার্শনিক ইবনে রুশ্দ এই তর্কের একটা সমন্বয়ের চেষ্টা করেন। তবে এই তর্কের ভেতর দিয়ে সুফি দর্শনও আর নিপাট সর্ব ঈশরবাদে থাকেনি। এই ধারার সুফি সাধক আবু সাঈদ আবুল খায়ের। তার ভেতর রুশদের ওই দ্বন্দ্ব ও সমন্বয় চেষ্টা আছে। তার কিংবদন্তিতেও এর নজির পাওয়া যায়।

যেমন ১০৩৭ সালের নিশাপুরে তার সমসাময়িক আরেক দার্শনিক ইবন সিনার সঙ্গে দর্শন ও রহস্য নিয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাহাসে পরিণত হয়। ইবন সিনা যেমন বলেছিলেন, ‘আমি যা কিছু জানি, তিনি দেখেন।’ এতে আবু সাঈদের উপস্থাপন হচ্ছে, ‘আমরা যা কিছু দেখি, তিনি জানেন।’

প্রথম জীবনে আবু সাঈদ আমিত্বকে অস্বীকার করে সব প্রকার জনসংযোগ এড়িয়ে চলতেন। দুনিয়াদারির সঙ্গে সব বন্ধন ছিন্ন করে চলতেন। শরীরকে কষ্ট দিয়ে হলেও সারা রাত প্রার্থনা, দীর্ঘ উপবাস, আত্মবিনাশ ও সংহতির স্থান ভ্রমণ, মাসাধিক কাল মরুতে একা অবস্থান করতেন। এমনকি মসজিদ মোছা, দারিদ্র্যতার জন্য রাস্তায় ভিক্ষা পর্যন্ত করছেন। এজন্য তিনি ‘সিলা-য়ে মা কুসা’ নামে পরিচিত হন। পরবর্তী সময় তপস্বী জীবনে আবু সাঈদ প্রায় সুলতান তুল্য আড়ম্বর যাপন করেন। আউফি হিসেবে তিনি দামি খাবার গ্রহণ, বিপুল খরচে বিনোদনের আয়োজন করতেন। তখন অধিকাংশ সময় কেটে যেত কবিতা ও সংগীত শুনে। এই সময় সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে গান, নৃত্য ও কান্না ভরা সুফি ‘সামা’ আয়োজন করতেন। বিশেষ করে নৃত্যমগ্ন ব্যক্তি যখন তন্ময়তার ভেতর শরীরের জামা উপড়ে টুকরো টুকরো করে চারপাশে ছড়িয়ে দিতেন, তখন তিনি পুলক বোধ করতেন।

আবুল খায়ের তপস্যার জীবন শুরু হয় নিশাপুরে। কোরআন শিক্ষক আবদুল রহমানের কাছে তিনি পাঠ নিচ্ছেন। তখন এক ঘটনা ঘটে। একজন লোক সেখানে এসে আবুল খায়েরকে সালাম দিয়ে বললেন—

‘এখানে আমি একজন আগন্তুক। পথে আসতে আসতে সারা শহরে আপনার খ্যাতি দেখলাম। তারা বলছিলেন, আপনি অলৌকিক ক্ষমতায় পূর্ণ একজন মানুষ, যা অপ্রকাশ্য নয়। তো আমাকে সে রকম কিছু দেখান এখন।’

আবু সাঈদ উত্তর দিলেন, ‘আমি যখন আবুল আব্বাসের সঙ্গে আমুল এলাকায় ছিলাম, কেউ একজন আপনার মতোই আদেশ ও চাওয়া নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, তুমি যা দেখছ তা অলৌকিক নয়? একজন কসাইয়ের ছেলে, যার বাবা তাকে নিজের ব্যবসা শিখিয়েছেন, তার একটি লক্ষ্য হচ্ছে পরমাহ্লাদিত করা। এ লক্ষ্য তাকে বাগদাদ শহরে নিয়ে শায়ক শিবলীর কাছে পেশ করছে, তারপর বাগদাদ থেকে মক্কা, মক্কা থেকে মদিনা, মদিনা থেকে জেরুজালেম চলে গেছে, যেখানে তার জন্য কাদির অপেক্ষা করছিল। খোদাতালা কাদিরের হূদয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহণের কথা স্থাপন করে দিয়েছিলেন। তারপর সে এখানে ফিরে আসে। এখন দলে দলে লোক তার কাছে আসছে, শুঁড়িখানা থেকে ফিরছে, পাপাচার ত্যাগ করছে, অনুতাপের প্রতিজ্ঞা করছে, সম্পদ বিলিয়ে দিচ্ছে। ভালোবাসায় জ্বলন্ত হূদয় নিয়ে তারা দুনিয়ার শেষ প্রান্ত থেকে আমার কাছে আসছে খোদাকে চাইতে। এর থেকে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে?’

তারপর লোকটা সেই মুহূর্তে আবুল আব্বাসের কাছে অলৌকিক কিছু দেখতে চাইল। আব্বাস তার আগ্রহের কেন্দ্র বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, এটা কি বিস্ময়কর নয় যে একজন বকরি হত্যাকারীর সন্তান ক্ষমতায় বসে আছে, তবু দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছে না, এই দেয়াল তার ওপর পড়ছে না, এই ভেঙে পড়ছে না। পোশাক-পরিচ্ছদ ছাড়াই সে বৈরাগ্য গ্রহণ করে, কোনো জনসমর্থন ছাড়াই তিনি রুটি আহার করেন, মানুষকে খাওয়ান। এসব কি অলৌকিক নয়?’

আগন্তুক ব্যক্তি আবু সাঈদ ও আবুল আব্বাসের ঘটনার সাদৃশ্য স্বীকার করল। বলল, ‘আমি তোমাকে অলৌকিকের কথা বললাম আর তুমি কেবল শায়ক আবুল আব্বাসের কথাই বললে।’ আবু সাঈদ বললেন, ‘যে কেউ দাতাকে (করিম) অন্তরে ধারণা করে, তার সব ক্রিয়াই তখন উপহার (কেরামতি)।’ তারপর মৃদু হেসে একটা শ্লোক আবৃত্তি করলেন—

‘বুখারা অঞ্চল থেকে আমার কাছে যে বাতাস আসে

নিঃশ্বাসে গোলাপ ও কস্তূরী এবং জেসমিনের ঘ্রাণ ছড়ায়

সব নর-নারী এই প্রবাহমান বাতাসকে ভাবে—

এটা নিশ্চয় খোটেন থেকে বইছে,

বস্তুত খোটেন থেকে এমন সুস্বাদু সমীরণ বহে না

এই বাতাস কেবল ভালোবাসার উপস্থিতি থেকে আসে

প্রতি রাত আমি ইয়েমেনের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং যেখানে তুমি জাগ্রত

যেখানে তুমি শিল্প সুহায়েল, সুহায়েল ইয়েমেনে জাগে

একজনকে ভালোবাস! আমি সবার থেকে তোমাকে লুকাই

এ কারণে যে, তোমার নাম কোনো লোককথা থেকে আসেনি

তোমার নামই প্রথম শব্দ হিসেবে আমার ঠোঁটে উঠে আসে।’

 

এ রকম আরেকটি ঘটনায় আবু সাঈদের মজেজা বোঝা যেতে পারে। তারা বলেন, ‘অমুক তো পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যায়।’ তিনি বলেন, ‘এটা যথেষ্ট সহজ। ব্যাঙ ও জলচর পাখি এটা করে।’ তারা বলেন, ‘অমুক তো বাতাসে ওড়েন।’ ‘পাখি ও পতঙ্গরা তো তা-ই করে।’ তিনি উত্তর দেন। তারা বলেন, ‘অমুক তো এক মুহূর্তে এই শহর থেকে আরেক শহরে যায়।’ ‘শয়তান এক মুহূর্তেই পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে পারে’, তিনি যোগ করেন, ‘এর মধ্যে কোনো মহামূল্য নেই।’ এর মধ্য দিয়ে আবুল খায়ের আসলে সত্যের সংজ্ঞা দিয়ে দিয়েছেন—একজন, যে কিনা তার চারপাশের অন্য সব প্রাণীর সঙ্গে মিত্রসূলভ মেলামেশা করে, অথচ তা সত্ত্বেও খোদার কথা কখনো বিস্মৃত হয় না।

অনেক মুনিঋষির মতো তার প্রচলিত কিংবদন্তি অধিকাংশই ‘ফিরাসা’র (আত্মার গোপন ক্ষমতা) ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একে আজকের দিনে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে দাঁড় করার চেষ্টা করানো কঠিন হবে। তবে এগুলো তাদের বিস্তার ও শিষ্য তৈরিতে ভূমিকা রেখে। একবার শহরের এক দর্জি ও তার চরণদার (সেলাই সহযোগী) মনে করলেন আবু সাঈদ একজন ভণ্ড এবং তিনি ঐশ্বয়িক ক্ষমতার ভান ধরে আছেন। তারা একটা পরীক্ষা নিতে চাইলেন, তিনি যদি প্রথম পরিচয়ে তাদের পদবি ধরতে পারেন, তাহলে বুঝবেন তার দাবি সঠিক। সে মতে তারা আবু সাঈদের আশ্রমে উপস্থিত হলেন। শায়খ তাদের ওপর প্রথম চোখ পড়তেই বললেন—

কোনো সন্দেহ নেই দুজনই কারিগর

একজন দর্জি, আরেকজন চরণদার

দর্জিকে লক্ষ্য করে: এইজন রাজপুত্রের জন্য গ্রাউন তৈরি করে

চরণদারকে লক্ষ্য করে: এইজন কেবল রাজপুত্রের জামায় সুতা লাগান।

বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা আবু সাঈদের পায়ে লুটিয়ে পড়ল এবং অবিশ্বাসের জন্য ক্ষমা চাইল। যথারীতি তারা আনুগত্যও মেনে নিল। সচেতন পাঠকের মনে আছে নিশ্চয়, এমন ঘটনা নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারেও ঘটেছিল।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো কিংবদন্তির সবই লোকমুখে প্রচারিত। একে কথক বা কর্তার কাছ থেকে যাচাই করা সম্ভব নয়। এই কিংবদন্তি ছাড়া আবার তাদের দর্শন বোঝাও সহজ নয়। প্রহেলিকা মনে হলেও এগুলোই তাদের জীবন্ত রাখে। তার চেয়ে বড় কথা এগুলো প্রায় সর্বজনীন। যে কারণে বসরা বা বাগদাদের কাহিনীর সঙ্গে সিলেটের শাহজালাল-শাহ পরান, ফরিদপুরের খিজির ফকির কিংবা ঢাকার দোহারের শানাল শাহের কিংবদন্তির তেমন পার্থক্য নেই স্থানিকতা ছাড়া। তবে এগুলো বাগদাদ-পারস্য থেকে ভারতে দিল্লিতে নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা যথেষ্ট সুযোগ আছে।

নিশাপুরে ঈশি নিলি নামে সম্ভ্রান্ত এক তপস্বী নারী ছিলেন। তার অর্থের জন্য ওই এলাকার অনেকেই তার আশীর্বাদ আশা করতেন। একবার তিনি শুনলেন ওই শহরে মাইহানের প্রখ্যাত সাধক আবু সাঈদ আশ্রম করেছেন। তিনি খাস সেবিকাকে পাঠালেন সেখানে কী বয়ান করা হয় শুনে আসতে। কিন্তু ফিরে এসে সেবিকা বললেন, সেখানে গিয়ে তিনি তেমন কিছুই শোনেননি মদ্যাসক্তি নিয়ে এক কবিতা ছাড়া। তপস্বী তাকে বললেন, এখনই তোমার মুখ ধুয়ে এসো, সেখানে কি এমন কিছু বলে!’

এক রাতে ভীষণ স্বপ্ন দেখে জেগে তপস্বী ঈশি প্রচণ্ড চক্ষুপ্রদাহ অনুভব করলেন। বিশটি দিন ও রাত তিনি এই যন্ত্রণা ভোগ করলেন। তারপর এক রাতে শুতে যাওয়ার আগে শপথ করলেন, তার চক্ষুপ্রদাহ যদি কমে যায়, তাহলে তিনি আবু সাঈদকে সন্তুষ্ট করবেন। পরের দিনই আশ্চর্য ফল পাওয়া গেল। তিনি হাজার দিরহাম শায়খের আশ্রমে পাঠিয়ে দিলেন। খাস সেবিকা আশ্রমে পৌঁছে দেখলেন, শায়খ তখন সেদিনে প্রাত বয়ান শেষে মেসওয়াক হাতে নিয়েছেন। আবু সাঈদ তার একটা মেসওয়াক খাস সেবিকাকে দিয়ে বললেন, এটা দিয়ে তার মুনিবাকে চোখ চকলে ধোয়ার জন্য। সেই সঙ্গে তার হূদয়ে সব উদ্বেগ ও অস্বস্তিবোধ সুফির দরবারে পাঠিয়ে দিতে। তাহলে তার চোখ ভালো হয়ে যাবে। তপস্বী ঈশি সেই মেসওয়াক ভেজান পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে উপশম বোধ করলেন। পরদিন সকালে তিনি সব অলংকার ও গহনা শায়খের কাছে দিয়ে বললেন, ‘আমার পুনসংস্কার হয়েছে এবং আমার সব অস্বস্তি আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। এবার আমাকে আপনার আশীর্বাদপুষ্ট করুন।’ এই নারীকে তিনি স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। পরবর্তী সময় এই নারী তার সব সম্পদ ত্যাগ করে তপস্বী হয়েছেন এবং সুফিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

মৃত্যুর পর আবু সাঈদের নামে তিনটি আশ্রম পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেন তার শিষ্যরা। এর মধ্যে আবু নাসর সারবানি প্রতিষ্ঠা করেন কাউকাসাস পাহাড়ের দক্ষিণে সারবান এলাকায়, ১০৮০ সালের দিকে নেসার নিকটবর্তী বাসকানে করেন আবু আমর বাসকানি এবং আবিল সাঈদের সুফি দর্শনে অনুগত হয়ে ধর্নাঢ্য মুহাম্মদ সোকানী প্রতিষ্ঠা করেন সারাক এলাকার পশ্চিমে সোকান এলাকায়। তবে উমাইয়া শাসন আমলেই ১১৫৪ সালে খোরাসান অধিকারের সময় মেহানায় তার দরগা এবং নিশাপুর আশ্রম ধ্বংস করে দেয়া হয়। এমনকি মেহানায় তার পরিবারের ১১৫ সদস্যকে পিটিয়ে মৃত্যুর দিকে পাঠিয়ে দেয় তারা। তার কবিতা যেমন আছে—

‘যখন আমি সিংহ ছিলাম, চিতা ছিল শিকার

আমি সবকিছু ধরি যা কিছু চাই আমার,

যখন আমি তোমার প্রেমে বাঁধা পড়ি শক্ত করে

এক খোঁড়া শেয়াল আমকে গুহা থেকে বের করে।’

একবার আবু সাঈদ দেখলেন তার বিরুদ্ধে কিছু লোকপ্রচার তৈরি হয়েছে। একদিন তিনি অনুচর আবদুল করিমকে নিমন্ত্রণ দিলেন এবং সে কী করছেন তার খোঁজখবর নিলেন। আবদুল করিম জানালেন, তার গুরুকে যারা চায় এমন কিছু বুজুর্গকে তিনি গুরুর পক্ষে চিঠি লিখছেন।’ শায়খ বললেন, ‘ও আবদুল করিম, তুমি পত্র লেখক হইয়ো না, এমন একজন হও যে পত্রই তোমার হয়ে কথা বলবে।’

আদৌতে আবু সাঈদ প্রচলিত বুজুর্গপনার ওপর গোপন ও অচেনা মাহাত্ম আরোপ করেছেন। লোকে তাকে চিনত—যিনি খোদাপ্রীতিকে প্রতিপন্ন করেছেন এবং পরে তিনি খোদাকে ভালোবেসেছেন। তিনি লেখেন—

সবকিছু তোমার সৌন্দর্য দেখি, যখন আমি চোখ খুলি;

আমার সমস্ত শরীর হূদয় হয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলে।

আমার মনে হয় এক কথা আর কাউকে না বলাই ঠিক,

যখন তোমাকে বলতে শুরু করি, দীর্ঘ কথায় চলে।’

 

তথ্য সূত্র:

১.   Studies in Islamic Myaticism, R. A. Nicholson

2.   The Heritage of Sumism, V-1, Ed. Leonard Lewisohn, One World publication, Oxford, 83-136 p

3.   Abu Said Abi©l Kayr, Encyclopedia Iranica. www.iranicaonline.org

৪. পারস্য প্রতিভা (অখণ্ড), মোহাম্মদ রকততুল্লাহ, বাংলা একাডেমি, জুন ২০১৮

 

অলাত এহ্সান: গল্পকার, প্রাবন্ধিক।