[পেশোয়ারের ফল ব্যবসায়ী ও ফল বাগানের মালিক লালা গোলাম সারওয়ারের পুত্র মুহাম্মদ ইউসুফ খান (জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯২২-মৃত্যু ৭ জুলাই ২০২১) বাবার ব্যবসার দিকে একটুও আকৃষ্ট হলেন না। চলে এলেন বোম্বে, আজকের মুম্বাই শহরে। হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নায়ক দিলীপ কুমার। তার আত্মজীবনী দ্য সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড শ্যাডো: অ্যান অটোবায়োগ্রাফি থেকে পেশোয়ার স্মৃতির একাংশ অনূদিত হলো]
উত্তর-পশ্চিম
সীমান্ত প্রদেশের
প্রধান শহর
পেশোয়ারে আমার
জন্ম, ইতিহাস
বিভিন্ন নামে
এ শহরটিকে
ডেকেছে: কখনো
সিটি অব
ফ্লাওয়ার্স, কখনো
ভারতবর্ষের শস্য
শহর, আবার
কখনো লোটাস
ল্যান্ড বা
পদ্মভূমি। যে
পেশোয়ারে আমার
জন্ম তা
ছিল ভারতের
অংশ...সেই
শহর নিয়ে
আমার গর্বের
শেষ নেই।
এখনকার পাকিস্তানে
আমার জন্মশহর
পেশোয়ারের একজন
শুভানুধ্যায়ীর লেখা
একটি চিঠি
১৯৮৮-এর
গোড়ার দিকে
আমার হাতে
আসে। তিনি
লিখেছেন শহরটির
নির্মাণগত সব
উন্নতির পরও
এখানে কোনো
ব্লাড ব্যাংক
নেই, যা
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত
রোগীদের এ
অত্যাবশ্যকীয় তরলটি
সরবরাহ করতে
পারবে; এবারই
প্রথম একটি
সামাজিক সংস্থা
রক্তদান কেন্দ্র
এবং একটি
ব্লাড ব্যাংক
স্থাপনে উদ্যোগী
হয়েছে। রক্তের
বিভিন্ন ধরনের
সমস্যায় আক্রান্ত
রোগীদের সেবায়
তা কাজে
লাগবে। আমি
সুবিধামতো সময়ে
একবার পেশোয়ার
এসে এই
ব্লাড ব্যাংক
সেবার উদ্বোধন
করে যেতে
পারব কি
না আমার
শুভ্যানুধ্যায়ী তা-ই
জানতে চেয়েছেন।
আমি নিমন্ত্রণ
গ্রহণ করি
এবং এটা
জেনে বিস্মিত
হই যে
আমার নিমন্ত্রণ
গ্রহণের বিষয়টি
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট
জেনারেল মুহাম্মদ
জিয়াউল হক
জানতে পেরেছেন
এবং আমাকে
আতিথ্য প্রদানের
সিদ্ধান্ত নিয়ে
আমাকে রাষ্ট্রীয়
অতিথি হওয়ার
জন্য পত্র
দেয়া হচ্ছে।
একটি ব্লাড
ব্যাংক উদ্বোধনের
দাওয়াতের প্রেক্ষিতে
ব্যক্তিগত একটি
সফর বিশাল
ব্যাপারে পরিণত
হতে যাচ্ছে
একজন ভারতীয়
অতিথির জন্য।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট
একে রাষ্ট্রীয়
সফর বলে
ঘোষণা দিয়েছেন।
এটা আমার
জন্য আতঙ্কেরও,
আবার খুব
সাধারণ কারণে
মাথা নুইয়ে
ফেলার মতো
ব্যাপার। আমি
নিজেকে কখনো
একজন পরিশ্রমী
অভিনেতা ছাড়া
আর কিছু
ভাবিনি। কঠোর
পরিশ্রম আর
ভাগ্যগুণে যে
শীর্ষে উঠেছে,
আমি এমনই
একজন। এই
সম্মানের যোগ্য
হতে রাষ্ট্রপ্রধান
কিংবা ভারত
সরকারের দূত
আমি নই।
আমি যখন
সফরের মানসিক
প্রস্তুতি নিচ্ছি
আমার অন্তরের
চোখের সামনে
লাইন ধরে
যাওয়া স্মৃতির
ক্যারাভানে ডুবে
থাকি। আমাদের
বাড়িটার এবং
তার চারপাশের
শব্দ ও
গন্ধ, বন্ধু
এবং পরিবারের
সদস্যদের মুখ
মন্দিরের ঘণ্টার
প্রতিধ্বনি, সন্ধ্যার
আলোছায়ার সন্ধিক্ষণে
কাছের মসজিদ
থেকে ভেসে
আসা ভরাট
কণ্ঠের আজান,
আমার দাদির
নির্দেশ, শীতের
হিম-গ্রীষ্মের
উষ্ণতা—সব
আমার চেতনায়
ফিরে আসছে।
সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধানরা
যে সম্মান
পেয়ে থাকেন,
তেমন সম্মান
নিয়ে একটি
রাষ্ট্রীয় সফরের
যে আনন্দ
তা আমার
মা এবং
আঘাজির সঙ্গে
ভাগ করতে
না পারার
যাতনা আমি
অনুভব করতে
থাকি। আমি
যেন অর্ডার
অব ব্রিটিশ
এম্পায়ার খেতাব
পেয়েছি, আঘাজি
নিশ্চয়ই খুব
গর্ব বোধ
করতেন।
১৯৮৮-এর
এপ্রিলে আমরা
করাচি পৌঁছব।
আমাদের যাত্রার
আগে শুনতে
পেলাম আমার
প্রথম পাকিস্তান
সফরে পিআইএর
ফ্লাইটটি কে
পরিচালনা করবেন
তা নিয়ে
পাইলটদের মধ্যে
প্রতিযোগিতা শুরু
হয়েছে। আমাকে
এবং আমার
সফরসঙ্গীদের বহন
করতে পেরে
উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন
ও তার
ক্রুরা কতটা
গর্বিত, ক্যাপ্টেন
তার উদ্বেলিত
কণ্ঠে মাইক্রোফোনে
তা জানালেন।
এ যাত্রাকে
তিনি বললেন
ঐতিহাসিক সফর।
উড়োজাহাজ যখন
ভারত সীমান্ত
অতিক্রম করে
পাকিস্তানে প্রবেশ
করছে, ক্যাপ্টেনের
স্বরে আবার
গর্ব ও
আনন্দের আভাস।
বললেন, আমাকে
পরিবহনের সুযোগ
পাওয়া পিআইএর
জন্য সম্মানের
বিষয়।
স্পষ্টতই আমার সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল পাকিস্তানিদের জন্য। আনন্দ, উত্তেজনা এবং উৎসবের বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ আমার জন্ম শহর পেশোয়ার এখন তাদের দেশের একটি শহর। ন্যাড়া মাথা, বেঢপ চেহারার যে ইউসুফ ১৯৩০ দশকের মধ্যভাগে আঘাজি মোহাম্মদ সারওয়ার খানের সঙ্গে দিল্লি চলে এসেছিল এখন কঠোর পরিশ্রমে কিছু সম্মান উপার্জন করে অভিনেতা দিলীপ কুমার হয়ে সেখানে ফিরে যাচ্ছে। এতে পেশোয়ার ও পাকিস্তানের জনগণ এক ধরনের সহজাত গর্ব অনুভব করছে। তাদের দিক থেকে এটাই স্বাভাবিক। আমার দিক থেকে তা অতীত পুনরুদ্ধার যা বোম্বেতে আমার পেশাগত ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় অনেকটাই মলিন হয়ে গেছে—বোম্বেতে বেড়ে উঠেছে আমার মূল ও মূলের শাখা-প্রশাখা।
২ এপ্রিল
১৯৮৮। বরাবরই
যে একান্ত
আমার সেইজন
সায়রা, ক’জন
ঘনিষ্ঠ বন্ধু
পরিবারের সদস্য
ও পরিচারক
এবং একজন
ক্যামেরা ক্রু
নিয়ে করাচির
উদ্দেশে আমাদের
যাত্রা। আমরা
যখন করাচি
এয়ারপোর্টে অবতরণ
করি কী
যে এক
বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা।
তারপর প্রতিটি
দিন আমরা
মোটরক্যাডে যখনই
বেরিয়ে গন্তব্যে
পৌঁছতে ঘণ্টার
পর ঘণ্টা
লেগে যেত।
কারণ উদ্দীপিত
জনতা নিরাপত্তা
ব্যারিকেড ভেঙে
সবচেয়ে কম
দূরত্বের পথ
দিয়ে আমাদের
খোলা গাড়ির
কাছে চলে
আসত। ভালোবাসা
ও শ্রদ্ধার
অবিস্মরণীয় এ
অভিজ্ঞতা আমার
এবং আমার
সফরসঙ্গী সবার।
আমার ভাই
আহসান কেঁদে
ফেলেছে।
আমাদের এ
ট্রিপটি ছিল
বিরামহীন ব্যস্ততার
এবং ক্লান্তির—এত
গ্র্যান্ড স্টেট
ফাংশন জিয়া
সাহেব (প্রেসিডেন্ট
জেনারেল জিয়াউল
হক নিজে
সেখানে হোস্ট,
সঙ্গে ডিনার-লাঞ্চ,
চা-নাশতা,
পুরনো পরিচিত
এবং এখন
বিখ্যাত এমন
সব স্থানে
গমন—আমার
বাড়ি কিসসাখানি
বাজার, আমার
কাজিন ও
তাদের পরিবারের
সঙ্গে মোলাকাত,
ছাপা গণমাধ্যম
আর ইলেকট্রনিক
গণমাধ্যমের সঙ্গে
ছোটবড় অনেক
সাক্ষাত্কার, স্কুলজীবনের
বন্ধুদের সঙ্গে
কোলাকুলি, গলাগলি—তারা
খুশি যে
আমি তাদের
নাম ভুলিনি,
এমনকি তাদের
সেইসব কৌতুককর
আচরণগুলোও মনে
রেখেছি। যে
কারণে আমি
অন্তরের গভীরেও
খুশি যে
আমার পেশোয়ার
সফরের একটি
মহৎ উদ্দেশ্যও
ছিল—ফাতিমিদ
ফাউন্ডেশনের রক্তদান
কেন্দ্র ও
ব্লাড ব্যাংকের
উদ্বোধন। আমার
জন্য হূদয়
উষ্ণ করা
আরো বড়
ব্যাপারটি ছিল
জনতার স্পষ্ট
ও উচ্চকণ্ঠ
সাড়া—যখন
আমি তাদের
উদ্দেশ্যে কথা
বলেছি আমি
সেদিনের দৃশ্য
কল্পনা করেছি
যখন দুই
দেশের মধ্যে
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক
হবে এবং
উভয় দেশের
মঙ্গলসাধনের জন্যই
ফলবান ও
উৎপাদনমুখী বাণিজ্যিক
সম্পর্ক সৃষ্টি
হবে।
বিস্মিত হওয়ার
মতো বদলে
যায়নি পেশোয়ার।
আমাদের পুরনো
বাড়ি যেমন
ছিল তেমনই
আছে, রাস্তার
দুই পাশের
বাড়িঘরগুলোও তাই।
সেই বাজার
ক্ষুধা উদ্রেক
করা গন্ধ
ও চাপলি
কাবাবের হিসহিস
শব্দে ম
ম করছে।
আমার সঙ্গীরা
সবাই চায়ের
দোকানে গরম
সুগন্ধ ভরা
চা পান
করার জন্য
নামল; দোকানদার
তার পূর্বসূরিদের
মতোই খদ্দেরবান্ধব।
দুধ মেশানো
হোক কি
দুধ ছাড়া
‘খাওয়া’ই
হোক কড়া
সুঘ্রাণ তার
থাকবেই। আমি
যেসব পুরনো
জায়গা অতিক্রম
করে যাচ্ছি
তার কোনোটারই
তেমন পরিবর্তন
হয়নি। কেবল
এখানে ওখানে
কিছু দালান
উঠেছে। তবে
অন্যত্র এ
শহর যে
আধুনিক স্থাপত্য
প্রভাবকে স্বাগত
জানিয়েছে তা
নিশ্চিত করেছে।
আমি বোম্বে
ফিরে এসে
দুঃসংবাদটি শুনলাম
আমার প্রিয়
বন্ধু রাজ
(কাপুর) দিল্লির
হাসপাতালে। খবরটি
আমাকে সম্পূর্ণভাবে
বিধ্বস্ত করে
ফেলল, পেশোয়ার
থেকে আমন্ত্রণ
আসার পর
আমি তার
সঙ্গে কথা
বলেছি, করাচি
যাওয়ার আগে
কথা বলেছি।
আমি অ্যাপোলো
হাসপাতালে তাকে
দেখতে দিল্লি
রওনা হলাম।
আমি আল্লাহর
কাছে প্রার্থনা
করলাম তিনি
যেন রাজকে
আমাদের কাছ
থেকে নিয়ে
না যান।
রাজ ২
জুন ১৯৮৮
আমাদের ছেড়ে
চলে যায়।
দ্বিতীয় সফর
১৯৯৮-এর
মার্চের শেষভাগে
পাকিস্তানের সর্বোচ্চ
বেসামরিক সম্মান
নিশান-ই-ইমতিয়াজ
খেতাব গ্রহণের
জন্য আমি
দ্বিতীয়বার পাকিস্তান
সফরে যাই,
নিশান-ই-ইমতিয়াজ
মানে শ্রেষ্ঠত্বের
সম্মান—ব্রিটেন
অর্ডার অব
ব্রিটিশ এম্পায়ার
কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের
প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল
ফর ফ্রিডমের
মতো—কেবল
পাকিস্তানেই সীমিত
নয়। আমার
এ স্বীকৃতিতে
বিতর্কের ঝড়
তুললেন শিব
সেনাপ্রধান বালাসাহেব
থ্যাকারে (তিনি
পাকিস্তানবিরোধী ভূমিকার
জন্য পরিচিত)।
পরোক্ষভাবে তিনি
অকারণে আমার
সততা ও
দেশেপ্রেম নিয়েও
প্রশ্ন তুললেন,
আমি খুব
আহত বোধ
করলাম। আমি
তখনকার ভারতীয়
প্রধানমন্ত্রী অটল
বিহারি বাজপেয়ির
পরামর্শ চাইলাম।
তিনি স্পষ্টভাবে
ঘোষণা করলেন
আমাকে এ
খেতাব গ্রহণ
করতে হবে।
সুললিত ভাষায়
তিনি বললেন,
‘আপনি
একজন শিল্পী,
সুতরাং রাজনৈতিক
বা ভৌগোলিক
সীমান্তে আপনি
বাধা নন।
আপনি মানবতার
জন্য যে
কাজ করেছেন
সেজন্য আপনাকে
বেছে নিয়েছে।
দুই দেশের
মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে
আপনার ভূমিকার
কথা সুবিদিত।’
আমি যদি
সে সময়
পুরস্কার প্রত্যাখ্যান
করতাম, সে
সময় এ
পুরস্কারের কোনো
রাজনৈতিক বা
সাম্প্রতিক গুরুত্ব
ছিল না—আমার
প্রত্যাখ্যানে দুই
দেশের সম্পর্ক
আরো তিতকুটে
হয়ে উঠত,
দুই দেশের
মধ্যে বৈরিতার
অনুভূতি বাড়িয়ে
দিত।
এ কাহিনী
একটি আনন্দদায়ক
অংশের কথা
তো আমাকে
বলতেই হবে,
আমার প্রিয়
বন্ধু সুনীল
দত্ত (বিখ্যাত
চিত্র নির্মাতা,
অভিনেতা, সংসদ
সদস্য, মন্ত্রী
এবং মানবতার
জন্য কাজে
খ্যাতিমান) আমার
বাড়িতে এসে
বললেন, আমার
খেতাব গ্রহণের
সাক্ষী হতে
তিনি আমার
সঙ্গে পাকিস্তান
যেতে চান।
এ প্রস্তাবে
খুশির চেয়েও
বেশি কিছু
হওয়ার থাকলে
আমি তা-ই
হয়েছি। আমরা
সম্মত হই
যে সফরের
একটি পর্যায়
পর্যন্ত আমরা
একসঙ্গে থাকব।
তারপর সুনীল
চলে যাবে
তার জন্মভূমি
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে
চোতালা ঘুরে
আসতে। সে
সময়টা আমি
থাকব পেশোয়ারে।
আমার এই
সফরের সময়
লাহোরে পাকিস্তানি
ক্রিকেটার ইমরান
খানের মা
শওকত খানুমের
নামে ক্যান্সার
রোগীদের জন্য
প্রতিষ্ঠিত শওকত
খানুম মেমোরিয়াল
ট্রাস্ট হাসপাতালও
উদ্বোধন করি।
বালাসাহেব থ্যাকারেকে আমি ১৯৬৬ সালে তার শিব সেনা আন্দোলনে যোগ দেয়ার আগে থেকেই চিনি। আমি অপ্রীতিকর কোনো স্মৃতি ধরে রাখতে চাই না, বালাসাহেব থ্যাকারে আর নেই (১৭ নভেম্বর ২০১২ মারা যান), আমরা বিভেদ ভুলে যাই এবং নিজেদের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করি।





