সং অব প্রোটেস্ট—নেরুদার লেখা প্রতিবাদের কবিতা ঔপনিবেশিক লাতিন আমেরিকায়, স্বৈরশাসনের নিষ্পেষণের বলি প্রতিটি দেশে পঠিত হয়েছে, গীত হয়েছে। বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছে।

পাবলো নেরুদা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন চিলি, আর্জেন্টিনা, নিকারাগুয়া, ভেনিজুয়েলা, গুয়াতেমালা, এল সালভাদরে—সর্বত্র।

১৯৬০ সালে প্রকাশিত প্রতিবাদের গানের ভূমিকায় নেরুদা লিখেছেন—

আমি কসম খেয়ে বলছি, আমার কবিতা মর্যাদাহীন মানুষের মর্যাদার গান গাইবে, আশাহীনের আশার গান, অনাচারের ভুবনে ন্যায়বিচারের গান, শোষণের বিরুদ্ধে সাম্যের গান, মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের গান গেয়ে যাবে এবং যারা লড়াই করছেন, তাদের সৌভ্রাতৃত্বের গান গাইবে।

ইংরেজি অনুবাদ থেকে কয়েকটি কবিতা বাংলায় ভাষান্তরিত হলো—

 

বিশ্বাসঘাতক মারা গেছে

 

বিশ্বাসঘাতকের নাম ছিল সমোজা

ভাড়াটে সেপাই, স্বৈরাচার, ঘাতক।

আমি বলেছি তার নাম ‘ছিল’—কারণ একদিন

বজ্রাঘাত তাকে দেয়ালে পেরেকবিদ্ধ করল।

 

নিকারাগুয়া আত্মত্যাগ কী তা জানে

নিকারাগুয়ার আত্মার ওপর আরোপিত আছর

সেখানে তার নেতারা ভুঁড়স্ফীিত লোভী

কলমে লিখে আর ছুঁচোর কণ্ঠে যখন

তাকে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করে

গ্রহের সাথে তুলনা করে

ভোরের গোলাপি অস্ত্রের সাথে তুলনা করে

তখন তার তস্কর হাত ও অসংযত আঙুল

নিকারুগুয়ার টুঁটি চেপে ধরে রেখেছে।

 

দুঃসাহসী রিগোবার্তো লোপেজ এলেন

দেখলেন সমোজা তার ফুর্তিতে মত্ত

দ্রুত কিছু ক্ষুব্ধ গুলি বিস্ফোরণ

তার জীবনের বাকিটুকু এখানেই ছেঁটে দিল

এভাবেই আছড়ে পড়ল ঝাঁজরা উদর

নিকারাগুয়ার মৃত সম্মান ফেরানো হলো

যে বীর গুলি ছুড়েছিল, নিহত সেখানেই

সে তার মুষ্ঠি দিয়ে নিয়তি গড়েছে।

তার বীরত্বের কীর্তি ছিল তার মৃত্যুর বীজ!

তার নামের সম্মানে হোক বৈশ্বিক নামগান।

 

[কবি রিগোবার্তো লোপেজ পেরেজ ১৯৫৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নিকারাগুয়ার স্বৈরাচারী শাসক আনাস্তাসিয়ো সমোজা গার্সিয়াকে ক্ষমতাসীন অবস্থায় গুলি করেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কয়েক দিন পর পানামা ক্যানাল জোন হাসপাতালে মৃত্যু ঘটে এ স্বৈরশাসকের।

সমোজা (১ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৬-২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬) দীর্ঘদিন দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে দেশে-বিদেশে নিন্দিত।

কবি ও বিপ্লবী রিগোবার্তো লোপেজ পেরেজ (জন্ম ১৩ মে ১৯২৯-মৃত্যু ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬) সমোজাকে গুলি করার পর পরই সমোজা প্রহরীদের গুলিতে সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণ হারান লোপেজ। রিগোবার্তো সমোজা পরিবারের শাসনের অবসান ঘটালে নিকারাগুয়ার জাতীয় বীর হিসেবে সমাদৃত হন।]

 

রাজাগণ

কিন্তু তাদের পেট থেকে ঝরল

বেরিয়ে এল ছোট সমোজাগণ:

রক্তমাখা দুটো ক্লাউন

নির্মম ব্যাঙ থেকে দুটো ছোট উর্বর ব্যাঙ

পুঁজস্রাবী সমোজার পতন না হতেই

দুটো খেলনা জেনারেল সিংহাসনে এল

হীরার টুকরো দিয়ে নিজেদের শরীর সেলাই করাল

তারপর আজীবন রাষ্ট্রপতি ঘোষিত হলো

সব বড় জোত নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিল।

তারা নব্যধনী হিসেবে নিজেদের তুলে ধরল আর

উত্তর আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের কাছে

নিজেদের বানাল তার প্রিয় লাঠিয়াল।

এভাবেই আমাদের দেশে ইতিহাস তৈরি হয়;

এভাবেই অপরাধ ক্রমেই বেড়ে চলে

এবং একটার পর একটা কুখ্যাত মানুষের নাম টিকে থাকে

সামরিক নির্যাতনের নোংরা জলাশয়ে।

 

[সমোজার পুত্র আনাস্তাসিয়ো সমোজা দেবেলে ও লুই সমোজা দেবেলে নেরুদার কবিতার দুই রক্তমাখা ক্লাউন। বাবা ও দুই পুত্র ৪৪ বছর নিকারাগুয়া শাসন ও লুণ্ঠন করে।]

 

গুয়াতেমালায়

যেমন ছিল সান্দিনোর সময়ে

আমি গুয়াতেমালায় গোলাপ ফুটতে দেখেছি

আমি গরিব মানুষকে জমি প্রতিরক্ষা করতে দেখেছি

মানুষের মুখে ন্যায়বিচার পৌঁছতে দেখেছি

আরবেঞ্জ তার মানুষের মধ্যে মেলে ধরল

তার সূক্ষ্ম ও ক্ষমতাধর হাত

আর স্কুলগুলো ছিল

শস্যাগার—যতদিন না ক্যানেল থেকে

থাবা ছড়াল প্রভাতের পথে।

উত্তর আমেরিকার আগুনে ঘাতক

ডলার ও বোমা ছুড়তে শুরু করল

মৃত্যু বানাল তার জমকালো পোশাক

ইউনাইটেড ফ্রটু দড়ি ছাড়তে থাকল

আর উড়ন্ত অবস্থায় ঘুঘুর মতো

গুয়াতেমালাকে হত্যা করা হলো।

 

[অগাস্তো সান্দিনো নিকারাগুয়ার বিপ্লবী, মার্কিন সেনা উপস্থিতি ও অবরোধবিরোধী; সমোজার গার্ড ফোর্সের হাতে ৩৮ বছর বয়সে নিহত হন।

জ্যাকব আরবেঞ্জ ১৯৩২-৫৪ পর্যন্ত গুয়াতেমালার সামরিক প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নিজের বাথটাবে ডুবে মরেন।

ক্যানেল হচ্ছে পানামা ক্যানেল, মার্কিন হস্তক্ষেপের নৌপথ।]

 

সালভাদরে মৃত্যু

 

সালভাদরে এখনো মৃত্যুর প্যাট্রল চলছে।

মৃত কৃষকের রক্ত

এখনো শুকোয়নি, সময় রক্ত শুকাতে পারে না

বৃষ্টি রক্তের দাগ রাস্তা থেকে মুছতে পারেনি।

মেশিনগানে খুন হয়েছে দেড় হাজার

ঘাতকের নাম ছিল মার্তিনেজ

তখন থেকে সালভাদরের জমিন,

রুটি আর সুরা রক্তের ঘ্রাণ শুষে নিচ্ছে।

 

[ম্যাক্সিমিলিয়ানো হার্নান্দেজ মার্তিনেজ (১৮৮২-১৯৬৬) এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট। ১৯৩২ সালে কৃষক বিদ্রোহ দমন করতে কমপক্ষে ১০ হাজার কৃষককে গুলি করে হত্যা করেন।]

 

ভেনিজুয়েলার জন্য

 

আমি ভেনিজুয়েলাকে ভালোবাসতাম, কিন্তু সে তো সেখানে ছিল না

জীবিত যেসব লাশ ছিল আমি তার মধ্যে খুঁজেছি

আমি তাকে ডেকেছি আবারো ডেকেছি, কেউ সাড়া দেয়নি,

ডুবে যাওয়া জাতি সাড়া দিতে পারেনি,

তবুও মানচিত্র স্বীকার করে নেয়,

তার ভৌগোলিক পান্না রঙ,

তুষার সাদা পাখিসহ পর্বতমালা

একটি নীল আগুন দ্বীপকে রক্ষা করে

পেট্রোলিয়াম জ্বালিয়ে দেয় তার কোমর এবং

সেলাই করে দেহে গেঁথে দেয় স্বর্ণ,

অরিনকো ছিল অসংখ্য অক্ষরে লেখা

সরীসৃপ ও সংবাদ পরিপূর্ণ—আসলে,

আসলে ভেনিজুয়েলা শোনাত ধাতব বস্তুর

রাজধানী—হীরক, খোসা ছাড়ানোর শব্দ এবং

বুনো জন্তু ট্যাপির সিমন বলিভারের সাথে নিঃশ্বাস নেয়

(এক ভদ্রলোক চিলিতে এসে তার বানানরীতি নিয়ে আমাদের পাগল করে তুললেন)। কাজেই আমি সারা পৃথিবী হেঁটে বেড়লাম

আমি বান্ধব ও বৈরী দরজায় টোকা দিলাম

তাদের পালা এলে প্রতিটি জাতি আমার

সফরের বন্দোবস্ত করে দেয়।

শৈশবে আমি যেমন তাদের মানচিত্রে দেখেছি

সবুজ এশিয়ায় মাংসাশী ইংল্যান্ড,

স্পেন উদ্বোধন করছে নিজের দাফন

সুঘ্রাণ ফ্রান্স কোনো রকম নগ্নতা ঢাকা

অনেক পাগলের মাঝে সুইজারল্যান্ড একটি ঘড়ির মতো

জার্মানি গোলন্দাজ চর্চায় ব্যস্ত

রাশিয়া নিজের নাম বদলে নিয়েছে

আর রোমে অবস্থান করে ঈশ্বর ভুগেছেন

আমি যখন ভেনিজুয়েলার অনুসন্ধান করি

খুঁজে না পেয়ে আমার দিন কাটতে থাকে

যতক্ষণ না কারাকাসের পিসন, সালাস এসে

কী ঘটেছে আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন।

 

[মারিয়ানো ফেদেরিকো পিসন সালাস (১৯০১-৬৫) ভেনিজুয়েলার কূটনীতিক, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার বই ‘স্পেনীয় আমেরিকার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: দখল থেকে স্বাধীনতা’।

অরিনকো: লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় নদী। সিমন বলিভার (১৭৮৩-১৮৩০) ঔপনিবেশিক লাতিন আমেরিকার প্রধান নেতা। তাকে সাধারণভাবে মুক্তিদাতা সম্বোধন করা হয়। ভেনিজুয়েলার প্রথম প্রেসিডেন্ট।]

 

 কাল ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জজুড়ে

 

এই রক্তাক্ত সাগরের নিষ্কলুষ যুবক

এ কালের তরুণ কমিউনিস্ট

স্বৈরাচারের রাজত্ব সাফ করতে

তোমরা আরো বেশি সংখ্যায় আসবে

এদিন আমরা সাক্ষাৎ করতে সমর্থ হবো

এবং স্বাধীনতায় আমার কবিতা

আরো একবার তোমাদের মধ্যে গেয়ে উঠবে।

কমরেড, আমি সেই উদযাপনের প্রতীক্ষায় আছি।

 

কালো মানুষের সাথে মৃত্যু

 

নতুন পৃথিবীতে মহাদেশের কালো মানুষ

এতদিনের হারানো কিছু তোমরা নিয়ে এসেছ;

কালো ছাড়া ড্রামের নিঃশ্বাস চলে না

কালো ছাড়া গিটার বাজে না।

আমাদের সবুজ আমেরিকা ছিল নিথর

যতদিন না কালো এক জোড়ের রক্ত ও

মহিমার মৃত্যু উঠে এল আর

তাল গাছের মতো দুলে উঠল।

এত যাতনা সহ্য করার পর

বেতের আঘাতে মৃত্যু মেনে

অরণ্যে শূকর পালন করে

সবচেয়ে ভারী পাথর বহন করে

কাপড়ের পিরামিড স্তূপ ধুয়ে

ওপরতলায় গেলে ঠেলে নামিয়ে

রাস্তায় কেউ না থাকলেও থামিয়ে দিয়ে

থালা নেই চামচও নেই

বেতনের চেয়ে বেশি প্রহার কামিয়ে

চোখের সামনে বোনের বিক্রি হওয়া সহ্য করে

এক শতাব্দী ধরে যাঁতায় ময়দা পিষে

সপ্তাহে কেবল একদিন খেয়ে

সারাক্ষণ ঘোড়ার মতো দৌড়ে

চটির বাক্স চালান দিয়ে

ঝাঁটা ও করাত চালিয়ে

রাস্তা ও পর্বতমালা খনন করে

ক্লান্তিতে শুয়ে মৃত্যু মেনে নিয়ে

তবুও পরদিন সকালে আবার জেগে

যে গান কেউ গাইতে জানে না, সে গান গেয়ে

শরীর ও আত্মা মিশিয়ে গানে টান দিয়ে

আমার হূদয় বলতে চায়

আমার জীবন ও আমার শব্দ ভেঙে

খান খান হয়ে যায়—আমি আর অব্যাহত থাকতে

পারি না, আমি আফ্রিকান করতলের সাথে যেতে চাই,

মহাবৈশ্বিক সংগীতের রক্ষাকর্ত্রী আফ্রিকা

জানালা দিয়ে আমাকে আন্দোলিত করে;

আমি এখন রাস্তায় নাচতে যাচ্ছি

হাভানায় আমার কালো ভাইদের সাথে।