মাতিলদে উরুতিয়া। অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

[বিশ শতকের সর্বাধিক পঠিত কবি চিলির পাবলো নেরুদা (জন্ম ১২ জুলাই ১৯০৪—মৃত্যু ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩)। নিজ দেশে যখন তার বিরুদ্ধে হুলিয়া, নির্বাসিত জীবনে সংগীতশিল্পী মাতিলদে উরুতিয়ার (জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯১২—মৃত্যু ৫ জানুয়ারি ১৯৮৫) সঙ্গে পূর্ণচাঁদের নিচে পাবলো নেরুদার বিয়ে হলো। চন্দ্রালোকে আমৃত্যু একসঙ্গে থাকার শপথ নেন দুজন। সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন—বর ও কনে। এটি কোনো আইনসিদ্ধ বিয়ে ছিল না। মাতিলদে তার তৃতীয় স্ত্রী। দাপ্তরিকভাবে তাদের দাম্পত্যকাল ১৯৬৬ থেকে নেরুদার মৃত্যু পর্যন্ত। কিন্তু তাদের প্রথম দেখা ও প্রণয়ের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ।

মৃত্যুর আগে মাতিলদে উরুতিয়া রচনা করেছেন মাই লাইফ উইথ পাবলো নেরুদা। দুর্ভাগ্য, বইটি প্রকাশের আগেই তার মৃত্যু হয়। স্প্যানিশ ভাষায় লিখিত বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮৬-তে। আলেজান্দ্রিয়া জিয়ারদিনোর হাতে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। নেরুদার জন্মজয়ন্তী (১২ জুলাই) এবং মানুষের চন্দ্র বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী স্মরণে গ্রন্থটির সংশ্লিষ্ট অধ্যায়টি অনূদিত হলো।]

 

আমরা রাতের বেলা সেই সুন্দর দ্বীপে এসে পৌঁছেছি। যখন এর বহু সরু ও আঁকাবাঁকা রাস্তার কথা মনে করি, ভাবি ক্যাপ্রির একটা রহস্য তো আছেই। আমরা যখন শহরের প্রধান প্লাজায় গিয়ে হাজির হই, সমস্বরে দুজনই বলি, ‘কি সুন্দর!’ আমরা বিস্মিত হই। মনে হয় সিনেমার সেটের মতো, একেবারে জাদুকরী। যা কিছু সামনে পড়ছে, ক্ষুধার্ত ও উত্তেজিত পর্যটকের মতো দেখছি। আমরা একটু দ্রুতই হাঁটছিলাম। কারণ একটি বাড়ি তখন আমাদের প্রতীক্ষায়। শেষ পর্যন্ত কিছু সময়ের জন্য হলেও নিজেদের বলার মতো একটি বাড়ি হয়েছে। এটা অনেকের কাছে খুব সাধারণ ব্যাপার হতে পারে। কিন্তু আমাদের জন্য যা ছিল বিজয়, যা রক্ষা করতে আমাদের অনেক যুদ্ধে লড়তে হয়েছে। আমরা এই স্বপ্ন লালন করে আসছি—প্রেমিকদের নিজস্ব বিনোদনের একটা কুটির, অনেক দিন ধরে তাদের দখলেই থাকবে। আর সেটাই এখন আমাদের সামনে। ইতালির কায়দায় স্বাগত জানানো উষ্ণ একটি আবাস।

ব্যাপারটা যেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক—পাবলো আমাকে তার দুই হাতে তুলে নিয়ে ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে গেল। ঢোকার পথে একটি টেবিলের পাশে আমাকে বসাল, টেবিলের ওপর পুষ্পস্তবক, তাতে একটি কার্ড, কার্ডে লেখা ‘মাতিলদের জন্য, ভালোবাসাসহ আরভিন সেরিও।’

আমার হূত্স্পন্দন বেড়ে গেল। যে মানুষটাকে আমি ভালোবাসি এবং সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি, আমাকে তার বিয়ের কনের মতো, স্ত্রীর মতো করে এতটা পথ বহন করে এনেছে। আর আমার সামনে ক্যাপ্রির মহান লেখক ও সম্ভ্রান্ত নাগরিক আরভিন। আমার আরো একবার মনে হলো, আমি আমাকে বেষ্টন করা চিলির প্রাদেশিক খোলস ভেঙে এই মাত্র বেরিয়ে এসেছি।

আমরা শোয়ার ঘরে গেলাম। বিশাল একটি ফায়ারপ্লেস, আগুন জ্বলছে। ঠিক পাশেই দাঁড়ানো লম্বা, হ্যান্ডসাম সাদা পোশাকের আরভিন সেরিও। নিঃশ্বাস নিয়ে আমরা তাকে অভিবাদন জানালাম।

এই মুহূর্তটির বর্ণনা দিতে গিয়ে পাবলো সেরিও প্রসঙ্গে লিখেছে, ‘রূপকথার গল্পের বাবার মতো ঈশ্বর হয়ে সে ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে।’ সবটাই মিষ্টি স্বপ্নের মতো। আলিঙ্গন হচ্ছে, পরস্পরের চোখের দিকে চেয়ে থাকা, কিন্তু মুখে একটি কথাও নেই। সেরিও হাসতে হাসতে আমাদের কাছে আসে। অভিবাদন জানাতে হাত আঁকড়ে ধরে। বলে, ‘আমার বাড়ি তোমাদেরই বাড়ি।’ কথাগুলো বহুল ব্যবহূত হতে পারে, কিন্তু আমাদের জন্য এর গুরুত্ব অনেক। আমরা নিশ্চয়ই অনেক কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হাসতে হাসতে আমাদের আলিঙ্গন করে সেরিও চলে গেল।

সেরিওর মেয়ের গৃহকাজের মহিলাটিকে আমাদের কাছে পাঠানো হলো। তার মেয়ে সফরে আছে। মহিলাটি আমাদেরই প্রতীক্ষায় ছিল। এখন বিস্ময় ও আনন্দ নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্যাপ্রিতে আমার থাকাটা যেন আনন্দের হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই সব আয়োজন করা হয়েছে। ইতালীয় ভাষায় আমাদের সীমিত জ্ঞানের কারণে অ্যামেলিয়াকে বোঝাতে সময় লেগেছে যে আমিই রাতের খাবার তৈরি ও পরিবেশন করব, সে আজকের মতো চলে যেতে পারে। মুখভরা হাসি দিয়ে অ্যামেলিয়া আমাদের বলল, ‘লো মে নে ভাদো’—আমি তাহলে যাচ্ছি এবং চলে গেল।

শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের বাড়িতে একাকী হলাম। সেখানে আমাদের প্রথম ডিনার, প্রথম রাত। এই রাতের বর্ণনা দিতে যাওয়া বোকামি হবে। রাতটা আমাদের কেমন কেটেছে, এমনকি সবচেয়ে সহজ শব্দেও যদি বর্ণনা করতে হয়, বোঝানোর জন্য আমি কখনো সঠিক শব্দ খুঁজে পাব না। আমি সে কথাই বলব, সেই রাতে খাবার ছিল, একটা রাত ছিল—কি যে উদযাপন!

পরদিন সকালে, আমরা তখনো বিছানায়, বেডরুমের দরজায় হালকা টোকার শব্দ শুনি আর ইতালীয় ভাষার কিছু কথা যা আমি আদৌ বুঝিনি।

অনেক চেষ্টা করে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলি। অ্যামেলিয়া এসেছে, হাতের প্লেটে সকালে বানানো ধোঁয়া বের হচ্ছে এমন গরম রুটি আর মিষ্টি গন্ধের এক পট কফি।

তাকে ধন্যবাদ দিই। তখন বিছানা ছেড়ে ওঠা ছাড়া আর উপায় কী? ক্যাপ্রি যখন আমাদের প্রতীক্ষায়, আমরা কেমন করে ঘুমিয়ে থাকব? দিনটা আমাদের কেমন কাটবে? কে জানে, কোনো কারণে হাসতে হাসতে আমরা নাশতার টেবিলে বসলাম। নাশতায় আমাদের লাগতে পারে এমন কোনো কিছুরই ঘাটতি সেখানে নেই। ঘরের ভেতর আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের কুকুরটিও এত বড় পরিসরের জায়গা ও বাগান পেয়ে খুশিই মনে হচ্ছে। আমরা জানালা খুলি। নিচে ছোট্ট বাঁধাই করা উঠোন, তারপর বন, আরো দূরে ম্যারিনা পিকোলার কাছে সাগর থেকে উঠে আসা পাথরশ্রেণী। একটার পর একটা বিস্ময় আমরা আবিষ্কার করে চলেছি—বাড়িটা একটা স্বর্গ।

আমরা পাশের বনে ঘুরে বেড়াই, শৈবাল ও বৃক্ষে পরিপূর্ণ, আমরা আরো মুগ্ধ। এটা কারো সযত্নপালিত বন নয়। স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠেছে। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। কোট নেয়ার জন্য আমরা বাড়ি ফিরে আসি। আমরা শহর ঘুরে দেখতে চাই, হাঁটতে থাকি, ক্যাপ্রির ছোট ছোট মনোমুগ্ধকর রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। পাথরের দেয়াল রাস্তা ধরে রেখেছে, কোনো আড়ম্বর নেই। কিন্তু আমরা জানি, বড় বড় বাড়িগুলো এর পেছনেই।

এই হচ্ছে ক্যাপ্রিতে আমাদের প্রথম দিককার দিন। মুগ্ধ হওয়ার মতো কত কিছু যে এখনো দেখার বাকি। দ্বীপের জীবন কেমন আমাদের লিখতে হবে। আমরা জানি দ্বীপের সবকিছুর ধরনই ভিন্ন।

যে ক্যাপ্রির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম শীতে তা নীরব, গ্রীষ্মে পর্যটকে ঠাসা দ্বীপ ক্যাপ্রি নয়। তখন সবই ছিল প্রশান্ত। বছরের পর বছর ধরে যারা দ্বীপে থাকছেন, আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করি। তারা সরল, বিশ্বাসী মানুষ। তারা কীভাবে আমাদের সেবা করবে সে জন্য উদ্গ্রীব।

আমরা প্লাজার দিকে এগোই। আগের রাতে এটাকে মনে হয়েছে সিনেমার সেট। এখনো সে রকমই লাগছে, ক্যাফে ঘিরে রেখেছে, চেয়ার ও ছোট টেবিলে পূর্ণ। প্লাজা থেকে বিভিন্ন দিকের গলিগুলো এত সরু যে চোখে নাও পড়তে পারে। পুরো বীথিকাজুড়ে খবরদারি করছে ছোট প্রাচীন সুন্দর একটি চার্চ। চার্চের ধারঘেঁষে সিঁড়ির দীর্ঘ বহর। এগুলো আসলে রাস্তা। আমরা এসবের গুণগান করতে বসেছি। আমাদের বন্ধু সেরিও তার একটি বইতে এই প্লাজার কথা লিখেছে। বলেছে, ‘ঈশ্বরের পরিপূর্ণ সৃষ্টি।’

সেরিও বাড়িয়ে কিছু বলেছে বলে আমি মনে করি না। ক্যাপ্রির চারপাশের পরিবেশের দারুণ একটা বিশেষত্ব আছে—পরিচিত, পরিচ্ছন্ন এবং একটা বিশেষ কিছু, যা সঙ্গে সঙ্গেই নিজের বাড়ির একান্ত অনুভূতি দেয়। শিগগিরই অনেকেই আমাদের অভিবাদন জানাতে এল। ওয়েটার, বইয়ের দোকানের মালিক, ক্যাফের মালিক, সবাই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। পাবলোকে যে বহিষ্কার করা হয়েছে, সে সংবাদ এই দ্বীপে পৌঁছেছে। গ্রামের সব মানুষ আমাদের সঙ্গে দেখা করে সহানুভূতি জানাতে চাইছে। মানুষের অন্তরের উষ্ণতা গ্রহণ করা অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। এটা আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি ছিল। আমরা ক্যাপ্রিকে ভালোবাসতে শুরু করলাম।

দ্বীপের সবচেয়ে বড় ও জৌলুসপূর্ণ হোটেলগুলো বন্ধ। কিন্তু কতগুলো ছোট ও সুন্দর হোটেল খোলা। সুন্দর রেস্তোরাঁ আছে, চমৎকার সুস্বাদু খাবার, আমরা প্রায়ই সেখানে খাচ্ছি। আমরা যদি একটু হিসাবি না হই, তাহলে আমাদের আর্থিক সংকটে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। আমরা টের পাচ্ছি না, সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে না। আমরা যা-ই খাচ্ছি, যে সেবাই গ্রহণ করছি, বাড়িতে যা কিছু সরবরাহ করা হচ্ছে, বিল পাব মাসের শেষে। এটা দ্বীপের জীবন, অন্যখানের জীবন থেকে ভিন্ন। সীমাহীন উপভোগের আয়োজন করা আছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বেলায় সতর্ক, হিসাবি হতে হচ্ছে। আমাদের দুজনের যা আছে তাতে চলে যাবে। কিন্তু খরচের একটু বাড়াবাড়ি হলেই আমরা কুলিয়ে উঠতে পারব না।

দিন চলে যাচ্ছে। আমরা অক্লান্তভাবে এই বিস্ময়কর দ্বীপটি চষে বেড়াচ্ছি। আমরা এখন সবই চিনি। ক্যাপ্রির লোকজন মানুষকে খেতাব দিতে পছন্দ করে। তারা পাবলোকে ডাকছে ‘প্রফেসর’, কিন্তু পাবলো যখন তাদের কাছে এর চেয়েও বড় কিছু হয়ে ওঠে, তখন হয়ে যায় ‘কমেন্দাতোরে’।

এটা আমাদের পছন্দ।&dquote;&dquote;

আমাদের একমাত্র হতাশা হচ্ছে নিঃশব্দ সমুদ্রসৈকত। আমরা যখন প্রথম মারিনা পিকোলাতে যাই, সম্ভবত ইসলা নেগ্রার টানে পাবলো বলল, ‘সমুদ্রটা যদি গর্জন করত! এর শান্ত হয়ে আসা জলধারা প্রায় নিঃশব্দে সৈকতে আসে। তাছাড়া গন্ধটা ঠিক আমাদের সমুদ্রের নয়।’

আসলে পাবলো ভূমধ্যসাগরকে একটুও পছন্দ করেনি। ফারালিওনি প্রস্তরমালা তার হতাশার কারণ। সমুদ্র থেকে উঠে আসা অনেক উঁচু দানবীয় পাথর। সৈকত থেকে দেখতে আকর্ষণীয় মনে হয়। পাহাড়ের কাছাকাছি আমরা একজন অন্যজনের ছবি তুলেছি। কিন্তু আশপাশে এমন কেউ ছিল না, যে আমাকে ও পাবলোকে একই ফ্রেমে তুলে দিতে পারে।

ক্যাপ্রিতে পৌঁছার দুদিন পর কুয়েস্তরা মানে স্থানীয় পুলিশ আমাদের কাগজপত্র নিয়ে তাদের অফিসে যেতে বলল। পুলিশের সঙ্গে আন্তরিক কথোপকথনের সময় তারা আমাদের সেবা প্রদান করতে চাইল। পাবলো বলল, আমরা যখন এই দ্বীপ ছেড়ে নেপলস কিংবা অন্য কোথাও যাব, তখন কি আগেভাগে পুলিশকে নোটিস দিতে হবে?

পুলিশ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘অবশ্যই না।’ পরে হাসিমুখে পাবলো আমাকে বলল, ‘তাদের নোটিস দেয়ার কথা কেন বলবে, আমরা যে মুহূর্তে এ দ্বীপ ছেড়ে যাব, তারা তো যেভাবেই হোক জানবে।’

অন্তত ক্যাপ্রিতে কেউ আমাদের অনুসরণ করেনি। এতে আমরা মুক্ত বোধ করতে পেরেছি। আমরা এ দ্বীপ ও অ্যানাক্যাপ্রি শহরে অক্লান্ত অভিযাত্রী ছিলাম। অ্যানাক্যাপ্রি ক্যাপ্রি শহর থেকে উঁচুতে দ্বীপের পাথুরে পার্বত্যাঞ্চলে। আকারে বড় ছিল, কিন্তু সৌন্দর্যে সমান নয়। আমরা ধীরে চলা ছোট ঘোড়াটানা গাড়িতে শহর ঘুরেছি। এগুলোই ছিল আমাদের আনন্দের উৎস।

এভাবেই সময় কেটে যায়।

অন্তহীন আঁকাবাঁকা পথে আমাদের শান্তিপূর্ণ জীবন আরো একটি সুখের সংবাদে বাধাগ্রস্ত হয়। আমি নিশ্চিত, আমি গর্ভধারণ করেছি। গ্রামবাসী ক্যাপ্রির বুড়ো ডাক্তার প্রসিলিওর কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিল। তিনি বললেন, আমি যে গর্ভবতী, এ ব্যাপারে তিনি প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার জন্য নেপলসে স্যাম্পল পাঠাতে চান। ডাকযোগে রিপোর্ট আসবে। এটা যে পজিটিভ হবে তা তো আমি জানি।

যেদিন আমরা সংবাদটির প্রত্যাশা করছিলাম, আমি প্লাজার একটি ক্যাফেতে অপেক্ষা করছিলাম। পাবলো গেছে পোস্ট অফিসে। আমি চারদিকে তাকাচ্ছি, দেখি কোনদিক থেকে সে আবির্ভূত হয়। শেষ পর্যন্ত যখন দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছে, সে আনন্দে উছলে পড়ছে। আমি যখন জিজ্ঞাসা করার জন্য উঠে দাঁড়ালাম, আমি কথা বলার আর কোনো সুযোগ পেলাম না। চুমোতে চুমোতে দীর্ঘ চুমোতে আমার মুখ ঢেকে ফেলল। আমরা হাসলাম, গান গেয়ে উঠলাম, প্লাজার লোকজন তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে। আমরা কয়েক পেগ ড্রিংক করলাম। রেস্তোরাঁয় খাব, কেবল এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য বাড়ি ফিরে গেলাম। আমরা অ্যামেলিয়াকে ছুটি দিয়ে আমাদের মহান আনন্দ সংবাদ উদযাপন করতে বেরিয়ে পড়লাম। আমরা আরো সুখী, আরো সুখী, তেমন কড়া হবে না ভেবে স্থানীয় ওয়াইন পান করলাম, কিন্তু পানীয়টি হালকা ছিল না।

আরো অনেক সময় পর যখন রেস্তোরাঁয় কেউ ছিল না, আমরা স্টাফদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। এতদিনে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। আমরা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোলাম। সামনের দরজায় আমাদের কুকুর নিয়ন ডাকছে এবং ঘ্যান ঘ্যান করছে। একেবারে বরফ জমা রাত। চাবি খুঁজতে পাবলো তার সবক’টি পকেট হাতড়াল। কিন্তু চাবি বের হলো না। পাবলো বলল, ‘অবশ্যই তোমার কাছে আছে।’ আমি পার্স হাতড়ালাম। নেই। চাবি নেই। আমরা দরজার ঠিক অন্য প্রান্তে, এটা বুঝতে পেরে নিয়ন খুব কাঁদছে। চাবি পাওয়া যাচ্ছে না। আমি নিচে বসে পার্স উল্টে ঢেলে দিই। এখানে নেই। পাবলো সব জায়গায় খুঁজল। সেও পেল না। তাহলে কী ঘটল? আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করতে থাকি। আমি বললাম, ‘পাবলো, আমি তোমার পকেট চেক করব, অবশ্যই তোমার কাছে আছে।’ পাবলো বলল, ‘লাভ নেই, আমি দুবার খুঁজেছি।’

রাত বাড়ছে, আমরা জমে যাচ্ছি। আমাদের তাহলে হোটেলে যেতে হবে। কিন্তু কোন হোটেলে? এত রাতে কে আমাদের জন্য হোটেল খোলা রাখবে?

প্রথম যে হোটেলটি চোখে পড়ল সেখানেই গেলাম। আমরা দরজায় টোকা দিতে থাকলাম। ভেতরে অন্ধকার। বদমেজাজি চেহারার একজন নাইটগার্ড শেষ পর্যন্ত উঠে এল। সে আমাদের মতো বিদেশীদের চেনে না, যারা বাজে উচ্চারণে ইতালিয়ান ভাষা বলে। অনেক সমস্যা কাটিয়ে আমরা তাকে বোঝাতে পারলাম যে আমরা ক্যাপ্রিতে থাকি। আমরা চাবি হারিয়ে ফেলেছি। সেখানে দরজার অন্য প্রান্তে আমাদের কুকুরটি আমাদের প্রতীক্ষায় কাঁদছে।

নাইটগার্ড চোখগুলো বড় করে তাকিয়ে বলে, কী ব্যাপার বাচ্চা কাঁদছে!&dquote;&dquote;

আর আমরা এখানে নির্বিকার হাসি-তামাশা করছি, রাত কাটানোর জন্য রুম চাচ্ছি! হায় ভগবান! এ কী পরিস্থিতি। আমাদের ভেতর থেকে হাসির যে ঢেউ উঠে আসছে, তাতে আমরা কথা বলতে পারছি না। আমরা হেসে চলি আর নাইটগার্ডের ক্রোধ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। নিয়ন যে মানবশিশু নয়, বরং একটি প্রিয় কুকুর, এটা তাকে বোঝানো যে কী কষ্টের কাজ! অনেক বাক্য ব্যয়ের পর আমরা একটি রুম পেলাম। রুমটি বরফশীতল, রেফ্রিজারেটরের মতো ঠাণ্ডা। আমরা ভাবলাম, রুমটাকে আগে গরম করা দরকার।

সৌভাগ্যবশত আমরা খুব উত্ফুল্ল ছিলাম। কাজেই এই দুর্ভাগ্যও আমাদের হাসির কারণ হয়ে উঠেছে। কেবল নাইটগার্ড রুষ্ট হয়ে রইল। সে নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছে, চাবি হারিয়ে কেউ এমন করে হাসতে পারে!

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই পাবলো বাইরে গেল আমরা কোন হোটেলে উঠেছি তার নামটি দেখার জন্য। কিছুক্ষণ পর দরজায় হালকা টোকা, ভেতরে একটি হাত ঢুকল, কেবল একটি হাত, সে হাতে আমাদের ঘরের চাবি। চাবিটা পাবলোর পকেটেই ছিল।

আমরা বাড়ি ফিরে আসি। সকালে অ্যামেলিয়া যখন নাশতা নিয়ে এসেছে এবং আমাদের পায়নি, তখন সে কী ভেবেছে, আমরা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। অবশ্য ততক্ষণে অ্যামেলিয়া আমাদের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরটি সেরিওকে জানিয়ে দিয়েছে। সেরিও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠেছে।

এই গল্প আমাদের অনেকবার শোনাতে হয়েছে। গোটা ক্যাপ্রি জেনে গেছে যে নেরুদারা তাদের চাবি হারিয়ে ফেলেছে আর হোটেলে রাত কাটিয়েছে। আমরা যখন প্লাজায় আমাদের নিত্যকার টেবিলে এসে বসি, কৌতূহলী মানুষ আমাদের ঘিরে ধরে—‘শেষ পর্যন্ত কেন তোমাদের হোটেলে ঘুমোতে হলো?’ আবার আমরা গল্পটা বলতে শুরু করি। ব্যাপারটা একেবারে জ্যামে বাস করার মতো, সেখানে সবকিছুই খবর, সবাই আপনাকে চিনবে, সবাই আপনার অভিজ্ঞতার ভাগীদার হবে।

আমি বরাবরই বলেছি যে একটি যথার্থ জীবনের স্বাদ আমি পেয়েছি। হ্যাঁ স্বর্গ আছে, আমরা যখন ক্যাপ্রিতে বসবাস করতাম, স্বর্গসুখ গ্রহণের অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে।

কয়েক মাস কেটে যায়। পাবলোর অতি আদরে আমি বখে যেতে থাকি। শিগগিরই বাচ্চাটি নেমে আসবে, বদলে দেবে আমাদের জীবন। কিন্তু এটা আমাদের তেমন উদ্বিগ্ন করছে না। আমি মা হব, পাবলো বাবা। ব্যাপারটা এ রকমই। পরিস্থিতি আমাদের আতঙ্কিত করছে না। একদিন পাবলো আমাকে বলল, ‘কয়েক দিনের মধ্যেই আকাশে পূর্ণচাঁদ উঠবে, আমরা সেদিন বিয়ে করব। বাচ্চা যখন আসছে, আমাদের বিবাহিত হতে হবে। চলো, একটা পার্টি করে ফেলি এবং চাঁদকে বলি আমাদের বিয়ে দিতে। আজ আমি একটি আংটি তৈরি করাব, যে আংটি তোমার কাছে বাকি জীবন থাকবে।’

ক্যাপ্রিতে একজন পুরনো অলংকার নির্মাতা আছেন। তিনি আমার আংটি বানালেন, তাতে লেখা: ‘ক্যাপ্রি ৩ মে, ১৯৫২, তোমার ক্যাপ্টেন।’

পোশাকের জন্য অসাধারণ কল্পপ্রবণ তাঁতিরা ক্যাপ্রিতে বাস করত। কালো ও সবুজ স্ট্রাইপ ও স্বর্ণ-সুতোয় সেলাই পোশাক বানাতে পাবলো আমাকে তাদের কাছে পাঠায়। এটাই হবে আমার বিয়ের পোশাক। এক তরুণী পোশাক কারিগর আমাদের আশপাশে দেখে থাকবে, চূড়ান্ত ট্রায়ালের দিন পাবলো যখন আমাকে বলল, ‘এই পোশাকে তুমি হবে সুন্দর একজন কনে।’ সে বিস্মিত হলো। আমাদের পৃথিবীতে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু ক্যাপ্রিতে এটা সবচেয়ে অপ্রথাগত একটি ব্যাপার। শিগগিরই আমরা ক্যাপ্রিতে সবচেয়ে অদ্ভুত পাগলাটে দম্পতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠি।

আমাদের বন্ধু সারাহ অ্যালিকাতা তখন ক্যাপ্রিতে একটি বাড়ি বানাচ্ছে। নেপলস থেকে প্রায়ই এখানে আসছে। সেও কমরেড নেরুদা ও তার স্ত্রীর কথা শুনেছে।

আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের সবকিছু তৈরি। খুব সকালে এ উপলক্ষে অ্যামেলিয়ার সঙ্গে টোস্ট করলাম আর জানালাম, দুপুরের পর থেকে তার ছুটি। আমাদের নিজেদের একান্ত সময় দরকার। ঘরের সব সাজসজ্জার দায়িত্ব পাবলোর; আমি রান্নাঘরে গেলাম হাঁস-কমলা রান্না করব। বিভিন্ন রকম সস দিয়ে হবে সি-ফুড অ্যাপেটাইজার।

সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার পর আমি পাবলোর হাতে ম্যানু দিলাম আর সে আমাকে তার গৃহসজ্জা দেখতে নিয়ে গেল। চারদিক দেখে মনে হলো, আমার পক্ষে এর চেয়ে বেশি সুখী হওয়া সম্ভব নয়। আমি চারপাশের দেয়ালের দিকে তাকালাম, কাগজ কাটা রঙিন ফুলের স্তবক এবং চারদিকে রঙিন কাগজে বড় হরফে লেখা, ‘মাতিলদে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, মাতিলদে।’ আমরা দরজা খুলে ট্যারাসে এলাম। আকাশে পূর্ণচাঁদ জ্বলজ্বল করছে, চাঁদের সঙ্গে আমাদের যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, সেভাবেই উদিত হয়েছে।

আলো বিচ্ছুরক সবুজ পোশাকে ট্যারাসে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে আমি কাঁপতে থাকি। আমি অনুভব করি, চাঁদের সাদা আলো আদৌ শীতল নয়। অদ্ভুত এক জাদু আমাকে ঘিরে রাখে। সেখানে দাঁড়িয়ে পাবলো তার সিরিয়াস স্বরে সামান্যতম কৌতুকের ইশারা না দিয়ে আমাদের বিয়ে দেয়ার জন্য চাঁদকে বলল। সে চাঁদের কাছে ব্যাখ্যা দিল যে পৃথিবীতে আমরা বিয়ে করতে সমর্থ নই, কিন্তু প্রেমে পড়া সব কবির অনুপ্রেরণাদাত্রী চাঁদ তত্ক্ষণাৎ ঘটনাস্থলেই আমাদের বিয়ে করিয়ে দিতে পারে। সে চাঁদের কাছে প্রতিজ্ঞা করে যে আমার এই বিয়েকে অত্যন্ত পবিত্রতার সঙ্গে ধারণ করবে। পাবলো আমার হাত তুলে নিয়ে আঙুলে বিয়ের আংটি পরিয়ে দেয়। পাবলো পরে আমাকে আশ্বস্ত করেছে, সেই মুহূর্তে সে চাঁদকে একটু নড়ে উঠতে দেখেছে। তখন চাঁদ আমাদের আশীর্বাদ করছিল বলে সে জানায়। আমরা এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। আর এভাবেই আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। তারপর আমরা দীর্ঘ, দীর্ঘ সময় ধরে পরস্পরকে চুমো খাই। তারপর পরস্পরের হাত ধরে ‘লোহেনগ্রিন’ থেকে ওয়েডিং মার্চ সংগীত গাইতে গাইতে ঘরে প্রবেশ করি। আমি সান্তিয়াগোর মিউনিসিপ্যাল কোরাসের সঙ্গে যখন গান গাইতাম, তখন আমি আমার সেই গান গাওয়ার দিনগুলোতে ফিরে যাই। আমি কনজারভেটরির শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় গান গেয়ে সে সময় অল্পবিস্তর কামাইও করেছি।

আমরা গান গেয়েছি, নেচেছি, আমাদের কুকুর নিয়ন সবকিছুর সাক্ষী, আমাদের সঙ্গে নাচে যোগ দিতে চেয়েছে, আমাদের পায়ের মধ্য দিয়ে ছোটাছুটি করেছে। জানালা দিয়ে চাঁদ আমাদের দেখছিল। পাবলো আঙুল উঁচিয়ে দেখাল, ‘চাঁদের কী প্রশস্ত হাসি, দেখেছ, তোমার মতোই হাসছে।’ আমরা গ্লাস উঁচিয়ে পরস্পরের এবং চাঁদের টোস্ট করলাম।

কী আড়ম্বরপূর্ণ চাঁদ! পরিপূর্ণ সুখের সে কী এক রাত! কেউ এতটা প্রেমে কেমন করে পড়ে? কেউ এতটা সুখী কেমন করে হয়? এমনকি খাবারটাও ছিল বিস্ময়কর। পাবলো আমাকে বলে চলেছে, তুমি রান্নাঘরের রানী। আমি কত ভালো বিয়ে করেছি।

যখন ভোরের প্রথম আলো আমাদের চোখে পড়ে, আমরা অবাক হয়েছি; আমাদের অগোচরে গোটা রাতটাই পেরিয়ে গেছে। পাবলো বলল, ‘আহা, তাহলে তো আমরা যথাযথ বিয়ের রাত পাচ্ছি না।’ ছোট শিশুর মতো উন্মত্ত হয়ে হাসতে হাসতে ছুটতে ছুটতে আমরা অ্যামেলিয়ার জন্য লিখলাম, সে পৌঁছার পর সকালে যেন আমাদের ঘুম থেকে না জাগায়। তবে আমাদের উৎসবের পর পরিষ্কার করার মতো বহু জঞ্জাল তো তার জন্য রয়েই গেল।

সেই রাতের পর থেকে বন্ধু ও পরিবারের অসংখ্য সদস্যের বিয়েতে আমি হাজির হয়েছি। আমার মনে হয়েছে, একটি বিয়েও আমাদের বিয়ের চেয়ে বেশি সৎ ও সুখময় হয়নি। যে বিয়েতে চাঁদ আশীর্বাদ করেছে।

বহু দীর্ঘ বছর সেই রাতের ছবি আমার দিবাস্বপ্ন পূরণ করে রেখেছে। কোনো সন্দেহ নেই, সময়ের সঙ্গে বছর গড়াতে গড়াতে স্মৃতি আরো বেড়েছে, আরো অলংকৃত হয়েছে। বহু বছর পর সান্তিয়াগোর প্রোভেনসিয়া এলাকায় একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে আমরা যখন ডিনার করছিলাম, পাবলো সে কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি তাকে বলি, ক্যাপ্রির সেসব স্মৃতি আমার জন্য হূতস্বর্গের দর্শন। প্রশান্ত বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে পাবলো আশ্বস্ত করে, আমাদের জীবনে আমরা এমন আরো অনেক স্বর্গের সন্ধান পাব। কারণ আমরাই তা নিশ্চিত করব।

চাঁদের এই বিয়ে করানোর অনেক বছর পর পাবলো সত্যিই বিপত্নীক হয় এবং আমরা ১৯৬৬ সালে আইনসিদ্ধ বিয়ে করি। নেরুদা প্রথম স্ত্রী মারিয়া আন্তোনিয়েতা হাগেনারের মৃত্যুর কথা বলেছে, যার সঙ্গে নেরুদার বিয়ে হয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৩০।

আমাদের সেই বিয়ের পার্টিতে অতিথি ছিল, ফটো উঠেছে, খাবার ছিল, নবদম্পতিকে টোস্ট করা হয়েছে। আমরা অস্বস্তি বোধ করছিলাম এবং একাকী হতে চাইছিলাম। আমরা আমাদের বিয়ের সেই প্রথম রাতটি পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছিলাম। কিন্তু সুখের মহান মুহূর্তগুলো কখনো পুনঃসৃষ্টি করা যায় না। ক্যাপ্রিতে আমাদের যে বিয়ে, তার পুনরাবৃত্তি কখনো সম্ভব নয়। এটি অনবদ্য এবং এটি কেবল আমাদের স্মৃতিতেই রয়ে গেছে।