মিগুয়েল আলগারিন। অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব

[পাবলো নেরুদার কাব্যগ্রন্থ  Cancion de Gesta প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল স্প্যানিশ ভাষায় ১৯৬০ সালে। ১৯৭৬ সালে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় সং অব প্রোটেস্ট নামে। অনুবাদ করেন মিগুয়েল আলগারিন এবং তিনি এ অনুবাদের সঙ্গে বইয়ের জন্য একটি ভূমিকাও যুক্ত করেন। এ গ্রন্থে স্থান পায় ৪৩টি কবিতা। নেরুদার পরিকল্পনা ছিল বইয়ের কবিতাগুলো হবে পুয়ের্তো রিকোকে ঘিরে। কিন্তু তা হয়নি। নেরুদার কথায়, ‘বইটা পরে কিউবার অসাধারণ ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলকে ঘিরে আমার কবিতা তৈরি হতে থাকে। এভাবে কবিতায় যুক্ত হতে থাকে কিউবা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া ও গুয়াতেমালা।

কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে নেরুদা লেখেন, ‘এটা কোনো একাকী বিলাপ নয় কিংবা অন্ধাকার সময়ের ফসল নয়। বরং এই কবিতার বই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুড়ে দেয়া অস্ত্র। সহোদর দেশগুলোর মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামে এ কবিতাগুলো মৌলিক ও সংহতিমূলক সহায়তা দেবে।’ পরবর্তী সংস্করণে নেরুদা যোগ করেন, ‘আমি কসম কেটে বলছি আমার কবিতা অপমানিত মানুষকে মর্যাদা দেবে, আশাহীনকে আশা। অবিচারের মাঠে গাইবে ন্যায়বিচারের গান, শোষকের উল্লাসের সামনে বলবে সমতার কথা।’

মিগুয়েল আলগারিন রাটজারস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক, কবি ও ঔপন্যাসিক। তার জন্ম পুয়ের্তো রিকোতে। সং অব প্রোটেস্ট বইয়ে মিগুয়েল আলগারিন যে ভূমিকাটি লিখেছেন, তার শিরোনাম ‘কবিতার রাজনীতি’। এ ভূমিকায় তিনি ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে নেরুদার কবিতার মূল্যায়ন শুরু করেছেন এবং তা ধীরে ধীরে পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনীতিকে স্পর্শ করে গেছে।]

আমি যখন শিশু, তখন সবকিছুতেই মায়ের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতাম। তিনি নিরাপদ থাকলে আমিও নিরাপদ অনুভব করতাম। আমার মনে পড়ে, আমি মায়ের ইশারার অপেক্ষায় থাকতাম; ভয়ের ইশারার ব্যাপারে সবসময় সতর্ক ছিলাম। বিভিন্ন বিষয় বুঝতে মা-বাবাকে প্রশ্ন করতাম এবং তারা সবসময় আমাকে ব্যাখ্যাসহ জবাব দিতেন। আমি যখন নিতান্তই শিশু, লুইস মুনোজ মারিন তখন পুয়ের্তো রিকোর গভর্নর। আমার মনে আছে, ভিড়ের মধ্যে আমার ভাই-বোনকে ওপরে তুলে ধরা হয়েছিল, যেন তারা লুইস মুনোজ মারিনকে দেখতে পারে। মারিন তখন ভাষণ দিয়ে রেডিও স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসছিলেন। আমার মা খুব আনন্দিত, বাবা গর্বসহকারে ঋজুভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু আমার মন তখন খুবই খারাপ ছিল। আমার চাচা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আমাকে তিনি কাঁধে তুলবেন না। কারণ আমি বেশি মোটা। গভর্নর চলে যাওয়ার পর খুব জোরে মানুষের করতালির শব্দ শোনা গেল। এই তালির শব্দ এত জোরে হচ্ছিল যে আমি নিজের দুঃখ ভুলে গেলাম এবং নিজেও তালি বাজাতে শুরু করলাম। যদিও গভর্নরের পালিশ করা সাদা জুতোজোড়া ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতে পাইনি।

মুনোজ মারিনের প্রতি আমাদের পুরো পরিবারের কী পরিমাণ শ্রদ্ধা ছিল, সেটা আমার মনে আছে। একবার আমার চাচা বেনিটিন ও এক প্রতিবেশীর মধ্যে ভয়ানক মারামারি হয়েছিল। কারণ ছিল প্রতিবেশী মানুষটি বলেছিলেন যে মুনোজ মারিন আমাদের বিক্রি করে দিচ্ছেন। এটা ছিল এক অবাক করা অভিজ্ঞতা। আমি চাচা বেনিটিনকে এতটা উত্তেজিত আর কখনো দেখিনি, মনে হচ্ছিল তার গায়ে মৌমাছি হুল ফুটিয়েছে আর তিনি ব্যথা সহ্য করতে পারছেন না। বেনিটিন চাচা সেই প্রতিবেশীর গলা চেপে ধরে তাকে খুন করে ফেলতে চাইলেন। দুই পরিবারই তাদের ছাড়িয়ে দিতে ছুটে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে তাদের আলাদা করা হয় এবং তারপর সবাই শান্ত হয়ে আসে। তবে এরপর আমার চাচা আর সেই প্রতিবেশী জীবনে আর কখনো কথা বলেননি। সব মিলিয়ে মি. মুনোজ যতটা ঘৃণিত হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন।

আমার পরিবার নিউইয়র্কে চলে আসে এবং আমিও মি. মুনোজের স্মৃতি ভুলে যেতে থাকি। কারণ ততক্ষণে নতুন পরিবেশের নানা অনুষঙ্গ আমার মস্তিষ্কে ভিড় করছে। আমি আমার সেই দ্বীপদেশের কথা স্মরণ করতাম, কিন্তু তার নেতা ও রাজনীতি আমার স্মৃতি থেকে চলে গিয়েছিল। অতীতের স্মৃতি রোমন্থনে মানুষ সবসময় মধুর স্মৃতিগুলোকেই বেছে নেয়; খারাপ সময়কে নয়। পরিবারের সদস্যরা সবাই এক জায়গায় বসলে তারা শুধু পুরনো ভালো সময়ের কথা বলতেন। খারাপ সময়ের কথা তারা প্রায় তুলতেনই না। অতীতের এক প্রফুল্ল ও কিছুটা আদর্শবাদী চেহারা প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করল।&dquote;&dquote;

পুয়ের্তো রিকোয় ঘনিয়ে উঠতে থাকা ঐতিহাসিক ঘটনাবলির দিকে মনোযোগ দেয়ার আগে আমাকে নিউইয়র্কের রাস্তায় খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে। টিকে থাকার পথটা খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি আমার পুরো মনোযোগ নিউইয়র্কেই নির্দিষ্ট করে রেখেছিলাম। যা-ই হোক, কিছুদিন পরই নিজের মধ্যে অসন্তুষ্টিবোধ তীব্র হয়ে উঠছিল। সবকিছু নতুন—এটা আমার জন্য সুখকর ছিল না। আমার একটা ইতিহাস দরকার হয়ে পড়েছিল। আমার স্মৃতিগুলো ফেরত চাইছিলাম, তাই দরকার ছিল স্প্যানিশ ভাষার কাছে ফিরে যাওয়ার। তখন নিজের আবেগকে শান্ত করতে আর ধূসর হয়ে যাওয়া স্মৃতিকে পুরস্কার করতে ফিরে তাকালাম ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকার লেখকদের দিকে।

ঠিক এমন সময় আমি হাতে পেলাম পাবলো নেরুদার সং অব প্রোটেস্ট। আমি সবকিছুর পরিষ্কার ছবি দেখতে চাইছিলাম। আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছিল যে মি. মুনোজ মারিন কোনো নায়ক নন। তাকে নিয়ে আমার প্রশ্ন পরিবারে হইচই ফেলে দিল এবং কিছুক্ষণ পর আমার পরিবারের সদস্যরা অস্বস্তিতে পড়লেন এবং তারপর তারা হতোদ্যম হয়ে গেলেন।

আমি প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু নেরুদার মধ্যে আমি একজন শিক্ষক-বন্ধু পেয়ে গেলাম। তিনি আমাকে ঘটনাগুলো বলতে চাইছিলেন। তিনি সত্যকে এত পরিষ্কারভাবে বলতে চাইতেন যে তার কবিতাগুলো আপনার স্নায়ুতে ঢুকে যাবে এবং সেগুলো আপনার স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলবে, যত্ন নেবে। নেরুদার শব্দ যে চিত্রকল্প তৈরি করে, সেগুলো যেন রাসায়নিক উপাদানের মতো শরীরের গঠনকে বদলে দিতে পারে।

কবিতাটা খুব সরল। আমি শিক্ষা নিতে চাইছিলাম আর নেরুদা শেখাতে চাইছিলেন। তাই নেরুদাকে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘরে নিয়ে আসি—

এই পানিতে একটা মোটাসোটা কীট আছে

এই জমিনে আছে এক রাক্ষুসে পোকা

সে তার দ্বীপের পতাকাটা খেয়ে ফেলেছে

তারপর নিজের ক্ষমতার পতাকা উড়িয়েছে

সে পুষ্টি পেয়েছে বন্দি আর

পুঁতে রাখা দেশপ্রেমিকদের রক্ত থেকে।

(মুনোজ মারিন)

“‘মোটা কীট’—এটা এক অসৎ কবির অসৎ উপমা”—আমার চাচা আল চিত্কার করে উঠেছিলেন। লড়াইটা সহজ ছিল না। পরিবারে এমন প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা প্রত্যাশিতই ছিল। ‘এই কবি কবিতার লেখার কাজটাই ভুলতে বসেছে’—আমার চাচা রাগে চিত্কার করছিলেন। তিনি আমাকেসহ টেবিল, বইপত্র মেঝেতে ছুড়ে ফেলেছিলেন। আমি বারবার বলছিলাম, এটা একটা ‘কবিতামাত্র’, কিন্তু চাচা চিত্কার করে বলতে লাগলেন, এটা কেবল কবিতা নয়, বরং একটা শয়তান মানুষ, একজন ভালো, ন্যায়পরায়ণ শাসকের সুনাম নষ্ট করতে চাইছে। আমি চাচার প্রতিক্রিয়ায় একই সঙ্গে খুশি ও বেজার হয়েছিলাম। এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে নেরুদার কবিতা চাচার বুকে আঘাত করছে। আমি সেদিনের মতো কবিতা পড়া বন্ধ করলাম।

আমি জনপরিসরে আবৃত্তি করা অনেক কবিতা শুনেছি, যেগুলো তাদের সৌন্দর্য ও গঠনের জন্য প্রশংসিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলো পড়ার পর মানুষের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারত না কিংবা কয়েক মিনিটের বেশি সেগুলো মানুষের মনেও থাকত না। কিন্তু নেরুদার সং অব প্রোটেস্টের কবিতাগুলো এমন নয়। এর কবিতাগুলোর রেশ পড়ার পরও অনেক দিন পর্যন্ত রয়ে যায় পাঠকের মনে। নেরুদার কবিতাগুলো সেভাবেই তৈরি করেছেন—

নেরুদার কাছে খুব পবিত্র বা ক্ষমতাবান কোনো নাম ছিল না, যেটা তিনি প্রকাশ করতে পারবেন না। তিনি তার কাজ নিয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি জীবনের সঙ্গে গত অর্ধশতকের ঘটনাবলি মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এমনকি তার কবিতা দিয়ে পুরো একটি প্রজন্মের মোহ ভেঙে দিয়েছেন। তিনি অতীতে যা ঘটেছে, সেগুলোকে একেবারে বর্তমানে এনে যুক্ত করেছেন।

কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন সেটা স্মরণ করা হয়। আর সেগুলোকে স্মরণ করার কেউ না থাকলে স্মৃতি ধূসর হতে থাকে। আমার চাচা আল যদি নেরুদার কবিতা না শুনতেন, তাহলে সম্ভবত কখনই তিনি লুইস মুনোজ মারিনের স্মৃতিকে যাচাই করতে যেতেন না।

আমার জন্য এ পরিস্থিতিটা বেশ কঠিন ছিল। আমি পরিবারকে ভালোবাসতে ও বিশ্বাস করতে শিখেছি। তখন আমি তাদের দেয়া তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করছিলাম। সংকট ঘনিয়ে উঠেছিল। আমি শিখেছি মা-বাবা যাকে বিশ্বাস করেন, তাকেই বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু আমি আর সেভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি শিখতে শুরু করেছিলাম, ‘তথ্যগুলো’ কীভাবে তাদের হাত পৌঁছেছিল। আমি আবিষ্কার করেছিলাম, মুনোজ মারিনের নেতৃত্বে বিরাট প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছিল। আমি মুনোজের মিথ্যাগুলোর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে শিখেছিলাম। কিন্তু আমার মা-বাবার কোনো রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল না কিংবা ছোটবেলায় আমার শেখা সব মূল্যবোধই ভুল ছিল, এমনটা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার মা-বাবা বিকৃত ও বাছাই করা তথ্যের শিকার ছিলেন। তা সত্ত্বেও বলতেই হয়, তাদের মূল্যবোধগুলো মিথ্যা ছিল—তারা নিজেদের সময়ের ইতিহাসের মুখোমুখি হননি।

নেরুদা আপনাকে আপনার অতীতের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে। ইতিহাস ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে। এটা প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাস ব্যক্তি ও পুরো জাতির স্মৃতিকে বিকশিত করে। এটা এক প্যাশনেট প্রক্রিয়া এবং এতে চরম উত্তেজনাও আছে। বিস্মৃতপ্রায় কোনো স্বৈরশাসককে নিয়ে বলা একটা গল্প অতীতের মিথ্যাকে উন্মুক্ত করতে পারে, আপনার অনুভূতিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

লুইস মুনোজ মারিন ছিলেন গণশাসক। যখন একজন শাসক যোগাযোগের সব ধরনের মাধ্যমগুলো (পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন) দখল করে নেন এবং ঘটনার সত্য বিবরণ প্রচার করতে না দেন, তাহলে কোনো একদিন কেউ সত্য প্রকাশের দায় পালন করতে এগিয়ে আসবে। নেরুদা তার সং অব প্রোটেস্টে সেটাই করেছেন। এতে তিনি শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়েছেন এবং যেখানে দরকার মনে করেছেন, সেখানে উত্তেজনাও তৈরি করেছেন।

আমি মি. মুনোজের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বাড়ি নিয়ে আসি। কিন্তু আমার চেতনার রূপান্তর পুরো হয়নি। আমি রাগান্বিত হয়েছিলাম। কারণ আমার মা-বাবা এসব কেন জানতেন না তাই ভেবে। আমার আল চাচা নিশ্চয়ই ভাবতেন যে তাকে অপমান করার জন্যই আমি বাসায় নেরুদার কবিতা পড়তাম। কবিতাকে আলোকিত করার বাহন হিসেবে না দেখে আমি সেটাকে আক্রমণের, অভিযোগ জানানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলাম—

এরই মধ্যে পুয়ের্তো রিকোর মুনোজ&dquote;&dquote;

দ্বীপদেশটির স্বাক্ষর নকল করেছে

এবং দস্যুর ব্যানারের ছায়ায়

সে দেশের ভাষা আর অস্তিত্বকে বিক্রি করে দিয়েছে, জমি এবং খুশি,

আরো বেঁচে দিয়েছে বেচারা আমেরিকার সম্মান,

বিক্রি করেছে মা-বাবাকে, দাদা-দাদিকে এবং ভস্ম।

(ইট ইজ হ্যাপেনিং)

নেরুদার কবিতা মানুষের স্মৃতিকে ঝাঁকুনি দিতে পারে, ঠিক যেভাবে লুটেরা আপনাকে ঝাঁকুনি দিয়ে গিয়েছিল। কবিতাগুলো আপনার সামনে নেরুদার ছবিকে নিয়ে আসবে প্রেমের নৈবেদ্য হিসেবে; চোর আসে এবং নিয়ে যায়, কিন্তু নেরুদা এসে দিয়ে যান। কিন্তু তার উপহার পূর্ব বা পশ্চিমা দুনিয়ার কোনো সুবাস নয়। এ উপহার আপনাকে আপনার স্মৃতি ফিরিয়ে দেবে। ‘অ্যানশিয়েন্ট হিস্ট্রি’ কবিতায় নেরুদা পুয়ের্তো রিকো ছেড়ে কিউবায় হাজির হন। এতে তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক দ্বীপের বর্ণনা দিয়েছেন।

‘এবার আমি চোখ খুলি আর তখনই মনে পড়ে যায়

আনন্দ-বেদনায় উচ্ছ্বসিত এবং ম্রিয়মাণ

কিউবার তিক্ত ও জাদুকরী ইতিহাস।’

হোসে মার্তি বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছেন, তাই তিনি কিউবায় ‘ডলার’ নৈতিকতার বিরোধিতা করেছিলেন। তাই তাকে সহিংস শত্রুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটা ‘স্বাধীনতার শাখাটি তুলে ধরা/ খুব কঠিন আর ভয়ানক কাজ/ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাটা বিপজ্জনক।’

যারা বর্তমান সময়ের সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন, তাদের নিয়েও নেরুদা লিখেছেন। যারা বিনাশী কর্তৃত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, তাদের সাহস নেরুদাকে আশাবাদী করেছে। তাদের এ সাহসকে স্তুতি জানিয়ে নেরুদা গান লিখেছেন—

আশা আর বন্দুকের গুলি দিয়ে মার্তি

দিবাস্বপ্ন দেখা মানুষ আর কৃষকদের জাগিয়ে ছিলেন

রক্ত আর চিন্তা দিয়ে

নতুন আলোর উৎস তৈরি করেছিলেন।

(আই রিমেম্বার আ ম্যান)

নেরুদা কাস্ত্রোকে কিউবার মানুষের ঘুম ভাঙানোর ওষুধ হিসেবে দেখেছিলেন। কাস্ত্রোর চারপাশে পরিকল্পনা করে যে মিথ্যার জাল বিছানো হয়েছিল, সেটা নেরুদা বুঝতে পারছিলেন—

‘ফিদেল, ফিদেল, মানুষ তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ

কারণ তুমি কথাকে কাজে করে দেখিয়েছ।’

(টু ফিদেল কাস্ত্রো)

 

কাস্ত্রোকে হত্যা করার জন্য অপেক্ষা করে থাকা অ্যামবুশকে দেখেছেন নেরুদা। এ রকম হামলা থেকে কাস্ত্রোকে বহুবার তিনি বেঁচে যেতে দেখেছেন। এটা এখন সবারই জানা যে কাস্ত্রোকে হত্যা করার জন্য সিআইএ অনেক ব্যয়বহুল প্লট করেছিল, এমনকি সেনা অভিযানও চালিয়েছিল। সিআইএর শক্তি ও অর্থের ক্ষমতাকে মোকাবেলা করে কাস্ত্রো টিকে গিয়েছেন। এটা আর কোনো লাতিন আমেরিকান বিপ্লবী নেতা করতে পারেননি। সিআইএর প্রযুক্তিগত স্যাবোটাজ ও গুপ্তচর হামলার মুখোমুখি হয়েছেন ফিদেল। কাস্ত্রো যেভাবে সিআইএর বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে ছিলেন, সেটা দুনিয়ার সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে শক্তিশালী শক্তিকে দৃঢ়সংকল্প দিয়ে থামিয়ে দেয়া যায় এবং তার মিথ্যাগুলোকেও উন্মোচন করা যায়।

কাস্ত্রো তার কথা রেখেছিলেন এবং মানুষ তার প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। কিউবায় একটি সামষ্টিক গল্প গড়ে ওঠে। ফিদেলকে কিউবার বিরুদ্ধে চালানো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা এবং আক্রমণকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। আর এসবের পেছনে সিআইএ কোটি কোটি ডলার খরচ করেছে। যা যা ঘটছিল, সেগুলো নেরুদা দেখছিলেন। নেরুদা জানতেন ফিদেলের কাজকে বর্ণনা করার জন্য একজন গায়ক লাগবে। নেরুদা নিজেই সেই গল্প বলিয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

নেরুদা তার অভিজ্ঞতা থেকে তথ্য সঞ্চয় করেছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে নিজের শক্তিকে পুনরিজ্জীবিত করতেন—

আমি রুটি আর মাছ খাওয়া মানুষ

আপনি আমাকে বইয়ের পাতায় খুঁজে পাবেন না

বরং পাবেন মানুষের মধ্যে

তারা আমার অগণিত বিষয় শিখিয়েছেন।&dquote;&dquote;

(সো ইজ মাই লাইফ)

মানুষই তার এ কবিতাগুলোর বিষয়। নেরুদার মতে, তার এ বইয়ের উদ্দেশ্য ‘বেদনার্ত মানুষের কষ্টকে বোঝা/তাদের বেদনা আমারও বেদনা।’ মানুষের দুর্দশার কথা লিপিবদ্ধ করাটাকে নেরুদা তার দায়িত্ব বলে মানতেন।

নেরুদা স্মৃতিকে বর্তমানের কাজে পরিণত করতে পারতেন। তিনি অতীতকে বর্তমানে হাজির করতেন আর এতে মানুষ যেখানে বসবাস করছে, সেদিকে নজর দিতে পারত।

নেরুদা যেমন তার ভূমির প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়েছেন, তেমনি এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এখানে অর্থনৈতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে—

অন্য প্রান্ত থেকে মানুষ

তোমার জন্য দাসত্বের জোয়াল নিয়ে এসেছিল

তারা হুইস্কি ছাড়া আর কিছুই ঢালেনি...

টাকা দিয়ে তারা খাল কুঁদেছে

তোমার রক্ত দিয়ে মাটি চষেছে

আর এখন তারা নিউইয়র্কে ডলার পাঠাচ্ছে

এখানে তোমার জন্য রেখে যাচ্ছে কবর।

(হিস্ট্রি অব আ ক্যানাল)

নেরুদার কাজ ছিল চিত্রকল্প তৈরি করা, যা সেই মুহূর্তটাকে স্মৃতি দিয়ে এতটা উত্তুঙ্গ করে তোলে যে তিনি ও তার সঙ্গে অন্যরা কাজে নেমে পড়েন। সং অব প্রোটেস্টের অনেক কবিতায় তিনি ভৌগোলিক দৃশ্য তৈরি করেছেন, যা তার মহাদেশের প্রাকৃতির সৌন্দর্যকে উদযাপন করেছে। নেরুদা যেমন মানুষকে স্মৃতি উপহার দিয়েছেন, তেমনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কত প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে তাদের বসবাস। স্মৃতি আর এ সম্পদের বিবরণ দুটোই দরকার ছিল বর্তমানের ঘটনাবলিকে বোঝার জন্য। স্বাধীন শক্তি হিসেবে বিকশিত হতে হলে একজন মানুষের যেমন স্মৃতির দরকার হয়, তেমনি প্রয়োজন হয় নিজের ভূমির সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক:

মা হারা সন্তানের মতো

পানামার বাতাস জিজ্ঞেস করছে

আমার দেশের পতাকাটা কোথায়?

(হিস্ট্রি অব আ ক্যানাল)

নেরুদা অবশ্য এটাও পরিষ্কার করেছেন যে সমাধান কেবল যুদ্ধে নয়। এটা নেরুদা ‘নর্থ আমেরিকান ফ্রেন্ড’ কবিতায় স্পষ্ট করেছেন। উত্তর আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া হতে পারে। উত্তর আমেরিকায় কেবল দানব আর মিথ্যাবাদীর বাস এমনটা নেরুদা বলেননি। নেরুদা উত্তর আমেরিকার মানুষের সঙ্গে জানাবোঝা বাড়াতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি দেখেন—

দু-তিনজন মানুষ

উত্তর আমেরিকার দ্বার বন্ধ করে রেখেছে&dquote;&dquote;

শুধু শোনা যায় ‘ভয়েস অব আমেরিকা’

শুনে মনে হয় রোগাটে মুরগির হাঁকডাক।

(নর্থ আমেরিকান ফ্রেন্ড)

আমাদের দেশের কর্মকর্তারা মিডিয়াকে ব্যবহার করে নিরবচ্ছিন্নভাবে যে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে, সেসব উন্মোচন করার প্রয়োজনীয়তা আমরা সবে অনুভব করছি; মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা কথাসংবলিত গণঘোষণাগুলো মানুষের ব্যক্তিজীবনে পৌঁছে যাচ্ছে। গণমাধ্যম ভবিষ্যেক ইতিবাচকভাবে নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু এখন এরা আমাদের কাছে নানা জাতের পণ্য বিক্রি করে আমাদের বোধের ওপর নিরন্তর আক্রমণ করে যাচ্ছে আর এসব পণ্য তৈরি করতে গিয়ে দুনিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ গ্রাস করছে। নেরুদা যুক্তরাষ্ট্রের এই লোভকে দেখেছিলেন এবং এই লোভকে আমলে নিয়েই নিজের ভবিষ্যৎ রূপকল্পকে কবিতায় তুলে ধরেছেন—

আমরা তোমাদের পেট্রোলিয়াম তুলতে যাচ্ছি না,

আমার তোমাদের রীতি-প্রথায় হস্তক্ষেপ করব না,

আমরা উত্তর আমেরিকার গ্রামে গ্রামে

ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি বিক্রি করব না:

আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ

আমাদের সামান্য আয়েই আমাদের চলে যায়,

যারা অন্যের জিনিসে লোভ করে

আমরা তাদের কাছে মাথা নোয়াই না।

আমরা লিংকনকে এবং পল রোবসনের

পরিষ্কার চিন্তাকে শ্রদ্ধা করি

আমরা চার্লি চ্যাপলিনকে ভালোবাসতে শিখেছি

আরো অনেক কিছুকে, যে ভূগোল

আমাদের আরাধ্য ভূমিতে ঐক্যবদ্ধ করেছে।

সবকিছু আমাকে আরেকবার বলতে বলে

যে আমরা সবাই এক নৌকাতেই সফর করছি।

নৌকাটা আমাদের অহংকারে ভারী হয়ে ডুবে যেতে পারে

চলুন, নৌকাটা রুটি আর আপেল দিয়ে ভর্তি করি,

নৌকায় সাদা-কালো সবার জায়গা হোক,

আরো জায়গা পাক পারস্পরিক বোঝাপড়া ও আশা-আকাঙ্ক্ষা।

(নর্থ আমেরিকান ফ্রেন্ড)

নেরুদা এক ঐক্যের একটি রূপকল্প প্রস্তাব করেছিলেন। নেরুদা যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিতে হবে বা তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে হবে, এমন কোনো ধারণা পোষণ করতেন না। তিনি শুধু ডলারকে বিতাড়িত করার কথা বলেছেন, একই সঙ্গে ডলারের আধিপত্যে সৃষ্টি হওয়া নৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও।

সং অব প্রোটেস্টের শেষে নেরুদা স্তুতি গেয়েছেন। এই স্তুতি সিয়েরা মায়েস্ত্রার, যার দুর্গম প্রকৃতি কিউবার বিপ্লবীদের আশ্রয় দিয়েছিল। নেরুদা লিখেছেন ‘দুর্গম বন, কঠিন শিলার শক্ত আবাস’—এ প্রশংসার কারণ নেরুদা কিউবার জন্য ফিদেলের নেয়া ঝুঁকির বিষয়টি ভালোভাবে জানতেন। জন এডউইন ফ্যাগ ১৯৬৯ সালে লিখেছিলেন কাস্ত্রোর প্রশাসন তার সততা হারায়নি। ফিদেলের উদ্দেশ্যের প্রতি গভীর আস্থা ছিল নেরুদার। নেরুদা ফিদেলের মধ্যে এক যোদ্ধামূর্তি দেখেছিলেন, যে যোদ্ধা তার আগুন দিয়ে বর্তমানকে বিশুদ্ধ করতে পারে, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে—

আমি দেখছি সামনে কী আসছে এবং কীসের জন্ম হচ্ছে,

ব্যথাগুলো পরাজিত হয়েছে,

আমার মানুষের সর্বস্বান্ত স্বপ্ন আবার স্বপ্ন দেখছে;

স্কুলগুলোতে শিশুদের পায়ে জুতো,

সূর্য যেভাবে গ্রীষ্মে রোদ ছড়ায়

সেভাবেই সবাইকে রুটি আর ন্যায়বিচার দেয়া।

আমি দেখতে পাই সরলতা জয়ী হয়েছে।

সিয়েরা মায়েস্ত্রার ধ্যানমগ্ন নেরুদা তার আকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ দুনিয়ার চিত্রটি আঁকতে চেয়েছেন—তিনি এমন এক দুনিয়ার দেখছেন, যা হবে শ্রমজীবী মানুষের—সেখানে মানুষকে ‘ন্যায়বিচারের জন্য গভর্নর আর আদালতে/দৌড়ানোর প্রয়োজন হবে না।’ কারণ সেটা হবে এমন দুনিয়া, যেখানে ‘নিষ্ঠুর ও খারাপ মানুষেরা চিরতরে চলে যাবে।’