রিতা গিবার্ত। অনুবাদ: শওকত হোসেন

‘আমার জীবন কবিতা ও রাজনীতির মাঝে বিভক্ত হয়ে আছে, এটা আমি কখনই ভাবিনি’—৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯ চিলির কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা গ্রহণ উপলক্ষে দেয়া ভাষণে এ কথা বলেন পাবলো নেরুদা। ‘আমি একজন চিলিবাসী, দশকের পর দশক আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সমস্ত দুর্ভাগ্য এবং সমস্যার কথা যার জানা আছে এবং জনগণের সব রকমের আনন্দ ও বিষাদে যার অংশগ্রহণ ছিল, আমি তাদের কাছে আগন্তুক নই। ওদের ভেতর থেকেই উঠে এসেছি, আমি জনগণেরই অংশ। শ্রমিকশ্রেণীর পরিবার থেকে এসেছি...ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কখনই ছিলাম না। আমার শ্রম ও কবিতার মাধ্যমে চিলির জনগণের সেবা করাকেই আমার পেশা ও দায়িত্ব মনে করেছি। তাদের জন্য গান গেয়ে, তাদের পক্ষে লড়াই করেই বেঁচে আছি।’

বামপন্থীদের ভেতর বিভক্তির কারণে জোরালো প্রচারণার পরও পপুলার ইউনিটির একজন প্রার্থীর সমর্থনে নেরুদা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে ইস্তফা দেন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে ইস্তফা দেয়ার ঠিক আগে তার ইসলা নেগ্রার বাড়িতে এ সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়।

ইসলা নেগ্রা (কৃষ্ণদ্বীপ) কৃষ্ণ বা দ্বীপের কোনোটাই নয়। ভালপারাসিওর ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং সান্তিয়াগো থেকে ২ ঘণ্টার দূরত্বে এটা একটি বিলাসবহুল সৈকত নিবাস। নামটা কোত্থেকে এসেছে, কেউ বলতে পারেন না। নেরুদা তার টেরাস থেকে দেখা যাওয়া দ্বীপাকৃতি কালো পাহাড়ের কথাই চিন্তা করেন। ৩০ বছর আগে, ইসলা নেগ্রা পরিচিত হয়ে ওঠার বহু আগে নেরুদা তার বইয়ের সম্মানীর টাকায় সৈকত-লাগোয়া খাড়া ঢালের বুকে একটা ছোট পাথুরে বাড়িসহ ছয় হাজার বর্গমিটার জায়গা কিনেছিলেন। ‘তার পরই বাড়িটা বেড়ে উঠতে শুরু করে, মানুষের মতো, গাছপালার মতো।’

নেরুদার আরো বাড়ি আছে—সান্তিয়াগোয় স্যান ক্রিস্তোবালে একটা, আরেকটা ভালপারাসিওতে। বাড়ি সাজাতে রাজ্যের জিনিসের খোঁজে বিভিন্ন অ্যান্টিক শপ এবং জাংক ইয়ার্ড ঢুঁড়ে বেরিয়েছেন তিনি। প্রতিটি জিনিস তাকে কোনো একটা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘ওটাকে স্তালিনের মতো লাগে না?’ ইসলা নেগ্রায় খাওয়ার ঘরে রাখা ইংরেজ অভিযাত্রী মরগানের আবক্ষ মূূর্তির দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ‘অ্যান্টিক ডিলার আমার কাছে ওটা বেচতে চায়নি; কিন্তু আমি চিলির মানুষ শোনার পর পাবলো নেরুদাকে চিনি কিনা জানতে চাইল সে। এভাবেই ওটা বিক্রি করতে রাজি করিয়েছিলাম।’

এ ইসলা নেগ্রাতেই ‘জাগতিক পর্যটক’ পাবলো নেরুদা এবং তার তৃতীয় স্ত্রী মাতিলদে (যাকে ভালোবেসে ‘পাতোহা’ ডাকেন, যাকে উদ্দেশ করে বহু প্রেমের কবিতা লিখেছেন) সবচেয়ে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছেন।

তার দীর্ঘ, সুঠাম দেহ, জলপাই রঙ চেহারা, তার অনন্য বৈশিষ্ট্য নাক এবং ঢুলুঢুলু পাপড়ির বড় বড় সবুজ চোখ। চলাফেরা শ্লথ হলেও দৃঢ়। ভণিতা ছাড়াই স্পষ্ট করে কথা বলেন। যখন হাঁটতে বের হন—সাধারণত দুটো পোষা কুকুর নিয়ে—দীর্ঘ পঞ্চো পরেন, হাতে থাকে একটা মামুলি ছড়ি।

ইসলা নেগ্রায় নেরুদা অবিরাম অতিথিদের স্বাগত জানান। শেষ মুহূর্তে হাজির হওয়া মেহমানের জন্য সবসময়ই খাওয়ার টেবিলে জায়গা থাকে। নেরুদা বেশির ভাগ মেহমানদারি করেন বারে, সৈকতের দিকে খোলা টেরাস থেকে ছোট একটা করিডোর হয়ে ঢুকতে হয় ওখানে। করিডোরের মেঝেতে একটা ভিক্টোরীয় বিডেট এবং একটা পুরনো অর্গান রয়েছে। জানালার তাকে নানা ধরনের বোতলের সংগ্রহ। সিলিং ও কাঠের কড়িবর্গার গায়ে নেরুদার হাতের লেখার অনুকরণে ছুতোর তার মৃত বন্ধুদের নাম খোদাই করেছে।

বারের পেছনে লিকার শেলফে একটা সাইনবোর্ডে লেখা নো সে ফিয়া (বাকি হবে না)। নেরুদা বারটেন্ডারের ভূমিকাকে ভীষণ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে থাকেন। মেহমানদের জন্য বিভিন্ন পদের পানীয় তৈরি করেন, যদিও নিজে স্রেফ স্কচ আর ওয়াইন পান করেন। দেয়ালে দুটো নেরুদাবিরোধী পোস্টার সাঁটা, কারাকাসে শেষবার সফরের সময় কিনে এনেছেন একটা। ওটায় ‘নেরুদা ফিরে যাও’ লেখাসহ তার প্রোফাইল দেখা যাচ্ছে। অন্যটি তার ছবিঅলা এক আর্জেন্টেনীয় সাময়িকীর প্রচ্ছদ এবং ‘নেরুদা আত্মহত্যা করছেন না কেন?’ লেখা। ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত ঝুলছে টুইগির একটা বিশাল পোস্টার।

ইসলা নেগ্রার খাবার সাধারণত চিলীয় হয়ে থাকে। নেরুদা তার কবিতায় সেগুলোর কোনো কোনোটার কথা উল্লেখ করেছেন: কংগার-ঈল স্যুপ, টমেটোর পাতলা ঝোল এবং বাচ্চা চিংড়ি দিয়ে মাছ, মাংসের পাই। মদ সবসময়ই চিলীয়। পাখির আদলের একটা মদের ভাণ্ড মদ ঢালার সময় গান গেয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে একটা অ্যান্টিক রেল ইঞ্জিনঅলা বাগানে দুপুরের খাবার পরিবেশিত হয়।

সংক্ষিপ্ত বৈঠকে এ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সকালে নেরুদা নিজের ঘরে নাশতা সারার পর লাইব্রেরিতে মিলিত হতাম আমরা। বাড়ির নতুন অংশে পড়েছে সেটা। তিনি বিভিন্ন মেইলের জবাব দেয়ার এবং নতুন বইয়ের কবিতা রচনা বা টুয়েন্টি লাভ পোয়েমসের নতুন চিলীয় সংস্করণের গ্যালিপ্রুফ সংশোধনের সময় আমি অপেক্ষা করতাম। কবিতা রচনার সময় একটা সাধারণ কম্পোজিশন খাতায় সবুজ কালিতে লিখে থাকেন তিনি। বেশ অল্প সময়েই মোটামুটি দীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলতে পারেন, শেষে অল্প কিছু সংশোধন করেন। এরপর কবিতাগুলো তার সচিব ও ৫০ বছরের বেশি সময়ের বন্ধু হোমেরো আর্সে টাইপ করেন।

বিকালে তার দৈনন্দিন ঘুমের পর আমরা সাগরের দিকে খোলা টেরাসে একটা পাথুরে বেঞ্চে বসতাম। টেপ রেকর্ডারের মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে কথা বলতেন নেরুদা, সেটা তার কণ্ঠস্বরের পটভূমিতে সাগরের গর্জনও তুলে নিত।

 

প্রশ্ন: আপনি নাম বদলেছিলেন কেন, পাবলো নেরুদাই বেছে নিলেন কেন?&dquote;&dquote;

উত্তর: মনে নেই। তখন মাত্র ১৩ কি ১৪ বছর বয়স ছিল আমার। মনে আছে আমার লেখালেখি করার ইচ্ছাটা বাবাকে বেশ ত্যক্ত করত। তার ধারণা ছিল লেখালেখি পরিবার ও আমার ধ্বংস ডেকে আনবে এবং বিশেষ করে আমাকে এক অর্থহীন জীবনের দিকে নিয়ে যাবে। এমন চিন্তার পেছনে পারিবারিক কারণ ছিল তার, সেটা আমার ওপর তেমন প্রভাব ফেলেনি। এটা ছিল আমার নেয়া প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর প্রথমটি—নাম পাল্টে ফেলা।

প্রশ্ন: চেক কবি জান নেরুদার কারণেই কি ‘নেরুদা’ বেছে নিয়েছিলেন?

উত্তর: তার একটা ছোটগল্প পড়েছিলাম। কখনো তার কবিতা পড়িনি, তবে প্রাগের সেই পাড়ার বিনয়ী বাসিন্দাদের নিয়ে স্টোরিজ ফ্রম মালা স্ত্রানা নামে তার একটা বই আছে। সম্ভবত আমার নতুন নাম ওটা থেকেই এসেছে। যেমন বললাম, পুরো ব্যাপারটা আমার স্মৃতির এত আড়ালে চলে গেছে যে মনে পড়ে না। তা সত্ত্বেও চেকরা আমাকে তাদেরই একজন, তাদের জাতির অংশ ভাবে। কিন্তু ওদের সঙ্গে আমার কখনো বন্ধুসুলভ যোগাযোগ ছিল না।

প্রশ্ন: আপনি চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন যদি, লেখালেখি চালিয়ে যেতেন কি?

উত্তর: আমার কাছে লেখালেখি শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। আমি শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া বাঁচব না; লেখালেখি ছাড়াও বাঁচব না।

প্রশ্ন: সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দায়িত্ব আকাঙ্ক্ষী কোন কোন কবি সফল হয়েছেন?

উত্তর: আমাদের এ সময়টা কবিদের হাতে পরিচালিত একটা যুগ—মাও সে দং ও হো চি মিন। মাও সে দংয়ের অন্য আরো গুণও আছে: আপনি যেমন জানেন, তিনি একজন দক্ষ সাঁতারু, আমি যা নই। একজন মহান কবিও আছেন, সেনেগালের প্রেসিডেন্ট লেপল্ড সেংঘর; আরেক পরাবাস্তববাদী কবি এইমি সেরাইরে মার্তিনিকের ফোর্ট-দে-ফ্রান্সের মেয়র। আমার দেশে কবিরা সবসময়ই রাজনীতিতে নাক গলিয়ে এসেছেন, যদিও প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমরা কখনো কোনো কবিকে পাইনি। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এমন লেখক আছেন—রোমুলো গ্যালোগোস ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

প্রশ্ন: আপনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা কেমন চালাচ্ছেন?

উত্তর: একটা মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রথমে সবসময় লোকগান গাওয়া হয়, এরপর দায়িত্বশীল কেউ আমাদের প্রচারণার কঠোরভাবে রাজনৈতিক ব্যাপ্তি ব্যাখ্যা করেন। এরপর শহরবাসীর সঙ্গে কথা বলতে আমার সুরটা হয় অনেক বেশি খোলামেলা, সেভাবে গোছালো নয়; ঢের বেশি কাব্যিক ধরনের। প্রায় সবসময় কবিতা দিয়েই শেষ করি। আমি কবিতা না পড়লে লোকজন হতাশ হয়ে ফিরে যায়। ওরা আমার রাজনৈতিক চিন্তার কথাও শুনতে চায় বৈকি, কিন্তু মানুষের অন্য ধরনের ভাষার দরকার আছে বলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করি না।

প্রশ্ন: আপনি কবিতা আবৃত্তি করার সময় মানুষের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়?

উত্তর: খুবই আবেগপ্রবণভাবেই ওরা আমার কবিতা ভালোবাসে। আমি কোথাও যেতে বা কোনো জায়গা থেকে বেরুতে পারি না। লোকজন আমাকে ঘিরে ফেলায় জটলা থেকে আমাকে বাঁচাতে বিশেষ এস্কর্ট আছে আমার। সবখানেই এমনটা ঘটছে।

প্রশ্ন: আপনাকে চিলির প্রেসিডেন্ট পদ ও নোবেল পুরস্কারের ভেতর যেকোনো একটা বেছে নিতে হলে কোনটা বেছে নিতেন? নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে প্রায়ই আপনার নাম উচ্চারিত হচ্ছে।

উত্তর: এ ধরনের অবাস্তব বিষয়ের ভেতর থেকে বেছে নেয়ার কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না।

প্রশ্ন: কিন্তু ওরা ওই টেবিলে প্রেসিডেন্ট পদ আর নোবেল পুরস্কার এনে রাখলে?&dquote;&dquote;

উত্তর: সেটা করলে আমি উঠে অন্য টেবিলে গিয়ে বসব।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন স্যামুয়েল বেকেটকে নোবেল পুরস্কার দেয়া ন্যায্য ছিল?

উত্তর: হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি। বেকেট সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিচিত্র বিষয়ে লেখালেখি করেন। নোবেল পুরস্কার যেখানেই যাক না কেন, এটা সবসময়ই সাহিত্যের প্রতি সম্মান। নোবেল পুরস্কার ঠিক হাতে গেছে কিনা, এটা নিয়ে যারা সবসময় তর্কে মেতে থাকেন, আমি তাদের একজন নই। এ পুরস্কারের যে দিকটা গুরুত্বপূর্ণ—যদি কোনো গুরুত্ব থেকে থাকে—লেখকের প্রতি সম্মানের খেতাব তুলে দেয়। এটাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: আপনার সবচেয়ে তীব্র স্মৃতিগুলো কী?

উত্তর: আমি জানি না। সম্ভবত স্পেনে কবিদের মহান সাহচর্যে আমার জীবনের স্মৃতিই সবচেয়ে প্রবল—আমাদের আমেরিকান জগতে এ ধরনের—বুয়েন্স আয়ার্সে যেমন লোকে বলে—গল্পগুজবে ভরা—কোনো ভ্রাতৃপ্রতিম দলের কথা জানা ছিল না। পরে ওই প্রজাতন্ত্রের গৃহযুদ্ধে বন্ধুদের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করা ভয়ংকর ব্যাপার ছিল, এভাবে ফ্যাসিস্ট নিপীড়নের ভয়াবহ বাস্তবতা ফুটে ওঠে। আমার বন্ধুরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন: গার্সিয়া লোরকা ও মিগেল হের্নান্দেসের মতো কাউকে কাউকে এখানেই মেরে ফেলা হয়।  অন্যরা নির্বাসনে মারা গেছেন। আরো অনেকে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

প্রশ্ন: ওরা কি এখন আপনাকে স্পেনে যেতে দেবে?

উত্তর: সরকারিভাবে আমার যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা নেই। একবার চিলির দূতাবাস থেকে ওখানে আবৃত্তি করতে যাওয়ার দাওয়াত পেয়েছিলাম। খুব সম্ভবত ওরা আমাকে যেতে দেবে। কিন্তু আমি একে সেভাবে গুরুত্ব দিতে চাই না, কারণ এটা হয়তো স্পেনীয় সরকারের পক্ষে এর বিরুদ্ধে প্রবলভাবে লড়াই চালানো কাউকে যেতে দিয়ে এক ধরনের গণতান্ত্রিক মনোভাব দেখানোর পক্ষে সুবিধাজনক হয়ে থাকতে পারে। আমি জানি না। আমাকে অনেক দেশেই ঢুকতে দেয়া হয়নি, আবার বহু দেশকেই আমি ফিরিয়ে দিয়েছি, তাই ব্যাপারটা এখন আর আমার ভেতর আগের মতো অস্বস্তি তৈরি করে না।

প্রশ্ন: একদিক থেকে গার্সিয়া লোরকার মৃত্যুর আগেই তাকে নিয়ে লেখা আপনার কবিতা তার করুণ প্রস্থানের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল।

উত্তর: হ্যাঁ, ওই কবিতাটা অদ্ভুত ছিল। অদ্ভুত, কারণ তিনি এত হাসিখুশি, এত প্রফুল্ল মানুষ ছিলেন, ওর মতো মানুষ খুব কমই দেখেছি। তিনি ছিলেন...বেশ, সাফল্যের কথা বলব না, জীবনের প্রতি ভালোবাসার প্রতিমূর্তি। অস্তিত্বের প্রতিটি মিনিট উপভোগ করেছেন—সুখের এক বিরাট অপব্যয়ী। এ কারণেই তার হত্যাকাণ্ডের অপরাধ ফ্যাসিবাদের ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোর একটি।

প্রশ্ন: প্রায়ই আপনি আপনার কবিতায় তার কথা—এবং মিগেল হের্নান্দেসের কথাও—উল্লেখ করেন।

উত্তর: হের্নান্দেস ছিল আমার ছেলের মতো। কবি হিসেবে অনেকটা আমার শিষ্যের মতোই; এক অর্থে আমার বাড়িতেই থাকত। গার্সিয়া লোরকার মৃত্যুসংক্রান্ত সরকারি ভাষ্য অস্বীকার করাতেই তাকে কারাগারে যেতে হয় এবং ওখানেই সে মারা যায়। ওদের ব্যাখ্যা ঠিক হয়ে থাকলে ফ্যাসিস্ট সরকার কেন মৃত্যু পর্যন্ত মিগেল হের্নান্দেসকে জেলে আটকে রাখল? চিলির দূতাবাসের কথামতো ওকে হাসপাতালে নিতে কেন অস্বীকৃতি জানাল? মিগেল হের্নান্দেসের মৃত্যুও হত্যাকাণ্ডই ছিল।

প্রশ্ন: ভারতে আপনার অবস্থানকালীন সবচেয়ে বেশি কী মনে আছে?

উত্তর: ওখানে আমার অবস্থান ছিল এক ধরনের সাক্ষাৎ, যার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। ওই অচিন মহাদেশের জৌলুস আমাকে অভিভূত করে দিয়েছিল কিন্তু তবু মরিয়া বোধ হয়েছে আমার, কারণ ওখানে আমার জীবন ও নিঃসঙ্গতা ছিল বেশ দীর্ঘ। অনেক সময় অন্তহীন টেকনিকালার ছবিতে আটকা পড়ে গেছি বলে মনে হতো—এক অনন্য চলচ্চিত্র, যেটা থেকে আমি বিদায় নিতে পারব না। ভারতে এত বেশি দক্ষিণ আমেরিকান এবং অন্যান্য দেশের লোকদের পথ দেখানো অতীন্দ্রিয়বাদের অভিজ্ঞতা আদৌ ছিল না আমার। উত্কণ্ঠার একটি ধর্মীয় উত্তরের খোঁজে যারা ভারতে যান, তারা ভিন্ন দৃষ্টিতে সবকিছু দেখেন। আমার বেলায়, সামাজিক অবস্থা দেখে ভীষণ অলোড়িত হয়েছি—সাম্রাজ্যবাদী শাসনের জাঁতাকলে আটকে থাকা বিশাল নিরস্ত্র, প্রতিরক্ষাহীন একটা জাতি। এমনকি ইংরেজি সাহিত্য, যার প্রতি আমার বিরাট দুর্বলতা রয়েছে, সেই সময় অসংখ্য হিন্দুর বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণের হাতিয়ার হওয়ার কারণে আমার কাছে ঘৃণ্য মনে হয়েছে। আমার কনস্যুলার পদবি সত্ত্বেও আমি ওই মহাদেশের বিদ্রোহী তরুণদের সঙ্গে মিশেছি। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা নিয়ে আসা মহান আন্দোলনে যারা জড়িত, সব বিদ্রোহীকেই চিনতাম। 

প্রশ্ন: আপনি কি ভারতেই রেসিডেন্স অন আর্থ লিখেছিলেন?

উত্তর: হ্যাঁ, যদিও আমার কবিতায় ভারতের খুবই সামান্য বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব রয়েছে।

প্রশ্ন: রেঙ্গুন থেকেই তো আর্জেন্টাইন হেক্তর ইয়ান্দিকে সেই অবেগপ্রবণ চিঠিগুলো লিখেছিলেন?

উত্তর: হ্যাঁ। চিঠিগুলো আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমার অচেনা ওই লেখক নিজে থেকে আমাকে ভীষণ নিঃসঙ্গতায় সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন খবর আর সাময়িকী পাঠিয়েছেন। নিজের ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক খোয়ানোর ভয়ে ছিলাম আমি। অনেক বছর স্প্যানিশভাষী কারো সঙ্গে দেখা হয়নি। রাফায়েল আলবার্তিকে লেখা এক চিঠিতে আমি একটা স্প্যানিশ ডিকশনারি পাঠাতে বলেছিলাম। আমাকে কনসাল পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু সেটা নিম্নপর্যায়ের পদ ছিল, কোনো মজুরি ছিল না। ভীষণ দারিদ্র্য এবং দারুণ নিঃসঙ্গতায় ছিলাম। সপ্তাহের পর সপ্তাহ দ্বিতীয় কোনো মানুষের দেখা মিলত না।

প্রশ্ন: ওখানে থাকতেই জোসি ব্লিসের সঙ্গে দারুণ প্রেম গড়ে উঠেছিল আপনার, যার কথা আপনার অনেক কবিতাতেই উল্লেখ করেছেন।

উত্তর: হ্যাঁ, জোসি ব্লিস আমার কবিতায় গভীর প্রভাব রেখে যাওয়া একজন নারী। ওর কথা সবসময়ই ভাবি। এমনকি আমার সাম্প্রতিক বইগুলোয়ও।

প্রশ্ন: তাহলে আপনার রচনা আপনার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত?

উত্তর: স্বভাবতই। একজন কবির জীবন অবশ্যই তার কবিতায় উঠে আসতে হবে। এটাই শিল্প ও জীবনের ধর্ম।

প্রশ্ন: আপনার রচনাকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে, নাকি?

উত্তর: এ ব্যাপারে আমার ভীষণ বিভ্রান্তিকর ভাবনা রয়েছে। আমার নিজস্ব কোনো পর্যায় নেই; এসব আবিষ্কার করেছেন সমালোচকরা। আমার কিছু বলার থাকলে সেটা হলো, আমার কবিতায় এক ধরনের জীবনের বৈশিষ্ট্য আছে—আমি ছোট থাকতে শিশুসুলভ, আমার তরুণ বয়সে কৈশোরিক, আমার দুর্ভোগের সময় বিষণ্ন, আমাকে সামাজিক সংগ্রামে নামতে হয়েছিল যখন, তখন লড়াকু। আমার এখনকার কবিতায় ওইসব প্রবণতার একটা মিশেল উপস্থিত রয়েছে। আমি সবসময়ই অন্তঃস্থ চাহিদা থেকে লিখেছি এবং সব লেখক বিশেষত কবির বেলাতেই এটা ঘটে বলে মনে করি।

প্রশ্ন: আপনাকে গাড়িতে বসে লিখতে দেখেছি।

উত্তর: যেখানে যখন পারি লিখি, অবশ্য আমি সবসময়ই লেখার ওপর থাকি।

প্রশ্ন: আপনি কি বরাবরই সবকিছু বড় হাতের হরফে লেখেন?

উত্তর: একটা দুর্ঘটনায় পড়ে আঙুল ভেঙে ফেলার পর কয়েক মাস টাইপরাইটার ব্যবহার করতে পারছিলাম না যখন, তখন থেকে নিজের কম বয়সের কায়দায় হাতে লিখতে শুরু করি। আমার আঙুল কিছুটা ভালো হয়ে উঠলে দেখলাম আবার টাইপ করতে পারছি কিন্তু হাতে লেখা কবিতাই ঢের সংবেদনশীল, এর প্লাস্টিক রূপ অনায়াসে বদলে যেতে পারে। এক সাক্ষাৎকারে রবার্ট গ্রেভস বলেছেন, চিন্তার খাতিরে কারো আশপাশে যতদূর সম্ভব ঘরে তৈরি নয়, এমন জিনিস রাখা উচিত। তিনি আরো বলতে পারতেন যে কবিতা হাতেই লেখা উচিত। টাইপরাইটার কবিতার সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল এবং আমার হাত আবার সেই ঘনিষ্ঠতা ফিরিয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন: আপনার কাজের সময় কোনটা?

উত্তর: আমার কোনো ধরাবাঁধা সময় নেই, তবে সকালে লিখতেই পছন্দ করি। যার মানে, আপনি যদি এখানে আমার সময় (এবং আপনার সময়ও) নষ্ট করতে বাধ্য না করতেন, তাহলে এখন লিখতাম। দিনের বেলায় তেমন বেশি কিছু পড়ি না, বরং সারা দিন লিখতেই পছন্দ করব কিন্তু প্রায়ই কোনো একটা ভাবনার, অভিব্যক্তি, একটা কিছুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ভীষণভাবে আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে—আসুন একে প্রাচীন বুলি ‘অনুপ্রেরণা’ বলা যাক—আমাকে তা সন্তুষ্ট বা পরিশ্রান্ত অথবা শূন্য করে দেয়। মানে আমি আর এগোতে পারি না। এছাড়া সারা দিন নিজের ডেস্কে কাটাতে পছন্দ করি। আমার জীবনের, আমার সংসারের, রাজনীতি ও প্রকৃতির প্রবহমানতায় অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। আমি সর্বক্ষণ যাওয়া-আসার ভেতর আছি। কিন্তু যখন যেখানে পারি, প্রবলভাবে লিখে যাই। চারপাশে অসংখ্য লোকজন থাকার ব্যাপারটা আমাকে স্পর্শ করে না।

প্রশ্ন: নিজেকে চারপাশের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেন?&dquote;&dquote;

উত্তর: নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি এবং সবকিছু সহসা নীরব হয়ে গেলে তখন আমার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন: আপনি কখনই গদ্যের প্রতি খুব বেশি নজর দেননি।

উত্তর: গদ্য...সারা জীবন পঙিক্তরূপেই লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি আমি। গদ্যের প্রকাশভঙ্গি আমাকে আগ্রহী করে না। আমি সত্যিকার অর্থে বর্ণনার দিকে বাঁক নিতে চায় এমন বিশেষ ধরনের চকিত আবেগ বা ঘটনাকে প্রকাশের জন্য গদ্য ব্যবহার করি। সত্যি কথা হলো, আমি গদ্য রচনা পুরোপুরি বাদ দিতে পারি। এটা স্রেফ সাময়িক ভিত্তিতেই করি। 

প্রশ্ন: আপনার রচনাকে আগুনের কবল থেকে বাঁচাতে চাইলে কোনটা বাঁচাবেন?

উত্তর: সম্ভবত একটাও না। সেসব কী কাজে লাগবে আমার? আমি বরং একটা মেয়েকে...কিংবা গোয়েন্দা গল্পের একটা সংগ্রহই বাঁচাব...যেগুলো আমার লেখার চেয়ে ঢের বেশি আনন্দ দেবে আমাকে।

প্রশ্ন: আপনার সমালোচকদের ভেতর কারা আপনার রচনা সবচেয়ে ভালো বুঝতে পেরেছেন?

উত্তর: ওহ! আমার সমালোচক! আমার সমালোচকরা তো বলতে গেলে দুনিয়ার সব ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার সঙ্গে আমাকে ছিন্নভিন্ন করে ছেড়েছেন! শিল্পকর্মের মতো জীবনের পক্ষে সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়। এ অবস্থা সবসময়ই আমাদের সঙ্গী। সবসময়ই কাউকে চুম্বন আর চড় খেতে হয়, আদর এবং লাথি হজম করতে হয়। এটাই কবির জীবন। আমাকে যেটা কষ্ট দেয় সেটা হলো, কারো জীবনের কবিতা বা ঘটনার ব্যাখ্যার বিকৃতি। যেমন নিউইয়র্কে পেন ক্লাব কংগ্রেস চলার সময়—বিভিন্ন জায়গা থেকে অসংখ্য লোককে একত্র করে এই অনুষ্ঠান—আমি আমার সামাজিক কবিতা—কিউবার বিপ্লবের সমর্থনে রচিত কিউবার উদ্দেশে নিবেদিত কবিতা পড়েছিলাম এবং ক্যালিফোর্নিয়ায়ও সেগুলোর বেশ কয়েকটা পড়েছিলাম। অথচ কিউবার লেখকরা আমার মতের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে একটা চিঠি স্বাক্ষর করে কয়েক মিলিয়ন কপি বিলি করেছেন, যেখানে আমাকে উত্তর আমেরিকানদের প্রতিরক্ষাধীন একজন হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তারা এমনকি এও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমার প্রবেশ এক ধরনের পুরস্কার ছিল! এটা ঈর্ষা না হলেও রীতিমতো নির্বুদ্ধিতা, যেহেতু বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে থেকে বহু লেখক এসেছিলেন; এমনকি কিউবার লেখকদের আগমনও প্রত্যাশিত ছিল। নিউইয়র্কে গিয়ে আমরা আমাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চরিত্র হারাইনি। তা সত্ত্বেও সেটাই বোঝানো হয়েছে, হয় তাড়াহুড়োর কারণে অথবা কিউবার লেখকদের মন্দ বিশ্বাসের কারণে। সত্যি কথা হলো, এ মুহূর্তে আমার সত্যিকারের বিপ্লবী ইতিহাস রয়েছে। বিপ্লবী রচনার প্রতি নিবেদনের তুলনা করতে গেলে, আমি যা করেছি আর যার জন্য যুদ্ধ করেছি, তার একশ ভাগের এক ভাগের সমান হতে পারার মতো ওই চিঠিতে স্বাক্ষরকারী কোনো লেখক খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে।

প্রশ্ন: আপনার জীবনযাত্রার ধরন এবং আপনার অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে আপনি সমালোচিত হয়েছেন।

উত্তর: সাধারণভাবে গোটা ব্যাপারটাই মিথ। এক অর্থে স্পেনের কাছ থেকে বলতে গেলে আমরা খুবই মন্দ উত্তরাধিকার পেয়েছি, যে দেশটি কখনই তার দেশের লোকদের কোনো ব্যাপারে আলাদা বা সম্মানিত হওয়ার ব্যাপারটা সহ্য করতে পারে না। ক্রিস্টোফার কলম্বাস দেশে ফেরার পর তাকে ওরা শিকলবন্দি করেছে। এটা আমরা পেয়েছি ঈর্ষাতুর পাতি বুর্জোয়াদের কাছ থেকে। এরা কেবল অন্যদের কী আছে আর ওদের কী নেই, সেটাই ভাবে। আমার নিজের ক্ষেত্রে আমি আমার জীবনকে সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য উৎসর্গ করেছি। আমার বাড়িতে যা আছে—আমার বই—আমার নিজের কাজেরই ফল। আমি কাউকে শোষণ করিনি। এটা অদ্ভুত। আমি যে ধরনের ভর্ত্সনার শিকার হই, জন্মগতভাবে ধনী লেখকদের কিন্তু তেমন ভর্ত্সনা করা হয় না! বরং আমার প্রতি করা হয়—যে লেখকের পেছনে ৫০ বছরের পরিশ্রম রয়ে গেছে। ওরা সবসময় বলছে, ‘দেখ, দেখ কীভাবে জীবন যাপন করে সে। সাগরমুখী একটা বাড়ি আছে তার। দামি মদ খায়।’ কী বাজে কথা! প্রথম কথা, চিলিতে বাজে মদ  খাওয়াই কঠিন, কারণ চিলির প্রায় সব মদই ভালো। এটা একটা সমস্যা, যেটা বিশেষ একটা উপায়ে আমাদের দেশের অনুনন্নয়নকে, মোদ্দাকথা আমাদের চিন্তাভাবনার মাঝারি মানই তুলে ধরে। আপনি নিজেই আমাকে বলেছিলেন, নরম্যান মেইলারকে এক উত্তর আমেরিকান সাময়িকীতে তিনটা প্রবন্ধ লেখার বিনিময়ে প্রায় ৯০ হাজার ডলার দেয়া হয়েছে। এখানে কোনো লাতিন আমেরিকান লেখক এই পরিমাণ টাকা যদি পান, তো একজন লেখকের এ ধরনের পারিশ্রমিক দাবি করতে পারায় খুশি হওয়ার বদলে অন্য লেখকদের তরফ থেকে প্রতিবাদ উঠবে—‘কী অবিশ্বাস্য কথা! কী ভয়ংকর! এর শেষ হবে কোথায়?’—বেশ, যেমন বললাম, এগুলো সাংস্কৃতিক অনুন্নতি হিসেবে চালু থেকে যাওয়া দুর্ভাগ্য।

প্রশ্ন: আপনি কমিউনিস্ট পার্টিতে আছেন বলেই কি এ অভিযোগ আরো বেশি জোরালো নয়?

উত্তর: একদম। যার কিছুই নেই—বহুবার বলা হয়েছে একথা—তার শিকল ছাড়া হারানোর কিছুই নেই। আমি প্রতিটি মুহূর্তে আমার জীবন, আমার সত্তা, আমার সমস্ত কিছু—আমার বই, আমার বাড়ি—ঝুঁকিতে ফেলছি। আমার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আমার ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে, একাধিকবার আমাকে আটক করা হয়েছে, আমাকে নির্বাসিত করা হয়েছে, আমাকে ওরা একঘরে করেছে, হাজার হাজার পুলিশ আমাকে খুঁজে বেরিয়েছে। খুবই ভালো, তবে আমার যা কিছু আছে সেসব নিয়ে আমি স্বস্তিতে নেই। তো আমার যা আছে, সবই মানুষের পক্ষে সংগ্রামের জন্য উৎসর্গ করেছি এবং আপনি যে বাড়িতে এখন আছেন, সেটাও ২০ বছর ধরে কমিউনিস্ট পার্টির মালিকানায়। পাবলিক রিট করে এটা ওদের হাতে তুলে দিয়েছি। এ বাড়িতে আছি স্রেফ পার্টির দয়ায়। ঠিক আছে, যারা আমাকে নিন্দা করেন, তাদেরও একই কাজ করতে দিন, অন্তত ওদের জুতোজোড়া কোথাও তুলে রেখে দিন, যাতে সেগুলো আর কারো কাছে পাঠানো যায়!

প্রশ্ন: আপনি বিভিন্ন লাইব্রেরি দান করেছেন। আপনি কি এখন ইসলা নেগ্রায় রাইটার্স কলোনির প্রজেক্টের সঙ্গে জড়িত নন?

উত্তর: আমি আমার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একাধিক পূর্ণাঙ্গ লাইব্রেরি দান করেছি। আমি আমার বই থেকে পাওয়া আয়ে চলি। আমার কোনো সঞ্চয় নেই। প্রতি মাসে আমার বইয়ের বিনিময়ে যা দেয়া হয়, তার বাইরে বিক্রি করার মতো আমার কিছুই নেই। এ আয়ে ইদানীং আমি উপকূলে এক টুকরো জমি জোগাড় করছি, যাতে ভবিষ্যতে লেখকরা ওখানে গ্রীষ্মকাল কাটাতে পারেন এবং অনন্য সৌন্দর্যমণ্ডিত পরিবেশে সৃজনশীল কাজ করতে পারেন। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব চিলি এবং সোসাইটি অব রাইটার্সের পরিচালকদের নিয়ে এটা হবে কান্তালাও ফাউন্ডেশন।

প্রশ্ন: টুয়েন্টি লাভ পোয়েমস অ্যান্ড আ সং অব ডিসপেয়ার আপনার প্রথম দিকের বইগুলোর একটি, হাজার হাজার ভক্তের পাঠ অব্যাহত আছে।

উত্তর: ওই বইয়ের এক মিলিয়ন কপি প্রকাশ উদযাপন উপলক্ষে প্রকাশিত সংস্করণের ভূমিকায় আমি বলেছি—অচিরেই দুই মিলিয়ন কপি হয়ে যাবে—পুরো ব্যাপারটা কি সত্যি বুঝি না—এই বইটি কেন, প্রেম-বিষণ্নতা, ভালোবাসা-যন্ত্রণার একটি বই এত এত লোক পড়ে যাচ্ছে, এত অসংখ্য তরুণ পড়ছে। সত্যি, আমি বুঝি না। হতে পারে এ বইটি বহু হেঁয়ালির তারুণ্য ভরা উপস্থাপন তুলে ধরেছে, হতে পারে এটা সেইসব হেঁয়ালির উত্তর তুলে ধরেছে। এটা শোকার্ত একটা বই কিন্তু এর আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনি বহুল অনূদিত কবিদের অন্যতম—প্রায় ৩০টি ভাষায় আপনার বই অনূদিত হয়েছে। কোন ভাষায় আপনার লেখার সেরা অনুবাদ হয়েছে?

উত্তর: আমি বলব ইতালীয় ভাষায়, দুটো ভাষার মিলের কারণে। ইতালীয় ভাষার বাইরে আমি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা জানি, এ দুটো ভাষা উচ্চারণ কিংবা শব্দ চয়ন বা বর্ণ বা শব্দের ওজনের দিক থেকে স্প্যানিশের সঙ্গে মেলে না। এটা ব্যাখ্যামূলক মিলের প্রশ্ন নয়; না, অনুভবটুকু ঠিক থাকতে পারে কিন্তু তর্জমা, অর্থের এ শুদ্ধতা একটি কবিতার জন্য ধ্বংস হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফরাসি ভাষায় বহু অনুবাদে—আমি বলব না সবগুলো—আমার কবিতা হারিয়ে গেছে, কিছুই অবশিষ্ট নেই; কিন্তু প্রতিবাদ করার জো নেই, কারণ সেটা লিখিতটির মতো একই কথা বলছে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে আমি ফরাসি কবি হলে ওই কবিতায় যা বলেছি সেটা বলতাম না, শব্দের মূল্য এতটাই ভিন্ন। হয়তো ভিন্ন কিছু লিখতাম।

প্রশ্ন: আর ইংরেজি?

উত্তর: ইংরেজি ভাষা স্প্যানিশ থেকে এত বেশি ভিন্ন মনে হয়—অনেক বেশি প্রত্যক্ষ—অনেক সময় এটা আমার কবিতার অর্থ প্রকাশ করে কিন্তু কবিতার পরিবেশ বর্ণনা করে না। ইংরেজি কবিতা স্প্যানিশে রূপান্তরের বেলায়ও হয়তো একই ব্যাপার ঘটে।

প্রশ্ন: বললেন গোয়েন্দা কাহিনীর বিশাল পাঠক আপনি। আপনার প্রিয় লেখক কারা?

উত্তর: এ ধরনের লেখার একটা বিরাট সাহিত্যিক রচনা এরিক অ্যাম্বলারের আ কফিন ফর দিমিত্রিওস। ওটার পর বলতে গেলে অ্যাম্বলারের সব লেখাই পড়েছি কিন্তু কোনোটিরই আ কফিন ফর দিমিত্রিওসের মৌলিক অনন্যতা, অসাধারণ কৌতূহল আর রহস্যময় পরিবেশ নেই। সিমেননও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আসলে জেমস হ্যাডলি চেজই ত্রাস, ভীতি আর বিধ্বংসী চেতনায় লিখিত সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছেন। নো অর্কিডস ফর মিস ব্ল্যান্ডিশ পুরনো বই হলেও গোয়েন্দা গল্পের বেলায় মাইলফলকই হয়ে আছে। নো অর্কিডস ফর মিস ব্ল্যান্ডিশ এবং উইলিয়াম ফকনারের খুবই বাজে অথচ গুরুত্বপূর্ণ বই স্যাংকচ্যুয়ারির ভেতর অদ্ভুত মিল আছে কিন্তু এ দুটোর ভেতর কোনটা আগে লেখা হয়েছে, ধরতে পারিনি। অবশ্যই গোয়েন্দা কাহিনীর প্রসঙ্গ এলে ড্যাশিয়েল হ্যামেটের কথা মনে পড়ে। তিনিই এ জনরাকে উপসাহিত্যিক কল্পনা থেকে পাল্টে দিয়ে মজবুত মেরুদণ্ড দিয়েছেন। তিনি মহান স্রষ্টা এবং তার পরেই আছেন কয়েকশ, জন ম্যাকডোনাল্ড তাদের ভেতর সবচেয়ে ধারালো। ওদের সবাই দ্রুতপ্রজ লেখক এবং দারুণ পরিশ্রম করেন। এবং এ ঘরানার—গোয়েন্দা কাহিনী—উত্তর আমেরিকার প্রায় সব লেখকই সম্ভবত উত্তর আমেরিকার বিধ্বস্ত পুঁজিবাদী সমাজের কঠোরতম সমালোচক। এসব উপন্যাসে উত্তর আমেরিকার ব্যবস্থা ‘আমেরিকান জীবন ধারা’র সবদিকে আবির্ভূত রাজনীতিক এবং পুলিশের অবসাদ-দুর্নীতি, বড় বড় শহরে অর্থের প্রভাব এবং দুর্নীতির অভিশাপ আর কোথাও এভাবে দেখা যায় না। সম্ভবত এটা একটা কালের সবচেয়ে নাটকীয় সাক্ষী কিন্তু তবু একে সবচেয়ে ক্ষীণ অভিযোগ ভাবা হয়, কেননা গোয়েন্দা কাহিনীকে সাহিত্যিক সমালোচকরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন না।

প্রশ্ন: অন্য আর কী বই পড়েন আপনি?&dquote;&dquote;

উত্তর: আমি ইতিহাসের বিশেষত আমার দেশের পুরনো কাহিনীর পাঠক। চিলির এক অনন্য ইতিহাস আছে। বিভিন্ন সৌধ ও প্রাচীন ভাস্কর্যের কারণে নয়, এখানে যার অস্তিত্ব নেই, বরং চিলি একজন কবি পঞ্চম কার্লোসের একজন অনুচর দোন আলোন্সো দে এরসিলা ই যুনিগা আবিষ্কার করেছেন। তিনি ছিলেন কনকুইস্তাদোরদের সঙ্গে হাজির হওয়া একজন বাস্ক অভিজাত—বেশ অস্বাভাবিক ব্যাপার, কেননা চিলিতে পাঠানো বেশির ভাগ লোকই এসেছিল কারাগার থেকে। বেঁচে থাকার পক্ষে এটা ছিল সবচেয়ে কঠিন জায়গা। আরাউকানীয় ও স্প্যানিশদের ভেতর যুদ্ধ শত শত বছর স্থায়ী ছিল, মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ। আরাউকানীয়দের আধা বুনো গোত্রগুলো তিনশ বছর ধরে স্প্যানিশ হানাদারদের বিরুদ্ধে মুক্তির জন্য লড়াই করেছে। তরুণ মানবতাবাদী দোস আলোন্সো দে এরসিলা ই যুনিগা এসেছিলেন গোটা আমেরিকাকে পদানত করতে আসা দাস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। সত্যি পদানত করেও ছিল। কিন্তু আমরা যাকে চিলি বলি, সেই বুনো অঞ্চলটি বাদে। দোন আলোন্সো ক্যাস্তিলীয় সাহিত্যের দীর্ঘতম মহাকাব্য লা আরকানা লিখেছেন, যেখানে তিনি আরাউকানীয় অজানা বিভিন্ন গোত্রের—অজ্ঞাত বীর, যাদের তিনি প্রথমবারের মতো নাম দিয়েছিলেন—স্বদেশী ক্যাস্তিলীয় সৈনিকদের চেয়ে বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। ষোলো শতকে প্রকাশিত লা আরোকানা গোটা ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রচারিত হয়েছে। এক মহান কবির মহান কবিতা। এভাবে চিলির ইতিহাসের এ মহাকাব্যিক মাহাত্ম্য আর জন্মমুহূর্তের বীরত্ব রয়েছে। স্প্যানিশ ও ইন্ডিয়ান আমেরিকার অন্যান্য সঙ্কর জাতির বিপরীতে আমরা চিলিবাসীরা স্প্যানিশ সৈনিক এবং তাদের ধর্ষণ বা উপপত্নীদের উত্তরাধিকারী নই, বরং যুদ্ধের দীর্ঘ বছরগুলোয় আরাউকানীয়দের সঙ্গে স্প্যানিশ নারীদের স্বেচ্ছা কিংবা জোরজবরদস্তি বিয়ের পরিণাম। আমরা বিশেষ ধরনের ব্যতিক্রম। অবশ্যই এরপর ১৮১০ সাল পরবর্তী রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার ইতিহাসের কথা আসে, করুণ ঘটনা, মতভিন্নতা এবং সংগ্রামে ভরা ইতিহাস; যেখানে স্যান মার্তিন, বলিভার, হোসে মিগেল কারেরা এবং ও’হিগিন্সের নাম সাফল্য ও দুর্ভাগ্যের অন্তহীন পাতায় উঠে এসেছে। এসবই আমাকে মাটি খুঁড়ে বের করা, ধুলি-ময়লা ঝেড়ে ফেলা নানা বইয়ের এক পাঠকে পরিণত করেছে, এ দেশের—সবার কাছ থেকে এত দূরে, এটার দ্রাঘিমাংশের কারণে এত শীতল, এত বিরান...উত্তরের সল্টপিটার প্রান্তর, এর দক্ষিণের বসতি, ভীষণ বরফ ঢাকা আন্দেস, সাগরের কারণে এত ঔজ্জ্বল্য—তাত্পর্য খোঁজার সময় এগুলো আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয়। এই আমার দেশ, চিলি। আমি চিরকালের জন্য চিলিবাসীদের একজন, অন্যরা আমার প্রতি যেমন আচরণই করুক, আমাকে আমার দেশে ফিরে আসতেই হবে। আমি ইউরোপের বিরাট শহরগুলো পছন্দ করি: আর্নো ভ্যালি, কোপেনহাগেন ও স্টকহোমের বিশেষ কিছু রাস্তা পছন্দ করি এবং স্বভাবতই প্যারিস, প্যারিস, প্যারিস কিন্তু তবু আমাকে চিলিতে ফিরে আসতেই হবে।

প্রশ্ন: ‘মাই কনটেম্পোরারিজ’ শািরোনামের এক রচনায় আর্নেস্তো মন্তেনেগ্রো ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার লেখকরা তাদের গদ্যের নবায়ন পেতে চাইলে লাতিন আমেরিকার সহকর্মীদের রচনা নিয়ে গবেষণা করার ব্যর্থ আশা প্রকাশ করায় উরুগুয়ের সমালোচক রদ্রিগেস মোনেগালের সমালোচনা করেছেন। মন্তেনেগ্রো রসিকতা করে বলেছেন যে এটা অনেকটা হাতির উদ্দেশে পিঁপড়ের ‘আমার পিঠে চড়ে বসো, সৈনিক’ বলার মতো। এরপর বোর্হেসকে উদ্ধৃত করেছেন তিনি: ‘বর্বরোচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে এ দেশ (এ মহাদেশ) বিশ্বব্যাপী প্রভাব সৃষ্টিকারী কোনো লেখক তৈরি করেনি—একজন ইমারসন, একজন হুইটম্যান, একজন পো...কোনো মহান মরমি লেখকও—একজন হেনরি জেমস কিংবা মেলভিল—সৃষ্টি করেনি।’

উত্তর: আমাদের মহাদেশে হুইটম্যান, বোদলেয়ার বা কাফকার মতো নাম থাকলে বা না থাকলে কী এসে যায়? সাহিত্যিক সৃষ্টির ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের মতো বড়ই ব্যাপক। আমরা কোনো কেতা চাপিয়ে দিতে পারি না। বিপুল শিক্ষিত মানুষ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রাচীন ঐতিহ্য নিয়ে ইউরোপকে বই বা নিজেদের প্রকাশের উপায়বিহীন আমাদের লাতিন আমেরিকার জনগণের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। কিন্তু পরস্পরের প্রতি পাথর ছুড়ে সময় কাটাতে বা কোনো মহাদেশকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশায় জীবন পার করা আমার কাছে প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গি বলেই মনে হয়। তাছাড়া এসবই ব্যক্তিগত মতামতের বিষয় হতে পারে।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: আপনি কি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে মন্তব্য করবেন?

উত্তর: একটি সাময়িকী, সেটা হন্ডুরাস কি নিউইয়র্ক (স্প্যানিশ ভাষায়) কিংবা মন্তেভিদিও কিংবা গুয়াকিল থেকেই আসুক, আমরা দেখতে পাই সবগুলোই এলিয়ট অথবা কাফকা প্রভাবিত চলতি সেই একই সাহিত্যের ক্যাটালগ তুলে ধরছে। এটা সাংস্কৃতিক উপনিবেশের একটা নজির। আমরা এখনো ইউরোপীয় আদবকেতাতেই জড়িয়ে আছি। যেমন এখানে, চিলিতে যেকোনো গৃহকর্ত্রী আপনাকে কিছু—চীনা প্লেট—দেখানোর সময় সন্তোষের হাসির সঙ্গে বলবেন: ‘এটা আমদানি করা জিনিস।’ লাখ লাখ চিলিবাসীর ঘরে সাজানো ভয়ংকর পোর্সেলিনের বেশির ভাগই আমদানি করা এবং এগুলো জার্মানি ও ফ্রান্সের বিভিন্ন কারখানায় তৈরি সবচেয়ে বাজে জিনিস। আমদানি করা হয়েছে বলেই আজেবাজে জিনিসকে উন্নত মানের হিসেবে মেনে নেয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন: এর জন্য কি অসমরূপতার ভীতি দায়ী?

উত্তর: নিশ্চিতভাবেই অতীতে সবাই, বিশেষ করে লেখকরা বিপ্লবী ধ্যান-ধারণাকে ভয় পেতেন। বর্তমান দশকে এবং বিশেষ করে চিলির বিপ্লবের পর চলতি ফ্যাশন ঠিক তার উল্টো। লেখকরা তাদের চরম বামপন্থী হিসেবে গ্রহণ করা হবে না ভেবে ভয়ে থাকেন, ফলে প্রত্যেকে এক ধরনের গেরিলা টাইপ অবস্থান নেন। বহু লেখক আছেন, যারা কেবল তারা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইতে সামনের কাতারে আছেন নিশ্চিত করতেই লেখেন। আমরা যারা অবিরাম লড়াই করে আসছি, তারা আনন্দের সঙ্গে সাহিত্য নিজেকে জনগণের পাশে খাড়া করতে দেখি। কিন্তু আমরা এও বিশ্বাস করি যে এটা কেবল ফ্যাশনের ব্যাপার হলে এবং লেখকের সক্রিয় বামপন্থী হিসেবে গৃহীত না হওয়ার ভয় হয়ে থাকলে, বেশ, এ ধরনের বিপ্লবীকে নিয়ে আমরা বেশি দূর এগোতে পারব না। শেষমেশ সব ধরনের পশু-প্রাণীই সাহিত্যের জঙ্গলে ঠাঁই পায়। একবার অনেক বছর ধরে অল্প কয়েকজন একগুঁয়ে অত্যাচারীর হামলার শিকার হয়েছিলাম যখন, যারা কেবল আমার কবিতা আর জীবনের ওপর আক্রমণ করেই বেঁচে আছে বলে মনে হয়েছে, আমি বলেছিলাম: ‘ওদের একা থাকতে দাও, এ জঙ্গলে সবার জন্যই জায়গা আছে। আফ্রিকা আর সিলোনের জঙ্গলের বিশাল জায়গা দখল করা হাতির জন্য জায়গা থাকলে নিশ্চয়ই সব কবির জন্যও জায়গা আছে।’

প্রশ্ন: কিছু লোক হোর্হে লুই বোর্হেসের প্রতি বৈরিতার কারণে আপনাকে অভিযুক্ত করে থাকেন।

উত্তর: আমাদের ভিন্ন মানসিক গঠনের কারণে বোর্হেসের প্রতি বৈরিতার অস্তিত্ব হয়তো বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা সাংস্কৃতিক চেহারায় থাকতে পারে। কেউ শান্তিপূর্ণভাবে লড়াই করতে পারেন। কিন্তু আমার ভিন্ন প্রতিপক্ষ রয়েছে, লেখকরা নয়। আমার কাছে শত্রু হলো সাম্রাজ্যবাদ আর আমার প্রতিপক্ষ হচ্ছে পুঁজিবাদী এবং যারা ভিয়েতনামে নাপাম ফেলেছে। বোর্হেস আমার শত্রু নন।

প্রশ্ন: বোর্হেসের লেখা সম্পর্কে কী মনে করেন?

উত্তর: তিনি একজন মহান লেখক। যারা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে, তারা বোর্হেসের অস্তিত্ব থাকায় ভীষণ গর্বিত। বোর্হেসের আগে ইউরোপের লেখকদের সঙ্গে তুলনায় দাঁড়ানোর মতো খুব অল্প লেখকই ছিলেন আমাদের। আমাদেরও মহান লেখক ছিলেন কিন্তু বোর্হেসের মতো সর্বজনীন ধরনের একজন লেখক আমাদের মতো দেশগুলোয় খুব বেশি পাওয়া যায় না। এটা বলতে পারছি না যে তিনিই শ্রেষ্ঠ এবং আমি আশা করি, অন্যরা তাকে বহুবার অতিক্রম করে যাবেন কিন্তু সব দিক থেকে তিনি ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলের পথ খুলে দিয়েছেন এবং আমাদের দেশগুলোর প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু আমার কাছে সবাই চাইছে বলেই বোর্হেসের সঙ্গে আমার যুদ্ধ—আমি কখনই সেটা করতে যাব না। তিনি ডাইনোসরের মতো চিন্তাভাবনা করলে, বেশ তো, আমার চিন্তাভাবনার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সমসাময়িক বিশ্বে কী ঘটছে, তার কিছুই তিনি বোঝেন না; তিনি মনে করেন, আমিও কিছু বুঝি না। সুতরাং আমাদের ভেতর সহমতই আছে।

প্রশ্ন: রোববার আমরা কিছু আর্জেন্টাইন তরুণকে গিটার বাজিয়ে বোর্হেসের লেখা কোনো মিলোংগা গাইতে দেখি। আপনাকে তা প্রীত করে, তাই না?

উত্তর: বোর্হেসের মিলোংগা আমাকে দারুণ আনন্দ দেয়, বিশেষ করে তার কারণ এটা এমনই একজন রুদ্ধ কবি—এ কথাটাই ব্যবহার করা যাক—এমনই একজন অভিজাত ও বুদ্ধিজীবী কবি, এমনই সত্যিকারের এবং বিশেষ ছোঁয়া দিয়ে কোনো জনপ্রিয় ধারণার প্রতি নজর দিতে পারার একটা নজির। বোর্হেসের মিলোংগা ভীষণ পছন্দ করি আমি। লাতিন আমেরিকার কবিদের উচিত তার নজির অনুসরণ করা।

প্রশ্ন: আপনি কি কোনো চিলীয় লোকসংগীত লিখেছেন?

উত্তর: আমি কিছু গান লিখেছি, যেগুলো এ দেশে সুপরিচিত।

প্রশ্ন: রাশিয়ার কবিদের ভেতর কারা আপনার বেশি পছন্দের?

উত্তর: মায়কোভস্কি রাশিয়ান কবিতার দাপুটে ব্যক্তিত্বই রয়ে গেছেন। উত্তর আমেরিকান শিল্প বিপ্লবের বেলায় যেমন ওয়াল্ট হুইটম্যান, তেমনি রুশ বিপ্লবের ক্ষেত্রে আছেন তিনি। মায়কোভস্কি কবিতাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছেন যে প্রায় সব কবিতাই মায়কোভস্কিসুলভ হয়ে গেছে।

প্রশ্ন: রাশিয়া ছেড়ে আসা রুশ লেখকদের ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?

উত্তর: যারা কোনো জায়গা ছেড়ে চলে যেতে চান, তাদের সেটাই করা উচিত। কোনো কোনো সোভিয়েত লেখক সাহিত্যিক সংগঠন বা তাদের দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বেলায় নিজেদের অসন্তুষ্ট ভাবতেই পারেন। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দেশের মতো আর কোথাও রাষ্ট্র ও লেখকদের এত বেশি মতভিন্নতা দেখিনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ সোভিয়েত লেখক সমাজতান্ত্রিক কাঠামো, নািসদের বিরুদ্ধে মহান মুক্তিযুদ্ধ, বিপ্লব ও মহাযুদ্ধে জনগণের ভূমিকায় এবং সমাজতন্ত্রের সৃষ্ট কাঠামো নিয়ে গর্বিত। কোনো ব্যতিক্রম থাকলে সেটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন এবং প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবেই যাচাই করা দরকার।

প্রশ্ন: কিন্তু সৃজনশীল কাজ স্বাধীন হতে পারে না। একে অবশ্যই সবসময় রাষ্ট্রের চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

উত্তর: এমনটা বলা অতিরঞ্জন হয়ে যায়। আমি বহু লেখক ও চিত্রকরকে চিনি, যাদের রাষ্ট্রের কোনো কিছুকে মহান করে তোলার কোনো ইচ্ছা নেই। এ ধরনের কিছুর অস্তিত্ব থাকার কথা বোঝানো এক ধরনের ষড়যন্ত্র। কিন্তু ব্যাপার তা নয়। অবশ্যই প্রত্যেক বিপ্লবকেই এর শক্তি সংহত করতে হয়। বিকাশ ছাড়া বিপ্লব টিকে থাকতে পারে না: পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে পরিবর্তনের খোদ শোরগোলই বিপ্লব এর সব ক্ষমতার সুবাদে লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীসহ সমাজের সব পর্যায়ের সমর্থন দাবি না করে টিকতে পারে না। আমেরিকান বিপ্লবের কথাই ভাবুন কিংবা সাম্রাজ্যবাদী স্পেনের বিরুদ্ধে আমাদের নিজস্ব স্বাধীনতা যুদ্ধ। ওইসব ঘটনার পর লেখকরা রাজতন্ত্র কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজ কিংবা সাবেক উপনিবেশগুলোয় স্প্যানিশ রাজার শক্তির পুনর্বহাল নিয়ে মেতে থাকলে কী হতো। কোনো লেখক বা শিল্পী উপনিবেশবাদকে মহান করে তুললে তার ওপর নিপীড়ন চালানো হতো। একটি সমাজকে শূন্য (হাজার হোক পুঁজিবাদ বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের পা রাখার চেষ্টা আগে কখনো হয়নি) থেকে নির্মাণাকাঙ্ক্ষী বিপ্লব বুদ্ধিবৃত্তির সমর্থন নিজের শক্তিতে জোগাড় করবে, এটাই বেশি যুক্তিসংগত। এ ধরনের প্রক্রিয়া সংঘাত সৃষ্টি করতেই পারে। এমনটা ঘটা স্রেফ মানবিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার। তবে আমি আশা করি, সময় ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক সমাজগুলোর তাদের লেখকদের অবিরাম সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন অনেক কমে আসবে এবং তারা আন্তরিকভাবে যেটা চান, তা-ই সৃষ্টি করতে পারবেন।

প্রশ্ন: তরুণ কবিদের কী পরামর্শ দেবেন আপনি?

উত্তর: ওহ, তরুণ কবিদের দেয়ার মতো কোনো পরামর্শ নেই! ওদের নিজেদেরই পথ করে নিতে হবে। তাদের অভিব্যক্তির সমস্যা মোকাবেলা করে সেগুলোকে অতিক্রম করতে হবে। আমি ওদের কখনই রাজনৈতিক কবিতা দিয়ে শুরু করার পরার্মশ দেব না। অন্য যেকোনো কবিতার চেয়ে রাজনৈতিক কবিতা ঢের বেশি গভীর—অন্তত প্রেমের কবিতার মতো—এখানে জোর করা যাবে না, কারণ তাহলে সেটা অশ্লীল এবং অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। রাজনৈতিক কবি হতে হলে অন্য সব ধরনের কবিতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। রাজনৈতিক কবিকে অবশ্যই—কবিতার সঙ্গে কিংবা সাহিত্যের সঙ্গে বেইমানির জন্য তার দিকে ছুড়ে দেয়া গালমন্দের জন্যও তৈরি থাকতে হবে। তারপর রাজনৈতিক কবিতাকেও নিজেকে এমন উপকরণ ও বিষয়বস্তু, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগীয় ঋদ্ধতায় সশস্ত্র হতে হবে, যাতে বাকি সবকিছুকে অবজ্ঞা করতে পারে। এটা বিরল ক্ষেত্রেই অর্জিত হয়।

প্রশ্ন: আপনি প্রায়ই বলেন যে মৌলিকত্বে বিশ্বাস করেন না।

উত্তর: যেকোনো মূল্যে মৌলিকত্বের খোঁজ করা আধুনিক অবস্থা। আমাদের সময়ে লেখক নিজের প্রতি নজর কাড়তে চান এবং এ উপরিগত পূর্বধারণা ভক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য পেয়ে যায়। প্রত্যেকে একটা পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে, যার মাধ্যমে সে অসামান্যতা বা আবিষ্কারের জন্য নয়, বরং এক ধরনের বিশেষ বৈচিত্র্য আরোপের কারণে আলাদা হতে পারবে। সবচেয়ে মৌলিক শিল্পী সময়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন পর্যায় পরিবর্তন করবেন। পিকাসো তার সবচেয়ে বিরাট উদাহরণ, আফ্রিকার পেইন্টিং ও ভাস্কর্যে নিজেকে লালন করা শুরু করার পর পরিবর্তনের এমন একটা শক্তির ভেতর দিয়ে গেছেন যে তার অসাধারণ মৌলিকতায় বৈশিষ্ট্যায়িত ছবিগুলো বিশ্বের সাংস্কৃতিক ভূতত্ত্বের বিভিন্ন পর্যায় বলে মনে হয়।

প্রশ্ন: আপনার ওপর সাহিত্যিক প্রভাব কী কী?

উত্তর: আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস যেমন এক জায়গায় থাকে না, তেমনি লেখকরাও সবসময়ই পারস্পরিক বিনিময় করছেন। একজন লেখক সবসময় এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাচ্ছেন, তাকে আসবাব বদলাতে হয়। কোনো কোনো লেখক এতে অস্বস্তি বোধ করেন। আমার মনে আছে, ফ্রেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা সবসময় আমাকে আমার কোনো কবিতা থেকে পঙিক্ত পড়তে বলতেন কিন্তু পড়ার মাঝখানে বলে উঠতেন, ‘থামো, থামো! আর পড়ো না, আমার ওপর না আবার প্রভাব ফেলে দাও!’

প্রশ্ন: নরম্যান মেইলার সম্পর্কে। আপনি তার সম্পর্কে কথা বলা প্রথম লেখকদের একজন।

উত্তর: মেইলারের দ্য নেকেড অ্যান্ড দ্য ডেড বাজারে আসার অল্প পরেই মেক্সিকোর এক বইয়ের দোকানে ওটা পাই আমি। ওটার কথা কেউ কিছু জানত না। আমি কিনেছিলাম, কারণ সফরে যাচ্ছিলাম এবং একটা নতুন আমেরিকান উপন্যাস দরকার ছিল। থিয়োডর ড্রাইসার দিয়ে শুরু হয়ে হেমিংওয়ে, স্টেইনবেক ও ফকনারের মাধ্যমে শেষ হওয়া মহানদের ভেতর দিয়েই আমেরিকান উপন্যাস শেষ হয়ে গেছে বলে আমার ধারণা ছিল; কিন্তু অসাধারণ ভাষিক সহিংসতা, মহান সূক্ষ্মতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং বর্ণনার অসাধারণ ক্ষমতার একজন লেখক আবিষ্কার করেছিলাম আমি। পাস্তারনাকের কবিতা ভীষণ পছন্দ করি কিন্তু দ্য নেকেড অ্যান্ড দ্য ডেডের পাশে ডক্টর যিভাগোকে একঘেয়ে উপন্যাসের মতো মনে হয়, কেবল প্রকৃতির বর্ণনার অংশটুকু অর্থাৎ কিনা এর কবিতা বাদে। মনে আছে সেই সময় আমি ‘লেট দ্য রেইল স্প্লিটার অ্যাওয়েক’ লিখেছিলাম। লিংকনকে উৎসর্গ করা এ কবিতা বিশ্বশান্তির প্রতি নিবেদিত ছিল। আমি ওকিনাওয়া ও জাপানের যুদ্ধের কথা বলেছি এবং নরম্যান মেইলারের কথাও বলেছি। আমার কবিতাটা ইউরোপে পৌঁছানোর পর অনূদিত হয়েছে। মনে আছে আরাগঁ বলেছিলেন, ‘নরম্যান মেইলার কে জানতে প্রচুর খাটতে হয়েছে।’ বাস্তবে তাকে কেউই চিনত না এবং তার নাম উল্লেখকারী প্রথম লেখকদের অন্যতম বলে আমি এক ধরনের গর্ব বোধ করি।

প্রশ্ন: প্রকৃতির প্রতি আপনার তীব্র দরদের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেন?

উত্তর: ছেলেবেলা থেকেই পাখি, ঝিনুক, বনজঙ্গল ও গাছপালার প্রতি মায়া বোধ করে এসেছি আমি। সাগরের ঝিনুকের খোঁজে বহু জায়গায় গেছি, বিশাল একটা সংগ্রহ গড়ে উঠেছে আমার। আমি আর্ট অব বার্ডস নামে একটা বই লিখেছি। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে পারি না। হোটেলগুলো দিনদুয়েকের জন্য ভালো লাগে, ঘণ্টাখানেকের জন্য বিমান ভালো লাগে কিন্তু আগুন, জমিন আর হাওয়া-বাতাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগে বনে, বালিতে কিংবা নৌকায় ভাসতেই বেশি ভালো লাগে আমার।

প্রশ্ন: আপনার কবিতায় কিছু প্রতীক বারবার ফিরে আসে এবং সেসব সবসময়ই সাগর কিংবা মাছ অথবা পাখির চেহারা নেয়...

উত্তর: আমি প্রতীকে বিশ্বাস করি না। এসব স্রেফ বস্তুগত জিনিস। সাগর, মাছ, পাখি বস্তুগতভাবেই আমার কাছে অস্তিত্ববান। যেভাবে দিনের আলোকে দেখি, সেভাবেই দেখেছি ওসব। আমার কবিতায় কিছু কিছু বিষয় যে বিশেষত্ব পেয়েছে—বারবার দেখা দেয়—সেটা বস্তুগত অস্তিত্বেরই ব্যাপার।

প্রশ্ন: ঘুঘু আর গিটার কী তুলে ধরে?

উত্তর: ঘুঘু তুলে ধরে ঘুঘু আর গিটার তুলে ধরে গিটার নামে একটা বাদ্যযন্ত্রকে।

প্রশ্ন: বলতে চাইছেন যারা এসব জিনিসকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন—

উত্তর: আমি ঘুঘু দেখলে ওটাকে ঘুঘুই বলি। উপস্থিত থাক বা না থাক, আমার কাছে ঘুঘুর একটা রূপ আছে, বিষয়গত কিংবা বস্তুনিষ্ঠভাবে—কিন্তু ঘুঘুর চেয়ে বেশি দূরে যায় না সেটা।

প্রশ্ন: আপনি রেসিডেন্স অন আর্থের কবিতাগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন যে ‘ওগুলো বেঁচে থাকতে সাহায্য করে না। মরতে সাহায্য করে।’

উত্তর: আমার বই রেসিডেন্স অন আর্থ আমার জীবনের এক অশুভ ও বিপজ্জনক সময় তুলে ধরে। এটা বেরুনোর পথবিহীন একটা কবিতা। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাকে বলতে গেলে নতুন করে জন্ম নিতে হয়েছে। আমি এখনো যার গভীরতা জানি না, সেই মরিয়া অবস্থা থেকে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ এবং আমাকে ধ্যানে বাধ্য করার মতো গুরুতর ঘটনাপ্রবাহের কারণে রক্ষা পেয়েছিলাম। একসময় বলেছিলাম যে আমার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা থাকলে ওই বইটি পাঠ নিষিদ্ধ করতাম এবং আর যেন ছাপা না হয় সে ব্যবস্থা নিতাম। এটা কষ্টকর ভার হিসেবে, মরণশীল পীড়ন জীবনবোধকে অতিরঞ্জিত করে তোলে। তবে এও জানি, এটা আমার সেরা বইগুলোর একটা, এই অর্থে যে এটা আমার মনের অবস্থা তুলে ধরে। তবু কেউ যখন লেখেন—কথাটা অন্য লেখকদের বেলায় সত্যি কিনা জানি না—তার পঙিক্তগুলো কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে, জানা থাকা দরকার। রবার্ট ফ্রস্ট এক নিবন্ধে বলছেন, কবিতার একমাত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিষাদ থাকতে হবে: ‘বিষাদকে কবিতার সঙ্গে একা থাকতে দাও।’ কিন্তু কোনো তরুণ আত্মহত্যা করে তার বই রক্তে রঞ্জিত করে গেলে রবার্ট ফ্রস্ট কী বলতেন, আমার জানা নেই। আমার বেলায় এমনটা ঘটেছে—এখানে, এই দেশে। প্রাণবন্ত একটি ছেলে আমার বইয়ের পাশেই আত্মহনন করেছিল। তার মৃত্যুর জন্য সত্যিকার অর্থে নিজেকে দায়ী মনে করি না। কিন্তু রক্তের দাগঅলা কবিতার ওই পাতাটা একজন কবিকে নয়, বরং সব কবিকেই ভাবতে বাধ্য করে...অবশ্যই আমার বিরোধীরা সুযোগ নিয়েছে—আমার সব কথাতেই যেমন করে তারা—আমার নিজের বইকে দেয়া আমার ভর্ত্সনার রাজনৈতিক ফায়দা। তারা আমার ওপর কেবল সুখী এবং আশাবাদী কবিতা রচনার আকাঙ্ক্ষাকে চাপিয়ে দেয়। ওই ঘটনার কথা তারা জানে না। আমি কখনই নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা কিংবা বিষণ্নতার অভিব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করিনি। কিন্তু আমি ভঙ্গি বদলাতে, সব শব্দ খুঁজে পেতে, সমস্ত রঙ ধরতে, যেখানেই থাকুক জীবনের শক্তির খোঁজ করতে পছন্দ করি—সৃষ্টি বা ধ্বংসে। 

আমার কবিতা আমার জীবনের মতোই কিছু পর্যায় পেরিয়ে এসেছে; নিঃসঙ্গ ছেলেবেলা থেকে দূরে, বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন দেশে কোণঠাসা কৈশোর থেকে নিজেকে বিশাল মানবগোষ্ঠীর অংশে পরিণত করার লক্ষ্যে পথে নেমেছি। আমার জীবন পূর্ণতা পেয়েছে এবং এটাই সব। যন্ত্রণাকাতর বিষাদগ্রস্ত হওয়া গত শতকের কবিদের কায়দা ছিল। কিন্তু জীবনকে, এর সমস্যাকে  জানেন এবং স্রোতের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়ে বেঁচে গেছেন এবং বিষাদের ভেতর দিয়ে প্রাচুর্যে পৌঁছেছেন, এমন কবিও থাকতে পারেন।