শ্রী গুরুপ্রসাদ মৈনালি। ভাবান্তর: নাসরিন জে. রানি

[শ্রী গুরু প্রসাদ মৈনালী নেপালের আধুনিক ছোটগল্পের উন্মেষ প্রজন্মের প্রথমদিককার একজন গল্পকার। তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় নেপালের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘শারদা’য়।

‘খড়ের আগুন যেমন জ্বলে তেমন নেভে’ গল্পটি মৈনালির ‘পারালকো আগো’ গল্পের ভাষান্তর।]

 

চেমের বৌ গৌনথালী ছিল এক দজ্জাল মহিলা, খাণ্ডারনি বলাই ভালো। চেম যখন তার সাথে শান্ত ব্যবহার করত, তখনো কোনো না কোনো ছুতা খুঁজে গৌনথালী সাধারণ কথাবার্তাকে তিক্ত পর্যায়ে নিয়ে যেত, কিছু না কিছু দোষ খুঁজে ঝগড়া চালিয়ে যেত, আর এভাবেই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে নিত্য ঝগড়া লেগেই থাকত।

একদিন সন্ধ্যাবেলা চেম ক্ষেত থেকে বাড়ি ফিরে দেখে, গৌনথালী ঘরের দরজায় তালা মেরে গ্রামের অন্য এক বাড়িতে বিয়ের উৎসব দেখতে চলে গেছে। সারা দিনের অক্লান্ত খাটুনির পর চেম খুব ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত ছিল। সে যখন উঠানের একপাশে তার কাঁধ থেকে লাঙল-জোয়াল নামিয়ে রেখে উঠানের মাঝ থেকে বলদটাকে টেনে তুলছিল, গৌনথালীকে দেখা গেল পাহাড় বেয়ে নেমে আসতে। গৌনথালী উঠানে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাগে ফেটে পড়ল চেম—এখনো চুলা জ্বালাসনি? খাবার রান্না করিসনি কেন?

গৌনথালী কিছু না বলে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে কলসি নিয়ে পানি আনতে চলে গেল। চেম উনানে আগুন জ্বালিয়ে তার হুঁকায় তামাক ভরল। তারপর দরজার মুখে বসে হুঁকার ধোঁয়ায় মেঘের বড় বড় কুণ্ডলী বানিয়ে উড়াতে লাগল। কলস কাঁখে নিয়ে ফিরে এসে গৌনথালী যখনই ঘরে ঢুকতে যাবে, চেম তাকে দেখে হুংকার দিয়ে উঠল, ‘এই শয়তান মাগী! সারা দিন বসে বসে ব্যাটাদের গিলিস তুই, না! এখনো কাজ দেখাচ্ছিস! চালিয়াতি!’ এই বলেই ছুটে এসে গৌনথালীকে এক লাথি মেরে বসল চেম। লাথি খেয়ে গৌনথালী দরজার মুখেই পড়ে গেল, তার কলসিটাও পড়ে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল,পানি চৌকাঠ পেরিয়ে দোরগোড়া থেকে উঠানে ছড়িয়ে পড়ল। গৌনথালী শান্ত মুখে কলসির ভাঙা টুকরোগুলো সব কুড়িয়ে উঠানের অন্য পাশে ছুড়ে দিল, পেছন থেকে চেম তখন চিৎকার করে বলে ওঠল, ‘আর এক মুহূর্তও তুই আমার বাড়ি থাকতে পারবি না। বাড়ি থেকে বের হ তুই, ছিনাল মাগী। যেখানে ইচ্ছা চলে যা।’

এর পরই চেম তেড়ে এল, গৌনথালীর চুলের মুঠি ধরে টেনেহিঁচড়ে তাকে উঠান থেকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। গৌনথালীর প্রতিবাদ করার কিছু ছিল না, তাই লাথি খাওয়ার পরও সে নিজেকে শান্ত রেখেছিল, কিন্তু চেম যখন তার চুলের মুঠি ধরে তাকে উঠান থেকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির বাইরে বের করে দিতে চাইছিল, তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। পাল্টা চেঁচিয়ে উঠল, ‘খাটাশ ব্যাটা, তুই আমার চুল ছাড় এক্ষুনি। আমার গাধা বাপটা তোর মতো এক কসাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে আমাকে। তোর মতো এক ফকির, ঘাটের মড়ার সাথে একঘরে থাকার চেয়ে নদীতে গিয়ে ডুবে মরা ভালো।’

‘কী বললি তুই! রেণ্ডি মেয়েছেলে! তোর বাপ বড়লোক নাকি? ওই ফকিন্নির পুতরে যদি অন্য মাইনসে ক্ষেতে বর্গা না দেয়, তাহলে তো একবেলাও খাবার জুটবে না। আর তার মেয়ের কি ঠাঁট দেখো! দেমাগ কত! আমার দিকে কুদে আসে!’ এই বলেই চেম গৌনথালীকে আরেকটা লাথি মারে। লাথি খেয়ে গৌনথালী গলা ছেড়ে দিয়ে কেঁদে ওঠে।

চেঁচামেচির শব্দে গ্রামের প্রায় সব ছেলেমেয়ে দল বেঁধে এসে উঠানের কিনারা ঘেঁষে মজা দেখতে দাঁড়িয়ে গেল। এই দেখে চেমের রাগ আরো তেঁতে উঠল, বলল, ‘এই মড়ার দল, এখানে কি নাটক চলছে যে সব এসে ভিড় জমায়ছ, যা ভাগ!’ বলে একটা লাঠি হাতে নিয়ে ধাওয়া করল সে ওদের। কিন্তু দুষ্ট ছেলেপেলেগুলো একেবারে সরে না গিয়ে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে চেমের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।

গৌনথালী তখন দরজায় বসেই বিলাপ করে যাচ্ছে। কিন্তু চেম সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে দাওয়ায় মাদুর পেতে শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালবেলা লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে আরেক হাতে বলদের দড়ি ধরে অভুক্ত চেম ক্ষেতের উদ্দেশে রওনা হলো। দিন শেষে সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরছে, তাকে দেখে এক প্রতিবেশী দৌড়ে এসে বলল, গৌনথালী ব্যাগ গোছগাছ করে বাপের বাড়ি চলে গেছে।

কালো মোষটা ঘরের উঠানের এক কোণে বাঁধা ছিল। চেমকে দেখে জোরে জোরে ডাক শুরু করে দিল। চেম মোষটাকে প্রথমে কিছু জাব খেতে দিয়ে তারপর বাছুরের দড়ি খুলে দিয়ে, বালতি নিয়ে বসল দুধ দোয়াতে। কিন্তু মোষের বাঁটে সে হাতই দিতে পারল না, যতবারই সে হাত বাড়িয়ে যায়, এগিয়ে যায়, মোষটা লাফিয়ে, খেপে ওঠে তাকে উল্টো লাথি মারার চেষ্টা করল। এ রকম কয়েকবারের চেষ্টায় বেমাক্কা এক লাথি খেয়ে মোষের নাদের ওপরই উল্টে এসে পড়ল চেম। হাত থেকে বালতিটা ছিটকে পড়ল তিন ফুট দূরে। তার প্যান্ট আর গায়ের ফতুয়া গোবরে মাখামাখি হয়ে গেল। উঠে বসার সময়ই তার চোখ পড়ল দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা মোটাসোটা একটা লাঠির ওপর, সে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লাঠিটা তুলে নিয়ে মোষের গায়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল। মার খেয়ে মোষটার লাফালাফি দ্বিগুণ বাড়ল এবং একপর্যায়ে শিকল ছিঁড়ে দৌড়ে গিয়ে কোকালের ভুট্টা ক্ষেতে গিয়ে ঢুকে পড়ল। চেম তাকে নানাভাবে সরিয়ে আনতে চাইল, কিন্তু মোষ তাকে দেখে আরো বেশি আতঙ্কিত হয়ে ক্ষেতের এক পাশ থেকে আরেক পাশে দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করল। দ্রুতই নতুন নিড়ানো ভুট্টা ক্ষেত খড়ের মতো মোষের পায়ের তলায় চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতে লাগল। শব্দ শুনে বাইরে বেরিয়ে এ দৃশ্য দেখে কোকালের বৃদ্ধ মা উঠানে দাঁড়িয়ে সমানে চেমকে শাপশাপান্ত করতে শুরু করল।

‘চেম, একটা আটকুড়ো, ঘাটের মড়া। কলেরাও তোকে নেয় না কেন! গতকাল বৌকে মেরে তাড়িয়েছিস, আজ মোষটাকে মারছিস। আমাদের সারা বছরের খোরাকির সর্বনাশ করছিস? মুরোদ নেই, মেজাজ দেখাস বউয়ের সঙ্গে। তোরা সবাই এসে দেখ, এই হতভাগা গেল বছর কুস্তিতে ধনবীরের এক ঘুষি খেয়ে কেমন সারা বছর বিছানায় কাটিয়েছে...শুনি, বাইরের লোককে না হয় মারা যায়, কুস্তি লড়া যায়! তুই নিজের বউয়ের ওপর হাত তুলিস কোন দুঃখে, আর দেখ ওই অবোধ প্রাণীটাকেই বা কীভাবে পেটাস! হররোজ, সন্ধ্যায় একটা না একটা কাণ্ড আছেই। পুরা গ্রাম অতিষ্ঠ করে ফেলেছে।’

এদিকে ধনবীরের বাড়িতে বিয়ের ভোজ ছিল। গ্রামের সমস্ত ছোকরার দল মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঝিমুচ্ছিল। কোকালে নারীর পোশাক পরেছে, মজা করে নাচছে। নাচের সঙ্গে টুংটাং করে একটা বাদ্যও বাজিয়ে যাচ্ছে সে। তার নাচে খানিক পর পরই মাতাল সঙ্গীরা হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছিল, মাঝে মাঝে গান গেয়ে উঠছিল কেউ কেউ। ঠিক সেই সময়ে তার বোন এসে হাজির হলো, কোকালকে থামিয়ে তার ভুট্টা ক্ষেত তছনছ হয়ে যাওয়ার খবরটা দিল। কোকালে টকটকে লাল রঙের একটা পেটিকোট পরেছিল, সে অবস্থায়ই সে দৌড় শুরু করল ক্ষেতের দিকে। ক্ষেতে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মোষটা কোকালের আগুনে রঙা পেটিকোট দেখে নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে করতে আবার এলোপাতাড়ি দৌড়াতে শুরু করল।

ভুট্টা ক্ষেতের চিঁড়েচ্যাপ্টা এলোমেলো চারাগুলো দেখে কোকালে মুহূর্তে রাগে আগুন হয়ে গেল, তার চোখের সামনেই দেখল, উন্মত্ত মোষটা ক্ষেতের বাকি চারাগাছগুলোও দুমড়েমুচড়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। ছুটে গিয়ে সে চেমের দুই গালে কষে চড় বসিয়ে দিল। বিমূঢ় চেম কিছুই বলল না। শেষে অনেক কষ্টে চার-পাঁচজন লোকের কোকালের ক্ষেত থেকে মোষটাকে রাস্তায় তুলে আনতে মধ্যরাত হয়ে গেল।

পরদিন সকালে ঝরনা থেকে পানি আনতে গিয়ে ফেরার পথে পাহাড় বেয়ে নিচে নামার সময় দর্জি জুথের বৌয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দর্জি জুথ আর চেম ভালো বন্ধু। জুথের বৌকে ভাবি বলে ডাকল চেম।

‘ইস! মরদলোক যদি কলসি কাঁধে পানি নিতে আসে!’ চেমকে বলল জুথের বউ।

‘ভাবি, আমি তো এক হতভাগা। পানি আমি না আনলে কে এনে দেবে?’

‘আনার মানুষকে উল্টাপাল্টা মারধর করলে কি সে তোমার ঘর করবে, চেম?’

‘আর বলো না ভাবি, ওর জিহ্বা ক্ষুরের চেয়েও ধারালো। মারধর না করে উপায় থাকে না।’

‘সেটা সবাই জানি, ও খুব নির্লজ্জ মেয়ে। কিন্তু এত না মেরে হালকা শাসন করলেই তো পারো ভাই।’

‘থামো ভাবি! গত বছর দশেরা উৎসবের দিনে জুথ তোমাকে কি কম পিটুনি দিয়েছিল, আমি ভুলিনি। মার খেয়ে সেদিন তো তুমি জুথকে একটা শব্দও বলোনি। প্রতিবাদ করেছিলে কোনো?’

‘খোদা! ও আর মনে করিয়ে দিও না। আমরা এখন অনেক ভালো আছি। হ্যাঁ, একটা সময় ছিল মার না খেয়ে একদিনও পার হয়নি আমার। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে তিব্বতি পাহাড় থেকে মদ খেয়ে পাঁড় মাতাল হয়ে ফিরে কোনো না কোনো একটা অজুহাতে আমাকে মারধর করত, একদিন তোমার সমানেই মারল।

‘সেসব দুঃসহ দিন গেছে ঠিক, কিন্তু আমার শরীরের ব্যথা আর আঘাতের দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে। এতগুলো দিন পার হয়ে গেলেও মারের কথা কি সব ভুলে গেছি! কিন্তু আমিও কি জবাব দিতে পারতাম না, পারতাম।’

‘ভাবি, তুমি বলছো, আমি বৌকে মারি বলেই ওর মুখ ফুটে গেছে? ও দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে উঠেছে! ভাবি, ও যদি অন্তত তোমার মতোও হতো, তাহলেও আমি তাকে ঘরে রেখে দিতাম। দেবীকে পূজা করার মতোই আমি ওকে ভালোবাসতাম।’

‘হ্যা চেম, কোনো মেয়েরই তোমার মতো এ রকম হতভাগা স্বামী থাকা উচিত না। আর কতদিন এভাবে ঝরনা থেকে পানি বয়ে আনবে তুমি? যাও কাল গিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বৌকে ফিরিয়ে নিয়ে আসো।’

‘সে যদি নিজের ভুল বুঝতে পারে তো ভালো। ও ফিরে এলে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি নিজে যাব না। আমি এত সস্তা লোক না।’

ঊর্ধ্বাঙ্গের ফতুয়ার ওপর ওয়েস্টকোট, তারপর ঢিলেঢালা নেপালি ধুতি। আর জোড়া ভ্রূর মাঝখান থেকে ললাট পর্যন্ত লাল তিলক। মাথায় ময়লা টুপি। নাকের নিচে মোটা রুক্ষ গোঁফ। সরু কাঁধের মাঝখানে পানির কলসসমেত চেমকে খুব মলিন দেখচ্ছিল।

এক সকালে বারান্দায় বসে চেম যখন বাঁশের হুঁকোয় তামাক টানছে, একটি ছোট ডোঙ্গা নৌকায় দর্জি জুথকে পাহাড়ি নদী থেকে নেমে আসতে দেখা গেল। ডোঙ্গার সামনে জুথ বসে আছে, পেছনে তার ছেলে আর সবশেষে জুথের বৌ। তার কোলে এক গাট্টি তৈরি পোশাক। জুথ চেমকে দেখে হেসে জিজ্ঞেস করল:&dquote;&dquote;

‘তা, কেমন চলছে, ছোট ভাই?’

‘ভালো, ভাইজান।’

‘বৌকে তুই মেরে ভাগিয়ে দিয়েছিস, এখন একা একা বসে থাক।’

জুথ ও তার বৌ এখন বেশ এক সুখী দম্পতি। সেলাইয়ের কাজ সংগ্রহ করতে পাহাড় থেকে যখন গ্রামে নেমে আসে দর্জি, বউটা সঙ্গে থাকবেই। পথে স্বামী-স্ত্রী সারাক্ষণ নিজেদের ঘরকন্না আর নানা আলাপে ব্যস্ত হয়ে থাকে। ফেরার পথেও তাই, ওদের কথা যেন ফুরায়ই না।।

সন্ধ্যায় জুথ নিজের হাতে ঘরের বাতি জ্বালায়। ধর্মগ্রন্থ থেকে দুই-এক শ্লোক পাঠ করে, পাশে বসে তার বৌ হাঁড়িকুড়ি ধোয়ার কাজ করলেও কান পেতে শ্লোকগুলো শোনে। আর জুথ যদি কখনো অসুস্থ হয় তো বৌটা ডাক্তার-বদ্যি খুঁজতে নিজেই গ্রামে চলে আসে।

কখনো কখনো সন্ন্যাসীদের জন্য সেলাই করা পোশাকগুল দিতে পাহাড় বেয়ে গ্রামে নেমে আসার পথে জুথ যখন বৌয়ের সাথে খুনসুটি করে, বউও পাল্টা জুথের চোখ চেপে ধরে, এমনকি মাঝে মাঝে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মিটিমিটি হাসতেও পথচারীদের সামনেই এসব দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়। মাঝে মাঝে দু-একজন উত্সুক পথচারীর চাহনিতে বৌ লজ্জা পেয়ে বলে ওঠে, ‘তুমি যত বুড় হচ্ছ জুথ, তত তুমি রসে টইটম্বুর হচ্ছ।’

জুথ খুব ধার্মিক লোক। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ঝরনার পানিতে স্নান করে, তারপর কপালে সিঁদুরের তিলক এঁকে, বাইরের রোদে মহিলারা যেখানে কাপড় শুকোতে দেয়, তার পাশে বসেই আকাশের দিকে তাকিয়ে শ্লোক পাঠ শেষ করে সে তার দিন শুরু করে।

 

জুথের এ সুখী জীবনের কথা ভেবে নিজেকে চেমের একজন দুর্ভাগাই মনে হলো। তার বৌ ঘরে থাকলে কী হতো, সে কল্পনা করে, ঝগড়া ছাড়া আর কী, বিপরীতে এই সময়ে জুথ হয়তো রাতের খাওয়া সেরে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বসেছে। জুথ ও তার বৌয়ের বিপরীতে তার নিজের বৌ একটা দজ্জাল, বদমেজাজি মেয়েলোক, যে বেহুদা ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কত বছর হয়েছে তাদের বিয়ে, কিন্তু চেমের বৌ চেমকে ভালো কোনো কথা বলেছে, এমন কিছু তার মনে পড়ে না। এমনকি এই দুর্দিনেও তার মোষটিও তাকে অপছন্দ করছে, ওর কাছেই ভিড়তে দিচ্ছে না। গৌনথালীই মোষটার দেখাশোনা করত, তাই মোষটা ওকেই খুঁজছে। চেমকে দেখলেই রেগে তেড়ে আসছে। হতচ্ছড়া মোষটার কারণে সে কোকালের হাতে চড় খেয়েছে।

মোষটা ধার করে কেনা না হলে চেম ওটাকে টেনেহিঁচড়ে খাড়া বাঁধের পাশে নিয়ে গিয়ে ধাক্কা মেরে পাহাড়ি নদীটাতে ফেলে দিত, কে তাকে বাধা দিতে আসত দেখত সে।

ঘরের কাজ না করে তাহলে তাকে না উপোস দিয়েই দিন কাটাতে হবে। সে যদি মরেও যায়, তার মুখাগ্নি করারও কেউ নেই। সেকি একজন সন্ন্যাসী হয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে? কিন্তু ভিক্ষু হয়েই বা কী করবে সে? দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত পাততে হবে। আর নয়তো অনাহারেই মরতে হবে। এখন লোকজন স্বাস্থ্যবান ভিক্ষু দেখলে হাসাহাসিই করে, বলে, কী ভিক্ষু হয়েছ ক্ষেতখামারের কাজে ফাকি দেয়ার মতলবে? ঘুরে ঘুরে খেতে খুব আরাম তাই না!’

রাস্তার পাশে বাড়ি বানানোয় একটা সুবিধাই হয়েছে। কিছু লোকজনের সাড়াশব্দ শুনতে পায়। আর নয়তো সে যদি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েও যায়, তাকে এক গ্লাস পানি এনে দেয়ার লোকও তো নেই। রাস্তা দিয়ে লোকজন ‘জয় নারায়ণ’ বলে হেঁটে যায়, মাঝেসাঝে কিছু ভিক্ষু ভিক্ষার জন্য দরজায় এসে কড়া নাড়ে। ভিক্ষুদের নজর করে দেখে চেম। এদের রোদে পোড়া পাশুটে শরীর, দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ায়, কিন্তু ওদের গায়ের পোড়া চামড়ার চেয়ে তার নিজের বুকের ভেতরটা কি কিছু কম পুড়েছে! বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু সে জানে, বুকটা তার পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে।

বৌ চলে যাওয়ার প্রথম সপ্তাহে তার কথা একবারও ভাবেনি চেম। কিন্তু যতই সময় গড়িয়ে যেতে থাকে, ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতা তাকে গ্রাস করতে থাকে। মাঝে মাঝে সে ভাবে, গৌনথালী খানিকটা হয়তো বজ্জাত স্বভাবের ছিল, কিন্তু সে তো জীবিত কেউ একজন ছিল, ও যখন ছিল অনেক কথা বলত। মন ভালো থাকত যখন ওর, মোষটার অনেক যত্ন করত, প্রচুর খাবার দিত। জাবের বালতি প্রায় উপচে পড়ত। মোষটাও গৌনথালীকেই ভালোবাসে। আর প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা তার জন্যই সে রাঁধত। কিন্তু এখন ও নেই। ও চলে যাওয়ার পর আর আমি কিছু রাঁধি না, একবার কি দুবার বোধহয় রেঁধেছি শুধু। কদিন ধরে খিদে পেলে বার্লি খাচ্ছি, কিন্তু এভাবে ভালো লাগছে না আর। ও যখন ছিল, মোষটা প্রতিদিন ঠিকঠাকমতো দুধ দিত, গৌনথালীই দুধ দোয়াত। কিন্তু মোষটা এখন কেমন বৈরী আচরণ করছে। আমাকে কাছে ভিড়তে দেয় না। সবাই বৌকে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে বলছে। জুথের বৌও বলেছে সেদিন। নিজ থেকে ও হয়তো আসবে না, আমাকেই যেতে হবে তার মান ভাঙাতে।

পরদিন সকালে নাশতা সেরে সে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল। সবচেয়ে ভালো কাপড় পরল সে। টুপিটা হাতে নিয়ে দেখল, গৌনথালী ওটার ওপর কখন যেন তামাক রেখেছিল, বিশ্রী দাগ পড়ে টুপিটা পুরোই বরবাদ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ধই করে মাথায় রাগ চড়ে গেল তার: ‘দেখো! ছিনাল বেটি টুপিটার কী হাল বানিয়েছে। একটা কিছু দিলে কীভাবে সেটা নষ্ট করে দেখো। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দেয়ার সময় হয়েছে। ওর বাপ-দাদা চৌদ্দগুষ্টি ভালো কোনো টুপি পরলে না তার যত্ন নেয়া শিখত। ওর বাপ তো একটা সস্তা টুপি পরেই জীবন পার করে দিয়েছে, টুপির মতো পরেছেও সস্তা কাপড়চোপড়, তার মেয়ে কীভাবে দামি পোশাকের মূল্য বুঝবে? একজন ব্রাহ্মণ যদি জীবনে কখনো মাশরুম না খায়, সে মাশরুমের স্বাদ বুঝবে কীভাবে?’

টুপিটাকে ঝেড়ে নিয়ে মাথায় পরল। তার একটাই ওয়েস্টকোট, ওটাই পরে তার ওপর আলখাল্লাটা চাপিয়ে বুকের মাঝখানটা একটি ক্লিপ দিয়ে আটকে একটা পুরনো জরাজীর্ণ ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়ল।

চেমের শ্বশুরবাড়ির কাছাকাচি ছত্র নামের একটি জায়গায় এসে খানিক জিরিয়ে নেয়ার জন্য থেমে যখন সে চোখ-মুখের ঘাম মুছছিল, তখনই হঠাৎ বাতাসে মনে হলো গৌনথালীর গলার আওয়াজ পেল। গলার আওয়াজটা বনের এক পাশের কিছু গাছের পেছন থেকে আসছে মনে হলো, গৌনথালী সম্ভবত ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে ওখানে বিশ্রাম নিতে থেমেছে। ওর গান কানে এল: ‘আমি যদি পক্ষী হইতাম, নীল আকাশে উইড়া যাইতাম রে বন্ধু, পাখনা বিনা পক্ষীর দুঃখ কারে বুঝাই!’

চেম রাগে দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে, ‘আমার মোষট না খেয়ে তার পেটে ঢোল-ডগ্গর বাজছে, আর এদিকে উনি বনে বনে সুর ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন।’

বিশ্রাম শেষে চেম আবার পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। কিন্তু একটা বিছুটিপাতার ঝোপ পার হওয়ার সময় হঠাৎ পা জড়িয়ে এল তার। মনে দ্বিধা। তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে কীভাবে নেবে, কী বলবে তাকে ওরা! তার পরও ধীরে ধীরে পায়ে পায়ে সে শ্বশুরবাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ায়। উঠানের এক পাশে তার শাশুড়ি একটি বড় হাঁড়ি মাজছে। বারান্দার এক কোনায় বসে হুঁকা টানছে তার শ্বশুর। চেম শাশুড়িকে হাত জড়ো করে প্রণাম জানাল, শাশুড়িও তার ময়লা হাত জড়ো করে উত্তর দিল প্রণামের। তারপর হেঁটে বারান্দায় শ্বশুরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শ্বশুর হাতের হুঁকোটা বাড়িয়ে দিল চেমের দিকে। হুঁকো হাতে নিয়ে পা ছোঁয়ার জন্য ঝুঁকতেই শ্বশুর মাঝপথে নিরস্ত করল তাকে। শ্বশুরের পাশেই বসল চেস।

একটু পরই গৌনথালী ঘাসের আঁটির ঝুড়ি নিয়ে উঠান পেরিয়ে ঘরের দিকে হেঁটে গেল। একটা সুন্দর কাঁচুলি পরেছে সে। জংলা ছাপার একটি পেটিকোট কোমর জড়িয়ে পা পর্যন্ত নেমে গেছে। তার হাঁটার সময় হাতের চুড়ি থেকে রিনিঝিনি আওয়াজ উঠছে, গলায় প্রবালের হার পরেছে ও। কপালে লাল সিঁদুর, খোঁপায় রডোডেন ফুল জড়িয়েছে। গৌনথালীকে কিছুটা ক্লান্ত দেখালেও তাকে অপরূপা সুন্দরীও লাগছে। চেম খুব তৃপ্তি অনুভব করল, তার মনে হলো দেবী লক্ষ্মী যেন এইমাত্র মানুষের রূপ নিয়ে ঘরে করল।

সন্ধ্যার একটু আগে গৌনথালী কাছে এল তার, পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। চেম ভেতরে ভেতরে তীব্র সুখ অনুভব করল, তার ইচ্ছে হলো এখনই গৌনথালীকে জড়িয়ে ধরে অজস্র চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয় সে। চেম গৌনথালীর হাত ধরতে যেতেই হাত সরিয়ে দিয়ে ভেতরে চলে গেল সে।

রাতের খাবারের পর বারান্দায় চেমের জন্য একটি তোশক পাতা হলো, ওটায় শুয়ে বিশ্রাম নিলেও একবিন্দু ঘুম এল না চেমের। শুয়ে শুয়ে গৌনথালীর জন্য অপেক্ষা করছে সে। সবার খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ হলো, থালাবাটি হাঁড়িকুড়িও ধুয়ে উঠিয়ে নেয়া হলো। লণ্ঠন হাতে কেউ ওপরের কামরায় চলে গেল। হঠাৎ একটা দরজা খোলার আওয়াজ শুনল, পরক্ষণেই আবার তা বন্ধ হয়ে গেল। চেম স্তব্ধ হয়ে বসে রইল বাইরে। অনুশোচনা হলো। ‘ধ্যাৎ! গৌনথালীকে কেন মেরেছিলাম সেদিন? মেয়েরা বিয়ের উৎসব দেখতে ভালোবাসে আর সে তো এখনো তরুণী। বিয়ের অনুষ্ঠান যদি দেখতেই গিয়ে থাকে, তাতে কী এমন ক্ষতি হয়েছে? এজন্য কেউ বৌকে মারধর করে? দেরি করে খাবার রান্নার জন্যও কি কেউ বৌকে মারে? এর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী? আচ্ছা, ঠিক আছে, ও যদি একটু দজ্জাল আর নির্লজ্জও হয়, তাহলেও কী এমন ক্ষতি?

ও আমার সঙ্গে বাড়ি ফিরলে আর কখনই ওকে মারধর করব না। জুথের বৌয়ের চেয়েও ওকে আমি বেশি যত্নে রাখব।’

মনে যখন তার এই অশান্তি চলছে, চেমের খোলা পা মশারা ছেঁকে ধরেছে।

সকালে দরজা খোলার শব্দে তার ঘুম ভাঙল। গৌনথালীর আওয়াজ না পেয়ে চেমের মন খারাপ হয়ে গেল। শ্বশুরকে দেখল প্রস্রাব করতে নর্দমার দিকে যাচ্ছে। সারা রাত চেম চোখের পাতা এক করতে পারেনি। একফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি।

ভোরে যখন হাঁস-মুরগির খাঁচার দরজা খুলে দেয়া হলো, চেমের শ্বশুর তখন বারান্দার এক পাশে বসে তামাক ফুঁকছে, পাশে শাশুড়ি তুষের আগুনে ভুট্টা পোড়াচ্ছে, রান্নাঘরের মেঝেয় বসে গৌনথালীকে দেখল বাসন মাজছে। চেম উঠে গিয়ে একটু লাজুক শ্বশুরকে বলল, ‘কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষেতের ফসল কাটা শুরু হবে। আপনার মেয়ের বাড়ি যাওয়া দরকার।’

হুঁকা টানতে টানতেই শ্বশুর একটু কেশে ওঠেন, হুঁকার নলে গাল ঢেকে বড় বড় কয়েকটি ফুঁ দিয়ে বললেন, ‘আমি শুনলাম যে তুমি আমাকে ফকির, ভিক্ষুক বলে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করো। আমার মেয়েটাকে সবসময় মারধর করো।’

হুঁকায় টান দেয়ার জন্য থামল শ্বশুর তার।

‘আমরা গরিব হতে পারি, কিন্তু ভিক্ষুক নই। বিয়ের সময় আমরা তোমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছি, সাধ্যমতো খরচ করে মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি।’

 

‘এখন তুমি যদি পারো তোমার বৌকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না।’

 

চেম এবার বিষণ্ন হয়ে গেল, তার উৎসাহ দমে গেল।

গৌনথালীর বাসন মাজা শেষে ঘাস কাটতে যাওয়ার জন্য একটা ঝুড়ি হাতে বের হয়ে যাচ্ছিল। চেম এগিয়ে গিয়ে তার পথ রোধ করে দাঁড়াল, হাত ধরল গৌনথালীর।

‘ঝুড়ি নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? চলো, বাড়ি চলো।’

‘আমি মরে যাব, তবু তোমার সাথে যাব না।’

‘বাড়ি না গেলে কোথায় যাবে?’

‘তাতে কার কী? আমার যেখানে খুশি চলে যাব। আমি এখন ভিক্ষু হয়েছি, আমার আপনজন কেউ নেই।’

‘তুমি ভিক্ষু হলে তোমার মোষের দেখাশোনা কে করবে? তাকে কে খাওয়াবে?’

‘আহ! তোমার মোষ তুমি দেখে রাখো। নিজে ঘাস কেটে এনে খাওয়াও।’

‘ওহ! আর ঝগড়া করো না তো। চুপচাপ বাড়ি চলো। এসো।’

‘কেন যাব? ঝগড়া করতে আর মার খেতে?’

‘আমি একটা বেয়াক্কেল আর অভিশপ্ত লোক, আমি যদি আবার তোমাকে মারধর করি।’

‘ঠিক আছে, এটা মনে থাকে যেন।’

দ্রুত তৈরি হয়ে নিল গৌনথালী। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সুন্দর করে সাজল সে। বিদায় নেয়ার সময় মা ছোট্ট পুঁটলিতে করে কিছু একটা হাতে গছিয়ে দিল, সঙ্গে এক হাঁড়ি দইও দিল। গৌনথালী পুঁটলি আর দইটা হাতে নিয়ে বের হয়ে এল বাড়ি থেকে। চেম এগিয়ে এসে বউয়ের হাত থেকে দইয়ের হাঁড়িটা নিল।

তারপর গল্প শুরু হলো তাদের।

‘মোষটা কতটুকু দুধ দিচ্ছে?’

‘অল্প।

শুনে গৌনথালীর চেহারা রাগে থমথমে দেখাল। পাহাড়ের কোলে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। রাখালরা পশুর পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে, পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে। চেম আর গৌনথালী পাহাড়ি ঝরনার কাছে পৌঁছলে জুথের বৌকে দেখল পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে, কাঁধে কলসি। চেমের পেছনে গৌনথালীকে দেখে প্রথমে থমকাল, তার পরই ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, ‘ওহো! রাজহংস আর রাজহংসীর মিলন হলো শেষমেশ। দেখে তো, মনে হচ্ছে নতুন বউ বিয়ে করে বর ঘরে তুলছে।’

‘হেসো না ভাবি! আবার ঝগড়া লেগে যেতে পারে, তুমি তা জানো না গো!’ গৌনথালী লাজুক হাসি দিয়ে বলল।

‘আহা! তা তাতে কি, আর লাগলেই বা কি? স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়াঝাঁটি তো খড়ের গাদায় বিস্ফোফণের মতোই। কারণ খড়ের আগুন যেমন জ্বলে, তেমনি তা নেভেও।’