আরব বলতে চোখে ভেসে ওঠে ঊষর মরু। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে নাম তার ‘জাযিরাতুল আরব’ বা আরব দ্বীপ। কারণ আরব ভূমিকে তিন দিকে ঘিরে আছে সাগর—পূর্বে পারস্য উপসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর ও পশ্চিমে লোহিত সাগর। মরুবাসী আরবদের জীবিকার মূল উৎস ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। মরুপথে যেমন চলেছে তাদের উটের কাফেলা, তেমনি নৌ-বাণিজ্যেও তারা পিছিয়ে থাকেনি। সাগরের নীল জলরাশির বুকে আরবদের এ যাত্রার ইতিহাস বর্ণাঢ্য। নৌবিদ্যা, জাহাজ নির্মাণ ও প্রযুক্তিতে আরবদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইসলামের আবির্ভাব আরব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করে। প্রাথমিক খিলাফতের যুগে নৌ-বাণিজ্য ও নৌশক্তি সংহত করতে শাসকরা উদ্যোগ নেন।

আব্বাসীয় আমলে লোকমুখে শোনা যেতে থাকে আরব্য রজনীর ভুবন ভোলানো কিস্সা। সেই রজনী আলো করা এক নায়ক সিন্দাবাদ—দুঃসাহসী নাবিক সিন্দাবাদ। সাত যাত্রায় সিন্দাবাদ সাত সমুদ্দুরে অভিযানে গেছেন। মোকাবেলা করেছেন দানবীয় ঢেউ, আস্ত দানব, জাদুকরকে; দেখেছেন কত শত জাদুকরী পরিস্থিতি। সিন্দাবাদ বারবার অভিযানে গেছেন বাগদাদ বন্দর থেকে, আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনামলে। সিন্দাবাদের কাহিনী, তার নায়কোচিত মর্যাদা সেকালে মুসলিম আরব সমাজে নাবিকের গুরুত্বকে আমাদের সামনে হাজির করে। আব্বাসীয় আমলে যে আরব মুসলিম নাবিকরা দুনিয়ার নানা প্রান্তে অভিযানে যাচ্ছিলেন সে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাবিকদের দুঃসাহসী অভিযানের কাহিনী আরব লোককথায় স্থান করে নিয়েছিল। আব্বাসীয় আমলে আরব অর্থনীতি ও সমাজ বিকশিত হচ্ছিল। বণিকরা নতুন নতুন পণ্য, বাণিজ্যপথ আর বন্দরের খোঁজে সাগর চষে বেড়াচ্ছিলেন। আরব নৌশক্তির এহেন বিকাশের পর্বেই সিন্দাবাদ জায়গা করে নিলেন।

ইসলামের আবির্ভাবের আগেই আরবরা নৌ-বাণিজ্যে অভ্যস্ত ছিল। আরবি ভাষার প্রাচীন অভিধানে নৌবিদ্যা, সমুদ্রযাত্রা, জাহাজসংক্রান্ত অনেক শব্দের অস্তিত্ব রয়েছে। আছে বিদেশী শব্দও। অর্থাৎ নৌ-যোগাযোগের মাধ্যমে ভিনদেশীদের সঙ্গেও আরবদের যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। আরবি ভাষায় সফিনা ও ফুলক শব্দ দুটি দিয়ে সাধারণত নৌকা ও জাহাজ বোঝানো হয়। প্রাচীনকালের আরব কবিরা বড় নৌকা বা জাহাজ বোঝাতে খালিয়াত শব্দটি ব্যবহার করতেন। কুরআন শরীফে বড় জাহাজ বা নৌকার জন্য জারিয়া ও জাওয়ারি (বহুবচন) ব্যবহার করা হয়েছে। বড় জাহাজের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহন হিসেবে যে ছোট নৌকা থাকে তাকে বলা হয় কারিব।

আব্বাসীয় খিলাফতের যুগে আরবি নৌবিদ্যায় নতুন নতুন শব্দের সংযোজন লক্ষ করা যায়। দজলা নদীতে অভিজাতদের ভ্রমণের জন্য ব্যবহূত নৌকার নাম ছিল তাইয়ার। আর প্রমোদ ভ্রমণের নৌকাকে বলা হতো জাওরাক। সেকালে নৌযাত্রাকে আরবরা বলতেন মিলাহ্। এটি এসেছে মিলহ্ থেকে যার অর্থ লোনা। যিনি সমুদ্রযাত্রা করতেন তাকে বলা হতো মাল্লাহ। নৌকা চালনাকে বলা হয় মিলাহাত কিংবা সিফানাত। আরবিতে নাবিককে বলা হয় মাল্লাহ ও সাফফান।

আমরা আজ যে খালাসি শব্দটি ব্যবহার করি তার মূলও আরবি ভাষায়। জাহাজের চাকর, কর্মচারীদের বলা হতো খাল্লাসি। আরবিতে খালাস অর্থ সাদা-কালোর মিশ্রণ। সাদা ও কালো পিতামাতার সন্তানকে ‘খাল্লাসি’ বলা হতো। এ শব্দের মূল আরবি। সেকালে আরবরা হাবশি মেয়েদের দিয়ে ঘরের কাজ করাত। এই মেয়েদের সন্তানরা সাধারণত জাহাজে কাজ পেত। এদেরই বলা হতো খালাসি। জাহাজের কাপ্তানকে বলা হয় রব্বান। আব্বাসীয় আমলে জাহাজের নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারীদের ‘মাল্লাহ’ ও ‘খাল্লাসি’ আর উচ্চপদস্থদের বলা হতো রাউসা। একবচনে হতো রইস।

নৌবিদ্যা যত উন্নত হতে থাকে, আরবরা জাহাজে চেপে নতুন নতুন দিগন্ত পানে যাত্রা করে। ফলে অন্য ভাষার অনেক শব্দ আরবদের নৌবিদ্যায় জায়গা করে নেয়। এগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শব্দ হচ্ছে ‘বার’, যার অর্থ উপকূল বা কিনারা। ধারণা করা হয়, শব্দটির উৎস ফার্সি বা সংস্কৃত। দক্ষিণ ভারতের মালাবার ও কোলাবার এবং আফ্রিকার জাঞ্জিবার উপকূলে বার শব্দটি একই অর্থে ব্যবহূত হয়। ধারণা করা হয়, শব্দটি সংস্কৃত ‘বার’ শব্দের (যথা কাতিয়াবার, কারবার) আরবীকৃত রূপ।

সাগরের জলরাশির সীমা এই আধুনিক যুগেও অসীমের মতোই মনে হয়। মধ্যযুগে সাগরের বিস্তৃতি নিয়ে জ্ঞানভাণ্ডারে আরব নাবিকদের আছে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ২২৫ হিজরিতে সুলায়মান নামের এক আরব নাবিক লিখে গেছেন—

যেসব কথা লোকে আগে জানত না এবং আমাদের আমলে জানতে পেরেছে, সেগুলো হলো চীন সাগর ও ভারত মহাসাগর সিরীয় সাগরের সঙ্গে যুক্ত। আগের দিনের নাবিকদের এ রকম কোনো ধারণাও ছিল না, কিন্তু আমাদের আমলে এটা প্রমাণিত হয়েছে। আমরা এমন খবর পেয়েছি—ভূমধ্যসাগরে যে জাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ঢেউয়ের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, সেগুলো হাওয়ার টানে পানিতে ভেসে খাযার সাগরে চলে এসেছে এবং সেখান থেকে ভূমধ্যসাগরে এসেছে এবং তার পরে ভূমধ্যসাগর ও সিরীয় সাগরে এসেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় চীন ও সিলার চতুর্দিকে সাগর রয়েছে, তা তুর্কিস্তান ও খাযারের পেছনে বিস্তৃত হয়েছে। তারপর ভূমধ্য উপসাগরে গিয়ে পড়ে সিরিয়ার উপকূলে প্রবাহিত হয়েছে। এটা প্রমাণিত হয়েছে, কারণ প্রধানত জাহাজের কাঠ জোড়া বাঁধা থাকত আর শুধু রোমীয় জাহাজে লোহার কাঁটা লাগানো থাকত। আরো একটি কারণ দৃষ্টে আমরা এই সত্য জানতে পেরেছি যে ভূমধ্যসাগরে আম্বর পাওয়া গেছে, অথচ এখানে আম্বর পাওয়া যেত বলে আগে কখনো জানা যায়নি। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে আম্বর এখানে সম্ভবত এডেন থেকে এসে থাকবে। আম্বর যেসব নদীতে জন্মায় তাদের সঙ্গে লোহিত সাগরের সংযোগ থাকলেও লোহিত ও ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে প্রতিবন্ধক রয়েছে (এই প্রতিবন্ধক হচ্ছে সুয়েজ, যা এখন খাল)। কাজেই আম্বরের কথা যদি সত্য হয়, তাহলে খুব সম্ভবত ভারত মহাসাগর আম্বর অন্যান্য সাগরে বহন করে নিয়েছে, সেসব সাগর থেকে শেষ পর্যন্ত তা ভূমধ্যসাগরে গিয়ে থাকবে।

আরব বণিক সুলায়মানের এ বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন পৃথিবীর স্থলভাগ ও জলভাগের মানচিত্র সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা ছিল। পরবর্তীকালে আরব নাবিকরা আফ্রিকার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার পথ সম্পর্কে আরো বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। পরবর্তীকালে আল মাসুদি (৩০৩ হি.) ও আবু রায়হান বেরুনি (ওফাত ৪৪০ হি.) প্রমুখ সাগর পথের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। আরো পরে আবুল ফিদ (ওফাত ৭২৫ হি.) ও ইবনে খালদুন মহাসাগর সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা লিপিবদ্ধ করেছেন।

আরবে সেকালে বিভিন্ন সাগরের জন্য আলাদা আলাদা বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এমন বিশেষজ্ঞদের কথা উল্লেখ করে গেছেন মাসুদি। এমন ওস্তাদ নাবিকদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন—

ভূমধ্যসাগরের যুদ্ধ ও সওদাগরি জাহাজের নাবিকদের আমি দেখেছি।...জাহাজের কর্মচারী, কর্মকর্তা, যোদ্ধা চালকদের সঙ্গেও আমি দেখা করেছি, আলাপ করেছি। তাদের একজন হলেন আবুল হারিস লাওয়ি, যিনি দামেস্ক উপকূলের সিরীয়-ত্রিপোলির শাসকের কর্মচারী। তাদের মতে, ৩০০ হিজরির পরে ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য ও বিস্তার অনেক বেড়ে গেছে, এর উপসাগরের সংখ্যাও হয়েছে অসংখ্য। সিরিয়ার হিমসের প্রধানের উজিরের পুত্র আবদুল্লাহ আমাকে একই রকম তথ্য দিয়েছেন। বর্তমান কালে (৩৩২ হি.) ভূমধ্যসাগর সম্বন্ধে তার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করার মতো ব্যক্তি আর কেউ নেই, প্রবীণদের মধ্যেও নেই। যুদ্ধ ও সওদাগরি জাহাজের নাবিক সবাই তার উপদেশ অনুযায়ী কাজ করেন। তার তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও যথার্থতার প্রতি প্রত্যেকেরই বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। ভূমধ্যসাগরে গ্রিকদের বিরুদ্ধে তিনি যে যুদ্ধ করেছিলেন তা-ও সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন।

ভূগোলবিদ কিংবা জ্ঞানীরা যে মত দিতেন ‘অশিক্ষিত’ নাবিকরা অনেক সময় সাগরের বুকে ঢেউয়ে ভেসে, অজানা সীমানায় হাজির হয়ে তাদের ভুল প্রমাণিত করে দিতেন। এমন আরব নাবিকদের নিয়ে মাসুদি লিখেছেন—

সাগরে চলাচলকারী এ নাবিকরা জানেন, কখন হাওয়া প্রবাহিত হবে—তারা তাদের পরবর্তী পুরুষের নাবিকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণও প্রদান করে যান, কেননা তারা হাওয়া আর ঢেউয়ের গতি জানেন। কখন সাগর উত্তাল হবে আর কখন শান্ত হবে তা-ও তারা জানেন।

এতক্ষণ গেল আরবদের নৌবিদ্যা ও নৌযাত্রার ঐতিহ্যের কথা। এবার এ ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আরবদের নৌ-বাহিনী তৈরির ইতিহাসের সূচনা নিয়ে দুয়েক কথা বলা যায়। ভূমধ্যসাগর উপকূল ঘিরে যে মানুষের বসবাস ছিল সপ্তম-দশম শতাব্দী সময়কালে তারা মূলত দুটি ধর্মীয় পরিচয়ে বিভক্ত ছিল—মুসলিম ও খ্রিস্টান। সমাজ, সমরশক্তির ভারসাম্যে চলছিল নিত্যদিনের ভাঙাগড়া। ভূমধ্যসাগরের মধ্যাঞ্চলে সমুদ্রের জলরাশির ওপর কাদের নিয়ন্ত্রণ থাকবে তা নিয়ে খ্রিস্টান ও আরব মুসলিম নৌশক্তির সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সময় সময় বদলে গেছে শক্তির ভারসাম্য। শুরুর দিকে মুসলিম শাসকরা স্থালভাগে তাদের বিজয়াভিযান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ধীরে ধীরে শক্তিশালী নৌবাহিনী তৈরির গুরুত্বও তারা বুঝতে পারেন। উমাইয়া আমলেই বাইজেনটিয়ামের খ্রিস্টান সাম্রাজ্যকে পরাজিত করার তত্পরতা শুরু হয়েছিল। এজন্য দরকার ছিল ভূমধ্যসাগরের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য। আব্বাসীয় আমলে বাইজেনটিয়ামের সঙ্গে রেষারেষি চরমে ওঠে।

ভূমধ্যসাগরের অনেক দ্বীপ ও বন্দর এলাকা মুসলিম নৌশক্তির পদানত হয়। আবার অনেক জায়গায় খ্রিস্টানদের সঙ্গে আপসও করতে হয়েছিল। এ সময় মুসলিম নৌবহরের জাহাজগুলো ছিল দাঁড়টানা, পালের জাহাজ তারা কম ব্যবহার করত। দাঁড়টানা জাহাজ পাল তোলা জাহাজের চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন ছিল। এ সময় আরব ও বাইজেনটিয় শক্তির নৌবাহিনীর গঠন প্রায় একই ধরনের ছিল। তবে পার্থক্যও ছিল। এই নৌশক্তি আরব মুসলিম সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির কারণে বিভিন্ন এলাকার জাহাজ নির্মাণ বিশারদ ও অভিজ্ঞ নাবিকরা আরবদের সঙ্গে শামিল হয়েছিল। সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও মিসরের উপকূলে শক্তিশালী জাহাজ নির্মিত হয়, যা আব্বাসীয় আমলে মুসলিমদের অনেক নৌযুদ্ধে জয়ী হতে সহায়তা করেছে।

এসএম রশিদ: লেখক