রুশ লেখক ম্যাক্সিম গোর্কি উপন্যাসের তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। প্রথমত ভাষা, দ্বিতীয়ত আখ্যান, তৃতীয়ত শিল্প-সৌন্দর্য সৃষ্টি করা। গোর্কির কথাটি উপন্যাসের প্রাথমিক বিন্যাসের বেলায়। কিন্তু বাংলা উপন্যাস প্রধানত আখ্যাননির্ভর। আধুনিক উপন্যাস নিছক কাহিনীনির্ভর নয়। তাই কখনো কখনো উপন্যাসে অপূর্ণ চরিত্র বিন্যাস আখ্যানকে নঞর্থক করে তোলে। শিল্পের এমন সূক্ষ্ম দোলাচল উপন্যাসের নতুন ভাষ্য তৈরি করে বৈকি।

‘তোমারে চিনি না আমি’ উপন্যাসের কাহিনীর বিন্যাস ঘটেছে উত্তরবঙ্গের এক বিশ্ববিদ্যালয় শহরকে কেন্দ্র করে। আর তা প্রদক্ষিণ করে এসেছে একটা ছকবদ্ধ সময়ের মানসপট। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রানা অন্তর্মুখী, আপাত স্বপ্নহীন, ব্যর্থ, অনেকটা সামাজিক জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো একজন মানুষ। যে সংসার নামক একটা অন্তঃসারহীন খাঁচায় বসবাস করে যাচ্ছে, যেন অনেকটা প্রকৃতির নিয়মে। রানা তার অতীত রোমন্থনের মধ্য দিয়ে কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। রানার সেই বর্ণনায় দেখা যায়, একজন যুবক যার স্বপ্ন ছিল কবি হওয়ার এবং একই সঙ্গে বিপ্লবের প্রচণ্ড আকর্ষণ কীভাবে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন ও বাস্তবের ফারাক যেন বারে বারে রানাকে বিচ্ছিন্ন মানুষে পরিণত করেছে।

সে ছিল বরাবরই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন একজন, যাকে তার বাবা নাস্তিকতার অজুহাতে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ সে আদৌ নাস্তিক কিনা, এ-সম্পর্কিত তার কোনো মতবাদ আছে কিনা উপন্যাসের বয়ানে তা অনুপস্থিত। এ সম্পর্কে রানা বলছেন, ‘জীবনযাপনে আমি কিছুটা এলোমেলো। বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কিছু আন্দোলনেও অংশ নিয়েছিলাম। ...ধর্ম বিষয়ে আমার বিতৃষ্ণা কখনো নাস্তিকতার পর্যায়ে চলে যায়নি। ...ধর্ম নিয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারিনি, যাতে আমাকে নাস্তিক বলা সম্ভব।’ এখানে লেখক মাহবুব মোর্শেদ আমাদের চেনা ধারণায় এক বড় ধরনের নাড়া দিয়েছেন। অর্থৎ যাদের সমাজে নাস্তিক হিসেবে প্রচার করা হয় বা শাস্তি দেয়া হয়, তাদের নাস্তিকতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রমাণসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। লেখক এখানে পাঠকের জন্য ভাবনার খোরাক রেখে যাচ্ছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় আমরা যে মাহবুবকে চিনি, তিনি গভীর রাজনৈতিক বিষয় প্রহসনের ছলে বলেন, সেই তিনিই তার উপন্যাসে বিপ্লবের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেছেন। এ উপন্যাসে রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতা এসেছে প্রকট হয়ে। করেছেন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তীব্র কটাক্ষ।

‘...এ শিক্ষা ব্যবস্থা আপনাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে যে, আপনি আর দর্শনায় ফিরে গিয়ে বাবার কাছ থেকে জমি চেয়ে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করতে পারবেন না। ...দেখুন চারদিকে যত লোক হাঁটছে, সবার জীবনেই স্বপ্ন ছিল। অধিকাংশই সেখানে পৌঁছতে পারেনি। ...যদি পারত তাহলে দেশটা এমন থাকত না।’

‘...এ শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা কি তাদের জনগোষ্ঠীর কাজে লাগছে? এদের কেউ কি গ্রামে তাদের গরিব মা-বাবার কাছে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজ করছে? নাকি এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই শুধু বাড়ছে এবং শহরে ভিড় বাড়ছে।’

প্রতিবাদহীন একটা স্থবির আত্মকেন্দ্রিক যুবসমাজের চিত্র দেখা যায় এ উপন্যাসে। একটা হত্যাকাণ্ডের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা খোলার পর আবার যখন ফিরে আসছে, তাদের নির্লিপ্ততা দেখে মনে হচ্ছে, যেন গ্রীষ্মের ছুটি শেষে হলে ফিরছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই, জিজ্ঞাসা নেই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো নেই। রানা তখন বলছে, ‘আমার খুব ইচ্ছা করে, চেতনাহীন ওই মুখগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে বাস্তবতার মুখোশ খুলে দিতে।’

সেই রানাই আবার যে মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন পড়ে জীবনে একবার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের একটা মৌলিক দাবি চৌকাঠ পর্যন্ত আসা ছাত্রছাত্রীরা যারা কোনোদিন জানতেই পারেনি যে, ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়! সে এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, যারা তাদের শাসন করে, তাদেরও চ্যালেঞ্জ করা যায়। সে ধারণাটা সে ছাত্রদের মাঝে বুনে দিয়েও আন্দোলনটা সফল করতে পারেনি। তদুপরি ছাত্রশিবিরের এক হুঙ্কারে, কোনো প্রতিবাদ না করেই রাতারাতি তাকে হল ছাড়তে দেখা যায়। এই যে পলায়নপরতা, এই যে কেন্নো হয়ে বেঁচে থাকা মানুষ, এই কি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা! রানা, সংসারের প্রতি যার কোনো দায় ছিল না, বলতে গেলে কোনো পিছুটান নেই, সে কেন ঘুরে দাঁড়াতে পারল না। প্রতিবাদ করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারল না! রানা যেন এক চক্রব্যূহে ঢুকে পড়া অভিমন্যু, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ তার জানা নেই।

রানার স্বপ্ন ছিল মূলত কবি হওয়ার। কিন্তু তার ভেতরে বিপ্লবের বীজ বুনে দিয়েছেন সরদার। সরদার চরিত্রটি এ উপন্যাসের প্রাণ। সরদার আপাদমস্তক একজন ছদ্মবেশী মানুষ। যিনি একই সঙ্গে শিল্পচর্চা, লালন সাধনা, গঞ্জিকা সেবন, মদ্যপান, প্রেম-যৌনাচার, মার্ক্সবাদী ধ্যান-ধারণা আর একটা স্থানীয় পত্রিকা প্রকাশে নিজেকে ব্যাপ্ত রেখেছেন। এ চরিত্রের আবির্ভাবের মধ্য দিয়েই লেখকের বিষয়বস্তু নির্ধারণের নৈপুণ্য পরিলক্ষিত হয়। সরদার যে আসলে কে, কী তার প্রকৃত উদ্দেশ্য, এটা বোঝা রানার জন্য সহজ ছিল না। সরদার সবসময় রানাকে কবিতা লিখতে উৎসাহিত করে গেছেন। রানা যখন সরাসরি আন্দোলন সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছে, সরদার তখন তাকে বাধা দিয়েছেন। তিনি বলছেন, ‘আপনি কবিতা লিখবেন, আপনি বিপ্লবের স্বপ্ন মনে রাখবেন, লোকে ভুলতে চাইলে স্বপ্নটাকে মানুষের মধ্যে চারিয়ে দেবেন। লেখকদের একজোট করে তাদের মধ্যে যৌথ স্বপ্ন বুনে দেবেন।’

‘বিপ্লবের ইশারা যদি জনপ্রিয় কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষ অনুবাদ করে নিতে না পারে, তবে কিন্তু মানুষ বিপ্লবীদের ভুল বুঝবে।’ এ কথার গূঢ় অর্থ অনেক গভীর, যা একজন বিপ্লবীমাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন।

উপন্যাসের ঘটনাপরম্পরা ঠিক এভাবে সাজানো নয়। উপন্যাসের শুরুতে পাঠক যে রানাকে দেখবে, শেষ দিকে গিয়ে সে এক ভিন্ন মানুষ।

এ উপন্যাসের বড় একটা অংশজুড়ে রয়েছে যৌনতা। রানা এক প্রেম থেকে আরেক প্রেমে, কখনো প্রেমহীন যৌন সম্পর্কে ব্যাপ্ত রেখেছে নিজেকে। তার বয়ানে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে একজন লম্পট যুবকের যৌন দৌরাত্ম্য। শুরুতে কিছুটা প্রেমাকাঙ্ক্ষার মতো মনে হলেও নারী প্রথমত তার কাছে একটা শরীর, তারপর প্রেম। নারীর প্রতি তার প্রেমাকাঙ্ক্ষা শরীরকেন্দ্রিক এবং তার জীবনে আসা প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে তার একই মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। এমনকি যে নারী তার বন্ধু, তাকেও সে অবচেতনে একটা নারী শরীরই ভাবে। যদিও পরবর্তীতে তার অনুশোচনা হয়। তবু এটাই যেন এ উপন্যাসের পুরুষ চরিত্রগুলোর মনোদৈহিক রূপ। তাই কবি থেকে বিপ্লবী সবাই এখানে কামুক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

সরদারের জীবনাচারণ, তার লালন সাধনা, তার রাজনৈতিক কৌশল, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম সবকিছু এক দক্ষ চরিত্র নির্মাতার মতো নির্মাণ করেছেন মাহবুব। শুধু তার মনোদৈহিক জীবনের ব্যাখ্যাটা সাধারণ পাঠকের কাছে পরিষ্কার করেননি। পাঠক তাকেও লম্পট ভাবতে বাধ্য। সাধারণত মার্ক্সবাদী রাজনীতি যারা করেন, তারা প্রচলিত নিয়মের বিবাহরীতি অনেক সময় অনুসরণ করেন না। মানসিকভাবে কাছাকাছি আসা দুজন মানুষ পারস্পরিক শপথ গ্রহণের মাধ্যমে বা পার্টি সদস্যদের সাক্ষী রেখে একসঙ্গে বসবাস করে থাকেন। এ উপন্যাসে সরদারের সঙ্গে পপির তেমন একটা সম্পর্ক তৈরি হতে পারত, কিন্তু সেটা হয়নি। লালনের সাধনসঙ্গী ধারণার সঙ্গেও এর মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে কোনো লুকোছাপা নেই। সরদারের যৌনজীবনে রাখঢাকের ব্যাপারটা আছে, তাই এখানে অনৈতিকতার আভাস স্পষ্ট। এখানে কেউ কারো প্রতি সৎ নয়। পুরোটাই অবাধ যৌনাচার। পাঠক হিসেবে এখানে ধাক্কাটা লাগে। একজন বিপ্লবীর এমন কামুক উপস্থাপন পাঠককে আহত করতে পারে। একজন রাজনৈতিক কর্মী, যিনি একটা আদর্শের জন্য সংগ্রাম করছেন, নৈতিক জীবনে তার অন্তত সংযমী হওয়া প্রয়োজন ছিল। মাহবুব মোর্শেদ হয়তো তার লেখায় বাংলা উপন্যাসের প্রচলিত যৌন সম্পর্কের নীতি-নৈতিকতার ট্যাবু ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছেন। তবে শারীরবৃত্তীয় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি উপন্যাসের আখ্যানকে খানিকটা ন্যুব্জ করে দেয়।

রানা, যে কোনো একলা মানুষ নয়, জীবনের প্রয়োজনে সে নানা মানুষের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে। আবার অনেকের সঙ্গে থেকেও সে একা। সে যেন তার সবচেয়ে কাছের মানুষটাকেও চিনে উঠতে পারেনি বা কাছের মানুষটাও ধরা দেয়নি তার কাছে। এ চিনতে না পারার ব্যর্থতা ক্রমাগত তাকে হতাশ করে তুলেছে। সময়টাকে সে স্থবির হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে, কিন্তু আদতেই কি তাই!

পাঠকের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারা, তাকে স্বপ্ন দেখাতে পারা একজন লেখকের সাফল্য। মাহবুব মোর্শেদ তার বয়ান আর শব্দ চয়নের মধ্য দিয়ে সে বোধ তৈরি করে গেছেন। তাই ‘তোমারে চিনি না আমি’ হয়ে উঠেছে চেনা জগতের অতলান্তিক উপন্যাস।