মাউন্ট এভারেস্টের আকর্ষণে নামচে বাজার পৌঁছানোর চারটি রুটের কথা বলেছিলেন এরিক শিপটন। চারটের মধ্যে দুটো বিহারে। দ্বারভাঙার উত্তরে জয়নগর কিংবা উত্তর বিহারের যোগবনী হয়ে হাঁটা শুরু হতো। কিছু পথ অবশ্য যাওয়া যেত লরিতে। কিন্তু এ দুটি পথের অসুবিধা ছিল জোগাড়যন্ত্রের। ছোট শহর হলে যা হয় আর কি! তৃতীয় পথটির শুরু কাঠমান্ডু থেকে। সেখানে ভারত থেকে লটবহর নিয়ে আসতে হতো। তার বিশাল খরচ। আর শেষ পথটি ছিল দার্জিলিং থেকে। রাস্তা একটু বেশিই। তবে শেরপা পথপ্রদর্শক বা কুলি থেকে শুরু করে অন্যসব প্রয়োজনীয় জিনিস, রসদ ইত্যাদি সংগ্রহ করতে অসুবিধা ছিল না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো দার্জিলিং ছিল ইংরেজদের রাজত্বে। খাস সাহেবদের শহর যাকে বলে। তাই বিশ শতকের প্রথমার্ধ বা দ্বিতীয়ার্ধের প্রারম্ভ পর্যন্ত নেপাল বা সিকিমের যত পাহাড়ের অভিযান তার বেশির ভাগই শুরু হতো দার্জিলিং থেকে।

১৯৩০ সালে ফ্র্যাঙ্ক স্মাইথ যে অভিযানে শামিল হয়েছিলেন তার গন্তব্য এভারেস্ট ছিল না। ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর সেই অভিযানের নেতা গুন্থার ডুরেনফোয়ার্থ যাত্রা করার ঘাঁটি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দার্জিলিংকে। সেবারের অভিযান সফল হয়নি। তবে দলের অন্যতম সদস্য ফ্র্যাঙ্ক স্মাইথ প্রথমবার এলেন দার্জিলিংয়ে আর সেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপূর্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিছু উপলব্ধি তার স্বভাবসিদ্ধ সুললিত ভাষায় লিখে রেখেছিলেন ‘দ্য কাংচেনজুংগা অ্যাডভেঞ্চার’ বইতে।

কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র সৌন্দর্য আর তার শরীরজুড়ে তাকে ঢেকে রাখা তুষারের প্রাচুর্যের আশ্চর্য কারণটি ধরা পড়েছিল ধুরন্ধর পর্বতারোহী স্মাইথের চোখে। তিনি লিখেছিলেন, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে যেহেতু অন্য অনেক নামিদামি পর্বতশৃঙ্গের মতো বিভিন্ন উঁচু চূড়া ঘিরে রাখেনি, তাই সমতল থেকেই তাকে দেখা যায়। স্মাইথের নিজের ভাষায়, আমি এমন আর কোনো মাউন্টেন রেঞ্জ দেখিনি, যা এখানকার মতো হঠাৎ সমতল থেকে পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। এই দেখলাম রয়েছি গল্ফ কোর্সের মতো সবুজ আর সমতল বাংলার মাঠ-ময়দানে, পরক্ষণেই দেখি পাহাড়ি উপত্যকা একেবারে ঘিরে ফেলেছে। বোঝা যায় হিমালয় পৌঁছে গিয়েছি।

দার্জিলিং যাওয়ার পথটাও এমন। স্মাইথের যুগে তো বটেই, প্রায় ১০০ বছর পরে এখনো। শিলিগুড়ির ধুলো ওড়া শহর পার হয়ে চা বাগানকে চিরে পথ গিয়ে যেই না শুকনার জঙ্গলে ঢুকেছে, তার কিছুক্ষণের মধ্যে হঠাৎ যে কখন পাকদণ্ডী রাস্তা আর তার পাশে গভীর খাদ শুরু হয়ে গেল, টেরই যেন পাওয়া যায় না। এ সমতলের ওপর দিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে বয়ে আসা হাওয়ার কথা বলেছিলেন স্মাইথ। সেই সামুদ্রিক বাতাস সরাসরি ধাক্কা দেয় কাঞ্চন পাহাড়ে। তার কারণেই সেখানে অত বরফ।

দার্জিলিং পাহাড় বা কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু বিদেশী পর্বতারোহীদের নয়, মুগ্ধ ও বিস্ময়াবিষ্ট করেছে এ দেশের প্রায় প্রত্যেক ভ্রমণার্থীকে। তাই দার্জিলিং সাহিত্যের বিষয়বস্তু হয়েছে অসংখ্যবার, বিভিন্নভাবে, নানা আঙ্গিকে। রবীন্দ্রনাথ বা উপেন্দ্রকিশোর থেকে শুরু করে এ যুগের সাহিত্যিকরা কেউই দার্জিলিংকে এড়াতে পারেননি তাদের সৃষ্টিতে।

স্মাইথ সেবারের অভিযানে যাওয়ার বছর ছয়েক আগে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলেন বিশ্বকবি। সেখান থেকে ভ্রাতুষ্পুত্রীকে চিঠিতে লিখেছিলেন গাড়িতে দার্জিলিং যাওয়ার পথের বর্ণনা—

গাড়ি চলতে লাগল। বন-পাহাড়-পর্বত-ঝরনা-মেঘ এবং বিস্তর খাঁদা নাক এবং বাঁকা চোখ দেখা দিতে লাগল। ক্রমে ঠাণ্ডা, তারপর মেঘ, তার পরে নদিদির সর্দি, তার পরে বড়দিদির হাঁচি, তারপরে শাল কম্বল বালাপোষ, মোটা মোজা, পা কন্কন্, হাত ঠাণ্ডা, মুখ নীল, গলা ভার ভার এবং ঠিক তার পরেই দার্জিলিং।

আবার কবির লেখা ‘দুরাশা’ গল্পের কথক বলছেন:

দার্জিলিংয়ে গিয়া দেখিলাম, মেঘে-বৃষ্টিতে দশদিক আচ্ছন্ন। ঘরের বাহির হইতে ইচ্ছা হয় না, ঘরের মধ্যে থাকিতে আরো অনিচ্ছা জন্মে।

হোটেলে প্রাতঃকালে আহার সমাধা করিয়া পায়ে মোটা বুট এবং আপাদমস্তক ম্যাকিন্টশ পরিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছি। ক্ষণে ক্ষণে টিপ টিপ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে এবং সর্বত্র ঘন মেঘের কুজ্ঝটিকায় মনে হইতেছে যেন বিধাতা হিমালয় পর্বতশুদ্ধ সমস্ত বিশ্বচিত্র রবার দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া মুছিয়া ফেলিবার উপক্রম করিয়াছেন।

রবি ঠাকুরের এ ভাষা আর ভাব একই সঙ্গে কৌতুক আর বর্ণনা প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন রস সম্রাট পরশুরাম ‘কচি সংসদ’ গল্পে। সেই গল্পের কথক ব্রজেন, যে কিনা পেশায় ঘাঘু উকিল অবশ্য পরিকল্পনা করেছিল ডালহৌসি পাহাড়ে যাবে। কিন্তু দজ্জাল গৃহিণীর ‘হ্যাং ডালহাউসি। দার্জিলিং চল’ শুনে নিক্কথায় রাজি হয়ে যায় দার্জিলিং যেতে।

পরশুরামের গল্পে দার্জিলিংয়ের পটভূমিতে প্রেম, কোর্টশিপ, ‘হাইকোর্টশিপ’ আর বহু রঙ্গ-রসিকতার মধ্যে দার্জিলিংকে ক্ষণিকের তরে দেখা গিয়েছিল নকুড়মামার মতো বেরসিকের দৃষ্টিকোণ থেকেও। আর ছিল এক পাহাড়ি সন্ধ্যার মনোরম বর্ণনা—

জনবিরল পথ দিয়া চলিয়াছি। শহরের সর্বত্র—উপরে, আরো উপরে, নিচে, আরো নিচে, স্তরে স্তরে অগণিত দ্বীপমালা ফুটিয়া উঠিয়াছে। রাস্তার দুই ধারে ঝোপে-জঙ্গলে, পাহাড়ি ঝিঁঝিঁর অলৌকিক মূর্চ্ছনা ষড়জ হইতে নিষাদে লাফাইয়া উঠিতেছে। পরিষ্কার আকাশে চাঁদ উঠিয়াছে, কুয়াশার চিহ্নমাত্র নাই।

সাহিত্যের দার্জিলিং কখনো পাঠকের কাছে ধরা দেয় ভ্রামণিকের গন্তব্য হয়ে। আবার কখনো পাঠক তাকে পায় কাহিনীর অকুস্থল হিসেবে। কখনো আবার দার্জিলিং শহর তার হাজারো রূপের ডালি নিয়ে কাহিনীর চরিত্রও হয়ে ওঠে।

শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ‘হাওয়া বদল’ করতে দার্জিলিং গিয়ে ছবি এঁকেছেন ভাষা দিয়ে। সেই ভাষা কখনো অপরূপ গদ্য আবার কোনো সময়ে মন ভোলানো পাহাড়িয়া ছন্দ। সবাই দার্জিলিং থেকে কাঞ্চন পাহাড় দেখে। অবনীন্দ্রনাথও দেখেছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ দিকের পাহাড়তলি তার শিল্পীর চোখকে এড়াতে পারেনি। তার কথা তিনি লিখেছেন—

দক্ষিণে পাহাড়তলা যতদূর দেখা যায়, তত দূর পর্যন্ত নিশ্চল মেঘ-সমুদ্র, উত্তরে তুষার পর্বতের অচল ঢেউ, তারই মাঝে একখানি কালো পাথর আর তার গলা জড়িয়ে একটি বনলতা। পাথর সে কাঞ্চনশৃঙ্গের দিকে চেয়ে সকাল-সন্ধ্যা সোনার স্বপ্ন দেখেছে, বনলতা পাহাড় তলার দিকে চেয়ে মেঘ-সমুদ্রের তলায় যে সবুজ বন সবুজ মাঠ লুকিয়ে আছে, তারই স্বপন দেখেছে...

সওয়া’শো বছর আগে দার্জিলিং কেমন ছিল তার একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর লেখা ‘দার্জিলিং’ আর ‘মেঘের মূলক’ শীর্ষক একাধিক রচনায়। ‘সখা’, ‘মুকুল’ আর ‘সন্দেশ’-এর বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত নাতিদীর্ঘ রচনাগুলোয় দার্জিলিংয়ের যাত্রাপথ পাহাড়, মেঘ, ‘কোয়াশা’, রেল, ভুটিয়া, নেপালি, বৌদ্ধমঠ, সাধু, কুলি, পাহাড়, ডান্ডি, ঘোড়া, মুটে, লামা, ‘খাঁচেন ঝ ঙ্গা’, তিব্বত, ‘চারি আনা সের পটল’, ভুটিয়া দুধওয়ালা প্রভৃতি নানা তথ্য ঘটনা বিবরণ ইত্যাদি সেকালের দার্জিলিংয়ের এক পরিষ্কার ছবি তুলে ধরে পাঠকের মানসে। নকুড়মামার মতো একটি চরিত্রও দেখা যায় উপেন্দ্রকিশোরের লেখায়। সে হলো বাবুর চাকর রাম। বাবুর সঙ্গে দার্জিলিং বেড়িয়ে ফিরে যে বলেছিল:

এতটুকু বাড়ি, তাতে না আছে উঠান, না আছে পুকুর। এদিকে গেলে পাহাড়, ওদিকে গেলে পগার, একটু মাঠ নাই যে দু’দণ্ড পায়চারি করি। সে দেশে কি মানুষ থাকে?

বহুদর্শী সাহিত্যিকরা বুঝতেন দার্জিলিং মানেই যে তা প্রত্যেকের কাছে পাহাড়ের রানী বা নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি হবে, এমন কোনো কথা নেই। সেই রকম বোঝাতেই হয়তো নকুড়মামা বা চাকর রামের মতো চরিত্রদের সৃষ্টি। তবে উপেন্দ্রকিশোর নিজে রসিক পাঠকের জন্য দার্জিলিংকে তুলে ধরেছেন অপরূপ বর্ণনায়। পাহাড়ে মেঘের প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন—

আমার মেঘের খেলা দেখিতে বড়ই ভালো লাগে। দূর হইতে মেঘ ক্রমে কাছে আইসে, গাছপালাগুলো ক্রমে ঝাপসা হইয়া তাহার সঙ্গে মিলাইয়া যাইতে থাকে। ক্রমে আমাদের ছোট উঠানটির উপর দিয়া, আমাদের বাড়ির উপর দিয়া, রাস্তা ডিঙাইয়া চারিদিক মেঘে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। তখন আমাদের এই ছোট বাড়িটির আর খানিকটা ভিন্ন আর কিছুই দেখিতে পাওয়া যায় না।

১৮৯৩-এ প্রকাশিত ‘পালামৌ’ গ্রন্থে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন:

বঙ্গবাসীদের কেবল মাঠ দেখা অভ্যাস, মৃত্তিকার সামান্য স্তূপ দেখিলেও তাহাদের আনন্দ হয়...

এই অভ্যাসের কারণেই বোধহয় নিতান্ত অ-সাহিত্যিক বাঙালি যাঁরা লেখক হিসেবে যত না পরিচিতি, অন্য কাজের জন্য তাঁদের অধিক পরিচিতি অধিক, তাঁরাও দার্জিলিং পৌঁছে লিখে ফেলেছেন এই শহরকে নিয়ে রীতিমতো আস্ত বই। যেমন বলা যায়, কৃষ্ণনগরের বিশিষ্ট ফৌজদারি উকিল তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। তিনি গিয়েছিলেন ১৮৯৪-এ। ফিরে এসে যে বইটি লিখেছিলেন তার নাম ‘দার্জিলিং প্রবাসীর পত্র’। আর লিখেছিলেন নায়েব প্রভাতচন্দ্র দোবে। তিনি দার্জিলিং গিয়েছিলেন মহিষাদলের রাজা সতীপ্রসাদ গর্গের সঙ্গী হয়ে সন ১৯০৬-এ। তাঁর লেখা বইটির নাম ‘দারজিলিং’। প্রথম প্রকাশ ১৩১৭ বঙ্গাব্দে।

যে বছর এরিক শিপটন মাউন্ট এভারেস্টের যাত্রাপথ সন্ধান করতে এসেছিলেন, সেই ১৯৫১-এ দার্জিলিং গিয়েছিলেন বাঙালি কথাসাহিত্যিক নারায়ণ সান্যাল। তখন তিনি মধ্য-বিশের তরতাজা যুবক। লেখক হিসেবে মান্যতা পেতে একটু দেরি আছে তখনও। সেই যাত্রার বিবরণে তিনি যত্নে ছাঁটা কাগজে ম্যাপ, রেখাচিত্রসহ স্বহস্তে লিখে এবং এঁকে সেলাই করে রেখেছিলেন বইয়ের আকারে।

তখনো লেখক হয়ে না ওঠা যুবক তার ছাপতে না দেয়া পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন—

এই দুটো চোখেই তো দেখেছি উত্তাল তরঙ্গমেখলা সমুদ্র, দেখেছি শস্যভারনতা শ্যামল ধান্যক্ষেত্র, আজ দেখছি তার অন্য রূপ। হে মহামৌন গিরিরাজ তুমিই আমাকে পাঠিয়েছিলে আমন্ত্রণ... নিঃশব্দ নিঃসঙ্গ প্রান্তরে স্তব্ধ গিরিরাজ যে অশ্রুত গান গেয়ে চলেছেন, বহুদূর থেকে তার সংগীতরব শুনেই তো ব্যাকুল হয়ে ছুটে এসেছি।

অনেক বছর পরে গোয়েন্দা কাহিনী রচনা করতে গিয়ে হয়তো সেই মহামৌন গিরিরাজের অশ্রুত সংগীতের কথা মনে রেখে পটভূমি হিসেবে দার্জিলিংকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, ততদিনে সাহিত্যিক হিসেবে বাংলার সাহিত্য জগতে সুপ্রতিষ্ঠিত সান্যালমশাই।

অবশ্য দার্জিলিং আর গোয়েন্দা কাহিনীর কথা একসঙ্গে উঠলে প্রথমেই মনে পড়বে ফেলুদার কথা, যার গল্পে অকুস্থল একটা বিশেষ বিষয়। সেখানে দুটি গল্পে ফেলুদার তদন্তের পটভূমি হিসেবে দার্জিলিংকে বেছে নিয়েছেন সত্যজিৎ রায়। ফ্র্যাঙ্ক স্মাইথ লিখেছেন, নিচের উপত্যকা থেকে সরল শেরপা বা লেপচারা মাথা তুলে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখে যেমন আবেগ অনুভব করেন, দার্জিলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে কতকটা ওইরকম অনুভূতিই হয় যুক্তিপূর্ণ মানসিকতার যেকোনো শিক্ষিত মানুষের। সত্যজিেয়র কাহিনীতে ফেলু আর তোপসের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে উদগ্রীব হয়ে থাকা বা লালমোহনবাবুর জীবনে প্রথমবার সেই দৃশ্য দেখে স্বর্গীয় হেভেনলি অপার্থিব অনির্বচনীয় সাব্লাইম ইত্যাদি বিশেষণের ব্যবহার ফ্র্যাঙ্ক স্মাইথের উপলব্ধিরই প্রতিধ্বনি মনে হয়।

‘দার্জিলিং, স্মৃতি সমাজ ইতিহাস’ বইটির লেখক পরিমল ভট্টাচার্য চাকরি সূত্রে দার্জিলিংয়ে থাকার সময় নিবিড়ভাবে দেখেছেন শহরটিকে। শুধু দেখেননি, অপার উৎসাহে চেষ্টা করেছেন দার্জিলিংকে আবিষ্কার করতে। সেই অনুসন্ধান পাঠকের কাছে দার্জিলিংকে পৌঁছে দেয় এক অনন্য চেহারায়। সে রূপ না কাহিনীর পটভূমির, না ভ্রামাণিকের গন্তব্যের। শ্রীভট্টাচার্যের লেখা নন ফিকশন হলেও পাঠকের কখনো মনে হয় দার্জিলিং বুঝি এ কাহিনীর নায়ক। দার্জিলিং প্রসঙ্গ শুধু এখানেই নয়, শ্রীভট্টাচার্যের তিব্বতের অনুসন্ধানবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ ‘শাংগ্রিলার খোঁজে’ বইতে দার্জিলিংকে পেশ করা হয়েছে একেবারে ভিন্নরূপে।

তবে দার্জিলিং সত্যিই নায়িকা উঠেছে যে কাহিনীতে, সেটি একটি উপন্যাস। তার নাম ‘শীতে উপেক্ষিতা’। লিখেছেন ‘রঞ্জন’ ছদ্মনামে নিরঞ্জন মজুমদার। তখন বাঙালি টুর্যিস্টের কাছে শীতে বা বর্ষায়ও, সত্যিই উপেক্ষিতা থাকত দার্জিলিং। এখন অবশ্য দিনকাল বা বাঙালির পছন্দ অনেক বদলেছে, কিছু রসিক পাঠকের কাছে ‘শীতে উপেক্ষিতা’র আকর্ষণ কমেনি।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন:

শীতকালের পাহাড়ের একটা বিশেষ ঘ্রাণ আছে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাতাস যেন বুকের ভেতরটা পর্যন্ত ধুয়ে দেয়।

সুনীল যা-ই বলুন, পাহাড়ের, বিশেষ করে দার্জিলিংয়ের একটা নয়, কয়েকটা বিশেষ ঘ্রাণ আছে। সেগুলোর এক-একটি অনুভব করা যায় দিনের বা বছরের বিশেষ সময়ে। আর কিছু ঘ্রাণ আছে দার্জিলিংয়ে সেগুলো পাওয়া যায় সংবৎসর। এমনকি দার্জিলিং থেকে ফিরে আসা পর্যটকও সেই গন্ধ অনুভব করেন ব্যস্ত মুহূর্তে বা যেকোনো অবসরে।

 

প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত: নন-ফিকশন লেখক